সোহরাওয়ার্দীকে কেন পাকিস্তানে ঢুকতে দেয়নি মুসলিম লীগ? । ইতিহাস ও রাজনীতি সিরিজ

হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী—যাঁকে বলা হয় ‘গণতন্ত্রের মানসপুত্র’ এবং পাকিস্তান আন্দোলনের অন্যতম প্রধান রূপকার। অথচ দেশভাগের পর এক অদ্ভুত ও নির্মম পরিহাসের শিকার হন তিনি। যে রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠায় তিনি বাংলার ঘরে ঘরে মুসলিম লীগের বার্তা পৌঁছে দিয়েছিলেন, সেই রাষ্ট্রটি গঠনের পরপরই তাঁর ওপর নেমে আসে অঘোষিত নিষেধাজ্ঞা। তাকে ভারতের দালাল ট্যাগ দিয়ে পাকিস্তানে ঢোকার সব পথ বন্ধ করে দেয়া হয়। সোহরাওয়ার্দীকে পাকিস্তানে প্রবেশে বাধা দেওয়ার নেপথ্যে ছিল পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর চরম সংকীর্ণতা এবং ক্ষমতার চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত করার এক গভীর ষড়যন্ত্র।

সোহরাওয়ার্দীকে কেন পাকিস্তানে ঢুকতে দেয়নি মুসলিম লীগ?

 

হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী
হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী

 

‘ভারতের দালাল’ ও ‘রাষ্ট্রদ্রোহী’ অপবাদ:

দেশভাগের অব্যবহিত পরেই দাঙ্গাবিধ্বস্ত কলকাতায় মুসলমানদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখতে সোহরাওয়ার্দী সেখানে থেকে যান। তিনি মহাত্মা গান্ধীর সাথে শান্তি মিশনে অংশ নেন। সোহরাওয়ার্দীর এই মানবিক অবস্থানকে পাকিস্তানের প্রথম প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান তাঁর রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করেন। তিনি প্রচার করেন যে, সোহরাওয়ার্দী পাকিস্তানের অনুগত নন। লিয়াকত আলী খান প্রকাশ্য জনসভায় সোহরাওয়ার্দীকে ‘ভারতের দালাল’ এবং এমনকি ‘পাকিস্তানের কুত্তা’ (নাউযুবিল্লাহ) বলেও গালি দিয়েছিলেন।

নাগরিকত্ব হরণ ও গণপরিষদ থেকে বহিষ্কার:

১৯৪৮ সালে সোহরাওয়ার্দী যখন করাচিতে গিয়ে পাকিস্তান গণপরিষদের (Constituent Assembly) অধিবেশনে যোগ দিতে চান, তখন লিয়াকত আলীর সরকার এক নজিরবিহীন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। তারা দ্রুত একটি নতুন আইন পাস করে এই যুক্তিতে তাঁর সদস্যপদ বাতিল করে দেয় যে—তিনি যেহেতু পাকিস্তানে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন না, তাই তিনি পাকিস্তানের নাগরিক নন। পাকিস্তান আন্দোলনের অগ্রসেনানীকে তাঁর নিজের তৈরি দেশেই ‘অ-নাগরিক’ বানিয়ে দেওয়া হয়।

নিজ ভূখণ্ড পূর্ব পাকিস্তানে প্রবেশে বাধা:

১৯৪৮ সালের শুরুতে সোহরাওয়ার্দী যখন তাঁর রাজনৈতিক ভিত্তিভূমি পূর্ব বাংলায় (বর্তমান বাংলাদেশ) আসতে চেয়েছিলেন, তখন লিয়াকত আলীর অনুগত খাজা নাজিমুদ্দিন সরকার তাঁর ওপর ‘বহিষ্কারাদেশ’ জারি করে। তাঁকে ঢাকা বিমানবন্দর থেকে জোরপূর্বক ফেরত পাঠানোর চেষ্টা করা হয়। এমনকি ঢাকায় তাঁর জনসভা পণ্ড করতে পুলিশ ও গুন্ডাবাহিনী লেলিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

ক্ষমতার লড়াই ও বাঙালির নেতৃত্বের ভয়:

বাস্তব সত্য এই যে, লিয়াকত আলী খান ও মুসলিম লীগের উচ্চবিত্ত কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব সোহরাওয়ার্দীর জাদুকরী জননেতৃত্বকে ভয় পেতেন। তাঁরা জানতেন, সোহরাওয়ার্দী পাকিস্তানে ফিরলে মেহনতি মানুষ ও সচেতন বাঙালির অধিকারের প্রশ্নে তিনি প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবেন। লিয়াকত আলীর আমলাতান্ত্রিক একনায়কতন্ত্রের সামনে সোহরাওয়ার্দী ছিলেন এক মূর্তমান আতঙ্ক। তাই তাঁকে দমানোর জন্য রাষ্ট্রীয় ‘নিরাপত্তা আইন’ এবং ‘দেশদ্রোহী’ তকমা ব্যবহার করা হয়েছিল।

লিয়াকত আলীর ব্যক্তিগত আক্রোশ:

লিয়াকত আলী খান ১৯৪৭ সালের ১১ আগস্ট সোহরাওয়ার্দীকে গণপরিষদের প্রথম অধিবেশনে তাঁর আসন গ্রহণ করতেও বাধা দেন। ১৯৪৯ সালে যখন তিনি করাচিতে স্থায়ীভাবে থাকতে শুরু করেন, লিয়াকত আলী খান তাঁকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘বিপজ্জনক ব্যক্তি’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করেন।

লিয়াকত আলী খান
লিয়াকত আলী খান

হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর প্রতি পাকিস্তানের এই আচরণ প্রমাণ করে যে, পাকিস্তান রাষ্ট্রটি শুরু থেকেই তার সত্যিকারের প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক নেতাদের ধারণ করতে ব্যর্থ হয়েছিল। যাঁদের ঘাম ও শ্রমে পাকিস্তান অর্জিত হয়েছিল, রাষ্ট্র গঠনের পর তাঁদেরকেই ‘ভারতীয় দালাল’ বানিয়ে ছুড়ে ফেলে দেওয়া হয়। সোহরাওয়ার্দীর এই অপমানই আসলে পরবর্তীকালে আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠন এবং শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের এক অন্যতম প্রেক্ষাপট তৈরি করেছিল।

আরও দেখুন: