বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবদান । ইতিহাস ও রাজনীতি সিরিজ

১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ কালরাত্রিতে যখন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর নামে বাংলাদেশের মাটিতে ইতিহাসের বর্বরতম ও নৃশংসতম গণহত্যা শুরু করে, তখন ভারত কেবল আমাদের একটি প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবেই পাশে দাঁড়ায়নি; বরং তারা দাঁড়িয়েছিল মানবতার এক অতন্দ্র প্রহরী হিসেবে।

একটা বিষয় আমাদের খুব পরিষ্কারভাবে বোঝা দরকার—বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ কিন্তু স্রেফ পাকিস্তান ভাঙার কোনো রাজনৈতিক লড়াই ছিল না, এটি ছিল একটি গোটা জাতির অস্তিত্ব রক্ষার চরম সংগ্রাম। ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সেই বলিষ্ঠ ও দূরদর্শী নেতৃত্ব, ভারতীয় সামরিক বাহিনীর নিখুঁত রণকৌশল এবং ভারতের সাধারণ মানুষের অপরিসীম ত্যাগ ও সহমর্মিতা ছাড়া—মাত্র নয় মাসে এই বিশাল বিজয় অর্জন করা আমাদের জন্য প্রায় অসম্ভব ছিল। ভারত সরকার একদিকে যেমন একাত্তরের সেই কঠিন দিনে আমাদের এক কোটি বিপন্ন মানুষকে নিজেদের দেশে আশ্রয় দিয়েছিল, অন্ন-বস্ত্র দিয়েছিল; অন্যদিকে তেমনি বিশ্ববিবেকের দরবারে পাকিস্তানের এই জঘন্য অন্যায়ের বিরুদ্ধে তীব্র কূটনৈতিক লড়াই চালিয়েছিল। আধুনিক বিশ্বের ইতিহাসে কোনো দেশ অন্য একটি দেশের স্বাধীনতার জন্য এতটা ত্যাগ স্বীকার করেছে—এমন নজির সত্যিই বিরল।

এই যুদ্ধের প্রেক্ষাপটটা যদি একটু বড় ক্যানভাসে দেখেন, তবে বুঝতে পারবেন এর গভীরতা কতটা বিশাল ছিল। একদিকে ছিল একটা উগ্র ধর্মতাত্ত্বিক রাষ্ট্রের পাশবিক সামরিক শক্তি, আর অন্যদিকে ছিল একটা স্বাধীনতাকামী জাতির নিজের আত্মপরিচয় নিয়ে বেঁচে থাকার অদম্য আকাঙ্ক্ষা। ভারত মূলত তিনটি প্রধান কারণে এই যুদ্ধে সর্বাত্মকভাবে জড়িয়ে পড়েছিল—প্রথমত, চোখের সামনে ঘটে যাওয়া মানব ইতিহাসের অন্যতম বড় মানবিক বিপর্যয় রোধ করা; দ্বিতীয়ত, নিজেদের জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং তৃতীয়ত, সীমান্তে একটি ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক প্রতিবেশী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা।

আর ভারতের এই ঐতিহাসিক অবদান কিন্তু কেবল রণক্ষেত্রের যুদ্ধেই সীমাবদ্ধ ছিল না; এটি ছড়িয়ে ছিল আন্তর্জাতিক কূটনীতির টেবিল থেকে শুরু করে ভারতের সাধারণ মানুষের ঘরের রান্নাঘর পর্যন্ত। যেখানে সাধারণ ভারতীয়রা নিজেদের এক বেলার খাবার বাঁচিয়ে আমাদের শরণার্থীদের মুখে তুলে দিয়েছিলেন। এই প্রবন্ধে আমরা ভারত সরকার, তাদের বীর সশস্ত্র বাহিনী এবং সে দেশের সাধারণ মানুষের সেই ত্যাগের মহাকাব্যিক আখ্যানটি প্রতিটি স্তরে খতিয়ে দেখার চেষ্টা করব।

অবশ্য, একটা মাত্র আর্টিকেলে এত বড় একটা ইতিহাসের সবার অবদান পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে স্বীকার করা বা লিখে শেষ করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। আমি এখানে মূলত একটি সাধারণ ধারণা দেওয়ার জন্য ইতিহাসের কিছু প্রধান প্রধান ঘটনাবলি ও সত্যকে আপনাদের সামনে তুলে ধরলাম।

১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংসতা থেকে বাঁচতে ভারতে চলেছে মানুষ
১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংসতা থেকে বাঁচতে ভারতে চলেছে মানুষ

Table of Contents

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবদান

১. শরণার্থী আশ্রয়ে অবদান: বিশ্বের বৃহত্তম মানবিক বিপর্যয় মোকাবিলা

একাত্তরের মার্চ থেকে ১৬ই ডিসেম্বর পর্যন্ত ৯ মাস ধরে সরকারি হিসেবে প্রায় ৯৮ লাখ ৯৯ হাজার ৩০৫ জন (প্রায় ১ কোটি) মানুষ ভিটেমাটি ছেড়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, আসাম ও মেঘালয়ে আশ্রয় নেয়। বাস্তবে এই সংখ্যা আরও বেশি ছিল। এটি ছিল আধুনিক ইতিহাসের বৃহত্তম শরণার্থী সংকট। ভারতের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য এক কোটি অতিরিক্ত মানুষের অন্ন-বস্ত্রের সংস্থান করা ছিল এক অকল্পনীয় অর্থনৈতিক বোঝা।

সীমান্ত উন্মুক্তকরণ ও প্রথম পদক্ষেপ:

২৬শে মার্চ থেকেই সীমান্ত এলাকায় মানুষের ঢল নামতে শুরু করে। ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (BSF) প্রধান কে এফ রুস্তমজি দূরদর্শিতার পরিচয় দেন। তিনি জানতেন, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত আসতে সময় লাগতে পারে, কিন্তু ক্ষুধার্ত ও গুলিবিদ্ধ মানুষের জন্য সময় নেই। তিনি নিজ দায়িত্বে বর্ডার খুলে দেওয়ার এবং বিএসএফ জওয়ানদের ব্যক্তিগত রেশন থেকে শরণার্থীদের খাবার দেওয়ার নির্দেশ দেন। এটি ছিল ভারতের প্রথম মানবিক সংকেত।

ত্রিপুরার বিস্ময়কর ত্যাগ:

ত্রিপুরার অবদানকে আলাদাভাবে স্বর্ণাক্ষরে লেখা উচিত। ১৯৭১ সালে ত্রিপুরার নিজস্ব জনসংখ্যা ছিল মাত্র ১৫ লাখ ৫৫ হাজার। অথচ সেখানে আশ্রয় নেওয়া শরণার্থীর সংখ্যা ছিল প্রায় ১৬ লাখ। অর্থাৎ, একটি রাজ্য তার নিজস্ব জনসংখ্যার চেয়েও বেশি মানুষকে জায়গা দিয়েছিল। আগরতলার প্রতিটি সরকারি স্কুল, অফিস এমনকি মানুষের ব্যক্তিগত শোবার ঘরও তখন শরণার্থীদের জন্য উন্মুক্ত ছিল। ত্রিপুরার তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী শচীন্দ্রলাল সিংহ নিজে ত্রাণ শিবিরে গিয়ে তদারকি করতেন।

পশ্চিমবঙ্গের গণজাগরণ:

পশ্চিমবঙ্গের প্রতিটি জেলা—বিশেষ করে নদীয়া, চব্বিশ পরগনা ও মালদহ—হয়ে উঠেছিল একেকটি বিশাল আশ্রয় শিবির। সল্টলেকের নাম তখন ছিল ‘রিফিউজি ক্যাম্প সিটি’। কলকাতার সাধারণ মানুষ রাস্তা থেকে বালতি নিয়ে অর্থ সংগ্রহ করতেন। পশ্চিমবঙ্গের অনেক সম্পন্ন কৃষক, যেমন মেদিনীপুরের বিপিন বিহারী, তাঁর সারা বছরের ফলানো ২০ মণ ধান স্থানীয় লঙ্গরখানায় দান করে দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, “আমার ঘরে অন্ন থাকতে আমার প্রতিবেশী না খেয়ে মরবে, এটা আমার ধর্মের শিক্ষা নয়।”

চিকিৎসা ও কলেরার বিরুদ্ধে যুদ্ধ:

বর্ষাকালে যখন শরণার্থী শিবিরগুলোতে কলেরার মড়ক লাগে, তখন ভারতীয় চিকিৎসকরা এক অভাবনীয় বীরত্ব দেখান। ডা. দিলীপ মহলানবিশের নেতৃত্বে ভারতীয় চিকিৎসকরা শরণার্থী শিবিরেই লবণের স্যালাইন বা ORS (Oral Rehydration Salts)-এর কার্যকারিতা প্রমাণ করেন। এই চিকিৎসা পদ্ধতি হাজার হাজার শিশুর প্রাণ বাঁচিয়েছিল, যা পরবর্তীতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) বিশ্বজুড়ে স্বীকৃতি দেয়।

আন্তর্জাতিক পরিদর্শক ও ইন্দিরা গান্ধীর অবস্থান:

প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ১৬ মে বাগডোগরা বিমানবন্দরে নেমে হলদিবাড়ি ও দেওয়ানগঞ্জ শরণার্থী শিবির পরিদর্শন করেন। তিনি যখন ভিজে কাদায় মাখামাখি হয়ে এক ক্যাম্প থেকে অন্য ক্যাম্পে যাচ্ছিলেন, তখন বিশ্ব মিডিয়া ভারতের এই বিশাল ত্যাগের কথা জানতে পারে। মার্কিন সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডি এই শিবিরগুলো পরিদর্শন করে ওয়াশিংটনে গিয়ে রিপোর্ট দিয়েছিলেন, “আমি ভারতের মাটিতে যা দেখেছি, তা কোনো মানুষের বর্ণনার অতীত। ভারত একা এই বোঝা বইতে পারবে না।”

 

১৯৭১ সালে ভারতে শরণার্থী শিবিরে ইন্দিরা গান্ধী
১৯৭১ সালে ভারতে শরণার্থী শিবিরে ইন্দিরা গান্ধী

 

২. আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও কূটনৈতিক অবদান: ইন্দিরা গান্ধীর ‘অগ্নিপরীক্ষা’ ও বিশ্বজয়

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ কেবল রণক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ ছিল না; এর একটি বিশাল অংশ লড়া হয়েছিল বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলোর ড্রয়িং রুমে এবং জাতিসংঘের সদর দপ্তরে। এই কূটনৈতিক যুদ্ধের সেনাপতি ছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। তাঁর দূরদর্শী চিন্তা এবং অদম্য সাহসের কারণে বিশ্ব জনমত পাকিস্তানের বিপক্ষে চলে যায়।

ক. ইন্দিরা গান্ধীর বিশ্বভ্রমণ: বিশ্ববিবেক জাগানোর মহাযাত্রা

১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বর এবং অক্টোবর মাসে ইন্দিরা গান্ধী এক দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর বিশ্বভ্রমণে বের হন। তাঁর লক্ষ্য ছিল বিশ্বনেতাদের বোঝানো যে, বাংলাদেশে যা ঘটছে তা পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ কোনো সমস্যা নয়, বরং এটি একটি সুপরিকল্পিত গণহত্যা।

২১ দিনে ২০ দেশ:

তিনি লন্ডন, প্যারিস, বন (জার্মানি), ব্রাসেলস এবং ওয়াশিংটনসহ ২০টিরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ রাজধানী সফর করেন। তাঁর প্রতিটি বক্তৃতায় তিনি একটি কথা বারবার বলতেন— “ভারত শান্তিকামী দেশ, কিন্তু আমাদের সীমান্তে এক কোটি ক্ষুধার্ত মানুষের হাহাকার আর ওপারে লাখে লাখে মানুষের রক্তপাত আমাদের নিস্পৃহ থাকতে দিচ্ছে না।”

লন্ডনে কড়া অবস্থান:

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ-এর সাথে বৈঠকে ইন্দিরা গান্ধী অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলেছিলেন যে, পাকিস্তান যদি রাজনৈতিক সমাধানে না আসে, তবে ভারত তার জাতীয় নিরাপত্তার খাতিরে যেকোনো পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হবে। তাঁর এই দৃঢ়তার কারণেই ব্রিটিশ গণমাধ্যম (যেমন: বিবিসি ও দ্য গার্ডিয়ান) বাংলাদেশের গণহত্যার খবর ব্যাপকভাবে প্রচার করতে শুরু করে।

খ. হোয়াইট হাউসে লড়াই: ইন্দিরা গান্ধী বনাম রিচার্ড নিক্সন

কূটনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে উত্তেজনাকর মুহূর্ত ছিল ইন্দিরা গান্ধীর ওয়াশিংটন সফর। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার ছিলেন ঘোরতর ভারত-বিদ্বেষী এবং পাকিস্তানের অন্ধ সমর্থক।

নিক্সন ইন্দিরা গান্ধীকে অবজ্ঞা করার জন্য নির্ধারিত সময়ের ৪৫ মিনিট পরে বৈঠকে যোগ দেন। কিন্তু ইন্দিরা গান্ধী বিচলিত না হয়ে শান্তভাবে নিক্সনের চোখে চোখ রেখে বলেছিলেন, “আমি এখানে আপনার কাছে সাহায্য চাইতে আসিনি। আমি এসেছি আপনাদের জানাতে যে, দক্ষিণ এশিয়ায় আপনারা যে একনায়কতন্ত্রকে সমর্থন দিচ্ছেন, তার পরিণতি শুভ হবে না।”

পরবর্তীতে উন্মুক্ত হওয়া নথিপত্রে দেখা যায়, কিসিঞ্জার ইন্দিরা গান্ধীকে ‘অত্যন্ত কঠিন ও বিপজ্জনক নারী’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। কিন্তু ইন্দিরা গান্ধী আমেরিকান সিনেটর এবং বুদ্ধিজীবীদের সাথে আলাদা বৈঠক করে তাদের বুঝাতে সক্ষম হন যে, পাকিস্তান আসলে গণতন্ত্রকে হত্যা করছে।

গ. সোভিয়েত-ভারত মৈত্রী চুক্তি: একটি কূটনৈতিক মাস্টারস্ট্রোক

৯ আগস্ট, ১৯৭১ সালে ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে ২০ বছর মেয়াদী ‘শান্তি, মৈত্রী ও সহযোগিতা চুক্তি’ স্বাক্ষরিত হয়। এটি ছিল মুক্তিযুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক বিজয়।

এই চুক্তির ফলে ভারত নিশ্চিত হয় যে, যদি আমেরিকা বা চীন সরাসরি যুদ্ধে হস্তক্ষেপ করে, তবে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভারতের পাশে দাঁড়াবে।

এই চুক্তির নেপথ্য কারিগর ছিলেন ইন্দিরা গান্ধীর উপদেষ্টা ডি পি ধর। তিনি মস্কোতে দিনের পর দিন বৈঠক করে এই ঐতিহাসিক চুক্তিটি চূড়ান্ত করেছিলেন।

ঘ. জাতিসংঘে স্নায়ুযুদ্ধ ও সোভিয়েত ‘ভেটো’

ডিসেম্বরে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে আমেরিকা ও চীন বারবার যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব আনে। তাদের লক্ষ্য ছিল ভারতকে থামিয়ে দিয়ে পাকিস্তানকে রক্ষা করা।

৪, ৫ এবং ১৩ ডিসেম্বর—এই তিন দিন সোভিয়েত ইউনিয়ন নিরাপত্তা পরিষদে মার্কিন প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ‘ভেটো’ প্রদান করে। এর ফলে ভারত তার অভিযান চালিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সময় পায়। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সরদার শরণ সিং এবং রাষ্ট্রদূত সমর সেন সেই দিনগুলোতে নিউইয়র্কে যে অদম্য লড়াই চালিয়েছিলেন, তা আজ ইতিহাসের এক গর্বিত অধ্যায়।

 

ঙ. ভুটান ও ভারতের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি

যুদ্ধ চলাকালীনই ৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। তার ঠিক আগে বা একই দিনে ভুটানও স্বীকৃতি প্রদান করে। এই স্বীকৃতি ছিল বাংলাদেশের জন্য এক বিশাল রাজনৈতিক বিজয়, কারণ এর ফলে বিশ্বের মানচিত্রে বাংলাদেশের অস্তিত্ব দালিলিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যায় - পাকিস্তানি বাহিনীর ওপরে হামলা চালাচ্ছে ভারতীয় সেনা

৩. সামরিক অবদান: বাঙালিদের আত্মসম্মান ও যৌথ বাহিনীর রণকৌশল

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সামরিক সহযোগিতা কেবল অস্ত্র বা সৈন্য সরবরাহের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। ভারতের তৎকালীন সামরিক নেতৃত্বের একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল দিক ছিল—তাঁরা চেয়েছিলেন এই যুদ্ধটি যেন বিশ্বের কাছে কোনোভাবেই ‘ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ’ হিসেবে পরিচিত না হয়, বরং এটি যেন ‘বাঙালির মুক্তির সংগ্রাম’ হিসেবেই ইতিহাসে প্রতিষ্ঠিত হয়। এই লক্ষ্যেই ভারত প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অপারেশনের পরিকল্পনা এমনভাবে করেছিল যাতে শুরুর আঘাতটি আসে মুক্তিযোদ্ধাদের হাত দিয়ে এবং কৃতিত্বের দাবিদার হয় নবজাতক বাংলাদেশ।

ক. কিলোফ্লাইট (Kilo Flight): বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর গৌরবময় জন্ম

ভারতের কাছে তখন অত্যাধুনিক সব যুদ্ধবিমান ছিল, যা দিয়ে তারা সহজেই আকাশপথ নিয়ন্ত্রণ করতে পারত। কিন্তু ভারত চেয়েছিল বাংলাদেশের নিজস্ব একটি বিমানবাহিনী গড়ে উঠুক।

ভারত সরকার মুক্তিবাহিনীর হাতে একটি পুরোনো ডিসি-৩ ডাকোটা (DC-3 Dakota), একটি অটার বিমান এবং একটি অ্যালুয়েট হেলিকপ্টার তুলে দেয়। নাগাল্যান্ডের দিমাপুরে ভারতীয় বিমানবাহিনীর টেকনিশিয়ানরা রাতদিন পরিশ্রম করে এই বেসামরিক বিমানগুলোতে রকেট পড এবং মেশিনগান ফিট করে সেগুলোকে যুদ্ধবিমানে রূপান্তর করেন।

৩রা ডিসেম্বর ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধে নামার কয়েক ঘণ্টা আগে, দিমাপুর থেকে উড়ে এসে এই ‘কিলোফ্লাইট’-এর বীর বাঙালি বৈমানিকরাই চট্টগ্রামের জ্বালানি ডিপো এবং নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল তেল ডিপোতে প্রথম সফল বিমান হামলা চালান। ভারত চেয়েছিল পাকিস্তানি সেনাদের ওপর প্রথম আকাশপথের আঘাতটি যেন বাঙালির হাত দিয়েই হয়, যাতে তাঁদের আত্মসম্মান ও সক্ষমতা বিশ্বদরবারে প্রমাণিত হয়।

খ. নৌ-যুদ্ধ ও অপারেশন জ্যাকপট: সমুদ্রের নিচে বাঙালির বীরত্ব

নৌ-যুদ্ধের ক্ষেত্রেও ভারত একই নীতি অনুসরণ করেছিল। ভারতীয় নৌবাহিনী চাইলেই সরাসরি জাহাজ পাঠাতে পারত, কিন্তু তারা বেছে নিয়েছিল কঠিনতম পথ—বাঙালি তরুণদের নৌ-কমান্ডো হিসেবে গড়ে তোলা।

পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার পলাশীতে ভাগীরথী নদীর তীরে প্রায় ৪৫০ জন বাঙালি তরুণকে নৌ-কমান্ডো হিসেবে কঠোর প্রশিক্ষণ দেয় ভারতীয় নৌবাহিনী। প্রশিক্ষক হিসেবে ছিলেন ভারতীয় নেভির অত্যন্ত দক্ষ অফিসাররা।

১৫ই আগস্টের ‘অপারেশন জ্যাকপট’-এ চট্টগ্রাম, মোংলা ও চাঁদপুর বন্দরে পাকিস্তানি জাহাজ ধ্বংস করার মিশনে সব কটি অপারেশন চালিয়েছিলেন বাঙালি কমান্ডোরা। ভারতীয় নৌবাহিনী নেপথ্যে থেকে ল্যাপপেট মাইন ও ডাইভিং সরঞ্জাম সরবরাহ করলেও, ইতিহাসের পাতায় এই মহাকাব্যিক অভিযানের নায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বাঙালি মুক্তিযোদ্ধারা। এটি ছিল ভারতের পক্ষ থেকে বাঙালির জাতীয় বীরত্বের প্রতি এক গভীর শ্রদ্ধা।

গ. যৌথ কমান্ড ও মিত্রবাহিনী: এক অভিন্ন রক্তস্রোত

৩রা ডিসেম্বর থেকে ১৬ই ডিসেম্বর—এই চূড়ান্ত যুদ্ধের সময় গঠিত হয় ‘যৌথ কমান্ড’ বা মিত্রবাহিনী। জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার নেতৃত্বে প্রতিটি অভিযানে একটি অলিখিত নিয়ম ছিল—মুক্তিবাহিনীর সদস্যদের অগ্রভাগে রাখা।

ভারতীয় নিয়মিত সেনাবাহিনী যখন ভারী অস্ত্র নিয়ে এগোত, তখন তাঁদের পথপ্রদর্শক এবং সম্মুখ সারির লড়াকু হিসেবে থাকত মুক্তিবাহিনী। এর ফলে প্রতিটি জনপদ স্বাধীন হওয়ার পর সেখানে প্রথম বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা উত্তোলিত হতো মুক্তিবাহিনীর সদস্যদের হাত দিয়ে।

জেনারেল সগৎ সিং-এর নেতৃত্বে মেঘনা নদী অতিক্রমের সময় ভারতীয় হেলিকপ্টারগুলো যখন হাজার হাজার সৈন্য পার করছিল, তখন মুক্তিযোদ্ধাদের বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল যাতে ঢাকার দিকে চূড়ান্ত যাত্রায় তাঁরাই থাকেন প্রথম সারিতে।

ঘ. স্যাম মানেকশর ‘আত্মসম্মানবোধ’ ও আত্মসমর্পণের দলিল

ফিল্ড মার্শাল স্যাম মানেকশ চেয়েছিলেন বাঙালির বিজয় যেন পূর্ণাঙ্গ মর্যাদার হয়। ১৬ই ডিসেম্বরের আত্মসমর্পণের দলিলে কেবল ভারতীয় বাহিনীর নাম ছিল না; এটি ছিল ‘ভারত ও বাংলাদেশ যৌথ কমান্ডের’ কাছে আত্মসমর্পণ। রেসকোর্স ময়দানে যখন জেনারেল নিয়াজী সই করছিলেন, তখন ভারতের জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার পাশে বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ কে খন্দকারকে সসম্মানে উপস্থিত রাখা হয়েছিল। ভারত এটি নিশ্চিত করেছিল যাতে বিশ্ববাসী দেখে যে, এই বিজয় যৌথ সংগ্রামের ফল।

ঙ. ৩,৯০০ জন শহীদের রক্ত ও নিঃস্বার্থ বিদায়

এই যুদ্ধে ভারতের প্রায় ৩,৯০০ জন সৈনিক শহীদ হন এবং ১০,০০০-এর বেশি আহত হন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য ভারতীয় জওয়ানরা যে রক্ত দিয়েছেন, তা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। কিন্তু সবচেয়ে বড় আত্মসম্মানের জায়গাটি তৈরি হয়েছিল ১৯৭২ সালের ১৭ই মার্চ। বঙ্গবন্ধুর অনুরোধে ভারত অত্যন্ত দ্রুততম সময়ের মধ্যে তাদের সমস্ত সৈন্য প্রত্যাহার করে নেয়। বিশ্বের ইতিহাসে খুব কম দেশই আছে যারা যুদ্ধের পর বিজয়ী হিসেবে অন্য দেশের মাটিতে অবস্থান করেনি। এই নিঃস্বার্থ বিদায় প্রমাণ করেছিল যে ভারত বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও বাঙালির আত্মসম্মানকে কতটা উঁচুতে স্থান দেয়।

১৯৭১ এ বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের বুদ্ধিজীবীরা এককাতারে

৪. শিল্পী, সাহিত্যিক ও নাগরিক সমাজের অবদান

রণক্ষেত্রে যখন মুক্তিযোদ্ধারা জীবন বাজি রেখে লড়ছিলেন, তখন ভারতের সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিজীবী সমাজ ভারতের প্রতিটি প্রান্তে এবং বিশ্বজুড়ে গড়ে তুলেছিল এক অপ্রতিরোধ্য জনমত। এই লড়াই ছিল চেতনার, এই লড়াই ছিল সহমর্মিতার।

ক. লতা মঙ্গেশকর ও সুরের জাদুতে সংগৃহীত রশদ

সুরসম্রাজ্ঞী লতা মঙ্গেশকরের অবদান কেবল গানে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি বাংলাদেশের মানুষের আর্তনাদে এতটাই ব্যথিত হয়েছিলেন যে, তিনি তাঁর ব্যক্তিগত আয়ের একটি বড় অংশ উৎসর্গ করেন।

লতা মঙ্গেশকর তার সাহায্য শুরুই করেন এক লক্ষ রুপি দিয়ে। তারপর তিনি ঘোষণা করেছিলেন যে, ১৯৭১ সালে তাঁর গাওয়া নির্দিষ্ট কালজয়ী গানগুলোর গ্রামোফোন রেকর্ড থেকে প্রাপ্ত রয়্যালটির পুরোটাই তিনি ‘বাংলাদেশ রিফ্যুজি ফান্ডের’ জন্য দান করবেন। এছাড়া তার অনেকগুলো হিট গানের রয়ালিটি বাংলাদেশ সরকারকে দিয়েছিলেন যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত।

লতা মঙ্গেশকর, প্রখ্যাত অভিনেতা সুনীল দত্ত, ওয়াহিদা রেহমান এবং নার্গিস দত্ত মিলে বোম্বের (মুম্বাই) রাস্তায় ট্রাকে করে ঘুরে বেরিয়েছেন। লতা জি ট্রাকে দাঁড়িয়ে মাইকে গান ধরতেন, আর সাধারণ মানুষ তাঁদের সাধ্যমতো টাকা, গয়না এবং প্রয়োজনীয় দ্রব্য সেই ট্রাকে তুলে দিত। লতা জির এই আবেদন ভারতীয়দের মনে এক প্রবল সংহতি তৈরি করেছিল।

সে সময় লতা মঙ্গেশকর ছাড়াও আশা ভোসলে, কিশোর কুমার, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, মোহাম্মদ রফি, মান্না দে, সলিল চৌধুরী প্রমুখ বাংলাদেশের ফান্ড তৈরির জন্য সংগীত আসরে ফ্রি গান পরিবেশন করেছিলেন।

খ. আকাশবাণী ও দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়: একটি অবিনাশী কণ্ঠস্বর

আকাশবাণী কলকাতা কেন্দ্রের ভূমিকা ছিল একটি পূর্ণাঙ্গ সেনাবাহিনীর চেয়েও শক্তিশালী। সংবাদ পাঠক দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাচনভঙ্গি ছিল জাদুকরী। তিনি যখন রণাঙ্গনের খবর পাঠ করতেন, তখন সীমান্তের ওপারে মুক্তিযোদ্ধারা নতুন শক্তিতে জ্বলে উঠতেন এবং পাকিস্তানি সেনারা আতঙ্কে থাকত। দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের কণ্ঠ ছিল বিজয়ের সংকেত।

সাংবাদিক উপেন তরফদার জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে শব্দচিত্র ধারণ করে আনতেন যা ‘সংবাদ পরিক্রমা’ অনুষ্ঠানে প্রচারিত হতো। এই অনুষ্ঠানগুলো ভারতের সাধারণ মানুষকে যুদ্ধের ভয়াবহতা এবং বাঙালির বীরত্ব বুঝতে সাহায্য করত।

গ. পণ্ডিত রবিশঙ্কর ও ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’

বাংলাদেশের পক্ষে আন্তর্জাতিক জনমত তৈরির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সাংস্কৃতিক ঘটনাটি ছিল ১ আগস্ট ১৯৭১-এর ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’।

পন্ডিত রবিশঙ্কর তাঁর বন্ধু এবং বিটলস তারকা জর্জ হ্যারিসনকে অনুরোধ করেছিলেন বাংলাদেশের মানুষের জন্য কিছু করার। রবিশঙ্করের উদ্যোগেই নিউ ইয়র্কের ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে সেই ঐতিহাসিক কনসার্টটি হয়। বব ডিলান, এরিক ক্ল্যাপটন এবং জর্জ হ্যারিসনের পাশে রবিশঙ্কর যখন সেতার হাতে বসলেন, তখন পুরো বিশ্ব বাংলাদেশের গণহত্যার খবর জানতে পেরেছিল। এই কনসার্ট থেকে সংগৃহীত অর্থ ভারতের মাধ্যমে শরণার্থীদের সহায়তায় ব্যয় করা হয়।

ঘ. সুচিত্রা সেন ও শিল্পীদের ব্যক্তিগত মমতা

কিংবদন্তি অভিনেত্রী সুচিত্রা সেনের শেকড় ছিল বাংলাদেশের পাবনায়। তিনি অত্যন্ত অন্তর্মুখী হওয়া সত্ত্বেও পর্দার আড়ালে থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ সাহায্য করেছিলেন। তিনি তাঁর পরিচিত মহলে অর্থ সংগ্রহের আবেদন জানাতেন এবং শরণার্থীদের জন্য শীতবস্ত্র ও ওষুধের সংস্থান করেছিলেন। অভিনেতা রাজ কাপুর, অমিতাভ বচ্চন এবং শশী কাপুরের মতো তারকারাও সেই সময় রাস্তায় নেমে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে সোচ্চার হয়েছিলেন।

ঙ. সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীদের লেখনী

কলকাতার বুদ্ধিজীবী সমাজ একাত্তরকে নিজেদের লড়াই মনে করেছিলেন। বাংলাদেশের সংকট দেখে অন্নদাশঙ্কর রায় লিখেছিলেন তাঁর সেই কালজয়ী কবিতা— “যতকাল রবে পদ্মা যমুনা…” যা আজও বাঙালির হৃদয়ে বঙ্গবন্ধুর অমরত্বের প্রতীক। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে অসুস্থ শরীর নিয়ে সভা-সমাবেশে যোগ দিয়ে বাংলাদেশের পক্ষে কথা বলেছিলেন।

বিশ্বখ্যাত চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায় আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোতে নিয়মিত চিঠি ও কলাম লিখে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নৃশংসতার চিত্র তুলে ধরতেন। তাঁর লেখনী পশ্চিমা বিশ্বের বুদ্ধিজীবী মহলে বড় প্রভাব ফেলেছিল।

মুক্তিযোদ্ধা

৫. সাধারণ মানুষের অবদান: একমুঠো চাল ও প্রাণের বন্ধন

ভারত সরকারের বড় বড় সিদ্ধান্তের চেয়েও যে বিষয়টি এই মুক্তিযুদ্ধকে এক অনন্য উচ্চতা দিয়েছিল, তা হলো ভারতের সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত আত্মত্যাগ। ভারতের সাধারণ মানুষ তাদের সীমিত সম্পদ নিয়েও যে উদারতা দেখিয়েছিল, তা ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

ত্রিপুরার গৃহিণীদের ‘মুষ্টি চাল’:

ত্রিপুরার গ্রামের প্রতিটি হিন্দু-মুসলিম ঘরে মায়েরা একটি সুন্দর নিয়ম চালু করেছিলেন। প্রতিদিন রান্নার আগে তাঁরা একমুঠো করে চাল একটি হাঁড়িতে আলাদা করে রাখতেন। সপ্তাহ শেষে সেই জমানো চাল দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য লঙ্গরখানা চালানো হতো। যে রাজ্যে নিজেদেরই খাবারের অভাব ছিল, সেখানে ১৬ লাখ মানুষকে আশ্রয় দেওয়া কেবল আত্মার বন্ধনেই সম্ভব ছিল।

কলকাতার স্কুল পড়ুয়াদের মাটির ব্যাংক:

পশ্চিমবঙ্গের স্কুলগুলোতে ছাত্রছাত্রীরা তাদের টিফিনের পয়সা বাঁচিয়ে ক্লাসে রাখা মাটির ব্যাংকে জমা করত। সেই টাকা দিয়ে কেনা হতো শরণার্থীদের জন্য কম্বল ও দুধ। এমন অনেক নজির আছে যে, ছোট ছোট শিশুরা তাদের শখের খেলনা বিক্রি করে সেই টাকা রিফ্যুজি ফান্ডের বক্সে দিয়ে দিয়েছিল।

রিকশাচালক মানসিংহের সেই ৫১০ টাকা:

বিহারের মুজাফফরপুরের এক দরিদ্র রিকশাচালক মানসিংহ। তিনি তাঁর সারা জীবনের জমানো ৫১০ টাকা নিয়ে স্থানীয় প্রশাসনের কাছে গিয়েছিলেন বাংলাদেশের মানুষের জন্য সাহায্য হিসেবে। প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী এই খবর পেয়ে অত্যন্ত আবেগপ্লুত হয়েছিলেন এবং বলেছিলেন, “এই ৫১০ টাকা ভারতের নৈতিকতার মেরুদণ্ড।”

রক্তের সাগর ও হাসপাতালের ত্যাগ:

কলকাতার প্রতিটি ব্লাড ব্যাংকে তখন দীর্ঘ লাইন থাকত। ছাত্রছাত্রীরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে রক্ত দিতেন যাতে কোনো আহত মুক্তিযোদ্ধা বা ভারতীয় জওয়ান চিকিৎসার অভাবে মারা না যান। ভারতের হাসপাতালগুলো তখন রোগীদের ভিড়ে উপচে পড়ত, তবুও সাধারণ ভারতীয়রা হাসি মুখে সেই কষ্ট মেনে নিয়েছিল।

ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ মৈত্রী

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ কেবল একটি ভূখণ্ড স্বাধীন করার লড়াই ছিল না; এটি ছিল ভারত ও বাংলাদেশের মানুষের সম্মিলিত রক্তস্রোতে লেখা এক মহাকাব্য। ভারত যদি কেবল তার ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ দেখত, তবে ১ কোটি মানুষকে ৯ মাস অন্ন-বস্ত্র দিত না। ৩,৯০০ জন ভারতীয় সেনার জীবন বিসর্জন এবং বাঙালির আত্মসম্মানকে সবার উপরে রাখার সেই যে মহিমা ভারত প্রদর্শন করেছিল, তা বিশ্বের ইতিহাসে বিরল। ভারত ও বাংলাদেশের এই সম্পর্ক তাই কেবল কূটনৈতিক দলিলে সীমাবদ্ধ নয়, এটি দুই দেশের কোটি কোটি মানুষের হৃদস্পন্দনের এক অমর স্মৃতিগাঁথা।

সোর্স বা উৎস:

  • Bangladesh Documents (Vols. 1 & 2): ১৯৭১ সালে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত এই দুই খণ্ডের দলিলে ইন্দিরা গান্ধীর বিশ্বভ্রমণ, বিশ্বনেতাদের কাছে প্রেরিত চিঠি এবং শরণার্থী সংকটের প্রকৃত পরিসংখ্যান (৯৮ লাখ ৯৯ হাজার ৩০৫ জন) বিস্তারিত রয়েছে।

  • White Paper on Bangladesh: পাকিস্তান সরকার কর্তৃক প্রকাশিত শ্বেতপত্রের বিপরীতে ভারত সরকার যে প্রতি-দলিলাদি পেশ করেছিল, সেখান থেকে কূটনৈতিক তথ্যগুলো নেওয়া।

  • Hamoodur Rahman Commission Report: পাকিস্তানের এই তদন্ত রিপোর্টে ভারতীয় বাহিনীর রণকৌশল এবং মিত্রবাহিনীর অগ্রযাত্রার বিবরণ পাওয়া যায়।

  • Surrender at Dacca: Birth of a Nation — General J.F.R. Jacob: ১৬ই ডিসেম্বরের আত্মসমর্পণের নেপথ্য মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ এবং নিয়াজীকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করার প্রতিটি খুঁটিনাটি এই বই থেকে নেওয়া।

  • The Liberation of Bangladesh — Lt. Gen. Sukhwant Singh: মেঘনা অতিক্রম (Heliborne operation) এবং সগৎ সিং-এর যুদ্ধকৌশলের প্রধান উৎস এই গ্রন্থ।

  • Leadership in the Indo-Pak War 1971 — Major General Arjun Ray: ভারতীয় জওয়ানদের আত্মত্যাগ এবং ৩,৯০০ শহীদের পরিসংখ্যান এই বই থেকে সংগৃহীত।

  • K.F. Rustamji’s Diaries: বিএসএফ প্রধান কে এফ রুস্তমজির ব্যক্তিগত ডায়েরি থেকে প্রথম দিনগুলোতে সীমান্ত খুলে দেওয়া এবং মুক্তিযোদ্ধাদের প্রাথমিক অস্ত্র সাহায্যের তথ্য নেওয়া হয়েছে।

  • The Blood Telegram: Nixon, Kissinger, and a Forgotten Genocide — Gary J. Bass: এই বই থেকে নিক্সন-কিসিঞ্জারের ভারত-বিদ্বেষী মনোভাব এবং ইন্দিরা গান্ধীর ওপর মার্কিন চাপের তথ্যগুলো ভেরিফাই করা হয়েছে।

  • My Truth — Indira Gandhi: ইন্দিরা গান্ধীর ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণমূলক এই বই থেকে তাঁর শরণার্থী শিবির পরিদর্শন এবং বিশ্বভ্রমণের সময়কার মানসিক অবস্থার তথ্য পাওয়া যায়।

  • আকাশবাণী ও স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের আর্কাইভ: দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের সংবাদ পাঠের অংশ এবং শিল্পীদের গান সম্পর্কিত তথ্য আকাশবাণী কলকাতা ও বাংলাদেশের আর্কাইভ থেকে সংগৃহীত।

  • লতা মঙ্গেশকর ও চ্যারিটি কনসার্ট: ১৯৭১ সালের বোম্বে ও দিল্লির সমকালীন সংবাদপত্র (যেমন: The Times of India, Anandabazar Patrika) এবং লতা মঙ্গেশকরের বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে তাঁর রয়্যালটি দান ও ট্রাক মিছিলের তথ্য সংরক্ষিত আছে।

  • সুচিত্রা সেনের অবদান: সাংবাদিক গোপালকৃষ্ণ রায়-এর লেখা এবং সুচিত্রা সেনের পারিবারিক জীবন নিয়ে রচিত জীবনী গ্রন্থ থেকে তাঁর গোপন সহায়তার কথা জানা যায়।

  • ত্রিপুরার অবদান: ত্রিপুরা সরকারের প্রকাশিত ‘Tripura’s Contribution in the Liberation War of Bangladesh’ শীর্ষক প্রতিবেদন।

  • মানসিংহের দান: ১৯৭১ সালের ভারতীয় জাতীয় দৈনিকগুলোতে রিকশাচালক মানসিংহের দান এবং ইন্দিরা গান্ধীর প্রতিক্রিয়ার খবর সচিত্র প্রকাশিত হয়েছিল।

  • কিলোফ্লাইট: বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ কে খন্দকার এবং স্কোয়াড্রন লিডার বদরুল আলমের ডায়েরি ও সাক্ষাৎকার থেকে দিমাপুরের সেই ঐতিহাসিক শুরুর তথ্য নেওয়া।

আরও দেখুন: