আজকের দিনে আমাদের চারপাশে এক অদ্ভুত ও চমত্কার তামাশা দেখতে পাওয়া যায়। অনেক মুমিন, নামধারী ধর্মীয় বক্তা, ওয়াজিন কিংবা তথাকথিত ইসলামপন্থী লেখক মঞ্চে উঠে বা ফেসবুকে বুক ফুলিয়ে ‘মুসলিম বিজ্ঞানী’ নাম দিয়ে ইবনে সিনা, আল-রাজি কিংবা ইবনে রুশদের নাম নেন। জামায়াতে ইসলামীর মতো উগ্র ও সুবিধাবাদী রাজনৈতিক দলগুলো এই বিজ্ঞানীদের নামে বড় বড় হাসপাতাল, ট্রাস্ট, গবেষণা প্রতিষ্ঠান কিংবা কোচিং সেন্টার খুলে কোটি কোটি টাকার ব্যবসা ফাঁদে। বিজ্ঞানের যেকোনো আধুনিক আবিষ্কার দেখলেই এরা এক লাফে মধ্যযুগে ফিরে যায় এবং দাবি করে—এইসব তো আমাদের মুসলিম বিজ্ঞানীরা বহু আগেই আবিষ্কার করে গেছেন!
কিন্তু ইতিহাসের পাতা উল্টালে যে সত্যটি বেরিয়ে আসে, তা অত্যন্ত নির্মম ও লজ্জাজনক। আজ যারা এই বিজ্ঞানীদের নাম ভাঙিয়ে নিজেদের আখের গোছাচ্ছে, ব্যবসা করছে আর সস্তা ধর্মীয় গৌরব খুঁজছে—তাদের পূর্বসূরি কট্টরপন্থীরা কি এই পণ্ডিতদের জীবদ্দশায় তাঁদের শান্তিতে বাঁচতে দিয়েছিল? তাঁরা কি তাঁদের পাশে ছিল?
ইতিহাসের অকাট্য দলিল বলে, এই মহান মানুষগুলো তাঁদের স্বাধীন বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান, যুক্তি এবং দার্শনিক চিন্তার জন্য তৎকালীন কট্টরপন্থী ইসলামী ধর্মীয় শক্তির চরম চক্ষুশূল ছিলেন। ইমাম গাজ্জালীর মতো অত্যন্ত প্রভাবশালী ও রক্ষণশীল ধর্মীয় তাত্ত্বিকেরা এদের অনেকের দর্শন ও বৈজ্ঞানিক চিন্তাকে সরাসরি ‘কুফর’ (ইসলামের পরিপন্থী বা নাস্তিকতা) বলে ফতোয়া দিয়েছিলেন।
রক্ষণশীল সমাজ শুধু এই কুফরি ফতোয়া দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি; তারা এই জ্ঞানসাধকদের সমাজচ্যুত করেছে, অপমানিত করেছে, ডাইনি বা কাফের আখ্যা দিয়ে লাঞ্ছিত করেছে, রাজপথে পিটিয়ে রক্তাক্ত করেছে, ‘পাগল’ বলে বছরের পর বছর অন্ধকার ঘরে গৃহবন্দি করে রেখেছে, দেশ থেকে নির্বাসনে পাঠিয়েছে, জেলের অন্ধকূপে ভরেছে এবং অনেককে নৃশংসভাবে হত্যাও করেছে। ইমাম গাজ্জালীর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘তাহাফুত আল-ফালাসিফা’ (দার্শনিকদের অসংগতি) ছিল যুক্তি ও বিজ্ঞানের বিরুদ্ধে অন্ধ বিশ্বাসের এই প্রাতিষ্ঠানিক যুদ্ধের সবচেয়ে বড় তাত্ত্বিক হাতিয়ার।
যে উগ্রপন্থী ও ধর্মান্ধ গোষ্ঠী এক সময় এই বিজ্ঞানীদের চলার পথে পদে পদে কাঁটা বিছিয়েছে, তাঁদের বই পুড়িয়ে ছাই করেছে, আজ সেই একই গোষ্ঠীর উত্তরসূরিরা নিজেদের দেউলিয়াত্ব ঢাকতে এই বিজ্ঞানীদের ‘মুসলিম বিজ্ঞানী’ বলে বিশ্বমঞ্চে গর্ব করে আর তাঁদের নাম বিক্রি করে নিজেদের পকেট ভারী করে। আসুন, ইতিহাসের ধুলোবালি ঝেড়ে একটু দেখে নেওয়া যাক—আমাদের সমাজ কার সাথে কী পরিণতি করেছিল।
প্রথম অধ্যায়: মুসলিম স্বর্ণযুগ—বিজ্ঞানের আলো বনাম ফতোয়ার অন্ধকার
১. জাবির ইবনে হাইয়ান (Jabir Ibn Haiyan, ৭২২–৮০৪)
ইউরোপে ‘Geber’ নামে পরিচিত। তিনি রসায়নের জনক (The Father of Chemistry) এবং ল্যাবরেটরিতে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার আদি প্রবক্তা। তরলীকরণ, বাষ্পীভবন ও অম্লরাজ (Aqua Regia) আবিষ্কারসহ রসায়নকে কুসংস্কারের অন্ধকার থেকে বিজ্ঞানের আলোয় এনেছিলেন তিনি।
তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজ তাঁর এই ল্যাবরেটরির রাসায়নিক পরীক্ষা-নিরীক্ষাকে ‘জাদুবিদ্যা’ ও ‘শয়তানের কাজ’ (Alchemy/Witchcraft) বলে ফতোয়া দেয়। আব্বাসীয় খলিফা হারুন-অর-রশীদের বারমাকি (Barmakids) মন্ত্রীদের পতনের পর, কট্টরপন্থীদের প্ররোচনায় জাবিরের ওপর রাষ্ট্রীয় কোপ নেমে আসে এবং তাঁর বৈজ্ঞানিক কাজকে নিষিদ্ধ করার চেষ্টা হয়। জীবন বাঁচাতে এই বৃদ্ধ বয়সে তাঁকে বাগদাদ থেকে পালিয়ে কুফায় চলে যেতে হয়েছিল এবং জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি কুফায় এক প্রকার গৃহবন্দি ও চরম অবমাননাকর নজরদারির মধ্যে কাটাতে বাধ্য হন।
২. আল-খোয়ারিজমি (Al-Khwarizmi, ৭৮০–৮৫০)
ইউরোপে ‘Algoritmi’ বা ‘Algaurizin’ নামে পরিচিত। তিনি বীজগণিতের জনক (Father of Algebra) এবং যাঁর নাম থেকে আজকের কম্পিউটার বিজ্ঞানের ‘অ্যালগরিদম’ (Algorithm) শব্দের উৎপত্তি। তাঁর কাজই ইউরোপে হিন্দু-আরবি সংখ্যা পদ্ধতি পরিচয় করিয়ে দেয়।
খোয়ারিজমি তাঁর জীবদ্দশায় বেঁচে গিয়েছিলেন কারণ তিনি আব্বাসীয় খলিফা আল-মামুনের ‘বাইতুল হিকমাহ’ (House of Wisdom)-র প্রধান ছিলেন এবং খলিফা নিজে ‘মু’তাজিলা’ বা যুক্তিবাদী দর্শনের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। কিন্তু খোয়ারিজমির মৃত্যুর পর যখনই বাগদাদে যুক্তিবাদীদের পতন ঘটে এবং কট্টরপন্থী খলিফা আল-মুতাওয়াক্কিল ক্ষমতায় বসেন, তখন এই বিজ্ঞানীদের সমস্ত কাজকে ‘ইসলাম-বিরোধী’ তকমা দেওয়া হয়। পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে কট্টর ওলামারা ফতোয়া দেন যে—বীজগণিত বা উচ্চতর গণিত চর্চা করা মুসলিমদের জন্য জরুরি নয়, বরং তা মানুষকে নাস্তিকতার দিকে নিয়ে যায়। খোয়ারিজমির উত্তরাধিকারীদের ওপর এই ধর্মীয় মানসিকতাই পরবর্তী সময়ে আরবে বিজ্ঞান চর্চার কবর খুঁড়েছিল।
৩. আল-কিন্দী (Al-Kindi, ৮০১–৮৭৩)
ইউরোপে ‘Alkindus’ নামে পরিচিত। যাঁকে ইতিহাসের পাতায় সশ্রদ্ধচিত্তে “আরবদের দার্শনিক” (The Philosopher of the Arabs) বলা হয়। তিনি একাধারে ছিলেন গণিতবিদ, পদার্থবিজ্ঞানী ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী এবং প্রথম মুসলিম পেরিপেটেটিক (এরিস্টটেলীয়) দার্শনিক।
আল-কিন্দী গ্রিক দর্শন ও বিজ্ঞান চর্চাকে আরবে জনপ্রিয় করার অপরাধে কট্টরপন্থীদের চরম রোষানলে পড়েন। আব্বাসীয় খলিফা আল-মুতাওয়াক্কিলের আমলে যখন যুক্তিবাদের (মু’তাজিলা) পতন ঘটে এবং কট্টর রক্ষণশীলতা রাজকীয় আশ্রয় পায়, তখন আল-কিন্দীর ওপর নেমে আসে অমানুষিক নির্যাতন। এই বৃদ্ধ বিজ্ঞানী ও গণিতবিদকে প্রকাশ্য রাজপথে এনে পিঠে ৬০ ঘা চাবুক মারা হয়। তাঁর সারাজীবনের সাধনায় গড়ে তোলা বিশাল ও সমৃদ্ধ লাইব্রেরিটি (‘আল-কিন্দীয়া’) রাষ্ট্রীয়ভাবে বাজেয়াপ্ত করা হয়। জীবনের শেষ দিনগুলোতে চরম একাকীত্ব, দারিদ্র্য আর সামাজিক অবমাননার বিষ বুকে নিয়ে এই মহান বিজ্ঞানীকে পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে হয়েছিল।
৪. সাবিত ইবনে কুররা (Thabit ibn Qurra, ৮২৬–৯০১)
ইউরোপে ‘Thebit’ নামে পরিচিত। তিনি একাধারে আরব গণিতবিদ, চিকিৎসক ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী; টলেমির জ্যোতির্বিজ্ঞান ব্যবস্থার প্রথম সংস্কারক এবং স্থিতিবিদ্যার (Statics) জনক।
তিনি মূলত তৎকালীন ‘হাররান’ এলাকার ‘সাবিয়ান’ (তারা উপাসক) সম্প্রদায়ের মুক্তচিন্তক ছিলেন। তিনি যখন বিজ্ঞান ও গণিতের যুক্তির আলোয় তৎকালীন ধর্মীয় অন্ধতাকে প্রশ্ন করতে শুরু করেন, তখন খোদ তাঁর নিজের রক্ষণশীল সম্প্রদায়ের ধর্মগুরুরাই তাঁর বিরুদ্ধে ‘ধর্মদ্রোহিতা’র ফতোয়া দেয়। চার্চ ও ধর্মীয় আদালতের তীব্র মানসিক নির্যাতন এবং সমাজচ্যুতির (Excommunication) হুমকিতে বাধ্য হয়ে তিনি নিজের জন্মভূমি হাররান ত্যাগ করেন। পরবর্তীতে বাগদাদে এসে খলিফা আল-মুতাদিদের আশ্রয় না পেলে হয়তো উগ্রবাদীদের হাতে তাঁকে মরতে হতো।
৫. আল-বাত্তানি (Al-Battani, ৮৫৮–৯২৯)
ইউরোপে ‘Albatenius’ নামে পরিচিত। তিনি ত্রিকোণমিতি ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের এই মহান পণ্ডিত, যিনি সূর্যের কক্ষপথ এবং বছরের সঠিক দৈর্ঘ্য (ঋতুসমূহের দৈর্ঘ্য) গণনা করেছিলেন। তাঁর গণনা গ্রিক বিজ্ঞানী টলেমির চেয়েও নিখুঁত ছিল।
তৎকালীন জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের প্রায়ই ‘জ্যোতিষী’ বা ভাগ্য গণনাকারী (Astrologer) এবং নক্ষত্র পূজারী আখ্যা দিয়ে কট্টর মোল্লারা ফতোয়া দিত। বাত্তানিকে তাঁর গাণিতিক ও জ্যোতির্বিজ্ঞান সংক্রান্ত কাজের জন্য রাজদরবারের কট্টরপন্থীদের তীব্র সমালোচনা, ধর্মীয় সন্দেহ এবং সামাজিক হেনস্তার মুখে পড়তে হয়েছিল।
৬. আল-রাজি (Rhazes, ৮৬৫–৯২৫)
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে আল-রাজি এক অবিসংবাদিত নাম। গুটিবসন্ত এবং হামের মধ্যকার সুনির্দিষ্ট পার্থক্য প্রথম তিনিই নিরূপণ করেছিলেন। কিন্তু আল-রাজি কেবল একজন চিকিৎসক বা কিমিয়াবিদ ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন আপসহীন যুক্তিবাদী (Rationalist)।
তিনি পরিষ্কারভাবে অলৌকিকত্ব, অন্ধবিশ্বাস এবং ধর্মীয় কর্তৃত্বের সমালোচনা করেছিলেন। তাঁর মতে, ঈশ্বর মানুষকে বুদ্ধি দিয়েছেন যেন মানুষ প্রকৃতির নিয়ম বুঝতে পারে, কোনো অলীক মিথ্যার পেছনে অন্ধের মতো না ছোটে। মুক্তচিন্তার এই অপরাধে শেষ জীবনে তাঁকে যে করুণ পরিণতি ভোগ করতে হয়েছিল, তা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। একটি প্রচলিত ঐতিহাসিক বিবরণ অনুযায়ী, তাঁর যুক্তিবাদী চিন্তার বই পড়ে ক্ষিপ্ত হয়ে তাঁর এক কট্টরপন্থী রাজকীয় পৃষ্ঠপোষক আদেশ দেন যে, আল-রাজির লেখা বই দিয়ে তাঁর মাথায় ততক্ষণ আঘাত করা হোক, যতক্ষণ না বইটি ছিঁড়ে যায় অথবা তাঁর মাথা ফেটে যায়। এই নৃশংস নির্যাতনের ফলেই আল-রাজি শেষ জীবনে সম্পূর্ণ অন্ধ হয়ে যান বলে একটি বড় বিতর্ক ও ইতিহাস প্রচলিত আছে।
৭. আল-ফারাবী (Al-Farabi, ৮৭২–৯৫০)
ইউরোপে ‘Alpharabius’ নামে পরিচিত। যুক্তিবিদ্যা, সমাজবিজ্ঞান এবং মহাজাগতিক বিজ্ঞানের এই অসামান্য পণ্ডিতকে মধ্যযুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদ মনে করা হয়।
তৎকালীন কট্টর মোল্লারা তাঁকে ‘কাফের’, ‘নাস্তিক’ ও ‘ধর্মত্যাগী’ ফতোয়া দিয়েছিলেন। ইমাম গাজ্জালী তাঁর বিভিন্ন তাত্ত্বিক গ্রন্থে আল-ফারাবীকে ইসলামের শত্রু এবং তাঁর দর্শনকে বিপজ্জনক হিসেবে চিহ্নিত করায় সমাজ তাঁর জন্য বসবাসের অযোগ্য হয়ে ওঠে। কট্টরপন্থীদের হত্যাযজ্ঞ থেকে বাঁচতে এই মহান পণ্ডিতকে প্রায় সারা জীবন এক শহর থেকে অন্য শহরে, এক রাজদরবার থেকে অন্য রাজদরবারে ফেরারি আসামির মতো পালিয়ে বেড়াতে হয়েছিল।
৮. ইবনে আল-হাইথাম (Alhazen, ৯৬৫–১০৪০)
আধুনিক আলোকবিজ্ঞানের (Optics) জনক এবং বিজ্ঞানের ইতিহাসে ‘বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি’ বা ‘Scientific Method’ (পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও প্রমাণের মাধ্যমে সত্যে পৌঁছানো)-এর প্রকৃত প্রবক্তা। ক্যামেরার আদি রূপ ‘পিনহোল ক্যামেরা’র পেছনের বিজ্ঞান তিনিই আবিষ্কার করেছিলেন।
যখন ফাতেমীয় খলিফা আল-হাকিম নীল নদের বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য তাঁকে একটি বাঁধ নির্মাণের দায়িত্ব দেন, হাইথাম বৈজ্ঞানিকভাবে পরীক্ষা করে বুঝতে পারেন যে তৎকালীন প্রযুক্তি দিয়ে এটি অসম্ভব। খলিফাকে এই বৈজ্ঞানিক সত্য জানানোর পর খলিফা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। স্বৈরাচারী খলিফা এবং কট্টর দরবারীদের মৃত্যুদণ্ড থেকে বাঁচতে এই মহান বিজ্ঞানীকে এক অভাবনীয় কৌশল বেছে নিতে হয়েছিল। তিনি নিজেকে ‘পাগল’ বলে দাবি করেন। এই ‘পাগলামি’র ভান করে তিনি প্রায় ১০ বছর ঘরবন্দি জীবন কাটান। যে সমাজ ও শাসক একজন বিজ্ঞানীর সত্য কথা বলার অধিকার কেড়ে নেয় এবং বাঁচতে হলে বিজ্ঞানীকে ‘পাগল’ সাজতে হয়, সেই সমাজকে বিজ্ঞানের মিত্র ভাবার চেয়ে বড় কৌতুক আর কী হতে পারে!
৯. ইবনে সিনা (Avicenna, ৯৮০–১০৩৭)
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাস যাঁর অবদান ছাড়া অসম্পূর্ণ। যাঁর লেখা ‘আল-কানুন ফি আল-তিব’ (The Canon of Medicine) শত শত বছর ধরে ইউরোপের মেডিকেল কলেজগুলোতে চিকিৎসাবিজ্ঞানের বাইবেল হিসেবে পড়ানো হয়েছে। তিনি এরিস্টটেলীয় দর্শন ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের অসামান্য মেলবন্ধন ঘটিয়েছিলেন।
ইবনে সিনার জীবন ছিল এক যাযাবরের মতো তাড়া খাওয়া জীবন। আজকের দিনে আমরা যা খুব সহজে অ্যানাটমি ল্যাবে বসে শিখি, মানবদেহের সেই সঠিক অ্যানাটমি বা ভেতরের গঠন বোঝার জন্য ইবনে সিনাকে রাতের অন্ধকারে চোরের মতো কবর খুঁড়ে লাশ চুরি করতে হয়েছিল! কারণ তৎকালীন কট্টর ইসলামী ধর্মীয় সমাজ ও মোল্লাতন্ত্র মৃতদেহের ময়নাতদন্ত বা শব ব্যবচ্ছেদকে চরম পাপ ও ধর্মীয় বিধানের পরিপন্থী মনে করত। এখানেই শেষ নয়, তাঁর যুক্তিবাদী দর্শন ও বিজ্ঞানের প্রতি অনুরাগকে ‘নাস্তিকতা’ ও ‘ধর্মদ্রোহিতা’ আখ্যা দিয়ে তৎকালীন কট্টরপন্থীরা তাঁর পেছনে লেগেছিল। জীবন বাঁচাতে এক শহর থেকে অন্য শহরে পালিয়ে বেড়াতে বেড়াতে একপর্যায়ে নাস্তিকতার অভিযোগে তাকে ইস্পাহানের দুর্গে বন্দি জীবনও কাটাতে হয়েছিল।
১০. ওমর খৈয়াম (Omar Khayyam, ১০৪৮–১১৩১)
পারস্যের বিশ্বখ্যাত গণিতবিদ, জ্যোতির্বিজ্ঞানী এবং কবি। তিনি জালালি ক্যালেন্ডার সংস্কার করেছিলেন এবং বীজগণিতে ঘন সমীকরণের (Cubic Equations) জ্যামিতিক সমাধানের পথ দেখিয়েছিলেন। বিশ্বজুড়ে তিনি তাঁর ‘রুবাইয়াত’ বা চতুর্পদী কবিতার জন্য বিখ্যাত।
খৈয়ামের প্রধান সমস্যা ছিল—তিনি প্রকৃতির নিয়মকে গাণিতিক সমীকরণে দেখতে ভালোবাসতেন এবং তাঁর কবিতায় তৎকালীন প্রাতিষ্ঠানিক ইসলামের ভণ্ডামি, অন্ধ নিয়তিবাদ ও পরকালের সস্তা লোভ লালসাকে চরমভাবে কটাক্ষ করেছিলেন। যুক্তি ও সন্দেহের এই চাবুক সহ্য করার ক্ষমতা তৎকালীন মোল্লাতন্ত্রের ছিল না। কট্টরপন্থীরা তাকে একজন ‘সন্দেহবাদী নাস্তিক’ হিসেবে ব্র্যান্ডিং করে এবং তাঁর জীবনকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে। নিজেকে প্রথাগত ধার্মিক প্রমাণ না করলে যেকোনো সময় গণপিটুনি বা হত্যার শিকার হতে হতো বলে, বাধ্য হয়ে ওমর খৈয়ামকে জীবনের একপর্যায়ে হজ করতে যেতে হয়েছিল—যা ছিল মূলত কট্টর সমাজ থেকে নিজের জীবন বাঁচানোর একটি রাজনৈতিক কৌশল মাত্র।
১১. ইবনে জুহর (Avenzoar, ১০৯১–১১৬১)
চিকিৎসাবিজ্ঞানের অন্যতম পথিকৃৎ, খ্যাতনামা সার্জন এবং প্রথম পরজীবীবিদ (Parasitologist)। তিনিই প্রথম মানবদেহে খোসপাঁচড়ার পরজীবী (Scabies mite) আবিষ্কার করেন এবং তাঁর লেখা বিখ্যাত গ্রন্থ ‘আল-তাইসির’ চিকিৎসাবিজ্ঞানের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল।
তৎকালীন আলমোরাভিদ (Almoravid) রাজবংশের কট্টরপন্থী ও ধর্মান্ধ খলিফাদের আমলে বিজ্ঞান ও চিকিৎসায় যুক্তির ব্যবহার নিষিদ্ধ করার চেষ্টা চলে। ইবনে জুহর যখন প্রচলিত কুসংস্কার ও ঝাড়ফুঁক বাদ দিয়ে সম্পূর্ণ অ্যানাটমি ও আধুনিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার ওপর ভিত্তি করে বৈজ্ঞানিক চিকিৎসা শুরু করেন, তখন তৎকালীন কট্টর শাসক আলী ইবনে ইউসুফের রোষানলে পড়েন। তাঁকে দীর্ঘ সময় কারাগারে বন্দি রাখা হয় এবং তাঁর বৈজ্ঞানিক গবেষণাকে চরমভাবে বাধাগ্রস্ত করা হয়।
১২. ইবনে রুশد (Averroes, ১১২৬–১১৯৮)
কর্ডোভার মহান আরব দার্শনিক ও পণ্ডিত। যিনি অ্যারিস্টটলের দর্শন এবং প্লেটোর ‘রিপাবলিক’-এর ওপর বিশ্ববিখ্যাত ভাষ্য ও সারসংক্ষেপ তৈরি করেছিলেন। যাঁর যৌক্তিক ব্যাখ্যা ছাড়া ইউরোপে রেনেসাঁ বা বিজ্ঞানচেতনার বিকাশ অসম্ভব ছিল।
ইবনে রুশদকে জীবন সায়াহ্নে এসে যে অবমাননা সহ্য করতে হয়েছিল, তা শিউরে ওঠার মতো। তৎকালীন কট্টরপন্থী ও কুপমণ্ডূক ওলামাদের প্ররোচনায় খলিফা আল-মনসুর এক রাজকীয় ফরমান জারি করেন। ইবনে রুশদকে কাফের ও ধর্মত্যাগী ঘোষণা করে লিসবনের কাছে একটি ইহুদি গ্রামে নির্বাসনে পাঠানো হয়। শুধু তাই নয়, খলিফার আদেশে রাজকীয়ভাবে ইবনে রুশদের লেখা প্রায় সমস্ত দর্শন, জ্যোতির্বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানের অমূল্য বই প্রকাশ্য রাজপথে এনে পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়া হয়েছিল। কট্টরপন্থীদের নির্দেশ ছিল, নামাজ পড়তে আসা সাধারণ মানুষ যেন এই বিজ্ঞানীর পোড়া বইয়ের ওপর থুতু ফেলে মসজিদে ঢোকে!
১৩. ইবনে আল-বাইতার (Ibn Al-Baitar, ১১৯৭–১২৪৮)
মধ্যযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ উদ্ভিদবিজ্ঞানী (Botanist), ঔষধবিজ্ঞানী ও চিকিৎসক। তিনি মধ্যযুগের ইসলামিক চিকিৎসকদের সমস্ত ভেষজ আবিষ্কার এবং ১,৪০০-এরও বেশি উদ্ভিদের গুণাগুণ পদ্ধতিগতভাবে নথিবদ্ধ করেছিলেন।
উদ্ভিদের ভেষজ গুণ নিয়ে কাজ করতে গিয়ে তিনি যখনই প্রচলিত ‘অলৌকিক নিরাময়’ বা ‘ঝাড়ফুঁক’-এর ভণ্ডামিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে খাঁটি বৈজ্ঞানিক ও ভেষজ রাসায়নিক তত্ত্ব সামনে এনেছিলেন, তখন সনাতন কবিরাজ ও কট্টর ওলামারা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। তাঁর বিরুদ্ধে ধর্মীয় অনুভূতির অবমাননা ও প্রচলিত ধর্মীয় বিশ্বাসের পরিপন্থী কাজ করার অভিযোগ এনে তাঁকে সামাজিক হেনস্থা ও অপপ্রচারের মুখোমুখি করা হয়েছিল।
১৪. ইবনে আল-রাওয়ান্দি (Ibn al-Rawandi, আনুমানিক ৯ম-১০ম শতাব্দী)
মধ্যযুগের ইসলামিক ইতিহাসের অন্যতম সবচেয়ে বিতর্কিত ও কট্টর যুক্তিবাদী চিন্তাবিদ। তাঁকে ইতিহাসের পাতায় এক চরম ‘ধর্মদ্রোহী’ ও নাস্তিক হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে।
ইবনে আল-রাওয়ান্দির অপরাধ ছিল—তিনি অন্ধভাবে কোনো অলৌকিক অনুশাসন, নবুয়ত এবং ধর্মীয় অলীক মিথকে মেনে নিতে রাজি হননি। তিনি বুদ্ধির শ্রেষ্ঠত্ব (Rationalism) এবং প্রকৃতির অমোঘ নিয়মের পক্ষে দাঁড়িয়ে নবুয়তের ধারণাকে তীব্র ও যৌক্তিক সমালোচনা করেছিলেন। তৎকালীন কট্টরপন্থী সমাজ ও ওলামারা তাঁর এই যুক্তিবাদী সাহস সহ্য করতে পারেনি। তাঁর ওপর নেমে আসে শারীরিক আক্রমণ, তাঁর সমস্ত বই ও লিখিত চিন্তাকে পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়া হয় এবং তাঁকে ফেরারি আসামির মতো সমাজচ্যুত হয়ে জীবন কাটাতে হয়।
১৫. আবু বকর আল-আসাম ও মু’তাজিলা চিন্তাবিদগণ (৯ম–১১শ শতাব্দী)
‘মু’তাজিলা’ হলো ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত যুক্তিবাদী বুদ্ধিবৃত্তিক ধারা। আবু বকর আল-আসামসহ এই ধারার চিন্তাবিদরা অন্ধ বিশ্বাসের চেয়ে মানুষের ‘বুদ্ধি’ (Aql) ও ‘যুক্তি’কে সর্বোচ্চ স্থান দিতেন। তাঁরা প্রকৃতির নিয়মকে ঈশ্বরের তৈরি গাণিতিক কাঠামো হিসেবে দেখতেন।
আব্বাসীয় খলিফা আল-মামুনের আমলে এই যুক্তিবাদের স্বর্ণযুগ থাকলেও, পরবর্তী সময়ে কট্টরপন্থী খলিফা আল-মুতাওয়াক্কিলের আমলে যুক্তিবাদীদের ওপর নেমে আসে ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় নিধনী যজ্ঞ। মু’তাজিলা পণ্ডিতদের কাফের ফতোয়া দিয়ে সরকারি চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়, তাঁদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হয় এবং কারাবন্দি করা হয়। তাঁদের রচিত শত শত যুক্তিবাদী ও বৈজ্ঞানিক বই গ্রন্থাগার থেকে বের করে পুড়িয়ে ফেলা হয়েছিল, যা মুসলিম বিশ্বে মুক্তচিন্তা ও বিজ্ঞান চর্চার ধারাকে চিরতরে পঙ্গু করে দেয়।
১৬. সুহরাওয়ার্দী (Suhrawardi, ১১৫৪–১১৯১)
ইতিহাসে তিনি ‘শহীদ সুহরাওয়ার্দী’ বা ‘শেখ আল-ইশরাক’ নামে পরিচিত। তিনি ছিলেন একাধারে মহান দার্শনিক, চিন্তাবিদ এবং আলোকোজ্জ্বল দর্শনের (Illuminationist Philosophy) প্রবক্তা, যা যুক্তি ও আধ্যাত্মিকতার এক অনন্য মেলবন্ধন ছিল।
সুহরাওয়ার্দীর স্বাধীন দার্শনিক চিন্তা, গ্রিক দর্শনের ব্যবহার এবং প্রচলিত রক্ষণশীল ধর্মীয় ব্যাখ্যার বাইরে গিয়ে সত্য অনুসন্ধান করা তৎকালীন আলেপ্পোর কট্টরপন্থী ওলামাদের ক্ষুব্ধ করে। এই আলেপ্পোর ওলামারা সমবেতভাবে সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর ছেলে মালিক আল-জাহিরের কাছে সুহরাওয়ার্দীকে ‘কাফের’ ও ‘ধর্মদ্রোহী’ হিসেবে বিচার করার দাবি তোলে। ওলামাদের ফতোয়া ও তীব্র রাজনৈতিক চাপের মুখে খলিফার আদেশে মাত্র ৩৮ বছর বয়সে এই মহান তরুণ দার্শনিককে আলেপ্পোর কারাগারে নৃশংসভাবে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।
১৭. ইবনে বতুতা (Ibn Battuta, ১৩MD–১৩৬৯)
পুরো নাম শামস আদ-দিন। তিনি ইতিহাসের অন্যতম সেরা বিশ্বভ্রমণকারী, ভূগোলবিদ ও পণ্ডিত। তাঁর লেখা বিখ্যাত ভ্রমণগ্রন্থ ‘রিহলা’ (Rihlah) মধ্যযুগের বিশ্ব সমাজবিজ্ঞান ও মানব ভূগোলের এক অমূল্য ও ঐতিহাসিক দলিল।
ইবনে বতুতা দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ শেষে যখন নিজের মাতৃভূমি মরক্কোয় ফিরে আসেন এবং তাঁর চোখ দিয়ে দেখা বিশ্বের বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি, সমাজ ব্যবস্থা এবং মানুষের জীবনযাত্রার বিবরণ দেন—তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজ ও ওলামাদের একটি বড় অংশ তাঁকে ‘মিথ্যুক’ এবং ‘গাজাখোর গল্পকার’ বলে উপহাস করেছিল। তারা ইসলামের চেনা ভৌগোলিক গণ্ডির বাইরে কোনো উন্নত সভ্যতার অস্তিত্বকে মেনে নিতে পারছিল না। সমাজ তাঁর এই বৈজ্ঞানিক ও ভৌগোলিক অভিজ্ঞতাকে সহজে গ্রহণ করেনি, বরং তাঁকে তীব্র সন্দেহ ও অবমাননার চোখে দেখেছিল।
১৮. ইবনে খালদুন (Ibn Khaldun, ১৩==–১৪০৬)
আধুনিক ইতিহাস-দর্শন, সমাজবিজ্ঞান (Sociology) এবং অর্থনীতির অন্যতম আদি রূপকার। তিনি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘মুকাদ্দিমা’ (Muqaddimah)-য় প্রথম অলৌকিকতা বা ধর্মীয় মিথ বাদ দিয়ে, খাঁটি বৈজ্ঞানিক, ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক কারণে কীভাবে সভ্যতার উত্থান-পতন হয় তার ধর্মনিরপেক্ষ সমাজতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন।
খালদুনের এই প্রগতিশীল, বৈজ্ঞানিক ও যুক্তিপন্থী রাজনৈতিক দর্শন তৎকালীন প্রথাগত দরবারী ওলামাদের চরম ক্ষুব্ধ করে। এই তাত্ত্বিক শ্রেষ্ঠত্বের কারণে তাঁকে সারা জীবন তীব্র রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, চক্রান্ত এবং অপমানের শিকার হতে হয়েছিল। তিউনিসিয়া, মরক্কো ও গ্রানাডার কট্টরপন্থীদের চক্রান্তে তাঁকে বারবার কাজী (বিচারক)-র পদ থেকে চাকরিচ্যুত করা হয়, একাধিকবার দেশ থেকে নির্বাসনে পাঠানো হয় এবং এমনকি মরক্কোর ফেস (Fez) শহরের অন্ধকার কারাগারে তাঁকে প্রায় দুই বছর বন্দিও থাকতে হয়েছিল।
দ্বিতীয় অধ্যায়: আধুনিক যুগের অন্ধকার—ড. আব্দুস সালামের ট্র্যাজেডি
ধর্মীয় অন্ধত্ব, বিজ্ঞানীদের প্রতি এই বৈরী আচরণ এবং মুক্তচিন্তার টুঁটি চেপে ধরার এই জঘন্য মানসিকতা যে কেবল সেই অন্ধকার মধ্যযুগেই সীমাবদ্ধ ছিল—তা নয়। এটি একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক সমাজকেও একইভাবে গ্রাস করে রেখেছে। এর সবচেয়ে বড়, জীবন্ত এবং লজ্জাজনক উদাহরণ হলেন পাকিস্তানের একমাত্র নোবেলজয়ী পদার্থবিজ্ঞানী ড. আব্দুস সালাম।
পদার্থবিজ্ঞানে বিশ্ব কাঁপানো অনন্য অবদানের জন্য ১৯৭৯ সালে তিনি নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। মহাবিশ্বের চারটি মৌলিক বলের দুটিকে (তড়িৎ চৌম্বকীয় বল ও দুর্বল নিউক্লীয় বল) এক সুতোয় বেঁধে তিনি আবিষ্কার করেছিলেন ‘ইলেকট্রোউইক থিওরি’, যা আজ আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের অন্যতম প্রধান ভিত্তি।
কিন্তু এই বিশ্ববরেণ্য বিজ্ঞানীর অপরাধ কী ছিল? অপরাধ বিজ্ঞানের কোনো সূত্রে ছিল না; তাঁর অপরাধ ছিল—তিনি ‘আহমদিয়া’ বা কাদিয়ানী সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।
পাকিস্তানের কট্টরপন্থী সমাজ ও রাষ্ট্র একজন নোবেলজয়ীকে সম্মান জানানো তো দূরের কথা, তাঁকে পদে পদে লাঞ্ছিত ও অপমানিত করেছে। ১৯৭৪ সালে জুলফিকার আলী ভুট্টোর সরকার আহমদিয়াদের সরকারিভাবে ‘অমুসলিম’ ঘোষণা করার পর ড. আব্দুস সালামের জীবন বিষাদময় করে তোলা হয়। দেশ ছাড়তে বাধ্য হন এই মহান বিজ্ঞানী।
অপমানের চূড়ান্ত রূপটি দেখা যায় তাঁর মৃত্যুর পর। ১৯৯৬ সালে মৃত্যুর পর যখন তাঁকে পাকিস্তানের ঝং (Jhang) এলাকায় দাফন করা হয়, তাঁর কবরের ফলকে সশ্রদ্ধচিত্তে লেখা হয়েছিল—‘First Muslim Nobel Laureate’ (প্রথম মুসলিম নোবেলজয়ী)। কিন্তু পাকিস্তানের কট্টরপন্থী মোল্লাদের চাপে স্থানীয় আদালত ও প্রশাসন আইনি ফরমান জারি করে সেই কবরের ফলক থেকে ‘মুসলিম’ (Muslim) শব্দটি ছেনি-হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে কুৎসিতভাবে মুছে দেয়।
বিজ্ঞানের আলো দিয়ে যিনি সারা বিশ্বকে আলোকিত করলেন, নিজের দেশের ধর্মীয় অন্ধকারের কদর্য রূপের কাছে তাঁকে এভাবে পরাজিত হতে হলো। এই ঘটনা প্রমাণ করে—আজ যারা বিজ্ঞানীদের নাম ভাঙিয়ে বড় বড় ডায়ালগ দেয়, তাদের মগজের ভেতরে মূলত সেই মধ্যযুগীয় জল্লাদদের ডিএনএই (DNA) কিলবিল করছে।
তৃতীয় অধ্যায়: অন্ধত্বের বৈশ্বিক খতিয়ান—খ্রিস্টান চার্চ ও গ্রিক সভ্যতার নির্মমতা
বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রাকে রুদ্ধ করা, যুক্তিকে শৃঙ্খলিত করা এবং বিজ্ঞানীদের ওপর পৈশাচিক নির্যাতন চালানোর এই অন্ধকার ইতিহাস কেবল কোনো একটি নির্দিষ্ট ধর্মের একচেটিয়া সম্পত্তি নয়। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যাবে, যখনই কোনো রাষ্ট্রে বা সমাজে প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম কিংবা অন্ধ বিশ্বাস অতিরিক্ত শক্তিশালী হয়ে উঠেছে, তখনই তারা বিজ্ঞানের টুঁটি চেপে ধরেছে। মানুষের অজ্ঞতা আর ভয়কে পুঁজি করে যারা ক্ষমতার পিরামিডে বসে থাকে, তারা সবচেয়ে বেশি ভয় পায় স্বাধীন বৈজ্ঞানিক চিন্তাকে।
১. হাইপেশিয়া (Hypatia, ৩৬০–৪১৫ খ্রিস্টাব্দ)
মানব ইতিহাসের পাতায় বিজ্ঞানের জন্য প্রথম সুপরিচিত নারী শহীদ হলেন আলেকজান্দ্রিয়ার হাইপেশিয়া। তিনি একাধারে ছিলেন গণিতবিদ, জ্যোতির্বিজ্ঞানী এবং দর্শনের শিক্ষক। যখন খ্রিস্টধর্ম রোমান সাম্রাজ্যের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে এক উগ্র রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরিত হচ্ছিল, তখন আলেকজান্দ্রিয়ার কট্টরপন্থী বিশপ সিরিল (Cyril) এবং তাঁর অনুসারী উন্মাদ খ্রিস্টান জনতা হাইপেশিয়ার মুক্তচিন্তা ও বিজ্ঞানচর্চাকে ‘ডাইনিবিদ্যা’ ও পৌত্তলিকতা বলে রটাতে শুরু করে।
৪১৫ খ্রিস্টাব্দের এক অভিশপ্ত দিনে, এই মহান নারী বিজ্ঞানী যখন তাঁর রথে চড়ে বাড়ি ফিরছিলেন, তখন একদল উগ্র খ্রিস্টান ধর্মান্ধ তাঁকে রথ থেকে টেনেহিঁচড়ে নামায়। তাঁকে টেনে নিয়ে যাওয়া হয় একটি চার্চের ভেতর। সেখানে ঈশ্বরের নাম জপ করতে করতে সেই কট্টরপন্থীরা ধারালো ঝিনুকের খোলস এবং ভাঙা টাইলস দিয়ে হাইপেশিয়ার শরীরের চামড়া ও মাংস কেটে টুকরো টুকরো করে অত্যন্ত পৈশাচিক উপায়ে তাঁকে হত্যা করে। এখানেই শেষ নয়, তাঁর সেই ছিন্নভিন্ন মরদেহটি শহরের রাজপথে প্রদর্শন করার পর পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়া হয়। বিজ্ঞানের ইতিহাস এই নৃশংস মেধা-নিধনকে কোনোদিন ভুলবে না।
২. জিওর্দানো ব্রুনো (Giordano Bruno, ১৫৪৮–১৬০০)
মহাবিশ্বের অসীমতা এবং আমাদের এই পৃথিবী মহাবিশ্বের একমাত্র কেন্দ্র নয়, বরং সূর্যও একটি নক্ষত্র এবং মহাবিশ্বে এমন কোটি কোটি সূর্য ও পৃথিবী রয়েছে—এই মহাজাগতিক বৈজ্ঞানিক সত্যটি সাহসের সাথে প্রচার করেছিলেন ইতালীয় বিজ্ঞানী ও দার্শনিক জিওর্দানো ব্রুনো।
রোমান ক্যাথলিক চার্চের কট্টর ইনকুইজিশন (ধর্মীয় আদালত) ব্রুনোর এই সত্যকে বাইবেল বিরোধী ও চরম ধর্মদ্রোহিতা (Heresy) বলে ফতোয়া দেয়। দীর্ঘ সাত বছর তাঁকে অন্ধকার জেলের প্রকোষ্ঠে বন্দি রেখে অমানুষিক নির্যাতন করা হয় যেন তিনি নিজের বৈজ্ঞানিক সত্যকে অস্বীকার করে চার্চের পায়ে ক্ষমা চান। কিন্তু ব্রুনো মাথা নত করেননি। ১৬০০ সালের ১৭ই ফেব্রুয়ারি রোমের কাম্পো দে ফিয়োরি (Campo de’ Fiori) চত্বরে প্রকাশ্য জনসমক্ষে চার্চের পাদ্রিরা এই মহান বিজ্ঞানীকে একটি কাঠের খুঁটিতে বেঁধে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারে। পুড়িয়ে মারার আগে তাঁর জিবটি লোহার ক্লিপ দিয়ে আটকে দেওয়া হয়েছিল, যেন মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়েও তিনি বিজ্ঞানের সত্য উচ্চারণ করতে না পারেন।
৩. গ্যালিলিও গ্যালিলিই (Galileo Galilei, ১৫৬৪–১৬৪২)
আধুনিক পর্যবেক্ষণমূলক জ্যোতির্বিজ্ঞানের জনক গ্যালিলিও যখন কোপার্নিকাসের সূর্যকেন্দ্রিক তত্ত্বকে (Heliocentric Theory—অর্থাৎ পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘোরে) তাঁর দূরবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে প্রমাণ করে দেখালেন, তখন খ্রিস্টান চার্চের ভিত কেঁপে উঠেছিল। কারণ চার্চের অন্ধ বিশ্বাস ছিল—পৃথিবী স্থির এবং এটিই মহাবিশ্বের কেন্দ্র।
১৬৩৩ সালে রোমান চার্চের ধর্মীয় আদালত গ্যালিলিওকে তলব করে। বৃদ্ধ গ্যালিলিওকে ব্রুনোর মতো জ্যান্ত পুড়িয়ে মারার ভয় দেখিয়ে, হাঁটু গেঁড়ে বসে নিজের আবিষ্কারকে ‘ভুল ও মিথ্যা’ বলে স্বীকারোক্তি দিতে বাধ্য করা হয়। কথিত আছে, হাঁটু গেঁড়ে ক্ষমা চেয়ে উঠে দাঁড়ানোর সময় গ্যালিলিও মাটির দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে স্বগতোক্তি করেছিলেন—“Eppur si muove” (তবুও এটি ঘোরে)। চার্চ তাঁর মৃত্যুদণ্ড মওকুফ করলেও জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত (প্রায় ১০ বছর) তাঁকে নিজ বাড়িতে অবমাননাকর গৃহবন্দি জীবন কাটাতে হয়েছিল।
৪. সক্রেটিস (Socrates, ৪৭০–৩৯৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দ)
ধর্মীয় ও সামাজিক অন্ধত্বের এই রোগ প্রাচীন গ্রিসকেও রেহাই দেয়নি। এথেন্সের তরুণ সমাজকে যুক্তি শেখানো, প্রশ্ন করতে উদ্বুদ্ধ করা এবং প্রচলিত পৌত্তলিক দেব-দেবীদের অলৌকিকত্ব নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করার অপরাধে তৎকালীন শাসক, পুরোহিত এবং রক্ষণশীল সমাজ সক্রেটিসের বিরুদ্ধে ‘তরুণদের পথভ্রষ্ট করা’ ও ‘নাস্তিকতার’ অভিযোগ আনে। আদালতে প্রহসনের বিচারের পর এই মহান দার্শনিককে হেমলক (Hemlock) নামক মারাত্মক বিষ পানে আত্মহত্যা করতে বাধ্য করা হয়। যুক্তির আলোকে সমাজকে জাগাতে চাওয়ার এটাই ছিল প্রাচীন সভ্যতার দেওয়া পুরস্কার।
চতুর্থ অধ্যায়: ডারউইন এবং আধুনিক অপপ্রচারের রাজত্ব
অন্ধ বিশ্বাসের এই বিজ্ঞান-বিদ্বেষী চরিত্র যে কেবল অতীতেই সীমাবদ্ধ, তা ভাবলে ভুল হবে। এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ চার্লস ডারউইন (Charles Darwin)। ডারউইনের পরিবার তাঁকে চার্চের যাজক (Pastor) বানানোর জন্য জাহাজে তুলে দিয়েছিল। কিন্তু প্রকৃতির সত্যকে তিনি আড়াল করতে পারেননি। ১৮৫৯ সালে প্রকাশিত তাঁর ‘On the Origin of Species’ বইটি পৃথিবীর সমস্ত জীববিজ্ঞানের মোড় ঘুরিয়ে দেয় এবং প্রমাণ করে যে অলৌকিক কোনো জাদুমন্ত্রে নয়, বরং কোটি কোটি বছরের ‘প্রাকৃতিক নির্বাচন’ ও বিবর্তনের মাধ্যমে পৃথিবীর সমস্ত জীবের বিকাশ ঘটেছে।
ডারউইনের এই বৈজ্ঞানিক তত্ত্বটি প্রকাশের পর থেকে আজ পর্যন্ত সমস্ত প্রাঙ্গাতিষ্ঠানিক ধর্মীয় ও কট্টরপন্থী শক্তিগুলো এর বিরুদ্ধে কোমর বেঁধে লেগেছে। যেহেতু আজ বিজ্ঞান অনেক শক্তিশালী এবং তারা চাইলেই কোনো জীববিজ্ঞানীকে প্রকাশ্য রাজপথে চাবুক মারতে বা পুড়িয়ে মারতে পারে না, তাই তারা বেছে নিয়েছে ‘অপপ্রচার’ ও ‘মিথ্যাচার’-এর ছক। আজ ইউটিউব, ওয়াজ মাহফিল, পাঠ্যপুস্তকের বিতর্ক এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ডারউইনের বিবর্তনবাদকে ‘নাস্তিকতার হাতিয়ার’ বা ‘বানর থেকে মানুষ হওয়ার গল্প’ নামক সস্তা কুৎসিত মিথ্যাচারের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মনে বিজ্ঞানের প্রতি ঘৃণা ছড়ানো হচ্ছে।
বিজ্ঞানের অগ্রগতিতে আমাদের প্রকৃত শত্রু ও মিত্র কারা?
সমগ্র মানব ইতিহাসের এই কালানুক্রমিক ও কালজয়ী ব্যবচ্ছেদ শেষে এটি দিবালোকের মতো স্পষ্ট যে—বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রায়, শিক্ষার বিস্তারে এবং সামাজিক প্রগতিতে আমাদের প্রকৃত শত্রু ও মিত্র কারা:
আমাদের শত্রু:
আমাদের শত্রু হলো সেই সমস্ত কট্টরপন্থী, মৌলবাদী ও উগ্র ধর্মীয় শক্তি—তা সে মধ্যযুগের চার্চের যাজক হোক, এথেন্সের পুরোহিত হোক, কিংবা ইবনে সিনা-আল রাজির বই পোড়ানো খলিফা-মোল্লা হোক কিংবা আজকের দিনের জামায়াতে ইসলামীর মতো ধর্ম ব্যবসায়ী কর্পোরেট দল হোক। এরা জীবিত অবস্থায় বিজ্ঞানীদের কাফের বলে পিটিয়েছে, তাঁদের বই পুড়িয়েছে, আর এখন তাঁদের আবিষ্কারের কৃতিত্ব নিয়ে মৃত লাশের ব্যবসা করে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে চায়। এদের মূল চরিত্র—অন্ধ বিশ্বাস, যুক্তিহীনতা এবং ক্ষমতার লোভ।
আমাদের মিত্র:
আমাদের প্রকৃত মিত্র হলো মানুষের স্বাধীন ‘বুদ্ধি’, ‘যুক্তি’, ‘সন্দেহবাদ’ এবং ‘বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি’। আমাদের মিত্র হলেন সেই সমস্ত মহান বিজ্ঞানসাধক, যাঁরা চাবুকের আঘাত সহ্য করেছেন, জেলের অন্ধকার কুঠুরিতে মরেছেন, জ্যান্ত আগুনে পুড়ে ছাই হয়েছেন, কিন্তু বিজ্ঞানের সত্য ও যুক্তির পথকে বিসর্জন দেননি।
ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে আজ আমাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এসেছে—আমরা কি সেই অন্ধকারের দালালদের পক্ষে থাকব যারা বিজ্ঞানীদের নাম ভাঙিয়ে ধর্ম ব্যবসা করে, নাকি আমরা সেই মহান বিজ্ঞানীদের জ্বালিয়ে যাওয়া যুক্তির মশালকে বুকে ধারণ করে সমাজকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাব?
আরও দেখুন:
