দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে (ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভুটান, আফগানিস্তান ও মালদ্বীপ) শত শত ভাষা ও উপভাষা রয়েছে। এর মধ্যে বেশ কিছু ভাষায় হাজার বছরের পুরোনো এবং অত্যন্ত সমৃদ্ধ সাহিত্য ইতিহাস রয়েছে, আবার কিছু ভাষার সাহিত্যিক যাত্রা আধুনিক যুগে শুরু হয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়ার সাহিত্য
বাংলা (Bengali)
বাংলাদেশ এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা ও আসাম রাজ্য জুড়ে বিস্তৃত বাংলা ভাষা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শীর্ষ এবং বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ ও প্রভাবশালী সাহিত্যিক মাধ্যম। দশম-দ্বাদশ শতাব্দীর আদি নিদর্শন ‘চর্যাপদ’ থেকে শুরু করে মধ্যযুগের মঙ্গলকাব্য, বৈষ্ণব পদাবলী ও মরমী গানের ঐতিহ্য পেরিয়ে আধুনিক যুগে এই সাহিত্য এক বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়েছে; বিশেষ করে কবিতা, কথাসাহিত্য (ছোটগল্প ও উপন্যাস), নাট্যসাহিত্য এবং অনন্য শিশুসাহিত্যের মতো প্রতিটি ধারায় বা জনরায় এর বিকাশ ঘটেছে বিশ্বমানের। বাংলা সাহিত্যে প্রগতি লেখক সংঘ, ভাষা আন্দোলন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ এবং দলিত আন্দোলনের মতো প্রগতিশীল চেতনার এক গৌরবময় ও দ্রোহী ইতিহাস রয়েছে, যেখানে মাইকেল মধুসূদন, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (এশিয়ার প্রথম নোবেলজয়ী), জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, জীবনানন্দ দাশ, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ও আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের মতো কালজয়ী সাহিত্যিকেরা একে বিশ্বমঞ্চে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো কর্তৃক ২১শে ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান মূলত এই ভাষার সাহিত্যিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লড়াইয়েরই এক ঐতিহাসিক বৈশ্বিক জয়জয়কার।
সমৃদ্ধ সাহিত্যিক ধারা ও জনরা (Genres)
বাংলা সাহিত্যের ক্যানভাস এতটাই বিশাল যে এর প্রতিটি জনরা নিজস্ব স্বকীয়তায় ভাস্বর:
ক. কবিতা ও গীতিকাব্য (Poetry & Lyrics)
বাংলা সাহিত্যের আদি উৎসই হলো কবিতা। মধ্যযুগের বৈষ্ণব পদাবলী এবং বাউল ও মরমী গানের (লালন সাঁই, হাছন রাজা) আধ্যাত্মিক সুধা বাংলা কবিতাকে সমৃদ্ধ করেছে। আধুনিক যুগে এসে মাইকেল মধুসূদন দত্তের হাত ধরে বাংলা কবিতা মধ্যযুগীয় শেকল ভেঙে অমিত্রাক্ষর ছন্দের যুগে প্রবেশ করে। রবীন্দ্রনাথের নোবেলজয়ী ‘গীতাঞ্জলি’ একে বিশ্বমানের আধ্যাত্মিক ও নান্দনিক উচ্চতা দেয়। পরবর্তীতে জীবনানন্দ দাশ, কাজী নজরুল ইসলাম এবং তিরিশের দশকের আধুনিক কবিদের মাধ্যমে কবিতা গভীর মনস্তাত্ত্বিক, পরাবাস্তববাদী ও নাগরিক রূপ লাভ করে।
খ. কথাসাহিত্য: উপন্যাস ও ছোটগল্প (Fiction: Novels & Short Stories)
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের হাত ধরে বাংলা উপন্যাসের সার্থক যাত্রা শুরু। তবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা ছোটগল্পের এমন এক নিখুঁত রূপ দেন যা বিশ্বসাহিত্যের মোপাসাঁ বা চেশভের সমতুল্য। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর উপন্যাসে মধ্যবিত্ত সমাজের আবেগ ও নারীর মনস্তত্ত্বকে চমৎকারভাবে ধারণ করেন। পরবর্তীতে তারাশঙ্কর, বিভূতিভূষণ ও মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘বন্দ্যত্রয়ী’ উপন্যাসে আঞ্চলিক জনজীবন ও বাস্তবতাবাদকে এক মহাকাব্যিক রূপ দেন। উত্তর-আধুনিক যুগে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, হাসান আজিজুল হক কিংবা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখনী এই ধারাকে বিশ্বমানে উন্নীত করেছে।
গ. নাট্যসাহিত্য ও থিয়েটার (Drama & Theatre)
উনিশ শতকে দীনবন্ধু মিত্রের ‘নীলদর্পণ’ নাটকের মাধ্যমে বাংলায় সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিবাদের থিয়েটার শুরু হয়। রবীন্দ্রনাথের রূপক-প্রতীকী নাটক (যেমন- রক্তকরবী, ডাকঘর) এবং বিংশ শতাব্দীতে বিজন ভট্টাচার্যের ‘নবান্ন’ নাটক বাংলা নাট্যসাহিত্যের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর সেলিম আল দীন, মুনীর চৌধুরী এবং কলকাতায় বাদল সরকারের ‘থার্ড থিয়েটার’ আন্দোলন বাংলা নাটককে নিজস্ব লোকজ আঙ্গিক ও আন্তর্জাতিক আধুনিকতা দান করে।
ঘ. শিশু ও কিশোর সাহিত্য (Children’s Literature)
বাংলা শিশুসাহিত্য পৃথিবীর অন্যতম সেরা ও বৈচিত্র্যময়। উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী, সুকুমার রায়ের ননসেন্স রাইম (আবোল তাবোল), দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদারের ‘ঠাকুরমার ঝুলি’ এবং পরবর্তীতে সত্যজিৎ রায়ের ‘ফেলুদা’ ও ‘প্রফেসর শঙ্কু’, এবং মুহম্মদ জাফর ইকবালের সায়েন্স ফিকশন কিশোর মননকে দশকের পর দশক ধরে সমৃদ্ধ করে আসছে।
প্রগতিশীল সাহিত্য ও আন্দোলন (Progressive Literature)
বাংলা সাহিত্যে শোষিত, বঞ্চিত এবং প্রান্তিক মানুষের অধিকার আদায়ের লড়াই ও রাজনৈতিক সচেতনতার এক গৌরবময় প্রগতিশীল ইতিহাস রয়েছে:
- কল্লোল যুগ ও তিরিশের আধুনিকতা: ১৯২০-এর দশকে ‘কল্লোল’ পত্রিকাকে কেন্দ্র করে প্রথাবদ্ধ রোমান্টিকতার বিরুদ্ধে গিয়ে প্রথম এক প্রকার প্রগতিশীল বিদ্রোহ শুরু হয়, যা সাহিত্যে অবদমিত কাম, দারিদ্র্য এবং রূঢ় বাস্তবতাকে স্থান দেয়।
- প্রগতি লেখক সংঘ ও আইপিটিএ (IPTA): ১৯৩৬ সালে প্রতিষ্ঠিত এই সংঘের মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যে মার্ক্সীয় দর্শন ও মেহনতি মানুষের বিপ্লবের বাণী সরাসরি প্রতিফলিত হয়। সুকান্ত ভট্টাচার্য, সোমেন চন্দ, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়দের লেখনী এবং গণসংগীতের মাধ্যমে সামন্তবাদ ও ফ্যাসিবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে ওঠে।
- ভাষা আন্দোলন ও একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ: ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন ছিল বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান প্রগতিশীল বাঁক। হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত ‘একুশে ফেব্রুয়ারী’ সংকলন এবং জহির রায়হানের ‘আরেক ফাল্গুন’ এর অন্যতম বড় উদাহরণ। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ বাংলা কথাসাহিত্যে জন্ম দেয় এক বিশাল দ্রোহ ও ট্র্যাজেডির আখ্যান (যেমন- শওকত ওসমানের ‘ক্রীতদাসের হাসি’ বা জাহানারা ইমামের ‘একাত্তরের দিনগুলি’)।
- দলিত ও হাংরি আন্দোলন: ষাটের দশকে মলয় রায়চৌধুরীদের ‘হাংরি জেনারেশন’ আন্দোলন এবং পরবর্তী সময়ে মহাশ্বেতা দেবীর হাত ধরে দলিত, সাঁওতাল ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকারের প্রগতিশীল সাহিত্য এক নতুন মাত্রা পায়।
সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য (Notable) সাহিত্যিকবৃন্দ
বাংলা সাহিত্যের বিশাল আকাশকে যাঁরা দীপ্তিময় করেছেন, তাঁদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন হলেন:
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১–১৯৪১): বাংলা সাহিত্যের ‘বিশ্বকবি’। কবিতা, ছোটগল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ ও সংগীতে তাঁর একক অবদান বাংলা সংস্কৃতিকে আধুনিক রূপ দিয়েছে। ১৯১৩ সালে ‘গীতাঞ্জলি’র জন্য এশিয়ার প্রথম সাহিত্যিক হিসেবে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।
- কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯–১৯৭৬): বাংলাদেশের ‘জাতীয় কবি’ এবং বাংলা সাহিত্যের ‘বিদ্রোহী কবি’। তাঁর কবিতা ও গান ঔপনিবেশিক শাসন, সাম্প্রদায়িকতা ও শোষণের বিরুদ্ধে এক অগ্নিস্ফুলিঙ্গ। তিনি বাংলা গজল ও রাগপ্রধান গানেরও অন্যতম শ্রেষ্ঠ রূপকার।
- মাইকেল মধুসূদন দত্ত (১৮২৪–১৮৭৩): বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক আধুনিক ও প্রথাবিরোধী কবি ও নাট্যকার। তাঁর মহাকাব্য ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য সম্পদ।
- বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৩৮–১৮৯৪): বাংলা উপন্যাসের জনক এবং ‘সাহিত্য সম্রাট’। তাঁর ‘আনন্দমঠ’ ও ‘কপালকুণ্ডলা’ বাংলা কথাসাহিত্যের আদি ভিত্তি।
- শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৭৬–১৯৩৮): উপমহাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক, যাঁর ‘দেবদাস’, ‘চরিত্রহীন’ ও ‘শ্রীকান্ত’ তৎকালীন সমাজ ও নারী হৃদয়ের গভীর রূপায়ণ।
- জীবনানন্দ দাশ (১৮৯৯–১৯৫৪): রবীন্দ্র-উত্তর যুগের সবচেয়ে প্রভাবশালী আধুনিক কবি। ‘রূপসী বাংলা’ ও ‘বনলতা সেন’ এর মাধ্যমে তিনি প্রকৃতি, নির্জনতা ও পরাবাস্তববাদের এক মায়াবী জগৎ তৈরি করেছেন।
- মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় (১৯০৮–১৯৫৬): বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বাস্তবতাবাদী ও মার্ক্সীয় চেতনার ঔপনিবেশিক। ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ ও ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’ মানুষের আদিম প্রবৃত্তি ও অর্থনৈতিক সংগ্রামের এক অনবদ্য দলিল।
- আখতারুজ্জামান ইলিয়াস (১৯৪৩–১৯৯৭): বাংলা মহাকাব্যিক উপন্যাসের জাদুকর। মাত্র দুটি উপন্যাস (‘চিলেকোঠার সেপাই’ ও ‘খোয়াবনামা’) এবং কয়েকটি গল্প দিয়ে তিনি বিশ্বসাহিত্যের স্তরে স্থান করে নিয়েছেন।
- মহাশ্বেতা দেবী (১৯২৬–২০১৬): প্রখ্যাত প্রগতিশীল লেখিকা ও সমাজকর্মী, যিনি তাঁর ‘অরণ্যের অধিকার’ ও ‘হাজার চুরাশির মা’ উপন্যাসে আদিবাসী ও রাজনৈতিকভাবে শোষিত মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছিলেন।
- হুমায়ূন আহমেদ (১৯৪৮–২০১২): আধুনিক বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা, যিনি সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারে পাঠক জাগরণের এক অভূতপূর্ব জোয়ার এনেছিলেন।
সংস্কৃত (Sanskrit)
প্রাচীন ও শাস্ত্রীয় ভাষা হিসেবে মূলত সমগ্র ভারত এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় পরিমণ্ডলে বিস্তৃত সংস্কৃত ভাষা বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন, বৈজ্ঞানিক ও সমৃদ্ধ সাহিত্যিক মাধ্যম। খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় সহস্রাব্দের বৈদিক স্তোত্র ও উপনিষদের আধ্যাত্মিক দর্শন থেকে শুরু করে ধ্রুপদী যুগের মহাকাব্য, নাটক ও ব্যাকরণতত্ত্বের মধ্য দিয়ে এই সাহিত্য এক সুগভীর তাত্ত্বিক মহীরুহে পরিণত হয়েছে; বিশেষ করে মহাকাব্যিক কবিতা, ধ্রুপদী নাট্যসাহিত্য, দার্শনিক সন্দর্ভ এবং নীতিশিক্ষামূলক গল্পের মতো প্রতিটি ধারায় বা জনরায় এর বিকাশ ঘটেছে বিশ্বমানের। সংস্কৃত সাহিত্যে প্রাচীন ভারতের চার্বাক দর্শন (বস্তুবাদ), বৌদ্ধ ও জৈন সংস্কৃতির প্রগতিশীল ধারা এবং ঔপনিবেশিক আমল থেকে আধুনিক যুগ পর্যন্ত জাতীয়তাবাদী ও পুনর্জাগরণবাদী চেতনার এক গৌরবময় ইতিহাস রয়েছে, যেখানে মহর্ষি বেদব্যাস, আদিকবি বাল্মীকি, কবিগুরু কালিদাস, নাট্যকার ভাস, দার্শনিক শংকরাচার্য এবং আধুনিক যুগের পন্ডিত ভট্ট মথুরানাথ শাস্ত্রীর মতো কালজয়ী ব্যক্তিত্বেরা একে বিশ্বমঞ্চে এক অনন্য ও অপার্থিব উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। প্রাচীন বিশ্বসাহিত্যের ভিত্তি স্থাপন এবং আধুনিক ইন্দো-আর্য ভাষাসমূহের জননী হিসেবে এই ভাষার সাহিত্যিক ও ব্যাকরণগত অবদান মানব সভ্যতার ইতিহাসে এক ঐতিহাসিক বৈশ্বিক জয়জয়কার।
সমৃদ্ধ সাহিত্যিক ধারা ও জনরা (Genres)
সংস্কৃত সাহিত্যের ক্যানভাস এতটাই বিশাল ও শাস্ত্রীয় যে এর প্রতিটি জনরা নিজস্ব স্বকীয়তায় ভাস্বর:
ক. বৈদিক ও দার্শনিক সাহিত্য (Vedic & Philosophical Literature): সংস্কৃত সাহিত্যের আদি উৎস হলো বেদ (ঋগ্বেদ, সামবেদ, যজুর্বেদ, অথর্ববেদ)। উপনিষদের অদ্বৈত দর্শন এবং ষড়দর্শনের (ন্যায়, সাংখ্য, যোগ, মীমাংসা ইত্যাদি) গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও মহাজাগতিক জিজ্ঞাসা এই সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে। শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার কর্মযোগ ও আধ্যাত্মিক সুধা বিশ্বজুড়ে দার্শনিক চিন্তার এক অনন্য মাইলফলক।
খ. মহাকাব্য ও পুরাণ (Epics & Puranas): আদিকবি বাল্মীকির ‘রামায়ণ’ এবং মহর্ষি বেদব্যাসের ‘মহাভারত’—এই দুটি বিশাল মহাকাব্য ভারতীয় উপমহাদেশের সমাজ, সংস্কৃতি, মূল্যবোধ ও সাহিত্যের মূল ভিত্তি। এছাড়া ১৮টি পুরাণ ও উপপুরাণ ঐতিহাসিক আখ্যান ও রূপকের মাধ্যমে মানব জীবনের জটিল মনস্তত্ত্বকে এক মহাকাব্যিক রূপ দিয়েছে।
গ. ধ্রুপদী কাব্য ও নাট্যসাহিত্য (Classical Kavya & Drama): খ্রিষ্টীয় প্রথম সহস্রাব্দে কবি কালিদাসের হাত ধরে সংস্কৃত কাব্য ও নাটক এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছায়। তাঁর ‘অভিজ্ঞানশকুন্তলম’ নাটক এবং ‘মেঘদূতম’ কাব্য বিশ্বসাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ রোমান্টিক আখ্যানগুলোর সমতুল্য। এছাড়া শূদ্রকের ‘মৃচ্ছকটিকম’ (বাস্তবতাবাদী নাটক) এবং বিশাখদত্তের ‘মুদ্রারাক্ষস’ (রাজনৈতিক নাটক) এই ধারাকে অত্যন্ত সমৃদ্ধ করেছে।
ঘ. নীতি ও কথাসাহিত্য (Fables & Didactic Literature): সংস্কৃত নীতিসাহিত্য পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন ও শিক্ষণীয় আখ্যান। পন্ডিত বিষ্ণু শর্মার ‘পঞ্চতন্ত্র’ এবং নারায়ণ পন্ডিতের ‘হিতোপদেশ’ পশুপাখির রূপক গল্পের মাধ্যমে রাজনীতি, সমাজনীতি ও বাস্তব জীবনের যে শিক্ষা দিয়েছে, তা বহু শতাব্দী ধরে বিশ্বের শত শত ভাষায় অনূদিত ও সমাদৃত হয়ে আসছে।
প্রগতিশীল সাহিত্য ও আন্দোলন (Progressive Literature)
সংস্কৃত সাহিত্যকে সাধারণত রক্ষণশীল ভাবা হলেও এর ভেতরে প্রাচীনকাল থেকেই তীব্র প্রথাবিরোধী ও প্রগতিশীল চিন্তার চর্চা ছিল:
- চার্বাক ও লোকায়ত দর্শন: প্রাচীন ভারতে বেদ ও ঈশ্বরকেন্দ্রিক রক্ষণশীলতার বিরুদ্ধে গিয়ে চার্বাক দর্শন সম্পূর্ণ বস্তুত্ববাদী, ইহজাগতিক এবং প্রগতিশীল চিন্তার জন্ম দিয়েছিল, যা সংস্কৃত সাহিত্যের আস্তিক ধারাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে।
- শূদ্রক ও প্রান্তিক বাস্তবতা: ধ্রুপদী নাট্যকার শূদ্রক তাঁর ‘মৃচ্ছকটিকম’ নাটকে কোনো রাজা বা দেবতাকে নায়ক না করে একজন দরিদ্র ব্রাহ্মণ ও একজন গণিকাকে মূল চরিত্র করে সামাজিক বৈষম্য, জুয়াড়ি, চোর এবং রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে গণবিদ্রোহের এক প্রগতিশীল চিত্র এঁকেছিলেন।
- আধুনিক সংস্কৃত পুনর্জাগরণ: বিংশ শতাব্দীতে এসে সংস্কৃত সাহিত্যকে দেব-দেবী ও রাজদরবারের বৃত্ত থেকে বের করে সাধারণ মানুষের দুঃখ-কষ্ট, দেশভাগ, নারীবাদ এবং দেশাত্মবোধক প্রগতিশীল আন্দোলনে যুক্ত করা হয়।
সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য (Notable) সাহিত্যিকবৃন্দ
সংস্কৃত সাহিত্যের আকাশকে যাঁরা দীপ্তিময় করেছেন, তাঁদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন হলেন:
- বেদব্যাস ও বাল্মীকি (প্রাচীন যুগ): যথাক্রমে ‘মহাভারত’ ও ‘রামায়ণ’-এর রচয়িতা। এই দুই ঋষি-কবি উপমহাদেশের কথাসাহিত্য, দর্শন ও সংস্কৃতির চিরন্তন রূপরেখা তৈরি করে গেছেন।
- কালিদাস (খ্রিষ্টীয় ৪র্থ-৫ম শতাব্দী): সংস্কৃত সাহিত্যের ‘মহাকবি’ ও নাট্যসম্রাট। ‘রঘুবংশম’, ‘কুমারসম্ভবম’, ‘মেঘদূতম’ এবং ‘অভিজ্ঞানশকুন্তলম’-এর মাধ্যমে তিনি নান্দনিকতা ও উপমার এক অবিসংবাদিত শিখরে আরোহণ করেন।
- পাণিনি (খ্রিষ্টপূর্ব ৪র্থ শতাব্দী): বিশ্বের সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষাবিজ্ঞানী ও ব্যাকরণবিদ। তাঁর রচিত ‘অষ্টাধ্যায়ী’ সংস্কৃত ভাষাকে একটি নিখুঁত, গাণিতিক ও বৈজ্ঞানিক রূপ দান করে যা আধুনিক কম্পিউটার কোডিং-এর ক্ষেত্রেও সমাদৃত।
- ভাস (খ্রিষ্টপূর্ব ৩য়-৪র্থ শতাব্দী): কালিদাসের পূর্ববর্তী শ্রেষ্ঠ নাট্যকার, যাঁর ‘স্বপ্নবাসব দত্তাম’ এবং মহাভারতের পটভূমিতে লেখা নাটকগুলো থিয়েটারের আদি ও সার্থক রূপ।
- বাণভট্ট (খ্রিষ্টীয় ৭ম শতাব্দী): সংস্কৃত গদ্য সাহিত্যের রাজপুত্র। রাজা হর্ষবর্ধনের সভাকবি বাণভট্টের ‘কাদম্বরী’কে বিশ্বের আদি উপন্যাসগুলোর একটি হিসেবে গণ্য করা হয়।
- ভট্ট মথুরানাথ শাস্ত্রী (১৮৮৯–১৯৬৪): আধুনিক সংস্কৃত সাহিত্যের পুরোধা ব্যক্তিত্ব, যিনি প্রাচীন ছন্দের সাথে আধুনিক যুগের রাজনৈতিক সচেতনতা, গল্প ও উপন্যাসের মেলবন্ধন ঘটিয়ে সংস্কৃতকে আধুনিক রূপ দিয়েছিলেন।
হিন্দি (Hindi)
ভারতের উত্তরাঞ্চল, মধ্যাঞ্চল এবং বিশ্বজুড়ে থাকা বিশাল প্রবাসী ভারতীয় সমাজ জুড়ে বিস্তৃত হিন্দি ভাষা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শীর্ষ এবং বিশ্বের সর্বাধিক প্রচলিত ও প্রভাবশালী সাহিত্যিক মাধ্যম। একাদশ শতাব্দীর চারণ কাব্য ও বীরগাথা কাল থেকে শুরু করে মধ্যযুগের ভক্তি ও রীতিকাব্য এবং আধুনিক যুগে বিশ্বমঞ্চে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করা হিন্দি সাহিত্য আজ এক বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়েছে; বিশেষ করে জাতীয়তাবাদী কবিতা, সমাজবাস্তববাদী কথাসাহিত্য (উপন্যাস ও ছোটগল্প), প্রগতিশীল নাটক এবং মননশীল ললিত-নিবন্ধের মতো প্রতিটি ধারায় বা জনরায় এর বিকাশ ঘটেছে বিশ্বমানের। হিন্দি সাহিত্যে ছায়াবাদ (রোমান্টিক আন্দোলন), প্রগতিশীল লেখক সংঘ, প্রয়োগবাদ এবং নয়ী কবিতা আন্দোলনের মতো প্রগতিশীল ও শোষিত মানুষের অধিকার আদায়ের এক গৌরবময় ও দ্রোহী ইতিহাস রয়েছে, যেখানে সন্ত তুলসীদাস, কবি কबीर, মুন্সী প্রেমচন্দ (কথাসাহিত্য সম্রাট), জয়শঙ্কর প্রসাদ, মহাদেবী বর্মা ও সচ্চিদানন্দ বাৎস্যায়ন ‘অজ্ঞেয়’-এর মতো কালজয়ী সাহিত্যিকেরা একে বিশ্বমঞ্চে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। ভারতের রাষ্ট্রীয় ঐক্য ধরে রাখা এবং সমসাময়িক বৈশ্বিক কথাসাহিত্যে অনন্য অবদান রাখার মধ্য দিয়ে এই ভাষার সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক যাত্রা আজ এক ঐতিহাসিক ও আন্তর্জাতিক জয়জয়কার।
সমৃদ্ধ সাহিত্যিক ধারা ও জনরা (Genres)
হিন্দি সাহিত্যের ক্যানভাস এতটাই গতিশীল ও মননশীল যে এর প্রতিটি জনরা নিজস্ব স্বকীয়তায় ভাস্বর:
ক. কবিতা ও ভক্তিগীতি (Poetry & Bhakti Lyrics): হিন্দি কবিতার আদি উৎস বীরগাথা হলেও মধ্যযুগে কबीर, তুলসীদাস, সুরদাস ও মীরা বাঈয়ের হাত ধরে ভক্তি ও সুফী কাব্যের এক অভূতপূর্ব জোয়ার আসে। আধুনিক যুগে এসে ‘ছায়াবাদ’ আন্দোলনের মাধ্যমে কবিতা আধ্যাত্মিকতার গণ্ডি পেরিয়ে গভীর মানবিক অনুভূতি, প্রকৃতি প্রেম ও রহস্যবাদে রূপ নেয়। পরবর্তীতে ‘নয়ী কবিতা’ আন্দোলনের মাধ্যমে কবিতা হয়ে ওঠে তীক্ষ্ণ রাজনৈতিক ও নাগরিক জীবনের প্রতিচ্ছবি।
খ. কথাসাহিত্য: উপন্যাস ও ছোটগল্প (Fiction: Novels & Short Stories): মুন্সী প্রেমচন্দের হাত ধরে হিন্দি উপন্যাসের বাস্তবতাবাদী ও আধুনিক যাত্রা শুরু হয়। তিনি জমিদার ও মহাজনদের দ্বারা শোষিত গ্রামীণ ভারতের যে নিখুঁত চিত্র এঁকেছেন, তা বিশ্বমানের। পরবর্তীতে ফণিশ্বর নাথ ‘রেণু’ হিন্দি কথাসাহিত্যে ‘আঞ্চলিক উপন্যাসের’ এক জাদুকরী ধারা তৈরি করেন। উত্তর-আধুনিক ও সমসাময়িক যুগে মোহন রাকেশ, মৈত্রেয়ী পুষ্পা ও কৃষ্ণ সোবতির লেখনী এই ধারাকে মনস্তাত্ত্বিক ও বৈশ্বিক স্তরে উন্নীত করেছে।
গ. নাট্যসাহিত্য ও রঙ্গমঞ্চ (Drama & Theatre): আধুনিক হিন্দি নাটকের ভিত্তি গড়েন ভারতেন্দু হরিশচন্দ্র। বিংশ শতাব্দীতে জয়শঙ্কর প্রসাদের ঐতিহাসিক নাটকগুলো এবং পরবর্তীতে মোহন রাকেশের ‘আষাঢ় কা এক দিন’ বা ‘আধূ আধূরে’-এর মতো নাটকগুলো হিন্দি থিয়েটারকে রাজদরবার ও পৌরাণিক আখ্যান থেকে বের করে সাধারণ মানুষের তীব্র মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব ও অস্তিত্ব সংকটের মুখোমুখি দাঁড় করায়।
ঘ. ললিত-নিবন্ধ ও গদ্য (Essays & Literary Prose): হিন্দি সাহিত্যে প্রবন্ধ বা নিবন্ধের এক অত্যন্ত পাণ্ডিত্যপূর্ণ ঐতিহ্য রয়েছে। আচার্য রামচন্দ্র শুক্ল এবং পরবর্তীতে কুবেবনাথ রাইয়ের মতো ললিত-নিবন্ধকারেরা প্রাচীন ভারতীয় সংস্কৃতি, লোকঐতিহ্য ও আধুনিক বিশ্বদর্শনের মেলবন্ধনে হিন্দি মননশীল গদ্যকে অত্যন্ত সমৃদ্ধ করেছেন।
প্রগতিশীল সাহিত্য ও আন্দোলন (Progressive Literature)
হিন্দি সাহিত্যে শোষিত মেহনতি মানুষ ও নারীদের অধিকারের পক্ষে লড়ার এক দীর্ঘ ও শক্তিশালী প্রগতিশীল ঐতিহ্য রয়েছে:
- প্রগতিশীল লেখক সংঘ (১৯৩৬): লক্ষ্ণৌতে মুন্সী প্রেমচন্দের সভাপতিত্বে প্রগতিশীল লেখক সংঘের প্রথম ঐতিহাসিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এর ফলে হিন্দি সাহিত্যে পুঁজিবাদ, সামন্তবাদ ও ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে এবং কৃষক-শ্রমিকের অধিকারের পক্ষে মার্ক্সীয় দর্শনের এক শক্তিশালী জোয়ার আসে।
- ছায়াবাদ ও নারী মুক্তি: ১৯২০ ও ৩০-এর দশকে মহাদেবী বর্মা ও সূর্যকান্ত ত্রিপাঠী ‘নিরালা’-র লেখনীতে পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে নারীর আত্মমর্যাদা ও স্বাধীনতার প্রগতিশীল বাণী উচ্চকিত হয়।
- দলিত ও গ্রামীণ চেতনা: উত্তর-আধুনিক যুগে ওমপ্রকাশ বাল্মীকি (তাঁর কালজয়ী আত্মজীবনী ‘জুটন’-এর মাধ্যমে) ও মৈত্রেয়ী পুষ্পার হাত ধরে হিন্দি সাহিত্যে জাতপাত বৈষম্য, কুসংস্কার এবং প্রান্তিক অন্ত্যজ মানুষের অধিকারের লড়াই এক নতুন বৈপ্লবিক মাত্রা পায়।
সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য (Notable) সাহিত্যিকবৃন্দ
হিন্দি সাহিত্যের বিশাল আকাশকে যাঁরা দীপ্তিময় করেছেন, তাঁদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন হলেন:
- মুন্সী প্রেমচন্দ (১৮৮০–১৯৩৬): হিন্দি ও উর্দু সাহিত্যের ‘উপন্যাস সম্রাট’। তাঁর ‘গোদান’, ‘গবন’ এবং ‘কফন’-এর মতো কালজয়ী ছোটগল্প ও উপন্যাস গ্রামীণ ভারতের শোষিত মানুষের এক চিরন্তন ও জীবন্ত দলিল।
- তুলসীদাস ও কबीर (মধ্যযুগ): তুলসীদাসের ‘রামচরিতমানস’ এবং কীবরের প্রথাবিরোধী ও অসাম্প্রদায়িক ‘দোহা’ সাধারণ মানুষের মুখে মুখে হিন্দি ভাষার ভিত্তি গড়ে তুলেছে।
- বারতেন্দু হরিশচন্দ্র (১৮৫০–১৮৮৫): আধুনিক হিন্দি সাহিত্যের জনক। তিনি একাধারে কবি, নাট্যকার ও সাংবাদিক হিসেবে হিন্দি ভাষাকে আধুনিক গদ্যের রূপ দান করেন।
- জয়শঙ্কর প্রসাদ (১৮৮৯–১৯৩৭): হিন্দি কবিতার ‘ছায়াবাদ’ যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্তম্ভ। তাঁর মহাকাব্য ‘কামায়নী’ (Kamayani) দর্শন ও নান্দনিকতার এক অমর কীর্তি।
- মহাদেবী বর্মা (১৯০৭–১৯৮৭): আধুনিক হিন্দি সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নারী কবি ও প্রাবন্ধিক, যিনি তাঁর মরমী কবিতা ও গদ্যের জন্য ‘আধুনিক মীরা’ নামে পরিচিত এবং ১৯৮২ সালে জ্ঞানপীঠ পুরস্কার লাভ করেন।
- সচ্চিদানন্দ বাৎস্যায়ন ‘অজ্ঞেয়’ (১৯১১–১৯৮৭): হিন্দি সাহিত্যে ‘প্রয়োগবাদ’ ও ‘নয়ী কবিতা’ আন্দোলনের প্রবক্তা। তাঁর মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস ‘শেখর: এক জীবনী’ হিন্দি কথাসাহিত্যের একটি অবিসংবাদিত মাইলফলক।
- ফণিশ্বর নাথ ‘রেণু’ (১৯২১–১৯৭৭): হিন্দি সাহিত্যের প্রখ্যাত আঞ্চলিক ঔপন্যাসিক। বিহারের গ্রামীণ লোকসংস্কৃতি ও ভাষা নিয়ে রচিত তাঁর ‘মৈলা আঁচল’ হিন্দি সাহিত্যের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী সৃষ্টি।
তামিল (Tamil)
ভারতের তামিলনাড়ু রাজ্য, পুদুচেরি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল এবং শ্রীলঙ্কার উত্তরাঞ্চল ও পূর্বাঞ্চল ছাড়াও সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়াসহ বিশ্বজুড়ে থাকা বিশাল তামিল প্রবাসী সমাজ জুড়ে বিস্তৃত তামিল ভাষা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শীর্ষ এবং বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘতম টিকে থাকা ধ্রুপদী বা শাস্ত্রীয় (Classical) সাহিত্যিক মাধ্যম। খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০ অব্দ থেকে শুরু হওয়া প্রাচীন ‘সঙ্গম সাহিত্য’ (Sangam Literature) থেকে শুরু করে মধ্যযুগের ভক্তি আন্দোলন এবং আধুনিক যুগে বিশ্বমঞ্চে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করা তামিল সাহিত্য আজ এক বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়েছে; বিশেষ করে প্রাচীন নীতিশাস্ত্রীয় কাব্য, মহাকাব্যিক আখ্যান, ভক্তিমূলক গীতি এবং আধুনিক যুগে রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতাবাদী কথাসাহিত্যের মতো প্রতিটি ধারায় বা জনরায় এর বিকাশ ঘটেছে বিশ্বমানের. তামিল সাহিত্যে প্রাচীন আত্মমর্যাদাবোধ (আকাম ও পুরাম চেতনা), বিংশ শতকের প্রগতিশীল ‘দ্রাবিড় আন্দোলন’, আত্মসম্মান আন্দোলন (Self-Respect Movement) এবং প্রান্তিক ও দলিত মানুষের অধিকার আদায়ের এক গৌরবময় ও দ্রোহী ইতিহাস রয়েছে, যেখানে মহাকবি তিরুভাল্লুভার, সুব্রামানিয়া ভারতী (আধুনিক তামিল সাহিত্যের জনক), পুদুমাইপিথান, আকিলান এবং জয়কান্তনের মতো কালজয়ী সাহিত্যিকেরা একে বিশ্বমঞ্চে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। দুই হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে ভাষার বিশুদ্ধতা ও স্বকীয়তা বজায় রেখে আধুনিক বিশ্বের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক শক্তি হিসেবে টিকে থাকার মধ্য দিয়ে এই ভাষার সাহিত্যিক যাত্রা আজ এক ঐতিহাসিক ও বৈশ্বিক জয়জয়কার।
সমৃদ্ধ সাহিত্যিক ধারা ও জনরা (Genres)
তামিল সাহিত্যের ক্যানভাস এতটাই সুপ্রাচীন ও নান্দনিক যে এর প্রতিটি জনরা নিজস্ব স্বকীয়তায় ভাস্বর:
- ক. সঙ্গম ও নীতিসাহিত্য (Sangam & Didactic Poetry): তামিল সাহিত্যের আদি উৎস হলো ‘সঙ্গম সাহিত্য’, যা মানুষের অভ্যন্তরীণ আবেগ (আকাম) এবং বীরত্ব ও যুদ্ধকে (পুরাম) কেন্দ্র করে রচিত হয়েছিল। খ্রিষ্টীয় প্রথম সহস্রাব্দের শুরুতে রচিত মহাকবি তিরুভাল্লুভারের ‘তিরুক্কুড়ল’ (Thirukkural) বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নীতিগ্রন্থ, যা জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানবজীবনের নৈতিকতা ও দর্শনের এক শাশ্বত গাইডবুক।
- খ. পঞ্চ-মহাকাব্য (The Five Great Epics): তামিল সাহিত্যের মধ্যযুগীয় স্বর্ণালী ভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে পাঁচটি মহাকাব্যের ওপর, যার মধ্যে প্রধানতম হলো ইলাঙ্গো আদিগালের ‘শিলপ্পাদিকারম’ (Silappatikaram) এবং ছাত্থানার-এর ‘มணிমেকলাই’ (Manimekalai)। এই মহাকাব্যগুলো কোনো পৌরাণিক দেব-দেবীকে কেন্দ্র করে নয়, vacations বাস্তব জীবন, প্রেম, কোপ ও ত্যাগের এক অনন্য মহাকাব্যিক রূপ।
- গ. ভক্তিমূলক কাব্য (Bhakti Literature): ষষ্ঠ থেকে নবম শতাব্দীর মধ্যে তামিলনাড়ু থেকেই সমগ্র ভারতে ‘ভক্তি আন্দোলন’-এর সূচনা হয়েছিল। আলভার (বিষ্ণুভক্ত) এবং নায়নমার (শিবভক্ত) সাধুদের রচিত হাজার হাজার আধ্যাত্মিক ও মরমী গান তামিল কবিতাকে সুর ও ভক্তির এক অনন্য উচ্চতা দান করেছে।
- ঘ. আধুনিক কথাসাহিত্য ও ছোটগল্প (Modern Fiction & Short Stories): বিংশ শতাব্দীতে পুদুমাইপিথানের হাত ধরে তামিল ছোটগল্পের আধুনিক ও বাস্তবতাবাদী যুগের সূচনা হয়। পরবর্তীতে আকিলান, জয়কান্তন এবং উত্তর-আধুনিক যুগে সুন্দর রামস্বামী ও পেরুমাল মুরুগানের মতো লেখকদের লেখনী তামিল কথাসাহিত্যকে বিশ্বমানের মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা ও নান্দনিকতা দিয়েছে।
প্রগতিশীল সাহিত্য ও আন্দোলন (Progressive Literature)
তামিল সাহিত্যে সামাজিক বৈষম্য, জাতপাত এবং পিতৃতান্ত্রিকতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের এক অত্যন্ত উগ্র ও আপসহীন প্রগতিশীল ইতিহাস রয়েছে:
- দ্রাবিড় ও আত্মসম্মান আন্দোলন: বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে পেরিয়ার ই. ভি. রামাসামির ‘আত্মসম্মান আন্দোলন’ তামিল সাহিত্যকে আমূল বদলে দেয়। এর প্রভাবে সাহিত্যে ধর্মীয় গোঁড়ামি, ব্রাহ্মণ্যবাদ এবং জাতপাতের বিরুদ্ধে তীব্র কুঠারাঘাত করা হয় এবং ভারতেন্দু হরিশচন্দ্রের মতোই সুব্রামানিয়া ভারতীর কবিতায় জাতীয়তাবাদ ও নারীমুক্তির প্রগতিশীল বাণী উচ্চকিত হয়।
- দলিত সাহিত্য আন্দোলন: আশির দশক থেকে তামিল সাহিত্যে এক শক্তিশালী দলিত ধারার জন্ম হয়। বামা (Bama)-র কালজয়ী আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস ‘কারুক্কু’ (Karukku) এবং পেরুমাল মুরুগানের উপন্যাসে গ্রামীণ সমাজের বর্ণবৈষম্য, অস্পৃশ্যতা এবং প্রান্তিক অন্ত্যজ মানুষের অধিকারের লড়াই এক নতুন বৈপ্লবিক মাত্রা লাভ করে।
সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য (Notable) সাহিত্যিকবৃন্দ
তামিল সাহিত্যের বিশাল আকাশকে যাঁরা দীপ্তিময় করেছেন, তাঁদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন হলেন:
- তিরুভাল্লুভার (খ্রিষ্টপূর্ব ৩য়-১ম শতাব্দী): তামিল সাহিত্যের সর্বকালের শ্রেষ্ঠ দার্শনিক ও কবি। তাঁর রচিত ‘তিরুক্কুড়ল’ তামিল সংস্কৃতির মূল চালিকাশক্তি ও অমূল্য আকর গ্রন্থ।
- ইলাঙ্গো আদিগাল (খ্রিষ্টীয় ৫মহ-৬ষ্ঠ শতাব্দী): তামিল সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মহাকাব্য ‘শিলপ্পাদিকারম’ (নূপুরের উপাখ্যান)-এর রচয়িতা, যিনি চেরা রাজবংশের যুগরাজ হওয়া সত্ত্বেও সন্ন্যাসী হয়ে সাধারণ মানুষের ট্র্যাজেডিকে কাব্যে রূপ দিয়েছিলেন।
- কাম্বান (১১শ-১২শ শতাব্দী): তামিল সাহিত্যের ‘মহাকবি’। তিনি বাল্মীকির রামায়ণকে তামিল সংস্কৃতির ছাঁচে ঢেলে ‘কাম্ব রামায়নাম’ রচনা করেন, যা এর সাহিত্যিক সৌন্দর্য ও শব্দচয়নের জন্য অনন্য।
- সুব্রামানিয়া ভারতী (১৮৮২–১৯২১): আধুনিক তামিল সাহিত্যের জনক ও বীর কবি। তাঁর দেশাত্মবোধক কবিতা, সামাজিক সংস্কারমূলক গান এবং সহজ সরল গদ্যশৈলী তামিল সমাজকে ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে জাগিয়ে তুলেছিল।
- পুদুমাইপিথান (১৯০৬–১৯৪৮): আধুনিক তামিল ছোটগল্পের জাদুকর। প্রথাবদ্ধ ও।)আদর্শবাদী লেখার বাইরে গিয়ে তিনি সমাজের রূঢ় বাস্তবতা, ভণ্ডামি ও মানুষের অবদমিত আকাঙ্ক্ষাকে অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে ফুটিয়ে তোলেন।
- জয়কান্তন (১৯৩৪–২০১৫): তামিল সাহিত্যের অন্যতম প্রভাবশালী প্রগতিশীল ঔপন্যাসিক ও গল্পকার, যিনি সমাজতান্ত্রিক ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ হয়ে চেন্নাইয়ের বস্তিবাসী, রিকশাচালক ও প্রান্তিক মানুষের জীবন নিয়ে লিখেছেন এবং ২০০২ সালে জ্ঞানপীঠ পুরস্কার লাভ করেন।
উর্দু (Urdu)
পাকিস্তান (জাতীয় ভাষা) এবং ভারতের উত্তর প্রদেশ, দিল্লি, বিহার, হায়দরাবাদ ছাড়াও বিশ্বজুড়ে থাকা বিশাল দক্ষিণ এশীয় মুসলিম প্রবাসী সমাজ জুড়ে বিস্তৃত উর্দু ভাষা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শীর্ষ এবং বিশ্বের অন্যতম সুমিষ্ট, সংবেদনশীল ও প্রভাবশালী সাহিত্যিক মাধ্যম। ত্রয়োদশ-চতুর্দশ শতাব্দীর সুফী কবি আমির খসরুর ‘রেখতা’ ও প্রাচীন ‘দখনি’ রূপ থেকে শুরু করে মধ্যযুগের রাজকীয় দরবার এবং আধুনিক যুগে বিশ্বমঞ্চে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করা উর্দু সাহিত্য আজ এক বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়েছে; বিশেষ করে অনন্য গজল ও শায়েরি, সুগভীর দাস্তান (মহাকাব্যিক আখ্যান), সমাজবাস্তববাদী ছোটগল্প এবং প্রগতিশীল মননশীল প্রবন্ধের মতো প্রতিটি ধারায় বা জনরায় এর বিকাশ ঘটেছে বিশ্বমানের। উর্দু সাহিত্যে বিংশ শতকের প্রগতিশীল লেখক আন্দোলন (Progressive Writers’ Movement), দেশভাগ ও দাঙ্গার ট্র্যাজেডি এবং আধুনিক নাগরিক জীবনের মনস্তাত্ত্বিক সংকটের এক গৌরবময় ও দ্রোহী ইতিহাস রয়েছে, যেখানে মির্জা গালিব, আল্লামা ইকবাল, মীর তকী মীর, সাদাত হাসান মান্টো এবং ফয়েজ আহমেদ ফয়েজের মতো কালজয়ী সাহিত্যিকেরা একে বিশ্বমঞ্চে এক অনন্য ও কালজয়ী উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। গীতিময়তা ও রোমান্টিকতার সাথে তীব্র রাজনৈতিক প্রতিবাদের মেলবন্ধন ঘটিয়ে সমসামयिक বৈশ্বিক কথাসাহিত্যে অনন্য অবদান রাখার মধ্য দিয়ে এই ভাষার সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক যাত্রা আজ এক ঐতিহাসিক ও আন্তর্জাতিক জয়জয়কার।
সমৃদ্ধ সাহিত্যিক ধারা ও জনরা (Genres)
উর্দু সাহিত্যের ক্যানভাস এতটাই গতিশীল, সুরময় ও মননশীল যে এর প্রতিটি জনরা নিজস্ব স্বকীয়তায় ভাস্বর:
ক. গজল, শায়েরি ও নজম (Poetry & Ghazals): উর্দু সাহিত্যের মূল প্রাণই হলো কবিতা। এর প্রধান রূপ ‘গজল’ (যার মাধ্যমে প্রেম, বিরহ ও দর্শনের গূঢ় তত্ত্ব প্রকাশ পায়) এবং ‘নজম’ (নির্দিষ্ট বিষয়ে দীর্ঘ কবিতা) বিশ্বসাহিত্যের অমূল্য রত্ন। মীর ও গালিবের হাত ধরে গজলের যে রাজকীয় ও দার্শনিক ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল, তা আজও উপমহাদেশের সংগীত ও সংস্কৃতির মূল চালিকাশক্তি।
খ. কথাসাহিত্য: ছোটগল্প ও উপন্যাস (Fiction: Short Stories & Novels): এক সময় বড় বড় অলৌকিক আখ্যান বা ‘দাস্তান’ উর্দু গদ্যের মূল রূপ হলেও, বিংশ শতাব্দীতে এসে ছোটগল্প বা ‘আফসানানিগারি’ (Afsana) উর্দু সাহিত্যের সবচেয়ে শক্তিশালী জনরায় পরিণত হয়। মুন্সী প্রেমচন্দ এবং পরবর্তী সময়ে সাদাত হাসান মান্টোর হাত ধরে উর্দু ছোটগল্পে রূঢ় বাস্তবতা ও মানুষের আদিম মনস্তত্ত্ব এক অনন্য উচ্চতা লাভ করে। এছাড়া কুরাতুলাইন হায়দারের ‘আগ কা দরিয়া’ উর্দু উপন্যাসের এক মহাকাব্যিক মাইলফলক।
গ. মার্সিয়া ও কাসিদা (Marsiya & Qasida): কারবালার ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডিকে কেন্দ্র করে রচিত শোকগাঁথা বা ‘মার্সিয়া’ উর্দু কাব্যের এক অনন্য ও সমৃদ্ধ ধারা। মীর আনিস ও মির্জা দাবিরের হাত ধরে এই ধারাটি উপমা, অলঙ্কার এবং বিষাদময় শৈলীতে বিশ্বমানের মহাকাব্যিক রূপ ধারণ করেছে।
ঘ. রম্যরচনা ও মননশীল গদ্য (Satire & Literary Prose): উর্দু সাহিত্যে মার্জিত ব্যঙ্গবিদ্রূপ এবং বুদ্ধিবৃত্তিক কৌতুকের এক চমৎকার ধারা রয়েছে। পিত্রাস বুখারী ও মুশতাক আহমেদ ইউসুফীর মতো রম্যরচনাকারেরা সমাজ, রাজনীতি ও মানুষের স্বভাবকে চমৎকার ব্যঙ্গাত্মক গদ্যের মাধ্যমে ব্যবচ্ছেদ করেছেন।
প্রগতিশীল সাহিত্য ও আন্দোলন (Progressive Literature)
উর্দু সাহিত্যে শোষিত মেহনতি মানুষ, ফ্যাসিবাদের বিরোধিতা এবং নারীদের অধিকারের পক্ষে লড়ার সবচেয়ে সুসংগঠিত ও শক্তিশালী প্রগতিশীল ইতিহাস রয়েছে:
- প্রগতিশীল লেখক আন্দোলন (Anjuman Taraqqi Pasand Musannifin): ১৯৩৬ সালে এই আন্দোলনের যাত্রা শুরু হয়। উর্দু সাহিত্যের ইতিহাসে এটি ছিল সবচেয়ে প্রভাবশালী আন্দোলন। সাজ্জাদ জহির, ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ, আলী সরদার জাফরি এবং ইসমত চুগতাইদের লেখনীর মাধ্যমে সাহিত্য রাজদরবার ও কপোত-কপোতীর প্রেম থেকে বের হয়ে কারখানার শ্রমিক, ক্ষুধার্ত কৃষক এবং শোষিত মানুষের বিপ্লবের হাতিয়ারে রূপান্তরিত হয়।
- দেশভাগের ট্র্যাজেডি ও বাস্তবতাবাদ: ১৯৪৭ সালের ভারত ও পাকিস্তান দেশভাগের নারকীয় নৃশংসতা, দাঙ্গা ও মানবিক ট্রমাকে কোনো রাজনৈতিক মুখোশ ছাড়াই অত্যন্ত নিষ্ঠুর ও নগ্ন বাস্তবতার সাথে ফুটিয়ে তুলেছেন সাদাত হাসান মান্টো। তাঁর ‘টোবা টেক সিং’ গল্পটি বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম সেরা প্রগতিশীল প্রতিবাদী সৃষ্টি।
- নারী মুক্তি ও প্রথাবিরোধিতা: ইসমত চুগতাই এবং রশিদ জাহানের মতো নারী লেখিকারা মধ্যবিত্ত মুসলিম সমাজের অন্ধ সংস্কার, লিঙ্গবৈষম্য এবং নারীদের অবদমিত মনস্তত্ত্ব ও কামনার কথা অত্যন্ত অকপটে ও সাহসিকতার সাথে তুলে সমাজে বৈপ্লবিক ঝড় তুলেছিলেন।
সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য (Notable) সাহিত্যিকবৃন্দ
উর্দু সাহিত্যের বিশাল আকাশকে যাঁরা দীপ্তিময় করেছেন, তাঁদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন হলেন:
- মির্জা গালিব (১৭৯৭–১৮৬৯): উর্দু সাহিত্যের সর্বকালের শ্রেষ্ঠ ও জনপ্রিয়তম কবি। তাঁর ক্ষুরধার বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তা, গভীর দর্শন ও অনন্য গজলশৈলী উর্দু ভাষাকে বিশ্বদরবারে অমর করে রেখেছে।
- আল্লামা মুহাম্মদ ইকবাল (১৮৭৭–১৯৩৮): উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দার্শনিক-কবি বা ‘শায়ের-ই-মাশরিক’ (প্রাচ্যের কবি)। তাঁর ‘শিকওয়া’, ‘জওয়াব-ই-শিকওয়া’ এবং আধ্যাত্মিক কবিতা মুসলিম পুনর্জাগরণ ও আধুনিক চিন্তাধারার মূল ভিত্তি।
- মীর তকী মীর (১৭২৩–১৮১০): উর্দু গজলের জনক বা ‘খুদা-এ-সুখান’ (কবিতার ঈশ্বর)। তাঁর অত্যন্ত सरल অথচ হৃদয়স্পর্শী ও বিষাদময় গজল পরবর্তী প্রজন্মের সমস্ত কবিদের (এমনকি গালিবকেও) গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল।
- সাদাত হাসান মান্টো (১৯১২–১৯৫৫): বিংশ শতাব্দীর উর্দু সাহিত্যের সবচেয়ে সাহসী, বিতর্কিত ও প্রভাবশালী ছোটগল্পকার। সমাজবাস্তবতা ও দেশভাগের ট্র্যাজেডি নিয়ে লেখা তাঁর গল্পগুলো বিশ্বসাহিত্যের অমূল্য সম্পদ।
- ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ (১৯১১–১৯৮৪): আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন প্রগতিশীল কবি ও লেনিন শান্তি পুরস্কার বিজয়ী। প্রথাগত রোমান্টিক গজলের অবয়বকে তিনি অত্যন্ত সার্থকভাবে রাজনৈতিক প্রতিবাদ ও স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের হাতিয়ারে রূপান্তর করেছিলেন।
- কুরাতুলাইন হায়দার (১৯২৭–২০০৮): উর্দু কথাসাহিত্যের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ ও জ্ঞানপীঠ পুরস্কার বিজয়ী লেখিকা। আড়াই হাজার বছরের উপমহাদেশীয় ইতিহাস ও সমাজ রূপান্তরের পটভূমিতে রচিত তাঁর মহাকাব্যিক উপন্যাস ‘আগ কা দরিয়া’ (River of Fire) বিশ্বমানের এক ক্লাসিক সৃষ্টি।
- ইসমত চুগতাই (১৯১৫–১৯৯১): উর্দু সাহিত্যের প্রগতিশীল আন্দোলনের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় বৈপ্লবিক নারী কথাসাহিত্যিক, যাঁর সাহসী ও অকপটে লেখনী পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল।
৬. মালয়ালম (Malayalam)
প্রধান অঞ্চল: ভারতের কেরালা রাজ্য।
পরিচিতি: আধুনিক ভারতীয় সাহিত্যে সবচেয়ে প্রগতিশীল এবং উচ্চশিক্ষিত পাঠকদের ভাষা হিসেবে এটি পরিচিত। এই ভাষার কথাসাহিত্য অত্যন্ত শক্তিশালী এবং ভারত সরকারের সর্বোচ্চ সাহিত্য পুরস্কার ‘জ্ঞানপীঠ’ অর্জনে এই ভাষার লেখকেরা অনন্য রেকর্ড গড়েছেন।
৭. কন্নড় (Kannada)
প্রধান অঞ্চল: ভারতের কর্ণাটক রাজ্য।
পরিচিতি: তিন হাজার বছরেরও বেশি পুরোনো ইতিহাস সমৃদ্ধ আরেকটি শাস্ত্রীয় ভাষা। প্রাচীন ‘কবিরাজমার্গ’ থেকে শুরু করে মধ্যযুগের বচন সাহিত্য এবং আধুনিক যুগে জ্ঞানপীঠ বিজয়ী ইউ. আর. অনন্তমূর্তি বা গিরিশ কারনাডের নাট্যসাহিত্য কন্নড় ভাষাকে অনন্য উচ্চতা দিয়েছে।
৮. তেলুগু (Telugu)
প্রধান অঞ্চল: ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশ ও তেলেঙ্গানা রাজ্য।
পরিচিতি: ইতালীয় ভাষার মতো সুমিষ্ট স্বরবর্ণের ব্যবহারের জন্য একে ‘প্রাচ্যের ইতালীয়’ বলা হয়। মধ্যযুগের মহাকাব্যিক অনুবাদ থেকে শুরু করে আধুনিক যুগের প্রগতিশীল ও বিপ্লবী কবিতা তেলুগু সাহিত্যের মূল বৈশিষ্ট্য।
৯. মারাঠি (Marathi)
প্রধান অঞ্চল: ভারতের মহারাষ্ট্র রাজ্য।
পরিচিতি: মধ্যযুগের সাধু-কবি তুকারাম ও জ্ঞানেশ্বরের ভক্তিগীতি থেকে এই ভাষার সাহিত্যের মজবুত ভিত্তি তৈরি হয়। আধুনিক যুগে দলিত সাহিত্য (Dalit Literature) আন্দোলনে মারাঠি ভাষা সমগ্র ভারতের সমাজ ও সাহিত্যে এক যুগান্তকারী বিপ্লব ঘটিয়েছিল।
১০. গুজরাটি (Gujarati)
প্রধান অঞ্চল: ভারতের গুজরাট রাজ্য।
পরিচিতি: মধ্যযুগের মরমী কৃষ্ণভক্ত কবি নরসিংহ মেহতার হাত ধরে এই ভাষার সাহিত্য বিকশিত হয়। পরবর্তীতে মহাত্মা গান্ধীর আত্মজীবনী এবং আধুনিক যুগের কবি ও ঔপন্যাসিকদের হাত ধরে গুজরাটি সাহিত্য আরও সমৃদ্ধ হয়েছে।
১১. অসমীয়া (Assamese)
প্রধান অঞ্চল: ভারতের আসাম রাজ্য।
পরিচিতি: মধ্যযুগের মহাপুরুষ শ্রীমন্ত শংকরদেবের হাত ধরে অসমীয়া সাহিত্যের নবজাগরণ ঘটে। এই ভাষার নিজস্ব ঐতিহাসিক বিবরণী গ্রন্থ ‘বুৰঞ্জী’ (Buranji) এবং আধুনিক যুগের লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়া ও ইন্দিরা গোস্বামীর (মামণি রয়সম) সাহিত্য অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য।
১২. ওড়িয়া (Odia)
প্রধান অঞ্চল: ভারতের ওড়িশা রাজ্য।
পরিচিতি: ভারতের অন্যতম শাস্ত্রীয় ভাষা। পঞ্চদশ শতাব্দীতে সারলা দাসের ওড়িয়া মহাভারত দিয়ে এর মূল ভিত্তি স্থাপিত হয়। আধুনিক যুগে গোপীনাথ মহান্তি ও প্রতিভা রায়ের মতো লেখকদের হাত ধরে এই ভাষা বিশ্বমানের কথাসাহিত্য উপহার দিয়েছে।
১৩. পাঞ্জাবি (Punjabi)
প্রধান অঞ্চল: পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশ এবং ভারতের পাঞ্জাব রাজ্য।
পরিচিতি: দুই দেশেই বিস্তৃত এই ভাষার সাহিত্য অত্যন্ত সমৃদ্ধ, বিশেষ করে এর মরমী ও সুফী ঐতিহ্য বিশ্বখ্যাত। বাবা ফরিদ, বুলেহ শাহ এবং সুলতান বাহুর আধ্যাত্মিক সুফী কালাম এবং ওয়ারিস শাহ-এর অমর প্রেমগাথা ‘হীর রাঞ্জা’ পাঞ্জাবি সাহিত্যকে অমর করে রেখেছে। আধুনিক যুগে অমৃতা প্রীতম ও সুরজিৎ পাতরের মতো সাহিত্যিকেরা একে নতুন উচ্চতা দিয়েছেন।
১৪. পশতু (Pashto)
প্রধান অঞ্চল: আফগানিস্তান (প্রধান সরকারি ভাষা) এবং পাকিস্তানের খাইবার পখতুনখোয়া প্রদেশ।
পরিচিতি: পশতু সাহিত্যের ইতিহাস বেশ প্রাচীন। সপ্তদশ শতাব্দীর মহান যোদ্ধা, দার্শনিক ও জাতীয় কবি খুশহাল খান খাট্টাক-কে পশতু সাহিত্যের জনক বলা হয়। এছাড়া রহমান বাবার সুফী ও মরমী কবিতা পশতু সংস্কৃতির মূল ভিত্তি। আধুনিক যুগেও এই ভাষায় শক্তিশালী দেশাত্মবোধক ও প্রগতিশীল সাহিত্য রচিত হচ্ছে।
১৫. দারি / ফারসি (Dari / Persian)
প্রধান অঞ্চল: আফগানিস্তান (প্রধান সরকারি ও সাহিত্যিক ভাষা)।
পরিচিতি: দারি মূলত ফারসি ভাষারই আফগান রূপ। ক্লাসিক্যাল ফারসি সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ তীর্থভূমি এই অঞ্চল। জালাল উদ্দিন মুহাম্মদ রুমি, জামি এবং আনসারির মতো বিশ্বখ্যাত সুফী কবি ও দার্শনিকদের কর্মস্থল ও জন্মভূমি ছিল বর্তমান আফগানিস্তানের বিস্তীর্ণ অঞ্চল। আধুনিক আফগান কথাসাহিত্যেও এই ভাষার প্রভাব অসীম।
১৬. সিন্ধি (Sindhi)
প্রধান অঞ্চল: পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশ এবং ভারতের কিছু অঞ্চল।
পরিচিতি: উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন ও সমৃদ্ধ সাহিত্যিক ভাষা। শাহ আব্দুল লতিফ ভিট্টাই-এর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ ‘শাহ জো রিসালো’ সিন্ধি সাহিত্যের বাইবেল হিসেবে গণ্য করা হয়। তাঁর কবিতা ও মরমী সুফী গান সিন্ধি সংস্কৃতিকে বিশ্বজুড়ে এক অনন্য পরিচিতি দিয়েছে।
১৭. সিংহলি (Sinhala)
প্রধান অঞ্চল: শ্রীলঙ্কা (প্রধান সরকারি ভাষা)।
পরিচিতি: দুই হাজার বছরেরও বেশি পুরোনো এই ভাষার সাহিত্যিক ঐতিহ্য মূলত বৌদ্ধ দর্শন ও পালি সাহিত্য দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত। প্রাচীন রাজকীয় খোদাই এবং কাব্যগ্রন্থ থেকে শুরু করে আধুনিক যুগের মার্টিন বিক্রমাসিংহের মতো প্রখ্যাত ঔপন্যাসিকদের হাত ধরে সিংহলি কথাসাহিত্য একটি শক্তিশালী আধুনিক রূপ লাভ করেছে।
১৮. নেপালি (Nepali)
প্রধান অঞ্চল: নেপাল (সরকারি ভাষা) এবং ভারতের সিকিম ও দার্জিলিং অঞ্চল।
পরিচিতি: ভানুভক্ত আচার্যকে নেপালি সাহিত্যের ‘আদিকবি’ বলা হয়, যিনি রামায়ণকে নেপালি ভাষায় অনুবাদ করে এই সাহিত্যের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। পরবর্তীতে ‘মহাকবি’ লক্ষ্মীপ্রসাদ দেবকোটা এবং আধুনিক যুগের লেখকদের হাত ধরে নেপালি কবিতা ও কথাসাহিত্য অত্যন্ত শক্তিশালী ও বাস্তবমুখী হয়ে উঠেছে।
১৯. জোংখা (Dzongkha)
প্রধান অঞ্চল: ভুটান (সরকারি ভাষা)।
পরিচিতি: ভুটানের এই জাতীয় ভাষার সাহিত্য মূলত তিব্বতি বৌদ্ধধর্ম, আধ্যাত্মিকতা, লোকগাথা এবং হিমালয় অঞ্চলের রাজা ও সাধুদের জীবনী (নামথার) কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। ঐতিহ্যগতভাবে ধর্মীয় স্ক্রিপ্ট বা পুঁথিনির্ভর হলেও বর্তমানে এই ভাষায় আধুনিক ছোটগল্প ও কবিতা লেখা শুরু হয়েছে।
২০. দিভেহী (Dhivehi)
প্রধান অঞ্চল: মালদ্বীপ (সরকারি ভাষা)।
পরিচিতি: ইন্দো-আর্য ধারার এই ভাষাটির নিজস্ব লিপি রয়েছে, যা ‘তানা’ (Thaana) নামে পরিচিত। প্রাচীনকালে তাম্রশাসনে (লোমাফানু) এই ভাষার আদি নিদর্শন পাওয়া যায়। মালদ্বীপের লোকগাথা, সামুদ্রিক জীবন এবং ঐতিহ্যবাহী কবিতা (রাঈভ) এই ভাষার সাহিত্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য।
২১. বেলুচি (Balochi)
প্রধান অঞ্চল: পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশ, ইরান ও আফগানিস্তানের কিছু অংশ।
পরিচিতি: বেলুচি সাহিত্য মূলত মৌখিক বীরত্বগাথা, যুদ্ধকাব্য এবং রোমান্টিক লোককাহিনীর ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। বিংশ শতাব্দীতে এসে এই ভাষায় লিখিত সাহিত্যের প্রসার ঘটে এবং সায়েদ জহুর শাহ হাশমি ও আতা শাদের মতো কবিদের হাত ধরে বেলুচি কবিতা ও গদ্য আধুনিক রূপ লাভ করে।
২২. কাশ্মীরি (Kashmiri)
প্রধান অঞ্চল: জম্মু ও কাশ্মীর অঞ্চল (ভারত ও পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত)।
পরিচিতি: চৌদ্দ শতকের মহান নারী সুফী সাধিকা লালদেদ (লল্লেশ্বরী) এবং নুন্দ রেশির হাত ধরে কাশ্মীরি সাহিত্যের স্বর্ণযুগ শুরু হয়। তাঁদের আধ্যাত্মিক পঙক্তিগুলো (বাখ ও শ্রুক) কাশ্মীরি সংস্কৃতির মূল ভিত্তি। আধুনিক যুগে গোলাম আহমদ মাহজুর এবং রহমান রাহীর মতো কবিরা এই সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন।
২৩. মৈথিলি (Maithili)
প্রধান অঞ্চল: ভারতের বিহার রাজ্যের পূর্বাঞ্চল (মিথিলা অঞ্চল) এবং নেপালের তরাই অঞ্চল।
পরিচিতি: মৈথিলি সাহিত্যের ইতিহাস প্রায় হাজার বছরের পুরোনো। চতুর্দশ শতাব্দীর বিখ্যাত কবি বিদ্যাপতি (যাঁকে ‘মৈথিল কোকিল’ বলা হয়) রাধাকৃষ্ণের প্রেম নিয়ে যে পদাবলী রচনা করেছিলেন, তা মৈথিলি তো বটেই, বৈষ্ণব সাহিত্যের মাধ্যমে বাংলা ও ওড়িয়া সাহিত্যকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। এই ভাষার নিজস্ব লিপি রয়েছে যা ‘তিরহুতা’ বা ‘মিথিলাক্ষর’ নামে পরিচিত। বর্তমানে মৈথিলি ভারতের একটি অন্যতম সাংবিধানিক ভাষা এবং এতে নিয়মিত আধুনিক কথাসাহিত্য ও কবিতা রচিত হচ্ছে।
২৪. কোঙ্কানি (Konkani)
প্রধান অঞ্চল: ভারতের গোয়া, মহারাষ্ট্রের দক্ষিণ উপকূল এবং কর্ণাটকের কিছু অংশ।
পরিচিতি: কোঙ্কানি একটি অত্যন্ত অনন্য ভাষা, যা দেবনাগরী, রোমান (ক্যাথলিকদের মধ্যে) এবং কন্নড়—এই তিন লিপিতেই লেখা হয়। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে সন্ত নামদেবের সমসাময়িক কবিদের হাত ধরে এর সাহিত্যিক যাত্রা শুরু। গোয়ার লোকসংস্কৃতি, সমুদ্র উপকূলের জীবন এবং পর্তুগিজ উপনিবেশের প্রভাব কোঙ্কানি সাহিত্যে স্পষ্ট। ভারতের সর্বোচ্চ সাহিত্য পুরস্কার ‘জ্ঞানপীঠ’ বিজয়ী রবীন্দ্র কেলকর ও দামোদর মৌজো কোঙ্কানি কথাসাহিত্যকে বিশ্বমঞ্চে পরিচিত করেছেন।
২৫. সাঁওতালি (Santali)
প্রধান অঞ্চল: ভারতের ঝাড়খণ্ড, ওড়িশা, পশ্চিমবঙ্গ, বিহার এবং বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল (রাজশাহী ও রংপুর বিভাগ)।
পরিচিতি: সাঁওতালি মূলত অস্ট্রো-এশিয়াটিক ভাষা গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত একটি অত্যন্ত সমৃদ্ধ আদিবাসী ভাষা। ঐতিহাসিকভাবে এর সাহিত্য ছিল সম্পূর্ণ মৌখিক—যা লোকগাথা, গান এবং রূপকথার মাধ্যমে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে টিকে ছিল। ১৯৯২ সালে পন্ডিত রঘুনাথ মুর্মু এই ভাষার জন্য ‘অল চিকি’ (Ol Chiki) লিপি আবিষ্কার করার পর সাঁওতালি লিখিত সাহিত্যে এক অভূতপূর্ব জোয়ার আসে। প্রকৃতি প্রেম, সাঁওতাল বিদ্রোহের (১৮৫৫) বীরত্বগাথা এবং আধুনিক জীবনের সংকট এই সাহিত্যের মূল উপজীব্য।
২৬. নেওয়ারি / নেপাল ভাষা (Newari / Nepal Bhasa)
প্রধান অঞ্চল: নেপালের কাঠমান্ডু উপত্যকা।
পরিচিতি: নেওয়ারি বা ‘নেপাল ভাষা’ (যা নেপালি ভাষা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা এবং তিব্বতি-বর্মন গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত) নেপালের প্রাচীনতম সাহিত্যের ভাষা। চতুর্দশ শতাব্দীর মল্ল রাজাদের আমলে এই ভাষার লিখিত সাহিত্যের স্বর্ণযুগ ছিল। বৌদ্ধ ও হিন্দু দর্শনের মেলবন্ধন, প্রাচীন নাটক, এবং ঐতিহ্যবাহী ‘খায়াহ’ (গল্প বলার ঐতিহ্য) এই ভাষার মূল ভিত্তি। বিংশ শতাব্দীতে ‘মহাকবি’ সিদ্ধিদাস মহাজুর এবং ‘চিত্তধর হৃদয়’-এর হাত ধরে নেওয়ারি কবিতা ও আধুনিক গদ্য এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছায়।
২৭. রাজস্থানি (Rajasthani)
প্রধান অঞ্চল: ভারতের রাজস্থান রাজ্য এবং পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশের কিছু অংশ।
পরিচিতি: রাজস্থানি সাহিত্যের ইতিহাস বীরত্ব এবং রোমান্টিকতায় ভরপুর। মধ্যযুগের চারণ কবিদের লেখা ‘ডিঙ্গল’ ও ‘পিঙ্গল’ ধারার কাব্য, ডালহী-র বিখ্যাত প্রেমগাথা ‘ঢোলা মারু রা দুহা’ এবং মীরা বাঈয়ের ভক্তিগীতি রাজস্থানি সংস্কৃতির প্রাণ। যদিও এটি ভারতের সংবিধানে এখনো সরকারি ভাষার মর্যাদা পায়নি, তবুও ‘সাহিত্য অকাদেমি’ এই ভাষার সাহিত্যিক সমৃদ্ধির স্বীকৃতি দিয়েছে এবং এখানে অত্যন্ত শক্তিশালী আধুনিক গল্প ও নাটক লেখা হচ্ছে।
২৮. টুলু (Tulu)
প্রধান অঞ্চল: ভারতের কর্ণাটক রাজ্যের দক্ষিণ অংশ (দক্ষিণ কন্নড় ও উড়ুপি) এবং কেরালার কাসারগোড অঞ্চল, যা যৌথভাবে ‘টুলুনাডু’ নামে পরিচিত।
পরিচিতি: দ্রাবিড় ভাষা গোষ্ঠীর অন্যতম প্রাচীন ভাষা টুলু। পঞ্চদশ শতাব্দীতে রচিত ‘টুলু মহাভারত’ (অরুণাব্জ কর্তৃক লিখিত) এই ভাষার প্রাচীন লিখিত সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন। তবে এই ভাষার মূল শক্তি লুকিয়ে আছে এর বিপুল মৌখিক সাহিত্যে, বিশেষ করে ‘পদ্দন’ (Paddanas) নামক বীরত্বগাথা ও লোকগীতিতে, যা ওঝাপালি বা ‘ভূতা কোলা’ (ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় নৃত্য) উৎসবের সময় গাওয়া হয়। বর্তমানে কন্নড় ও দেবনাগরী লিপি ব্যবহার করে এই ভাষায় আধুনিক কবিতা ও নাটক বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
২৯. খাসি (Khasi)
প্রধান অঞ্চল: ভারতের মেঘালয় রাজ্য এবং বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চলের কিছু অংশ।
পরিচিতি: অস্ট্রো-এশিয়াটিক ভাষা পরিবারের এই ভাষাটির সাহিত্য একটা দীর্ঘ সময় পর্যন্ত সম্পূর্ণ মৌখিক ছিল। খাসি উপজাতিদের সমাজব্যবস্থা, পাহাড়ের প্রকৃতি, ধর্মীয় বিশ্বাস এবং পূর্বপুরুষদের বীরত্বের গল্প লোকগাথার (Kañiatskhur) মাধ্যমে টিকে ছিল। ঊনবিংশ শতাব্দীতে খাসি সাহিত্যের লিখিত রূপের সূচনা হয় রোমান লিপি ব্যবহারের মাধ্যমে। উ জেবন্ রায় (U Jeebon Roy)-কে খাসি লিখিত সাহিত্যের জনক বলা হয়। তাঁর এবং পরবর্তীতে উ সোসথাম মহাজনের হাত ধরে খাসি কবিতা ও প্রবন্ধ এক অনন্য আধুনিক রূপ লাভ করে।
৩০. বোড়ো / বড়ো (Bodo)
প্রধান অঞ্চল: ভারতের আসামের বোড়োল্যান্ড অঞ্চল।
পরিচিতi: তিব্বতি-বর্মন ভাষা গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত বোড়ো ভাষা বর্তমানে ভারতের অন্যতম সাংবিধানিক ভাষা। অতীতে এই ভাষাটি বিভিন্ন লিপিতে লেখা হলেও বর্তমানে দেবনাগরী লিপিতে এর সাহিত্য চর্চা হয়। ১৯৫২ সালে ‘বোড়ো সাহিত্য সভা’ (Bodo Sahitya Sabha) প্রতিষ্ঠার পর এই ভাষার আধুনিক সাহিত্যে এক যুগান্তকারী বিপ্লব ঘটে। আসামের সমাজবাস্তবতা, নিজেদের রাজনৈতিক অধিকারের সংগ্রাম এবং নিজস্ব লোকসংস্কৃতি এই ভাষার কথাসাহিত্য ও কবিতার মূল উপজীব্য।
৩১. ডোগরি (Dogri)
প্রধান অঞ্চল: ভারতের জম্মু ও কাশ্মীর কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল, হিমাচল প্রদেশ এবং পাঞ্জাবের উত্তরাঞ্চল।
পরিচিতি: ইন্দো-আর্য ধারার এই ভাষাটি অতীতে ‘টাকরি’ লিপিতে লেখা হলেও বর্তমানে দেবনাগরী লিপিতে চর্চা করা হয়। ডোগরি সাহিত্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর সুরময় লোকগীতি, যা ‘কারাক’ এবং ‘বারান’ (বীরত্বগাথা) নামে পরিচিত। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে ডিনো ভাই পান্ত-এর বিপ্লবী কবিতার মাধ্যমে আধুনিক ডোগরি সাহিত্যের প্রাতিষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। ২০০৩ সালে এটি ভারতের রাষ্ট্রীয় সাংবিধানিক ভাষার মর্যাদা লাভ করে এবং বর্তমানে এই ভাষায় অত্যন্ত মার্জিত ছোটগল্প ও উপন্যাস লেখা হচ্ছে।
৩২. ভোজপুরি (Bhojpuri)
প্রধান অঞ্চল: ভারতের বিহারের পশ্চিমাঞ্চল, উত্তর প্রদেশের পূর্বাঞ্চল (পূর্বাঞ্চল) এবং নেপালের তরাই অঞ্চল। (এছাড়া মরিশাস, সুরিনাম ও ফিজি-র প্রবাসী ভারতীয়দের মাঝে)।
পরিচিতি: ভোজপুরি সাহিত্যের ইতিহাস অত্যন্ত প্রাচীন হলেও এর আধুনিক লিখিত রূপের ভিত্তি গড়েন ভিখারী ঠাকুর, যাঁকে ‘ভোজপুরির শেকসপিয়র’ বলা হয়। তাঁর লেখা লোকনাট্য ‘বিদেশিয়া’ (Bideshiya) তৎকালীন গ্রামীণ সমাজ, অভিবাসন এবং নারীদের বিরহবেদনার এক অমর দলিল। যদিও এটি ভারতের সংবিধানে এখনো আলাদা ভাষার মর্যাদা পায়নি (হিন্দির উপভাষা হিসেবে গণ্য করা হয়), তবুও ভোজপুরি ভাষায় লোকগাথা, মরমী গান এবং সমসাময়িক রাজনৈতিক-সামাজিক কবিতা চর্চা ব্যাপক শক্তিশালী।