সাদাত হাসান মান্টো : ইতিহাসের এক রক্তাক্ত আয়না । অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

আল্লাহ সাদাত হাসান মান্টোকে আয়ু দিয়েছিলেন মাত্র ৪২ বছর, ৮ মাস এবং ৭ দিন। সেই সামান্য সময়ে মান্টো আমাদের জন্য রেখে গেছেন এমন অসংখ্য গল্প, এমন অসংখ্য চরিত্র, যাদের আয়ু শতাব্দী পেরিয়ে যাবে। চরম বদরাগী, চরম উদাসীন, অদ্ভুত একরোখা আর আত্মধ্বংসী স্বভাবের একজন মানুষ ছিলেন তিনি—যাঁকে দূর থেকে চেনা যায়, কিন্তু সাধারণ কোনো নিক্তিতে মেপে ভালোবাসা প্রায় অসম্ভব। সেই অদম্য, অপ্রতিরোধ্য মান্টো! সত্যি বলতে, তাঁর মতো এক মহীরুহকে নিয়ে দু-কলম লেখার যোগ্যতা বা স্পর্ধা আমার নেই।

কিন্তু ‘হাতক’ (Hathak) কিংবা ‘টোবা টেক সিং’ (Toba Tek Singh)-এর মতো গল্পগুলো যদি আপনার জীবনের কোনো এক বিষণ্ণ বিকেলে আপনি ভুল করেও একবার পড়ে ফেলেন, তবে মান্টোর প্রতি এক গভীর, অবাধ্য কৃতজ্ঞতা আপনার মনে জন্ম নিতে বাধ্য। সমাজের যে নগ্ন রূপ, যে তীব্র হাহাকার আর দেশভাগের যে আদিম নৃশংসতা তিনি কলমের ডগায় তুলে এনেছেন, তা পড়ার পর আপনি আর আগের মানুষটি থাকবেন না। তখন মান্টোর জন্মদিন হোক, মৃত্যুদিন হোক কিংবা অন্য যেকোনো সাধারণ সময়ে—হঠাৎ করেই অবচেতন মনে এই অদ্ভুত মানুষটার কথা ভেসে উঠবে, আর বুক চিরে এক ধরণের অস্ফুট কৃতজ্ঞতা চলে আসবে।

পরশু দিন, অর্থাৎ ১১ মে মান্টোর জন্মদিন। ভাবলাম, এই খ্যাপাটে জাদুকরের প্রতি নিজের ভেতরের সেই অবদমিত ঋণ স্বীকার করতেই—একটু চেষ্টা করে দেখি না, তাঁর স্মরণে কিছু লেখা যায় কিনা!

সাদাত হাসান মান্টো
সাদাত হাসান মান্টো

“Zamaane ke jis daur se hum is waqt guzar rahe hain agar aap isse naawaaqif hain to mere afsaane paḍhiye. Agar aap in afsaanon ko bardaasht nahi kar sakte to iska matlab hai ki ye zamaana naaqaabil-e-bardaasht hai…

Mujh mein jo buraaiyaan hain, wo is ahd ki buraaiyaan hain… Mere tahreer mein koi naqs nahi. Jis naqs ko mere naam se mansoob kiya jaata hai, dar-asl maujooda nizaam ka naqs hai.”

উর্দু সাহিত্যের রাজপুত্র সাদাত হোসেন মান্টোর এই অবিনাশী কথাগুলোর বাংলা তর্জমা করলে দাঁড়ায়—“আমরা এখন সময়ের যে যুগটার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, আপনারা যদি সেই সময়টা সম্পর্কে না জানেন, তবে আমার গল্পগুলো পড়ুন। আর আপনারা যদি আমার এই গল্পগুলো সহ্য করতে না পারেন, তবে তার মানে হলো এই সময়টাই আসলে সহ্য করার অযোগ্য…

আমার ভেতরে যে মন্দের প্রকাশ ঘটে, তা আসলে এই যুগেরই মন্দ দিক… আমার লেখায় কোনো ত্রুটি নেই। যে ত্রুটি বা খুঁতকে আমার নামের সাথে জুড়ে দেওয়া হয়, তা আসলে এই বর্তমান ঘুণে ধরা ব্যবস্থার ত্রুটি।”

আজ থেকে বহু বছর আগে বুক ফুলিয়ে সমাজকে এই চরম সত্যিটা বলে দিতে পেরেছিলেন একজনই—তিনি সাদাত হোসেন মান্টো। যিনি সমাজকে কোনো রকম মেকি ভদ্রতা বা কৃত্রিম চাদরে ঢেকে দেখতেন না। সমাজ যেমন—ঠিক ততটাই নগ্ন, ততটাই নিষ্ঠুর আর ততটাই বাস্তব রূপ তিনি তাঁর কলমের ডগায় তুলে আনতেন। আর এই কারণেই জীবদ্দশায় তাঁকে বারবার কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়েছে, সইতে হয়েছে তীব্র অপমান আর দারিদ্র্য। কিন্তু মান্টো তাঁর মকসো করা ধারালো কলমকে কখনো থামতে দেননি।

মান্টোর ছেলেবেলা

আমাদের চেনা সাহিত্যিকদের একটা চিরন্তন ভাবমূর্তি থাকে—তাঁরা শান্ত, ভাবুক, হয়তো কিছুটা অন্তর্মুখী। কিন্তু মান্টো ছিলেন এই চেনা ছকের একদম বাইরে। তিনি ছিলেন খামখেয়ালী, জেদি, কিছুটা অহংকারী, আবার একই সাথে প্রচণ্ড সংবেদনশীল এক মননের অধিকারী। ১৯১২ সালের ১১ মে অবিভক্ত ভারতের পাঞ্জাবের লুধিয়ানার এক মধ্যবিত্ত পরিবারে তাঁর জন্ম। কাশ্মীরি ব্রাহ্মণ বংশোদ্ভূত এই তরুণের শুরুটা কিন্তু খুব একটা চকমকে ছিল না। পড়াশোনায় মন বসত না, এন্ট্রান্স পরীক্ষায় পরপর তিনবার ফেল করেছিলেন! এমনকি যে উর্দু ভাষায় লিখে তিনি পরবর্তীতে গোটা উপমহাদেশ কাঁপিয়ে দিলেন, সেই উর্দু ভাষার পরীক্ষাতেই তিনি একবার ফেল করেছিলেন।

আসলে স্কুলের চার দেওয়ালে আটকে থাকা ব্যাকরণ মান্টোর জন্য ছিল না। তিনি পড়তে ভালোবাসতেন জীবনকে। রাশিয়ার ভিক্টর হুগো, অস্কার ওয়াইল্ড, কিংবা ম্যাক্সিম গোর্কির অনুবাদ পড়তে পড়তে তরুণ মান্টোর চোখের সামনে খুলে যায় এক নতুন পৃথিবী। তিনি বুঝতে পারেন, সাহিত্যের কাজ মানুষকে স্রেফ কল্পনার রাজ্যে ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়া নয়; সাহিত্যের আসল কাজ হলো মানুষের মনের ভেতরের অন্ধকার গলিগুলোকে আলো এনে দেখানো।

নানা রঙের দিনগুলো

মান্টোর জীবনের সবচেয়ে রঙিন আর রোমাঞ্চকর অধ্যায়টি কেটেছিল তৎকালীন বোম্বাই (বর্তমান মুম্বাই) শহরে। ১৯৩০ ও ৪০-এর দশকে বোম্বাই ছিল এক মায়ানগরী। মান্টো সেখানে এসেছিলেন ভাগ্য অন্বেষণে। সিনেমার চিত্রনাট্য লেখা, সাংবাদিকতা আর চলচ্চিত্র ম্যাগাজিনের সম্পাদনা করতে করতে তিনি মিশে যান বোম্বাইয়ের রন্ধ্রে রন্ধ্রে।

মান্টো বোম্বাইকে ভালোবেসে ফেলেছিলেন পাগলের মতো। তবে তিনি সিনেমার নায়কদের গ্ল্যামার দেখে মুগ্ধ হননি। তাঁর নজর কেড়েছিল বোম্বাইয়ের ফুটপাতে ঘুমিয়ে থাকা মানুষগুলো, বস্তির অন্ধকার ঘরের কান্না, আর ডন বা পতিতালয়ের যৌনকর্মীদের যাপিত জীবন। মান্টো খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন, কীভাবে এই তথাকথিত ‘খারাপ’ মানুষগুলোর ভেতরেও এক টুকরো নিখাদ মানবিকতা লুকিয়ে থাকে। তাঁর বিখ্যাত গল্প ‘সুলতানা’ কিংবা ‘মম্মি’—এর সব কটিই ছিল বোম্বাইয়ের এই অন্ধকার জগতের রক্ত-মাংসের চরিত্রদের নিয়ে লেখা। বোম্বাই মান্টোকে দুহাত ভরে দিয়েছিল—অর্থ, খ্যাতি এবং একঝাঁক বন্ধু, যাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক ইসমত চুগতাই এবং অভিনেতা অশোক কুমার।

কিন্তু মানুষের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময়টা যে কত দ্রুত ঝড়ের মুখে পড়তে পারে, তা মান্টো টের পেলেন ১৯৪৭ সালে।

দেশভাগ: চিরস্থায়ী ক্ষত

১৯৪৭ সালের আগস্ট মাস। ভারত ও পাকিস্তান নামক দুটি আলাদা রাষ্ট্রের জন্ম হলো। কিন্তু এই জন্মটা কোনো আনন্দের ছিল না, এটা ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এবং রক্তাক্ত এক ট্র্যাজেডি। রাতারাতি বন্ধু বদলে গেল শত্রুতে, চেনা প্রতিবেশীর হাতে উঠে এল ধারালো ছুরি। দাঙ্গা, খুন আর ধর্ষণের এক নারকীয় উৎসব শুরু হলো গোটা উপমহাদেশ জুড়ে।

মান্টো ছিলেন মুসলিম, কিন্তু তাঁর মনটা ছিল খাঁটি বোম্বাইয়ের কাঁচের মতো। যখন বোম্বাইয়ের স্টুডিওগুলোতেও ধর্মীয় মেরুকরণের বিষাক্ত হাওয়া ঢুকতে শুরু করল, তখন নিজের প্রাণের সুরক্ষার কথা ভেবে এবং পরিবারের চাপে পড়ে ভারী মন নিয়ে তিনি বোম্বাই ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি চলে যান নবগঠিত পাকিস্তানের লাহোর শহরে।

এই দেশভাগ মান্টোকে মানসিকভাবে একদম ভেঙে চুরমার করে দিয়েছিল। তিনি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছিলেন না—কীভাবে একটি কাল্পনিক সীমান্ত রেখা রাতারাতি মানুষের ভেতরের পশুত্বকে জাগিয়ে তুলতে পারে। লাহোরে গিয়ে মান্টো বেশ কিছুদিন কিছুই লিখতে পারেননি। তিনি স্রেফ স্তব্ধ হয়ে বসে থাকতেন। আর এই স্তব্ধতা ভেঙেই পরবর্তীতে তাঁর কলম থেকে বেরিয়ে আসে এমন কিছু গল্প, যা বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে এক একটা পারমাণবিক বোমা হয়েছিল।

লাহোরের একাকীত্ব এবং ‘আদিম অন্ধকার’ থেকে গল্পের জন্ম

পাকিস্তানের লাহোরে মান্টোর জীবন একেবারে বদলে গেল। চেনা পুরো পৃথিবীটাই রাতারাতি যেন অচেনা হয়ে গিয়েছিল। চারিপাশে কেবল শরণার্থী শিবিরের কান্না, দাঙ্গার দগদগে ক্ষত আর সীমাহীন অনিশ্চয়তা। মান্টো লাহোরের লক্ষ্মী ম্যানশনের একটি ফ্ল্যাটে এসে উঠলেন। দীর্ঘদিনের চেনা বোম্বাই (মুম্বাই) হারানোর তীব্র বেদনা এবং চারপাশের এই বীভৎসতা তাঁকে এতটাই স্তব্ধ করে দিয়েছিল যে, অনেক চেষ্টা করেও শুরুতে তিনি কিছুই লিখতে পারছিলেন না।

কিন্তু একজন সত্যিকারের লেখকের ভেতরের যে ছটফটানি, তা তো আর বেশিদিন চেপে রাখা যায় না। এরপর সেই স্তব্ধতা যখন ভাঙল, তখন তাঁর কলম দিয়ে যেন কালির বদলে রক্ত ঝরতে শুরু করল। তিনি অনুভবের এমন এক ‘আদিম অন্ধকারে’ ডুব দিলেন, যেখান থেকে উঠে এল বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কিছু রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক গল্প। মান্টো চাননি দেশভাগের এই নরকগুলজারকে কোনো রোমান্টিক রূপ দিতে; বরং তিনি চেয়েছিলেন দাঙ্গাবাজদের আসল হিংস্র চেহারাটা সমাজের সামনে নগ্ন করে দিতে এবং স্বাধীনতা নামের নিষ্ঠুর প্রতারণাকে ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে।

মান্টোর গল্প: অসহ্য সমাজের চেহারা

লাহোরে বসেই মান্টো একে একে লিখলেন ‘ঠান্ডা গোশত’ (Cold Meat), ‘খোলা দো’ (Open It), ‘কালী সালোয়ার’ (The Black Silwar), ‘ধুঁয়া’ (Smoke) এবং ‘টোবা টেক সিং’-এর মতো গল্প। এই গল্পগুলোর অপরাধে মান্টোকে বারবার ‘অশ্লীলতার’ দায়ে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়েছিল।

‘ঠান্ডা গোশত’ (Thanda Gosht):

এই গল্পে মান্টো দেখালেন ঈশ্বর সিং নামের এক দাঙ্গাবাজ শিখ যুবকের গল্প। যে দাঙ্গার আগুনে মেতে উঠে এক মুসলিম তরুণীকে অপহরণ করে তাকে ধর্ষণ করতে যায়। কিন্তু ধর্ষণের মুহূর্তে সে আবিষ্কার করে তরুণীটি আসলে ইতিমধ্যে মারা গেছে—সেটি স্রেফ একটি লাশ। এই চরম সত্যের মুখোমুখি হয়ে ঈশ্বর সিং মানসিকভাবে সম্পূর্ণ নপুংসক হয়ে পড়ে। মান্টো এই গল্পের মাধ্যমে বোঝাতে চাইলেন, দাঙ্গার উন্মাদনা মানুষের ভেতরের মানবিকতা ও পুরুষত্বকে কীভাবে এক নিমেষে ‘ঠান্ডা মাংসে’ পরিণত করে।

‘খোলা দো’ (Khol Do):

দেশভাগের সময় ঘটে যাওয়া অগণিত নারী নির্যাতনের এক চরম ও নৃশংস দলিল এই গল্প। এক বৃদ্ধ পিতা দাঙ্গার মাঝে হারিয়ে যাওয়া তাঁর যুবতী মেয়ে সকিনাকে হন্যে হয়ে খুঁজছেন। একদল স্বেচ্ছাসেবক যুবক মেয়েটিকে উদ্ধার করার দায়িত্ব নেয়। কিন্তু সকিনাকে উদ্ধার করার পর সেই যুবকেরাই তাকে বারবার গণধর্ষণ করে অচৈতন্য অবস্থায় এক ক্যাম্পে ফেলে রেখে যায়। ডাক্তার যখন ঘরে এসে সকিনাকে পরীক্ষা করতে বলেন এবং বলেন ‘জানালাটা খুলে দাও’ (খোল দো), তখন অচৈতন্য সকিনা কেবল ‘খোল দো’ শব্দটি শুনেই যান্ত্রিকভাবে নিজের সালোয়ারের ফিতে আলগা করে দেয়। পিতা খুশিতে চিৎকার করে ওঠেন, “আমার মেয়ে বেঁচে আছে!” আর ডাক্তার কপালে ঘাম মুছে জানালার দিকে তাকান।

‘কালী সালোয়ার’ (Kali Salwar):

মান্টোর এই গল্পটি কোনো দাঙ্গার নয়, এটি ছিল সমাজের চোখে পতিতা বা যৌনকর্মী সুলতানার মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ের গল্প। আম্বালা থেকে দিল্লিতে চলে আসা সুলতানা চরম অর্থকষ্টে ভুগছে। মহররমের উৎসব ঘনিয়ে আসছে, কিন্তু একটি কালো সালোয়ার (পোশাক) কেনার মতো টাকাও তার কাছে নেই। তখন শঙ্কর নামের এক অদ্ভুত যুবকের সাথে তার পরিচয় হয়, যে কোনো টাকা ছাড়াই সুলতানার মনস্তত্ত্ব বোঝে। মহররমের সকালে সুলতানা আবিষ্কার করে, শঙ্কর তার জন্য সেই আকাঙ্ক্ষিত কালো সালোয়ারটি রেখে গেছে; কিন্তু বিনিময়ে শঙ্কর সুলতানার একমাত্র শেষ সম্বল—তার সাধের সোনার দুলজোড়া নিয়ে গেছে।

‘ধুঁয়া’ (Dhuand):

এটি মান্টোর আরেকটি গল্প যা তৎকালীন সমাজকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল এবং অশ্লীলতার মামলার মুখোমুখি হয়েছিল। গল্পটি কিশোর বয়সের অবদমিত এবং কৌতূহলী যৌন মনস্তত্ত্ব নিয়ে। মাসুদ নামের এক কিশোরের বড় হয়ে ওঠার ট্রানজিশন পিরিয়ড বা বয়ঃসন্ধিকালের এক অদ্ভুত মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন এখানে উঠে এসেছে। এক তীব্র শীতের রাতে লেপের তলার উষ্ণতা আর ঘরের ভেতরের ধোঁয়াটে আবহের মধ্য দিয়ে মান্টো দেখিয়েছেন, কাম এবং অবদমিত আকাঙ্ক্ষা কীভাবে কিশোর মনে এক কুয়াশা তৈরি করে। সমাজ যে শরীর ও মনস্তত্ত্বকে পাপ বলে লুকিয়ে রাখতে চেয়েছিল, মান্টো সেখানে আলো জ্বালিয়ে দিয়েছিলেন।

‘মোযেল’ (Mozil):

১৯ ৪৭ সালের মুম্বাই (তৎকালীন বোম্বে) দাঙ্গার প্রেক্ষাপটে লেখা এক অনবদ্য গল্প। মোযেল ছিল এক স্বাধীনচেতা, খ্যাপাটে এবং চঞ্চল ইহুদি তরুণী। সে কোনো ধর্মীয় বা সামাজিক নিয়মের তোয়াক্কা করত না। কিন্তু দাঙ্গার সময় নিজের প্রাক্তন শিখ প্রেমিক তরলোচন এবং তার হবু মুসলিম স্ত্রীকে বাঁচাতে মোযেল নিজের জীবন বাজি রাখে। দাঙ্গাবাজদের হাত থেকে তরলোচনের হবু স্ত্রীকে বাঁচাতে গিয়ে মোযেল নিজের পোশাক খুলে তাকে পরিয়ে দেয় এবং নিজে সম্পূর্ণ নগ্ন অবস্থায় দাঙ্গাবাজদের সামনে গিয়ে পড়ে। মৃত্যুর শেষ মুহূর্তে যখন তরলোচন তার গায়ে নিজের ধর্মীয় চাদরটি জড়িয়ে দিতে যায়, মোযেল তা লাথি মেরে সরিয়ে দিয়ে বলে, “নিয়ে যাও তোমার এই ধর্মীয় চাদর, এটা এখন আমার কোনো কাজে আসবে না।” মানুষের তৈরি ধর্মের চেয়ে যে মানুষের জীবনের দাম অনেক বেশি—মান্টো তা মোযেলের রক্তের অক্ষরে লিখে গেছেন।

হাতক’ (Hathak):

হাতক অর্থ অপমান বা লাঞ্ছনা। গল্পের মূল চরিত্র ‘সুগন্ধি’—পেশায় একজন যৌনকর্মী বা পতিতা। তবে এই অন্ধকার জগতের বাসিন্দা হওয়া সত্ত্বেও সুগন্ধির ভেতরটা ছিল ভীষণ নরম, মায়া আর ভালোবাসায় ভরপুর। সে তাঁর ঘরে আসা পুরুষদের কেবল খদ্দের ভাবত না, বরং নিজের সমস্ত উজাড় করা মায়া দিয়ে তাদের আপন করে নেওয়ার এক অদ্ভুত ও সহজাত তাড়না অনুভব করত।

গল্পের মূল মোড় ঘোরে এক রাতে, যখন সুগন্ধির দালাল মাধো তাকে এক ধনী শেঠের গাড়িতে নিয়ে যায়। গাড়ির ভেতর অন্ধকারের মাঝে শেঠ লাইট জ্বালিয়ে সুগন্ধির মুখটা দেখে অত্যন্ত অবজ্ঞা আর ঘৃণার সাথে বলে ওঠে—“উঁহু, এ চলবে না!” এবং তাকে প্রত্যাখ্যান করে গাড়ি থেকে নামিয়ে দেয়।

এই একটিমাত্র ঘটনাই ছিল সুগন্ধির জীবনের সবচেয়ে বড় ‘হাতক’ বা অপমান। যে শরীর ও রূপকে পুঁজি করে সে এতকাল বেঁচে ছিল, সমাজের এক তথাকথিত ভদ্রলোকের সামান্য এক অবজ্ঞায় তা মুহূর্তে অর্থহীন হয়ে পড়ে। এই তীব্র অপমান সুগন্ধির ভেতরের এতকালের চেনা জগৎ, ভালোবাসা আর আত্মবিশ্বাসকে এক নিমেষে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয়। ঘরে ফিরে এসে নিজের পোষা কুকুরটিকে বুকে জড়িয়ে ধরে সে যে তীব্র একাকীত্ব আর হাহাকার অনুভব করে, মান্টো তা অত্যন্ত নির্মম কিন্তু সংবেদনশীল ভাষায় ফুটিয়ে তুলেছেন। তথাকথিত ‘নষ্ট’ নারীদেরও যে একটা মন থাকে, তাদেরও যে আত্মসম্মানবোধ আর অপমানের তীব্র আঘাত সইবার সীমানা থাকে—’হাতক’ গল্পে মান্টো তারই এক অসামান্য মনস্তাত্ত্বিক দলিল রেখে গেছেন।

 

‘টোবা টেক সিং’:

দেশভাগ নিয়ে লেখা বিশ্বসাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ গল্পগুলোর তালিকা করলে একদম শীর্ষে থাকবে মান্টোর ‘টোবা টেক সিং’ (Toba Tek Singh)। দেশভাগের কয়েক বছর পর ভারত ও পাকিস্তান সরকার সিদ্ধান্ত নেয় যে তারা লাহোরের মানসিক হাসপাতালের পাগলাটে বন্দিদেরও ধর্ম অনুযায়ী ভাগ করবে। অর্থাৎ, হিন্দু ও শিখ পাগলদের পাঠানো হবে ভারতে, আর মুসলিম পাগলদের রাখা হবে পাকিস্তানে।

এই পাগলদের দলেই ছিলেন বিশেন সিং নামের এক শিখ বৃদ্ধ, যাঁকে সবাই ‘টোবা টেক সিং’ বলে ডাকত—কারণ ওটাই ছিল তাঁর গ্রামের নাম। বিশেন সিং কোনো রাজনৈতিক তত্ত্ব বুঝতেন না, তিনি কেবল জানতে চেয়েছিলেন তাঁর সেই চেনা গ্রাম টোবা টেক সিং এখন কোথায়? ভারতে নাকি পাকিস্তানে? কেউ তাঁকে সঠিক উত্তর দিতে পারেনি।

সিন্ধান্ত অনুযায়ী পাগলদের যখন সীমান্তে নিয়ে গিয়ে ওলটপালট করা হচ্ছে, তখন বিশেন সিং ভারত বা পাকিস্তান—কোনো দিকেই যেতে রাজি হলেন না। তিনি দুই দেশের সীমান্তের মাঝখানের এক টুকরো ‘নো ম্যানস ল্যান্ড’-এ ঠায় দাঁড়িয়ে রইলেন। গল্পের শেষ লাইনে মান্টো লিখলেন—

“সেখানে, কাঁটাতারের পেছনে একপাশে ছিল হিন্দুস্তান, অন্যপাশে পাকিস্তান। আর মাঝখানের জমিতে, যার কোনো নাম ছিল না, সেখানেই উপুড় হয়ে পড়ে রইলেন টোবা টেক সিং।”

বিশেন সিংয়ের এই মৃত্যু আসলে ছিল রাষ্ট্র, রাজনীতি এবং মানচিত্রের গালে এক মস্ত বড় থাপ্পড়। পাগলদের চেয়েও যে এই দুই দেশের তথাকথিত সুস্থ রাজনীতিবিদরা বেশি উন্মাদ, মান্টো সেটাই আঙুল দিয়ে দেখিয়েছিলেন।

কাঠগড়ায় মান্টো: অশ্লীলতার মামলা

সমাজ যখন নিজের আসল চেহারা আয়নায় দেখতে পায়, তখন সে আয়নাটাকে ভেঙে ফেলার চেষ্টা করে। মান্টোর সাথেও ঠিক সেটাই ঘটেছিল। তাঁর এই সত্যনিষ্ঠা আর নগ্ন বাস্তবতাকে সমাজ ও রাষ্ট্র তকমা দিল ‘অশ্লীলতা’ (Obscenity) হিসেবে।

ব্রিটিশ আমল থেকেই মান্টোর লেখার বিরুদ্ধে অশ্লীলতার অভিযোগ আনা হয়েছিল। ভারত এবং পাকিস্তান—দুই দেশ মিলিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে মোট ছয়বার অশ্লীলতার মামলা করা হয়। তিনবার ব্রিটিশ ভারতে (ধুঁয়া, কালি শলওয়ার ও বু ধাঁচের গল্পের জন্য) এবং তিনবার পাকিস্তানে (ঠান্ডা গোশত, খোল দো ও উপর-নীচে-অর-দিল্মিয়ানের জন্য)।

আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েও মান্টো ছিলেন অটল। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বিচারকদের বলেছিলেন—

“যদি আমার গল্পগুলো আপনাদের কাছে অশ্লীল বা নোংরা মনে হয়, তবে সমাজকে গিয়ে পরিষ্কার করুন। আমার কাজ সমাজকে নোংরা করা নয়, আমি কেবল সমাজের নোংরা দিকগুলোকে সবার সামনে তুলে ধরি।”

যদিও কোনো মামলাতেই মান্টোকে শেষ পর্যন্ত দীর্ঘ কারাদণ্ড দেওয়া যায়নি (বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই জরিমানা দিয়ে তিনি খালাস পেয়েছিলেন), কিন্তু আদালতের এই চক্কর, পুলিশের হয়রানি এবং সমাজের তথাকথিত সুশীল সমাজের বয়কট মান্টোকে মানসিকভাবে একদম পঙ্গু করে দিয়েছিল। নিজের চেনা প্রগতিশীল লেখক সংঘও (Progressive Writers’ Association) একসময় মান্টোর পাশ থেকে সরে দাঁড়ায়, যা তাঁকে তীব্র একাকীত্বের দিকে ঠেলে দেয়।

 

লাহোরের শেষ দিনগুলো: চরম অভাব আর নিঃসঙ্গতা

জীবনের শেষ দিনগুলোতে লাহোর শহরটি মান্টোর জন্য কোনো আশ্রয় হয়ে উঠতে পারেনি, বরং তা হয়ে উঠেছিল এক জীবন্ত নরক। একদিকে একের পর এক আদালতের মামলা, সুশীল সমাজের কটূক্তি, অন্যদিকে চরম অর্থনৈতিক অনটন—সব মিলিয়ে মান্টো ক্রমশ এক গভীর অন্ধকারের দিকে তলিয়ে যাচ্ছিলেন। পাকিস্তানে আসার পর সিনেমার স্ক্রিপ্ট লিখে অর্থ উপার্জনের যে চেনা পথটি বোম্বাইতে ছিল, তা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। নতুন এই দেশের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি তখনো দাঁড়ায়নি, আর পত্রপত্রিকাগুলো মান্টোর গল্প ছাপতে ভয় পেত।

সংসারে স্ত্রী সাফিয়া আর তিন কন্যাসন্তান। তাঁদের মুখে দুবেলা অন্ন তুলে দেওয়ার মতো সামর্থ্যও একসময় হারিয়ে ফেলেন এই স্বাধীনচেতা লেখক। অবস্থা এতটাই বেগতিক ছিল যে, মাত্র কয়েকটা টাকার জন্য মান্টোকে নিউজপ্রিন্ট কাগজের টুকরো হাতে নিয়ে খবরের কাগজের অফিসে অফিসে ঘুরতে হতো। টেবিলে বসে সঙ্গে সঙ্গে একটা গল্প লিখে দিয়ে সামান্য কিছু টাকা নিতেন, যা দিয়ে সেদিনের বাজারের খরচ আর তাঁর নিজের মদের বোতলের দাম চুকত। এই চরম অপমান আর অভাব মান্টোর অহংকারী ও সংবেদনশীল মন কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছিল না।

মদের নেশা এবং লিভার সিরোসিসের গ্রাস

মানসিকভাবে পঙ্গু এবং চারপাশের মানুষের ভণ্ডামিতে বিরক্ত হয়ে মান্টো ক্রমশ ডুবে গেলেন তীব্র মদ্যপানের নেশায়। মদই হয়ে উঠল তাঁর একমাত্র সঙ্গী, তাঁর সমস্ত ক্ষোভ আর একাকীত্ব ভুলে থাকার একমাত্র দাওয়াই। কিন্তু সস্তা আর অতিরিক্ত মদ্যপান তাঁর শরীরকে ভেতরে ভেতরে একদম ঝাঁঝরা করে দিচ্ছিল। একসময় তিনি আক্রান্ত হলেন লিভার সিরোসিস রোগে।

অসুস্থ শরীর নিয়েও তিনি লিখে গেছেন। যখন হাত কাঁপত, তখন মুখে বলতেন আর পাশে বসে অন্য কেউ তা লিখে রাখত। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সমাজকে তাঁর সেই বিখ্যাত ‘আঙ্কেল স্যামের নামে চিঠি’ (Letters to Uncle Sam) সিরিজের মাধ্যমে রাজনৈতিক চাবুক মেরে গেছেন। কিন্তু প্রকৃতির নিয়ম তো আর বদলানো যায় না। ১৯৫৫ সালের ১৮ জানুয়ারি, মাত্র ৪২ বছর বয়সে লাহোরের এক হাসপাতালে এই মহান সুরস্রষ্টা ও শব্দসৈনিক চিরতরে চোখ বুজলেন। রক্তবমি করতে করতে শেষ হয়ে গেল উর্দু সাহিত্যের সবচেয়ে উজ্জ্বল অথচ ট্র্যাজিক এক অধ্যায়।

সাদাত হাসান মান্টো
সাদাত হাসান মান্টো

সেই বিখ্যাত এপিটাফ:

মান্টো জানতেন, যে সমাজ তাঁকে জীবদ্দশায় অবহেলা করেছে, মৃত্যুর পর তারাই আবার তাঁর কফিনের পাশে এসে মেকি কান্নাকাটি করবে। তাই নিজের মৃত্যুর এক বছর আগে, ১৯৫৪ সালের আগস্ট মাসে তিনি নিজেই নিজের কবরের জন্য একটি এপিটাফ (কবরলিপি) লিখে গিয়েছিলেন। এই এপিটাফটি ছিল মান্টোর জীবনের সারমর্ম এবং মৃত্যুর পরেও সমাজের মুখে মারা এক মস্ত বড় চপেটাঘাত।

তিনি লিখেছিলেন—

“এখানে শুয়ে আছে সাদাত হোসেন মান্টো। তাঁর সাথে দাফন করা হয়েছে গল্প রচনার সমস্ত রহস্য ও গোপন কথা। মাটির মস্ত ওজনের নিচে চাপা পড়ে সে ভাবছে—কে বড় গল্পকার? সে নিজে, নাকি ঈশ্বর?”

যদিও পরবর্তীতে তীব্র ধর্মীয় গোঁড়ামি আর রক্ষণশীল সমাজের চাপে তাঁর পরিবার এই এপিটাফটি তাঁর কবরে লাগাতে পারেনি (তার বদলে একটি সাধারণ কবিতা লেখা হয়েছিল), কিন্তু মান্টোর এই কথাগুলো আজ বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে এক অমর অমরত্ব পেয়ে গেছে।

মান্টোর প্রাসঙ্গিকতা এবং ইতিহাসের জয়

সাদাত হোসেন মান্টো চলে গেছেন আজ বহু দশক হয়ে গেল। যে সমাজ আর রাষ্ট্র তাঁকে ‘অশ্লীল’ বলে জুতো মেরেছিল, আজ সেই পাকিস্তান সরকারই তাঁকে মরণোত্তর দেশের অন্যতম সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘নিশান-ই-ইমতিয়াজ’-এ ভূষিত করেছে। আজ ভারত, পাকিস্তান তো বটেই, সারা বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দেশভাগ আর মনস্তাত্ত্বিক সাহিত্যের সিলেবাসে মান্টোর গল্প পড়ানো হয়।

যতোই ভালোবাসুন, মন্টোকে যথেষ্ট ভালো বাসা যায়না, কাছে যাওয়া যায় না।

মান্টো হাজার বছর বাঁচুক…