আজ অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজে আলোচনা গজল নিয়ে। প্রথমে আলাপ করা যাক – গজল আসলে কী? আমরা প্রচলিত ভাবে ছোট বেলা থেকে হামদ-নাত টাইপ ধর্মগানকেই গজল হিসেবে জেনে থাকি। কিন্তু গজল কি আসলে তাই?

গজল
আসলে গজল এক ধরনের কবিতা, বা জোড়া দেয়া কবিতার সমগ্র। এই কবিতাগুলো যখন সুর মিশিয়ে গাওয়া শুরু হলো, তখন সেই গানের নামও হল গজল।
গজলের জন্ম কিন্তু সরাসরি গজল হিসেবে হয়নি। আরবে তখন ‘কসিদা’ (Qasida) নামের দীর্ঘ কবিতা লেখা হতো (যাতে রাজা বা গোত্রের প্রশংসা থাকত)। এই দীর্ঘ কসিদার শুরুতে কবিরা ভূমিকা হিসেবে প্রেমিকা বা হারানো যৌবনের স্মৃতিচারণ করতেন। এই অংশটুকুকে বলা হতো ‘তশবিব’ (Tashbib)। কালক্রমে এই প্রেমের অংশটুকু মূল কবিতা থেকে আলাদা হয়ে স্বাধীন রূপ নেয়, যাকে আরবিতে বলা হলো ‘গজল’ (যার আক্ষরিক অর্থ: নারীদের সাথে আলাপ বা প্রেমের আলাপ)।
আরবি গজল যখন ইরানে (পারস্যে) এলো, তখন ফারসি কবিরা একে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেলেন। তাঁরা গজলে পার্থিব প্রেমের পাশাপাশি সুফিবাদ ও আধ্যাত্মিক প্রেম যোগ করলেন। যেখানে ‘মদ’ হয়ে উঠল ঐশ্বরিক জ্ঞান এবং ‘সাকি’ (পরিবেশক) হলেন সৃষ্টিকর্তা বা গুরু। এই সময়ের দিকপাল ফারসি কবিরা হলেন হাফিজ শিরাজি, শেখ সাদি, রূমি এবং ওমর খৈয়াম।
সুলতানি ও মুঘল আমলে ফারসি গজল ভারতবর্ষে প্রবেশ করে। ১৩শ শতকের আমীর খসরুকে ভারতীয় গজলের জনক বলা হয়। তিনি ফারসি ও স্থানীয় ব্রজভাষা মিলিয়ে গজল লেখা ও গাওয়া শুরু করেন। ওয়ালী দখিনী প্রথম দক্ষিণ ভারত থেকে উর্দু ভাষায় গজল লিখে দিল্লিতে নিয়ে আসেন। এরপর দিল্লি ও লখনউ হয়ে ওঠে গজলের মূল কেন্দ্র। এরপর মীর তকি মীর, মির্জা গালিব এর মতো ওস্তাদদের হাত ধরে উর্দু গজল তার চূড়ান্ত সাহিত্যিক রূপ পায়।
গজলের সাধারণ কারিগরি বিষয়:
উর্দু গজল সচরাচর দুই দুই লাইন করে তৈরি কবিতা। যেটাকে “মিসরা” বলে। মজার বিষয় হচ্ছে, প্রতিটি মিসরা একটি করে স্বাধীন কবিতা। আগের মিসরার সাথে তার সম্পর্ক থাকতেও পারে, নাও পারে। ছন্দ ও অন্যান্য কারিগরি বিষয়ও আমাদের কবিতা থেকে একটু আলাদা। মির্জা গালিবের দুই লাইন নিয়ে আলোচনা করে দেখা যাক :
“দিলে নাদান তুঝে হুয়া কিয়া হ্যায়,
আখির ইস দারদ কা দাওয়া কিয়া হ্যায়”
শেষে “কিয়া হ্যায়, কিয়া হ্যায়” রিপিট করে ছন্দ মেলাতে সহায়তা করা হয়। এই ছন্দ সহযোগী শব্দগুলোকে বলে “রাদিফ“। এবং মুল ছন্দ “হুয়া” বা “দাওয়া”, যা বদলে যাচ্ছে প্রতিটি লাইনে, একে “কাফিয়া” বলে।
প্রথম “মিসরা” টি সচরাচর খুব ছন্দ-মিল রেখে করা হয়, যেটার নাম “মাতলা“। এটাই গজলের ভিত্তি। এরপর মোটামুটি একই ধরনের ছন্দ (মিটার) ও রাদিফ ধরে আগানো হয়।
শেষ শের বা মিসরা কে বলে “মাকতা“, যেখানে কবি তার নাম, পেন নেম (তাখাল্লুস পেশ) ব্যাবহার করেন।
গজল এর কালেকশন বা সংগ্রহ কে বলে “দিউয়ান“। গজল বিষয়ে এটুকু কারিগরি বিষয় আপনার জানলেই চলবে। আরও যদি জানতে চান “অন্যন্য কারিগরি বিষয়” পড়তে পারেন। চট করে সব বুঝবেন না। কেউ ওভাবে বোঝে না। তবে কারিগরি বিষয় না পড়লেও গজলের পরিবেশন অংশটি অবশ্যই পড়ুন।
অন্যন্য কারিগরি বিষয়:
নিচের ৪টি বিষয় গজলকে পূর্ণতা দেয়:
১. বহর (Bahr / Meter)
গজলের সবচেয়ে কঠিন ব্যাকরণ হলো এর ‘বহর’ বা মিটার। একটি গজলের সবকটি শের একই বহরে (একই ছন্দে ও মাত্রায়) হতে হবে। যদি কোনো লাইনের মাত্রা কম-বেশি হয়, তবে তাকে উর্দুতে ‘খারিজ আজ বহর’ (ছন্দচ্যুত) বলা হয় এবং গজল হিসেবে সেটি বাতিল হয়ে যায়।
২. হুসন-এ-মাতলা (Husn-e-Matla)
কখনো কখনো কবি গজলের প্রথম শের-এর (মাতলা) ঠিক পরপরই দ্বিতীয় শেরটিতেও দুই লাইনেই কাফিয়া ও রাদিফ ব্যবহার করেন। এই দ্বিতীয় চমৎকার শেরটিকে বলা হয় ‘হুসন-এ-মাতলা’ বা ‘জেব-এ-মাতলা’। যেমন:
“হাম হ্যায় মুশতাক অউর ও বেজার,
ইয়া ইলাহি ইয়ে মাজারি কেয়া হ্যায়?”
(খেয়াল করুন, দ্বিতীয় শের-এরও দুই লাইনেই ‘কেয়া হ্যায়’ মিলটি বজায় রাখা হয়েছে। যেহেতু এটি প্রথম শের-এর ঠিক পরেই এসেছে এবং একই ঢঙে লেখা হয়েছে, তাই এটিই হলো হুসন-এ-মাতলা।)
৩. গজলের ছন্দ বা অন্ত্যমিল কাঠামো (Rhyming Structure) ভিত্তিক প্রকারভেদ:
মুরাদ্দফ গজল (Muraddaf Ghazal):
যে গজলে কাফিয়া এবং রাদিফ দুটোই থাকে (যেমন গালিবের ওই শেরটি)।
গায়ের মুরাদ্দফ গজল (Ghair-Muraddaf Ghazal):
যে গজলে কোনো রাদিফ থাকে না, শুধু কাফিয়া (ছন্দ মেলানো শব্দ) দিয়ে শের শেষ হয়। যেমন:
“হাজারোঁ খোয়াইশেন অ্যায়সি কি হর খোয়াইশ পে দম নিকলে,
বহুত নিকলে মেরে আরমান লেকিন ফির ভি কম নিকলে।”
এখানে খেয়াল করুন, শেরে্র শেষে কোনো স্থির শব্দ (যেমন: ‘হ্যায়’, ‘থা’, ‘কেয়া হ্যায়’) বারবার ফিরে আসেনি। প্রথম ও দ্বিতীয় উভয় লাইনের শেষেও আছে “নিকলে”। এখন দেখুন, এই ‘নিকলে’ শব্দটি কি রাদিফ? না। কারণ ‘নিকলে’ শব্দের ভেতরেই মূল ছন্দ বা কাফিয়া (যেমন: দম, কম) মিশে আছে অথবা এটি নিজেই মূল ছন্দের শব্দ হিসেবে কাজ করছে।
৪. গজলের স্তবক বা বন্ধ (Stanza) ভিত্তিক প্রকারভেদ:
উর্দু শায়েরিতে প্রতিটি স্তবককে বলা হয় ‘বন্দ’ (Band)। এই ‘বন্দ’ কতগুলো লাইন নিয়ে গঠিত হবে, তার ওপর ভিত্তি করে এই নামগুলো দেওয়া হয়েছে। সাধারণত বিশুদ্ধ গজল সবসময় ২ লাইনের শের দিয়েই হয়, তবে ‘মুসাল্লাস’ বা ‘মুরাব্বা’ প্রধানত ‘নজম’ বা শায়েরির অন্যান্য শাখায় বেশি দেখা যায়।
শের (Sher):
শুধুমাত্র ২ লাইনের, যেটা সচরাচর আমরা শুনি।
মুসাল্লাস (Musallas):
‘মুসাল্লাস’ শব্দটি আরবি ‘সালাসা’ (তিন) থেকে এসেছে। যখন কোনো কবিতার প্রতিটি স্তবক তিনটি চরণের বা লাইনের সমন্বয়ে গঠিত হয়, তাকে মুসাল্লাস বলা হয়।
উর্দু সাহিত্যে মুসাল্লাস (Musallas) বা তিন লাইনের স্তবক খুব কম দেখা যায়। বিখ্যাত কবি নজির আকবরাবাদি (যিনি সাধারণ মানুষের জীবন নিয়ে লিখতেন) কিছু মুসাল্লাস স্তবক লিখেছিলেন। যেমন:
আ গয়ি মওত জওয়ানি মে তো রোনা ক্যায়া হ্যায়? (১ম লাইন)
সো রহে দিন কো তো রাত কো সোনা ক্যায়া হ্যায়? (২য় লাইন)
খালি হাত আয়ে তো দুনিয়া সে লেনা ক্যায়া হ্যায়? (৩য় লাইন)
মুরাব্বা (Murabba)
‘মুরাব্বা’ শব্দটি আরবি ‘আরবা’ (চার) থেকে এসেছে। এটি এমন একটি কাব্যিক রূপ যেখানে প্রতিটি স্তবকে চারটি চরণ বা লাইন থাকে। উদাহরণস্বরূপ মির্জা গালিবের একটি মুরাব্বা থেকে দেখা যাক:
মির্জা গালিবের একটি ‘মুরাব্বা’ স্তবকের গঠন লক্ষ্য করুন (এটি হিসেবেও পরিচিত):
চরণ ১: মুঝসে ক্যাহ্তে হ্যায় কি তেরা দর্দ হ্যায় দস্ত-এ-খিজাঁ,
চরণ ২: তেরি ফুরকত মে গায়ে ক্যায়া ক্যায়া তুফান-এ-জিয়াঁ,
চরণ ৩: আয়ে মেরে লখত-এ-জিগার তু হ্যায় ক্যাহাঁ আব তু ক্যাহাঁ,
চরণ ৪: ইয়ে তো ক্যাহ্ দে কি ইয়ে কিস কিস কে হ্যায় নাম ও নিশাঁ।
এখানে চারটি লাইনের শেষেই ছন্দ বা কাফিয়া (খিজাঁ, জিয়াঁ, ক্যাহাঁ, নিশাঁ) মেলানো হয়েছে। গজল যদি এমন চার লাইনের স্তবকে বিভক্ত হয়ে এগোতে থাকে, তবে তাকে ‘মুরাব্বা’ গজল বলা হয়। এই চার লাইনের একটি স্বতন্ত্র কবিতা।
মুখাম্মাস (Mukhammas):
এটা এমন একটি কাব্যিক গঠন যেখানে প্রতিটি স্তবকে ৫টি করে লাইন বা চরণ থাকে। উর্দু সাহিত্যে এটি অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং সাধারণত কোনো নাজম বা শোকগাথা (মার্সিয়া) লিখতে এটি ব্যবহৃত হয়।
একটি উদাহরণ হলো নজির আকবরাবাদির লেখা ‘আদমিনামা’ (মানুষের কাহিনী)। নিচে একটি স্তবক দেওয়া হলো:
১. দুনিয়া মে পদিশাহ হ্যায় সো হ্যায় ওহ ভি আদমি (Duniya mein padishah hai so hai woh bhi aadmi)
২. আউর মুফলিস-ও-গদা হ্যায় সো হ্যায় ওহ ভি আদমি (Aur muflis-o-gada hai so hai woh bhi aadmi)
৩. জরদার-ও-বেনাওয়া হ্যায় সো হ্যায় ওহ ভি আদমি (Zardar-o-benawa hai so hai woh bhi aadmi)
৪. নে’মত জো খা রাহা হ্যায় সো হ্যায় ওহ ভি আদমি (Ne’mat jo kha raha hai so hai woh bhi aadmi)
৫. টুকড়ে জো চাবা রাহা হ্যায় সো হ্যায় ওহ ভি আদমি (Tukde jo chaba raha hai so hai woh bhi aadmi)
এখানে মুখাম্মাসের নিয়ম অনুযায়ী, প্রথম স্তবকের ৫টি লাইনেই একই অন্ত্যমিল (Rhyme) থাকতে হয়। এখানে প্রতি লাইনের শেষে ‘আদমি’ শব্দটি রাদিফ হিসেবে এবং তার আগের শব্দগুলো কাফিয়া হিসেবে মিলেছে। এই মুখাম্মাসে কবি বোঝাচ্ছেন যে—এই দুনিয়ায় যে বাদশা সেও মানুষ, যে নিঃস্ব ভিখারি সেও মানুষ; যে বিত্তবান সেও মানুষ, আবার যে অন্যের ফেলে দেওয়া রুটির টুকরো চিবিয়ে খাচ্ছে, সেও একজন মানুষ।
‘মুসাদ্দাস’ (৬ লাইন):
মুসাদ্দাস এ প্রতিটি স্তবক ৬টি করে লাইন বা চরণ নিয়ে গঠিত হয়। উর্দু সাহিত্যে দীর্ঘ এবং বর্ণনামূলক কবিতা বা ‘নজম’ লেখার জন্য এটি অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি মাধ্যম। উদাহরণস্বরূপ মাওলানা আলতাফ হোসেন হালি-র একটি মুসাদ্দাস “মুসাদ্দাস-এ-হালি” দেখা যাক:
নিচে ‘মুসাদ্দাস-এ-হালি’ থেকে একটি বিখ্যাত স্তবক দেওয়া হলো:
১. ঘটা এক পস-এ-মঞ্জর সে উঠি (Ghatta ek pas-e-manzar se uthi)
২. ফাসিল-এ-জমিঁ জিসনে সব জানকে লুটি (Fasil-e-zamin jisne sab jaanke luti)
৩. কভী দজলা পর দি এক উসনে দি দস্তক (Kabhi Dajla par di ek usne dastak)
৪. কভী শোর ইসকা পহুঁচা গঙ্গা তক (Kabhi shor iska pahuncha Ganga tak)
৫. উতরতি হ্যায় নিচে জহাঁ পার ওহ নদী (Utarti hai niche jahan par woh nadi)
৬. উজলতি হ্যায় যন ফাসল-এ-খুদরও কি বদী (Ujalti hai yun fasl-e-khudrow ki badi)
প্রথম ৪টি লাইন একে অপরের সাথে ছন্দ মেলায় (যেমন এখানে: উঠি, লুটি, দস্তক, তক — যদিও এখানে ৪টি লাইন দুই জোড়ায় বিভক্ত, মূল মুসাদ্দাসে প্রথম ৪ লাইন একই ছন্দে থাকে)।শেষের ২টি লাইন (৫ম ও ৬ষ্ঠ) সম্পূর্ণ আলাদা একটি ছন্দে থাকে, যা একটি নতুন ঝংকার তৈরি করে স্তবকটি শেষ করে। এই শেষ দুই লাইনকে অনেক সময় ‘বৈত’ বলা হয়।
মুসাদ্দাস কাঠামোটি মূলতইতিহাসের উত্থান-পতন বা জাতীয় জাগরণের কথা বলার জন্য সবচেয়ে কার্যকর। মাওলানা হালি তাঁর এই মুসাদ্দাস দিয়ে তৎকালীন মুসলিম সমাজের দুর্দশা ও সোনালী অতীত তুলে ধরেছিলেন। আল্লামা ইকবালের বিখ্যাত ‘শিকওয়া’ এবং ‘জওয়াব-এ-শিকওয়া’-ও এই ৬ লাইনের মুসাদ্দাস ঢঙেই লেখা হয়েছে।
৫. গজলের ভাবগত প্রকারভেদ:
গজলের কারিগরি কাঠামো বা ব্যাকরণ ছাড়াও এর ভেতরের ‘ভাব’ (Theme) এবং ‘রস’ (Aesthetic)-এর ওপর ভিত্তি করে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ রয়েছে:
১. গজল-এ-মুসালসাল (Ghazal-e-Musalsal / غزلِ مسلسل):
সাধারণত গজলের প্রতিটি শের (স্তবক) তার অর্থের দিক থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন থাকে—অর্থাৎ প্রথম শে্র প্রেমের কথা হলে দ্বিতীয় শে্র সমাজ বা আধ্যাত্মিকতার কথা হতে পারে। কিন্তু যখন কোনো গজলের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সবগুলো শের একটি নির্দিষ্ট গল্প, ধারাবাহিক বিষয় বা একটি অখণ্ড অনুভূতির ওপর ভিত্তি করে লেখা হয়, তাকে ‘গজল-এ-মুসালসাল’ বলে। তবে এই ধরনের গজলের ভাব একেবারে বিচ্ছিন্ন নয়, বরং একটি সুতোয় গাঁথা থাকে।
২. তাগাজ্জুল (Taghazzul / تغزل):
তাগাজ্জুল হলো গজলের ‘প্রাণ’ বা ‘আবহ’। গজলের চিরাচরিত বিষয়বস্তু—যেমন প্রেম, বিরহ, সমর্পণ এবং প্রিয়তমার সৌন্দর্য—এসবের সমন্বয়ে যে বিশেষ একটি রোমান্টিক আবহের সৃষ্টি হয়, তাকেই বলা হয় ‘তাগাজ্জুল’। উস্তাদেরা বলেন – কোনো গজলের ব্যাকরণ (কাফিয়া, রাদিফ, বহর) নিখুঁত হতে পারে, কিন্তু যদি তাতে সেই আবেগ বা ব্যঞ্জনা না থাকে যা পাঠকের হৃদয়ে দোলা দেয়, তবে বলা হয়— “এতে সবই আছে, শুধু ‘তাগাজ্জুল’ নেই!”
৩. গজল-এ-আরিফানা (Ghazal-e-Arifana):
যে গজলের মূল বিষয়বস্তু হলো আধ্যাত্মিকতা বা স্রষ্টার প্রতি প্রেম (Sufi focus)। এখানে ‘প্রিয়তমা’ বলতে সরাসরি সৃষ্টিকর্তাকে বোঝানো হয়। রুমি বা আমীর খসরুর অনেক গজল এই ধারার।
৪. সিয়াসী, ইনকিলাবি ও ইজতেমায়ী গজল:
আধুনিক যুগে গজলের ভাব শুধু প্রেম-বিরহে সীমাবদ্ধ নেই। যখন গজলের ছন্দে সমাজব্যবস্থা, রাজনীতি বা সমসাময়িক সংকটের কথা উঠে আসে (যেমন—ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ বা হাবিব জালিীবের গজল), তখন তাকে আধুনিক বা রাজনৈতিক গজল বলা হয়।
৬. ইলম-এ-আরুজ: ছন্দ ও মাত্রার শাস্ত্র (The Science of Prosody)
এই বিভাগে গজলের গাণিতিক ও ছন্দ সংক্রান্ত বিষয়গুলো থাকবে।
আরুজ (Ilm-ul-Arooz):
এটি মূল শাস্ত্র বা ব্যাকরণ যা ছন্দ ও মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে। যেমন বাংলা কবিতার ‘ছন্দতত্ত্ব’ বা ইংরেজি কবিতার ‘Prosody’, যা নির্ধারণ করে কবিতাটি কোন চালে চলবে।
তাকতি (Taqti):
ছন্দ বিশ্লেষণের গাণিতিক প্রক্রিয়া বা স্ক্যানিং। একটি লাইনকে ভেঙে ‘ফাউলুন—ফাউলুন—ফাউলুন’ এভাবে মাত্রার মাপে ভাগ করে উচ্চারণ মিলিয়ে দেখা।
আরকান ও জিহাফ (Arkan & Zihaf):
ছন্দের মূল একক (রুকন) এবং সেই এককে কবিদের শব্দ বসানোর ক্ষেত্রে ব্যাকরণসম্মত হেরফের বা স্বাধীনতা।‘ফাইলুন’ (Fai-lun) রুকনটিতে শব্দ বসাতে গিয়ে প্রয়োজনের খাতিরে তার প্রথম অক্ষরকে ছোট বা হালকা করে উচ্চারণ করা।
খারেজ-আজ-বহর (Kharij-az-Bahar):
ছন্দচ্যুত হওয়া, যা মাত্রার হেরফেরের কারণে ঘটে।কোনো লাইনের মাঝখানে হুট করে একটি বড় শব্দ বা অতিরিক্ত অক্ষর ঢুকে পড়ার কারণে ছন্দের দোলাটি ভেঙে যাওয়া (যেমন: লয় কেটে যাওয়া)।
৭. গজলের নির্মাণশৈলী ও কারিগরি কৌশল (Technical Composition)
মিসরা-এ-উলা ও মিসরা-এ-সানি:
একটি পূর্ণাঙ্গ শের গঠনের দুটি অপরিহার্য অংশ বা পর্যায়। শেরে্র প্রথম লাইনকে বলা হয় ‘মিসরা-এ-উলা’ (ভিত্তি) এবং দ্বিতীয় লাইনকে বলা হয় ‘মিসরা-এ-সানি’ (সমাপ্তি)। প্রথম লাইনটি সাধারণত একটি কৌতূহল বা প্রেক্ষাপট তৈরি করে এবং দ্বিতীয় লাইনটি সেই ভাবটিকে পূর্ণতা দিয়ে পাঠককে চমকে দেয়।
হুসন-এ-তলব (Husn-e-Talab):
বিনয়ের সাথে কোনো দাবি বা অনুরোধ প্রকাশের বিশেষ কাব্যিক ভঙ্গি। অর্থাৎ যখন কবি সরাসরি কিছু না চেয়ে অত্যন্ত সুন্দর ও অলঙ্কারিক ভাষায় প্রিয়তমা বা কোনো ব্যক্তির কাছে নিজের মনের ইচ্ছা বা প্রার্থনা তুলে ধরেন। একে ‘চাহিদার সৌন্দর্য’ বলা হয়, যেখানে প্রার্থনার ধরনেই কবি তার পাণ্ডিত্য ও বিনয় প্রকাশ করেন।
রদ-এ-মাতলা (Radd-e-Matla):
গজলের শুরুতে ব্যবহৃত কোনো অংশকে শেষে ফিরিয়ে এনে ভিন্ন অর্থে ব্যবহারের এক চমৎকার কৌশল। তার অর্থ হলো, গজলের প্রথম শেরে (মাতলা) ব্যবহৃত কোনো একটি শব্দ বা শব্দগুচ্ছকে কবি যখন একদম শেষ শেরে (মাকতা) পুনরায় ব্যবহার করেন। এটি করার ফলে পুরো গজলটি একটি বৃত্তের মতো পূর্ণতা পায় এবং শেষ শেরে ওই শব্দটি ভিন্ন এক ব্যঞ্জনা তৈরি করে।
৮. উইউব-এ-সুখান: কাব্যিক ত্রুটি ও বর্জনীয় দিক (Poetic Flaws)
দক্ষ কবিরা যা এড়িয়ে চলেন বা উস্তাদরা যেগুলোকে ‘আইব’ (দোষ) ধরেন।
শুতার গুরবা (Shutur Gurba): সর্বনাম বা সম্বোধনের অসামঞ্জস্যতা।
একটি শেরে্র প্রথম লাইনে কাউকে ‘আপনি’ (আপ) বলে সম্বোধন করে দ্বিতীয় লাইনেই তাকে ‘তুমি’ (তুম) বা ‘তুই’ (তু) বলা। এটি অত্যন্ত বড় ত্রুটি, কারণ এতে কবিতার গাম্ভীর্য ও ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়। যেমন ধরুন প্রথম লাইনে আপনি বললেন— “আপনার চরণে ঠাঁই চাই”, আর দ্বিতীয় লাইনে বললেন— “তোর প্রেমে আমি পাগল!”
ইতা (Ita): কাফিয়া মেলানোর সময় একই শব্দের অংশ বা দুর্বল শব্দের পুনরাবৃত্তি।
যখন কাফিয়া হিসেবে এমন শব্দ ব্যবহার করা হয় যার মূল অংশটি বারবার ফিরে আসছে। যেমন— ‘দানা’ (জ্ঞানী) এবং ‘বিনা’ (দ্রষ্টা); এখানে মূল ফারসি শব্দ ‘দান’ ও ‘বিন’-এর সাথে ‘আ’ প্রত্যয় যোগ করে ছন্দ মেলানো হয়েছে, যা উস্তাদরা দুর্বল শায়েরি মনে করেন।
উইউব-এ-কাফিয়া (Uyoob-e-Qafiya): কাফিয়া মেলানোর সূক্ষ্ম কারিগরি ত্রুটি (যেমন: সানিদ ও ইকতা)।
কাফিয়ার মূল স্বরধ্বনি (Vowel sound) সামান্য বদলে যাওয়া। যদি একটি শেরে ‘ই’ কার দিয়ে ছন্দ মেলান, তবে পরের শেরে ‘উ’ বা ‘আ’ কার দিয়ে মেলালে তাকে ছন্দপতন ধরা হয়। যেমন ‘দিল’ (Dil) এর সাথে ‘কাল’ (Kal) বা ‘ফুল’ (Phul) মেলানো যাবে না; কারণ এদের মূল স্বরধ্বনিগুলো ভিন্ন।
কাফিয়া-এ-মামুলা (Qafiya-e-Mamoola): জোর করে বা কৃত্রিমভাবে মেলানো কাফিয়া।
যখন কোনো একটি মূল শব্দকে ভেঙে বা দুটি আলাদা শব্দকে জোড়া লাগিয়ে কোনোমতে একটি কাফিয়ার সাথে মেলানোর চেষ্টা করা হয়। এটি শুনলে মনে হয় কবি ছন্দের জন্য লড়াই করছেন এবং লেখাটি কৃত্রিম মনে হয়। যেমন কাফিয়া মেলানোর জন্য ‘বেলা’ শব্দের সাথে ‘কে-লা’ (কে যে লা…) নামক অর্থহীন অংশ জোড়া দেওয়া যাবে না।
কসিদাহ ও গজলের প্রধান পার্থক্য:
| বৈশিষ্ট্য | কসিদাহ | গজল |
| দৈর্ঘ্য | অনেক দীর্ঘ হয় (কখনো ১০০ লাইনের বেশি)। | সাধারণত ৫ থেকে ১৫-১৭টি শেরে্র মধ্যে হয়। |
| বিষয়বস্তু | প্রশংসা, বীরত্ব বা বর্ণনা। | প্রেম, বিরহ এবং আধ্যাত্মিকতা। |
| শৈলী | বেশ গম্ভীর এবং রাজকীয়। | অত্যন্ত কোমল এবং গীতিময়। |
| অখণ্ডতা | পুরো কবিতা একই বিষয়ের ওপর থাকে। | প্রতিটি শের (মুসালসাল বাদে) অর্থগতভাবে স্বাধীন। |
গজল পরিবেশন ও মুশায়রার শিষ্টাচার (আদব)
গজল কেবল একটি কাব্যিক মাধ্যম নয়, এটি একটি শক্তিশালী পরিবেশন শিল্প। গজল মূলত তিনটি ভিন্ন আঙ্গিকে আমাদের সামনে পরিবেশিত হতে পারে:
তারান্নুম (Tarannum): কোনো বাদ্যযন্ত্রের সাহায্য ছাড়াই কেবল নিজের কণ্ঠের মাধুর্য ও সুরের জাদুতে গজল পাঠ করা। এখানে সুর থাকলেও তা গানের মতো নয়, বরং ছন্দের একটি গীতল বহিঃপ্রকাশ।
তহতুল লফজ (Taht-ul-Lafz): কোনো সুর বা লয় ছাড়াই দরাজ গলায় গজল আবৃত্তি করা। যখন কবি চান যে শ্রোতারা সুরের চেয়ে শব্দের গভীরতা এবং ভাবের দিকে বেশি মনোযোগ দিক, তখন তিনি এই পদ্ধতিতে গজল পাঠ করেন।
গজল গায়কি: বাদ্যযন্ত্রসহ (যেমন—হারমোনিয়াম, তবলা, সারঙ্গি) গজলকে যখন পূর্ণাঙ্গ শাস্ত্রীয় বা আধা-শাস্ত্রীয় সংগীত হিসেবে পরিবেশন করা হয়। জগজিৎ সিং, মেহেদী হাসান বা গোলাম আলীর মতো কিংবদন্তিরা এই ধারার সার্থক রূপকার।
মুশায়রা (Mushaira) ও এর অনন্য আদব
আমরা বর্তমানে ইন্টারনেটে বা অ্যালবামে গানের মাধ্যমে গজলের সাথে পরিচিত হলেও, গজল উপভোগের আদি ও অকৃত্রিম স্থান হলো ‘মুশায়রা’ (কবি সম্মেলন)। মুশায়রা কেবল কবিতা পাঠের আসর নয়, এটি একটি উচ্চমার্গীয় সাংস্কৃতিক সমাবেশ, যার নিজস্ব কিছু অলিখিত কিন্তু কঠোর নিয়ম বা ‘আদব’ রয়েছে।
দাদ দেওয়া বা প্রশংসা করার নিয়ম: মুশায়রাতে শ্রোতাদের সক্রিয় অংশগ্রহণকে বলা হয় ‘দাদ’ দেওয়া। যারা সঠিকভাবে দাদ দিতে জানেন না, তাদের অনেক সময় সুরুচিশীল সমাজে অপেশাদার বা ‘বেআদব’ হিসেবে গণ্য করা হতে পারে।
তালি দেওয়া নিষেধ: মুশায়রার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম হলো—এখানে তালি দেওয়া সম্পূর্ণ নিষেধ। প্রচলিত সংস্কৃতিতে তালি দেওয়ার অর্থ হলো আপনি কবিকে মঞ্চ ত্যাগ করতে বলছেন অথবা তার কবিতা শেষ করতে বলছেন। এটি কবির প্রতি চরম অবমাননা হিসেবে বিবেচিত হয়।
প্রশংসার ভাষা: একটি ভালো শের (স্তবক) শোনার পর কবিকে উৎসাহ দিতে এবং প্রশংসা করতে “ওয়াহ্ ওয়াহ্”, “সুবহানআল্লাহ”, “মারহাবা”, “জিয়া জিয়া” (বেঁচে থাকুন) কিংবা আবেগ প্রকাশের জন্য “আহ” বা “হায় হায়”-এর মতো শব্দ ব্যবহার করা হয়।
শের পুনরায় পাঠের অনুরোধ: যদি কোনো শের খুব ভালো লাগে, তবে উচ্চস্বরে “মুকররার” (আরেকবার) বলে কবিকে পুনরায় সেই শেরটি পাঠ করার অনুরোধ জানানো হয়।
সঞ্চালকের ভূমিকা: মুশায়রার প্রাণ হলেন ‘নাজিম’ বা সঞ্চালক। তিনিই ঠিক করেন কোন কবি কখন আসবেন এবং আসরের গাম্ভীর্য বজায় রাখার দায়িত্ব তাঁরই।
মুশায়রায় উপস্থিত হওয়া মানে কেবল কবিতা শোনা নয়, বরং একটি সুপ্রাচীন ঐতিহ্যের অংশ হওয়া। সঠিক সময়ে সঠিক শব্দে ‘দাদ’ দেওয়া আপনার উন্নত রুচি এবং কাব্যবোধের পরিচয় বহন করে।
গজল গাইবার রীতি :
শুরুর দিকে আগে থেকে কম্পোজড্ গজল গাইবার রীতি ছিল না। রেয়াজ ছিল- গায়ক কবিতার সাথে সময় নিয়ে নিজের বোঝাপড়া শেষ করবেন। এরপর গাইবার সময় কবিতার মুডের সাথে মানাসই একটি রাগ ও তাল বেছে নেবেন, সেটার উপরে ভিত্তি করে মনে যেই সুরে আসবে, সেই সুর দিয়ে কবিতাটি প্রকাশ করবেন।
ওস্তাদ মেহেদি হাসান খান প্রথম দিকে যখন রেডিওতে গাইতেন, তখন সাবধানতার জন্য প্রথমে গজল গুলো কম্পোজ করে নিতেন। একদিন তার বাবা (আজিম খান) ডেকে জিজ্ঞেস করলেন কিভাবে গাইছে ছেলে। মেহেদি হাসান আগে কম্পোজ করার কথা বলাতে তিনি অসন্তুষ্ট হলেন। মেহেদি হাসান বললেন ভুল হলে চাকরি খোয়া যেতে পারে, এজন্য সাবধানতার কারণে তিনি আগে থেকে কম্পোজ করে নিচ্ছেন। বড় খাঁ সাহেব বললেন- গজল যদি আগে থেকে কম্পোজ করেই গাইবে, তবে এত প্রজন্ম ধরে গান শিখে কি লাভ হল? শেষ পর্যন্ত বাবা ছেলে একটা বোঝাপড়ায় এলেন। ৩ টি গজলের একটি আগে থেকে কম্পোজ করে যাবেন, আর দুটি ওই মুহূর্তে যে সুর এবং তাল মনে আসবে তা থেকে গাইবেন।
ওস্তাদ মেহেদি হাসানের এমন অনেক গজল, আছে যেটা প্রথমবার একবারে বসে গাওয়া সুরই জনপ্রিয় হয়েছে। এমনকি কবিতাটি আধা ঘণ্টা আগে হাতে পেয়ে, প্রথম বার সুর লাগিয়েই, পুরো গজলের ফাইনাল টেক হয়ে গেছে।
একজন গাইয়ে প্রথমবারে যে সুরে গান, মোটামুটি ভালো হলে সেই সুরটিকে ধরে রাখেন। তবে গজলের মানে প্রতিবার একটু আলাদা করে, ইমপ্রোভাইজ করে গাওয়া। একই সুরে একই রকম করে প্রতিবার গাইলে গজলের শ্রোতারা আগ্রহ হারান।
গজলের মূল গায়নরীতি (The Singing Styles)
ঐতিহাসিকভাবে গজলের গায়নরীতিকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা যায়:
ক. শাস্ত্রীয় বা ক্লাসিক্যাল গায়নরীতি (Classical Style):
ঠুমরি, দাদরা বা টপ্পা অঙ্গের রাগ-সংগীতের ওপর ভিত্তি করে এই ধারার গজল গাওয়া হয়। এখানে রাগের বিশুদ্ধতা এবং শাস্ত্রীয় তান-বিস্তারের প্রাধান্য থাকে।
প্রবক্তা: উস্তাদ বরকত আলী খান, বেগম আখতার, উস্তাদ আমানত আলী খান।
খ. আধুনিক বা সেমি-ক্লাসিক্যাল গায়নরীতি (Semi-Classical/Light Classical):
বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে জগজিৎ সিং, মেহেদী হাসান বা গোলাম আলীর হাত ধরে গজলে এক নতুন বিপ্লব আসে। এখানে রাগের ব্যাকরণ ঠিক রেখেও সুরকে সহজ ও শ্রুতিমধুর করা হয়, যাতে সাধারণ শ্রোতারাও তা উপভোগ করতে পারেন। একে বলা হয় সুগম সংগীত বা আধুনিক গজল গায়কি।
গায়নের প্রধান অঙ্গ ও কারিগরি উপাদান (Technical Elements)
গজল গাওয়ার সময় একজন গায়ককে নিচের কারিগরি দিকগুলো কঠোরভাবে মেনে চলতে হয়:
১. শায়েরি বা উচ্চারণ স্পষ্টতা (Lafz aur Talaffuz):
গজলের প্রধান শর্ত হলো— শব্দ সুরের চেয়ে বড়। খিয়াল বা তারানায় যেমন সুরের দাপটে কথা হারিয়ে যায়, গজলে তা করা অপরাধ। প্রতিটি উর্দু বা ফারসি শব্দের উচ্চারণ (যেমন: ‘খ’ ও ‘খ়’, ‘জ’ ও ‘জ়’ এর পার্থক্য) একদম নিখুঁত হতে হবে।
২. তারান্নুম (Tarannum):
অনেক সময় গজলের শুরুতে বা মুশায়েরায় কোনো বাদ্যযন্ত্র ছাড়া, কেবল খালি গলায় পঠিত সুর করে শায়ের আবৃত্তি করা হয়। এই বিশেষ সুরময় আবৃত্তিকে তারান্নুম বলে।
৩. গিরহ লাগানো (Girah Bandi):
এটি গজলের অত্যন্ত উঁচুমানের গায়নরীতি। গজল গাইতে গাইতে মূল ভাবের সাথে মিল রেখে গায়ক যখন হঠাৎ অন্য কোনো কবির একটি প্রাসঙ্গিক শের বা লাইন সেখানে জুড়ে দেন এবং আবার মূল গজলের সুরে ফিরে আসেন, তাকে ‘গিরহ লাগানো’ বলে।
৪. মুরকি বা মীড় (Murki and Meend):
গজলে বড় বড় তান বা গিটকিরি দেওয়া হয় না। এখানে ব্যবহার করা হয় সূক্ষ্ম ‘মুর্কি’ (অল্প কথায় দ্রুত স্বরের কাজ) এবং ‘মীড়’ (এক স্বর থেকে অন্য স্বরে গড়িয়ে যাওয়া)। এটি গজলে এক ধরনের চাপা কান্না বা আবেগের সৃষ্টি করে।
গজলের তাল ও বাদ্যযন্ত্র (Taal and Instruments):
ব্যবহৃত তাল:
গজলে সাধারণত ধীর ও মিষ্টি তাল ব্যবহার করা হয়, যা শব্দের ভাব প্রকাশে বাধা দেয় না।
- কাহারবা তাল (৮ মাত্রা): গজলের সবচেয়ে প্রিয় ও জনপ্রিয় তাল।
- রূপক তাল (৭ মাত্রা): একটু গম্ভীর ও বিরহের গজলে ব্যবহৃত হয়।
- দাদরা তাল (৬ মাত্রা): দ্রুত গতির বা চপল গজলে ব্যবহৃত হয়।
বাদ্যযন্ত্রের প্রয়োগ:
গজলে বাদ্যযন্ত্র সবসময় কণ্ঠশিল্পীর পেছনে ছায়ার মতো থাকে, কণ্ঠকে ছাপিয়ে যায় না।
- হারমোনিয়াম ও সারেঙ্গি: সুরের রেশ ধরে রাখার জন্য।
- তবলা: মৃদু লয়ে ছন্দ দেওয়ার জন্য।
- সন্তুর, সেতার বা গিটার: আধুনিক গজলে আবহ তৈরি করতে ব্যবহৃত হয়।
ভারতীয় উপমহাদেশের ৪টি প্রধান গজল ঘরানা বা গায়কি:
গজল গায়কির ক্ষেত্রে চারজন কিংবদন্তি চারটি আলাদা ধারার জন্ম দিয়েছেন:
১. মেহেদী হাসান (রাজস্থানি বা শাস্ত্রীয় ধারা): তাঁকে গজলের সম্রাট বা ‘শেহেনশাহ-এ-গজল’ বলা হয়। তাঁর গায়কিতে নিখুঁত রাগ ও খাদের আওয়াজের এক অদ্ভুত মেলবন্ধন ছিল।
২. জগজিৎ সিং (আধুনিক ও ভাব গম্ভীর ধারা): তিনি পশ্চিমা বাদ্যযন্ত্র (যেমন গিটার, ভায়োলিন) গজলে নিয়ে আসেন এবং ভারী গলায় অত্যন্ত আবেগ দিয়ে সহজ সুরে গজলকে মানুষের ড্রয়িংরুমে পৌঁছে দেন।
৩. গোলাম আলী (পাঞ্জাবি ও শাস্ত্রীয় চপল ধারা): তাঁর গায়কি ছিল দ্রুত মুর্কি ও ঠুমরি অঙ্গের। গানের মাঝখানে তবলার সাথে তাঁর সওয়াল-জওয়াব ও লয়কারি দারুণ জনপ্রিয়।
৪. বেগম আখতার (লখনউ ও পুরব অঙ্গ): দরবারি ঐতিহ্য ও ঠুমরির এক বিষণ্ণ মেলবন্ধন ছিল তাঁর কণ্ঠে। তাঁকে ‘মল্লিকা-এ-গজল’ বলা হয়।

গজলে আমার কয়েকজন কবি:
- মীর তকী মীর
- মীর্জা গালিব
- মিয়া মমিন
- বাহাদুর শাহ জাফর
- সাহির লুধিয়ানভি
- আহমাদ ফারাজ (সৈয়দ আহমেদ শাহ)
- হাফিজ হোশিয়ারপুরী
- সাগর সিদ্দিকী
- দাঘ দেহেলভী (নওয়াব মীর্জা খান) এর শায়েরি
** আমার পছন্দের সব শায়ের কে কবির উচ্চতা দিয়ে বিচার করিনি। যাদের শায়েরি গজ.ল হিসেবে শুনতে ভালো লেগেছে তাদেরই তালিকা দিয়েছি।
আমার প্রিয় কয়েকজন গজল গায়ক:
- বেগম আখতার
- ওস্তাদ আমানত আলী খান
- ওস্তাদ মেহেদি হাসান (শ্যাহেনশাহে গাজল)
- ইজাজ হুসেইন হাযারভী
- গোলাম আলী
- জগজিৎ সিং
![গজল Ghazal গান খেকো গজল সম্পর্কে বিস্তারিত | অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ 4 গজল [ Ghazal ] গান খেকো](https://sufifaruq.com/wp-content/uploads/2023/07/গজল-Ghazal-গান-খেকো-300x157.png)
গজল বিষয়ে আরও পড়তে পারেন মিউজিক গুরুকুলে গাজল নিয়ে যা লিখেছি।
সিরিজের বিভিন্ন ধরনের আর্টিকেল সূচি:
![গজল Ghazal গান খেকো গজল সম্পর্কে বিস্তারিত | অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ 1 গজল [ Ghazal ] গান খেকো](https://sufifaruq.com/wp-content/uploads/2023/07/গজল-Ghazal-গান-খেকো.png)