বাংলাদেশে শরিয়া শাসন বাস্তবায়ন করবে কারা? । ইসলাম ও মুসলিম সিরিজ

বর্তমান বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতিতে ‘শরীয়াহ শাসন’ বা ‘ইসলামী রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠার একটি তাত্ত্বিক আকাঙ্ক্ষা প্রায়শই উচ্চারিত হয়। কিন্তু কেউই এই ফান্ডামেন্টাল প্রশ্নটা করে না—সেই আইন বাস্তবায়ন করবে কে বা কারা? তারা নির্বাচিত বা সিলেক্টেড হবে কিভাবে? সেই সিলেকশন প্রসেসে মুসলমানরা কি একমত হবে? মেরে ধরে কোন একদল ক্ষমতায় গেলই বা; সেটাতে কি অন্যরা মানবে?

এইখানেই লুকিয়ে আছে আসল মহাজট আর ভয়ঙ্কর এক ক্যাওয়াজ (Chaos)। তাত্ত্বিকভাবে ‘শরীয়াহ শাসন’ শুনতে যতোটা সহজ লাগে, আমাদের এই মাসলাক আর ফিরকা-বাজির দেশে এটা আসলে এক অন্তহীন গৃহযুদ্ধের রেসিপি।

সোজা সাপটা হিসাব মেলানো যাক—দেশ চালাতে গেলে তো একটা নির্দিষ্ট আইনি কাঠামো লাগবে। এখন প্রথম ক্যাওয়াজটাই লাগবে এইখানে: শাসনটা চালাবে কে? হানাফীরা নাকি সালাফীরা? যেহেতু মেজরিটি হানাফী, ধরে নিলাম হানাফীরাই ক্ষমতায় বসল। কিন্তু সালাফীরা কি এটা মেনে নেবে? সালাফী বা আহলে হাদীসদের সোজা কথা—আমরা কোনো ফিকহ বা ইমামের তৈরি করা আইন মানি না, আমরা সরাসরি কুরআন-সহীহ হাদীস দিয়ে বিচার করব। ফলে প্রথম দিন থেকেই শুরু হবে “কারটা সহীহ আর কারটা বেদআতি” সেই ফতোয়ার যুদ্ধ।

চলুন ক্যাওয়াজটা আরও গভীরে নিয়ে যাই। হানাফীরা ক্ষমতায় বসলেও কোন হানাফীরা বসবে? কওমী-দেওবন্দী নাকি রেজভী-বেরলেভী? এই দুই দলের ভেতরের শত্রুতা তো আজকের না, শত বছরের পুরোনো। দেওবন্দীদের কাছে বেরলেভীরা আধা-মুশরিক, আর বেরলেভীদের কাছে দেওবন্দী-ওয়াহাবিরা সরাসরি নবীর দুশমন। বেরলেভী ইমাম আলা হযরত তো ‘হুসসামুল হারামাইন’ কিতাব লিখে দেওবন্দী আর ওয়াহাবীদের কাফের ফাতওয়াই দিয়ে রাখছেন। তাদের মতে দেওবন্দীদের পেছনে নামাজ হবে না, তাদের জবাই করা পশু হালাল না, এমনকি বিয়েশাদীও জায়েজ না! অপরদিকে দেওবন্দীদের কাছেও বেরলেভীরা হলো টাটকা মুশরিক, যারা মাজার পুজো করে আর আল্লাহর সিফাত নবীর সাথে লাগায়।

এখন ধরেন, লাঠির জোরে দেওবন্দীরা ক্ষমতায় গেল। তারা কী করবে? এসেই সালাফী আর বেরলেভী দুদলকেই কোণঠাসা করবে। মাজার ভাঙতে যাবে। আর মাজার ভাঙতে গেলেই বেরলেভীরা লাখ লাখ লোক নিয়ে রাস্তায় নামবে, শুরু হবে সরকার পতনের রক্তক্ষয়ী দাঙা। আবার দেওবন্দী সরকার যদি আলিয়া মাদ্রাসাগুলোকে জোর করে কওমীকরণ করতে যায়, সেখানে লাগবে আরেক ক্যাচাল।

বিপরীতভাবে, যদি বেরলেভীরা ক্ষমতায় যায়? দেশে মাজারের বাম্পার ফলন হবে। আর এই “অনৈসলামিক” কাজের বিরুদ্ধে দেওবন্দী-সালাফীরা তৌহিদি জনতা নিয়ে রাস্তায় নামবে। বেরলেভী সরকার তখন সামান্য ওজুহাত পেলেই অন্য দলের আলেমদের “শাতেমে রাসূল” (রাসূলের অবমাননাকারী) বলে ধরে এনে কল্লা কাটবে।

আর যদি সালাফীরা কোনোভাবে ক্ষমতায় যায়? তারা তো সহীহ আক্বীদার দোহাই দিয়ে দেওবন্দী-বেরলেভী দুই দলকেই মুশরিক ফতোয়া দিয়ে সাফ করা শুরু করবে। কওমী-আলিয়া সব মাদরাসাকে জোর করে সালাফীকরণ করতে যাবে। তখন অস্তিত্ব টেকাতে দেওবন্দী আর বেরলেভী একজোট হয়ে রাস্তায় নামবে সালাফী সরকার পতন করতে।

মাসলাকি মারামারি বাদ দিলেও, রাষ্ট্রীয় আইন-কানুনে যে কী তামাশা ঘটবে, ভাবা যায়?

দেওবন্দীরা ক্ষমতায় গেলে হানাফী ফিকহ চালাবে। হানাফী মতে, কোনো মানুষ অলসতা করে নামায না পড়লে সে মুরতাদ না, তাকে জেলে পুরে বেত্রাঘাত করতে হবে যতক্ষণ না সে নামায শুরু করে। কিন্তু সালাফীদের তো আবার এই আইন চলবে না। তারা বিশ্বাস করে হাম্বলী বা জাহিরী আইনে, যেখানে পরিষ্কার বলা আছে—নামায ত্যাগকারী কাফের এবং তাকে হত্যা করতে হবে। এখন জজ সাহেব যদি হন সালাফী আর আসামি যদি হয় হানাফী, তবে একটা সাধারণ বেনামাজী মানুষ স্রেহ মাসলাকি জেদের কারণে খুন হয়ে যাবে। সালাফীরা তখন হানাফীদের এই নরম শরীয়াহ শাসনকে “অনৈসলামিক” ঘোষণা করে বিদ্রোহ শুরু করবে।

এর মধ্যে পাড়া-মহল্লার গোয়ার-জাহেল তৌহিদি জনতা নিজেদের “শরীয়াহ পুলিশ” ভেবে বসা শুরু করবে। রাস্তায় বোরকা না পরা মহিলাদের ধরে ধরে “দ্বীনি ইভটিজিং” বা মরাল পুলিশিং করবে। আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে এক দল যখন মেয়েদের হেনস্থা করবে, আরেক দল তখন তাদের ফুলের মালা পরিয়ে আনন্দ মিছিল করবে।

সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডিটা ঘটবে আড়ালে। এই সব দল যখন ক্ষমতার চেয়ার নিয়ে কামড়াকামড়ি করবে, তখন বিশুদ্ধ ইসলামী খেলাফতের দাবিদার উগ্রপন্থী “মানহাজী”, আল-কায়েদিস্ট আর আইসিসপন্থীরা পাহাড় থেকে হাসবে। তারা বলবে—”এই দেওবন্দী, বেরলেভী বা সালাফী সরকার কাফের রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক রেখেছে, জাতিসংঘের আইন মেনেছে, পরিপূর্ণ শরীয়াহ বাস্তবায়ন করেনি, তাই এরা সবাই মুরতাদ।” তারা তখন পাহাড় থেকে কালো পতাকা উড়িয়ে “ঢাকা অ্যাটাক” করতে আসবে। “ইসলামী ইমারত” গঠনের ঘোষণা দিয়ে তারা তখন এই তথাকথিত ইসলামী সরকারের লোকজনেরই কল্লা কাটা শুরু করবে।

অনেকে আবার অবুঝের মতো কুযুক্তি দেয়—”আফগানিস্তানে তো খুব ভালো চলিতেছে!”

আরে ভাই, আফগানিস্তানের খবর রাখেন? সেখানে উগ্র হানাফী-দেওবন্দী তালেবান শাসন চলতেছে। সেখানে সালাফীরা কার্যত নিষিদ্ধ। অনেক সালাফী আলেমকে আইসিস সন্দেহে হ*ত্যা পর্যন্ত করা হয়েছে। ইবনে আব্দুল ওয়াহহাবসহ সালাফী আলেমদের বইপুস্তক সেখানে ব্যানড। হানাফি ফিকহের বাইরের কোনো মত সেখানে প্রকাশ্যে প্রচার করাই নিষিদ্ধ। এমনকি শিয়ারা পর্যন্ত চরম কোণঠাসা। এই তো সেদিনের ঈদে শিয়া আলেমরা তালেবান সরকারের সাথে একদিন আগে ঈদ করতে রাজি না হওয়ায় ৩ জন শিয়া আলেমকে ধরে বন্দী করা হয়েছিল। আফগানিস্তানের তথাকথিত শান্তি আসলে বন্দুকের নলে অন্য সবার মুখ বন্ধ করে রাখার এক কৃত্রিম নীরবতা।

যারা কথায় কথায় এই দেশে শরীয়াহ শাসন কায়েম করে ফেলার খোয়াব দেখেন, তাদের বিন্দুমাত্র ধারণা নাই এই বহুধা বিভক্ত সমাজে সেটা হলে কী ভয়ঙ্কর নরক তৈরি হবে। কেউ কারও পেছনে নামাজ পড়তে রাজী না, কেউ কারও জবাই করা গরু খেতে রাজী না, কেউ কাউকে মুসলিম বলেই মানতে রাজী না—অথচ তারা সবাই মিলে একটা “ইসলামী রাষ্ট্র” চালাতে চায়!

ইসলাম যখন জঙ্গিদের হাতিয়ার

ফিরকাবাদিতা আর মাসলাকবাদিতার এই চরম যুগে, বাংলাদেশে শরীয়াহ শাসন কায়েম করে শান্তি প্রতিষ্ঠা তো দূরের কথা; সামান্য একটা ফিকহী মতপার্থক্য বা পোশাকের তারতম্য নিয়ে ভাই ভাইয়ের রক্ত ঝরাবে। যার হাতে যতো বড় লাঠি আর ফতোয়া থাকবে, সে ততো বড় ক্ষমতা খাটাবে। শেষ পর্যন্ত ইসলামের সুমহান ইনসাফ তো আসেই না, উল্টো সমাজ থেকে যৎসামান্য শান্তি আর সহাবস্থানের ঘটি-বাটি শুদ্ধো চিরতরে উজাড় হয়ে যাবে।

আরও দেখুন: