নিউক্লিয়ার নয় আমাদের দরকার কিউবিট ক্যাপাসিটি । CIO সিরিজ

১৯৬৫ সালের সেপ্টেম্বর যুদ্ধের পর পাকিস্তানের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো একটি চরম ও আবেগসর্বস্ব মন্তব্য করেছিলেন: “ভারত যদি পারমাণবিক বোমা তৈরি করে, তবে আমরা প্রয়োজনে ঘাস কিংবা পাতা খেয়ে থাকব, তবুও আমরা আমাদের নিজস্ব পারমাণবিক বোমা তৈরি করব।” পাকিস্তানের সামরিক-আমলাতান্ত্রিক শাসকগোষ্ঠী তাদের রাষ্ট্রীয় দর্শনে এই আত্মঘাতী জেদটিকেই শেষ পর্যন্ত বেছে নিয়েছিল। পাকিস্থান নিউক্লিয়ার নেশন হয়েছে বটে, তবে ২০২৩-২০২৪ সালের বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ-এর বাস্তব সূচকের দিকে তাকালে দেখা যায়, পাকিস্তান ঠিক তা-ই হয়েছে। তাদের দেশের মানুষ আজ আক্ষরিক অর্থেই আটার লাইনে দাঁড়িয়ে মারামারি করছে, অথচ তাদের অস্ত্রাগারে শোভা পাচ্ছে পারমাণবিক ওয়ারহেড।

একটি রাষ্ট্রের আসল শক্তি তার নাগরিকদের জীবনমান, অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা এবং প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের ওপর নির্ভর করে, কোনো মারণাস্ত্রের ওপর নয়। পাকিস্তান নিজের অর্থনীতি ও মানুষের মৌলিক চাহিদা (অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান) বিসর্জন দিয়ে প্রতিবেশী ভারতের সাথে একটি কৃত্রিম ও স্থায়ী যুদ্ধাবস্থা বজায় রাখার নীতি গ্রহণ করে। এর জেরে আজ বৈশ্বিক মঞ্চে তাদের পরিচয় হয়েছে “এক হাতে বন্দুক, অন্য হাতে ভিক্ষার থালা” নেওয়া একটি জাতি হিসেবে। তাদের পাসপোর্ট আজ বৈশ্বিক র‍্যাংকিংয়ের তলানিতে, আর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলোতে পাকিস্তানি নাগরিকদের ভিক্ষাবৃত্তির দায়ে আটক হওয়ার ঘটনা নিয়মিত আন্তর্জাতিক সংবাদে পরিণত হয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে, ভূ-রাজনৈতিক জেদ যখন অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে ছাড়িয়ে যায়, তখন পারমাণবিক বোমাও একটি রাষ্ট্রকে ফকির হওয়া থেকে বাঁচাতে পারে না।

Table of Contents

নিউক্লিয়ার নয় আমাদের দরকার কিউবিট ক্যাপাসিটি

এক হাতে বন্দুক, অন্য হাতে ভিক্ষার থালা: পাকিস্তান মডেলের মরীচিকা

১৯৭১ সালের শুরুর বিন্দু বনাম ২০২৩-২০২৪ সালের পাকিস্থানের পরিসংখ্যান

ঐতিহাসিকভাবে, ১৯৭১ সালে যখন এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে যাত্রা শুরু করে, তখন বিশ্বমঞ্চে অনেকেই এই ভূখণ্ডের টিকে থাকা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছিলেন। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের কোষাগার শূন্য করে সমস্ত সম্পদ পশ্চিমে পাচার করার কারণে স্বাধীনতার ঠিক পরমুহূর্তে বাংলাদেশের জিডিপির আকার ছিল মাত্র ৮.৭৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যেখানে পাকিস্তানের জিডিপি ছিল ১০.৬৭ বিলিয়ন ডলার। পাকিস্তানের অর্থনীতি তখন আমাদের চেয়ে শক্তিশালী তো ছিলই, উপরন্তু তাদের শক্তিশালী সামরিক অবকাঠামো এবং আন্তর্জাতিক লবির জোরালো সমর্থন ছিল। কিন্তু পরবর্তী সাড়ে পাঁচ দশকে সামরিক উন্মাদনা বনাম অর্থনৈতিক দূরদর্শিতার এই দুই বিপরীতমুখী দর্শনের কারণে দুই দেশের গতিপথ সম্পূর্ণ আলাদা হয়ে গেছে। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ (IMF) এবং ইউএনডিপি (UNDP)-র ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরের অফিশিয়াল ডেটা এই ঐতিহাসিক ব্যবধানকে এক নির্মম বাস্তবতায় রূপ দিয়েছে:

মাথাপিছু জিডিপি (Nominal GDP per capita):

আইএমএফ-এর ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরের অফিশিয়াল ডেটা অনুযায়ী, বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি দাঁড়ায় প্রায় ২,৫২০ মার্কিন ডলারে। এর বিপরীতে পাকিস্তানের মাথাপিছু জিডিপি সংকুচিত হয়ে নেমে আসে মাত্র ১,৪৭১ মার্কিন ডলারে। অর্থাৎ, পরিসংখ্যানগতভাবেই একজন বাংলাদেশি নাগরিকের গড় অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতা ও সক্ষমতা একজন পাকিস্তানির চেয়ে প্রায় ৭১.৩% বেশি।

মুদ্রার সার্বভৌমত্ব ও মুদ্রাস্ফীতির অভিঘাত:

২০২৩-২০২৪ অর্থবছরের গড় বাজার দর অনুযায়ী, যেখানে ১ মার্কিন ডলারে বাংলাদেশি টাকার বিনিময় হার ছিল ১১০ থেকে ১১৭ টাকার মধ্যে, সেখানে ১ ডলার কিনতে পাকিস্তানি রুপি লেগেছে ২৭৮ থেকে ২৮৫ টাকারও বেশি। এই মুদ্রার অবমূল্যায়নের চেয়েও বড় বিপর্যয় ছিল পাকিস্তানের আকাশচুম্বী মুদ্রাস্ফীতি। ২০২৩-২০২৪ সালে পাকিস্তানের গড় মুদ্রাস্ফীতি ২৩% থেকে ২৬% (কোনো কোনো মাসে যা ৩৮% ছাড়িয়েছিল) এর ঘরে অবস্থান করায় দেশটির সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও সঞ্চয় পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। এর বিপরীতে বাংলাদেশ বৈশ্বিক সংকটের মধ্যেও মুদ্রাস্ফীতিকে এক অঙ্কের ঘরে ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছিল।

বৈদেশিক বাণিজ্য ও রিজার্ভের পুষ্টি:

২০২৩-২০২৪ অর্থবছরে পাকিস্তানের মোট রপ্তানি আয় যেখানে মাত্র ৩০ বিলিয়ন ডলারের বৃত্তে ঘুরপাক খাচ্ছিল, সেখানে তৈরি পোশাক খাত ও রেমিট্যান্সের ওপর ভর করে বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয় স্পর্শ করে প্রায় ৫৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। একই সময়ে পাকিস্তান যখন তার দেউলিয়া হওয়া ঠেকাতে মাত্র ৮ থেকে ৯ বিলিয়ন ডলারের নেট রিজার্ভ ধরে রাখতে বন্ধু রাষ্ট্রগুলোর (যেমন সৌদি আরব, চীন ও ইউএই) কাছে চড়া সুদে ঋণ রোল-ওভার করার আকুতি জানাচ্ছিল, বাংলাদেশ তখনো নিজস্ব অভ্যন্তরীণ সক্ষমতায় মেগা প্রজেক্টগুলোর অর্থায়ন সচল রাখতে পেরেছিল।

সামাজিক সূচক ও মানব উন্নয়ন (HDI):

রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তানের চরম ব্যর্থতা সবচেয়ে বেশি স্পষ্ট হয় তাদের মানব সম্পদ উন্নয়নের সূচকে। ইউএনডিপি (UNDP)-র সর্বশেষ মানব উন্নয়ন সূচকে (HDI) বাংলাদেশ ০.৬৩২ স্কোর নিয়ে বৈশ্বিক তালিকায় ১২৯তম স্থানে রয়েছে, যা ‘মাঝারি মানব উন্নয়ন’ ক্যাটাগরি নির্দেশ করে। অন্যদিকে পাকিস্তান ০.৫৪৪ স্কোর নিয়ে ১৬৪তম স্থানে, যা ‘নিম্ন মানব উন্নয়ন’ তালিকার অন্তর্ভুক্ত। জীবনযাত্রার মানের ক্ষেত্রেও এই পার্থক্য দৃশ্যমান; বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু যেখানে ৭২.৮ বছর, পাকিস্তানের মানুষের গড় আয়ু সেখানে মাত্র ৬৬.১ বছর। এমনকি শিশু মৃত্যুর হার কিংবা নারীর কর্মসংস্থানের সূচকেও পাকিস্তান আজ দক্ষিণ এশিয়ার তলানিতে।

এই পরিসংখ্যানগুলো কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, এটি একটি রাষ্ট্রের ভুল অগ্রাধিকারের ফল। পাকিস্তান যখন পরমাণু অস্ত্রের রক্ষণাবেক্ষণ এবং ভারতের সাথে ছায়াযুদ্ধ বজায় রাখতে তাদের বাজেটের সিংহভাগ অনুৎপাদনশীল সামরিক খাতে অপচয় করছিল, বাংলাদেশ তখন নিঃশব্দে প্রাথমিক শিক্ষা, তৃণমূলের স্বাস্থ্যসেবা, নারীর ক্ষমতায়ন এবং গ্রামীণ অবকাঠামোতে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে।

আজ পাকিস্তান দেউলিয়া হওয়া ঠেকাতে যখন আইএমএফ-এর ৩ বিলিয়ন ডলারের বেইলআউট প্যাকেজের কঠোর শর্তের নিচে পিষ্ট হচ্ছে এবং আন্তর্জাতিকভাবে এক প্রকার “আর্থিক সাহায্যপ্রার্থী” রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে, আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারত সেখানে ৩.৭ ট্রিলিয়ন ডলারের জিডিপি নিয়ে বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম অর্থনীতি হিসেবে মহাকাশ ও ডিপ-টেক প্রযুক্তিতে নেতৃত্ব দিচ্ছে। এই ঐতিহাসিক বৈপরীত্যই প্রমাণ করে যে, সামরিক উন্মাদনা কিংবা পারমাণবিক বোমার ভয় দেখিয়ে কোনো রাষ্ট্র টেকসই রূপান্তর ঘটাতে পারে না, যদি না তার অর্থনৈতিক পরিকাঠামো ও আধুনিক প্রযুক্তির ভিত মজবুত থাকে।

দেশীয় ছদ্ম-বুদ্ধিবৃত্তিক উন্মাদনা এবং ৪,১৫৬ কিলোমিটারের বাস্তব সীমান্ত

দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আমাদের দেশের কিছু ডানপন্থী গোষ্ঠী, তথাকথিত তৌহিদী জনতা এবং তাদের সাথে সুর মেলানো কিছু ছদ্ম-নাস্তিক ও সুযোগসন্ধানী লোক এখনো এই পাকিস্তান মডেলের আফিম গিলতে চান। তারা এক ধরনের ভূ-রাজনৈতিক হীনম্মন্যতা, অলীক কল্পনা ও যুদ্ধোন্মাদনায় ভোগেন। আমাদের এই উন্মাদ জনতা প্রায়ই সুদূর আফগানিস্তান বা ইরানে আমেরিকার তথাকথিত পরাজয় কিংবা পিছু হটার গল্প শুনে বগল বাজায়, রাস্তায় নেমে উল্লাস করে। কিন্তু এই সহজ সমীকরণটি বোঝার মতো নূন্যতম কাণ্ডজ্ঞান বা বুদ্ধিবৃত্তিক গভীরতা তাদের নেই যে—আফগানিস্তান বা ইরানের ভৌগোলিক আকার, ভূকৌশলগত অবস্থান আর তাদের মাটির নিচের বিপুল প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদ কোনোটার সাথেই বাংলাদেশের বাস্তবতার বিন্দুমাত্র মিল নেই।

পাহাড়-পর্বতে ঘেরা দুর্গম আফগানিস্তান কিংবা খনিজ তেলে সমৃদ্ধ ইরান বছরের পর বছর যুদ্ধ করেও যেভাবে টিকে থাকতে পেরেছে, বাংলাদেশ কি তা পারবে? যুদ্ধের পরবর্তী সময়ে ওইসব দেশের সাধারণ মানুষের যে চরম দুরবস্থা, ক্ষুধা, দারিদ্র্য আর আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়েছে—তা বিবেচনা করার ক্ষমতাও এই ধর্মান্ধদের নেই। তারা উন্মাদের মতো সর্বক্ষণ একটা কাল্পনিক ও জেহাদি যুদ্ধের আকাঙ্ক্ষা করে। অথচ তাদের মগজে এই ভাবনার ক্ষমতাটুকু নেই যে, আমাদের মতো একটি অতি ঘনবসতিপূর্ণ, ভৌগোলিকভাবে সমতল এবং অর্থনৈতিকভাবে এখনো ভঙ্গুর একটি দেশ সামান্য কোনো যুদ্ধ বা সামরিক সংঘাতের ধাক্কাও সইতে পারবে না। গত কয়েক দশকে আমরা কষ্ট করে যতটুকু কোমর সোজা করে দাঁড়িয়েছি, আমাদের যে রেমিট্যান্স, পোশাক খাত আর উদীয়মান অর্থনীতি—তার সবকিছু এক নিমেষে ধ্বংস হয়ে ধুলোয় মিশে যাবে।

এই গোষ্ঠীটি আসলে চায় বাংলাদেশ যেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দেওয়া ঐতিহাসিক দূরদর্শী পররাষ্ট্রনীতি—”সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরিতা নয়”—সম্পূর্ণ ত্যাগ করে। তারা আমাদের ‘নন-অ্যালাইনমেন্ট’ বা জোটনিরপেক্ষ স্বাধীন অবস্থানকে বিসর্জন দিয়ে পাকিস্তানকে অন্ধভাবে অনুকরণ করতে বলে; অর্থাৎ নিজেদের সার্বভৌমত্ব বন্ধক রেখে কোনো বৈশ্বিক পরাশক্তির ভূ-রাজনৈতিক দাবার ঘুঁটি বা আমেরিকান সামরিক বলয়ের দাসত্ব বরণ করতে উস্কানি দেয়। এমনকি পাকিস্তানের মতো রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে ‘ভাড়াটে সৈন্য সাপ্লাই ব্যবসা’ (Mercenary System) করে কিংবা ‘মোল্লা-মিলিটারি রিজিম’ বা উগ্র ডানপন্থী-সামরিক আঁতাত ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে গিয়ে নিজেদের ধ্বংস ডেকে আনতে তাদের মনে কোনো দ্বিধা নেই।

এই উন্মাদদের কে বোঝাবে যে, যে দেশের সাথে আমাদের প্রায় ৪,১৫৬ কিলোমিটারের একটি বিশাল, জটিল এবং তিন দিক থেকে বেষ্টিত স্থল সীমান্ত রয়েছে, তাদের সাথে কোনো প্রকার স্থায়ী যুদ্ধাবস্থা বা বৈরিতা বজায় রেখে একটি রাষ্ট্রের টিকে থাকা সম্পূর্ণ অসম্ভব। পাকিস্তান ও ভারতের বর্ডারের দৈর্ঘ্য প্রায় ৩,৩২৩ কিলোমিটার—যা মূলত জনমানবহীন মরুভূমি, পাহাড় আর সমতল সীমান্ত। সেই সীমান্ত পাহারা দিতে গিয়েই পাকিস্তানের অর্থনীতি আজ আক্ষরিক অর্থেই পঙ্গু। আর বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তিন দিকের সীমান্ত তো বটেই, সাথে রয়েছে এক দীর্ঘ নদী ও ভূ-প্রাকৃতিক জটিলতা। শত্রুদেশের চিরস্থায়ী বৈরিতা মাথায় রেখে যেভাবে হাই-অ্যালার্ট সীমান্ত পাহারা দিতে হয়, ৪,১৫৬ কিলোমিটার জুড়ে আমরা যদি তেমন সামরিক শক্তির মহড়া ও প্রতিরক্ষা বলয় গড়ে তুলতে যাই, তবে আমাদের জাতীয় বাজেটের সিংহভাগ কেবল অনুৎপাদনশীল সামরিক খাতেই গ্রাস হয়ে যাবে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষার বাজেট কাটছাঁট করতে করতে দেশের মানুষের হাতে শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানের মতোই ভিক্ষার থালা উঠবে।

তিন দিক থেকে ভারতবেষ্টিত এই ভূখণ্ডে দাঁড়িয়ে বাস্তবসম্মত ভূ-রাজনীতি বা ‘রিয়েলপলিটিক’ (Realpolitik)-এর একমাত্র অমোঘ সমীকরণ হলো—ভারতের সাথে পারস্পরিক সম্মান ও সমতার ভিত্তিতে সুসম্পর্ক বজায় রাখা। সংঘাত নয়, বরং নিজেদের কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থানকে (Strategic Geographical Location) বৈশ্বিক ও regional বাণিজ্যের মূল লিভারেজ বা হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। এই ৪,১৫৬ কিলোমিটার সীমান্তকে স্থায়ী যুদ্ধের ক্ষত না বানিয়ে একে ব্যবহার করতে হবে আঞ্চলিক অর্থনৈতিক করিডোর, ট্রানজিট ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সাথে যুক্ত হওয়ার সংযোগ সড়ক হিসেবে। এই করিডোর ও মুক্ত বাণিজ্য সুবিধা ব্যবহারের মাধ্যমে ভারতের বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজারে আমাদের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা এবং অর্থনৈতিক ট্রান্সমিশন লাইনের মাধ্যমে নিজেদের সমৃদ্ধ করাই হলো বুদ্ধিমানের কাজ। বন্দুকের নল উঁচিয়ে সীমান্ত পাহারা দেওয়ার চেয়ে বাণিজ্যের ইন্টারকানেক্টিভিটি বা পারস্পরিক অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা তৈরি করা অনেক বড় কূটনৈতিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থা।

সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের এই বিংশ শতাব্দীর ‘প্রিমেটিভ’ বা আদিম মানসিকতা পোষণ করলে এই এআই এবং কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ের একবিংশ শতাব্দীতে আমাদের ধ্বংস অনিবার্য। আজকের যুগে জাতীয় নিরাপত্তা আর কোনো পারমাণবিক বোমা, যুদ্ধবিমান বা দূরপাল্লার ট্যাঙ্কের লোহার ওজনের ওপর নির্ভর করে না; কারণ এগুলো শুধু একটি ভূখণ্ডকে ধ্বংস করতে পারে, কোনো অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এনে দিতে পারে না। আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার আসল গ্যারান্টি হলো একটি শক্তিশালী, জ্ঞানভিত্তিক, এবং প্রযুক্তিগতভাবে অপ্রতিরোধ্য অর্থনৈতিক ভিত গড়ে তোলা। কোনো দেশের সামরিক বাহিনী যদি আমাদের সীমান্তে চোখ তুলে তাকাতেও চায়, তবে যেন তারা বুঝতে পারে যে এই দেশের অর্থনৈতিক ও কোয়ান্টাম ডেটা আর্কিটেকচারকে স্পর্শ করলে তাদের নিজস্ব বাণিজ্যিক ও ডিজিটাল সাপ্লাই চেইন চিরতরে ভেঙে পড়বে। এই স্তরের কম্পিউটেশনাল ও অর্থনৈতিক প্রতিরোধ গড়ে তোলাই হলো আসল সার্বভৌমত্ব, পাকিস্তানের মতো বন্দুকধারী ভিক্ষুক হওয়া নয়।

নিউক্লিয়ার বনাম কিউবিট ক্যাপাসিটি: শক্তির নতুন সমীকরণ

আমাদের বুঝতে হবে, শক্তির চিরন্তন সংজ্ঞাটাই এখন বদলে গেছে। আমি যখন পারমাণবিক বোমার বদলে কিউবিট ক্যাপাসিটি (Qubit Capacity)-র কথা বলি, তখন অনেকে হয়তো অবাক হন। কিন্তু একটু ঠান্ডা মাথায় তলিয়ে দেখলে বুঝবেন, পারমাণবিক বোমার পুরো ধারণাটাই আসলে চরম ‘ধ্বংসাত্মক ও দ্বিমাত্রিক’। একটা পরমাণু বোমা একটা নির্দিষ্ট ভূখণ্ডকে পুড়িয়ে ছাই করে দিতে পারে, লাখ লাখ প্রাণ কেড়ে নিতে পারে, কিন্তু তা কোনো নতুন মূল্য, সম্পদ বা মানুষের বেঁচে থাকার রসদ তৈরি করতে পারে না। এর শেষবিন্দু হলো শ্মশান।

অন্যদিকে, কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ের মূল একক ‘কিউবিট’ (Qubit)-এর ভেতরের শক্তিটা একদম বিপরীত—এটি ‘সৃজনশীল ও বহুমাত্রিক’। আমাদের চেনা প্রথাগত কম্পিউটার যেখানে সাধারণ বাইনারি বিটের (০ অথবা ১) সমীকরণ ধরে একমুখী বা লিনিয়ার লাইনে কাজ করে, কোয়ান্টাম কম্পিউটার সেখানে সুপারপজিশন (Superposition) এবং এনট্যাঙ্গেলমেন্ট (Entanglement) এর মতো জটিল পদার্থবিদ্যার নিয়ম খাটিয়ে একই সাথে কোটি কোটি গাণিতিক ও বৈজ্ঞানিক সম্ভাবনাকে পরখ করতে পারে। সাধারণ সুপারকম্পিউটারের যে হিসাব মেলাতে হাজার বছর লাগবে, কোয়ান্টাম কম্পিউটার তা চোখের পলকে, মাত্র কয়েক সেকেন্ডে সমাধান করে ফেলে।

বিংশ শতাব্দীতে বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্য নির্ধারিত হতো কার কত বড় পারমাণবিক অস্ত্রাগার আছে, কার কয়টা দূরপাল্লার মিসাইল আছে কিংবা কার মাটির নিচে কতটা খনিজ তেলের খনি লুকিয়ে আছে তার ওপর। কিন্তু ২০২৬ সালের এই বৈশ্বিক আর আঞ্চলিক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে বুক চাপড়ানো সেই পুরোনো শক্তির সমীকরণটা পুরোপুরি তামাদি হয়ে গেছে। আজকের ভূ-রাজনীতি আর মানচিত্রের কাঁটাতার কিংবা ভূখণ্ডের সীমানায় আটকে নেই; ক্ষমতার খেলাটা এখন টেবিল থেকে নেমে প্রবেশ করেছে সিলিকন চিপ আর কিউবিটের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র পারমাণবিক স্তরে। পাকিস্তান যে আদিম সামরিক মডেলের মরীচিকার পেছনে অন্ধের মতো ছুটে নিজের অর্থনীতিকে দেউলিয়া করেছে, নিজের নাগরিকদের আটার লাইনে দাঁড় করিয়েছে, সেই মডেল আজ বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটেই চরম হাসির খোরাক। আধুনিক বিশ্বে একটা দেশের সার্বভৌমত্ব, তার সম্মান আর ভূ-political লিভারেজ বা দরকষাকষির ক্ষমতা এখন আর কামানের গোলার ওজনে মাপা হয় না; তা নির্ধারিত হয় তার কম্পিউটেশনাল সুপ্রিমেসি (Computational Supremacy) বা গাণিতিক ও প্রসেসিং সক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে।

ভেবে দেখুন, আজকের দিনে ওয়াশিংটন, বেইজিং বা নতুন দিল্লির নীতিনির্ধারকরা কিন্তু পারমাণবিক বোমার সংখ্যা গোনার চেয়ে অনেক বেশি চিন্তিত সেমিকন্ডাক্টর চিপের সাপ্লাই চেইন এবং কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ের শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের টেবিলে একেই এখন বলা হচ্ছে ‘চিপ-রাজনীতি’ বা Chiplomacy। এই নতুন ঠান্ডা যুদ্ধের মূল দর্শনটা খুব পরিষ্কার—যে দেশ আল্ট্রা-অ্যাডভান্সড সেমিকন্ডাক্টরের লিথোগ্রাফি প্রযুক্তি এবং কোয়ান্টাম প্রসেসিংয়ের ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারবে, আগামী পৃথিবীর অর্থনীতি ও নিরাপত্তার নতুন ব্যাকরণ মূলত তারাই লিখে দেবে।

আগামী দিনের বিশ্ব অর্থনীতি আর খনিজ তেল, কয়লা কিংবা প্রথাগত গায়ের জোরের ওপর ভর করে চলবে না; তা চলবে খাঁটি কম্পিউটেশনাল ক্ষমতার ওপর। যে দেশের হাতে যত শক্তিশালী ‘কিউবিট ক্যাপাসিটি’ থাকবে, তারা তত দ্রুত নিখুঁত সব ন্যানো-মেটেরিয়াল তৈরি করতে পারবে, প্রাণঘাতী রোগের ওষুধ আবিষ্কার করবে, বৈশ্বিক ফাইন্যান্সিয়াল মার্কেটের গতিবিধি আগে থেকে নিখুঁতভাবে প্রেডিক্ট করে নিজেদের অর্থনীতিকে বাঁচাবে। আর সবচেয়ে বড় কথা, তারা চাইলে যেকোনো শত্রু দেশের সাইবার ডিফেন্স বা ব্যাংকিং এনক্রিপশন সিস্টেমকে এক সেকেন্ডে অচল করে দিয়ে ঘরে বসেই পুরো যুদ্ধ জয় করে নিতে পারবে—কোনো রক্তপাত ছাড়াই।

পারমাণবিক বোমার ধ্বংসক্ষমতা যেখানে কেবল একটা নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানায় আঘাত হানতে পারে, কোয়ান্টাম কম্পিউটেশনের ক্ষমতা সেখানে পুরো বিশ্বের ডিজিটাল এবং ফাইন্যান্সিয়াল পরিকাঠামোকে ঘরে বসেই পুনর্গঠন বা স্তব্ধ করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। এই অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি একটা পরমাণু বোমার চেয়ে বহুগুণ বেশি টেকসই এবং শক্তিশালী। তাই আমাদের তরুণ প্রজন্মকে যুদ্ধের উস্কানি না দিয়ে, সস্তা চিল্লানো রাজনীতির হাতিয়ার না বানিয়ে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের এই চূড়ান্ত অস্ত্র, অর্থাৎ কোয়ান্টাম প্রযুক্তির উপযোগী করে তোলাই হবে আমাদের আসল ‘ডিটারেন্স’ বা আসল প্রতিরক্ষামূলক দেয়াল। বন্দুকধারী ভিক্ষুক হওয়ার চেয়ে কিউবিট-সমৃদ্ধ আত্মমর্যাদাশীল জাতি হওয়াই আমাদের একমাত্র পথ।

চিপ-রাজনীতি ও এশীয় অক্ষের রূপান্তর: হার্ডওয়্যারের নতুন একচেটিয়া বাজার

আমাদের মনের ভেতর একটা ভুল ধারণা গেঁথে দেওয়া হয়েছে যে, তথ্যপ্রযুক্তির শেষ কথা বুঝি আমেরিকার সিলিকন ভ্যালি। কিন্তু ভেতরের আসল সত্যটা হলো, সিলিকন ভ্যালি যতই চোখধাঁধানো সফটওয়্যার, জেনারেটিভ এআই কিংবা ট্রিলিয়ন প্যারামিটারের লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল তৈরি করুক না কেন—সেগুলোর ভৌত অস্তিত্ব, প্রাণশক্তি আর প্রসেসিং ক্ষমতা সম্পূর্ণভাবে এশীয় অক্ষের ওপর নির্ভরশীল। পশ্চিমা বিশ্ব অ্যালগরিদম বা কোড লিখতে পারে, কিন্তু সেই কোডকে বাস্তবে সচল করার মতো রক্ত-মাংসের অবকাঠামো বা হার্ডওয়্যার তাদের নেই।

আজকের বৈশ্বিক চিপ-রাজনীতির (Chiplomacy) দিকে তাকালে দেখা যায়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জন্য অপরিহার্য বিশ্বের সবচেয়ে জটিল, সূক্ষ্ম এবং উন্নত (যেমন ৩ ন্যানোমিটার বা ২ ন্যানোমিটার) প্রসেসরগুলোর নকশা বা ব্লুপ্রিন্ট পশ্চিমে তৈরি হলেও, সেগুলোর ভৌত উৎপাদন বা ম্যানুফ্যাকচারিং কিন্তু আমেরিকায় হয় না; তা হয় তাইওয়ানের টিএসএমসি (TSMC) এর ল্যাবরেটরিতে। শুধু তাই নয়, এর সাথে যদি দক্ষিণ কোরিয়ার স্যামসাং এবং এসকে হাইনিক্স (SK Hynix) কোনো কারণে তাদের তৈরি করা বিশেষায়িত হাই-ব্যান্ডউইথ মেমোরি (HBM) চিপ সরবরাহ বন্ধ করে দেয়, তবে পশ্চিমা বিশ্বের সমস্ত চ্যাটজিপিটি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আর ক্লাউড কম্পিউটিংয়ের চাকা রাতারাতি স্তব্ধ হয়ে যাবে। গোটা সিলিকন ভ্যালি তখন স্রেফ একটা অচল খেলনায় পরিণত হবে।

সবচেয়ে শিক্ষণীয় বিষয় হলো, হার্ডওয়্যার ও ভৌত পরিকাঠামোর ওপর এশিয়ার এই যে অভূতপূর্ব একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ, এটি কিন্তু কোনো রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, সামরিক আগ্রাসন কিংবা ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে অর্জিত হয়নি। এটি অর্জিত হয়েছে গত দুই থেকে তিন দশক ধরে এশিয়ার এই দূরদর্শী দেশগুলোর দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনা, শিক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ এবং অর্থনৈতিক দূরদর্শিতার মাধ্যমে।

যখন আমাদের প্রতিবেশী পাকিস্তান সীমান্ত যুদ্ধের সস্তা উত্তেজনায় মেতে অবাস্তব সামরিক বাজেটের পেছনে নিজেদের রাষ্ট্রীয় তহবিল ঢালছিল, তখন এশিয়ার এই প্রকৃত পরাশক্তিরা সীমান্ত রেখার উন্মাদনা ভুলে নিঃশব্দে সেমিকন্ডাক্টর, লিথোগ্রাফি আর কম্পিউটেশনাল পরিকাঠামো গড়ে তুলছিল। তারা বন্দুকের চেয়ে সিলিকনকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিল। এই চিপ-রাজনীতি আজ বিশ্বমঞ্চে বুক ঠুকে প্রমাণ করে যে, বিংশ শতাব্দীর সেই মাও সে তুং-এর উক্তি—”শক্তির আসল উৎস বন্দুকের নল”—তা আজ পুরোপুরি ভুল। একবিংশ শতাব্দীতে শক্তির আসল উৎস আর বন্দুকের নলে নেই, তা স্থানান্তরিত হয়েছে সিলিকন ওয়েফারের কোটি কোটি আণুবীক্ষণিক ট্রানজিস্টরে। আর এই শক্তির নিয়ন্ত্রণ যার হাতে, আগামী পৃথিবীর শাসনভারও থাকবে তার পকেটেই।

চীন ও ভারতের নিজস্ব ইকোসিস্টেমের উত্থান এবং এশীয় মডেল

এই বৈশ্বিক কম্পিউটেশনাল রেস বা গাণিতিক শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ে আমাদের দুই প্রতিবেশী দেশ—চীন ও ভারতের অবস্থান এবং তাদের নিজস্ব প্রযুক্তির ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার গল্পটি বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় এবং বাস্তবসম্মত শিক্ষণীয় কেস স্টাডি। এটি আমাদের শেখায় যে, সদিচ্ছা আর সঠিক দূরদর্শিতা থাকলে কীভাবে বিশ্বমঞ্চে বুক টান করে দাঁড়ানো যায়।

আমেরিকার কঠোর প্রযুক্তিগত নিষেধাজ্ঞা, চিপ বয়কট এবং একের পর এক ইকোনমিক ব্লকেড বা অর্থনৈতিক অবরোধের মুখে পড়েও চীন যেভাবে ফিনিক্স পাখির মতো নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে, তা বিশ্ব তথ্যপ্রযুক্তি খাতের ক্ষমতার পুরো ভারসাম্যকেই নাড়িয়ে দিয়েছে। পশ্চিমা বিশ্ব ভেবেছিল চিপ তৈরির মূল লিথোগ্রাফি মেশিন সরবরাহ বন্ধ করে দিলে চীন প্রযুক্তির রেস থেকে ছিটকে যাবে। কিন্তু সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়ে চীন তাদের দেশীয় হুয়াওয়ে (Huawei) এবং এসএমআইসি (SMIC) এর মতো প্রতিষ্ঠানের যৌথ মেধা খাটিয়ে সম্পূর্ণ নিজস্ব প্রযুক্তিতে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন প্রসেসর তৈরি করে দেখিয়েছে। শুধু তা-ই নয়, ল্যাবরেটরি থেকে কোয়ান্টাম সুপ্রিমেসি (Quantum Supremacy) বা কোয়ান্টাম শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের এই মূল দৌড়ে চীন আজ পরাশক্তি আমেরিকার একমাত্র এবং সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

অন্যদিকে, আমাদের ঠিক পাশের দেশ ভারত বিশ্বকে এক অনন্য মানবিক ও ডিজিটাল রূপান্তরের গল্প দেখিয়েছে। ভারত প্রমাণ করেছে, কীভাবে একটি বিশাল জনশক্তিকে সস্তা আইটি আউটসোর্সিং বা স্রেফ কল সেন্টারের প্রাথমিক স্তর থেকে টেনে তুলে উন্নত ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচারে (DPI) রূপান্তর করা যায়। ভারতের তৈরি ‘UPI’ (Unified Payments Interface) এবং তাদের সামগ্রিক ‘India Stack’ আজ বিশ্বজুড়ে ডিজিটাল গভর্নেন্স এবং ফিনটেক বিপ্লবের প্রধানতম রোল মডেল। আজ আমেরিকার বড় বড় ফাইন্যান্সিয়াল জায়ান্টরাও ভারতের এই ক্যাশলেস এবং জিরো-ফি রিয়েল-টাইম পেমেন্ট আর্কিটেকচার দেখে রীতিমতো ঈর্ষা করে। ভারত আজ আর পশ্চিমাদের তৈরি প্রযুক্তির সাধারণ উপভোক্তা নয়; তারা নিজস্ব ‘ন্যাশনাল কোয়ান্টাম মিশন’ (National Quantum Mission) চালু করে কিউবিট ক্যাপাসিটি বাড়ানোর জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে।

ভারত ও চীনের এই অভাবনীয় উত্থান আমাদের চোখের সামনে একটি সত্যকে দিবালোকের মতো স্পষ্ট করে দেয়—এশিয়ার ভবিষ্যৎ এবং তার সার্বভৌমত্ব নির্ধারিত হচ্ছে অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত স্বাবলম্বিতা অর্জনের মাধ্যমে; প্রতিবেশী দেশের সাথে অবাস্তব ও কৃত্রিম যুদ্ধাবস্থা বজায় রেখে বা সীমান্তে কামানের গোলা ফাটিয়ে নয়। মেধা আর প্রযুক্তির এই নতুন এশীয় মডেলকে আপন করে নেওয়াই এখন বাংলাদেশের জন্য টিকে থাকার একমাত্র বাস্তব পথ।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক জাম্প এবং কোয়ান্টাম অর্থনীতির দিকে যাত্রা

একই সময়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর দিকে তাকালে এক চমৎকার শান্ত, অথচ জাঁদরেল অর্থনৈতিক রূপান্তর চোখে পড়ে। ভিয়েতনাম বা ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলো কোনো ধরনের সস্তা ভূ-রাজনৈতিক কোন্দল, কিংবা ফাঁকা বুলি আর আদর্শিক কাদা-ছোড়াছুড়িতে নিজেদের জড়ায়নি। তারা একদম ঠাণ্ডা মাথায় নিজেদের অর্থনীতিকে বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর এবং গ্রিন-টেক ভ্যালু চেইনের সাথে আঠার মতো গেঁথে নিয়েছে।

বৈশ্বিক বড় বড় জায়ান্ট কোম্পানিগুলো যখন একক চীন-নির্ভরতা কাটানোর জন্য ‘চায়না প্লাস ওয়ান’ (China+1) নীতি নিয়ে বিকল্প বাজারের খোঁজ শুরু করল—ভিয়েতনাম তখন এক মুহূর্তও নষ্ট করেনি। বাঘের মতো ছোঁ মেরে সুযোগটা দুই হাতে লুফে নিয়েছে তারা। রাতারাতি নিজেদের ভেতরের সব আমলাতান্ত্রিক ফাইল চালাচালির জটিলতা ঝেঁটিয়ে বিদায় করে আজ তারা বিশ্বের অন্যতম বড় ইলেকট্রনিক্স আর চিপ অ্যাসেম্বলি হাবে পরিণত হয়েছে।

সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা তারা দিয়েছে তাদের শিক্ষা ব্যবস্থায়। তরুণ প্রজন্মকে প্রথাগত সস্তা ফ্রিল্যান্সিং, ডাটা এন্ট্রি কিংবা মামুলি কোডিংয়ের গোলকধাঁধা থেকে টেনে বের করেছে তারা। সরাসরি ঢুকিয়ে দিয়েছে অ্যাডভান্সড হার্ডওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং আর সেমিকন্ডাক্টর আর্কিটেকচারের দুনিয়ায়।

এই উদীয়মান দেশগুলো খুব ভালো করে একটা অমোঘ সত্য টের পেয়ে গেছে—আগামী দিনের বিশ্ব অর্থনীতিতে যদি মাথা উঁচু করে টিকে থাকতে হয়, তবে নিজেদের এখনই ‘কোয়ান্টাম অর্থনীতি’র (Quantum Economy) জন্য প্রস্তুত করতে হবে। কোয়ান্টাম কম্পিউটার যখন ল্যাবরেটরির চার দেয়াল ভেঙে পুরোপুরি বাণিজ্যিক রূপ নিয়ে বাজারে নামবে, তখন আমাদের চেনা প্রথাগত লজিস্টিকস, ব্যাংকিং খাতের এনক্রিপশন, সাইবার সিকিউরিটি আর গ্লোবাল সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্টের পুরো খোলনলচেই রাতারাতি ওলটপালট হয়ে যাবে। পুরোনো জং-ধরা প্রযুক্তির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা দেশগুলো তখন স্রেফ এক নিমেষে পঙ্গু হয়ে পড়বে।

প্রযুক্তির এই প্রলয়ঙ্কারী ওলটপালটের বিপরীতে দাঁড়িয়ে আমাদের বাংলাদেশ যদি এখনো বিংশ শতাব্দীর সেই মরচে পড়া সামরিক মডেল, কিংবা উগ্র ডানপন্থী গোষ্ঠীর মগজে ঢুকিয়ে দেওয়া আত্মঘাতী ও দেউলিয়া ‘পাকিস্তান মডেল’ নিয়ে আফিমখোরের মতো পড়ে থাকে—তবে আমরা এই নতুন এশীয় অর্থনৈতিক অক্ষ থেকে চিরতরে হারিয়ে যাব।

আমাদের এই অতি ঘনবসতিপূর্ণ, ছোট একটা দেশের সাধারণ মানুষের ভাগ্যের যদি সত্যিই পরিবর্তন করতে হয়, তবে লক্ষ্যটা খুব স্পষ্ট হতে হবে। ভারতের সাথে কোনো অবাস্তব সংঘাত বা সস্তা ফেসবুকীয় যুদ্ধোন্মাদনা নয়; বরং প্রতিবেশী দেশের সাথে সমতা, মর্যাদা আর সুসম্পর্ক বজায় রেখে এই কোয়ান্টাম যুগের এক শক্তিশালী অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত অংশীদার হতে হবে। কাঁটাতারের ওপারে কাল্পনিক শত্রু খুঁজে সস্তা বাহবা পাওয়ার চেয়ে—সিলিকন আর কিউবিটের বৈশ্বিক সমীকরণে নিজেদের ঘরের ছেলেদের মেধাকে প্রতিষ্ঠিত করাটাই হবে আমাদের আসল দূরদর্শিতা।

বাংলাদেশের বর্তমান দুর্বলতা

সিলিকন আর কিউবিটের এই বৈশ্বিক মহাপরিবর্তনের বিপরীতে আমাদের বাংলাদেশের অবস্থান ঠিক কোথায়? কোনো মেকি আত্মতুষ্টি, ফাঁপা রাজনৈতিক স্লোগান কিংবা আবেগের চশমা ছাড়াই অত্যন্ত নির্মোহভাবে এই সত্যটা আজ আমাদের খতিয়ে দেখা দরকার।

বিগত দেড় দশকে শেখ হাসিনা সরকারের ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ রূপকল্পের হাত ধরে আমাদের দেশের সাধারণ মানুষের দৈনিক যাপিত জীবনে কিন্তু একটা বিশাল, দৃশ্যমান আর পজিটিভ পরিবর্তন এসেছে। এটাকে অস্বীকার করার উপায় নেই। ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত ফাইবার অপটিক কেবল পৌঁছে দেওয়া, বিকাশ-নগদের মতো মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে গ্রামের একদম সাধারণ মানুষের পকেটে ব্যাংক এনে দেওয়া কিংবা সরকারি সেবাগুলোকে একটা অ্যাপের ভেতর নিয়ে আসা—এগুলো নিঃসন্দেহে এক একটা বড় অর্জন।

শেখ হাসিনা সরকার আমাদের এই ইকোসিস্টেমটাকে আক্ষরিক অর্থেই এক লাফে অনেক দূর পৌঁছে দিয়েছে বটে। কিন্তু সমস্যা হলো, ঐতিহাসিকভাবে আমরা এতটাই পেছনে ছিলাম যে, এই এক লাফের অভাবনীয় অগ্রগতির পরও এশিয়ার অন্যান্য উন্নত দেশগুলোর কাছাকাছিও আমরা পৌঁছাতে পারিনি। তারা যেখানে ছিল, সেখান থেকে তাদের দৌড় আর আমাদের শুরু বিন্দুর মধ্যকার ঐতিহাসিক ব্যবধানটা এখনো অনেক বড় রয়ে গেছে। তাই এই মুহূর্তে আমাদের স্রেফ ছোটখাটো কোনো সংস্কার বা জোড়াতালি দিলে চলবে না; আমাদের দরকার আরও একটা বিশাল ‘জায়ান্ট লিপ’ বা মহাপরাক্রমশালী লাফ।

কেন এই বড় লাফের কথা বলছি? কারণ, নীতিনির্ধারণী আর কৌশলগত জায়গা থেকে আমাদের সবচেয়ে বড় অন্ধবিন্দু বা ব্লাইন্ডস্পট হলো—আমরা একটা চমৎকার ‘কনজিউমার সোসাইটি’ বা প্রযুক্তি ব্যবহারকারী সমাজ তৈরি করতে পেরেছি ঠিকই, কিন্তু কোনো ‘ইনোভেশন ইকোনমি’ বা প্রযুক্তি উৎপাদনকারী অর্থনীতি গড়ে তুলতে পারিনি। আমাদের পুরো আইটি মডেলটা দাঁড়িয়ে আছে অত্যন্ত ভঙ্গুর আর সস্তা শ্রমের ওপর। এশিয়ার অন্য দেশগুলো যখন সেমিকন্ডাক্টর, সুপারকম্পিউটিং আর কোয়ান্টাম ডিফেন্সের মতো ‘হাই-ভ্যালু’ বা উচ্চ-মূল্যের পরিকাঠামো নিয়ে খেলছে, আমরা তখনো কেবল পশ্চিমাদের তৈরি করা প্রযুক্তির একজন সাধারণ উপভোক্তা হিসেবে রয়ে গেছি। আমাদের এই বর্তমান কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো আগামী দিনের কোয়ান্টাম অর্থনীতির যুগে বাংলাদেশকে এক বিশাল ভৌত দেয়ালের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে।

ট্রাডিশনাল ফ্রিল্যান্সিং মডেলের সীমাবদ্ধতা ও রূপান্তরের সংকট

আমরা প্রায়শই বুক ফুলিয়ে বা গর্ব করে বলি যে, বিশ্ববাজারে বাংলাদেশ অন্যতম বড় ডিজিটাল শ্রম সরবরাহকারী দেশ। কিন্তু এই অর্জনের পেছনের নির্মম সত্যটা হলো, আমাদের ফ্রিল্যান্সারদের সিংহভাগই মূলত লো-স্কিল বা মিডিয়াম-স্কিল (Low to Medium Skill) কাজের ওপর নির্ভরশীল। ডাটা এন্ট্রি, সাধারণ ওয়ার্ডপ্রেস কাস্টমাইজেশন, বেসিক গ্রাফিক্স ডিজাইন কিংবা প্রথাগত সার্চ ইঞ্জিন অপ্টিমাইজেশনের (SEO) মতো কাজগুলো দিয়েই আমাদের আইটি রেমিট্যান্সের চাকা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে সচল রয়েছে।

বর্তমান সময়ে অ্যাডভান্সড কোডিং এজেন্ট আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার স্বয়ংক্রিয় হাতিয়ারগুলোর কারণে এই প্রথাগত কাজগুলোর চাহিদা আন্তর্জাতিক বাজারে ধপাস করে বা নাটকীয়ভাবে কমে যাচ্ছে। যে কোড লিখতে আগে একজন সাধারণ প্রোগ্রামারের তিন দিন সময় লাগত, আধুনিক এআই মডেলগুলো এখন মানুষের সাহায্য ছাড়াই চোখের পলকে তা নিখুঁতভাবে নামিয়ে দিচ্ছে। ভিয়েতনাম বা ভারতের তরুণরা যেখানে দ্রুত ক্লাউড আর্কিটেকচার, ডেটা সায়েন্স আর সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইনের দিকে নিজেদের আপস্কিল (Upskill) করে ফেলেছে, আমাদের দেশের ছেলেরা এখনো সেই পুরোনো ফ্রেমওয়ার্কের বৃত্তেই আটকে আছে। ফলে, আন্তর্জাতিক বাজারে আমাদের কাজের মূল্য বা ‘আওয়ারলি রেট’ অন্য দেশগুলোর তুলনায় অনেক নিচে। আমরা যদি আমাদের এই বিশাল জনশক্তিকেfourth শিল্প বিপ্লবের এই আসল সুযোগ নেওয়ার উপযোগী করে এক ধাক্কায় নেক্সট লেভেলে নিয়ে যেতে না পারি, তবে এই সস্তা শ্রমের বাজার ধসে পড়া কেবল সময়ের ব্যাপার মাত্র।

অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা: হাইপারস্কেল ডেটাসেন্টার ও ল্যাটেন্সি সংকট

আমাদের হাই-টেক পার্ক আর ফোর-টিয়ার (Tier IV) জাতীয় ডেটাসেন্টারগুলো একটা প্রাথমিক অবকাঠামো হিসেবে অবশ্যই ভালো শুরু ছিল। কিন্তু উচ্চ-লেভেলের কম্পিউটেশন, এআই মডেল ট্রেইনিং কিংবা কোয়ান্টাম-রেডি ডাটা প্রসেসিং হোস্ট করার জন্য আমাদের যে ধরনের ভৌত সক্ষমতা দরকার, সেখানে এখনো এক বিশাল খাদের মতো ঘাটতি রয়েছে। একটি moderne আন্তর্জাতিক আইটি হাবের জন্য প্রয়োজন মেগাওয়াট স্কেলের নিরবচ্ছিন্ন ও стабилно বিদ্যুৎ গ্রিড এবং আল্ট্রা-লো ল্যাটেন্সি (Ultra-low Latency) ইন্টারন্যাশনাল কানেক্টিভিটি।

আমাদের সাবমেরিন কেবলের ধারণক্ষমতা আগের চেয়ে বাড়লেও, ভারতের চেন্নাই বা বোম্বাই কিংবা ভিয়েতনামের মতো হাইপারস্কেল ডেটাসেন্টার ইকোসিস্টেম আমরা এখনো ছূঁতে পারিনি। বিদ্যুৎ সরবরাহ আর কানেক্টিভিটির এই আপ-ডাউনের অস্থিরতার কারণে বৈশ্বিক বড় বড় টেক জায়ান্টরা তাদের রিজিওনাল হাব বা কম্পিউটেশনাল ক্লাস্টার স্থাপনের জন্য বাংলাদেশকে বেছে না নিয়ে সিঙ্গাপুর বা ভারতের দিকে চলে যাচ্ছে। ফলে আমরা অবকাঠামোগতভাবেও এক ধরনের পশ্চাৎপদ রয়ে যাচ্ছি।

একাডেমিয়া-ইন্ডাস্ট্রি ডিসকানেক্ট: এক দশক পুরোনো পাঠ্যসূচি

একটি দেশের প্রযুক্তির আসল মেরুদণ্ড কিন্তু তার উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা। আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে প্রতি বছর হাজার হাজার কম্পিউটার সায়েন্স (CSE) গ্র্যাজুয়েট বের হচ্ছেন ঠিকই, কিন্তু দুঃখজনক বাস্তব সত্য হলো, আমাদের একাডেমিয়া বা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাথে আইটি ইন্ডাস্ট্রির সরাসরি কোনো আত্মিক যোগাযোগ বা মেলবন্ধন নেই।

বিশ্বের সেরা ল্যাবগুলো যেখানে এখন লিনিয়ার অ্যালজেব্রা, মাল্টিভ্যারিয়েবল ক্যালকুলাস, স্টোকাস্টিক প্রসেস আর হার্ডওয়্যার আর্কিটেকচারের ওপর জানপ্রাণ ঢেলে দিচ্ছে—যা কোয়ান্টাম কম্পিউটিং এবং এআই অ্যালগরিদম বোঝার জন্য জলভাতের মতো অপরিহার্য—আমাদের দেশের বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাস এখনো এক দশক পুরোনো প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজ আর থিওরিটিক্যাল ডাটাবেজের ডাস্টবিনে আটকে আছে। ইন্ডাস্ট্রি যে ধরনের আধুনিক প্রবলেম সলভার বা কম্পিউটেশনাল আর্কিটেক্ট খুঁজছে, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তা সরবরাহ করতে পারছে না। এই সনাতনী শিক্ষাব্যবস্থা দিয়ে আমরা ডিগ্রিধারী বেকার তৈরি করতে পারব, কিন্তু কিউবিট ক্যাপাসিটি অর্জনের মেধা তৈরি করতে পারব না।

পলিসি ও রেগুলেটরি ফ্রেমওয়ার্কের ধীরগতি

প্রযুক্তির গতি যেখানে জ্যামিতিক বা এক্সপোনেনশিয়াল হারে বাড়ছে, আমাদের আমলাতান্ত্রিক নীতি বা পলিসির ফাইলগুলো সেখানে কচ্ছপের গতিতে চলে। বাংলাদেশে স্টার্টআপদের জন্য কিছু সরকারি ফান্ডিং বা হাই-টেক পার্কের ট্যাক্স হলিডের মতো পলিসি নেওয়া হলেও, ক্রস-বর্ডার পেমেন্ট গেটওয়ে, আন্তর্জাতিক ভেঞ্চার ক্যাপিটালের পুঁজি দেশে আনা এবং আইপি (Intellectual Property) বা বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পত্তি সুরক্ষার আইনি কাঠামো এখনো অত্যন্ত জটিল আর দমবন্ধ করা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার।

একজন বিদেশি বিনিয়োগকারী যখন ভিয়েতনাম বা থাইল্যান্ডে যত সহজে এক টেবিলে বসে ব্যবসা শুরু করতে পারেন, বাংলাদেশে আমলাতান্ত্রিক লাল ফিতার দৌরাত্ম্যে সেই প্রক্রিয়াটি অনেক দীর্ঘ ও যন্ত্রণাদায়ক হয়। এই রেগুলেশনের ধীরগতি এবং পলিসির ধারাবাহিকতার অভাব আমাদের আইটি খাতকে গ্লোবাল ইনভেস্টমেন্ট লিভারেজ পেতে বারবার বাধা দিচ্ছে। উগ্র ডানপন্থীদের দেখানো ‘পাকিস্তান মডেল’-এর মতো আদিম সামরিক উন্মাদনায় মেতে ওঠার চেয়ে এই অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দেয়ালগুলো ভেঙে নিজেদের অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত ভিতকে শক্তিশালী করাটাই এই মুহূর্তে আমাদের সবচেয়ে বড় এবং জরুরি জাতীয় कर्तव्य। এই দেয়ালগুলো ভাঙার জন্য আমাদের নীতিনির্ধারকদের এখন একটা মহাপরাক্রমশালী ‘জায়ান্ট লিপ’ বা মহালম্ফন দিতেই হবে।

প্রথাগত আউটসোর্সিংয়ের বৃত্ত ভেঙে ‘ইনোভেশন ইকোনমি’র পথে যেতে হলে

বিশ্ব আইটি খাতের ক্ষমতার চাকা যখন সিলিকন ভ্যালি থেকে এশিয়ায় স্থানান্তরিত হচ্ছে এবং শক্তির সংজ্ঞা পারমাণবিক বোমা থেকে কিউবিট ক্যাপাসিটিতে রূপান্তরিত হচ্ছে, তখন বাংলাদেশের জন্য প্রথাগত আইটি সেবার বৃত্তে বন্দি থাকার আর কোনো সুযোগ নেই।  আমরা আমাদের কাঠামোগত যে দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করেছি, সেগুলোকে কাটিয়ে উঠতে হলে দেশের অভ্যন্তরীণ প্রধান খাতগুলোতে প্রযুক্তির কৌশলগত ও উচ্চ-মূল্যের (High-value) প্রয়োগ ঘটাতে হবে। আমাদের লক্ষ্য হতে হবে সস্তা শ্রমের ‘আউটসোর্সিং ডেস্টিনেশন’ থেকে নিজেদের উন্নীত করে এমন এক ‘কোয়ান্টাম ও ইনোভেশন ইকোনমি’ তৈরি করা, যা এশিয়ার এই নতুন সমীকরণে আমাদের একটি শক্ত লিভারেজ বা সুবিধা দেবে। নিচে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে প্রযুক্তিগত রূপান্তরের প্রধান প্রধান কৌশলগত ক্ষেত্রসমূহ বিশদভাবে বিশ্লেষণ করা হলো:

১. ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার (DPI) এবং ফিনটেক বিপ্লব

ভারতের ‘ইন্ডিয়া স্ট্যাক’ যেভাবে তাদের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকে বদলে দিয়েছে, বাংলাদেশের জন্যও নিজস্ব ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার বা ডিপিআই-কে বৈশ্বিক মানদণ্ডে নিয়ে যাওয়া এখন সবচেয়ে বড় কৌশলগত অগ্রাধিকার।

রিয়েল-টাইম পেমেন্ট ইন্টারঅপারেবিলিটি এবং ক্রস-বর্ডার ফিনটেক

বাংলাদেশে বিকাশ, রকেট বা নগদের মতো মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (MFS) এবং ইন্টারঅপারেবল ডিজিটাল ট্রানজেকশন প্ল্যাটফর্ম ‘বিনিময়’ আমাদের আর্থিক অন্তর্ভুক্তির একটি চমৎকার ফ্রন্ট-এন্ড তৈরি করেছে। কিন্তু এই পরিকাঠামোকে এখন নেক্সট-লেভেলে নিয়ে যেতে হবে। আমাদের এমন একটি ফিনটেক ইকোসিস্টেম দরকার যা এশিয়ার অন্যান্য পেমেন্ট গেটওয়ে (যেমন ভারতের UPI বা সিঙ্গাপুরের PayNow) এর সাথে সরাসরি যুক্ত হতে পারে। এটি করা সম্ভব হলে আমাদের রেমিট্যান্স আসার খরচ প্রায় শূন্যে নেমে আসবে এবং ক্ষুদ্র ফ্রিল্যান্সার বা ক্ষুদ্র কুটির শিল্পীরা সরাসরি এশিয়ার বাজারে তাদের পণ্য ও সেবা বিক্রি করে রিয়েল-টাইমে টাকা দেশে আনতে পারবেন।

ন্যাশনাল ডাটা গভর্ন্যান্স ও ডাটা ডেমোক্রেসিকরণ

আমাদের জাতীয় পরিচয়পত্র (NID), জন্ম নিবন্ধন এবং স্মার্ট নাগরিক ডাটাবেজে বিপুল পরিমাণ উপাত্ত রয়েছে। এই ডেটাকে প্রথাগত সাইলো (Silo) বা বিচ্ছিন্ন অবস্থায় না রেখে একটি সুরক্ষিত, ওপেন এপিআই (API) ভিত্তিক সেন্ট্রাল ডাটা এক্সচেঞ্জ আর্কিটেকচারে রূপান্তর করতে হবে। এর ফলে স্থানীয় স্টার্টআপ এবং আইটি কোম্পানিগুলো আইনসম্মতভাবে এই বেনামী (Anonymized) ডাটা ব্যবহার করে ক্রেডিট স্কোরিং, লজিস্টিকস অপ্টিমাইজেশন এবং কাস্টমাইজড ইনস্যুরেন্স প্রোডাক্ট তৈরি করতে পারবে।

২. এগ্রি-টেক এবং ফুড সিকিউরিটি অপ্টিমাইজেশন

বাংলাদেশ একটি কৃষিপ্রধান এবং ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। এশিয়ার নতুন টেক-ট্রেন্ডকে আমাদের কৃষির উৎপাদনশীলতা এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কাজে লাগাতে হবে।

সাপ্লাই চেইন অটোমেশন ও প্রিসিশন এগ্রিকালচার

আমাদের দেশে কৃষকরা প্রায়শই ফসলের সঠিক মূল্য পান না, আবার অন্যদিকে শহরের ভোক্তারা চড়া দামে পণ্য কেনেন। এই বাজার সিন্ডিকেট এবং লজিস্টিকস অপচয় দূর করতে আইওটি (IoT) এবং ডাটা-ড্রিভেন সাপ্লাই চেইন নেটওয়ার্ক তৈরি করা জরুরি। কোল্ড স্টোরেজগুলোর তাপমাত্রা রিয়েল-টাইমে ট্র্যাক করা এবং দেশের কোন অঞ্চলে কোন ফসলের কেমন চাহিদা রয়েছে, তা গাণিতিক মডেলের মাধ্যমে কৃষকদের আগে থেকে জানাতে পারলে ফসলের অপচয় ৩০ শতাংশ কমিয়ে আনা সম্ভব। একই সাথে মাটির পুষ্টিগুণ এবং আবহাওয়ার সূক্ষ্মতম পরিবর্তনের ডেটা বিশ্লেষণ করে সুনির্দিষ্ট সার ও সেচ ব্যবস্থাপনা (Precision Agriculture) নিশ্চিত করতে হবে।

৩. ম্যানুফ্যাকচারিং এবং সেমিকন্ডাক্টরের প্রান্তিক ইকোসিস্টেম

তাইওয়ান বা ভিয়েতনামের মতো আমরা হয়তো এখনই ট্রিলিয়ন ডলারের চিপ উৎপাদন কারখানা (Fab) তৈরি করতে পারব না, তবে সেমিকন্ডাক্টর ভ্যালু চেইনের একটি সুনির্দিষ্ট অংশে আমরা নিজেদের জায়গা করে নিতে পারি।

আইসি ডিজাইন (IC Design) এবং টেস্টিং হাব

চিপ ম্যানুফ্যাকচারিং অত্যন্ত ব্যয়বহুল হলেও, ইন্টিগ্রেটেড সার্কিট (IC) ডিজাইন বা চিপের নকশা তৈরি করার জন্য মূলত প্রয়োজন উচ্চ গাণিতিক ও প্রকৌশলগত মেধা। বাংলাদেশের কিছু Olympian মেধার স্থানীয় কোম্পানি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাব ইতিমধ্যেই বৈশ্বিক বাজারের জন্য আইসি ডিজাইনের কাজ শুরু করেছে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় যদি আমাদের দেশের মেধা তৈরি করার ল্যাবগুলোকে চিপ ডিজাইন সফটওয়্যাারের (যেমন Synopsys বা Cadence) লাইসেন্স এবং হাই-পারফরম্যান্স কম্পিউটিং সাপোর্ট দেওয়া যায়, তবে আগামী ৫ বছরে বাংলাদেশ এশিয়ার অন্যতম বড় ‘চিপ ডিজাইন ও ভিএলএসআই (VLSI) আউটসোর্সিং’ হাবে পরিণত হতে পারে।

৪. স্মার্ট গভর্ন্যান্স ও জুডিশিয়াল ম্যানেজমেন্ট

সরকারি সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি এবং বিচার বিভাগের মামলার জট (Backlog) আমাদের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার একটি বড় বাধা।

জুডিশিয়াল প্রসেস অটোমেশন

আমাদের দেশের আদালতগুলোতে ঝুলে থাকা লাখ লাখ মামলার ফাইল ও রায়গুলোকে ডিজিটাল ডাটাবেজে রূপান্তর করে একটি ডাইনামিক ক্যাটাগরি গ্রーフ তৈরি করতে হবে। প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে মামলার সমন জারি, শুনানির তারিখ নির্ধারণ এবং নথিপত্র ব্যবস্থাপনা স্বয়ংক্রিয় করা হলে বিচারকদের প্রশাসনিক কাজের চাপ কমে যাবে। এর ফলে মামলার রায়ের গতি বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে এবং দেশের লিগ্যাল ইকোসিস্টেমে এক অভূতপূর্ব স্বচ্ছতা আসবে। এটিই প্রমাণ করে যে, আদিম বন্দুক বা পারমাণবিক অস্ত্রের উন্মাদনা নয়, বরং অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থার প্রযুক্তিগত আধুনিকীকরণই একটি রাষ্ট্রকে প্রকৃত শক্তি দেয়।

নীতিনির্ধারণী দেয়াল ও ডিজিটাল কলোনিয়ালিজমের ঝুঁকি

বিশ্ব আইটি খাতের ক্ষমতার চাকা যখন সিলিকন ভ্যালি থেকে এশিয়ার দিকে ঘুরছে, তখন বাংলাদেশ যদি কেবল উদাসীন দর্শক হয়ে থাকে, তবে আমরা একবিংশ শতাব্দীর এক নতুন ধরনের পরাধীনতা বা ‘ডিজিটাল কলোনিয়ালিজমের’ (Digital Colonialism) শিকার হব। এই নতুন কলোনিয়ালিজমে কোনো দেশ জমি দখল করে না, বরং তারা একটি দেশের সম্পূর্ণ ডেটা বা উপাত্ত, পেমেন্ট ইকোসিস্টেম এবং ডিজিটাল পরিকাঠামো নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। বাংলাদেশ এই মুহূর্তে এই অদৃশ্য ঝুঁকির মুখে দাঁড়িয়ে আছে। এর প্রধান কারণ আমাদের পলিসি বা নীতিনির্ধারণী কাঠামোর কিছু বড় ধরনের ধীরগতি এবং বৈশ্বিক সাইবার নিরাপত্তার নতুন চ্যালেঞ্জগুলো অনুধাবন করতে না পারা।

পলিসি বটলেনেক এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা

আমাদের দেশের সবচেয়ে বড় সংকট হলো, প্রযুক্তির গতি এক্সপোনেনশিয়াল বা জ্যামিতিক হারে বাড়ে, কিন্তু আমাদের আমলাতান্ত্রিক পলিসি বা ফাইলের গতি বাড়ে লিনিয়ার বা rৈখিক গতিতে। ২০২৩-২০২৪ সালের এই সময়ে এসেও একজন আন্তর্জাতিক ভেঞ্চার ক্যাপিটালিস্ট বা বিদেশি বিনিয়োগকারী যখন বাংলাদেশে স্টার্টআপ বা ডিপ-টেক খাতে বিনিয়োগ করতে চান, তখন তাকে টাকা দেশে আনা এবং লভ্যাংশ ফেরত নেওয়ার ক্ষেত্রে জটিল ব্যাংকিং নিয়মের মুখোমুখি হতে হয়।

একই সাথে, আমাদের ক্রস-বর্ডার পেমেন্ট রেগুলেশন এখনো প্রথাগত ফ্রিল্যান্সিং মডেলের কথা মাথায় রেখে তৈরি, যা বৈশ্বিক হাই-ভ্যালু টেক বাউন্ডারির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ভিয়েতনাম বা সিঙ্গাপুরের মতো দেশগুলো যেখানে বিদেশি মেধা ও পুঁজি আকর্ষণের জন্য ‘সবুজ গালিচা’ পেতে রেখেছে, আমাদের এখানে পলিসির ধারাবাহিকতার অভাব এবং ট্যাক্স স্ট্রাকচারের জটিলতা নতুন উদ্ভাবনগুলোকে দেশের বাইরে (যেমন সিঙ্গাপুর বা দুবাইতে) ফ্লিপ বা স্থানান্তরিত হতে বাধ্য করছে।

পোস্ট-কোয়ান্টাম ক্রিপ্টোগ্রাফিক সংকট (The Cryptographic Crisis)

এশিয়ার দেশগুলো, বিশেষ করে চীন ও ভারত যখন কোয়ান্টাম কম্পিউটেশনের দিকে দ্রুত ধাবিত হচ্ছে, তখন আমাদের জাতীয় নিরাপত্তা এবং ব্যাংকিং খাতের ওপর এক বিশাল অদৃশ্য সাইবার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। বর্তমান বিশ্বের এবং বাংলাদেশের প্রায় সমস্ত ব্যাংকিং লেনদেন, পাসওয়ার্ড এবং রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য সুরক্ষিত আছে আরএসএ (RSA) বা ট্রাডিশনাল এনক্রিপশনের ওপর ভিত্তি করে।

কোয়ান্টাম সুপ্রিমেসি বা কোয়ান্টাম কম্পিউটারের ক্ষমতা যখন একটি সুনির্দিষ্ট স্তরে পৌঁছাবে (যা ২০৩০-এর দশকের শুরুতে প্রত্যাশিত), তখন পিটার শোর-এর আবিষ্কৃত কোয়ান্টাম অ্যালগরিদম ব্যবহার করে এই প্রথাগত এনক্রিপশন মাত্র কয়েক মিনিটে ভেঙে ফেলা সম্ভব হবে। এর অর্থ হলো, আমাদের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ ডেটা থেকে শুরু করে জাতীয় পরিচয়পত্রের সমস্ত এনক্রিপশন প্রোটোকল রাতারাতি অরক্ষিত হয়ে পড়তে পারে। বাংলাদেশ যদি এখন থেকেই ‘পোস্ট-কোয়ান্টাম ক্রিপ্টোগ্রাফি’ (PQC) বা কোয়ান্টাম-সুরক্ষিত নেটওয়ার্ক আর্কিটেকচার তৈরি করার নীতিগত ও কৌশলগত প্রস্তুতি শুরু না করে, তবে আগামী এক দশকে আমাদের সমগ্র ফিন্যান্সিয়াল ইকোসিস্টেম এক চরম সার্বভৌমত্ব সংকটের মুখোমুখি হবে।

আগামী ১০ বছরের সুনির্দিষ্ট কি হতে পারে?

একজন টেক-ফিউচারিস্ট এবং আইটি বিশেষজ্ঞ হিসেবে, বৈশ্বিক এবং দেশীয় প্রযুক্তির এই ক্ষমতার ভারসাম্য বদলের গতিপথ বিশ্লেষণ করে আগামী ১০ বছরের জন্য ৫টি সুনির্দিষ্ট গাণিতিক ও কৌশলগত পূর্বাভাস নিচে দেওয়া হলো:

১. এআই এজেন্টের একাধিপত্য ও প্রথাগত ফ্রিল্যান্সিংয়ের অবসান (২০২৮)

আগামী ৩ বছরের মধ্যে (২০২৮ সালের মধ্যে) প্রথাগত ডেটা এন্ট্রি, বেসিক কিউএ (QA) টেস্টিং এবং সাধারণ ইউআই/ইউএক্স ফ্রন্ট-এন্ড ডেভেলপমেন্টের মতো কাজগুলো সম্পূর্ণভাবে এআই এজেন্টরা দখল করে নেবে। এর ফলে বাংলাদেশের আইটি খাতের বর্তমান ফ্রিল্যান্সিং আয়ের প্রায় ৬০ শতাংশ বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়বে। যারা দ্রুত ক্লাউড ডেটা আর্কিটেকচার, এআই মডেল ফাইন-টিউনিং এবং প্রম্পট ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মতো উচ্চ-দক্ষতার কাজে নিজেদের রূপান্তর করতে পারবে না, তারা আন্তর্জাতিক বাজার থেকে ছিটকে যাবে।

২. এশিয়ার একক সেমিকন্ডাক্টর ও কম্পিউটেশনাল মনোপলি (২০৩০)

২০৩০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক কম্পিউটেশনাল ক্ষমতার (Computational Power) এবং বিশেষায়িত এআই সিলিকন চিপের প্রায় ৮০ শতাংশ এককভাবে এশিয়ার (তাইওয়ান, দক্ষিণ কোরিয়া, চীন, জাপান ও ভারত) নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে। সিলিকন ভ্যালি তখন মূলত একটি ‘ডিজাইন এবং ক্যাপিটাল হাব’ হিসেবে থাকবে, কিন্তু ভৌত পৃথিবীর মূল উৎপাদন ও নিয়ন্ত্রণের চাবিকাঠি থাকবে এশীয় অক্ষের হাতে।

৩. বাংলাদেশের প্রথম দেশীয় লার্জ ফাউন্ডেশনাল মডেল (২০৩১)

আগামী ৫ থেকে ৭ বছরের মধ্যে বাংলাদেশ নিজস্ব ডেটা সোভারেনটি বা উপাত্তের সার্বভৌমত্ব রক্ষার তাগিদে সম্পূর্ণ নিজস্ব বাংলা ল্যাঙ্গুয়েজ এবং কালচারাল কনটেক্সট-ভিত্তিক একটি লার্জ ফাউন্ডেশনাল মডেল (Large Foundational Model) তৈরি করতে বাধ্য হবে। এটি আমাদের সরকারি সেবা, আইনি ব্যবস্থা এবং শিক্ষা খাতের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করবে, যার ফলে পশ্চিমা বা অন্য কোনো দেশের এআই মডেলের ওপর আমাদের নির্ভরতা কমে আসবে।

৪. কোয়ান্টাম ক্লাউড ইনফ্রাস্ট্রাকচারের উত্থান (২০৩৩)

২০৩৩ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে কোয়ান্টাম কম্পিউটিং ল্যাবরেটরি থেকে বের হয়ে কমার্শিয়াল ক্লাউড সার্ভিসে রূপ নেবে। আইবিএম, গুগল এবং এশিয়ার হুয়াওয়ে বা টাটা তাদের কোয়ান্টাম প্রসেসরগুলোকে ক্লাউডের মাধ্যমে সবার জন্য উন্মুক্ত করবে। বাংলাদেশের মেগা-কোম্পানি এবং ফিনটেক সেক্টর তাদের লজিস্টিকস অপ্টিমাইজেশন এবং ফ্রড ডিটেকশনের জন্য এই কোয়ান্টাম ক্লাউড সাবক্রিপশন ব্যবহার করা শুরু করবে।

৫. আইপি-ভিত্তিক নতুন বাংলাদেশি স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম (২০৩৬)

আজ থেকে দশ বছর পর, অর্থাৎ ২০৩৬ সালের মধ্যে বাংলাদেশের আইটি খাতের মূল রাজস্ব বা রেমিট্যান্স আর ‘ঘণ্টা চুক্তির সস্তা শ্রম’ (Hourly Labour) থেকে আসবে না। এটি আসবে মূলত নিজস্ব বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ বা আইপি (Intellectual Property) এবং সফটওয়্যার-অ্যাজ-আ-সার্ভিস (SaaS) মডেল থেকে। বিশেষ করে এগ্রি-টেক, মাইক্রো-ফিন্যান্স ফিনটেক এবং জলবায়ু পরিবর্তন সহনশীল প্রযুক্তি রপ্তানি করে বাংলাদেশ এশিয়ার বাজারে একটি সুনির্দিষ্ট ও শক্তিশালী অংশীদার হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করবে।

আমাদের পরবর্তী ১০ বছরের রোডম্যাপ

সিলিকন ভ্যালি থেকে এশিয়ার দিকে বিশ্ব আইটি খাতের ক্ষমতার ভারসাম্য বদলের এই নতুন সমীকরণটি বাংলাদেশের জন্য একই সাথে একটি চরম সতর্কবার্তা এবং এক ঐতিহাসিক সুযোগ। ২০২৬ সালের এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আমাদের বুঝতে হবে যে, প্রযুক্তির এই নতুন জোয়ারে আমরা যদি শুধু অন্যের তৈরি করা সেবার উপভোক্তা বা সস্তা শ্রমের জোগানদার হয়ে থাকি, তবে গ্লোবাল ভ্যালু চেইনে আমরা চিরকালের জন্য পিছিয়ে পড়ব। এশিয়ার এই নতুন প্রযুক্তিগত পরাশক্তিদের (চীন, ভারত, তাইওয়ান, দক্ষিণ কোরিয়া) সাথে কাঁধ মেলাতে হলে এবং নিজেদের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে হলে বাংলাদেশকে অবিলম্বে একটি সুনির্দিষ্ট, আগ্রাসী এবং বাস্তবমুখী অ্যাকশন প্ল্যান নিয়ে মাঠে নামতে হবে।

আগামী এক দশকে গ্লোবাল টেক-লিডারে পরিণত হতে বাংলাদেশের জন্য ৪টি সুনির্দিষ্ট করণীয় নিচে তুলে ধরা হলো:

১. ‘সার্ভিস মডেল’ থেকে ‘আইপি-ড্রিভেন ইনোভেশন’ মডেলে রূপান্তর

আমাদের জাতীয় আইটি পলিসিকে আমূল বদলে ফেলতে হবে। এতদিন আমরা ফ্রিল্যান্সিংয়ের সংখ্যাগত দিক (যেমন: কত লাখ ফ্রিল্যান্সার আছে) দিয়ে নিজেদের সাফল্য পরিমাপ করেছি। এখন সময় এসেছে গুণগত মান এবং বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ (Intellectual Property) দিয়ে সাফল্য মাপার। দেশীয় আইটি কোম্পানিগুলো যাতে শুধু পশ্চিমাদের সস্তা কোড না লিখে নিজস্ব কাস্টমাইজড সফটওয়্যার, ইউনিক ফিনটেক সলিউশন এবং আইপি তৈরি করতে পারে, তার জন্য বিশেষ ট্যাক্স ইনসেনティブ এবং আন্তর্জাতিক পেটেন্ট ফাইলিং ফান্ড গঠন করতে হবে।

২. উচ্চতর গণিত, ডেটা সায়েন্স এবং চিপ ডিজাইনে মানবসম্পদ উন্নয়ন

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কম্পিউটার সায়েন্স (CSE) পাঠ্যসূচি থেকে এক দশক পুরোনো সিলেবাস হটিয়ে সেখানে লিনিয়ার অ্যালজেব্রা, স্টোকাস্টিক প্রসেস, অ্যাডভান্সড ডেটা অ্যানালিটিক্স এবং ভিএলএসআই (VLSI) বা চিপ ডিজাইন কোর্স বাধ্যতামূলক করতে হবে। দেশের শীর্ষস্থানীয় মেধাগুলোকে শুধু ‘কোড লিখিয়ে’ না বানিয়ে গবেষক ও আর্কিটেক্ট হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি, ভারতের ‘আইআইটি’ (IIT) মডেলের আদলে দেশের অন্তত ৩টি শীর্ষ প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশেষায়িত ‘ডিপ-টেক ও কোয়ান্টাম-রেডি ল্যাবরেটরি’ স্থাপনের জন্য রাষ্ট্রীয় বাজেট বরাদ্দ দিতে হবে।

৩. পোস্ট-কোয়ান্টাম ক্রিপ্টোগ্রাফি ও ডেটা সার্বভৌমত্ব রক্ষা

আমাদের কেন্দ্রীয় ব্যাংক, প্রতিরক্ষা খাত এবং জাতীয় পরিচয়পত্রের (NID) মতো সংবেদনশীল ডেটা পরিকাঠামোকে সুরক্ষিত করতে একটি ‘জাতীয় কোয়ান্টাম নিরাপত্তা টাস্কফোর্স’ গঠন করা এখন সময়ের দাবি। আগামী ৫ বছরের মধ্যে দেশের সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ এনক্রিপশন প্রোটোকলকে ‘পোস্ট-কোয়ান্টাম ক্রিপ্টোগ্রাফি’ (PQC) স্ট্যান্ডার্ডে আপগ্রেড করতে হবে। একই সাথে, দেশের জনগণের ডেটা যেন কোনো বিদেশি ক্লাউড বা প্ল্যাটফর্মের অধীনে চলে না যায়, তার জন্য একটি কঠোর ‘ডেটা সোভারেনটি অ্যাক্ট’ বা উপাত্ত সার্বভৌমত্ব আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে।

৪. আমলাতান্ত্রিক ও আর্থিক রেগুলেশনের আধুনিকীকরণ

বিদেশি বিনিয়োগ বা আন্তর্জাতিক ভেঞ্চার ক্যাপিটাল আকর্ষণ করার জন্য আমাদের ক্রস-বর্ডার পেমেন্ট রেগুলেশন এবং ব্যাংকিং নীতি সহজ করতে হবে। একজন বিদেশি বিনিয়োগকারী যেন সিঙ্গাপুর বা ভিয়েতনামের মতোই সহজে বাংলাদেশে পুঁজি নিয়ে আসতে পারেন begging বা লভ্যাংশ ফেরত নিয়ে যেতে পারেন, সেই আইনি বাধাগুলো দূর করতে হবে। ফ্রিল্যান্সার এবং স্টার্টআপদের জন্য আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গেটওয়ের মাধ্যমে সরাসরি এবং দ্রুত অর্থ দেশে আনার প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ আমলাতন্ত্র-মুক্ত করতে হবে।

তাহলে কি করবো?

আমরা একটি দেশের প্রযুক্তিগত যাত্রার এমন এক মোড়ে দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে অতীতের সফলতা আগামী দিনের টিকে থাকার গ্যারান্টি দেয় না। বাংলাদেশ তার ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্ক ও মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের অবকাঠামো দিয়ে যে চমৎকার ফ্রন্ট-এন্ড তৈরি করেছে, তা প্রশংসনীয়। কিন্তু যখন ক্ষমতার মূল সমীকরণটি সফটওয়্যার থেকে সরে গিয়ে ভৌত হার্ডওয়্যার, অ্যাডভান্সড কম্পিউটেশন এবং এশীয় সেমিকন্ডাক্টর মনোপলির দিকে চলে যাচ্ছে, তখন আমাদের পুরোনো ছকে বসে থাকার কোনো সুযোগ নেই।

সিলিকন ভ্যালির একাধিপত্যের পতন এবং এশিয়ার এই নতুন উত্থান আমাদের সামনে যে জানালাটি খুলে দিয়েছে, তা চিরকাল খোলা থাকবে না। এখন সিদ্ধান্ত আমাদের—আমরা কি সস্তা শ্রমের ফ্রিল্যান্সিং মডেলের আত্মতুষ্টিতে মগ্ন থেকে নতুন যুগের ‘ডিজিটাল কলোনি’তে পরিণত হব? নাকি দূরদর্শী পলিসি, গভীর গাণিতিক মেধা এবং নিজস্ব উদ্ভাবন শক্তিকে কাজে লাগিয়ে এশিয়ার এই নতুন টেক-ইকুয়েশনের অন্যতম প্রধান অংশীদার হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করব?

সময় ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই আমাদের এই রূপান্তরের সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আর সেই যাত্রার শুরুটা হতে হবে আজ, এই মুহূর্ত থেকেই।

আরও দেখুন: