যদি কখনো নির্জন কোনো শান্ত রাতে তাঁর ‘শায়ের কা আনজাম’-এর ভাবুক পৃষ্ঠাগুলোতে ভুল করে ডুব দেন, কিংবা ‘হুস্ন কি দেবী’র মনস্তাত্ত্বিক ও দার্শনিক গভীরতার মুখোমুখি হন—তবে আপনি বুঝতে পারবেন উর্দু গদ্যে প্রেমের বাহ্যিক রূপের আড়ালে মানবমনের গহীন আঁধার ও সূক্ষ্ম অনুভূতিকে তিনি কতটা নিপুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছিলেন। বিধাতা নিয়াজ ফতেহপুরীকে আয়ু দিয়েছিলেন প্রায় ৮২ বছর (১৮৮৪ – ১৯৬৬)। সেই দীর্ঘ জীবনকালে তিনি কেবল আফসানা বা ছোটগল্পের বাঁধাধরা ছক তৈরি করেননি, বরং সাহিত্যকে দর্শনের এক সুউচ্চ শিখরে পৌঁছে দিয়েছিলেন।
প্রেমচন্দের সামাজিক বাস্তবতাবাদ কিংবা মান্টোর নগ্ন আঁধার যেখানে সমাজকে সরাসরি আঘাত করছিল, নিয়াজ ফতেহপুরী সেখানে হাঁটছিলেন এক অন্য আলোছায়ার পথে। তিনি ছিলেন মানবচিন্তা, মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ ও ভাববাদের (Idealism) পরম রূপকার। আউটার ওয়ার্ল্ড বা বাইরের জগতের চেয়ে মানুষের ইনার ওয়ার্ল্ড বা ভেতরের মানসিক ভাঙাগড়াকে তিনি নিজের সাহিত্যের ক্যানভাস বানিয়েছিলেন। সাহিত্য পত্রিকা ‘নিগার’ (Nigar)-এর মাধ্যমে পুরো এক প্রজন্মকে যুক্তিবাদ ও কাব্যিক মনস্তত্ত্বের পাঠ শিখিয়েছিলেন এই প্রজ্ঞাবান সাহিত্যসাধক।
আজ উর্দু সাহিত্যের এই অসাধারণ চিন্তাবিদ ও মনস্তাত্ত্বিক কথাসাহিত্যিকের স্মৃতিকে শ্রদ্ধা জানিয়ে এবং তাঁর ভাবধারার প্রতি অকৃত্রিম ঋণ স্বীকার করে আমার এই নিবেদন।
নিয়াজ ফতেহপুরী
“Adab ka maqsad sirf zahiri khubsurati ya waqti jazbaat ka izhar nahi, balki insani zehn aur rooh ki un gaharaiyon ko kholna hai jahan jazbaat, falsafa aur nafsiyat ek ho jaate hain… Jo adab insan ko khud se muta’arif na karaye, woh adhuura hai.”
“সাহিত্যের উদ্দেশ্য কেবল বাহ্যিক সৌন্দর্য কিংবা ক্ষণিকের আবেগের প্রকাশ নয়; বরং মানুষের মন ও আত্মার সেই গভীরতম গলিগুলোকে উন্মোচিত করা, যেখানে আবেগ, দর্শন এবং মনস্তত্ত্ব একাকার হয়ে যায়… যে সাহিত্য মানুষকে নিজের মনের আয়নার মুখোমুখি না দাঁড় করায়, তা অসম্পূর্ণ।”
নিয়াজের শৈশব ও ‘নিগার’-এর জন্ম
১৮৮৪ সালে উত্তরপ্রদেশের ফতেহপুর জেলায় জন্ম নেন নিয়াজ মোহাম্মদ খান—যাঁকে সাহিত্যজগৎ একনামে চেনে ‘নিয়াজ ফতেহপুরী’ হিসেবে। ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় ও শাস্ত্রীয় শিক্ষার মাধ্যমে তাঁর শৈশব শুরু হলেও, তরুণ বয়সেই ফারসি, আরবি ও ইংরেজি সাহিত্যের প্রতি তাঁর অগাধ তৃষ্ণা তৈরি হয়।
নিয়াজের সাহিত্যজীবনের সবচেয়ে বড় মাইলফলক ছিল ১৯২২ সালে তাঁর বিখ্যাত সাহিত্য পত্রিকা ‘নিগার’ (Nigar) প্রকাশ। এই পত্রিকাটি কেবল একটি সাময়িকী ছিল না; এটি হয়ে উঠেছিল স্বাধীন চিন্তা, মুক্তবুদ্ধি, মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ ও আধুনিক গদ্যের এক তীর্থক্ষেত্র। ‘নিগার’-এর পাতায় তিনি ধর্মীয় গোঁড়ামি ও অন্ধ বিশ্বাসের বিরুদ্ধে যেমন যুক্তি দিয়ে লিখেছেন, তেমনি গদ্যের অলংকারকে সমৃদ্ধ করেছেন ভাববাদী চিন্তা দিয়ে।
ভাববাদ ও মনস্তাত্ত্বিক দর্শনের বিস্তার
নিয়াজ ফতেহপুরীর আফসানার মূল শক্তি ছিল তাঁর মনস্তাত্ত্বিক উন্মোচন। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষের আচরণ কেবল বাইরের জগতের পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে না; তার পেছনের আসল চালিকাশক্তি হলো তার অবচেতন মন, গোপন আকুলতা আর নান্দনিক তৃষ্ণা।
উর্দু আফসানায় যেখানে গল্প বলটাই ছিল প্রধান, নিয়াজ সেখানে যুক্ত করলেন—
- চরিত্রের ভেতরের আত্মসংঘাত ও মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ।
- প্রেম ও সৌন্দর্যের এক অতিলৌকিক ও দার্শনিক রূপ।
- প্রথাগত রোমান্টিসিজমের সাথে যুক্তিবাদ ও চিন্তাশীলতার মেলবন্ধন।
নিয়াজের আফসানা: মানবমনের অলিগলি ও নন্দনতত্ত্ব
‘শায়ের কা আনজাম’ (Shaair Ka Anjam):
‘হুস্ন কি দেবী’ (Husn Ki Devi):
মনস্তাত্ত্বিক উক্তি ও গদ্যরীতি:
যুক্তিযোগ, বিতর্ক এবং শেষ দিনগুলো
নিয়াজ ফতেহপুরী কেবল রূপ বা মনস্তত্ত্ব নিয়ে লিখে ক্ষান্ত হননি; তিনি ছিলেন একজন অকুতোভয় যুক্তিবাদী ও চিন্তাবিদ। ধর্মীয় কুপমণ্ডূকতা ও সামাজিক কুসংস্কারের বিরুদ্ধে ‘নিগার’-এ তাঁর লেখাগুলো তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল। বহুবার তাঁকেও সামাজিক বয়কট ও সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়েছে, কিন্তু যুক্তির পথ থেকে তিনি সরেননি।
সাহিত্যে অনন্য অবদানের জন্য ভারত সরকার তাঁকে ১৯৬২ সালে অন্যতম সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘পদ্মভূষণ’-এ ভূষিত করে। জীবনের শেষ ভাগে, ১৯৬২ সালে তিনি করাচিতে স্থানান্তরিত হন এবং সেখানেও নিজের সাহিত্যচর্চা অব্যাহত রাখেন। ১৯৬৬ সালের ২৪ মে এই মহান প্রজ্ঞাবান লেখক ও সম্পাদক চিরতরে বিদায় নেন।
