শরতের বিদায় আর শীতের আগমনের মধ্যবর্তী কালটি হলো হেমন্ত—যার বাতাসের স্পর্শে থাকে এক হালকা হিমেল অনুভূতি, স্নিগ্ধতা আর কিছুটা উদাস মনখারাপের সুর। ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতে ঠিক এই ঋতু এবং এর প্রকৃতির অন্তর্দাহকে যেন হুবহু সুরে রূপান্তর করেছেন সংগীত সাধকেরা। আর সেই সৃষ্টির নামই হলো রাগ হেমন্ত।
হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীতের (Hindustani Classical Music) জগতে রাগ হেমন্ত খুব প্রাচীন কোনো বৈদিক বা অপ্রচলিত রাগ না হলেও, বিংশ শতাব্দীর প্রথমভাগ থেকে আধুনিক শাস্ত্রীয় সংগীতের জলসায় এটি অত্যন্ত জনপ্রিয় ও প্রিয় একটি রাগ হিসেবে স্থান করে নিয়েছে। বিশেষ করে সেতার, সরোদ এবং খেয়াল পরিবেশনায় রাগ হেমন্তের চলন শ্রোতার মনে এক পরম প্রশান্তি ও গভীর ধ্যানমগ্নতার সৃষ্টি করে।
রাগের নামকরণের পেছনে ও উৎস
অনেকের মতে, রাগ হেমন্তের আধুনিক রূপকার হলেন প্রখ্যাত শাস্ত্রীয় সংগীতজ্ঞ ও ওস্তাদ বাবা আলাউদ্দীন খাঁ (মাইহার ঘরানার প্রতিষ্ঠাতা)। তবে এর পাশাপাশি পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখণ্ডেজির সংগৃহীত রচনার মধ্যেও হেমন্তের চলনের ঐতিহাসিক উল্লেখ পাওয়া যায়। ঋতুভিত্তিক রাগগুলোর (যেমন—বসন্ত, মেঘ, মল্লার) মতো রাগ হেমন্তও প্রকৃতি ও ঋতুর ভাবকে কেন্দ্র করেই বিকশিত হয়েছে।
রাগের সাঙ্গীতিক পরিচয় ও ব্যাকরণ
রাগ হেমন্ত মূলত একটি প্রাতঃকালীন বা নৈশকালীন গম্ভীর প্রকৃতির রাগ। এর কাঠামোতে রাগ ‘ইয়ামন’ (Yaman) এবং ‘শুদ্ধ কল্যাণ’ (Shuddha Kalyan)-এর ছায়া দেখা গেলেও এর নিজস্ব চলন একেবারেই স্বতন্ত্র।
- থাট (Thaat): বিলাবল (Bilawal Thaat)।
- জাতি (Jati): ঔড়ব-সম্পূর্ণ (Audav-Sampurna)। অর্থাৎ, আরোহণে ৫টি স্বর এবং অবরোহণে ৭টি স্বর ব্যবহৃত হয়।
- বর্জিত স্বর: আরোহণে ‘ঋষভ’ (R) এবং ‘পঞ্চম’ (P) বর্জিত।
- বাদী স্বর (Vadi Swara): শুদ্ধ মধ্যম (M)।
- সংবাদী স্বর (Samvadi Swara): ষড়জ (S)।
- স্বর রূপ (Swara Usage): এতে সব স্বরই শুদ্ধ ব্যবহৃত হয়।
- পরিবেশনার সময় (Time of Performance): রাত্রির প্রথম প্রহর (সন্ধ্যা থেকে রাত্রি ৯টার মধ্যে)।
আরোহণ ও অবরোহণ
- আরোহণ: S – G – M – D – N – S’(নোট: আরোহণে R ও P বর্জ্য রেখে সরাসরি S থেকে G এবং M থেকে D-তে যাওয়া হয়।)
- অবরোহণ: S’ – N – D – P – M – G – R – S(অবরোহণে সাতটি স্বরই স্পষ্টভাবে ব্যবহৃত হয়।)
রাগের বিশেষ পাকড় (Chalan / Pakad)
রাগ হেমন্তকে চেনার জন্য প্রধান স্বরসংগতি হলো:
S – G – M – D – N – S’ , S’ – N – D – P , M – P – G – R – S
এখানে মধ্যম (M) ও ষড়জ (S)-এর মধ্যকার সম্পর্ক এবং অবরোহণে M – P – G অংশটি রাগটিকে এক অনন্য মাধুর্য দান করে।
নান্দনিকতা ও পরিবেশনার বৈশিষ্ট্য
রাগ হেমন্তের মেজাজ অত্যন্ত গম্ভীর, ধীর ও ধ্যানমগ্ন।
১. যন্ত্রসংগীতে রূপায়ণ: সেতার ও সরোদে রাগ হেমন্ত বাজানো হলে এর মীড় এবং গমকের কাজ শ্রোতাকে এক গভীর শান্তিতে নিয়ে যায়। ওস্তাদ রৌশন আলী খান, পণ্ডিত রবিশঙ্কর এবং ওস্তাদ আলী আকবর খানের পরিবেশনায় রাগ হেমন্তের কালজায়ী রেকর্ড রয়েছে।
২. কণ্ঠসংগীত ও বিলম্বিত খেয়াল: প্রথমাংশে ধীরগতির আলাপের মধ্য দিয়ে রাগের রূপ উন্মোচন করা হয়। বিশেষ করে বাদী স্বর ‘মা’-এর ওপর ন্যাস (আটকে থাকা) এবং ‘সা’-এর দিকে প্রত্যাবর্তন রাগটিতে ভক্তির ভাব ফুটিয়ে তোলে।
৩. আধুনিক ও সুগম সংগীতে প্রভাব: শাস্ত্রীয় সংগীতের গণ্ডি পেরিয়ে আধুনিক বাংলা ও হিন্দি গান, এমনকি চলচ্চিত্রের আবহসংগীতেও রাগ হেমন্তের স্বরসংগতির পরোক্ষ প্রয়োগ দেখা যায়, যা দৃশ্যপটে নীরবতা ও গভীরতা আনতে ব্যবহৃত হয়।
অন্যান্য সমপ্রকৃতির রাগের সাথে পার্থক্য
অনেক সময় নবীন শ্রোতারা রাগ হেমন্তকে রাগ কানাড়া বা শুদ্ধ কল্যাণ-এর সাথে গুলিয়ে ফেলেন। তবে খেয়াল রাখা প্রয়োজন:
- শুদ্ধ কল্যাণে গান্ধার ও নিষাদের প্রয়োগের ধরণ ভিন্ন।
- রাগ হেমন্তে আরোহণে ‘পা’ এবং ‘রে’ পুরোপুরি বাদ দিয়ে যে সরল এবং সোজা চলন তৈরি করা হয়, তা এই রাগকে সম্পূর্ণ পৃথক এবং আত্মমগ্ন এক রূপ প্রদান করে।



