হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীতের (Hindustani Classical Music) সারং অঙ্গের রাগগুলোর মধ্যে রাগ জলধর সারং (Jaladhar Sarang / Jaldhar Sarang) অত্যন্ত শ্রুতিমধুর, গম্ভীর ও প্রথাগত একটি প্রাচীন রাগ। ‘জলধর’ শব্দের অর্থ হলো মেঘ বা জল বহনকারী; আর নামের সাথে সঙ্গতি রেখেই বর্ষার মেজাজ, মেঘের গাম্ভীর্য এবং বিরহ ও ব্যাকুলতার রস ফুটিয়ে তুলতে এই রাগের জুরি মেলা ভার।
সারং অঙ্গের অন্যান্য রাগের মতো এটিও দ্বিপ্রাহরিক রাগ হলেও, এর আরোহণ-অবরোহণের বিশেষ চলন এবং স্বরপ্রক্ষেপ একে বৃন্দাবনী সারং বা মিঞা কি সারং থেকে এক সম্পূর্ণ ভিন্ন ও স্বকীয় রূপ দান করে।
উৎস ও বৈশিষ্ট্য
রাগ জলধর সারং মূলত কাফি ঠাট-এর অন্তর্ভুক্ত একটি রাগ। প্রাচীন ও প্রথাগত সংগীত সাধকদের মতে, এটি সারং অঙ্গের একটি শুদ্ধ ও ব্যাকরণভিত্তিক রূপ।
এই রাগের প্রধান বিশেষত্ব হলো এর আরোহণ ও অবরোহণের স্বরবিন্যাস। রাগ জলধর সারং-এ কোনো কোমল স্বর বা মধ্যম ব্যবহার না করে শুদ্ধ স্বরের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়, আবার ক্ষেত্রবিশেষে সারং অঙ্গের প্রথাগত কোমল নিষাদের চমৎকার প্রয়োগ দেখা যায়। এতে গান্ধার (G) এবং ধৈবত (D) স্বর দুটি সম্পূর্ণ বর্জিত থাকে। ধ্রুপদ, ধামার, খেয়াল এবং সেতার বা সরোদের জটিল বন্দিশে এই রাগের আভিজাত্য অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে।
রাগের সাঙ্গীতিক পরিচয় ও শাস্ত্রীয় রূপ
- ঠাট (Thaat): কাফি (Kafi)।
- জাতি (Jati): ঔড়ব-ঔড়ব (Audav-Audav)। অর্থাৎ, আরোহণ ও অবরোহণ উভয়ক্ষেত্রেই ৫টি করে স্বর ব্যবহৃত হয়।
- বাদী স্বর (Vadi Swara): ঋষভ (Re / R)।
- সংবাদী স্বর (Samvadi Swara): পঞ্চম (Pa / P)।
- বর্জিত স্বর: আরোহণ ও অবরোহণ উভয়ক্ষেত্রেই গান্ধার (Ga) এবং ধৈবত (Dha) সম্পূর্ণ বর্জিত।
- ব্যবহৃত স্বর (Swara Usage): ষড়জ (Sa), শুদ্ধ ঋষভ (Re), শুদ্ধ মধ্যম (Ma), পঞ্চম (Pa), শুদ্ধ নিষাদ (Ni) এবং অবরোহণে কোমল নিষাদ (ni)।
- পরিবেশনার সময় (Time of Performance): দিন বা প্রথমার্ধের দ্বিতীয় প্রহর (দুপুর ১২টা থেকে বেলা ৩টার মধ্যে)।
- প্রকৃতি ও রস: শান্ত, গম্ভীর, করুণ ও শৃঙ্গার (বিরহ) রসপ্রধান।
আরোহণ, অবরোহণ ও পাকড় (Plain Text)
- আরোহণ: S R M P N S’(নোট: আরোহণে শুদ্ধ নিষাদ ‘N’ ব্যবহৃত হয় এবং G ও D বর্জিত থাকে।)
- অবরোহণ: S’ ni P M R S(অবরোহণে কোমল নিষাদ ‘ni’ ব্যবহৃত হয় এবং P থেকে সরাসরি M হয়ে R-এ অবরোহণ করা হয়।)
- বিশেষ পাকড় (Chalan / Pakad):R M P ni P M R , S R M P N S’ , S’ ni P M R S
নান্দনিকতা ও গায়নশৈলী
জলধর সারং রাগের প্রধান সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে এর ‘R – M – P’ এবং ‘P – M – R’ মীড়ের ব্যবহারে। যখন শিল্পী মধ্য সপ্তক থেকে মন্দ্র সপ্তকে নেমে আসেন কিংবা তার সপ্তকের দিকে আরোহণ করেন, তখন সারং অঙ্গের প্রথাগত আন্দোলন ও গাম্ভীর্য শ্রোতাকে এক নিমেষে ব্যাকুল করে তোলে।
সেতার ও সরোদে ওস্তাদ আলী আকবর খান এবং পণ্ডিত রবিশঙ্করের ধারার প্রবীণ শিল্পীরা এই রাগের বিচ্ছুরণ ঘটিয়েছেন। এছাড়া আগ্রা ও গ্বালিয়র ঘরানার গায়কদের কণ্ঠে বিলম্বিত ও দ্রুত খেয়ালে জলধর সারং-এর বৈচিত্র্যময় রূপ দেখা যায়।
সম্পর্কিত বা সদৃশ রাগের তালিকা
রাগ জলধর সারং-এর সাথে সারং পরিবারের অন্যান্য রাগের ঘনিষ্ঠ মিল রয়েছে। নিচে তুলনামূলক পার্থক্য তুলে ধরা হলো:
১. রাগ বৃন্দাবনী সারং (Brindabani Sarang): জলধর সারং-এর সাথে বৃন্দাবনী সারং-এর অনেক মিল রয়েছে, তবে চলন ও স্বরের জোরের দিক থেকে জলধর সারং কিছুটা গম্ভীর এবং এতে $R – M – P$ গতিপথটি বেশি সোজা ও স্পষ্ট।
২. রাগ শুদ্ধ সারং (Shuddha Sarang): শুদ্ধ সারং-এ তীব্র মধ্যম ($M’$) এবং ধৈবতের স্পর্শ থাকে, কিন্তু জলধর সারং-এ ধৈবত পুরোপুরি বর্জিত এবং তীব্র মধ্যমের কোনো স্থান নেই।
৩. রাগ মিঞা কি সারং (Miyan Ki Sarang): মিঞা কি সারং-এ কোমল ধা এবং কোমল নি-এর বিশেষ মেজাজ থাকে, যা জলধর সারং থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।
৪. রাগ মদমাধ সারং (Madhmad Sarang): মদমাধ সারং-এ উভয় দিকেই কোমল নিষাদ ব্যবহৃত হয়, কিন্তু জলধর সারং-এর আরোহণে শুদ্ধ নিষাদ ($N$) ব্যবহৃত হয়।
তথ্যসূত্র ও প্রামাণ্য গ্রন্থপঞ্জি (Sources)
১. পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখণ্ডে — ক্রমিক পুস্তক মালিকা (তৃতীয় ও চতুর্থ ভাগ)।
২. বিমলাকান্ত রায় চৌধুরী — ভারতীয় সংগীতের অভিধান।
৩. বসন্ত — সংগীত বিশারদ।
৪. B. Subba Rao — Raga-Nidhi (Volume 2).
৫. Walter Kaufmann — The Ragas of North India.



