হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সারং পরিবারের প্রখ্যাত ও মনোহর রাগগুলোর মধ্যে ‘রাগ মদমাদ সারং’ (যা সঙ্গীতগ্রন্থে ‘মধুমাদ সারং’ বা ‘মধ্যমাদ সারং’ নামেও বহুল সমাদৃত) এক পরম আভিজাত্যপূর্ণ ও বৈচিত্র্যময় স্থান দখল করে আছে।
প্রখর মধ্যাহ্নে বা অলস অপরাহ্ণে যখন রোদের উত্তাপ চারপাশ ঘিরে ধরে, তখন তানপুরার গুঞ্জনে মদমাদ সারং-এর সুরলহরী আসরে শীতল জলধারার মতো অনাবিল প্রশান্তি ছড়িয়ে দেয়। সারং অঙ্গের প্রফুল্লতার সাথে এর মাধুর্যময় স্বরপ্রক্ষেপণ শ্রোতার মনকে মুহূর্তেই বিমোহিত করে তোলে।
ইতিহাস ও রাগের পরিচয়
শাস্ত্রীয় ব্যাকরণে রাগ মদমাদ সারং সারং পরিবারের অন্যতম প্রাচীন ও প্রথাগত অঙ্গ। মধ্যযুগীয় সঙ্গীত সাধকদের মতে, ‘মদমাদ’ বা ‘মধুমাদ’ শব্দটির উৎপত্তি সুরের মধুময় বা আনন্দময় মত্ততা সৃষ্টির ক্ষমতা থেকে।
এটি মূলত কাফী ঠাটের আশ্রয়ে গড়ে ওঠা ঔড়ব-ঔড়ব (পাঁচ স্বরের) জাতির একটি সুসংহত রাগ। বিখ্যাত বৃন্দাবনী সারং-এর অত্যন্ত নিকটবর্তী হলেও, দুই নিখাদের সুনির্দিষ্ট প্রয়োগের সূক্ষ্ম পার্থক্যে মদমাদ সারং শাস্ত্রীয় সঙ্গীত ভুবনে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র এক সত্তা হিসেবে বিরাজ করে।
এর মূল রস হলো বীর, শৃঙ্গার (প্রেম) এবং শান্ত রস।
রাগের শাস্ত্রীয় কাঠামো
- ঠাট: কাফী ঠাট।
- জাতি: ঔড়ব-ঔড়ব (আরোহণ এবং অবরোহণ—উভয় ক্ষেত্রেই পাঁচ স্বর ব্যবহৃত হয়)।
- বাদী স্বর: র (শুদ্ধ ঋষভ)।
- সমবাদী স্বর: প (শুদ্ধ পঞ্চম)।
- বর্জিত স্বর: গ (গান্ধার) এবং ধ (ধৈবত) সম্পূর্ণ বর্জিত।
- ব্যবহৃত স্বর: শুদ্ধ ঋষভ (র), শুদ্ধ মধ্যম (ম), শুদ্ধ পঞ্চম (প) এবং কেবল কোমল নিখাদ (ণ)। (গান্ধার ও ধৈবত সম্পূর্ণ বর্জিত)।
- সময়: মধ্যাহ্ন (দিনের ২য় প্রহর — দুপুর ১২টা থেকে বিকেল ৩টা)।
- প্রকৃতি: প্রফুল্ল, মত্তকারী, স্নিগ্ধ ও গম্ভীর।
আরোহণ: স র ম প ণ র্স
(S R M P n S’)
অবরোহণ: র্স ণ প ম র স
(S’ n P M R S)
প্রধান স্বরসংগতি (পকড়):
ণ্ স র, ম র, প ম র, ণ প ম র, স
(N’ S R, M R, P M R, n P M R, S)
অথবা র ম প ণ প, ম র, ণ্ স র, স
(R M P n P, M R, N’ S R, S)
গায়কি ও কারিগরি বৈশিষ্ট্য
রাগ মদমাদ সারং-এর সূক্ষ্ম ব্যাকরণ ও নান্দনিক সৌন্দর্য ফুটিয়ে তুলতে কয়েকটি মৌলিক বিষয়ে সুরসাধকদের বিশেষ লক্ষ্য রাখতে হয়:
বৃন্দাবনী সারং-এর সাথে মদমাদ সারং-এর প্রধান তফাত লুকিয়ে রয়েছে ‘নিখাদ’ স্বরের ব্যবহারে। বৃন্দাবনী সারং-এর আরোহণে শুদ্ধ নিখাদ (S R M P N S') এবং অবরোহণে কোমল নিখাদ (S' n P M R S) ব্যবহৃত হয়। কিন্তু মদমাদ সারং-এ শুদ্ধ নিখাদ সম্পূর্ণ বর্জিত; এতে আরোহণ ও অবরোহণ—উভয় ক্ষেত্রেই কেবলমাত্র কোমল নিখাদ (ণ/n) ব্যবহৃত হয়।
তাত্ত্বিক কাঠামোর দিক থেকে রাগ মেঘ এবং রাগ মদমাদ সারং—উভয়েরই স্বরলিপি হুবহু এক (স র ম প ণ র্স / র্স ণ প ম র স)। কিন্তু রাগাঙ্গ ও পরিবেশনকাল সম্পূর্ণ ভিন্ন:
- রাগ মেঘ: এটি রাত্রিকালীন ও বর্ষাকালের মালহার অঙ্গের রাগ। এতে
ম র র সচরণে ঋষভে গম্ভীর আন্দোলন ও বর্ষাসিক্ত ব্যাকুলতা থাকে। - মদমাদ সারং: এটি প্রখর মধ্যাহ্নের সারং অঙ্গের রাগ। এতে ঋষভে আন্দোলন না করে
র ম প, ম রগতিতে সোজা ও প্রফুল্ল চাল বজায় রাখা হয়।
পঞ্চম থেকে সরাসরি মধ্যম ছুঁয়ে ঋষভে নামার দীর্ঘ মীড় (P~M~R) এবং মন্দ্র সপ্তকের কোমল নিখাদ থেকে ষড়্জ ও ঋষভের গতিধারা দুপুরবেলার মেহফিলে চমৎকার এক বৈরাগ্যহীন মিষ্টি পরিবেশ তৈরি করে।
ধ্রুপদ, খেয়াল, চতুরঙ্গ ও তরাণার পাশাপাশি সেতার, সরোদ, সানাই ও বাঁশিতে এই রাগের বিস্তার মধ্যাহ্নের আসরে এক অপূর্ব আনন্দময় ও সুধাময় আবহ তৈরি করে।
সম্পর্কিত রাগের তালিকা
- রাগ বৃন্দাবনী সারং: সারং পরিবারের আশ্রয় রাগ (যাতে আরোহণে শুদ্ধ নিখাদ ব্যবহৃত হয়)।
- রাগ শুদ্ধ সারং: তীব্র মধ্যম ও শুদ্ধ ধৈবতযুক্ত সারং পরিবারের অপর প্রখ্যাত রাগ।
- রাগ মেঘ: একই স্বরযুক্ত মালহার অঙ্গের সুগভীর বর্ষাকালীন রাগ।
- রাগ সামন্ত সারং: অবরোহে কোমল ধৈবতের বিশেষ ছোঁয়াজুক্ত সারং রূপ।
রাগ মদমাদ সারং হলো ভারতীয় মার্গ সঙ্গীতের সেই অনবদ্য উপাদান, যা মধ্যাহ্নের অলস উত্তাপকে সুরের মায়াজালে মিষ্টতা ও প্রশান্তিতে রূপান্তরিত করে। দ্বিপ্রহরের তানপুরা গুঞ্জনে যখন মদমাদ সারং-এর ‘ণ্ স র, ম র, ণ প ম র, স’-র প্রফুল্ল ও মধুময় টান ভেসে আসে, তখন তা মুহূর্তের মধ্যে শুননেওয়ালার অন্তরকে এক সজীব, শান্ত ও অনাবিল সুরলোকে পৌঁছে দেয়।
সোর্স ও প্রামাণ্য রেফারেন্স
১. ক্রমিক পুস্তক মালিকা (খণ্ড ৩ ও ৪) — পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখণ্ডে।
২. রাগ প্রবীণ ও রাগ বিজ্ঞান — পণ্ডিত বিনায়ক রাও পটবর্ধন।
৩. Raganidhi (Vol 1-4) — বি. সুব্বা রাও (Music Academy, Madras)।
৪. আইটিসি সঙ্গীত রিসার্চ একাডেমি (SRA) আর্কাইভ — সারং অঙ্গ ও মদমাদ/মধুমাদ সারং বিশ্লেষণ।