হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের আসরে দ্বিপ্রহরের প্রখর রোদ, অলস মধ্যাহ্নের তপ্ত হাওয়া এবং বিকেলের স্নিগ্ধ প্রশান্তি প্রকাশের একক ও সার্বভৌম সুরচ্ছটা হলো ‘সারং রাগাঙ্গ’ বা ‘সারং পরিবার’। মধ্যাহ্ন ও অপরাহ্ণের তপ্ত আবহে সুরের শীতল পরশ এনে দিতে সারং রাগের কোনো বিকল্প নেই।
সারং কেবল একটি একক রাগ নয়; এটি ভারতীয় মার্গ সঙ্গীতের সুপ্রাচীন ও অত্যন্ত প্রভাবশালী একটি ‘রাগাঙ্গ’ (Raganga)। কাফী ঠাটের আশ্রয়ে গড়ে ওঠা এই রাগ-পরিবার নিজস্ব নির্দিষ্ট স্বরবিন্যাস, বক্র চলন এবং অনন্য মীড়প্রয়োগের মাধ্যমে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতজগতে বিশাল এক পরিবার বিস্তার করে আছে।
সারং রাগাঙ্গ ও এর গাঠনিক বৈশিষ্ট্য
সারং অঙ্গের আসল চাবিকাঠি লুকিয়ে রয়েছে এর ঋষভ (র) ও মধ্যম (ম)-এর বিশেষ মেলবন্ধন এবং প্রধান স্বরপ্রক্ষেপণ র ম প ম র (R M P M R)-এর মধ্যে।
- ঠাট: মূলত কাফী ঠাট।
- জাতি: মূল প্রথাগত রূপ ঔড়ব-ঔড়ব (পাঁচ স্বরের রাগ); যেখানে গান্ধার (গ) এবং ধৈবত (ধ) সম্পূর্ণ বর্জিত। তবে কিছু মিশ্র সারঙে শাস্ত্রীয় অলঙ্কার হিসেবে গ ও ধ ব্যবহৃত হয়।
- মূল স্বরসংগতি (পকড়):
ণ্ স র, ম র, প ম র, স(N’ S R, M R, P M R, S)অথবার ম প, ম র, ণ্ স র, স(R M P, M R, N’ S R, S) - নিখাদের (N) অনন্য প্রয়োগ: সারং অঙ্গের অন্যতম প্রধান নিয়ম হলো—এর আরোহণে শুদ্ধ নিখাদ (নি/N) এবং অবরোহণে কোমল নিখাদ (ণ/n) ব্যবহৃত হয় (
ন সর্, র্স ণ প)। - সময়: মধ্যাহ্ন ও অপরাহ্ণ (দিনের ২য় প্রহর — দুপুর ১২টা থেকে বিকেল ৩টা)।
- রস ও মেজাজ: বীর রস, শৃঙ্গার রস, প্রসন্নতা এবং তপ্ত দুপুরে এক অনাবিল স্নিগ্ধ ও শান্ত ভাব।
সারং পরিবারের প্রধান ও প্রখ্যাত রাগসমূহ
প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় সুরসাধকগণ সারং অঙ্গকে ভিত্তি করে বহু অসামান্য মৌলিক ও সংমিশ্রিত রাগের উদ্ভাবন করেছেন। সারং পরিবারের প্রধান রাগগুলোকে তাদের স্বরগঠন অনুযায়ী নিচে সুসংগঠিতভাবে আলোচনা করা হলো:
১. বৃন্দাবনী সারং (Brindavani Sarang)
- চলন:
স র ম প নি র্স — র্স ণ প ম র স
২. শুদ্ধ সারং (Shuddha Sarang)
- চলন:
স র ম প, হ্ম প র্স নি ধ প, ম্ প ম র, স
৩. মিঞাঁ কী সারং (Miyan Ki Sarang)
- চলন:
স র ম প, ণ ধ প, ম র, ণ্ স র, স
৪. মদমাদ সারং / মধুমাদ সারং (Madhmad Sarang)
- চলন:
স র ম প ণ র্স — র্স ণ প ম র স
৫. সামন্ত সারং (Samant Sarang)
- চলন:
স র ম প নি র্স — র্স ণ ধ প, ম র, স
৬. লঙ্কাদহন সারং (Lanka Dahan Sarang)
- চলন:
স র ম প নি র্স — র্স ণ প, ম জ্ঞ র, স
৭. বঢ়হংস সারং (Badhans Sarang)
- চলন:
স র ম প, ধ নি র্স — র্স ণ ধ প, ম র, স
অন্যান্য শাখা ও অপ্রচলিত সারং
সারং অঙ্গ বনাম মালহার অঙ্গ: একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ
ম র স (M R S) এবং কোমল নিখাদের প্রক্ষেপণ বিদ্যমান। তবে তাত্ত্বিক ও প্রয়োগের দিক থেকে এদের পার্থক্য অত্যন্ত মৌলিক:| বৈশিষ্ট্য | সারং রাগাঙ্গ (Sarang Ang) | মালহার রাগাঙ্গ (Malhar Ang) |
| প্রধান সময় | মধ্যাহ্ন ও অপরাহ্ণ (দুপুর ১২টা – ৩টা)। | বর্ষাকাল ও রাত্রির মধ্যপ্রহর। |
| মূল পকড় ও চলন | র ম প ম র (R M P M R) গতি সোজা ও ঋজু। | ম র র স (M R R S) ঋষভে আন্দোলন ও বক্রতা। |
| গ ও ধ স্বরের ব্যবহার | বিশুদ্ধ রূপগুলোতে গান্ধার ও ধৈবত সাধারণত বর্জিত। | গান্ধার ও ধৈবতের সুনির্দিষ্ট প্রয়োগ থাকে (যেমন: গ ম র স)। |
| প্রকৃতি ও মেজাজ | দীপ্ত, বীরত্বপূর্ণ, স্নিগ্ধ ও প্রফুল্ল। | গম্ভীর, মেঘাচ্ছন্ন, বারিপাত সমতুল্য ও সজল। |
গায়কি ও কারিগরি বৈশিষ্ট্য
P~M~R) সারং অঙ্গের সবচেয়ে মায়াবী দিক।