রাগ যোগিয়া (বা জোগিয়া, বা জোগীয়া) | অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের প্রভাতী মেহফিলে করুণ রস, পরম বৈরাগ্য এবং একাকী ভক্তিময় আরতি ফুটিয়ে তোলার জন্য ‘রাগ যোগিয়া’ (বা প্রথাগত বানানে জোগিয়া) এক অতি সুপ্রাচীন, হৃদয়স্পর্শী ও আভিজাত্যপূর্ণ আশ্রয়।

‘যোগিয়া’ নামের ভেতরেই লুকিয়ে আছে সংসারত্যাগী যোগী বা সাধকের করুণ মিনতি ও ব্যাকুলতা। ভোরবেলার নির্জন নিস্তব্ধতায় যখন তানপুরার সুরের সাথে রাগ যোগিয়ার মায়াবী স্বরলহরী ভেসে আসে, তখন তা মুহূর্তের মধ্যেই শ্রোতার অন্তরকে জাগতিক চপলতা থেকে মুক্ত করে বৈরাগ্যময় সুরলোকে নিয়ে যায়।

ইতিহাস ও নামকরণের পটভূমি

উত্তর ভারতীয় মার্গ সঙ্গীত এবং লোকায়ত সুরধারায় রাগ যোগিয়ার ঐতিহাসিক শিকড় অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী:

১. নাথ সম্প্রদায় ও যোগী সাধক: মনে করা হয়, প্রাচীন ভারতের নাথপন্থী যোগী ও বৈরাগী সাধক সম্প্রদায় একতারা বা সারিন্দা বাজিয়ে প্রভাতকালে যে করুণ ও বৈরাগ্যপ্রধান লোকসুর ভজন আকারে গাইতেন, তা-ই কালক্রমে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ব্যাকরণে মার্জিত হয়ে ‘রাগ যোগিয়া’ হিসেবে স্থান করে নেয়।

২. ভৈরব বনাম আসাবরী/কাফী অঙ্গের রূপান্তর: রাগ যোগিয়াকে প্রধানত ভৈরব ঠাট-এর অন্তর্ভুক্ত করা হলেও এটি একটি অত্যন্ত সুসংহত মিশ্র প্রকৃতির রাগ। এতে পূর্বাঙ্গে ভৈরব অঙ্গের কোমল ঋষভ (r) ও শুদ্ধ মধ্যম (M)-এর আবেশের পাশাপাশি উত্তরাঙ্গে আসাবরী অঙ্গের কোমল ধৈবত (d) এবং কোমল নিখাদ (n)-এর সংমিশ্রণ ঘটেছে।

রাগের শাস্ত্রীয় কাঠামো

  • ঠাট: ভৈরব ঠাট।
  • জাতি: ঔড়ব-সম্পূর্ণ (আরোহণে গান্ধার ও নিখাদ বর্জিত; অবরোহে সাতটি স্বরই ব্যবহৃত হয়)।
  • বাদী স্বর: ম (শুদ্ধ মধ্যম)।
  • সমবাদী স্বর: স (ষড়্‌জ)।
  • বর্জিত স্বর: আরোহণে গান্ধার (G) ও নিখাদ (N) বর্জিত (স র ম প ধ র্স)।
  • ব্যবহৃত স্বর: কোমল ঋষভ (ঋ/r), কোমল ধৈবত (ধা/d), অবরোহে বিশেষ স্পর্শে কোমল নিখাদ (ণ/n) ও ক্ষেত্রবিশেষে আলতো শুদ্ধ নিখাদ (N), এবং শুদ্ধ মধ্যম (M), শুদ্ধ পঞ্চম (P) ও ষড়্‌জ (S)। (গান্ধার স্বরটি আরোহে বর্জিত হলেও অবরোহে মন্দ্র ও মধ্য সপ্তকে অত্যন্ত সূক্ষ্ম অলঙ্কার রূপে ব্যবহৃত হয়)।
  • সময়: প্রাতঃকাল (দিনের ১ম প্রহর — ভোর ৪টা থেকে সকাল ৭টা)। এটি প্রাতঃকালীন অন্যতম প্রধান ‘সন্ধিপ্ৰকাশ রাগ’।
  • প্রকৃতি ও রস: বৈরাগ্যময়, অতি করুণ, ব্যাকুল ও ভক্তিসিক্ত। এর প্রধান রস হলো করুণ ও শান্ত রস।

আরোহ, অবরোহ ও পকড় (স্বরসংগতি)

আরোহণ:
স র ম প, ধ র্স
(S r M P, d S’)
অবরোহণ:
র্স ণ্ ধ প, ম প ধ ণ্ ধ প, ম র স
(S’ n d P, M P d n d P, M r S)
প্রধান স্বরসংগতি (পকড়):
স র ম প, d - P, M P d n d P, M r S
(S r M P, d – P, M P d n d P, M r S)

গায়কি ও কারিগরি বৈশিষ্ট্য

১. ‘স র ম প’ এবং ‘ধ্-প’ চলন: আরোহণে গান্ধার ডিঙ্গিয়ে সরাসরি স র ম প যাওয়া এবং পঞ্চমের ওপর ভর করে কোমল ধৈবত থেকে পঞ্চমে আসা (d~P) যোগিয়া রাগের অন্যতম প্রধান চাবিকাঠি।
২. অবরোহে কোমল নিখাদের আন্দোলন: অবরোহণে ম প ধ ণ্ ধ প সংগতিটি অত্যন্ত সুমিষ্ট ও করুণ আভা তৈরি করে, যা শ্রোতার মনে মুহূর্তেই বৈরাগ্যের উদ্রেক ঘটায়।
৩. ঠুমরি, দাদরা ও সুগম সঙ্গীতের প্রয়োগ: রাগ যোগিয়া গম্ভীর খেয়ালের চেয়ে প্রধানত বিলম্বিত ও দ্রুত ঠুমরি, দাদরা, ভজন (যেমন—মীরাবাঈ বা কূলদাসের ভজন), গজল ও প্রাতঃকালীন ভাবসঙ্গীতের জন্য অত্যন্ত জনপ্রিয়।
৪. রবীন্দ্রসঙ্গীত ও নজরুলগীতিতে ব্যবহার: বাংলা সঙ্গীতে প্রাতঃকালীন বিরহ ও ভক্তিসিক্ত সুরচ্ছবি তৈরিতে রাগ যোগিয়ার বহুল ব্যবহার দেখা যায়।
সেতারা, সারেঙ্গী, সানাই ও বাঁশিতে প্রাতঃকালে রাগ যোগিয়ার করুণ ও স্নিগ্ধ তান আসরকে এক অপূর্ব অপার্থিব প্রশান্তিতে ভরিয়ে দেয়।

সম্পর্কিত রাগের তালিকা

রাগ যোগিয়া হলো হিন্দুস্তানি মার্গ সঙ্গীতের সেই অনবদ্য আধ্যাত্মিক সুরমালা, যা বৈরাগ্যকে পরম সৌন্দর্যে রূপান্তর করে। ভোরের স্নিগ্ধ নিস্তব্ধতায় যখন তানপুরার তারে যোগিয়ার ‘স র ম প, d – P, M P d n d P, M r S’-র ব্যাকুল ও সজল তান ভেসে আসে, তখন তা মুহূর্তের মধ্যে মানবমনকে সব জাগতিক মায়া থেকে মুক্ত করে এক পরম পবিত্র ও অনুভূতির সুরলোকে পৌঁছে দেয়।

সোর্স ও প্রামাণ্য রেফারেন্স

১. ক্রমিক পুস্তক মালিকা (খণ্ড ২ ও ৩) — পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখণ্ডে।
২. রাগ প্রবীণ ও রাগ বিজ্ঞান — পণ্ডিত বিনায়ক রাও পটবর্ধন।
৩. Raganidhi (Vol 1-4) — বি. সুব্বা রাও (Music Academy, Madras)।
৪. আইটিসি সঙ্গীত রিসার্চ একাডেমি (SRA) আর্কাইভ — ভৈরব ঠাট ও শাখা রাগ বিশ্লেষণ।