পৃথিবীর ইতিহাসে কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলে মানুষের ভাবনার ব্যাপ্তি কতটা গভীরে যেতে পারে, তার অন্যতম উদাহরণ প্রাচীন ভারতবর্ষ। আজকের বিশ্বে ধর্ম বা ঈশ্বর বলতে যে সুনির্দিষ্ট ধারণাগুলোর সাথে মানুষ পরিচিত, তা বহু পরে মধ্যপ্রাচ্য বা সেমেটিক অঞ্চলগুলোতে বিকাশ লাভ করে। কিন্তু সেই আব্রাহামিক বা সেমেটিক ধর্মগুলোর জন্মের বহু আগেই এই ভারতীয় উপমহাদেশে মুক্তচিন্তা ও তাত্ত্বিক অনুসন্ধানের এক ব্যাপক ঐতিহ্য গড়ে উঠেছিল।
আমাদের পূর্বপুরুষেরা শুধু কোনো অদৃশ্য শক্তির ওপর বিশ্বজগতের ব্যাখ্যার দায়িত্ব ছেড়ে দেননি। তারা প্রকৃতির নিয়ম, বস্তুর সূক্ষ্ম গঠন এবং মানব মনের গতিপ্রকৃতি নিয়ে অবিরত অনুসন্ধান চালিয়েছেন। একই সাথে যেমন ঈশ্বরকেন্দ্রিক আস্তিক দর্শনের জন্ম হয়েছে, তেমনি ঈশ্বর, পরলোক কিংবা অলৌকিকত্বকে সরাসরি খারিজ করে নিরীশ্বরবাদী বস্তুবাদের ভিত্তিও রচিত হয়েছে। বিশেষ কোনো সামাজিক সংঘাত বা রক্তপাত ছাড়াই দীর্ঘকাল ধরে এসব ভিন্নমুখী ভাবনা পাশাপাশি অস্তিত্ব রক্ষা করেছে।
ভারতীয় দর্শনের মূল বিভাজন
ভারতীয় দর্শনের বিশাল পরিসরকে মূল উৎস বা ভিত্তির ওপর নির্ভর করে প্রধানত দুটি ধারায় ভাগ করা হয়:
১. আস্তিক বা বৈদিক ধারা: যারা বেদকে চূড়ান্ত ও প্রামাণ্য জ্ঞানের ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেছেন।
২. নাস্তিক বা অবৈদিক ধারা: যারা বেদের প্রামাণ্যতা বা সিদ্ধান্ত মানেননি এবং স্বতন্ত্র বিচার-বুদ্ধির মাধ্যমে নিজস্ব তত্ত্ব গড়ে তুলেছেন।
আধুনিক ব্যাকরণে ‘আস্তিক’ বলতে ঈশ্বর বিশ্বাসী এবং ‘নাস্তিক’ বলতে অনীশ্বরবাদী বোঝানো হলেও, প্রাচীন ভারতীয় দর্শনে সংজ্ঞায়নটি ভিন্ন ছিল। সেখানে বৈদিক প্রামাণ্যতা মেনে নেওয়াই ছিল আস্তিকতার মাপকাঠি।
আস্তিক বা ষড়দর্শন: বৈদিক চিন্তার ছয়টি স্তম্ভ
১. ন্যায় দর্শন (যুক্তি ও প্রমাণের দর্শন)
২. বৈশেষিক দর্শন (প্রাচীন পরমাণুবাদ ও বস্তুবিচার)
৩. সাংখ্য দর্শন (প্রকৃতি ও পুরুষের আদি দ্বৈতবাদ)
৪. যোগ দর্শন (মনঃসংযম ও আত্মউপলব্ধির বিজ্ঞান)
৫. মীমাংসা বা পূর্ব-মীমাংসা দর্শন (কর্ম ও মন্ত্রের শক্তি)
৬. বেদান্ত বা উত্তর-মীমাংসা দর্শন (পরম সত্যের পরম অদ্বৈতবাদ)
নাস্তিক বা অবৈদিক ধারা: বস্তু ও চেতনার স্বাধীন ব্যাখ্যা
১. চার্বাক বা লোকায়ত দর্শন (চরম বস্তুবাদের প্রস্থান)
২. বৌদ্ধ দর্শন (কার্যকারণ ও আত্মমুক্তির পথ)
৩. জৈন দর্শন (জীবাত্মা, পরম অহিংসা ও বহুমাত্রিক সত্য)
জ্ঞানচর্চার ইতিহাস ও আমাদের অবস্থান
পেছন ফিরে তাকালে বোঝা যায়, প্রাচীন ভারতে চিন্তার চর্চা কখনোই কোনো একটি মাত্র গ্রন্থ বা সুনির্দিষ্ট কাঠামোর ভেতর সীমাবদ্ধ ছিল না। একদিকে পরমাণুবাদ, যুক্তিবিজ্ঞান ও চরম বস্তুবাদের অনুশীলন হয়েছে, অন্যদিকে চর্চিত হয়েছে পরম চেতনার গভীর দর্শন।
একই সমাজব্যবস্থায় চার্বাকদের মতো চরম নাস্তিকেরা যেমন দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করতে পেরেছেন, তেমনি ন্যায় ও বেদান্তের পন্ডিতেরা নিজেদের ভাবনার বিকাশ ঘটিয়েছেন। বিজ্ঞান, গণিত, ধাতুবিদ্যা, ব্যাকরণ ও দর্শনের এই সমন্বিত ঐতিহ্য প্রমাণ করে যে, ভারতবর্ষ হাজার বছর ধরে স্বাধীন ভাবনার এক বিশাল গবেষণাগার হিসেবে কাজ করেছে।
শিক্ষার্থী হিসেবে আমাদের জন্য এই ইতিহাস থেকে জানার অনেক কিছু রয়েছে। নিজেদের অতীতের এই মুক্তচিন্তার সংস্কৃতি, বস্তুনিষ্ঠ প্রমাণের গুরুত্ব এবং ভিন্নমতকে জায়গা করে দেওয়ার সহনশীল মানসিকতা লালন করাই আমাদের শিক্ষাজীবনের অন্যতম উদ্দেশ্য হওয়া উচিত।



