অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

রাগ মাড়ু খামাজ । শ্রোতা সহায়িকা নোট । অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

হিন্দোস্তানি শাস্ত্রীয় ও উপ-শাস্ত্রীয় সংগীতের সুরময় আঙিনায় রাগ মাড়ু খামাজ হলো এক অনন্য, চপল এবং অপার্থিব সৌন্দর্যে ভরপুর সংমিশ্রিত স্বরমূর্তি। খামাজ ঠাটের অন্তর্ভুক্ত এই রাগটি প্রথাগত উচ্চাঙ্গ সংগীতের নিয়মবদ্ধ ব্যাকরণ রক্ষা করেও লোকজ সুরের সাবলীল আবেগ প্রকাশে দারুণ সফল। রাজস্থানের মরুপ্রান্তরের লোকজ সুর ‘মাড়ু’ অঙ্গের সাথে শাস্ত্রীয় ‘খামাজ’ রাগের অনবদ্য মেলবন্ধনে এই রাগটির জন্ম। বিরহ, মিলন এবং শৃঙ্গার রসের পরম ব্যাকুলতা প্রকাশে রাগ মাড়ু খামাজের জুড়ি মেলা ভার।

রাগ মাড়ু খামাজ মূলত একটি সংমিশ্রিত ও রঞ্জনাত্মক রাগ। প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় সংগীত ঐতিহ্য অনুসন্ধানে দেখা যায়, রাজস্থানি চারণ কবি ও মাংগানিয়ার বাউল-শিল্পীদের বহুল চর্চিত ‘মাড়ু’ গায়কির সাথে খামাজ অঙ্গ যুক্ত হয়ে পরবর্তীতে হিন্দুস্তানি মার্গ সংগীতে এটি ধ্রুপদী রূপ লাভ করে। ইংরেজিতে এই রাগের নাম – Raga Maru Khamaj (সবচেয়ে প্রচলিত ও প্রাতিষ্ঠানিক বানান), Raag Maru Khamaj (সংগীত পরিবেশনা ও অ্যালবামে বহুল ব্যবহৃত). Raga Maadu Khamaj (বাংলা ‘ড়’ ধ্বনিকে স্পষ্টভাবে প্রকাশ করার জন্য), Raga Khamaj Maru (যেসব ক্ষেত্রে খামাজ অংশকে পূর্বে রেখে লেখা হয়) – হিসেবে লেখা হয়।

অন্যান্য পরিচিত নাম ও রূপভেদ:

সংগীত শাস্ত্রের বিভিন্ন আঞ্চলিক ঘরানা ও প্রামাণ্য গ্রন্থে রাগ মাড়ু খামাজ কয়েকটি ভিন্ন নামেও উল্লেখিত বা পরিচিতি লাভ করেছে:

  • মারু খামাজ (Maru Khamaj): দেবনাগরী ও হিন্দি উচ্চারণের সরাসরি লিপ্যন্তর।
  • মাড় সূর (Maru Soor): রাজস্থানি লোকজ সংগীতে মাড়ু খামাজের মূল লোকজ রূপান্তর।
  • খামাজ মাড়ু (Khamaj Maru): কোনো কোনো প্রবীণ ঘরানাদার শিল্পীর ব্যবহৃত নাম, যেখানে খামাজ অংশকে পূর্বে রেখে নামকরণ করা হয়েছে।

মাড়ু খামাজের মূল প্রাণভোমরা লুকিয়ে আছে এতে দুইটি নিষাদ (শুদ্ধ ও কোমল) এবং দুইটি মধ্যম (শুদ্ধ ও তীব্র)-এর মেধাভিত্তিক ব্যবহার। প্রথাগত খামাজে তীব্র মধ্যমের স্থান না থাকলেও, মাড়ু খামাজে অত্যন্ত কৌশলে তীব্র মধ্যম ($m$) স্পর্শ স্বর বা বিশেষ অলংকার হিসেবে প্রযুক্ত হয়—যা একে প্রচলিত খামাজ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা এক রাজকীয় ও আবেগঘন মর্যাদা দান করে।

উপ-শাস্ত্রীয় রূপায়নে—বিশেষ করে ঠুমরি, দাদরা, গজল, রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলসংগীত এবং আধুনিক রাগপ্রধান গানে—মাড়ু খামাজের বহুল ও বৈচিত্র্যময় প্রয়োগ লক্ষ্য করা যায়।

রাগের শাস্ত্রীয় কাঠামো ও স্বরলিপি

হিন্দুস্তানি মার্গ সংগীতের আকর গ্রন্থ ও ভাতখণ্ডে সংগীত শাস্ত্রের নিয়ম অনুসরণে রাগ মাড়ু খামাজের তাত্ত্বিক রূপরেখা নিচে প্রদান করা হলো:

  • ঠাটে (Thaat): খামাজ।
  • জাতি (Jati): ষাড়ব-সম্পূর্ণ (আরোহে ৬টি স্বর এবং অবরোহে ৭টি স্বর ব্যবহৃত হয়)।
  • আরোহ (Aroh): সা গ ম প, ধ নি সাঁ (S G M P, D N S)।(আরোহে ‘রে’ বা ঋষভ স্বরটি সাধারণ নিয়মে বর্জিত থাকে অথবা অতি সূক্ষ্ম বক্রভাবে প্রযুক্ত হয়)।
  • অবরোহ (Avroh): সাঁ নি(কোমল) ধ প, ম(তীব্র) প ম(শুদ্ধ) গ, রে সা (S n D P, m P M G, R S)।(অবরোহে কোমল নিষাদের স্পষ্ট ব্যবহার এবং তীব্র মধ্যম থেকে পঞ্চমের অলংকারিক সংগতি রাগের মূল রূপ তৈরি করে)।
  • বাদী স্বর (Vadi): শুদ্ধ গান্ধার (গ)।
  • সমবাদী স্বর (Samvadi): শুদ্ধ নিষাদ (নি)।
  • বর্জিত স্বর (Varjit Swar): আরোহে ঋষভ (রে)।
  • ব্যবহৃত স্বর: ষড়জ (সা), শুদ্ধ ঋষভ (রে), শুদ্ধ গান্ধার (গা), শুদ্ধ মধ্যম (মা), তীব্র মধ্যম (মা/ক্ষা—অবরোহে অলংকারিক স্পর্শ স্বর), পঞ্চম (পা), শুদ্ধ ধৈবত (ধা), শুদ্ধ নিষাদ (নি—আরোহে) এবং কোমল নিষাদ (n—অবরোহে)।
  • পরিবেশনের সময় (Time): রাত্রির দ্বিতীয় প্রহর (রাত ৯টা থেকে ১২টা)।
  • প্রকৃতি ও রস (Mood & Rasa): চঞ্চল, করুণ, বিরহদীপ্ত এবং শৃঙ্গার রসপ্রধান।
  • পকড় (Pakad/মূল সুরবাক্য): গ ম প ধ, নি ধ প, ম(তীব্র) প ম(শুদ্ধ) গ, রে সা।

সংশ্লিষ্ট বা সদৃশ রাগের সাথে তুলনামূলক বিশ্লেষণ

মাড়ু খামাজ একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল সংমিশ্রিত রাগ। এর নিকটবর্তী কিছু রাগের সাথে রূপগত পার্থক্যের বিবরণ নিচে দেওয়া হলো:

  • রাগ খামাজ (Khamaj): মূল খামাজ রাগে তীব্র মধ্যমের কোনো স্থান নেই এবং এর আরোহে ঋষভ প্রয়োগের ভঙ্গি ভিন্ন। মাড়ু খামাজে তীব্র মধ্যমের ($m$) অলংকারিক উপস্থিতি এটিকে আলাদা পরিচয় দেয়।
  • রাগ মানঝ খামাজ (Manjh Khamaj): মানঝ খামাজে মাড়ু খামাজের মতো তীব্র মধ্যমের প্রয়োগ থাকে না; বরং এতে দেশ বা সোরথ অঙ্গের সরল মধ্যবর্তী স্বরসংগতি প্রাধান্য পায়।
  • রাগ তিলক কামোদ (Tilak Kamod): তিলক কামোদের চলন বক্র এবং এতে ‘রে-পা’ সংগতি প্রধান, যেখানে মাড়ু খামাজে ‘গ-ম-প-ধ’ এবং দুই নিষাদের আন্দোলন প্রাধান্য পায়।
  • রাগ দেশ (Desh): দেশ রাগে অবরোহে কোমল নিষাদ স্পষ্ট হলেও মাড়ু খামাজের মতো তীব্র মধ্যমের মিড় বা অলংকার তাতে ব্যবহৃত হয় না।
রাগ মাড়ু খামাজ হলো ভারতীয় সংগীতের সেই অনন্য সৃষ্টি, যা উচ্চাঙ্গ সংগীতের প্রাচীর ভেঙে সাধারণ মানুষের হৃদয়ে বিরহ ও মিলনের এক অপার্থিব মায়াজাল বুনে দেয়। আরোহে শুদ্ধ নিষাদ থেকে অবরোহে কোমল নিষাদের ঢলে পড়া এবং তার মাঝে তীব্র মধ্যমের এক সূক্ষ্ম আলোকচ্ছটা গায়কের কল্পনাশক্তি ও সুর-জ্ঞানের পরম পরিচয় বহন করে। নিঝুম মধ্যরাতে যখন মাড়ু খামাজের অলংকারময় তান ও বিস্তার বেজে ওঠে, তখন তা শ্রোতাকে জাগতিক ব্যস্ততার বাইরে সুরলোকের এক পরম স্নিগ্ধ আকুলতায় ভাসিয়ে নিয়ে যায়।

প্রধান তথ্যসূত্র ও প্রামাণ্য গ্রন্থাবলী:

১. ক্রমিক পুস্তক মালিকা (খণ্ড ৩ ও ৪) – পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখণ্ডে
২. রাগ পরিচয় (খণ্ড ৪) – পণ্ডিত হরিশ্চন্দ্র শ্রীবাস্তব
৩. সংগীত বিশারদ – বসন্ত
৪. The Raga Guide: A Survey of 74 Hindustani Ragas – Joep Bor
৫. ভারতীয় সংগীতকোষ – বিমলাকান্ত রায় চৌধুরী
শেয়ার করুন: Facebook X WhatsApp LinkedIn

প্রেস ডেস্ক, সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর এর অফিস

সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর এর নিজের সকল লেখা, শুভেচ্ছা, স্মরণ ইত্যাদি এই ডেস্ক থেকে প্রকাশিত হয়।

সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক, কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগ। ইতিহাস, রাজনীতি, প্রযুক্তি ও উন্নয়ন নিয়ে লেখালেখি।

যোগাযোগ

কুমারখালী বাস স্ট্যান্ড, দুর্গাপুর, কুমারখালী।
+৮৮০ (১৭) ৬৩০৩৮,৬৩০৩৯।contact@sufifaruq.com

© ২০২৬ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।