ইতিহাস ও রাজনীতি সিরিজ

১৮ জানুয়ারি ১৯৬৮: ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’ দায়ের ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ | ইতিহাস ও রাজনীতি সিরিজ

ইতিহাস সাক্ষী দেয়, শোষক শ্রেণি যখন নিজেদের ক্ষমতার ভিত্তি টলটলায়মান দেখে, তখন তারা নিপীড়নের চরম পথ বেছে নেয়। ১৯৬৮ সালের ১৮ জানুয়ারি তৎকালীন পাকিস্তানের সামরিক স্বৈরশাসক আইয়ুব খান ঠিক সেই পথটিই বেছে নিয়েছিলেন। এই দিনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রধান আসামি করে তৎকালীন সরকার ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা দায়ের করে, যা লোকমুখে ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’ নামে পরিচিতি লাভ করে। বাঙালি জাতির স্বাধিকার আন্দোলনকে চিরতরে স্তব্ধ করার যে নীল নকশা শাসকগোষ্ঠী সেদিন এঁকেছিল, তা মূলত তাদের নিজেদের পতনেরই কফিন তৈরি করেছিল।

পটভূমি: ছয় দফার দাবানল ও আইয়ুব খানের আতঙ্ক

১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালির মুক্তির সনদ ‘ছয় দফা’ ঘোষণা করার পর পুরো পূর্ব বাংলায় এক অভূতপূর্ব জাগরণ তৈরি হয়। ছয় দফার প্রতি সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত এবং বিপুল সমর্থন দেখে আইয়ুব খানের সামরিক জান্তা চরম আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। ১৯৬৬ সালের মে মাস থেকেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কারাবন্দী ছিলেন। কিন্তু কারাগারের উঁচু প্রাচীরও তাঁর জনপ্রিয়তা বা বাঙালির স্বাধিকারের স্পৃহাকে আটকে রাখতে পারছিল না।

সামরিক সরকার বুঝতে পেরেছিল, সাধারণ রাজনৈতিক দমন-পীড়ন দিয়ে এই আন্দোলন থামানো যাবে না। তাই তারা এমন একটি নাটকীয় ও ভয়ংকর রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ সাজানোর পরিকল্পনা করে, যার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং বাঙালির অধিকার আদায়ের সংগ্রামকে দেশদ্রোহিতার তকমা দিয়ে চিরতরে মুছে ফেলা যায়।

১৮ জানুয়ারি ১৯৬৮: মামলার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ও অভিযোগের রূপরেখা

১৯৬৮ সালের ১৭ জানুয়ারি দিবাগত রাতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে মুক্তি দেওয়া হয়। কিন্তু কারামুক্তির পরপরই জেলগেট থেকে তাঁকে সামরিক বাহিনীর সদস্যরা পুনরায় গ্রেফতার করে এবং চোখ বেঁধে সরাসরি কুর্মিটোলা সেনানিবাসে নিয়ে যায়।

পরদিন, অর্থাৎ ১৮ জানুয়ারি ১৯৬৮ তারিখে পাকিস্তান সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে একটি প্রেসনোটের মাধ্যমে এই রাষ্ট্রদ্রোহ মামলার কথা ঘোষণা করে। মামলাটির সরকারি নাম দেওয়া হয়েছিল ‘রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিবুর রহমান এবং অন্যান্য’।

মামলার গুরুত্বপূর্ণ দিকঐতিহাসিক বিবরণ
মামলার সরকারি নামরাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিবুর রহমান এবং অন্যান্য
প্রধান আসামিবঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান (১ নম্বর আসামি)
মোট অভিযুক্ত৩৫ জন (সামরিক ও বেসামরিক বাঙালি কর্মকর্তা এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব)
মূল অভিযোগভারতের ত্রিপুরার আগরতলায় বসে সশস্ত্র অভ্যুত্থানের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানকে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন করার ষড়যন্ত্র।

সরকারের মূল লক্ষ্য ছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে চরম দেশদ্রোহী হিসেবে জনগণের সামনে তুলে ধরা। বিশেষ সামরিক ট্রাইব্যুনাল গঠন করে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলিয়ে পূর্ব বাংলার অবিসংবাদিত নেতৃত্বকে চিরতরে শেষ করে দেওয়াই ছিল এই ষড়যন্ত্রমূলক মামলার আসল উদ্দেশ্য।

বুমেরাং ষড়যন্ত্র: গণঅভ্যুত্থানের স্ফুলিঙ্গ

আইয়ুব খানের হিসাব সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণিত হয়েছিল। পূর্ব বাংলার মানুষ এই সাজানো মামলা ও রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে দেশদ্রোহী ভাবার বদলে সাধারণ মানুষ তাঁকে নিজেদের অধিকার আদায়ের সবচেয়ে বড় ও অবিসংবাদিত বীর হিসেবে গ্রহণ করে।

এই মামলার বিচারকার্য কুর্মিটোলা সেনানিবাসে শুরু হলে বাংলার ছাত্রসমাজ, শ্রমিক, কৃষক ও সাধারণ জনতা রাজপথে নেমে আসে। গঠিত হয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ এবং ঘোষিত হয় ঐতিহাসিক ১১ দফা। মামলা প্রত্যাহার ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তির দাবিতে ১৯৬৯ সালের শুরুতেই সারা দেশে এক গণবিস্ফোরণ ঘটে, যা ইতিহাসে ‘ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান’ নামে পরিচিত। জনতার এই প্রবল রুদ্ররোষের মুখে টিকতে না পেরে ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি আইয়ুব খান সরকার বাধ্য হয়ে এই ষড়যন্ত্রমূলক মামলা প্রত্যাহার করে এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ সকল বন্দীকে নিঃশর্ত মুক্তি দেয়।

ইতিহাসের আলোয় আজকের ভাবনা

আজকের দিনে দাঁড়িয়ে ১৯৬৮ সালের ১৮ জানুয়ারির ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করলে আমরা এক অমোঘ সত্যের দেখা পাই। আইয়ুব খান সরকার চেয়েছিল ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’র মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক জীবনের সমাধি রচনা করতে। অথচ এই মামলাই বাঙালির জাতীয়তাবাদী চেতনাকে এক সুতোর বাঁধনে গেঁথে ফেলেছিল।

যে অভিযোগকে সেদিন ‘রাষ্ট্রদ্রোহ’ বলা হয়েছিল, সেই কথিত অভিযোগের পথ ধরেই যেন বাঙালি সত্যিকার অর্থে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। ১৮ জানুয়ারি তাই আমাদের ইতিহাসে কেবল একটি ষড়যন্ত্রমূলক মামলা দায়েরের দিন নয়; এটি স্বৈরশাসকের দম্ভের বিপরীতে এক নির্ভীক নেতার উত্থান এবং স্বাধীন বাংলাদেশের পটভূমি রচনার এক অবিস্মরণীয় ঐতিহাসিক অধ্যায়।

শেয়ার করুন: Facebook X WhatsApp LinkedIn

প্রেস ডেস্ক, সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর এর অফিস

সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর এর নিজের সকল লেখা, শুভেচ্ছা, স্মরণ ইত্যাদি এই ডেস্ক থেকে প্রকাশিত হয়।

সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক, কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগ। ইতিহাস, রাজনীতি, প্রযুক্তি ও উন্নয়ন নিয়ে লেখালেখি।

যোগাযোগ

কুমারখালী বাস স্ট্যান্ড, দুর্গাপুর, কুমারখালী।
+৮৮০ (১৭) ৬৩০৩৮,৬৩০৩৯।contact@sufifaruq.com

© ২০২৬ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।