চট্‌কা গান । উত্তরবঙ্গের লোকসুর | গীত ধারা । অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

উত্তরবঙ্গের পলিমাটি ও তিস্তা-তোর্সা অববাহিকার (বাংলাদেশের রংপুর, দিনাজপুর এবং ভারতের কোচবিহার ও জলপাইগুড়ি এলাকা) লোকসংস্কৃতির এক অমূল্য সম্পদ হলো চট্‌কা গান। এটি লোকগীতির বরপুত্র ভাওয়াইয়ারই একটি বিশেষ ও প্রাণবন্ত রূপ। ভাওয়াইয়া গান যেখানে ধীর লয়ের, গভীর ও বিরহপ্রধান (যাকে আঞ্চলিক ভাষায় অনেক সময় ‘দরিয়া’ গানও বলা হয়), চট্‌কা সেখানে চপল, দ্রুতগতির ও হাস্যরসে ভরপুর লোকসুর।

নামকরণ ও গতির বৈশিষ্ট্য

‘চট্‌কা’ শব্দটির উৎপত্তি মূলত আঞ্চলিক ‘চটজলদি’ বা ‘চট’ (যার অর্থ দ্রুত বা তাড়াতাড়ি) শব্দ থেকে। প্রখ্যাত লোকসংগীত গবেষক মুহম্মদ মনসুরউদ্দীন তাঁর গবেষণায় উল্লেখ করেছেন যে, ভাওয়াইয়া হলো মানুষের অন্তরের সুগভীর কান্না, আর চট্‌কা হলো দৈনন্দিন জীবনের আনন্দ-বেদনার এক চঞ্চল ও হাস্যরসাত্মক প্রকাশ।

ভাওয়াইয়ার মতো এতে দীর্ঘ ব্যাকুল টান বা সুরের বিস্তার থাকে না, বরং এতে ‘জলদ লয়’ (Fast tempo) ব্যবহার করা হয়। গানের বাণীগুলো খুব দ্রুত উচ্চারিত হয়, যা শোনার সময় অনেক সময় প্রাণবন্ত সংলাপের মতো মনে হয়। উত্তরবঙ্গের রাজবংশী ও কামতাপুরী উপভাষার সঠিক আঞ্চলিক টান ও স্বরপ্রক্ষেপণ ছাড়া চট্‌কা গানের প্রকৃত মাধুর্য প্রকাশ করা সম্ভব নয়।

অনন্য বাদনশৈলী ও দোতারা

চট্‌কা গানের মূল সাঙ্গীতিক স্তম্ভ হলো দোতারা। এই গানে দোতারা বাজানোর একটি অত্যন্ত বিশিষ্ট ও বিশেষ ঢং রয়েছে, যাকে আঞ্চলিক সাঙ্গীতিক ভাষায় ‘খট্‌কা’ বলা হয়।

গায়ক যখন দ্রুত লয়ে গান পরিবেশন করেন, তখন দোতরার তারে আঙুলের বিশেষ কৌশলী আঘাতে এক ধরনের চপল ও ছন্দময় ঝংকার তৈরি হয়। এই বিশেষ দোতারার ঝংকারই চট্‌কা গানের মূল প্রাণশক্তি। দোতারার পাশাপাশি ঢোল, বাঁশি, মন্দিরা ও কাসর এই গানের ক্ষিপ্র তাল রক্ষা করে।

বিষয় বৈচিত্র্য ও সামাজিক উপাদান

চট্‌কা গানে কেবল সাধারণ বিনোদন নয়, বরং উত্তরবঙ্গের সামাজিক ও পারিবারিক জীবনের নানা সূক্ষ্ম রস উপজীব্য হয়।

প্রথমত, স্বামী-স্ত্রীর মিষ্টি ঝগড়া, দেবর-ভাবির রসাত্মক ঠাট্টা এবং নতুন দম্পতির মান-অভিমানের চিত্র এতে অত্যন্ত প্রাঞ্জলভাবে ফুটে ওঠে।

দ্বিতীয়ত, গ্রামীণ জোতদার, মোড়ল বা শোষক শ্রেণির কার্যকলাপ নিয়ে তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ প্রকাশের হাতিয়ার হিসেবে চট্‌কা ব্যবহৃত হয়।

তৃতীয়ত, কায়িক পরিশ্রমী মানুষের দৈনন্দিন অভাব-অনটন ও জীবনসংগ্রামকে বিষাদের বদলে কৌতুক ও চপলতার আবহে উপস্থাপন করা হয়।

এছাড়াও, নববধূর মনের চপল আকাঙ্ক্ষা ও গ্রাম্য জীবনের লৌকিক অনুভূতি চট্‌কার কথায় সবচেয়ে বেশি জীবন্ত হয়ে ওঠে।

সংরক্ষণ ও ঐতিহ্য

আব্বাসউদ্দীন আহমদ, মহেশ চন্দ্র রায়, সুখবিলাস বর্মা এবং পরবর্তী প্রজন্মের বহু প্রখ্যাত লোকশিল্পী ভাওয়াইয়ার পাশাপাশি চট্‌কা গানকেও ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়েছেন। আঞ্চলিক লোকনাট্য ও ভাওয়াইয়া আসরের প্রাণ হিসেবে চট্‌কা আজও উত্তরবঙ্গের মেঠো পথে আপন মহিমায় প্রজ্জ্বলিত।

সোর্স ও প্রামাণ্য রেফারেন্স:

১. হারামণি (উত্তরবঙ্গের লোকগীতি সংগ্রহ) — মুহম্মদ মনসুরউদ্দীন।
২. ভাওয়াইয়া — সুখবিলাস বর্মা (চট্‌কা গানের দোতারা বাদন ও ছন্দের প্রয়োগ সংক্রান্ত তথ্য)।
৩. উত্তরবঙ্গের লোকসঙ্গীত — নির্মলেন্দু ভৌমিক (চট্‌কা ও ভাওয়াইয়ার তুলনামূলক বিশ্লেষণ)।
৪. বাংলাদেশের লোকসংস্কৃতি — ড. এ. কে. এম. শাহনাওয়াজ।
আরও দেখুন: