সঙ্গীত শোনার প্রস্ততি | অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

আজ সংগীত শোনার প্রস্তুতি নিয়ে আলাপ করব।

কী শুনব?

শুনবেন রাগ। তার বিভিন্ন রঙে সাজানো রূপ আর বিচিত্র সব পরিবেশনা। তা হতে পারে কণ্ঠসংগীত কিংবা যন্ত্রসংগীত; হতে পারে শুদ্ধ শাস্ত্রীয়, উপশাস্ত্রীয় কিংবা মিশ্র রাগ। সহজ কথা হলো—শুনবেন সেটাই, যা আপনার কানে ও মনে প্রশান্তি দেয়।

শাস্ত্রীয় সংগীত শোনা মানে হলো কোনো একটি নির্দিষ্ট রাগ বা কম্পোজিশন শোনা। সেটি হতে পারে কণ্ঠে কিংবা বাদ্যযন্ত্রে। একই রাগের ওপর ভিত্তি করে তৈরি বিভিন্ন জনরা (Genre) বা বিভিন্ন গায়নশৈলীর (Style) গানগুলো শোনা এবং তার রস আস্বাদন করাই হলো আসল কাজ। ব্যাস, এটুকুই!

সাধারণ রাগাশ্রয়ী হালকা গানবাজনা শুনতে শুনতেই কান তৈরি হয়। কোনো একটি রাগের পরিবেশনা বারবার শুনতে শুনতে ক্রমশ কানে ও মনে সেই রাগের রূপ (অবয়ব ও রস) ধরা দিতে থাকে। মনের বিশেষ কোনো আবেগ বা অবস্থার সাথে তখন রাগের একটি ‘ম্যাপিং’ বা যোগসূত্র তৈরি হয়। জীবনের কোনো নির্দিষ্ট মুহূর্তে আপনার মন যখন সেই বিশেষ স্তরে পৌঁছায়, তখন অবচেতনভাবেই সেই রাগটি শুনতে ইচ্ছে করে। আর তখন তা শুনলে মনে হয় কোনো প্রিয় মানুষের সঙ্গ পাচ্ছেন। দ্বিধাহীনভাবে সুখ-দুঃখ ভাগ করে নেওয়ার এক অদ্ভুত শান্তি পাওয়া যায়।

রাগটা যখন ক্রমে প্রিয় হয়ে ওঠে, তখন প্রিয় মানুষের মতোই তাকে আরও গভীরভাবে জানতে ইচ্ছে করে। জানতে ইচ্ছে করে—তার প্রতিটি অঙ্গ দেখতে কেমন, কোথায় তার জন্ম, তার বেড়ে ওঠা, ইতিহাস, বিবর্তন আর চলন-বলন। তার পূর্ণ অবয়বকে স্পষ্ট দেখার এক তৃষ্ণা তৈরি হয়। জানাশোনার এই পথপরিক্রমায় সংগীতের প্রতি অনুরাগ ও ভালোবাসা কেবল বাড়তেই থাকে।

সঙ্গীত শোনার প্রস্ততি

সঙ্গীত শোনার প্রস্ততি

যুগে যুগে ওস্তাদরা একেকটি রাগকে আরও সাজিয়ে-গুছিয়ে উপস্থাপনের জন্য বিভিন্ন কৌশল উদ্ভাবন করেছেন। সংগীতের সেই কারুকাজগুলোকে চিনতে ইচ্ছে হয়। বিভিন্ন ঘরানা বা পরিবেশনশৈলীর বিশেষত্ব বুঝতে ইচ্ছে হয়। কোন বিশেষত্ব কখন, কীভাবে এবং কতখানি ফুটে উঠছে—সেটি জানার আগ্রহ তৈরি হয়। আর এই জানার যাত্রায় সংগীতের কারিগরি বিষয়গুলোর সাথে যেমন পরিচয় ঘটে, তেমনি রাগের রূপটাও মনের আয়নায় স্পষ্ট হতে থাকে।

তাই যেকোনো ধ্রুপদী শিল্পের মতোই ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের প্রকৃত আনন্দ পাওয়ার জন্য জানাশোনার ক্ষুধাটা ক্রমশ বাড়তে থাকে। যত বেশি জানা যায়, রসাস্বাদন ততটাই গভীর হয়; একসময় তা নেশার মতো হয়ে যায়। আর এক জীবনে যেহেতু শাস্ত্রীয় সংগীতের অসীম ভাণ্ডার চিনে শেষ করা সম্ভব নয়, তাই একটি মিষ্টি প্রেমের অপূর্ণতা নিয়েই হয়তো এই জীবন পার করে দেওয়া যায়।

 

শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের পরিবেশন:

শাস্ত্রীয় সংগীতের পরিবেশনা মানেই হলো গায়ন বা বাদনের মাধ্যমে কোনো একটি রাগকে মূর্ত করে তোলা। একটি রাগকে শুধুমাত্র ‘আকার’ (আ, ই, উ ধ্বনি) বা ‘সরগম’ (সা-রে-গা-মা) দিয়ে গেয়ে বা বাজিয়ে তার পূর্ণ অবয়ব প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। প্রাচীনকালে সংগীতের মূল রীতিটি অনেকটা এরকমই ছিল। তবে যুগে যুগে পরিবেশনাকে আরও আকর্ষণীয় ও সমৃদ্ধ করার জন্য সংগীতকে নানা ঢঙে সাজানো হয়েছে।

মানুষ রাগের এই কাঠামোকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন গায়ন ও বাদন রীতি (Genre) উদ্ভাবন করেছে, যেমন— ধ্রুপদ, খেয়াল ইত্যাদি। আবার বিভিন্ন অঞ্চলের লোকসংগীতের গায়নশৈলী থেকেও যুক্ত হয়েছে বিচিত্র সব অঙ্গ। প্রথিতযশা শিল্পীদের নিজস্ব গায়কী ও সৃজনশীলতার হাত ধরে তৈরি হয়েছে স্বতন্ত্র সব ‘ঘরানা’ (Gharana) বা সংগীতের ঘরোয়া ঘরানা। বিভিন্ন রাগে, বিভিন্ন রীতিতে এবং বিভিন্ন ঘরানার আবহে রচিত হয়েছে চমৎকার সব ‘বন্দিশ’ (Bandish)। তাই রাগের পাশাপাশি গায়নশৈলীর এই ভিন্নতা শ্রোতাকে এক বহুমাত্রিক স্বাদ আস্বাদনের সুযোগ করে দেয়। ঠিক এ কারণেই একই রাগ যখন ভিন্ন রীতিতে বা ভিন্ন ঘরানার শিল্পীর কণ্ঠে শোনা যায়, তখন তার আবেদনও হয় ভিন্নতর।

সুতরাং শাস্ত্রীয় সংগীত শোনা মানে কেবল রাগের পরিচয় জানা নয়, বরং এই সূক্ষ্ম বৈচিত্র্যগুলোর রস গ্রহণ করা। আপনি যত বেশি শুনবেন, এই বৈচিত্র্যগুলো আপনার কাছে তত স্পষ্ট হবে; আপনার শোনার আনন্দও বাড়বে এবং সুরের প্রতি এক দুর্নিবার আকর্ষণ তৈরি হবে।

SufiFaruq.com Logo 252x68 1 সঙ্গীত শোনার প্রস্ততি | অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

শোনার যাত্রাটা যেভাবে হতে পারে

আমাদের শাস্ত্রীয় সংগীত শোনার যাত্রাটা শুরু হতে পারে মূলত উপশাস্ত্রীয় সংগীত (Semi-classical) দিয়ে; অর্থাৎ রাগাশ্রয়ী হালকা গানবাজনার মাধ্যমে। শ্রোতা হিসেবে কোনো রাগের কঠোর ব্যাকরণ বা বিশুদ্ধ রূপ বোঝার চেষ্টা করার আগে, ওই রাগের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হালকা চালের গানগুলো প্রচুর পরিমাণে শোনা দরকার। এই গানগুলো আমাদের চারপাশে সবসময়ই বাজে, তাই এগুলো শোনার জন্য আলাদা করে পরিশ্রম করতে হয় না, অথচ অবজান্তেই আমাদের ‘কান’ তৈরি হতে থাকে।

উপশাস্ত্রীয় ধারার মধ্যে যা যা শুনতে পারেন: গজল, ঠুমরি, রাগাশ্রয়ী আধুনিক ও চলচ্চিত্রের গান, টপ্পা, কীর্তন, কাজরি, হরি, চৈতি এবং রাগাশ্রয়ী রবীন্দ্র ও নজরুল সংগীত।

এরপর ক্রমশ এগিয়ে যেতে হবে শুদ্ধ শাস্ত্রীয় (Classical) সংগীতের দিকে। শুদ্ধ গায়নরীতির মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত ধারা দুটি হলো— ধ্রুপদ (Dhrupad) এবং খেয়াল (Khayal)। ধ্রুপদ অত্যন্ত প্রাচীন এবং শুদ্ধতম ধারা হলেও খেয়ালের মতো এটি অতটা সর্বজনীন বা জনপ্রিয় হয়ে ওঠেনি। ধ্রুপদ মূলত বিশেষ কোনো আধ্যাত্মিক বা প্রার্থনা অনুষ্ঠানে বেশি শোনা যায়। আজকাল শাস্ত্রীয় সংগীতের আসরগুলোতে মূলত ‘খেয়াল’ রীতিতেই গান-বাজনা বেশি হয়। কণ্ঠশিল্পীদের পাশাপাশি যন্ত্রশিল্পীরাও মূলত খেয়ালের গায়নশৈলী অনুসরণ করেই বাদ্যযন্ত্র পরিবেশন করেন। তাই কণ্ঠের পরিবেশনা বুঝতে পারলে যন্ত্রের কারুকাজ বোঝাও অনেক সহজ হয়ে যায়। (যন্ত্রসংগীতের সামান্য কিছু কৌশলগত পার্থক্য নিয়ে নোট শেষে যুক্ত করা হবে)।

আমাদের পরিকল্পনা: প্রথমে উপশাস্ত্রীয় সংগীত দিয়ে আমরা রাগের ‘চেহারা’ বা মেজাজের সাথে পরিচিত হওয়ার চেষ্টা করব। এরপর আমরা যাব শুদ্ধ শাস্ত্রীয় সংগীতের দিকে এবং বোঝার চেষ্টা করব একটি পূর্ণাঙ্গ বৈঠকি আসর বা লাইভ পারফরম্যান্স।

একটি জরুরি কথা: মনে রাখতে হবে, কোনো স্টুডিও রেকর্ডিং আর লাইভ বৈঠকি আসর এক নাও হতে পারে। সময়ের সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক সময় রেকর্ডিংয়ে পুরো খেয়ালের বদলে তার একটি বিশেষ অংশ প্রকাশ করা হয়। কিন্তু বৈঠকি আসরে সচরাচর খেয়ালের সবগুলো অংশ ক্রমানুসারে নিখুঁতভাবে গাওয়া বা বাজানো হয়। তাই আসল রস পেতে বৈঠকি মেজাজের শোনার অভ্যাস করাটাই জরুরি।

SufiFaruq.com Logo 252x68 3 সঙ্গীত শোনার প্রস্ততি | অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

 

রেকর্ডেড সংগীত দিয়ে শুরু:

পরিচিতি ও প্রাথমিক প্রস্তুতি:

প্রথমে নির্দিষ্ট যেকোনো একটি রাগ বেছে নিন। এরপর ওই রাগের ওপর ভিত্তি করে তৈরি চলচ্চিত্র বা আধুনিক গান, গজল, রবীন্দ্র-নজরুল সংগীত, টপ্পা বা কীর্তনগুলো নিজের পছন্দমতো শুনতে থাকুন। শোনার সময় খেয়াল করুন—ভিন্ন ভিন্ন গান হওয়া সত্ত্বেও এদের সুরের কোথায় যেন একটি গভীর মিল আছে। বারবার ‘রিপিট’ দিয়ে শুনলে সেই সূক্ষ্ম মিলগুলো আপনার কানে ধরা দেবে। যেখানেই মিল, সেখানেই আসলে রাগের জাদু। এভাবে টানা দু-এক দিন শুনুন (বুঝতে দেরি হলে বিচলিত হওয়ার কিছু নেই)।

একাগ্রতা বজায় রাখুন:

মনে রাখবেন, যে কদিন একটি নির্দিষ্ট রাগকে মাথায় বসানোর চেষ্টা করছেন, সে কদিন অন্য কোনো রাগের বা মিশ্র রাগের গান না শোনাই ভালো। এতে মনোযোগ স্থির থাকে এবং রাগের রূপ ও মেজাজটি মস্তিষ্কে স্থায়ীভাবে গেঁথে যায়।

স্বর ব্যবহারের কারিগরি:

রাগের রূপরেখা ও আবহাওয়া বোঝার জন্য যেকোনো একটি বাদ্যযন্ত্র (যেমন হারমোনিয়াম) এবং আমার প্রতিটি রাগের নোটের “স্বর ব্যবহার” সেকশনটি নিয়ে বসুন। মনোযোগ দিয়ে বারবার পড়ুন এবং সাথে সাথে বাজিয়ে বা গেয়ে দেখার চেষ্টা করুন। গানটির পুরো সুরের সাথে নয়, বরং গানগুলোর মধ্যে থাকা ‘কমন’ বা সাধারণ সুরের অংশটির সাথে মিল খুঁজুন। কোনো একটি সুর যখন আপনার কান ও মনে ধরা দেবে, তখন এক স্বর্গীয় আবেশ অনুভব করবেন। এই আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। যদি শুরুতে মনে হয় কিছুই হচ্ছে না, তবুও হাল ছাড়বেন না; ফল পাওয়ার জন্য সময় দিতে হবে।

স্বর-মল্লিকা ও লক্ষণগীত:

“স্বর ব্যবহার” সেকশনটি নিয়ে কিছুক্ষণ নাড়াচাড়া করার পর স্বর-মল্লিকালক্ষণগীত শুনুন। এর মাধ্যমে স্বরগুলোর চলাফেরা বা ‘চলন’ বোঝার চেষ্টা করুন। যতক্ষণ পর্যন্ত আপনি নিজে থেকে অন্তত দু-চারটি মিল খুঁজে না পাচ্ছেন, ততক্ষণ হালকা গানগুলো শুনতে থাকুন। পাশাপাশি “স্বর ব্যবহার” দিয়ে প্র্যাকটিস করুন এবং গাইতে বা বাজাতে থাকুন। খুঁজে না পেলে আমার সামাজিক মাধ্যমের একাউন্টে মেসেজ করুন বা কমেন্ট করুন, আমি বা আমার টিমের কেউ একজন আপনাকে সাহায্য করবে।

পরিবেশ তৈরি রাখুন:

কাজের ফাঁকে ফাঁকে ওই রাগের যন্ত্রসংগীত (Instrumental) ছেড়ে রাখতে পারেন। রাতে ঘুমানোর সময় হালকা শব্দে গানটি চালিয়ে রাখলে তা অবচেতন মনে বেশ ভালো কাজ দেয়।

আলাপের গভীরতায় ঢোকার চেষ্টা করুন:

কিছুটা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করলে এবার রাগের ধীরগতির ‘আলাপ’ শোনা শুরু করুন। সেখানে স্বরগুলোর প্রয়োগ ধরার চেষ্টা করুন। ধরতে না পারলেও সমস্যা নেই, কেবল নিবিষ্ট মনে শোনার চেষ্টা চালিয়ে যান।

রাগ চেনার ম্যাজিক:

একই রাগের অন্তত ২৫টি ভিন্ন ভিন্ন কম্পোজিশন নিয়মিত শোনার চেষ্টা করুন। অল্প কয়েক দিনেই আপনি রাগটি চিনে যাবেন। তখন কেউ গাইতে শুরু করলেই আপনি নিজের অজান্তেই বলে উঠবেন— “এটি তো অমুক রাগ!” শুরুতে দু-একবার ভুল হওয়া খুবই স্বাভাবিক, কারণ অনেক বড় সংগীতজ্ঞদেরও দীর্ঘদিন চর্চায় না থাকা রাগ ধরতে কষ্ট হতে পারে।

অডিও লাইব্রেরি ও সহায়িকা:

সংগীত শোনার জন্য সবার আগে দরকার একটি সমৃদ্ধ অডিও লাইব্রেরি। যেখানে একটি নির্দিষ্ট রাগের পরিচিত সব জনরা, বিখ্যাত ঘরানা এবং প্রচলিত সব তালের অন্তত ২৫টি গান বা বাজনা থাকবে। এমন একটি লাইব্রেরি তৈরি করা বেশ সময়সাপেক্ষ এবং তা ব্যবস্থাপনা করাও কঠিন। তাই আপনাদের সুবিধার্থে আমরা প্রতিটি রাগের ‘শ্রোতা সহায়িকা’ নোটের সাথে অনলাইনে শোনার প্রয়োজনীয় লিঙ্কগুলো গুছিয়ে দেব (অফলাইনের জন্য আমরা আলাদাভাবে DVD-ও তৈরি করছি)।

এভাবেই রাগের সাথে আপনার প্রাথমিক পরিচয় ঘটে যাবে। এরপর আমাদের যাত্রা হবে বৈঠকি রীতির গান-বাজনার দিকে। কারণ শাস্ত্রীয় সংগীতের আসল রোমাঞ্চ লুকিয়ে থাকে বৈঠকি আসরে। যেহেতু এই পারফরম্যান্সগুলো নির্দিষ্ট কিছু নিয়ম মেনে চলে, তাই তার পূর্ণ রস আস্বাদন করতে হলে আমাদের এই রীতিনীতিগুলোও জেনে রাখা প্রয়োজন।

 

আরও দেখুন:

Leave a Comment