হিন্দুস্থানি সঙ্গীতের রাগের নোট

রাগ দেবগিরি বিলাবল । শ্রোতা সহায়িকা নোট । অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের সুবিশাল সাগরে বিলাবল অঙ্গের যতগুলো রাগ আছে, তার মধ্যে ‘দেবগিরি বিলাবল’ নিঃসন্দেহে এক অত্যন্ত সমৃদ্ধ, কারুকার্যময় এবং শ্রুতিমধুর রাগ। বাহ্যিকভাবে এটি শুদ্ধ স্বরের প্রাধান্যযুক্ত একটি রাগ হলেও, এর বিশেষ বক্র গতি এবং অনন্য স্বরসঙ্গতির কারণে সাধারণ শুদ্ধ বিলাবল থেকে এটি একেবারে স্বতন্ত্র এক ব্যক্তিত্ব নিয়ে আত্মপ্রকাশ করে।

দেবগিরি বিলাবল হলো বিলাবল ঠাটের অন্যতম প্রধান ও প্রাচীন একটি প্রকারভেদ। ইতিহাসবিদদের মতে, ‘দেবগিরি’ নাম থেকেই আঁচ করা যায় যে এই রাগের আদি উৎপত্তি হয়তো দাক্ষিণাত্তের ঐতিহাসিক দেবগিরি (বর্তমান দৌলতাবাদ) অঞ্চল থেকে হয়েছিল। মধ্যযুগীয় সংগীতগ্রন্থগুলোতেও এই রাগের সুস্পষ্ট উল্লেখ পাওয়া যায়। মূল কাঠামোর দিক থেকে এটি মূলত বিলাবল এবং কল্যাণ অঙ্গের এক অতি সুক্ষ্ম ও চমৎকার মিলনমেলা, তবে এর প্রধান ভিত্তি কিন্তু বিলাবল অঙ্গেই পোঁতা।

এই রাগের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য ও বৈশিষ্ট্য লুকিয়ে রয়েছে এর আরোহের বক্র চলনে। সাধারণ বিলাবলের মতো এর আরোহ সোজা পথে হাঁটে না। দেবগিরি বিলাবলে আরোহের সময় ‘মধ্যম’ (মা) স্বরটিকে কিছুটা এড়িয়ে বা অলংকারের মতো বক্রভাবে ব্যবহার করা হয়। বিশেষ করে ‘সা রে গা রে গা পা’ কিংবা ‘সা রে গা পা’—এই স্বরসঙ্গতিটি দেবগিরি বিলাবলের একবারে নিজস্ব সিগনেচার বা প্রাণভোমরা। যদিও এটি প্রধানত শুদ্ধ স্বরের রাগ, তবুও রাগের গভীরতা ও বৈচিত্র্য বাড়াতে কোনো কোনো ঘরানায় (বিশেষ করে জয়পুর বা গোয়ালিয়র ঘরানায়) কোমল নিষাদের (নি) অতি সামান্য বিবাদী স্পর্শ এবং কদাচিৎ তীব্র মধ্যমের হালকা ছায়া দেখা যায়, যা শ্রোতার মনে এক অদ্ভুত দোলা দিয়ে যায়।

রাগের শাস্ত্রীয় রূপরেখা:

  • ঠাট: বিলাবল।
  • জাতি: সম্পূর্ণ-সম্পূর্ণ (আরোহে ৭টি স্বর এবং অবরোহে ৭টি স্বরই ব্যবহৃত হয়, তবে আরোহের চলন বক্র)।
  • আরোহ: সা, রে গা, রে গা পা, মা ধা, নি সা। (অথবা: সা রে গা পা, মা ধা নি সা)।
  • অবরোহ: সা নি ধা পা, মা গা, রে সা।
  • বাদী স্বর: ষড়জ (সা)।
  • সমবাদী স্বর: পঞ্চম (পা)। (বি.দ্র. অনেক সংগীতশাস্ত্রীর মতে এর বাদী ‘ধৈবত’ (ধা) এবং সমবাদী ‘গান্ধার’ (গা))।
  • বর্জিত স্বর: নেই (সব স্বরই বিদ্যমান)।
  • ব্যবহৃত স্বর: মূলত সব শুদ্ধ স্বর ব্যবহৃত হয় (বিশেষ ঘরানায় কোমল ‘নি’-এর সুক্ষ্ম স্পর্শ ঘটে)।
  • পরিবেশন সময়: দিনের প্রথম প্রহর (সকাল ৬টা থেকে ৯টা)।
  • প্রকৃতি: গম্ভীর, প্রশান্ত, নমনীয় এবং ভক্তিপ্রবণ।

সম্পর্কিত বা সদৃশ রাগসমূহ:

  • শুদ্ধ বিলাবল: দেবগিরি বিলাবলের সাথে এর প্রচুর মিল থাকলেও পার্থক্য হলো শুদ্ধ বিলাবলের আরোহ ও চলন বেশ সহজ-সরল, কিন্তু দেবগিরির চলন জটিল ও বক্র।
  • আলহিয়া বিলাবল: আলহিয়া বিলাবলের অবরোহে কোমল নিষাদের (নি) উপস্থিতি খুব স্পষ্ট ও বাধ্যতামূলক, যা দেবগিরিতে সাধারণতঃ দেখা যায় না।
  • যমন (ইমন): আরোহের ‘নি রে গা’ এবং মেজাজের সূক্ষ্ম টানের কারণে অনেক সময় যমন রাগের একটি আবহ অনুভব করা যায়।
  • গৌড় সারং: নির্দিষ্ট কিছু বক্র স্বরসঙ্গতির কারণে (যেমন রে গা মা পা-এর প্যাটার্ন) গৌড় সারং রাগের সাথে এর একটি দূরবর্তী আত্মীয়তা বা অনুষঙ্গ লক্ষ্য করা যায়।

রাগ দেবগিরি বিলাবল তার গাম্ভীর্য, অভিজাত্য এবং শৈল্পিক বক্রতার জন্য শাস্ত্রীয় সংগীতরসিকদের কাছে অত্যন্ত আদরণীয়। ভোরের আলো ফুটবার পর সকালের স্নিগ্ধ পরিবেশে এই রাগের বিস্তার ও তান যখন বাতাসে ভেসে বেড়ায়, তখন তা শ্রোতার হৃদয়ে এক অদ্ভুত প্রশান্তি ও আধ্যাত্মিক অনুভূতির জন্ম দেয়। বিলাবল পরিবারের অন্য সব রাগের তুলনায় দেবগিরি বিলাবল পরিবেশন করা শিল্পীর জন্য বেশ চ্যালেঞ্জিং, কারণ এটি গায়কের সূক্ষ্ম মেধা ও সৃজনশীলতার পরীক্ষা নেয়। শুদ্ধ স্বরের এই অপূর্ব মেলবন্ধন সত্যিই আমাদের ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের এক অমূল্য রত্ন।

তথ্যসূত্র (Sources):

১. রাগ পরিচয় (দ্বিতীয় ও চতুর্থ খণ্ড) – পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখণ্ডে।

২. ক্রমিক পুস্তক মালিকা – ভি. এন. ভাতখণ্ডে।

৩. রাগ বিজ্ঞান – পণ্ডিত বিনায়ক রাও পট্টবর্ধন।

৪. ভারতীয় সংগীতের অভিধান – বিমলাকান্ত রায় চৌধুরী।

শেয়ার করুন: Facebook X WhatsApp LinkedIn

প্রেস ডেস্ক, সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর এর অফিস

সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর এর নিজের সকল লেখা, শুভেচ্ছা, স্মরণ ইত্যাদি এই ডেস্ক থেকে প্রকাশিত হয়।

সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক, কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগ। ইতিহাস, রাজনীতি, প্রযুক্তি ও উন্নয়ন নিয়ে লেখালেখি।

যোগাযোগ

কুমারখালী বাস স্ট্যান্ড, দুর্গাপুর, কুমারখালী।
+৮৮০ (১৭) ৬৩০৩৮,৬৩০৩৯।contact@sufifaruq.com

© ২০২৬ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।