ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ব্যাকরণ এবং লোকায়ত সুরধারার মেলবন্ধনে ‘রাগ ধনশ্রী’ (Dhanashree বা Dhanasri) এক অতীব প্রাচীন, মধুরাঙ্গ ও করুণ রসাত্মক রাগ। বৈষ্ণব পদাবলী, প্রাচীন কীর্তন এবং গুরুগ্রন্থ সাহিবের সুপ্রাচীন রাগপরম্পরায় ধনশ্রীর নাম স্বর্ণাক্ষরে লিখিত রয়েছে। এটি এমন এক রাগ, যার রূপগত লালিত্য ও চপলতা শ্রোতার মনে ক্ষণিকের মধ্যে এক পরম আধ্যাত্মিক আকুলতা ও আনমনা অনুভূতির জন্ম দেয়।
রাগ ধনশ্রী মূলত অপরাহ্ণ বা গোধূলি বেলার রাগ। রাগ ভীমপলশ্রীর সাথে এর স্বরগত কাঠামোর সুগভীর সাদৃশ্য থাকলেও, স্বরপ্রক্ষেপণের কৌশল, পঞ্চমের ওপর বিশেষ পক্ষপাত এবং দ্রুত গতিময়তার কারণে এটি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে নিজের সম্পূর্ণ পৃথক ও সতেজ অস্তিত্ব বজায় রেখেছে।
অন্যান্য নাম, রূপভেদ ও প্রাচীন প্রথা
ঐতিহাসিক সাঙ্গীতিক পাঠ্য ও আঞ্চলিক ভেদে রাগ ধনশ্রীকে বেশ কয়েকটি নামে ও ভিন্ন রূপায়ণে ডাকা হয়:
- ধনাশ্রী / ধনাশ্রী রাগ: প্রাচীন সংস্কৃত ও ব্রজবুলি সাহিত্যে (বিশেষ করে বৈষ্ণব শাক্ত পদাবলীতে) এই রাগকে ‘ধনাশ্রী’ নামে অভিহিত করা হয়েছে।
- ধানাস্রী (Dhanasri): শিখ ধর্মের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ ‘শ্রী গুরুগ্রন্থ সাহিব’-এ এটি ১৩ নম্বর রাগ হিসেবে নিবন্ধিত, যেখানে এটি ‘ধানাস্রী’ নামে সুপরিচিত। গুরু নানক, গুরু অমর দাস, গুরু রাম দাস ও গুরু অর্জন দেবের অজস্র পবিত্র বাণী এই ধানাস্রী রাগে নিবদ্ধ।
- কর্ণাটকী ধান্যাসি (Dhanyasi): দক্ষিণ ভারতীয় কর্ণাটকী সঙ্গীত ধারায় ধনশ্রীর কাছাকাছি একটি রাগ ‘ধান্যাসি’ নামে গীত হয়, যা ৮ নম্বর মেলাকর্তা হনুমাতোড়ী-র জন্য রাগ হিসেবে গণ্য।
- সিন্ধু ধনশ্রী ও জয়জাইবন্তী-ধনশ্রী: উত্তর ভারতীয় উপ-শাস্ত্রীয় ও ঠুমরি অঙ্গে ধনশ্রীর সাথে অন্যান্য রাগের মিশ্রণে ‘সিন্ধু ধনশ্রী’ বা ‘মিশ্র ধনশ্রী’ নামরূপ তৈরি হয়।
রাগের বিশেষত্ব ও রূপগত আভিজাত্য
রাগ ধনশ্রী হলো কাফি ঠাটের অন্তর্ভুক্ত একটি অতি মিষ্টি ও কোমল রাগ। ভীমপলশ্রীর মতোই এর আরোহণে ঋষভ (রে) এবং ধৈবত (ধা) স্বর দুটি বর্জিত থাকে, ফলে এটি জাতিগতভাবে ঔড়ব-সম্পূর্ণ।
তবে ভীমপলশ্রী থেকে ধনশ্রীর প্রধান তফাত হলো এর গতি এবং ‘পঞ্চম’ (পা) স্বরের ওপর বিশেষ অবস্থান। ভীমপলশ্রী যেখানে শুদ্ধ মধ্যমের (মা) ওপর দাঁড়িয়ে বিলম্বিত লয়ে অন্তর্মুখী বিষাদ তৈরি করে, ধনশ্রী সেখানে পঞ্চমের (পা) ওপর জোর দিয়ে কিছুটা চঞ্চল, চপল ও উদাসীন বিরহভাব প্রকাশ করে। খেয়াল, ঠুমরি, দাদরা এবং বিশেষ করে ভজন ও বৈষ্ণব কীর্তনে রাগ ধনশ্রীর প্রয়োগ ব্যাপকভাবে দেখা যায়।
রাগের শাস্ত্রীয় কোষ্ঠী ও গঠনতত্ত্ব
| শাস্ত্রীয় অঙ্গ | বিশদ বিবরণ |
| ঠাটের নাম | কাফি ঠাট। |
| জাতি | ঔড়ব-সম্পূর্ণ (আরোহণে ৫টি স্বর এবং অবরোহণে ৭টি স্বর ব্যবহৃত হয়)। |
| বাদী স্বর | পা (পঞ্চম — এর ওপর বারবার স্পর্শ ও অবস্থান রাগের প্রাণ)। |
| সমবাদী স্বর | সা (ষড়জ)। |
| বর্জিত স্বর | আরোহণে ঋষভ (রে) এবং ধৈবত (ধা) বর্জিত। |
| ব্যবহৃত স্বর | গান্ধার (গা) এবং নিষাদ (নি) কোমল; বাকি সব স্বর (রে, মা, ধা) শুদ্ধ। |
| প্রথাগত সময় | অপরাহ্ণ বা দিনের তৃতীয় প্রহর (বিকাল ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা)। |
| রস ও প্রকৃতি | প্রচ্ছন্ন করুণ, চপল, প্রেমময় ও ভক্তিপ্রধান। |
আরোহ, অবরোহ ও প্রধান চলন (পকড়)
- আরোহ: ণ্ সা জ্ঞ মা পা ণি র্সা
- অবরোহ: র্সা ণি ধা পা মা জ্ঞ রে সা
- পকড় (প্রধান সাঙ্গীতিক বাক্য): ণ্ সা জ্ঞ মা পা, পা ণি ধা পা, মা জ্ঞ রে সা / জ্ঞ মা পা ণি র্সা, ণি ধা পা, মা জ্ঞ রে সা
- চলন (গীতি রূপায়ণ): ণ্ সা জ্ঞ মা পা, মা পা ণি ধা পা, জ্ঞ মা পা র্সা, র্সা ণি ধা পা, মা জ্ঞ রে সা
(বি.দ্র.: এখানে ‘জ্ঞ, ণি’ দ্বারা কোমল গান্ধার ও কোমল নিষাদ এবং ‘ণ্’ দ্বারা মন্দ্র/খাদ সপ্তকের কোমল নিষাদ নির্দেশ করা হয়েছে)।
রাগ ভীমপলশ্রীর সাথে সূক্ষ্ম পার্থক্য
যেহেতু দুটি রাগের আরোহ ও অবরোহ অবিকল এক, তাই ভুল বোঝাবুঝি এড়াতে পার্থক্যটি জানা প্রয়োজন:
১. বাদী স্বরের পার্থক্য: ভীমপলশ্রীর বাদী স্বর হলো ‘মা’ (শুদ্ধ মধ্যম), কিন্তু ধনশ্রীর বাদী স্বর হলো ‘পা’ (পঞ্চম)।
২. চলনের মেজাজ: ভীমপলশ্রী বিলম্বিত লয়ে গম্ভীর ও অত্যন্ত করুণ; ধনশ্রী মধ্যম বা দ্রুত লয়ে চঞ্চল ও মাধুর্যময়।
৩. স্বরের প্রয়োগ: ধনশ্রীতে ‘জ্ঞ মা পা’ বা ‘পা ণি ধা পা’ স্বরসঙ্গতি বারবার ব্যবহার করে পঞ্চমের ওপর বিশ্রাম নেওয়া হয়, যা ভীমপলশ্রীতে অনুপস্থিত।

