আজকে কথা হচ্ছিল একজনের মুসলিম লীগার মানসিকতার লোকের সাথে। প্রসঙ্গ ছিল দেশভাগ—পার্টিশনের পর থেকে বছরের পর বছর ধরে বাংলাদেশ ও পাকিস্তান থেকে হিন্দুদের ভারতে চলে যাওয়া, এবং বিপরীত স্রোতে ভারতের মুসলিমদের সেভাবে পাকিস্তান বা বাংলাদেশে না আসার পেছনের কারণ। তিনি কথার এক পর্যায়ে ভারতের তুলনায় বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে অধিক সংখ্যালঘু নিপীড়ন এবং খারাপ আচরণের বিষয়টি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারলেন না। ওই ধরনের ‘মুসলিম লীগার’ মানসিকতার মানুষদের কাছে নিজেদের দেশে সংখ্যালঘুর নিপীড়নের বিষয়টি যেন এক্সিস্টই করে না।
তিনি ঘুরেফিরে সেই একই যুক্তিতে এসে দাঁড়ালেন—ভারত যেহেতু অর্থনৈতিকভাবে ভালো করেছে এবং ভারত একটি হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র, তাই হিন্দুরা উন্নত জীবনের আশায় ভারতে চলে যায়। আর মুসলিমরা ভারত ছেড়ে পাকিস্তান বা বাংলাদেশে আসে না তার কারণও ওই একটাই, অর্থনীতি! ভারত যেহেতু অর্থনীতিতে অনেক এগিয়ে গেছে, তাই ভারতের মুসলমানরা বাংলাদেশ বা পাকিস্তানে আসে না; তারা নিপীড়ন সহ্য করেও ভারতেই থেকে যায়।
আমি কিন্তু তাকে একবারও বলিনি যে ভারতে সংখ্যালঘু নিপীড়ন হয় না। অবশ্যই হয় এবং এর অনেক নৃশংস উদাহরণও আছে। কিন্তু এর সাথে এটাও তো এক নিদারুণ সত্য যে, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে এই মাত্রা তুলনামূলকভাবে বেশি। আর এই কারণেই পার্টিশনের পর থেকে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে সংখ্যালঘুর হার ক্রমশ কমছে, অথচ ভারতে সংখ্যালঘুর হার বাড়ছে।
তর্কটা ওই জায়গায় থামিয়ে আমি তাকে অন্য একটি গভীর বাস্তবতার কথা বললাম। আমি তাকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম, একজন মুসলমান যত সহজে তার পৈত্রিক বাড়ি চিরতরে ছাড়ার কথা ভাবতে পারে, একজন হিন্দু ততটা সহজে সে কথা স্বপ্নেও ভাবতে পারে না। আমরা প্রায়ই এই দুই সম্প্রদায়ের দেশান্তরের সমীকরণকে এক পাল্লায় মেপে ফেলি। কিন্তু একটু গভীরভাবে, দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এর পেছনের মনস্তাত্ত্বিক, আধ্যাত্মিক ও আবেগীয় প্রেক্ষাপট একেবারেই আলাদা।
ইসলাম বা সেমিটিক দর্শনে নির্দিষ্ট কোনো ‘মাটি’ বা ‘বাসস্থানের’ সাথে আধ্যাত্মিক পবিত্রতার কোনো অবিচ্ছেদ্য শর্ত নেই। আমাদের বিশ্বাসে মহান আল্লাহ সর্বত্র বিরাজমান; সমগ্র পৃথিবীই আমাদের জন্য প্রার্থনার জায়গা। একজন মুসলমান যেকোনো স্থানে তার জায়নামাজ বিছিয়ে নিতে পারেন। পুরনো স্থাপনা ভেঙে নতুন করে মসজিদ নির্মাণ করা যায়, প্রয়োজনে ভৌগোলিক কারণে তা স্থানান্তরও করা যায়। এতে প্রার্থনার পবিত্রতায় বিন্দুমাত্র কমতি হয় না। এমনকি আমাদের সর্বোচ্চ পবিত্র স্থান কাবা ঘরও বহুবার সংস্কার ও পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে। অর্থাৎ, কাঠামোর চেয়ে স্রষ্টার প্রতি আত্মসমর্পণের বিষয়টিই আমাদের কাছে মুখ্য। তাই একজন মুসলমান যখন তার পৈত্রিক ভিটা ছেড়ে অন্য কোনো শহরে বা দেশে যান, তিনি খুব সহজেই তার ধর্ম ও বিশ্বাসকে নতুন জায়গায় মানিয়ে নিতে পারেন। তার কাছে পুরনো বাড়িটি মূলত একটি ইমোশনাল মেমোরি, এর সাথে সরাসরি ধর্মের কোনো সংঘাত ঘটে না।
কিন্তু একজন সনাতন ধর্মাবলম্বীর কাছে চিত্রটা একেবারেই উল্টো। তার পৈত্রিক বাড়িটি কেবল ইট-পাথর-সুরকির মাথা গোঁজার ঠাঁই নয়, এটি রীতিমতো এক জীবন্ত আধ্যাত্মিক সত্তা; তার ধর্ম, বিশ্বাস ও বংশের শিকড়ের সাথে একাকার হয়ে থাকা একটি তীর্থক্ষেত্র।
সনাতন ধর্মে যখন কোনো বাড়ি তৈরি হয়, তখন ‘বাস্তুপূজা’ করে ওই মাটির প্রাণপ্রতিষ্ঠা করা হয়। সেই ভিটার একজন নির্দিষ্ট ‘বাস্তুদেবতা’ বা ‘বাস্তুপুরুষ’ থাকেন, যাকে ওই বংশের রক্ষাকর্তা মানা হয়। শত শত বছর ধরে একই স্থানে পূজার্চনা, মন্ত্রোচ্চারণ, শাঁখ আর কাঁসর-ঘণ্টার ধ্বনিতে ওই বাড়ির মাটি ও বাতাসে এক অদ্ভুত আধ্যাত্মিক স্পন্দন তৈরি হয়। একজন হিন্দু বিশ্বাস করেন, তার পৈত্রিক ভিটার এই শক্তি কোনোভাবেই স্থানান্তরযোগ্য নয়। তাই ভিটেমাটি ছাড়ার অর্থ হলো সেই শতবর্ষী সুরক্ষাবলয় এবং আধ্যাত্মিক শিকড়কে নিজের হাতে চিরতরে উপড়ে ফেলা।
একটি হিন্দু বাড়ির অন্দরমহলে তাকালে এই শেকড় ছেঁড়ার যন্ত্রণার গভীরতা আরও স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। পৈত্রিক বাড়ির ঠাকুরঘরে হয়তো পাঁচ-ছয় প্রজন্ম ধরে কুলদেবতা বা ইষ্টদেবতার নিত্যপূজা হয়ে আসছে। দেশান্তরের সময় এই দেবতাকে সবসময় সাথে নেওয়া সম্ভব হয় না। আর নিয়ে গেলেও নতুন কোনো অচেনা পরিবেশে তাকে স্থাপন করার মধ্যে এক গভীর অপরাধবোধ কাজ করে। পূর্বপুরুষের প্রতিষ্ঠিত দেবতাকে তার আদি স্থান থেকে উপড়ে ফেলার গ্লানি একজন হিন্দুকে সারাজীবন তাড়া করে ফেরে।
এর বাইরে থাকে বাড়ির উঠোনের তুলসীমঞ্চ। এটি কেবল একটি গাছ নয়, বাড়ির লক্ষ্মীশ্রী ও পবিত্রতার প্রতীক। প্রতিদিন সন্ধ্যায় শাঁখ বাজিয়ে যে তুলসীতলায় প্রদীপ জ্বলত, সেই উঠোনটিকে এতিমের মতো ফেলে যাওয়ার কষ্ট কোনো জাগতিক বা অর্থনৈতিক লাভ দিয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়। সবচেয়ে বড় হাহাকারটি লুকিয়ে থাকে পূর্বপুরুষের স্মৃতি ও তর্পণের দায়বদ্ধতায়। হিন্দু ধর্মে পিতৃপক্ষ বা মহালয়ার সময় বিশ্বাস করা হয় যে, মৃত পূর্বপুরুষেরা তাদের পৈত্রিক ভিটায় ফিরে আসেন। যখন একজন হিন্দু তার ভিটে ছেড়ে যান, তখন তার মনে এই তীব্র যন্ত্রণা ও শঙ্কা কাজ করে— “আমার পিতৃপুরুষেরা এসে এই শূন্য ভিটায় কার কাছে এক গ্লাস জল চাইবে?” পৈত্রিক পুকুরঘাটে দাঁড়িয়ে তর্পণ করার যে আত্মিক শান্তি, পৃথিবীর অন্য কোনো প্রান্তে বসে তা মেলে না। ভিটা ছাড়ার অর্থ হলো পূর্বপুরুষদের আত্মাকে নিরাশ করা।
আমার সেই পরিচিত মানুষটির মতো অনেকেই যে ভাবেন হিন্দুরা ভারতে চলে যায় উন্নত জীবনের আশায়, এটি চরম একপেশে ও ভ্রান্ত ধারণা। ভারত কোনো আমেরিকা বা কানাডা নয় যে সেখানে গেলেই রাতারাতি জীবনযাত্রার মান বদলে যাবে। বরং, এদেশ থেকে যাওয়া একজন মধ্যবিত্ত হিন্দুকে সেখানে গিয়ে অনেক ক্ষেত্রেই শূন্য থেকে লড়াই শুরু করতে হয়। নিজের দেশে যে মানুষটি হয়তো অত্যন্ত সম্মানজনক পেশায় ছিলেন, সেখানে তাকে টিকে থাকার জন্য অমানবিক সংগ্রাম করতে হয়।
তাহলে তারা কেন যায়? এই দেশান্তরের পেছনে থাকে এক অদৃশ্য মনস্তাত্ত্বিক চাপ, সামাজিক নিরাপত্তাহীনতার বোধ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার শঙ্কা। যখন পারিপার্শ্বিক অবস্থা, সামাজিক বৈষম্য বা কোনো নীরব বঞ্চনা এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, নিজের শেকড় আঁকড়ে ধরে রাখা আর সম্ভব হয় না—ঠিক তখনই একজন মানুষ চোখের জলে তার বুকের মানিক, পূর্বপুরুষের পবিত্র ভিটেমাটি ছেড়ে অজানার উদ্দেশ্যে পাড়ি জমায়।
তাই হিন্দুদের এই মাইগ্রেশনকে আমাদের সচরাচর দেখার দৃষ্টিভঙ্গি বদলানো প্রয়োজন। এটি নিছক পাসপোর্ট বদল বা ঠিকানার পরিবর্তন নয়; এটি একটি জীবন্ত গাছের শেকড় উপড়ে ফেলার মতো নির্মম ও যন্ত্রণাদায়ক প্রক্রিয়া। ইসলাম ধর্মের অনুসারী হিসেবে আমরা হয়তো কখনোই পুরোপুরি সেই আধ্যাত্মিক শূন্যতা বা ‘স্পিরিচুয়াল ডিসকানেকশন’ অনুভব করতে পারব না, যা একজন সনাতন ধর্মাবলম্বী তার পৈত্রিক ভিটা ত্যাগ করার সময় বুকের ভেতর বয়ে বেড়ান। তাদের কাছে ভিটা হলো মন্দির, মাটি হলো দেবতা, আর উঠোন হলো পূর্বপুরুষের হেঁটে চলা পবিত্র পথ। এই পবিত্র পথ ফেলে যখন কেউ চিরতরে চলে যায়, তখন বুঝতে হবে এর পেছনে শখের চেয়ে অনেক বড় কোনো বাধ্যবাধকতা ও গভীর ক্ষত লুকিয়ে আছে। আর সেই ক্ষত বুঝতে হলে আমাদের প্রয়োজন অপরিসীম মানবিক সংবেদনশীলতা।