হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের কল্যাণ ঠাটের অন্তর্গত অপ্রচলিত ও মনোরম শাখা রাগগুলোর মধ্যে ‘রাগ আনন্দ কল্যাণ’ (যা প্রথাগত শাস্ত্রীয় চর্চায় ‘আনন্দী কল্যাণ’ বা ‘আনন্দ কল্যাণ’ নামেও পরিচিত) এক অনন্য স্থান অধিকার করে আছে।
নাম থেকেই অনুমেয় যে, এই রাগের প্রধান সুরভাব হলো পরম প্রফুল্লতা, অনাবিল আনন্দ ও স্নিগ্ধ প্রশান্তি। প্রথাগত রাগ ইমনের সুগভীর ও গম্ভীর পরিবেশের সাথে যখন একধরনের প্রফুল্ল চপলতা ও আনন্দের সুরমিশ্রণ ঘটানো হয়, তখন রাগ আনন্দ কল্যাণের সাঙ্গীতিক অবয়ব ফুটে ওঠে।
ইতিহাস ও বিকল্প নামকরণ
উত্তর ভারতীয় মার্গ সঙ্গীতে রাগ আনন্দ কল্যাণ একটি প্রথাগত ও প্রামাণ্য রাগ হিসেবে স্বীকৃত। শাস্ত্রগ্রন্থে ও প্রবীণ ঘরানাধারীদের চর্চায় এই রাগটি বেশ কয়েকটি বিকল্প নামে সংজ্ঞায়িত:
১. আনন্দী কল্যাণ (Anandi Kalyan): রাজস্থান, গোয়ালিয়র ও কিরানা ঘরানার বেশ কিছু সুরসাধক একে ‘আনন্দী কল্যাণ’ নামে ডেকে থাকেন।
২. আনন্দ কল্যাণ (Anand Kalyan): সাধারণ প্রয়োগে ও বন্দিশের পাঠে অনেক সময় ‘আনন্দী’ অংশটি সংক্ষিপ্ত হয়ে ‘আনন্দ কল্যাণ’ রূপ লাভ করে।
৩. আনন্দী (Anandi – কল্যাণ অঙ্গ): ক্ষেত্রবিশেষে সংক্ষেপে কেবল ‘আনন্দী’ বলা হলেও এটি মূলত কল্যাণ অঙ্গেরই একটি প্রফুল্ল শাখা হিসেবে পরিগণিত হয়।
পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখণ্ডেজীর ঐতিহাসিক দলিল এবং বি. সুব্বা রাও-এর ‘রাগানধি’ (Raganidhi) গ্রন্থে কল্যাণ পরিবারের অপ্রচলিত রত্ন হিসেবে আনন্দ/আনন্দী কল্যাণের গাঠনিক বিবরণ ও প্রামাণ্যতা পাওয়া যায়।
রাগের শাস্ত্রীয় কাঠামো
- ঠাট: কল্যাণ ঠাট।
- জাতি: ষাড়ব-সম্পূর্ণ (আরোহণে মধ্যম বা পঞ্চমের বিশেষ বক্রতার কারণে ছয়টি স্বর এবং অবরোহণে সাতটি স্বর ব্যবহৃত হয়; মতান্তরে সম্পূর্ণ-সম্পূর্ণ)।
- বাদী স্বর: গ (শুদ্ধ গান্ধার)।
- সমবাদী স্বর: নি (শুদ্ধ নিখাদ) বা র (শুদ্ধ ঋষভ — ঘরানাভেদে)।
- ব্যবহৃত স্বর: শুদ্ধ ঋষভ (
R), শুদ্ধ গান্ধার (G), তীব্র মধ্যম (M'), শুদ্ধ পঞ্চম (P), শুদ্ধ ধৈবত (D), শুদ্ধ নিখাদ (N) এবং ষড়্জ (S)। কোনো কোনো সুপ্রসিদ্ধ গায়নিতে অবরোহণে অতীব সূক্ষ্ম অলঙ্কার হিসেবে শুদ্ধ মধ্যমের (M) স্পর্শ প্রয়োগ করা হয়। - সময়: রাত্রির ১ম প্রহর (সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত ১০টা)।
- প্রকৃতি ও রস: প্রফুল্ল, মিষ্টি, আনন্দময় ও স্নিগ্ধ। এর মূল রস হলো হাশ্য/আনন্দ, শৃঙ্গার ও শান্ত রস।
আরোহ, অবরোহ ও পকড় (স্বরসংগতি)
S R G M' P D N S'N' R G P D N S')S' N D P M' G R SS' N D P M' G M G R S)G P D N S', S' N D P, M' G R SN' R G, M' P, D P M' G R S)গায়কি ও কারিগরি বৈশিষ্ট্য
G) এবং নিখাদ (N)-এর ওপর স্থায়িত্ব বা ন্যাস নেওয়া হয় বেশি। G P D N S' বা N' R G সংগতিটি রাগের প্রধান ভিত্তি ধরে রাখে।M') ব্যবহৃত হলেও ইমন কল্যাণের মতো অবরোহণে গান্ধারে আসার সময় খুব আলতোভাবে শুদ্ধ মধ্যমের (M) অলঙ্করণ রাগটিকে আরও মধুর করে তোলে।সম্পর্কিত রাগের তালিকা
- রাগ ইমন (Yaman): কল্যাণ ঠাটের মূল গম্ভীর ও গভীর সান্ধ্যকালীন আশ্রয় রাগ।
- রাগ ইমন কল্যাণ (Yaman Kalyan): অবরোহণে শুদ্ধ মধ্যমের সুমিষ্ট স্পর্শযুক্ত প্রখ্যাত রাগ।
- রাগ শুদ্ধ কল্যাণ (Shuddha Kalyan): আরোহণে ঔড়ব ও অবরোহণে সম্পূর্ণ কল্যাণ অঙ্গের রাজকীয় রাগ।
- রাগ আনন্দ ভৈরব (Ananda Bhairav): ভৈরব পরিবারের প্রফুল্ল ও আনন্দময় প্রাতঃকালীন শাখা।
উপসংহার
G P D N S', S' N D P M' G R S-র মিষ্টি স্বরলহরী ভেসে আসে, তখন তা আসরকে এক পরম প্রশান্ত ও আনন্দময় সুরলোকে উন্নীত করে।সোর্স ও প্রামাণ্য রেফারেন্স
- রাগ কল্যাণ পরিবার ও কল্যাণ রাগাঙ্গ | অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ
- রাগ ভৈরব পরিবার ও ভৈরব রাগাঙ্গ | অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ
- অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ সূচি [ গান খেকো ]