রাগ গোরখ কল্যাণ (বা গোরখ) | অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সান্ধ্যকালীন ও গভীর রাত্রির আসরে চরম স্নিগ্ধতা, বিরহকাতর মাধুর্য এবং প্রশান্ত বৈরাগ্য প্রকাশের এক অসামান্য ও প্রখ্যাত রূপ হলো ‘রাগ গোরখ কল্যাণ’ (বা সংক্ষেপে গোরখ)।

নামের শেষে ‘কল্যাণ’ যুক্ত থাকলেও শাস্ত্রীয় গঠনের দিক থেকে রাগটি বেশ ব্যতিক্রমী ও চমৎকার। পাঁচ স্বরের (ঔড়ব-ঔড়ব) এই রাগটিতে স্বরসংগতির সরলতা এবং মায়াবী সুরচ্ছটা শ্রোতার মনে এক অনাবিল আধ্যাত্মিক সুধা ও গভীর প্রশান্তি ছড়িয়ে দেয়।

ইতিহাস, নামকরণের পটভূমি ও বিকল্প নামসমূহ

রাগ গোরখ কল্যাণের নামকরণ ও ঐতিহাসিক উৎস নিয়ে সঙ্গীতসমাজে অত্যন্ত শ্রুতিনন্দিত ব্যাকরণ ও ঐতিহ্য বিদ্যমান:

১. বিকল্প নামসমূহ:

  • গোরখ (Gorakh): খেয়াল ও যন্ত্রসঙ্গীতের মেহফিলে প্রবীণ ওস্তাদগণ একে সংক্ষেপে কেবল ‘গোরখ’ নামেই ডেকে থাকেন।
  • গোরখনাথ কল্যাণ (Gorakhnath Kalyan): প্রাচীন নাথ সম্প্রদায়ে প্রবাদপ্রতীম যোগী ও সাধক শ্রী গোরখনাথ (গোরক্ষনাথ)-এর নামানুসারে প্রাচীন কিছু গ্রন্থে এটিকে ‘গোরখনাথ কল্যাণ’ নামে অভিহিত করা হয়েছে।
  • গোরখী (Gorakhi): অঞ্চলভেদে এবং প্রাচীন সুগম গীতধারায় এর নামান্তর হিসেবে ‘গোরখী’ শব্দের ব্যবহারও পাওয়া যায়।

২. ‘কল্যাণ’ নামের ব্যতিক্রমী রহস্য:

সাধারণত কল্যাণ ঠাট বা কল্যাণ অঙ্গের প্রধান চাবিকাঠি হলো তীব্র মধ্যমের (M') উপস্থিতি। কিন্তু বিস্ময়করভাবে রাগ গোরখ কল্যাণে তীব্র মধ্যম তো দূরের কথা, শুদ্ধ গান্ধার (G) এবং পঞ্চম (P) স্বর দুটিও সম্পূর্ণ বর্জিত! এতে কেবল শুদ্ধ মধ্যম (M) ও কোমল নিখাদ (n) ব্যবহৃত হয়। তা সত্ত্বেও এর নামের শেষে ‘কল্যাণ’ যুক্ত হওয়ার কারণ হলো—প্রাচীন কাল থেকেই এর সুরপ্রক্ষেপণ শ্রবণকারীকে পরম ‘কল্যাণ’ (প্রশান্তি ও মঙ্গলভাব) দান করে এবং অবরোহণে এর গতির আভিজাত্য কল্যাণ অঙ্গের মতো পরম তৃপ্তি এনে দেয়।

রাগের শাস্ত্রীয় কাঠামো

  • ঠাট: খামাজ ঠাট (কোমল নিখাদের উপস্থিতির কারণে পণ্ডিত ভাতখণ্ডেজী একে খামাজ ঠাটের অন্তর্ভুক্ত করেছেন; তবে কিছু পণ্ডিত একে কাফী ঠাটের বলেও গণ্য করেন)।
  • জাতি: ঔড়ব-ঔড়ব (পাঁচ স্বরের রাগ—আরোহণ ও অবরোহণে গান্ধার ও পঞ্চম সম্পূর্ণ বর্জিত)।
  • বাদী স্বর: ম (শুদ্ধ মধ্যম) বা ধ (শুদ্ধ ধৈবত — ঘরানা ও সংপ্রদায়ভেদে)।
  • সমবাদী স্বর: স (ষড়্‌জ) বা র (শুদ্ধ ঋষভ)।
  • ব্যবহৃত স্বর: শুদ্ধ ঋষভ (R), শুদ্ধ মধ্যম (M), শুদ্ধ ধৈবত (D), কোমল নিখাদ (n) এবং ষড়্‌জ (S)।
  • বর্জিত স্বর: গান্ধার (G) এবং পঞ্চম (P) সম্পূর্ণ বর্জিত।
  • সময়: রাত্রির ২য় প্রহর (রাত ৯টা থেকে রাত ১২টা)।
  • প্রকৃতি ও রস: অত্যন্ত শান্ত, স্নিগ্ধ, ব্যাকুল, বৈরাগ্য ও করুণ-মাধুর্য রস প্রধান।

আরোহণ:S R M D n S'

অবরোহণ:

S' n D M, R M R S

প্রধান স্বরসংগতি (পকড়):

R M D n D M, R M R S

অথবা, D' n' S R M, R M D M, R S

গায়কি ও কারিগরি বৈশিষ্ট্য

রাগ গোরখ কল্যাণের একক সৌন্দর্য ও গায়কি বৈশিষ্ট্য রক্ষা করতে সুরসাধকদের অত্যন্ত নিখুঁত স্বরপ্রক্ষেপণ করতে হয়:

১. পাঁচ স্বরের চমৎকার ভারসাম্য: গান্ধার ও পঞ্চম বর্জিত থাকায় রাগটির কাঠামো অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন। এতে R M D এবং D n S'-এর সরল অথচ গভীর আবেশ মুহূর্তের মধ্যে সুরের আকাশ তৈরি করে।

২. ‘D n D M’ এবং ‘R M R S’-এর মীড়: অবরোহে নামার সময় কোমল নিখাদ থেকে ধৈবত ছুঁয়ে মধ্যমে আসা (n D M) এবং মধ্যম থেকে ঋষভ হয়ে ষড়্‌জে নামার (M R S) সুগভীর মীড় রাগটিতে এক অদ্ভুত আকুলতা ও বৈরাগ্য তৈরি করে।

৩. যন্ত্রসঙ্গীতে জনপ্রিয়তা: উস্তাদ আমীর খাঁ, পণ্ডিত মল্লিকার্জুন মনসুর প্রমুখ প্রবাদপ্রতীম কণ্ঠশিল্পীদের পাশাপাশি সেতার, বাঁশি ও সন্তূরে (বিশেষ করে পণ্ডিত শিবকুমার শর্মা ও পণ্ডিত হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়ার পরিবেশনায়) রাগ গোরখ কল্যাণ বিশ্বজুড়ে অভূতপূর্ব জনপ্রিয়তা লাভ করেছে।

দক্ষিণ ভারতীয় (কর্ণাটক) সঙ্গীতে গ্রহণ

উত্তর ভারতীয় গোরখ কল্যাণের অভূতপূর্ব মাধুর্যে মুগ্ধ হয়ে আধুনিক কর্ণাটক শাস্ত্রীয় সঙ্গীতবিদগণ এই রাগটিকে হুবহু একই নামে (Gorakh Kalyan) তাঁদের সাঙ্গীতিক ধারায় গ্রহণ করেছেন। সেখানেও এটি S R1 M1 D2 N2 S' স্বরগ্রামে অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি রাগ হিসেবে গীত ও বাজানো হয়।

সম্পর্কিত রাগের তালিকা

  • রাগ দুর্গা: এতেও গান্ধার ও নিখাদ বর্জিত পাঁচ স্বরের কাঠামো (S R M P D S'), তবে দুর্গাতে কোমল নিখাদের বদলে শুদ্ধ পঞ্চম ব্যবহৃত হয়।
  • রাগ নট ভৈরব / রাগ জৌনপুরী: অবরোহী তান ও ধৈবত-মধ্যমের ব্যবহারে দূরবর্তী সাঙ্গীতিক বৈচিত্র্য দৃশ্যমান।
  • রাগ বাগীশ্বরী / বাগেশ্রী: কোমল নিখাদ ও মধ্যমের অঙ্গভিত্তিক গভীরতার কারণে মেজাজে আত্মিক সাদৃশ্য রয়েছে।

গৌরী রাগিনী। সম্ভবত আহমদনগর সময়কাল আনুমানিক ১৫৭৫ ১৬০০ খ্রিস্টাব্দ রাগ গোরখ কল্যাণ (বা গোরখ) | অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

 

রাগ গোরখ কল্যাণ হলো হিন্দুস্তানি মার্গ সঙ্গীতের সেই অনবদ্য সুর-রত্ন, যা কোনো জটিল স্বরবিন্যাস ছাড়াই কেবল পাঁচটি স্বরের সুষম সংগতি দিয়ে মানুষের আত্মাকে স্পর্শ করতে পারে। শান্ত রাত্রির নিস্তব্ধতায় তানপুরা ও বাঁশির গুঞ্জনে যখন গোরখ কল্যাণের R M D n D M, R M R S-এর স্নিগ্ধ তান ভেসে আসে, তখন তা আসরকে এক পরম নিবিড়, পবিত্র ও বিরহকাতর সুরলোকে উন্নীত করে।

সোর্স ও প্রামাণ্য রেফারেন্স

১. ক্রমিক পুস্তক মালিকা (খণ্ড ৩ ও ৪) — পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখণ্ডে।

২. Raganidhi (Vol 1-4) — বি. সুব্বা রাও (Music Academy, Madras)।

৩. Ragas of North Indian Music — অ্যালাইন ড্যানিয়েলু (Alain Daniélou)।

৪. আইটিসি সঙ্গীত রিসার্চ একাডেমি (SRA) আর্কাইভ — খামাজ ঠাট ও অপ্রচলিত ঔড়ব রাগ বিশ্লেষণ।