রাগ ভৈরব পরিবার ও ভৈরব রাগাঙ্গ | অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সুবিশাল ক্যানভাসে প্রভাতী নিস্তব্ধতা, আধ্যাত্মিক পরম জাগ্রতি এবং বৈরাগ্যমিশ্রিত গাম্ভীর্য প্রকাশের সর্বপ্রধান এবং সুপ্রাচীন ভিত্তি হলো ‘ভৈরব রাগাঙ্গ’ বা ‘ভৈরব অঙ্গ’। শাস্ত্র মতে, দেবাধিদেব মহাদেবের ‘ভৈরব’ রূপ থেকে উদ্ভূত এই রাগাঙ্গ প্রাতঃকালীন মার্গ সঙ্গীতকে এক পরম পবিত্র, ভক্তিসিক্ত ও রাজকীয় মর্যাদা দান করেছে।

ভৈরব কেবল একটি একক রাগ বা ১০টি মূল ঠাটের একটি নয়; এটি এমন একটি সুগভীর ও বিস্তৃত ‘রাগাঙ্গ’ (Ragang), যা নিজের স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্ব, স্বরপ্রক্ষেপণ ও আন্দোলনের নীতি দিয়ে ডজন ডজন শাখা ও মিশ্র রাগের নেতৃত্ব দেয়।

ভৈরব অঙ্গের গাঠনিক ও সাঙ্গীতিক ব্যাকরণ

একটি রাগে ভৈরব অঙ্গ উপস্থিত কিনা তা নির্ধারণ করতে প্রাচীন শাস্ত্রবিদ ও পণ্ডিতগণ কয়েকটি সুনির্দিষ্ট সাঙ্গীতিক লক্ষণ চিহ্নিত করেছেন:

১. স্বরগ্রাম: ভৈরব অঙ্গের মূল স্বরকাঠামো হলো—কোমল ঋষভ (r), কোমল ধৈবত (d) এবং শুদ্ধ গান্ধার (G), শুদ্ধ মধ্যম (M), শুদ্ধ নিখাদ (N)।

২. আন্দোলিত ‘r’ এবং ‘d’: ভৈরব অঙ্গের সর্বপ্রধান প্রাণস্পন্দন হলো এর কোমল ঋষভ (r) এবং কোমল ধৈবতের (d) সুগভীর, ধীর ও প্রমিত ‘আন্দোলন’। এই আন্দোলনে সূক্ষ্মতা না থাকলে রাগের আভিজাত্য বিনাশ পায়।

৩. বিশেষ মীড় ও স্বরসংগতি: মধ্যম থেকে কোমল ঋষভে নামার সুগভীর মীড় (M~r) এবং পঞ্চম থেকে কোমল ঋষভের টান (P~r) ভৈরব অঙ্গের প্রধান চিহ্ন। এছাড়া পূর্বাঙ্গে G M P এবং উত্তরাঙ্গে d P প্রক্ষেপণ অত্যন্ত স্পষ্ট।

৪. প্রধান স্বরসংগতি (পকড়):

S, G M P, d~P, M G, r~r S

৫. সময় ও ভাব: ভৈরব অঙ্গের প্রধান সময় হলো প্রাতঃকাল (দিনের ১ম প্রহর — ভোর ৪টা থেকে সকাল ৭টা)। এটি প্রাতঃকালীন প্রধান ‘সন্ধিপ্ৰকাশ রাগ’ পর্যায়ভুক্ত। এর মূল রস হলো শান্ত, ভক্তি ও করুণ রস।

ভৈরব পরিবারের প্রখ্যাত ও আশ্রিত রাগসমূহ

ভৈরব অঙ্গের ওপর ভিত্তি করে যুগে যুগে প্রবাদপ্রতীম সুরসাধকগণ বহু কালজয়ী, মিশ্র ও ওস্তাদী রাগের উদ্ভাবন করেছেন। ভৈরব পরিবারের রাগগুলোকে মূলত তাঁদের সাঙ্গীতিক চরিত্র অনুযায়ী কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়:

১. আশ্রয় ও জনক রাগ

  • রাগ ভৈরব (Raga Bhairav): ভৈরব ঠাট ও ভৈরব অঙ্গের ‘জনক বা আশ্রয় রাগ’। ভোরবেলার ধ্যায়নমগ্ন নিস্তব্ধতায় তানপুরার জোড়া সুরে ভৈরবের গম্ভীর M G r~r S প্রক্ষেপণ সুরলোকের সর্বোচ্চ দ্বারে নিয়ে যায়।

২. প্রখ্যাত প্রধান শাখা রাগসমূহ

  • রাগ রামকেলী (Raga Ramkali): ভৈরব অঙ্গের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও নিকটবর্তী সহোদর রাগ। এতে অবরোহণে তীব্র মধ্যম এবং কোমল নিখাদের স্পর্শযুক্ত বক্র চাল ব্যবহার করা হয় (M' P d n d P)।
  • রাগ কালেংড়া (Raga Kalingda): ভৈরব ঠাটেরই স্বরগ্রাম, কিন্তু এতে ঋষভ ও ধৈবতের ওপর ভৈরবের মতো গম্ভীর আন্দোলন করা হয় না। চপল, সুমিষ্ট ও গান-বান্ধব মেজাজের রাগ।
  • রাগ আহীর ভৈরব (Raga Ahir Bhairav): পূর্বাঙ্গে ভৈরব অঙ্গ (S r G M) এবং উত্তরাঙ্গে আহীরী/কাফী অঙ্গের শুদ্ধ ধৈবত ও কোমল নিখাদ (P D n S') যুক্ত হয়ে গঠিত অত্যন্ত সুমিষ্ট ও জনপ্রিয় প্রাতঃকালীন রাগ।
  • রাগ যোগিয়া (Raga Jogia): কোমল ঋষভ, কোমল ধৈবত ও কোমল নিখাদযুক্ত চরম বৈরাগ্য ও করুণ রসে ভরা ভাবপ্রবণ রাগ।
  • রাগ নট ভৈরব (Raga Nat Bhairav): পূর্বাঙ্গে নট অঙ্গের শুদ্ধ ঋষভ (S R G M) এবং উত্তরাঙ্গে ভৈরব অঙ্গের কোমল ধৈবত (P d N S') মিলিয়ে গঠিত অনন্য আধুনিক মেলবন্ধন।
  • রাগ বৈরাগী ভৈরব / বৈরাগী (Raga Bairagi): ঔড়ব-ঔড়ব (পাঁচ স্বরের) পরম বৈরাগ্যপ্রধান রাগ (S r M P n S')। এতে গান্ধার ও ধৈবত বর্জিত।
  • রাগ গুণকেলী (Raga Gunkali): ভৈরব ঠাটের ঔড়ব-ঔড়ব প্রাতঃকালীন রাগ (S r M P d S')। এতে গান্ধার ও নিখাদ সম্পূর্ণ বর্জিত।
  • রাগ আনন্দ ভৈরব (Raga Ananda Bhairav): ভৈরব অঙ্গের গম্ভীর মেজাজের সাথে প্রফুল্লতা ও রঞ্জন ক্ষমতার চমৎকার মিশ্রণ।

৩. ওস্তাদী, অপ্রচলিত ও বিরল রূপভেদ

  • রাগ জোড়িয়া ভৈরব (Raga Jodiya Bhairav): ভৈরব অঙ্গের সাথে যোগিয়া বা নট-ভৈরবের বক্র সংমিশ্রণে গঠিত প্রবীণ ওস্তাদী রাগ।
  • রাগ শিবমত ভৈরব (Raga Shivmat Bhairav): ভৈরব, দেবগিরি এবং তোড়ী অঙ্গের সূক্ষ্ম ও প্রজ্ঞাপূর্ণ সংমিশ্রণে গঠিত জটিল খেয়াল রাগ।
  • রাগ প্রভাত ভৈরব (Raga Prabhat Bhairav): ভৈরব ও ভৈরবী অঙ্গের সংযোগে গঠিত ভোরের বিশিষ্ট রূপ।
  • রাগ বাঙ্গাল ভৈরব (Raga Bangal Bhairav): সুপ্রাচীন ঐতিহাসিক ধ্রুপদাঙ্গের অপ্রচলিত ভৈরব রূপ।
  • রাগ রূপকলী, মেঘরমঞ্জরী ও হিঙ্গোল ভৈরব: শাস্ত্রগ্রন্থে উল্লিখিত বিশেষ কাঠামোর দুর্লভ ভৈরব শাখা।

ভৈরব পরিবারের প্রধান রাগসমূহের তুলনামূলক বৈশিষ্ট্য

রাগের নামস্বরবিন্যাসের বৈশিষ্ট্যঅঙ্গের মেলবন্ধনপ্রকৃতি ও মেজাজ
ভৈরবS r G M P d N S'মূল ভৈরব অঙ্গ (আন্দোলিত r, d)অত্যন্ত গম্ভীর, শান্ত, আধ্যাত্মিক
রামকেলীS r G M P d N S' (অবরোহে M', n)ভৈরব + অবরোহী বক্র স্পর্শভক্তিপ্রবণ, আভিজাত্যপূর্ণ
কালেংড়াS r G M P d N S' (আন্দোলনহীন)ভৈরব স্বরগ্রাম (চপল চলন)চপল, মধুর, সহজলভ্য
আহীর ভৈরবS r G M P D n S'ভৈরব (পূর্বাঙ্গ) + আহীরী (উত্তরাঙ্গ)অত্যন্ত মধুর, প্রফুল্ল-করুণ
নট ভৈরবS R G M P d N S'নট (পূর্বাঙ্গ) + ভৈরব (উত্তরাঙ্গ)আভিজাত্যপূর্ণ, মাধুর্যময়
গুণকেলীS r M P d S' (ঔড়ব-ঔড়ব)ভৈরব অঙ্গের পঞ্চস্বরা রূপগভীর ভক্তি ও বৈরাগ্যময়
বৈরাগীS r M P n S' (ঔড়ব-ঔড়ব)ভৈরব + কাফী/সারং স্পর্শত্যাগ ও শান্ত রসাত্মক

ভৈরব অঙ্গ বনাম তোড়ী ও ভৈরবী অঙ্গ

প্রাতঃকালীন সঙ্গীতের প্রধান তিন রাগাঙ্গ—ভৈরব, তোড়ী এবং ভৈরবী—এর মূল সাঙ্গীতিক পার্থক্য বোঝা শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের শিক্ষার্থীদের জন্য অত্যন্ত জরুরি:

  • ভৈরব অঙ্গ : S r G M P d N S' (কোমল ঋ ও ধ-তে আন্দোলন, শুদ্ধ গ ও নি)
  • তোড়ী অঙ্গ : S r g M' P d N S' (কোমল ঋ, গ, ধ এবং তীব্র ম-র বক্র ব্যবহার)
  • ভৈরবী অঙ্গ : S r g M P d n S' (চারটি স্বরই কোমল, চপল ও সার্বজনীন)

তোড়ী রাগাঙ্গে কোমল গান্ধার (g) এবং তীব্র মধ্যমের (M') ব্যবহার একে ভৈরব থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করে। আবার ভৈরবী রাগাঙ্গে চার কোমল স্বরের সোজা ও চপল ব্যবহার হলেও ভৈরবের মতো ঋষভ ও ধৈবতে গভীর আন্দোলন করা হয় না।

ভৈরব পরিবার ও ভৈরব রাগাঙ্গ হলো হিন্দুস্তানি মার্গ সঙ্গীতের সেই অটুট ভিত্তিপ্রস্তর, যা ভোরের আলোকচ্ছটার মতো মানবের অন্তঃকরণকে আলোকিত করে। প্রভাতকালে তানপুরা ও সুরবাহারের সুগভীর গুঞ্জনে যখন ভৈরব রাগাঙ্গের S, G M P, d~P, M G, r~r S-র ব্যাকুল ও প্রমিত তান ভেসে আসে, তখন তা মুহূর্তের মধ্যে মনকে জগতের সমস্ত চপলতা থেকে মুক্ত করে এক পরম पवित्र, শান্ত ও আলোকোজ্জ্বল সুরলোকে উন্নীত করে।

সোর্স ও প্রামাণ্য রেফারেন্স

১. সংগীত দর্পণ — পণ্ডিত দামোদর সেন (১৭শ শতাব্দী)।

২. ক্রমিক পুস্তক মালিকা (খণ্ড ২ ও ৩) — পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখণ্ডে।

৩. Raganidhi (Vol 1-4) — বি. সুব্বা রাও (Music Academy, Madras)।

৪. Ragas of North Indian Music — অ্যালাইন ড্যানিয়েলু (Alain Daniélou)।

৫. আইটিসি সঙ্গীত রিসার্চ একাডেমি (SRA) আর্কাইভ — ভৈরব ঠাট ও রাগাঙ্গ বিশ্লেষণ।