হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের প্রভাতী ভুবনে ভৈরব ঠাটের আশ্রয়ে গড়ে ওঠা রাগগুলোর মধ্যে ‘রাগ কালেংড়া’ (বা প্রাচীন নামে কলিঙ্গ / কালিঙ্গড়া) এক অত্যন্ত পরিচিত, সহজলভ্য ও সুমিষ্ট রাগ।
প্রাতঃকালীন ভৈরব পরিবারের অন্যান্য রাগের গাম্ভীর্য ও ভারী ওস্তাদী চালের বিপরীতে রাগ কালেংড়ার মূল আকর্ষণ হলো এর সরলতা, মাধুর্য ও চপল গতি। এই রাগের সুরলহরী ভোরবেলার শান্ত প্রকৃতিতে এক অনাবিল প্রশান্তি, প্রফুল্লতা ও প্রেমের সুর ছড়িয়ে দেয়।
ইতিহাস ও নামকরণের পটভূমি
উত্তর ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীত ও প্রাচীন শাস্ত্রগ্রন্থে রাগ কালেংড়ার ঐতিহাসিক শিকড় অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী:
১. প্রাচীন ‘কলিঙ্গ’ রাজ্য ও লোকসুর: সংস্কৃত সঙ্গীত শাস্ত্রে এই রাগটি মূলত ‘কলিঙ্গ’ বা ‘কালিঙ্গ’ নামে উল্লিখিত রয়েছে। প্রখ্যাত সঙ্গীত গবেষকদের মতে, প্রাচীন ভারত বর্ষের ‘কলিঙ্গ’ (বর্তমান ওড়িশা ও তার সংলগ্ন উপকূলীয় অঞ্চল) অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী লোকসুর ও গীতরীতি মার্গ সঙ্গীতে গৃহীত হওয়ার পর এই রাগের নামকরণ হয় ‘কলিঙ্গ’। পরবর্তীতে অপভ্রংশ ও প্রাকৃত উচ্চারণে এটি ‘কালিঙ্গড়া’, ‘কালেঙ্গড়া’ এবং সর্বজনীনভাবে ‘কালেংড়া’ নামে পরিচিতি লাভ করে।
২. ভৈরব বনাম কালেংড়া: রাগ ভৈরব এবং রাগ কালেংড়া—উভয়েই ভৈরব ঠাটের অন্তর্ভুক্ত এবং স্বরগ্রামও হুবহু এক (কোমল ঋষভ ও কোমল ধৈবত যুক্ত)। তবে শাস্ত্রীয় মেজাজে এদের পার্থক্য আকাশ-পাতাল। ভৈরব হলো সুগভীর, গম্ভীর ও আন্দোলনপ্রধান; অন্যদিকে কালেংড়া হলো চপল, গতিশীল ও আড়ম্বরহীন সুমিষ্ট রাগ।
রাগের শাস্ত্রীয় কাঠামো
- ঠাট: ভৈরব ঠাট।
- জাতি: সম্পূর্ণ-সম্পূর্ণ (আরোহণ এবং অবরোহণ—উভয় ক্ষেত্রেই সাতটি করে স্বর ব্যবহৃত হয়)।
- বাদী স্বর: ধ (কোমল ধৈবত)।
- সমবাদী স্বর: র (কোমল ঋষভ)।
- ব্যবহৃত স্বর: কোমল ঋষভ (ঋ/r), কোমল ধৈবত (ধা/d) এবং শুদ্ধ গান্ধার (গ), শুদ্ধ মধ্যম (ম), শুদ্ধ পঞ্চম (প), শুদ্ধ নিখাদ (নি) ও ষড়্জ (স)।
- সময়: প্রাতঃকাল (দিনের ১ম প্রহর — সকাল ৬টা থেকে ৯টা)।
- প্রকৃতি ও রস: প্রফুল্ল, মিষ্টি, চপল ও করুণ-শৃঙ্গার ভাবাপন্ন। এর মূল রস হলো শান্ত, শৃঙ্গার (প্রেম) ও করুণ রস।
আরোহ, অবরোহ ও পকড় (স্বরসংগতি)
আরোহণ:
স ঋ গ ম প ধ নি র্স
(S r G M P d N S’)
অবরোহণ:
র্স নি ধ প, ম গ ঋ স
(S’ N d P, M G r S)
প্রধান স্বরসংগতি (পকড়):
স, ঋ গ ম প, ধ্ প, ম গ ঋ, ঋ স
(S, r G M P, d P, M G r, r S)
গায়কি ও কারিগরি বৈশিষ্ট্য
রাগ কালেংড়ার মূল সৌন্দর্য ফুটিয়ে তুলতে স্বরপ্রক্ষেপণের সরলতা বজায় রাখা জরুরি:
১. আন্দোলন বর্জিত স্বরপ্রক্ষেপণ: রাগ ভৈরবে কোমল ঋষভ (r) ও কোমল ধৈবতে (d) ধীর ও গম্ভীর আন্দোলন করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু কালেংড়াতে এই স্বরগুলোর ওপর কোনো আন্দোলন করা হয় না; বরং সোজা ও আলতো প্রক্ষেপণ করা হয়। এতে কোনো কারণে আন্দোলন এসে পড়লে রাগটি ভৈরবে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
২. চপল ও লঘু-শাস্ত্রীয় উপযোগী: গম্ভীর খেয়াল বা ধ্রুপদের চেয়ে কালেংড়া রাগটি প্রধানত মধ্য-দ্রুত খেয়াল, ভজন, গজল, ঠুমরি, দাদা ও প্রাতঃকালীন ভাবসঙ্গীতের জন্য অত্যন্ত উপযোগী।
৩. রবীন্দ্রসঙ্গীত ও সুগম সঙ্গীতে প্রয়োগ: বাংলা গানে বিশেষ করে রবীন্দ্রসঙ্গীত ও নজরুলগীতিতে প্রাতঃকালীন সুরচ্ছবি তৈরিতে রাগ কালেংড়ার বহুল ব্যবহার দেখা যায়।
সেতার, বাঁশি, সানাই ও হারমোনিয়ামে রাগ কালেংড়ার চপল প্রক্ষেপণ প্রাতঃকালীন আসরে এক অপূর্ব আনন্দময় ও মধুর পরিবেশ সৃষ্টি করে।
সম্পর্কিত রাগের তালিকা
- রাগ ভৈরব: ভৈরব ঠাটের মূল গম্ভীর ও আন্দোলনপ্রধান আশ্রয় রাগ।
- রাগ রামকেলী: ভৈরব ঠাটের আরেকটি প্রখ্যাত প্রভাতী রাগ; যাতে তীব্র মধ্যম ও কোমল নিখাদ ব্যবহৃত হয়।
- রাগ যোগিয়া: প্রাতঃকালীন করুণ ও বৈরাগ্যপ্রধান আরেকটি ঐতিহ্যবাহী রাগ।
উপসংহার
রাগ কালেংড়া হলো প্রাতঃকালীন সুরের সেই স্নিগ্ধ চাদর, যা কঠিন শাস্ত্রীয় ব্যাকরণের জটিলতা মুক্ত হয়ে অতি সহজেই শ্রোতার হৃদয় স্পর্শ করে। ভোরের মেহফিলে তানপুরার মিষ্টি সুরে যখন কালেংড়ার ‘স, ঋ গ ম প, ধ্ প, ম গ ঋ, ঋ স’-র স্বরলহরী ভেসে আসে, তখন তা মনকে এক অনাবিল প্রশান্তি, রূপ ও অনুরাগের স্নিগ্ধ সুরলোকে নিয়ে যায়।
সোর্স ও প্রামাণ্য রেফারেন্স
১. ক্রমিক পুস্তক মালিকা (খণ্ড ২) — পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখণ্ডে।
২. রাগ প্রবীণ ও রাগ বিজ্ঞান — পণ্ডিত বিনায়ক রাও পটবর্ধন।
৩. Raganidhi (Vol 1-4) — বি. সুব্বা রাও (Music Academy, Madras)।
৪. আইটিসি সঙ্গীত রিসার্চ একাডেমি (SRA) আর্কাইভ — ভৈরব ঠাট ও শাখা রাগ বিশ্লেষণ।