ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীত ভুবনে প্রাতঃকালের পরম প্রশান্তি ও আধ্যাত্মিক আকুলতা প্রকাশের ক্ষেত্রে ‘রাগ আহীর তোড়ী’ (যা শাস্ত্রীয় গ্রন্থে ‘আহীরী তোড়ী’ বা ‘আহীরী’ নামেও বহুল পরিচিত) এক অত্যন্ত চমৎকার, সুগভীর এবং ঐতিহ্যবাহী রূপান্তর।
নাম থেকেই স্পষ্ট যে, এটি প্রাতঃকালীন লোকসুরনির্ভর আহীর (বা আহীরী) অঙ্গ এবং প্রাতঃকালের সুগভীর তোড়ী অঙ্গের এক অতি সূক্ষ্ম ও প্রজ্ঞাপূর্ণ মেলবন্ধন। প্রাতঃকালের ভৈরব ও তোড়ী অঙ্গের স্বরচ্ছটার এমন সংমিশ্রণ বৈরাগ্য ও ভক্তিরসে শ্রোতার অন্তরকে আপ্লুত করে তোলে।
ইতিহাস ও রাগের পরিচয়
সঙ্গীতশাস্ত্রে ‘আহীরী’ নামটি অত্যন্ত প্রাচীন। প্রাচীনকালে ‘আহীরী’ নামে পৃথক একটি প্রাচীন জাতি-রাগ বা গ্রাম-রাগের অস্তিত্ব ছিল, যা কালক্রমে উত্তর ভারতীয় মার্গ সঙ্গীতে আহীর ভৈরব ও তোড়ী পরিবারের সাথে যুক্ত হয়ে বিভিন্ন মিশ্রম রূপ ধারণ করে।
শাস্ত্রীয় প্রথায় পণ্ডিত ভাতখণ্ডেজী এবং পণ্ডিত বি. সুব্বা রাও-এর মতো বিশিষ্ট সঙ্গীত তাত্ত্বিকগণ তাঁদের গ্রন্থে ‘আহীরী তোড়ী’-র বিশেষ উল্লেখ করে গেছেন। প্রাচীন রূপায়ণে তোড়ী অঙ্গের করুণ ভাব অক্ষুণ্ণ রেখে পূর্বাঙ্গ (S R g M) ও উত্তরাঙ্গে বিশেষ স্বরবিন্যাসের মাধ্যমে আহীরী অঙ্গ ফুটিয়ে তোলা হতো। আবার আধুনিক মেহফিলে তোড়ীর সুগভীর আধ্যাত্মিকতার মধ্যে আহীর অঙ্গের কোমল ঋষভ (r) ও কোমল নিখাদ (n)-এর স্পর্শ এনে রাগটিকে অত্যন্ত স্নিগ্ধ রূপ দেওয়া হয়।
এর প্রধান রস হলো শান্ত, ভক্তি এবং করুণ রস।
রাগের শাস্ত্রীয় কাঠামো
- ঠাট: তোড়ী ঠাট (মতান্তরে বিলাসখানী তোড়ী বা কাফী-তোড়ী মিশ্রণ)।
- জাতি: সম্পূর্ণ-সম্পূর্ণ।
- বাদী স্বর: ধ (কোমল ধৈবত) বা ম (শুদ্ধ মধ্যম — ঘরানা ও প্রচলনভেদে)।
- সমবাদী স্বর: g (কোমল গান্ধার) বা S (ষড়্জ)।
- ব্যবহৃত স্বর: কোমল ঋষভ (r), কোমল গান্ধার (g), শুদ্ধ মধ্যম (M), শুদ্ধ পঞ্চম (P), কোমল ধৈবত (d), কোমল নিখাদ (n) এবং বিশেষ স্পর্শে শুদ্ধ নিখাদ (N)।
- সময়: প্রাতঃকাল (দিনের ১ম প্রহর — সকাল ৬টা থেকে ৯টা)।
- প্রকৃতি: অত্যন্ত শান্ত, সুগভীর, ব্যাকুল ও ভক্তিভাবাপন্ন।
আরোহণ: স র জ্ঞ ম প, ধ ণ র্স
(S r g M P, d n S’)
অবরোহণ: র্স ণ ধ প, ম জ্ঞ র, র জ্ঞ ম জ্ঞ র স
(S’ n d P, M g r, r g M g r S)
প্রধান স্বরসংগতি (পকড়):
ধ্ ণ্ স, র জ্ঞ ম জ্ঞ র, র স
(d’ n’ S, r g M g r, r S)
গায়কি ও কারিগরি বৈশিষ্ট্য
রাগ আহীর তোড়ীর প্রধান কারিগরি দক্ষতা ও গায়কি বৈশিষ্ট্য নির্ভর করে তোড়ী অঙ্গ ও আহীর অঙ্গের ভারসাম্য বজায় রাখার ওপর:
১. পূর্বাঙ্গে তোড়ী ও বিলাসখানী ভাব: আরোহণ ও অবরোহণে কোমল ঋষভ ও কোমল গান্ধারের মীড়প্রয়োগে বিলাসখানী তোড়ী বা মিঞাঁ কী তোড়ীর বিশেষ টান প্রকাশ পায় (r g M g r S)।
২. উত্তরাঙ্গে আহীরী প্রক্ষেপণ: উত্তরাঙ্গে পঞ্চমের ওপর জোর দিয়ে কোমল ধৈবত ও কোমল নিখাদের প্রয়োগে আহীরী অঙ্গটি ফুটে ওঠে।
৩. আন্দোলন ও শান্ত ভাব: তোড়ী অঙ্গের মূল পরিচয় হিসেবে কোমল ঋষভ ও কোমল গান্ধারে সূক্ষ্ম আন্দোলন করা হয়। প্রাতঃকালে তানপুরার জোড়া সুরের সাথে এই রাগের আলাপ মেহফিলে গভীর ধ্যানমগ্নতার সৃষ্টি করে।
আগরা, গোয়ালিয়র এবং কিরাণা ঘরানার প্রবীণ ওস্তাদদের কণ্ঠে এবং সেতার, সারেঙ্গী ও রূদ্রবীণায় এই রাগের প্রথাগত আলাপ ও খেয়াল বন্দিশ দেখা যায়।
সম্পর্কিত রাগের তালিকা
- মিঞাঁ কী তোড়ী: তোড়ী পরিবারের আশ্রয় বা মূল প্রথাগত রাগ।
- বিলাসখানী তোড়ী: চার কোমল স্বরযুক্ত তোড়ী অঙ্গের আরেকটি বিখ্যাত প্রাতঃকালীন রাগ।
- আহীর ভৈরব: প্রাতঃকালের লোকপ্রিয় রাগ; যার উত্তরাঙ্গের সাথে আহীরী অঙ্গের গভীর মিল রয়েছে।
- গুর্জরী তোড়ী: তোড়ী পরিবারের পঞ্চমহীন ষাড়ব রূপ।