রাগ টোড়ি পরিবার বা রাগ তোড়ি পরিবার বা তোড়ি রাগাঙ্গ এর রাগ । অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের আসরে প্রাতঃকালের পরম আধ্যাত্মিকতা, করুণ রস ও অন্তরাত্মার তীব্র আকুলতা প্রকাশের জন্য ‘তোড়ী রাগাঙ্গ’ বা ‘তোড়ী পরিবার’ এক পরম আভিজাত্যপূর্ণ ও সুপ্রাচীন স্থান অধিকার করে রয়েছে। তোড়ী কেবল একটি একক রাগ নয়; এটি এমন একটি সুগভীর ও মহিমান্বিত রাগাঙ্গ, যা নিজের সুনির্দিষ্ট চলন ও স্বরপ্রক্ষেপণ দিয়ে সঙ্গীতজগতে সুবিশাল এক রাগ-পরিবারের নেতৃত্ব দেয়।

তোড়ী অঙ্গের প্রধান পরিচয় হলো এর বক্র স্বরসংগতি এবং কোমল স্বরসমূহের (বিশেষ করে কোমল ঋষভ, কোমল গান্ধার, তীব্র মধ্যম ও কোমল ধৈবত) সূক্ষ্ম ব্যাকুলতা। প্রাতঃকালে সুরের ভুবনে বৈরাগ্য ও ভক্তির অনন্য দ্যোতনা সৃষ্টিতে তোড়ী পরিবারের কোনো বিকল্প নেই।

তোড়ী রাগাঙ্গ ও এর বৈশিষ্ট্য

তোড়ী রাগাঙ্গের আসল মূল চাবিকাঠি লুকিয়ে রয়েছে এর কোমল ঋষভ (র), কোমল গান্ধার (জ্ঞ) এবং তীব্র মধ্যম (হ্ম)-এর বিশেষ আন্দোলনে।
  • মূল স্বরসংগতি (পকড়): র জ্ঞ র স (r g r S) এবং র জ্ঞ হ্ম প, জ্ঞ ম র স (r g M’ P, g M r S)।
  • প্রধান মেজাজ ও রস: ভক্তিরস, বৈরাগ্য, করুণ রস এবং প্রাতঃকালের নিবিড় আধ্যাত্মিক আকুলতা।
  • চলনের রীতি: তোড়ীর আরোহণ ও অবরোহণ অত্যন্ত বক্র। এতে কোমল ঋষভের ওপর বিশেষ স্থায়িত্ব ও কোমল গান্ধারের স্পন্দন রাগটিকে এক সুগভীর ও মরমী অবয়ব দান করে।

তোড়ী পরিবারের শ্রেণিবিন্যাস

প্রাচীনকাল থেকেই সঙ্গীতশাস্ত্রবিদ ও প্রবাদপ্রতীম সুরসাধকগণ তোড়ী রাগাঙ্গকে ভিত্তি করে বহু অসামান্য মিশ্র ও শাখা রাগের উদ্ভাবন করেছেন। তোড়ী পরিবারের মূল রাগগুলোকে প্রধানত তাঁদের গঠন ও জনপ্রিয়তার ভিত্তিতে সুসংগঠিতভাবে প্রকাশ করা হলো:

(ক) প্রধান তোড়ী গোষ্ঠী (প্রসিদ্ধ ও আশ্রিত রাগসমূহ)

১. মিঞাঁ কী তোড়ী (শুদ্ধ তোড়ী): এই পরিবারের মূল ‘আশ্রয় রাগ’। সসঙ্গীত সম্রাট তানসেনের অমর সৃষ্টি হিসেবে স্বীকৃত। চার কোমল স্বর (র, জ্ঞ, ধ) ও তীব্র মধ্যম (হ্ম)-এর সমন্বয়ে গঠিত প্রাতঃকালের পরম সুগভীর রূপ।
২. গুর্জরী তোড়ী: মিঞাঁ কী তোড়ীর প্রায় হুবহু রূপ, তবে এতে পঞ্চমের (P) ব্যবহার সম্পূর্ণ বর্জিত (ষাড়ব-ষাড়ব জাতি)।
৩. বিলাসখানী তোড়ী: তানসেনের পুত্র বিলাস খাঁর উদ্ভাবন। পিতার প্রয়াণে বিরহক্লিষ্ট হৃদয়ে সৃষ্ট এই রাগটি স্বরের বিচারে ভৈরবীর নিকটবর্তী হলেও চলন ও মীড়ে নিখুঁত তোড়ী অঙ্গের।
৪. ভূপাল তোড়ী: ঔড়ব-ঔড়ব (পাঁচ স্বরের) রাগ। এতে তীব্র মধ্যম ও নিখাদ বর্জিত (স র জ্ঞ প ধ র্স)।
৫. আহীর তোড়ী: প্রাতঃকালীন আহীর অঙ্গ ও তোড়ী অঙ্গের এক মনোরম সংমিশ্রণ।
৬. আসা তোড়ী (আশাবরী তোড়ী): আশাবরী অঙ্গের প্রফুল্লতা ও তোড়ীর করুণ ভাবের সমন্বয়ে গঠিত।
৭. গান্ধারী তোড়ী: তোড়ীর সাথে আশাবরী ও কাফী অঙ্গের সূক্ষ্ম মিশ্রণে তৈরি অপ্রচলিত রাগ।
৮. দেশী তোড়ী: তোড়ী ও সারং অঙ্গের মিশ্রণে গঠিত অতি সুপ্রাচীন ও মিষ্টি মেজাজের প্রাতঃকালীন রাগ।
৯. বহাদুরী তোড়ী: একাধিক রাগের জটিল স্বরসংগতিতে গঠিত ওস্তাদী অঙ্গের অপ্রচলিত রাগ।
১০. খট তোড়ী: ছয়টি ভিন্ন রাগের সুনিপুণ মিশ্রণে গঠিত দুর্লভ ও বিরল রাগ।

(খ) ঐতিহাসিক, আঞ্চলিক ও ঐতিহ্যবাহী শাখা তোড়ী

তোড়ী রাগাঙ্গের পরিধি বিস্তৃত করতে বিভিন্ন যুগে যেসব প্রাচীন ও আঞ্চলিক বৈচিত্র্য যুক্ত হয়েছিল:
  • আঞ্চলিক ও প্রাচীন প্রকার: অঞ্জনী তোড়ী, কল্লাদ তোড়ী, ছায়া তোড়ী, নবাৎখানি তোড়ী, প্রথম তোড়ী, প্রভাত তোড়ী, পুন্নাগ তোড়ী, ফিরোজখানি তোড়ী, বরাটী তোড়ী, মার্গ তোড়ী, মোটকী তোড়ী, মোহন তোড়ী, রাম তোড়ী, শুদ্ধ তোড়ী, সাভেরী তোড়ী।
  • গোত্রীয় ও প্রচলিত মিশ্র তোড়ী: কাফী তোড়ী, আটকী তোড়ী, পঞ্চমাস তোড়ী, বরণ তোড়ী, লছমী তোড়ী, লাচারী তোড়ী, সকারী তোড়ী, হুসেইনী তোড়ী।
  • বিরল ও অপ্রচলিত প্রকারভেদ: কমল তোড়ী, তুরস্ক তোড়ী, নট তোড়ী, মালিনী তোড়ী, মঙ্গল তোড়ী, মুন্দরী তোড়ী, রঞ্জনী তোড়ী, ললিত তোড়ী।

তোড়ী বনাম ভৈরবী: তাত্ত্বিক ও সাঙ্গীতিক বিশ্লেষণ

শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায়ই ভৈরবী (Bhairavi) এবং তোড়ী (Todi) পরিবারের মধ্যে বিভ্রান্তি দেখা যায়—বিশেষ করে বিলাসখানী তোড়ী, লাচারী তোড়ী বা ভূগঠনগত কিছু সংমিশ্রণের ক্ষেত্রে। কারণ উভয় রাগেই চার কোমল স্বর (র, জ্ঞ, ধ, ণ) বিদ্যমান।
তবে শাস্ত্রীয় ব্যাকরণে এদের মূল পার্থক্য অত্যন্ত স্পষ্ট:
বিষয়তোড়ী অঙ্গ (Todi Anga)ভৈরবী অঙ্গ (Bhairavi Anga)
মূল চলন (পকড়)র জ্ঞ র স (r g r S) এবং জ্ঞ ম র সজ্ঞ ম ধ প (g M d P) বা স র ণ ধ প
তীব্র মধ্যম (M’)তীব্র মধ্যমের (হ্ম) উপস্থিতি তোড়ীর অন্যতম প্রধান প্রাণশক্তি।মূল ভৈরবীতে শুদ্ধ মধ্যমের (ম) প্রাধান্য থাকে; তীব্র মধ্যম বর্জিত।
আন্দোলন ও মীড়ঋষভ (র) ও গান্ধারে (জ্ঞ) বিশেষ আন্দোলন ও বক্র মীড় থাকে।স্বরপ্রক্ষেপণ সোজা, চপল ও ঠুমরি অঙ্গের জন্য উপযোগী।
মেজাজঅত্যন্ত সুগভীর, গম্ভীর, বৈরাগ্য ও ভক্তিরস প্রধান।চপল, মধুর, শৃঙ্গার ও সর্বজনীন বিদায়ী সুর।
উল্লেখ্য: জৌনপুরী বা আশাবরীকে তোড়ী বলা যুক্তিসঙ্গত নয়; কারণ তাদের চলন, স্বরপ্রক্ষেপণ এবং মেজাজ সম্পূর্ণ আলাদা। ঠিক যেমন গৌরী অঙ্গ বা শ্রী অঙ্গের নিজস্ব স্বকীয়তা রয়েছে, তোড়ী অঙ্গও তার নিজস্ব চলনেই ভাস্বর।
তোড়ী পরিবারের প্রতিটি রাগেরই নিজস্ব স্বতন্ত্র আবেদন ও ব্যাকরণগত সৌন্দর্য রয়েছে। যদিও কালের বিবর্তনে এই পরিবারের বহু শাখা রাগ আজ মেহফিল থেকে কিছুটা অপ্রচলিত বা দুর্লভ হয়ে পড়েছে, তবুও হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ব্যাকরণ, গাঠনিক বৈচিত্র্য এবং আধ্যাত্মিক গাম্ভীর্যের বিচারে তোড়ী পরিবারের স্থান চিরকাল শীর্ষাসনে বিরাজ করবে।

রাগ টোড়ি পরিবার । অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

 

সোর্স ও প্রামাণ্য রেফারেন্স

১. ক্রমিক পুস্তক মালিকা (খণ্ড ২ ও ৩) — পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখণ্ডে।
২. রাগ প্রবীণ ও রাগ বিজ্ঞান — পণ্ডিত বিনায়ক রাও পটবর্ধন।
৩. Raganidhi (Vol 1-4) — বি. সুব্বা রাও (প্রখ্যাত সঙ্গীত তাত্ত্বিক)।
৪. আইটিসি সঙ্গীত রিসার্চ একাডেমি (SRA) আর্কাইভ — তোড়ী অঙ্গ ও শাখা রাগ বিশ্লেষণ।

আরও দেখুন: