
মালহার পরিবারের পরিচয় ও অন্তর্নিহিত চরিত্র
প্রধান প্রচলিত মালহার ও তাদের সূক্ষ্ম পার্থক্য
মালহার পরিবারে অসংখ্য রাগ ছড়িয়ে থাকলেও কিছু প্রাচীন ও ধ্রুপদী রাগ নিজেদের অনন্য সুরশৈলীতে ভাস্বর হয়ে আছে। এই পরিবারের সর্বজনস্বীকৃত সম্রাট হলো ‘মিঞাঁ কি মালহার‘। সম্রাট আকবরের দরবারের সঙ্গীতরত্ন মিঞাঁ তানসেন এর স্রষ্টা। অত্যন্ত গম্ভীর ও আধ্যাত্মিক মেজাজের এই রাগের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর অতি কোমল ও বিশেষ কায়দায় গীত ‘আন্দোলিত গান্ধার’। এতে দুটি নিখাদ (কোমল ও শুদ্ধ) এবং শুদ্ধ ধৈবতের ব্যবহার দেখা যায়।
এর বিপরীতে ‘মেঘ মালহার‘ হলো এই পরিবারের সবচেয়ে আদি ও সুপ্রাচীন রূপ। এটি সম্পূর্ণ ঔড়ব জাতির রাগ, অর্থাৎ এর আরোহ ও অবরোহে মাত্র পাঁচটি স্বর ব্যবহৃত হয়। মিঞাঁ কি মালহারে যেখানে গান্ধার ও ধৈবতের জটিল অলঙ্করণ থাকে, মেঘ মালহারে সেই দুটি স্বর সম্পূর্ণ বর্জিত। মেঘের গম্ভীর্যের মতো এই সরলতা ও শুদ্ধতাই রাগ মেঘের প্রধান পরিচয়।
আবার বৃষ্টির শান্ত ও আনন্দময় রূপকে ফুটিয়ে তোলে ‘গৌড় মালহার‘। এটি কিছুটা বিলাবল অঙ্গের কাছাকাছি এবং এতে শুদ্ধ গান্ধার ব্যবহৃত হয়। মিঞাঁ কি মল্লারের উদাসী কোমল গান্ধারের বদলে গৌড় মল্লারে শুদ্ধ গান্ধারের মিষ্টি প্রয়োগ এবং ‘রে-পা’ স্বরসংগতির প্রাধান্য একে একদম আলাদা এক চরিত্র দান করে। অন্যদিকে ভক্তিময় ও আকুলতা প্রধান রূপ হলো ‘সুর মালহার‘ বা ‘সুরদাসী মালহার’। এতে সাধারণ প্রথানুসারে গান্ধার বর্জিত থাকে এবং এর মেজাজটি সারং অঙ্গের খুব কাছাকাছি গিয়ে এক শান্ত ভক্তিভাব তৈরি করে।
মিশ্র মালহারের বৈচিত্র্যময় মেলা
যুগ যুগ ধরে সুরসাধকেরা অন্যান্য জনপ্রিয় রাগের সাথে মল্লারকে মিশিয়ে নিত্যনতুন রূপ দান করেছেন। যেমন রাগ বাহার ও মল্লারের মিলনে তৈরি ‘বাহার মালহার‘-এ বসন্তের চপলতা আর বর্ষার সজীবতা একসাথে ধরা দেয়। আবার ‘বাসন্তী মালহার‘ তৈরি হয়েছে রাগ বসন্ত ও গৌড় মালহারের সংমিশ্রণে, যা মূলত বসন্তের শেষভাগে হঠাৎ নেমে আসা বৃষ্টির অনবদ্য অনুভূতি দেয়। ভোরের স্নিগ্ধ আলো আর মেঘের ছায়াকে একসূত্রে বাঁধে ‘বিলাওয়াল মালহার‘ (আলহাইয়া বিলাওয়াল ও গৌড় মালহারের মিশ্রণ)।
প্রতিটি মিশ্র রাগে দুটি রাগের স্বরসংগতির এক অদ্ভুত লড়াই ও মেলবন্ধন দেখা যায়। যেমন ‘কেদার মালহার’-এ রাগ কেদারের ‘মা-পা’ সংগতির সাথে মল্লারের ‘রে-পা’ সংগতির দারুণ এক সংলাপ চলে। আবার শিবরঞ্জনীর করুণ রস ও মিঞাঁ কি মালহারের আভিজাত্য মিলিয়ে তৈরি ‘শিব মালহার’ এক মরমী বৈরাগ্য সৃষ্টি করে। একইভাবে কামোদের বক্র চলনের সাথে মল্লারের গভীরতা মিশে জন্ম নিয়েছে ‘মোদ মালহার’।
মালহার পরিবারের বিস্তৃত সাঙ্গীতিক মানচিত্র
প্রচলিত ও বিরল রূপ মিলিয়ে মালহার পরিবারে প্রায় ছেচল্লিশটি রাগের উপস্থিতি পরিলক্ষিত হয়। স্বরবিন্যাস ভিন্ন হলেও এদের প্রতিটিকে এক সুতোয় বেঁধে রেখেছে সেই মৌলিক ‘মল্লার অঙ্গ’।
গভীর বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কানাড়া ও অন্যান্য গম্ভীর অঙ্গের প্রভাবে তৈরি হয়েছে শাহানা মালহার, আদানা (বা আড়ানা) মালহার, ছায়া মালহার, এবং কাফি মালহার (বা মালহার কাফি)। আবার নির্দিষ্ট লোকসুর বা চারণ কবিদের নামানুসারে প্রচলিত হয়েছে বিরজু কি মালহার, চরজু কি মালহার, মীরাবাই কি মালহার, নানক মালহার, এবং গান্ধী মালহার।
প্রকৃতির নানা রূপ ও সময়ের সাথে মিলিয়ে যে রূপগুলো পাওয়া যায়, তার মধ্যে ধূলিধূসর ধরণীর ওপর প্রথম বৃষ্টির উদাসীন সুর ফুটে ওঠে ধুলিয়া মালহার-এ। ভোরের মেঘের আলো-ছায়ায় গাওয়া হয় অরুণ মালহার এবং চাঁদের আলোয় বর্ষার রোমান্টিক রূপ ফুটিয়ে তোলে চাঁদনী মালহার। সারং ও সোরথ অঙ্গের দোলা দেখা যায় সারং মালহার (বা মিঞাঁ কি সারং), সোরথ মালহার, এবং সাওয়ানি মালহার-এ (বা সাওয়ান গান্ধার)।
প্রখ্যাত সুরের সংমিশ্রণে গড়ে ওঠা মিশ্র রূপগুলোর তালিকা বেশ দীর্ঘ ও বৈচিত্র্যময়। এর মধ্যে অত্যন্ত জনপ্রিয় হলো দেশ মালহার। এছাড়া রয়েছে জয়ন্ত মালহার, বারওয়া মালহার, ঝিনঝোতি মালহার, নাট মালহার, প্যাট মালহার, রামদাসী মালহার, শুদ্ধ মালহার, তিলক মালহার, খাম্বাজ মালহার, দেবগিরি মালহার, গৌড়গিরি মালহার, ললিত মালহার, যোগ মালহার, যমন মালহার, হাম্বীর মালহার, অহি মালহার, শঙ্করা মালহার, এবং বিভাস মালহার।
মালহার পরিবারের এই রাগগুলো কেবল ব্যাকরণভিত্তিক কিছু স্বরলিপি নয়, বরং এগুলো প্রকৃতির সাথে মানুষের হৃদয়ের সুপ্রাচীন সম্পর্কের সাঙ্গীতিক রূপক। মিঞাঁ কি মালহারের বজ্রগম্ভীর ডাক থেকে শুরু করে গৌড় মালহারের স্নিগ্ধ ঝিরঝিরে বৃষ্টির সুর—সবই এই পরিবারের বিরাট ক্যানভাসে আঁকা রয়েছে। ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের এই পরিবারটি আমাদের শেখায় কীভাবে একটি ঋতু মানুষের অনুভূতিকে এত গভীরভাবে স্পর্শ করতে পারে। মালহারের যেকোনো একটি রাগ শেখা মানে স্রেফ স্বর সাধনা করা নয়, বরং প্রকৃতির বর্ষাসিক্ত আদিম সত্তার সাথে নিজের আত্মাকে মিলিয়ে দেওয়া।

