রাগের পরিবার বা রাগ অঙ্গ ভিত্তিক গ্রুপ । অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে রাগের শ্রেণিবিন্যাসের ক্ষেত্রে বর্তমানে আমরা প্রধানত পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখণ্ডের প্রবর্তিত ‘ঠাট’ পদ্ধতি অনুসরণ করি। কিন্তু এই ঠাট পদ্ধতির আগে রাগের চরিত্র বা প্রকৃতি বোঝার সবচেয়ে কার্যকর উপায় ছিল ‘রাগাঙ্গ’ (Raga + Anga)।

ঠাট ও রাগাঙ্গের মধ্যে মূল পার্থক্য:

ঠাট বিভাজন মূলত স্বর বা সুরের গাণিতিক বিন্যাসের ওপর নির্ভর করে। অন্যদিকে, রাগাঙ্গ পদ্ধতিটি রাগের চলন, পাকড় বা বিশেষ স্বর-সংগতির ওপর ভিত্তি করে তৈরি। রাগাঙ্গ মানে হলো রাগের ‘অঙ্গ’ বা অবয়ব। একটি নির্দিষ্ট রাগের মূল বৈশিষ্ট্য বা কাঠামো যখন অন্য অনেক রাগের মধ্যে লক্ষ্য করা যায়, তখন সেই মূল রাগের নামে একটি ‘রাগাঙ্গ পরিবার’ গড়ে ওঠে। যেমন— কানাড়া অঙ্গের চলন যে রাগে থাকবে, সেটি কানাড়া পরিবারের অন্তর্ভুক্ত হবে।

SufiFaruq.com Logo 252x68 2 রাগের পরিবার বা রাগ অঙ্গ ভিত্তিক গ্রুপ । অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

প্রধান রাগাঙ্গ ও তাদের বিশেষ স্বর-সংগতি (পাকড়):

নিচে প্রধান কিছু রাগাঙ্গ এবং সেগুলোর চলন সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:

স্বর সংকেতের নিয়মাবলী:
  • বড় হাতের অক্ষরের মতো শুদ্ধ স্বর: স (S), র (R), গ (G), ম (M), প (P), ধ (D), নি (N)
  • ছোট হাত/চিহ্নিত কোমল স্বর: ঋ/র (r), জ্ঞ/গ (g), ধা/ধ (d), ণি/ণ (n)
  • তীব্র মধ্যম: হ্ম (M’)

 

ক্র.রাগাঙ্গ / পরিবারশাস্ত্রীয় সঠিক প্রধান স্বর-সংগতি (পাকড় / চলন)মূল সাঙ্গীতিক বৈশিষ্ট্য
১ভৈরব অঙ্গগ ম র র স (G M r r S) / র জ্ঞ ম পকোমল ঋষভ (r) ও কোমল ধৈবতে (d) বিশেষ আন্দোলন।
২বিলাবল অঙ্গগ র, গ প, ধ নি র্স (G R, G P, D N S’)অল-শুদ্ধ স্বর, প্রাতঃকালীন প্রফুল্ল চলন।
৩কল্যাণ অঙ্গণ্ র গ, হ্ম প, ধ নি র্স (N’ R G M’ P, D N S’)তীব্র মধ্যম (M’) এবং ঋষভ-গান্ধারের সংগতি।
৪খামাজ অঙ্গগ ম প ধ নি র্স, র্স ণ ধ প (G M P D N S’, S’ n D P)অবরোহণে স্পষ্ট কোমল নিখাদ (n)-এর প্রয়োগ।
৫কাফী অঙ্গস র জ্ঞ ম প (S R g M P)কোমল গান্ধার (g) ও কোমল নিখাদের (n) সহজ গায়কি।
৬পূর্বী অঙ্গস র গ, হ্ম প, ধ প (S r G, M’ P, d P)কোমল ঋষভ (r), তীব্র মধ্যম (M’) ও কোমল ধৈবত (d)।
৭মারওয়া অঙ্গধ ম গ র, স (D M G r, S)কোমল ঋষভ (r), শুদ্ধ গান্ধার (G) ও তীব্র মধ্যম (M’)।
৮তোড়ী অঙ্গর জ্ঞ হ্ম প, জ্ঞ ম র স (r g M’ P, g M r S)কোমল ঋষভ, কোমল গান্ধার ও তীব্র মধ্যমের গাম্ভীর্য।
৯ভৈরবীক অঙ্গর জ্ঞ ম প, ধ ণ প (r g M P, d n P)চার কোমল স্বরের (r, g, d, n) চপল ও মরমী প্রকাশ।
১০সারং অঙ্গন প ম র, স (N P M R, S) / র ম প নি র্সকোমল ও শুদ্ধ নিখাদের স্পর্শ এবং মধ্যম কেন্দ্রিক চলন।
১১ধানশ্রী অঙ্গণ্ স গ ম প, ণ ধ প (N’ S g M P, n D P)কাফী/আশাবরী ঠাটের প্রাতঃকালীন আধ্যাত্মিক চলন।
১২ললিত অঙ্গণ্ র গ ম, ম হ্ম ম গ (N’ r G M, M M’ M G)দুই মধ্যমের (শুদ্ধ ম ও তীব্র M’) বিরল পাশাপাশি স্পর্শ।
১৩সোরাট অঙ্গর ম প ণ ধ প, র ম প (R M P n D P, R M P)সারং ও খামাজ অঙ্গের সুমিষ্ট মিশ্রণ।
১৪পিলু অঙ্গণ্ ধ্ ণ্ স, গ ম প, ণ ধ প (n’ d’ n’ S, G M P, n D P)মিশ্র স্বর ও ঠুমরি অঙ্গের চপল মাধুর্য।
১৫নাট অঙ্গস র, র গ, গ ম, ম প (S R, R G, G M, M P)আরোহণে প্রতিটি স্বরের জোরযুক্ত জোড়া প্রক্ষেপণ।
১৬শ্রী অঙ্গস র প, র প, ম গ র স (S r P, r P, M G r S)কোমল ঋষভ (r) থেকে সরাসরি পঞ্চমে (P) দীর্ঘ লম্ফ।
১৭বাগেশ্রী অঙ্গণ্ ধ্ ণ্ স, জ্ঞ ম ধ (n’ d’ n’ S, g M D)মধ্যম স্বরের (M) ওপর স্থায়ী আশ্রয় ও মাধুর্য।
১৮কৌঁস অঙ্গস জ্ঞ ম, ধ ণি র্স (S g M, d n S’)ঋষভ ও পঞ্চম বর্জিত (ঔড়ব) গম্ভীর সুরমণ্ডল।
১৯কেদার অঙ্গস ম, ম প, ধ প, ম প হ্ম প ম গ সশুদ্ধ মধ্যম থেকে ষড়্‌জে লম্ফ এবং তীব্র মধ্যমের স্পর্শ।
২০শঙ্করা অঙ্গস গ প, নি ধ র্স (S G P, N D S’)তীব্র আভিজাত্যপূর্ণ আরোহণ এবং পঞ্চমের স্থিরতা।
২১আশাবরী অঙ্গস র ম প, ধ প (S R M P, d P)কোমল গান্ধার, কোমল ধৈবত ও কোমল নিখাদের সুর।
২২কানাড়া অঙ্গগ ম র স, র্স নি ধ প (g M R S, S’ n D P)কোমল গান্ধারের (g) স্পন্দন ও g M R S মীড়।
২৩মালহার অঙ্গর ম প, র্স ণ ধ প, ম প, ম র র সM R R S (ঋষভের আন্দোলন) ও বর্ষার গাম্ভীর্য।
২৪হিন্দোল অঙ্গস গ হ্ম ধ র্স (S G M’ D S’)পঞ্চমে বর্জিত, তীব্র মধ্যমভিত্তিক উজ্জ্বল রূপ।
২৫ভূপালী (ভূপ্) অঙ্গস র গ প ধ র্স (S R G P D S’)পেন্টাটোনিক (পাঁচ স্বর) অল-শুদ্ধ স্বরের প্রফুল্লতা।
২৬আসা অঙ্গস র ম প ধ র্স (S R M P D S’)আশাবরী ঠাটের আশ্রয়ে প্রাতঃকালীন প্রসন্ন চলন।
২৭বিহাগ অঙ্গস গ ম প, নি র্স, র্স নি ধ প, ম গপ্রথাগতভাবে তীব্র মধ্যম স্পর্শসহ রাত্রির সৌন্দর্য।
২৮কামোদ অঙ্গর প, ম প ধ প, গ ম র স (R P, M P D P, G M R S)‘র প’ লম্ফ এবং ‘গ ম র স’ চরণের বক্র সংগতি।
২৯ভাটিয়ার অঙ্গস ধ্ প্, ধ্ স র গ ম (S D’ P’, D’ S R G M)মন্দ্র সপ্তকের ধৈবত ও প্রাতঃকালীন বিশেষ মোচড়।
৩০দুর্গা অঙ্গস র ম প ধ র্স, ধ ম র, স (S R M P D S’)নিখাদ ও গান্ধার বর্জিত পরিষ্কার পাঁচ স্বরের রূপ।
৩১বাহার অঙ্গস ম, ম প, জ্ঞ ম ধ নি র্স (S M, M P, g M D N S’)বসন্তের চপলতা, আরোহে দুই মধ্যম/গান্ধারের দোলা।
৩২ভীমপলশ্রী অঙ্গণ্ স জ্ঞ ম প, র্স ণি ধ প, ম প জ্ঞ ম র সকোমল গান্ধার ও কোমল নিখাদযুক্ত বিকেলের রাগ।
মেঘ রাগের শঙ্কর রাগপুত্র, সাব-ইম্পেরিয়াল মুঘল, উত্তর ভারত, সময়কাল আনুমানিক ১৬১০-২০ খ্রিস্টাব্দ।
মেঘ রাগের শঙ্কর রাগপুত্র, সাব-ইম্পেরিয়াল মুঘল, উত্তর ভারত, সময়কাল আনুমানিক ১৬১০-২০ খ্রিস্টাব্দ।

 

বিখ্যাত রাগের পরিবার (Family of Ragas)

ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে কিছু রাগ রয়েছে যা সাঙ্গীতিক দিক থেকে এতটাই সমৃদ্ধ ও প্রভাবশালী যে তাদের বিশেষ চলন, রূপ ও অবয়বকে কেন্দ্র করে বিশাল একেকটি পরিবার গড়ে উঠেছে। যেমন:
  • মালহার পরিবার: মিঞাঁ কি মালহার, মেঘ মালহার, গৌড় মালহার, সুর মালহার, রামদাসী মালহার, রূপমঞ্জরী মালহার ইত্যাদি।
  • কানাড়া পরিবার: দরবারী কানাড়া, নায়কী কানাড়া, শাহানা কানাড়া, আদানা কানাড়া, বাগেশ্রী-কানাড়া, কাফী-কানাড়া ইত্যাদি।
  • তোড়ী পরিবার: মিঞাঁ কি তোড়ী (শুদ্ধ তোড়ী), গুর্জরী তোড়ী, বিলাসখানী তোড়ী, ভূপাল তোড়ী, বহাদুরী তোড়ী ইত্যাদি।
  • সারং পরিবার: শুদ্ধ সারং, বৃন্দাবনী সারং, মধুমাদ সারং, মিঞাঁ কি সারং, সামন্ত সারং ইত্যাদি।
  • ভৈরব পরিবার: শুদ্ধ ভৈরব, রামকেলী, আহীর ভৈরব, বৈরাগী ভৈরব, আনন্দ ভৈরব ইত্যাদি।
  • কল্যাণ পরিবার: যমন (কল্যাণ), ভূপালী, শুদ্ধ কল্যাণ, শ্যাম কল্যাণ, যমুনী কল্যাণ ইত্যাদি।
  • বিলাবল পরিবার: শুদ্ধ বিলাবল, আলহাইয়া বিলাবল, শুক্ল বিলাবল, দেবগিরি বিলাবল, যমুনী বিলাবল ইত্যাদি।
রাগাঙ্গ-ভিত্তিক এই বিভাজন পদ্ধতি একজন শিক্ষার্থীকে রাগের প্রকৃত ‘রূপ’, ‘ছাঁচ’ বা মেজাজ চিনতে বিশেষভাবে সাহায্য করে। আপনি যখন একটি নির্দিষ্ট রাগাঙ্গ বা অঙ্গের চরিত্র ভালোভাবে আয়ত্ত করবেন, তখন সেই পরিবারের অন্তর্ভুক্ত অন্য যেকোনো রাগ চিনতে ও উপস্থাপন করতে আপনার জন্য বিষয়টি অনেক সহজ হয়ে যাবে।

এই আর্টিকেলটির উন্নয়ন কাজ চলমান। নতুন নতুন তথ্য ও অডিও উদাহরণ নিয়ে আমরা শীঘ্রই আরও সমৃদ্ধ আকারে এটি আপডেট করব। আবারো আসার আমন্ত্রণ রইলো।

 

 

 

SufiFaruq.com Logo 252x68 1 রাগের পরিবার বা রাগ অঙ্গ ভিত্তিক গ্রুপ । অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

 

আরও পড়ুন :

মন্তব্য করুন