হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীতের (Hindustani Classical Music) জগতে রাগ ঝিনঝটি একটি অত্যন্ত চঞ্চল, সুমধুর, শ্রুতিমধুর ও চিত্তাকর্ষক রাগ। সরল সাঙ্গীতিক কাঠামো এবং লোকসংগীতের খুব কাছাকাছি গায়নশৈলীর কারণে সাধারণ শ্রোতা থেকে শুরু করে বিদগ্ধ সংগীতজ্ঞ—সবার কাছেই এটি সমান সমাদৃত। এই রাগটি চপল প্রকৃতির হলেও এর অভ্যন্তরে এক গভীর প্রেম, ভক্তি ও করুণ রসের সংমিশ্রণ বিদ্যমান।
নামকরণের পরিচিতি:
আঞ্চিলিক উচ্চারণ, ঘরানার ভিন্নতা এবং গ্রন্থভেদে এই রাগটি বিভিন্ন নামে অভিহিত ও লেখা হয়। কমপ্লেক্স বা জটিল নামের কারণে সাধারণ পাঠক ও সংগীত শিক্ষার্থীদের মাঝে প্রায়শই বিভ্রান্তি তৈরি হয়। নিচে রাগটির প্রচলিত সবকটি প্রামাণ্য নাম উল্লেখ করা হলো:
- রাগ ঝিনঝটি (সবচেয়ে প্রচলিত বাংলা ব্যাকরণগত নাম)
- রাগ ঝিঁঝিট (বাংলা সাহিত্য ও রবীন্দ্রসংগীতে বহুল ব্যবহৃত নাম)
- রাগ ঝিনঝোটি (হিন্দি ও আধুনিক গ্রন্থে ব্যবহৃত রূপ)
- Jhinjhoti / Jhinjhiti / Jhinjhit (ইংরেজি নাম রূপান্তর)
(নোট: নাম যাই হোক না কেন, শাস্ত্রীয় সংগীতে এগুলো একই রাগের বিভিন্ন রূপান্তর বা নামভেদ।)
উৎস ও বৈশিষ্ট্য
রাগ ঝিনঝটি মূলত খাম্বাজ (বা খামাজ) ঠাট-এর অন্তর্ভুক্ত একটি রাগ। সংগীত বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি মূলত কোনো প্রাচীন লোকসুর বা আঞ্চলিক গান থেকে বিবর্তিত হয়ে পরবর্তীতে শাস্ত্রীয় রূপ লাভ করেছে।
এই রাগের প্রধান বিশেষত্ব হলো এর মন্দ্র ও মধ্য সপ্তকের বিস্তার। এটি উচ্চ বা তার সপ্তকের চেয়ে নিচের দিকের স্বরগুলোতে বেশি খেলা করে। এতে খাম্বাজ রাগের মতো দুটি নিষাদের (শুদ্ধ ও কোমল) ব্যবহার থাকলেও এর চলন খাম্বাজ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।
ধ্রুপদ বা বড় খেয়ালের চেয়ে ছোট খেয়াল, ঠুমরি, দাদরা, ভজন এবং বাদ্যযন্ত্রের (বিশেষ করে সেতার ও সারেঙ্গি) গতে এই রাগের আভিজাত্য এক অনন্য মাত্রা পায়। উস্তাদ বিলায়েত খাঁ এবং পণ্ডিত রবিশঙ্করের মতো দিকপাল শিল্পীরা সেতার বাদনে এই রাগকে বিশ্বদরবারে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন।
রাগের সাঙ্গীতিক পরিচয় ও শাস্ত্রীয় রূপ
- ঠাট (Thaat): খাম্বাজ (Khamaj)।
- জাতি (Jati): ঔড়ব-সম্পূর্ণ (Audav-Sampurna)। অর্থাৎ, আরোহণে ৫টি এবং অবরোহণে ৭টি স্বর ব্যবহৃত হয়।
- বাদী স্বর (Vadi Swara): শুদ্ধ গান্ধার (Ga / G)। এটি এই রাগের প্রাণপ্রদীপ।
- সংবাদী স্বর (Samvadi Swara): শুদ্ধ নিষাদ (Ni / N)।
- বর্জিত স্বর: আরোহণে গান্ধার (Ga) এবং নিষাদ (Ni) বর্জিত বা বক্রভাবে ব্যবহৃত হয়।
- ব্যবহৃত স্বর (Swara Usage):
- আরোহণে সবকটি স্বর শুদ্ধ।
- অবরোহণে সাতটি স্বরই ব্যবহৃত হয়, তবে এখানে কোমল নিষাদ (ni / ṇi) ব্যবহৃত হয়।
- অর্থাৎ এতে ষড়জ (Sa), শুদ্ধ ঋষভ (Re), শুদ্ধ গান্ধার (Ga), শুদ্ধ মধ্যম (Ma), পঞ্চমত (Pa), শুদ্ধ ধৈবত (Dha), শুদ্ধ নিষাদ (Ni) এবং অবরোহণে কোমল নিষাদ (ni) ব্যবহৃত হয়।
- পরিবেশনার সময় (Time of Performance): রাত্রির দ্বিতীয় প্রহর (রাত ৯টা থেকে রাত ১২টা)।
- প্রকৃতি ও রস: চঞ্চল, স্নিগ্ধ, মধুর; মূলত শৃঙ্গার (প্রেম) ও ভক্তি রসের সংমিশ্রণ।
আরোহণ, অবরোহণ ও পাকড় (Plain Text)
কপি-পেস্ট করার সুবিধার্থে স্বরলিপিগুলো প্লেইন টেক্সটে দেওয়া হলো:
- আরোহণ: S R M P D S’(নোট: প্রামাণ্য মতে ঔড়ব রূপ প্রধানে ৫টি স্বর ব্যবহৃত হয়। তবে অনেকে ‘S R G M P D N S” রূপে সম্পূর্ণ স্বরও ব্যবহার করেন।)
- অবরোহণ: S’ ni D P M G R S(এখানে ‘ni’ হলো কোমল নিষাদ।)
- বিশেষ পাকড় (Chalan / Pakad):
D’ S R M G , R G S , R m G R S
(বা ছোট স্বরসংগতি: S R G M G অথবা D’ S R M G)
লঘু-শাস্ত্রীয় ও রবীন্দ্রসংগীতে প্রভাব
বাংলা সংগীতে রাগ ঝিনঝটির প্রভাব অত্যন্ত গভীর। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই রাগের মাধুর্য ও ভাবকে তাঁর বহু গানে ব্যবহার করেছেন।
- রবীন্দ্রসংগীতের উদাহরণ: ‘এ কী লাবণ্যে পূর্ণ প্রাণ’, ‘আমার যা আছে আমি সকলি দিতে পারি’, ‘আমারে তুমি অশেষ করেছ’ ইত্যাদি গানে ঝিনঝটি রাগের স্নিগ্ধতা ও ভক্তিভাব স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।
সম্পর্কিত বা সদৃশ রাগের তালিকা
ঝিনঝটি রাগের সাথে কিছু রাগের স্বর বা চলনের মিল পাওয়া যায়, যা নিচে তুলনা করা হলো:
১. রাগ খাম্বাজ (Khamaj): ঠাট এক হলেও খাম্বাজে আরোহণে ‘রে’ (Re) বর্জিত, কিন্তু ঝিনঝটিতে ‘রে’ স্বরটি অত্যন্ত প্রখর ও শক্তিশালী।
২. রাগ দেশ (Desh): অবরোহণে কোমল নিষাদের ব্যবহারের কারণে কিছুটা মিল অনুভূত হলেও দেশ রাগে ঋষভ (Re) হলো বাদী স্বর এবং আরোহণ ‘S R M P N S”।
৩. রাগ তিলক কামোদ (Tilak Kamod): উভয় রাগে শুদ্ধ স্বরের প্রাধান্য থাকে, তবে তিলক কামোদের চলন অনেক বেশি বক্র এবং ঝিনঝটির চেয়ে কিছুটা গম্ভীর।
৪. রাগ গাড়া (Gara): গাড়ার চলনে ঝিনঝটির মন্দ্র সপ্তকের ছায়া থাকলেও ঋষভ ও ধৈবতের বিশেষ সংগতি একে আলাদা রাখে।
৫. রাগ কাফি (Kafi): কিছু কিছু ক্ষেত্রে $S – R – M – P$ চলনের কারণে কাফির ছায়া দেখা যায়, তবে থাট ভিন্ন হওয়ায় রসে পার্থক্য তৈরি হয়।
তথ্যসূত্র ও প্রামাণ্য গ্রন্থপঞ্জি (Sources)
১. পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখণ্ডে — রাগ পরিচয় (প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড) এবং ক্রমিক পুস্তক মালিকা (২য় ও ৩য় ভাগ)।
২. বিমলাকান্ত রায় চৌধুরী — ভারতীয় সংগীতের অভিধান।
৩. প্রফুল্ল কুমার চক্রবর্তী — সংগীত তত্ত্ব (প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড)।
৪. বসন্ত — সংগীত বিশারদ।
৫. Walter Kaufmann — The Ragas of North India (Jhinjhoti Section).
৬. B. Subba Rao — Raga-Nidhi.
৭. বিষ্ণুপুুর ঘরানার শাস্ত্রীয় সংগীতের প্রামাণ্য দলিল এবং যশোর শিক্ষা বোর্ড ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত পাঠ্যক্রম।


