শ্রোতা সহায়িকা নোট সিরিজে আজকের রাগ – রাগ কাফি [ Raga Kafi ]। এই আর্টিকেলটির উন্নয়ন কাজ চলমান রয়েছে। আপডেট পেতে আবারো আসার আমন্ত্রণ রইলো।
হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের দশটি প্রথাগত ‘ঠাটের’ (Thaat) অন্যতম প্রধান ও মূল আশঙ্কিত রাগ হলো ‘রাগ কাফি’ (Kafi)। এটি যেমন নিজে একটি স্বতন্ত্র সম্পূর্ণ রাগ, তেমনি এটি কাফি ঠাটের জনক বা ‘আশ্রয় রাগ’ হিসেবে পরিচিত।
কাফি রাগের সুরবিন্যাস অত্যন্ত প্রাণবন্ত, রসাত্মক এবং হৃদস্পর্শী। শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের কঠোর কাঠামোর মধ্যে অবস্থান করলেও এর স্বরপ্রক্ষেপণে এক বিশেষ নমনীয়তা রয়েছে। প্রথাগত খেয়াল ও ধ্রুপদের পাশাপাশি ভজন, ঠুমরি, দাদরা, গজল, হোলির গান, টপ্পা এবং ভারতীয় লোকসঙ্গীতে রাগ কাফির প্রয়োগ সর্বাধিক। বিশেষ করে বসন্তকালের ঋতুসঙ্গীত ও দোলযাত্রার গানে কাফি রাগের সুরধারা এক অমোঘ সাঙ্গীতিক আমেজ তৈরি করে।
বিশেষত্ব, স্বরপ্রয়োগ ও সাঙ্গীতিক আভিজাত্য
রাগ কাফির প্রধান বিশেষত্ব হলো এর কোমল গান্ধার (জ্ঞ) এবং কোমল নিষাদ (ণি)-এর মিষ্টি প্রয়োগ। তবে এই রাগে শাস্ত্রীয় স্বাধীনতার এক বিশেষ সুযোগ রয়েছে—অনেক সময় সুরের রঞ্জকতা ও বৈচিত্র্য বাড়াতে প্রাজ্ঞ শিল্পীরা উপ-শাস্ত্রীয় পরিবেশনায় কৌশলে শুদ্ধ গান্ধার (গ) এবং শুদ্ধ নিষাদ (নি)-এর আলতো স্পর্শ ঘটান।
দক্ষিণ ভারতীয় কর্ণাটকী সঙ্গীত ধারাতেও কাফি ঠাটের সমতুল্য ২২ নম্বর মেলাকর্তা রাগ হলো ‘খরহরপ্রিয়া’ (Kharaharapriya)। দাক্ষিণাত্যের খরহরপ্রিয়ার মতোই উত্তর ভারতের কাফি রাগটি প্রাচীন বৈষ্ণব আন্দোলন, কীর্তন এবং লোকায়ত সুরের এক সুগভীর আধার।
রাগের শাস্ত্রীয় কোষ্ঠী ও গঠনতত্ত্ব
| শাস্ত্রীয় অঙ্গ | বিশদ বিবরণ |
| ঠাটের নাম | কাফি ঠাট (নিজেই নিজের আশ্রয় রাগ)। |
| জাতি | সম্পূর্ণ-সম্পূর্ণ (আরোহে ৭টি এবং অবরোহে ৭টি স্বরই ব্যবহৃত হয়)। |
| বাদী স্বর | পা (পঞ্চম — এর ওপর স্বরের বিশ্রাম রাগের গতি সৃষ্টি করে)। |
| সমবাদী স্বর | রে (ঋষভ)। |
| অঙ্গ | উত্তরাঙ্গপ্রধান (বাদী স্বর পঞ্চমে হওয়ার কারণে)। |
| ব্যবহৃত স্বর | গান্ধার (গা) এবং নিষাদ (নি) কোমল; বাকি সব স্বর (রে, মা, ধা) শুদ্ধ। |
| ন্যাস স্বর | রে, জ্ঞ, মা, পা (যে স্বরগুলোতে সুর থামে বা বিস্তার লাভ করে)। |
| প্রথাগত সময় | মধ্যরাত্রি (রাতের তৃতীয় প্রহর); তবে বসন্তকালে যেকোনো সময় গাওয়া যায়। |
| রস ও প্রকৃতি | শৃঙ্গার, চঞ্চল, প্রেমময়, উৎসবমুখর ও করুণ রসে সমৃদ্ধ। |
আরোহ, অবরোহ ও প্রধান চলন (পকড়)
- আরোহ: সা রে জ্ঞ মা পা ধা ণি র্সা
- অবরোহ: র্সা ণি ধা পা মা জ্ঞ রে সা
- পকড় (প্রধান সাঙ্গীতিক বাক্য): সা সা রে রে জ্ঞ জ্ঞ মা মা পা, বা মা পা ধা ণি ধা পা, মা জ্ঞ রে সা
- রূপক চলন: সা রে জ্ঞ মা পা, মা পা ধা ণি ধা পা, মা জ্ঞ রে সা, ণ্ ধ্ সা
(বি.দ্র.: এখানে ‘জ্ঞ, ণি’ দ্বারা কোমল স্বর এবং ‘ণ্, ধ্’ দ্বারা মন্দ্র/খাদ সপ্তকের স্বর নির্দেশ করা হয়েছে)।
রাগ কাফি হলো ভারতীয় সঙ্গীতের সেই চিরবসন্তময় সুর, যা কঠোর উচ্চাঙ্গসঙ্গীত এবং সাধারণ লোকগাথার মধ্যে পরম সাঙ্গীতিক সেতু হিসেবে কাজ করে। এর চঞ্চল প্রকৃতি, মধুর স্বরপ্রক্ষেপণ এবং সার্বজনীন আবেদন যুগ যুগ ধরে শ্রোতাদের হৃদয়ে এক অনাবিল আনন্দ ও প্রেমের সুর জাগিয়ে চলেছে।
সম্পর্কিত বা কাছাকাছি রাগসমূহ
রাগ কাফি হলো একটি ‘জনক রাগ’ বা আশ্রয় রাগ। কাফি ঠাটের স্বর কাঠামোর ওপর নির্ভর করে কিংবা এর স্বরপ্রক্ষেপণের সামান্য পরিবর্তনের মাধ্যমে বেশ কয়েকটি কালজয়ী রাগ রূপ পরিগ্রহ করে:
রাগ ভীমপলশ্রী: কাফি ঠাটের সবচেয়ে প্রিয় ও জনপ্রিয় সন্তান। এতে কোমল ‘জ্ঞ’ ও কোমল ‘ণি’ থাকলেও, আরোহণে ঋষভ (রে) ও ধৈবত (ধা) সম্পূর্ণ বর্জিত হয় (ঔড়ব-সম্পূর্ণ জাতি) এবং এর প্রধান বল বা বাদী স্বর হলো শুদ্ধ মধ্যম (মা)।
রাগ বাগেশ্রী: কাফির সাথে স্বরগত মিল থাকলেও বাগেশ্রীর মেজাজ সম্পূর্ণ আলাদা। এটি গভীর রাতের রাগ এবং এতে আরোহণে পঞ্চমের (পা) স্পর্শ পরিহার করা হয়। এর বাদী স্বর কোমল নিষাদ (ণি)।
রাগ ধনশ্রী: ভীমপলশ্রীর মতোই কাফি ঠাটের রাগ, তবে এর বাদী স্বর ‘পঞ্চম’ (পা) হওয়ার কারণে ধনশ্রীর গায়কী কাফির চেয়ে অনেক বেশি চঞ্চল ও গোধূলি বেলার উপযোগী।
রাগ ধানী: কাফি ঠাটভিত্তিক এই রাগে ঋষভ (রে) ও ধৈবত (ধা) উভয়ই (আরোহ ও অবরোহে) সম্পূর্ণ বর্জিত হয় (ঔড়ব-ঔড়ব জাতি)। এটি হালকা, মিষ্টি ও লোকসুরের ঘনিষ্ঠ এক রাগ।
রাগ পিলু: কাফি ঠাটের অন্যতম প্রধান উপ-শাস্ত্রীয় ও মিশ্র রাগ। পিলুতে কাফির কোমল স্বরের ভিত্তি থাকলেও, এতে ১২টি স্বরের অবাধ ও নমনীয় বিচরণ একে ঠুমরি ও দাদরার প্রধান রাগে পরিণত করেছে।
- রাগ সিন্ধুড়া: কাফি রাগের সাথে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত একটি রাগ। এতে আরোহণে কৌশলে শুদ্ধ গান্ধারের (গ) ঈষৎ স্পর্শ এবং দ্রুত তানের বৈচিত্র্য ব্যবহার করে কাফি থেকে সামান্য আলাদা আমেজ তৈরি করা হয়।
কন্ঠে কাফি

কাজী নজরুল ইসলামের গানে কাফি রাগ:
নজরুলের অনেক গান রাগাশ্রয়ী। নির্দিষ্ট রাগের আশ্রয়ে যে গানগুলোতে সুর করা হয়েছে, সেগুলোর পুরো সুরে রাগের অবয়ব বজায় রাখার চেষ্টা থেকেছে; খুব বেশি রাগভ্রষ্ট হয়নি। তাই নজরুলের গানগুলো কান তৈরিতে বেশি উপযোগী বলে আমার কাছে মনে হয়।
- খেলে নন্দের-আঙিনায় আনন্দ দুলাল
- যাহা কিছু মম আছে প্রিয়তম
- আমার শ্যামা মায়ের কোলে চড়ে
- ব্রজগোপী খেলে হোরী ( সিন্ধু কাফি)

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের গানে কাফি রাগ:
কবিগুরু তার অনেক কম্পোজিশনে প্রচলিত রাগের আশ্রয় নিলেও অনেক সময় রাগের কাঠামোতে তিনি আটকে থাকতে চাননি। তাঁর সুরের পথ রাগের বাইরে চলে গেছে প্রায়শই। আমার কাঁচা কান যা বলে, তাতে বিশুদ্ধ রাগাশ্রয়ী গান হিসেবে তাঁর গান অনেক ক্ষেত্রেই খুব ভালো উদাহরণ নয়।
- এ পরবাসে রবে কে
- কে বসিলে আজি
- যদি এ আমার হৃদয় দুয়ার
- চরণ ধ্বনি শুনি তব নাথ
আধুনিক গানে কাফি রাগ:
- খুব জানতে ইচ্ছে করে [ মিশ্র]।
গজলে কাফি:
গজল গায়কির জন্য রাগ কাফি একটি অত্যন্ত সমৃদ্ধ এবং আদৃত রাগ। এর চপল অথচ গভীর আবেদন বিরহ ও শৃঙ্গার রসকে চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তোলে। কাফি রাগের কোমল গান্ধার (জ্ঞা) এবং কোমল নিষাদ (ণি) এর প্রয়োগ গজলকে এক বিশেষ মাধুর্য দান করে।
১. হাম কো কিসকে গম নে মারা — শিল্পী: গোলাম আলী। (এটি কাফি রাগের গজল গায়কির অন্যতম শ্রেষ্ঠ এবং জনপ্রিয় উদাহরণ)।
২. উসকে জখম পে ভি আয়া ক্যায়া ক্যায়া — শিল্পী: মেহেদী হাসান। (এই গজলে কাফি রাগের সাথে কিরওয়ানির সামান্য মিশ্রণ থাকলেও এর মূল চলন কাফি ভিত্তিক)।
৩. বাত নিকলেগি তো ফির দূর তলক জায়েগি — শিল্পী: জগজিৎ সিং। (যদিও অনেকে একে মিশ্র কিরওয়ানি বলেন, কিন্তু এর অনেক অন্তরা ও তানের কাজ বিশুদ্ধ কাফি রাগের স্বরবিন্যাস অনুসরণ করে)।
৪. দুনিয়া জিসে ক্যাহতে হ্যায় জাদুকর খিলোনা হ্যায় — শিল্পী: জগজিৎ সিং। (এটি কাফি রাগের ওপর ভিত্তি করে তৈরি একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় গজল)।
৫. কাল চৌদহবিন কি রাত থি — শিল্পী: জগজিৎ সিং। (এই বিখ্যাত গজলটির সুরে কাফি রাগের রোমান্টিক মেজাজটি অত্যন্ত স্পষ্ট)।
৬. আওয়াজ দে কর ছুপ গায়ে — শিল্পী: তালাত মাহমুদ। (পুরানো গজল ও চলচ্চিত্রের গজল আঙ্গিকের এই সৃষ্টিটি কাফি রাগের ওপর আধারিত)।
৭. ফির হাত মে শরাব হ্যায় — শিল্পী: পঙ্কজ উদাস। (সহজিয়া কাফি রাগের সুরে এটি একটি বিষণ্ণ মেজাজের গজল)।
৮. দিল-এ-নাদান তুঝে হুয়া ক্যায়া হ্যায় — শিল্পী: সুরাইয়া/বিভিন্ন শিল্পী। (মির্জা গালিবের এই কালজয়ী গজলটি ঐতিহাসিকভাবে কাফি রাগের সুরেই বেশি গীত হয়েছে)।
৯. দিল ধড়কনে কা সবব ইয়াদ আয়া — শিল্পী: গোলাম আলী। (এই গজলের কারুকাজে কাফি রাগের স্বরবিন্যাস অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে ব্যবহৃত হয়েছে)।
ভজনে কাফি:
ভজন গায়কিতে রাগ কাফি অত্যন্ত জনপ্রিয় কারণ এর চলন খুব সহজ এবং ভক্তি রসের সাথে এটি একাত্ম হয়ে যায়। বিশেষ করে শ্রীকৃষ্ণ এবং রাধার প্রেম ও লীলা বিষয়ক ভজনগুলোতে কাফি রাগের প্রয়োগ সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। এই রাগের কোমল গান্ধার (জ্ঞা) এবং কোমল নিষাদ (ণি) মনের আকুলতা প্রকাশে সাহায্য করে।
১. আজু ব্রজ মে হোলি রে রসিয়া — শিল্পী: পণ্ডিত জসরাজ / বিভিন্ন শিল্পী (এটি একটি ধ্রুপদী ভজন বা হোরি, যা বিশুদ্ধ কাফি রাগে নিবদ্ধ। ব্রজের হোলি বিষয়ক এই পদটি কাফি রাগের চপল প্রকৃতির শ্রেষ্ঠ উদাহরণ)।
২. মে তেরি মুরলী কি ধুন পর বল বল জাউঁ — শিল্পী: অনুপ জালোটা (অনুপ জালোটার গাওয়া এই জনপ্রিয় ভজনটি কাফি রাগের সরল ও মধুর রূপের ওপর ভিত্তি করে তৈরি)।
৩. শ্যাম কহে মোহি সখা মণ্ডলী — শিল্পী: উস্তাদ রশিদ খান (রামপুর সহসওয়ান ঘরানার এই শিল্পী কাফি রাগের গম্ভীর ও ভক্তিপূর্ণ মেজাজে এই কৃষ্ণ ভজনটি গেয়েছেন)।
৪. চলো মন গঙ্গা যমুনা তীর — শিল্পী: স্বামী আনন্দগিরি / বিভিন্ন শিল্পী (মীরাবাঈয়ের এই পদটি অনেক ক্ষেত্রে কাফি এবং মিশ্র ভৈরবী রাগের সংমিশ্রণে গাওয়া হয়, তবে এর মূল আধার কাফি)।
৫. ক্যায়সে জাউঁ যমুনা কে তীর — শিল্পী: বিদুসী গিরিজা দেবী (বেনারস ঘরানার এই প্রবাদপ্রতিম শিল্পী কাফি রাগের ‘ভজন-অঙ্গ’ বা ঠুমরি আঙ্গিকে এটি পরিবেশন করেছেন)।
৬. হোরি খেলত হ্যায় গিরিধারী — শিল্পী: পণ্ডিত ভীমসেন জোশী (কাফি রাগের তদ্ভব রূপ বা মিশ্র কাফি রাগে গাওয়া এই ভজনটি ভক্তি ও আনন্দের এক অপূর্ব সংমিশ্রণ)।
ঠুমরিতে কাফি:
ঠুমরি গায়কির ক্ষেত্রে রাগ কাফি-কে বলা হয় এই ধারার প্রাণ। ঠুমরির মূল ভাব—অর্থাৎ শৃঙ্গার, বিরহ এবং মান-অভিমান প্রকাশের জন্য কাফি রাগের কোমল গান্ধার (জ্ঞা) ও কোমল নিষাদ (ণি)-এর আন্দোলন অত্যন্ত কার্যকর। ঠুমরিতে সাধারণত কাফি রাগের বিশুদ্ধ রূপের চেয়ে ‘মিশ্র কাফি’-র চলন বেশি দেখা যায়, যেখানে শিল্পীরা সৌন্দর্যের খাতিরে ১২টি স্বরেরই (বিশেষ করে শুদ্ধ গা ও শুদ্ধ নি) সূক্ষ্ম প্রয়োগ ঘটান।
১. আব কে সাবন ঘর আ যা — শিল্পী: বিদুসী গিরিজা দেবী। (বেনারস ঘরানার এই প্রবাদপ্রতিম শিল্পী কাফি রাগের এই ঠুমরিটিকে এক অমর সৃষ্টিতে পরিণত করেছেন। বর্ষার আর্তি ও বিরহ এতে কাফি রাগের মাধ্যমে চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে)।
২. বাজে ঝুনঝুন প্যায়লিয়া — শিল্পী: উস্তাদ বড় গুলাম আলী খাঁ। (পাতিয়ালা ঘরানার এই ওস্তাদ কাফি রাগের চপল ও গায়কি অঙ্গের মিশেলে এই ঠুমরিটি পরিবেশন করেছেন)।
৩. কাঁহা মানে কারে না কারে — শিল্পী: পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তী। (কাফি রাগের বন্দিশি ঠুমরির এটি একটি চমৎকার উদাহরণ, যেখানে রাগের শুদ্ধতা ও রাধাকৃষ্ণের মান-অভিমান প্রধান)।
৪. ক্যায়সে খেলু হোরি রে গুলাইয়া — শিল্পী: উস্তাদ ফৈয়াজ খাঁ / বিভিন্ন শিল্পী। (আগ্রা ঘরানার এই ধ্রুপদী ঠুমরিটি কাফি রাগের ‘হোরি’ অঙ্গের একটি শ্রেষ্ঠ নিদর্শন। হোলির আনন্দ ও চপলতা কাফি রাগের মূল বৈশিষ্ট্য)।
৫. সাঁওয়ারিয়া মন ভায়া রে — শিল্পী: বেগম আখতার। (মল্লিকা-এ-গজল ও ঠুমরি সম্রাজ্ঞী বেগম আখতারের গলায় কাফি রাগের এই ঠুমরিটি অত্যন্ত দরদী ও করুণ রসের সৃষ্টি করে)।
৬. নয়নন মে বান ভরে — শিল্পী: পণ্ডিত ছন্নুলাল মিশ্র। (বেনারস গায়কির এই শিল্পী কাফি রাগের মিশ্র রূপ ব্যবহার করে বিরহী ঠুমরির এক গভীর আবেশ তৈরি করেছেন)।
যন্ত্রে কাফি:
সেতারে কাফি:
সেতার বাদনে রাগ কাফি অত্যন্ত জনপ্রিয় কারণ এই রাগের মিড় (Sliding notes) এবং জমজমা-র কাজগুলো সেতারে খুব চমৎকারভাবে ফুটে ওঠে। বিশেষ করে বিলম্বিত বা মধ্য লয়ের চেয়ে দ্রুত লয়ের ‘গৎ’ এবং ‘ঝালা’ এই রাগে বেশি শ্রুতিমধুর শোনায়। ঠুমরি অঙ্গের সেতার বাদনে কাফি রাগের প্রয়োগ সবচেয়ে বেশি।
ফ্যাক্ট চেক করে সেতারে রাগ কাফি-তে নিবদ্ধ প্রামাণ্য এবং কালজয়ী কিছু পরিবেশনার তালিকা নিচে দেওয়া হলো:
১. পণ্ডিত রবিশঙ্কর (মাইহার ঘরানা): তাঁর সেতারে ‘রাগ কাফি’র রূপায়ণ বিশ্ববিখ্যাত। বিশেষ করে তাঁর ‘মিশ্র কাফি’র হোলি বা ঠুমরি অঙ্গের বাজনা এবং তালের বৈচিত্র্য (যেমন—ধামার বা দীপচন্দী) এই রাগের চপলতাকে সার্থকভাবে ফুটিয়ে তোলে। ইউটিউবে Pandit Ravi Shankar - Raga Kafi Live লিখে সার্চ করলে তাঁর অনেক পুরোনো ও আধুনিক রেকর্ড পাওয়া যাবে।
২. উস্তাদ বিলায়েত খাঁ (ইমদাদখানী ঘরানা): তাঁর ‘গায়ন অঙ্গ’ বা কণ্ঠের অনুকরণে সেতার বাজানোতে কাফি রাগের কোমল স্বরগুলোর প্রয়োগ এক অন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে। তাঁর বাজানো কাফি রাগের ঠুমরি বা দাদরা অত্যন্ত করুণ ও রোমান্টিক রসের সৃষ্টি করে। Ustad Vilayat Khan - Raga Mishira Kafi শিরোনামে তাঁর কালজয়ী রেকর্ডগুলো শোনা যায়।
৩. পণ্ডিত নিখিল বন্দ্যোপাধ্যায় (মাইহার ঘরানা): তাঁর সেতারে কাফি রাগের অত্যন্ত ধীর ও গম্ভীর আলাপ এবং ‘জোড়’-এর কাজ শাস্ত্রীয় সংগীত প্রেমীদের কাছে এক অমূল্য সম্পদ। তিনি অনেক সময় কাফি রাগের সাথে রাগ সিন্ধু কাফি-র মিশ্রণ ঘটিয়ে এক নতুন আবহ তৈরি করতেন।
৪. উস্তাদ শহীদ পারভেজ খাঁ (ইমদাদখানী ঘরানা): আধুনিক সময়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এই সেতারিয়া কাফি রাগে তাঁর দ্রুত গতির তান ও নিখুঁত তন্ত্ৰকারী কাজের জন্য পরিচিত। তাঁর সেতারে কাফি রাগের একটি উজ্জ্বল ও তেজোদীপ্ত রূপ প্রকাশ পায়।
৫. উস্তাদ সুজাত খাঁ (ইমদাদখানী ঘরানা): তাঁর সেতারে কাফি রাগের সাথে লোকজ সুরের (Folk) সংমিশ্রণ এবং বাজনার সাথে তাঁর গায়কির মেলবন্ধন এক ভিন্ন মাত্রার রঞ্জকতা তৈরি করে।
সরদে কাফি:
সরদ বাদনে রাগ কাফি তার গভীরতা এবং ছন্দের বৈচিত্র্যের কারণে এক অনন্য রূপ লাভ করে। সরদের গম্ভীর প্রতিধ্বনি এই রাগের শৃঙ্গার ও করুণ রসকে আরও মরমী করে তোলে। আপনার উল্লিখিত দুজন দিকপাল শিল্পীর পাশাপাশি আরও কিছু প্রামাণ্য তথ্য নিচে যুক্ত করা হলো:
১. উস্তাদ আলী আকবর খান (মাইহার ঘরানা): তাঁর সরদে ‘রাগ কাফি’র এক আধ্যাত্মিক ও গম্ভীর রূপ পাওয়া যায়। তিনি মূলত ‘মিশ্র কাফি’ বাজাতে পছন্দ করতেন, যেখানে রাগের ব্যাকরণ মেনেও তিনি অত্যন্ত মুন্সিয়ানার সাথে অন্য স্বরের ছোঁয়া দিতেন। তাঁর ‘ঝালা’ এবং ‘জোড়’-এর কাজ কাফি রাগের এক অবিস্মরণীয় দলিল। তাঁর বিখ্যাত অ্যালবাম “Morning and Evening Ragas” বা বিভিন্ন লাইভ কনসার্টের রেকর্ডিং (ইউটিউবে Ali Akbar Khan Raga Kafi লিখে সার্চ করলে পাওয়া যাবে)।
২. পণ্ডিত বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত (শাহজাহানপুর ঘরানা): তাঁর সরদে কাফি রাগের গাণিতিক শুদ্ধতা এবং রাগের কাঠামোগত সৌন্দর্য খুব নিপুণভাবে প্রকাশ পায়। বিশেষ করে তাঁর ‘তন্ত্ৰকারী’ ও দ্রুত লয়ের ‘গৎ’ এই রাগে এক ভিন্ন মাত্রা যোগ করে। তিনি প্রায়শই কাফি রাগের ওপর ভিত্তি করে তৈরি প্রাচীন ‘বন্দিশ’ সরদে বাজাতেন। তাঁর বিভিন্ন শাস্ত্রীয় সংকলন ও আকাশবাণীর রেকর্ডিং।
৩. উস্তাদ আমজাদ আলী খান (সেনিয়া সেহরাওয়াত ঘরানা): তাঁর সরদে কাফি রাগের ‘গায়ন অঙ্গ’ বা কণ্ঠের মতো মিড় ও মুড়কির কাজ অত্যন্ত শ্রুতিমধুর শোনায়। তিনি এই রাগে প্রায়ই ‘হোরি’ বা ‘ধামার’ তালের কাজ করেন যা অত্যন্ত জনপ্রিয়। তাঁর কালজয়ী অ্যালবাম “Sarod Maestro”।
৪. পণ্ডিত তেজেন্দ্র নারায়ণ মজুমদার (শাহজাহানপুর ঘরানা): আধুনিক সময়ের এই সরদিয়া কাফি রাগের চপল ও রোমান্টিক দিকটিকে তাঁর দ্রুত গতির তান ও নিখুঁত কাজের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলেন।
আরও দেখুন:
