হিন্দুস্থানি সঙ্গীতের রাগের নোট

রাগ জৈনপুরী । রাগের শ্রোতা সহায়িকা নোট । অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

রাগ জৈনপুরী | অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

শ্রোতা সহায়িকা নোট সিরিজে আজকের রাগ – রাগ জৈনপুরী [ Raga Jaunpuri ] ।  এই আর্টিকেলটির উন্নয়ন কাজ চলমান রয়েছে। আপডেট পেতে আবারো আসার আমন্ত্রণ রইলো।

আমাদের জীবনের মধ্য-সকালগুলোর একটা নিজস্ব মেজাজ থাকে। ভোরের স্নিগ্ধ আলো যখন ফিকে হয়ে রোদ কিছুটা কড়া হতে শুরু করে, চারপাশের কোলাহল যখন ব্যস্ততার দখল নেয়—তখন মনের ভেতর এক অদ্ভুত বৈরাগ্য, প্রচ্ছন্ন উদাসীনতা বা অন্যমনস্কতা এসে ভর করে। ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের জগতে এই বিশেষ মুহূর্তটির অনুভূতিকে দরদ দিয়ে সুরের সুতোয় বুনে তৈরি করা হয়েছে ‘রাগ জৈনপুরী’ (Jaunpuri)।

রাগ জৈনপুরী [ Raga Jaunpuri ] সহজে চেনার উপায় । শ্রোতা সহযোগী নোট !

রাগ জৈনপুরী

নামকরণ এবং সৃষ্টির ইতিহাস

রাগ জৈনপুরীর নামকরণ এবং প্রবর্তনের ইতিহাস অত্যন্ত রোমাঞ্চকর। প্রচলিত প্রামাণ্য ইতিহাস ও প্রবীণ ওস্তাদদের মুখনিঃসৃত আখ্যান অনুযায়ী, পঞ্চদশ শতাব্দীতে জৌনপুর রাজ্যের (বর্তমানে ভারতের উত্তরপ্রদেশ) প্রজ্ঞাবান ও সুররসিক সুলতান হুসেন শাহ শরকি (Sultan Hussain Shah Sharqi) এই রাগের উদ্ভাবক।

তিনি আঞ্চলিক লোকজ সুরের মিষ্টি ব্যাকরণকে শাস্ত্রীয় সংগীতের শৃঙ্খলে বেঁধে এই নতুন রাগটি তৈরি করেছিলেন। পরবর্তীতে তাঁর প্রিয় রাজ্যের নামানুসারেই এই রাগের নাম হয় ‘জৈনপুরী’ (বা জৌনপুরী)।

বিশেষত্ব ও সাঙ্গীতিক আভিজাত্য

রাগ জৈনপুরী মূলত আশাবরী ঠাট-এর অন্তর্ভুক্ত একটি অতি সুপরিচিত, মিষ্টি অথচ প্রজ্ঞাময় ও গম্ভীর প্রকৃতির রাগ। এতে ভক্তি, সমর্পণ এবং প্রচ্ছন্ন করুণ রসের এক অপূর্ব সমারোহ ঘটে।

এটি দিনের দ্বিতীয় প্রহরের রাগ। ভোরের প্রথম প্রহরে সুরের যে আলতো ছোঁয়া থাকে, জৈনপুরীতে এসে তা এক গভীর আত্মিক আকুলতা ও আত্মনিবেদনের রূপ নেয়।

আশাবরী রাগের সাথে সূক্ষ্ম তফাত

অনেকে রাগ জৈনপুরীকে মূল ‘আশাবরী’ রাগের সাথে গুলিয়ে ফেলেন। তবে সাঙ্গীতিক বিচারে এদের প্রধান তফাত হলো:
  • রাগ আশাবরী: এর আরোহণে ‘নিষাদ’ (নি) স্বরটি সম্পূর্ণ বর্জিত থাকে।
  • রাগ জৈনপুরী: এর আরোহণে কোমল নিষাদ (ni) খুব সুন্দর ও সোজাভাবে স্পর্শ করা হয়।
ফলে জৈনপুরীর গায়কী আশাবরীর চেয়ে অনেক বেশি রঞ্জক, গতিশীল, বৈচিত্র্যময় ও উজ্জ্বল শোনায়। এতে বিলম্বিত খেয়ালের পাশাপাশি দ্রুত তানের কাজ শ্রোতার মনে এক অনির্বচনীয় আবেশ তৈরি করে।

রাগের শাস্ত্রীয় কোষ্ঠী ও গঠনতত্ত্ব

  • ঠাট (Thaat): আশাবরী (Asavari)।
  • জাতি (Jati): ষাড়ব-সম্পূর্ণ (Shadav-Sampurna)। অর্থাৎ, আরোহণে ৬টি স্বর এবং অবরোহণে ৭টি স্বর ব্যবহৃত হয়।
  • বাদী স্বর (Vadi Swara): কোমল ধৈবত (dha / d)।
  • সংবাদী স্বর (Samvadi Swara): কোমল গান্ধার (ga / g)।
  • বর্জিত স্বর: আরোহণে ‘গান্ধার’ (G/g) সম্পূর্ণ বর্জিত।
  • ব্যবহৃত স্বর (Swara Usage): ঋষভ (R) ও পঞ্চম (P) শুদ্ধ; আর গান্ধার (g), ধৈবত (d) ও নিষাদ (ni) কোমল ব্যবহৃত হয়।
  • প্রথাগত সময় (Time of Performance): দিনের দ্বিতীয় প্রহর (পূর্বাহ্ণ/সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টা)।
  • রস ও প্রকৃতি: প্রচ্ছন্ন করুণ, ভক্তিপ্রধান, শান্ত, বিনয়ী ও আত্মমগ্ন।

আরোহ, অবরোহ ও প্রধান চলন (পকড়)

কপি-পেস্ট করার সুবিধার্থে এবং স্বরলিপি যাতে ভেঙে না যায়, সে উদ্দেশ্যে সহজ প্লেইন টেক্সট সংস্করণে স্বরগুলো তুলে ধরা হলো:
(নোট: এখানে ছোট হাতের g, d, ni দ্বারা কোমল স্বর এবং S’ দ্বারা তার সপ্তকের সা নির্দেশ করা হয়েছে।)
  • আরোহ: S R M P d ni S’
  • অবরোহ: S’ ni d P M g R S
  • প্রধান পকড় (Pakad / সাঙ্গীতিক বাক্য):
    M P d ni d P , M P g , R S
    (বা চলন বাক্য: S R M P , d P , M P ni d P)
  • চলন রূপায়ণ:
    S R M P , d P , M P g , R S ; M P ni S’ , S’ ni d P

দরবারী কানাড়া, আদানা ও জৈনপুরীর সূক্ষ্ম পার্থক্য

শুনতে শুনতে কান তৈরি না হলে সাধারণ বা নবীন শ্রোতাদের কাছে প্রথম দিকে দরবারী কানাড়া, আদানা এবং জৈনপুরী—এই তিনটি রাগকে একই সুর বলে ভ্রম হতে পারে। কারণ তিনটি রাগেরই মূল স্বরসংগতি একই ঠাটের (সা, রে, g, মা, পা, d, ni)। কিন্তু এদের মেজাজ, সপ্তকের বিস্তার এবং গায়নশৈলী সম্পূর্ণ আলাদা:
১. দরবারী কানাড়া (Darbari Kanada): এটি সাগরের মতো অতল গম্ভীর ও প্রবীণ। এটি মূলত মন্দ্র (খাদ) ও মধ্য সপ্তকে গুমরে মরে। এর কোমল গান্ধার (g) অত্যন্ত বক্র, ধীর এবং বিশেষ আন্দোলনযুক্ত (Oscillated)।
২. রাগ আদানা (Adana): এটি ঠিক যেন পাহাড়ি ঝরনা—অত্যন্ত প্রখর, চঞ্চল, বীররসাত্মক ও দ্রুত গতিসম্পন্ন। এটি প্রধানত তার সপ্তকে (উঁচু স্বরে) বিকশিত হয়।
৩. রাগ জৈনপুরী (Jaunpuri): এটি ভোরের এক শান্ত ও বিনয়ী প্রার্থনা। এটি মধ্য ও তার সপ্তকের মাঝামাঝি জায়গায় নিজের রূপ প্রকাশ করে। এর কোমল গান্ধার (g) কোনো কৃত্রিম আন্দোলন ছাড়াই একদম সহজ, সরল ও পরিষ্কারভাবে উচ্চারিত হয়।
সংক্ষেপে বলতে গেলে—দরবারী রাজকীয় গাম্ভীর্য ও ভারী কানাড়া অঙ্গের মূর্ততা বহন করে; আদানা চঞ্চলতা ও শক্তির বহিঃপ্রকাশ ঘটায়; আর জৈনপুরী আশাবরী অঙ্গের সরলতা ও ভক্তিরসকে বুকে ধরে উদ্ভাসিত হয়।
গজল কিংবদন্তি ওস্তাদ মেহদি হাসান খাঁ তাঁর বিখ্যাত গজল “কুবাকু ফ্যায়ল গ্যায়ে” গাইবার আগে আসরে প্রায়ই এই তিন রাগের সূক্ষ্ম তফাতটি অত্যন্ত প্রাঞ্জলভাবে ব্যাখ্যা করতেন।
রাগ জৈনপুরী হলো ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের সেই পরম রত্ন, যা মানুষের মনের ভেতর জমে থাকা প্রচ্ছন্ন আকুলতাকে আত্মিক সুরে রূপান্তর করে। এর স্বরপ্রক্ষেপণের সততা ও স্নিগ্ধতা শ্রোতাকে এক পরম প্রশান্তি ও ধ্যানের জগতে নিয়ে যায়।

এই অঙ্গের কারণে দরবারি কানাড়া ও আডানার মধ্যে শুরুতে বেশি মিল বেশি মনে হবে। পরে মিল মনে হবে জৈনপুরীরর সাথে। তবে শুনতে শুনতে সব পরিস্কার হয়ে যাবে। এছাড়া আরও অনেক সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে যেগুলো বোঝার জন্য বিভিন্ন কম্পোজিশন শোনার কোন বিকল্প নেই।

এই ভিডিওটিতে ওস্তাদ মেহদি হাসান খান দরবারী রাগের “কুবাকু ফ্যায়ল গ্যায়ে” গজলটি গাইবার আগে জৈনপুরী ও দরবারীর পার্থক্য দেখিয়েছেন:

 

 

আধুনিক গানে জৈনপুরী:

১. ঐ উজ্জ্বল দিন ডাকে স্বপ্ন রঙিন — শিল্পী: হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। (এটি রাগ জৈনপুরীর ওপর ভিত্তি করে তৈরি বাংলা আধুনিক গানের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। এর সুরের চড়াই-উতরাই ও বিস্তার জৈনপুরীর আরোহ-অবরোহকে নিখুঁতভাবে অনুসরণ করে)।

২. খাঁচার পাখি ছিল সোনার খাঁচায় — শিল্পী: পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তী / আরতি মুখোপাধ্যায়। (রবীন্দ্রসংগীত হলেও এটি রাগ জৈনপুরীর প্রভাবে সুরারোপিত। এর প্রতিটি মিড় ও স্বরবিন্যাসে জৈনপুরীর আর্তি স্পষ্ট)।

৩. কেন দূরে থাকো শুধু আড়াল রাখো — শিল্পী: আশা ভোঁসলে। (এই বিখ্যাত আধুনিক গানটিতে জৈনপুরী রাগের ছোঁয়া অত্যন্ত স্পষ্ট, যা গানের বিষণ্ণ মেজাজকে ফুটিয়ে তোলে)।

 

গজলে জৈনপুরী:

গজল গায়কিতে রাগ জৈনপুরী তার আভিজাত্য এবং বিরহী মেজাজের কারণে অত্যন্ত জনপ্রিয়। বিশেষ করে মধ্যাহ্নের এই রাগের কোমল স্বরগুলো (জ্ঞা, দা, ণি) যখন গজলে ব্যবহৃত হয়, তখন তা এক অদ্ভুত একাকীত্ব এবং আধ্যাত্মিক আর্তি তৈরি করে।

১. দিল মেঁ এক ল্যাহের সি উঠি হ্যায় আভি — শিল্পী: গোলাম আলী।

এটি রাগ জৈনপুরী-র ওপর ভিত্তি করে তৈরি গজলের সবচেয়ে বিখ্যাত উদাহরণ। এর স্থায়ী এবং অন্তরায় জৈনপুরীর ‘সা রে মা পা দা ণি র্সা’ চলনটি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। গোলাম আলী সাহেব এই গজলে জৈনপুরীর শুদ্ধতা বজায় রেখে চমৎকার তান ও মুরকির কাজ করেছেন।

২. মুঝসে প্যাহলি সি মোহাব্বত মেরে মেহবুব না মাঙ্গ — শিল্পী: নূরজাহান / ফৈয়জ আহমেদ ফৈয়জ (কবিতা হিসেবে)।

ফৈয়জ আহমেদ ফৈয়জের এই অমর সৃষ্টিতে সুরারোপ করা হয়েছে রাগ জৈনপুরী-র আদলে। এর গাম্ভীর্য এবং বিরহী মেজাজ জৈনপুরী রাগের সাথে হুবহু মিলে যায়।

৩. কাহাঁ আকে রুকে থে রাস্তে — শিল্পী: মেহেদী হাসান।

শাহেনশাহ-এ-গজল মেহেদী হাসান এই গজলটি রাগ জৈনপুরী-র অত্যন্ত ধীর ও গম্ভীর চালে গেয়েছেন। এর স্বরবিন্যাস এবং মিড়গুলো জৈনপুরীর ব্যাকরণকে নিখুঁতভাবে অনুসরণ করে।

৪. খুলি জো আঁখ তো ও থা, না ও জামানা থা — শিল্পী: গুলাম আলী।

এই গজলটিতে জৈনপুরী রাগের একটি করুণ এবং স্মৃতিচারণমূলক রূপ পাওয়া যায়। এটি মূলত মিশ্র জৈনপুরী-র একটি চমৎকার নিদর্শন।

 

ভজনে জৈনপুরী:

ভজন গায়কিতে রাগ জৈনপুরী অত্যন্ত গম্ভীর, ভক্তিময় এবং সমর্পণমূলক এক পরিবেশ তৈরি করে। এই রাগের আশাবরী অঙ্গের চলন ঈশ্বরের প্রতি আকুলতা প্রকাশের জন্য অত্যন্ত উপযোগী।

১. ঘর মেঁ পধারো গজাননজি — শিল্পী: পণ্ডিত রাজন ও সাজন মিশ্র / বিভিন্ন শিল্পী। (এটি রাগ জৈনপুরীর ওপর ভিত্তি করে তৈরি একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় গণেশ ভজন। এর আরোহ-অবরোহ এবং স্থায়ী-অন্তরার কাজগুলো জৈনপুরী রাগের শুদ্ধ রূপকে চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তোলে)।

২. পায়োজি ম্যায়নে রাম রতন ধন পায়ো — শিল্পী: লতা মঙ্গেশকর / ডি. ভি. পালুস্কর। (মীরাবাঈয়ের এই বিখ্যাত পদটি সাধারণত রাগ জৈনপুরী-মিশ্র বা আশাবরী অঙ্গে গাওয়া হয়। এর মধ্যে জৈনপুরীর স্বরবিন্যাস এবং ভক্তি রস অত্যন্ত প্রবল)।

৩. প্রভু মেরে অবগুণ চিত না ধরো — শিল্পী: পণ্ডিত ভীমসেন জোশী / অনুপ জালোটা। (সুরদাসের এই পদটি অনেক ক্ষেত্রে জৈনপুরী রাগের কাঠামোতে গাওয়া হয়। এর গম্ভীর ও করুণ সুর ভক্তের আর্তিকে প্রকাশ করতে সাহায্য করে)।

৪. তেরে মন মেঁ রাম তন মেঁ রাম — শিল্পী: বিভিন্ন ভজন গায়ক। (এই ভজনটি জৈনপুরী রাগের সরল ও মধুর চলনের ওপর ভিত্তি করে তৈরি, যা সাধারণ শ্রোতাদের কাছেও অত্যন্ত জনপ্রিয়)।

 

ঠুমরিতে জৈনপুরী:

ঠুমরি গায়কির ক্ষেত্রে রাগ জৈনপুরী-র ব্যবহার তুলনামূলকভাবে কম, কারণ জৈনপুরী একটি অত্যন্ত গম্ভীর এবং শাস্ত্রীয় ব্যাকরণ-প্রধান রাগ। ঠুমরিতে সাধারণত যে চপলতা বা ‘খটকা-মুরকি’র কাজ থাকে, তা জৈনপুরীর গম্ভীর মেজাজের সাথে কিছুটা বিপরীত। তবুও, বেনারস ঘরানার শিল্পীরা এই রাগের করুণ রসকে কাজে লাগিয়ে কিছু চমৎকার ঠুমরি ও দাদরা সৃষ্টি করেছেন।

১. বাজে ঝুনঝুন প্যায়লিয়া — শিল্পী: বিদুষী গিরিজা দেবী। (বেনারস ঘরানার এই প্রবাদপ্রতিম শিল্পী জৈনপুরী রাগের ‘ঠুমরি-অঙ্গ’ বা চৈত্রি আঙ্গিকে এই পদটি অত্যন্ত নিপুণভাবে পরিবেশন করেছেন। এর মধ্যে জৈনপুরীর গম্ভীর মেজাজের সাথে ঠুমরির মাধুর্য মিশে আছে)।

২. সুঘর বানাও লাড়িলী — শিল্পী: পণ্ডিত ছন্নুলাল মিশ্র। (বেনারস গায়কির এই অনন্য শিল্পী জৈনপুরী রাগের ওপর ভিত্তি করে তৈরি এই ঠুমরি-সদৃশ পদটি গেয়েছেন। এতে জৈনপুরীর শুদ্ধ স্বরবিন্যাস এবং ঠুমরির ললিত ভাব—উভয়ই স্পষ্ট)।

৩. পিয়া বিন না হ্যায় চৈন — শিল্পী: বিভিন্ন বেনারস ঘরানার শিল্পী। (এটি মূলত একটি মিশ্র জৈনপুরী বা আশাবরী অঙ্গের ঠুমরি। বিরহী মনের আকুলতা প্রকাশে জৈনপুরীর কোমল স্বরগুলো এখানে অত্যন্ত কার্যকরভাবে ব্যবহৃত হয়েছে)।

৪. রাগ জৈনপুরীতে পতিয়ালার ওস্তাদ বড় ফাতেহ আলী খাঁ সাহেবের বিখ্যাত  “লাগান লাগে মরি” :

 

 

যন্দ্রে জৈনপুরী:

সেতারে জৈনপুরী:

সেতারে রাগ জৈনপুরী বাজানো বেশ চ্যালেঞ্জিং, কারণ এর বিশেষ স্বরবিন্যাস এবং ‘দা-পা’ বা ‘মা-পা-দা-ণি-দা-পা’-এর মতো মিড়ের কাজগুলো সেতারে ফুটিয়ে তুলতে উচ্চমানের নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন। আপনার উল্লেখ করা ওস্তাদ শহীদ পারভেজ খাঁ এই রাগের আধুনিক ও তেজোদীপ্ত রূপায়ণে অনন্য।

নিচে ফ্যাক্ট চেক করে সেতারে রাগ জৈনপুরীর প্রামাণ্য তালিকা দেওয়া হলো:

১. উস্তাদ শহীদ পারভেজ খাঁ (ইমদাদখানী ঘরানা): তাঁর সেতারে রাগ জৈনপুরীর এক অসাধারণ গায়ন-অঙ্গ (Vocal style) ফুটে ওঠে। বিশেষ করে তার সপ্তকে তাঁর দ্রুত গতির তান এবং নিখুঁত ‘তন্ত্ৰকারী’ এই রাগের উজ্জ্বলতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। তাঁর বাজানো জৈনপুরীর ‘ঝালা’ এবং দ্রুত লয়ের গৎ সেতার প্রেমীদের কাছে অত্যন্ত প্রিয়। তাঁর বিভিন্ন কনসার্ট রেকর্ডিং এবং অ্যালবাম (যেমন: The Great Heritage সিরিজ)।

২. পণ্ডিত নিখিল বন্দ্যোপাধ্যায় (মাইহার ঘরানা): সেতারে জৈনপুরী রাগের সবচেয়ে গম্ভীর এবং আধ্যাত্মিক রূপটি তাঁর বাজনায় পাওয়া যায়। তাঁর ধীর গতির ‘আলাপ’ এবং মন্দ্র সপ্তকের কাজ এই রাগের ভক্তি রসকে পূর্ণতা দেয়। তিনি প্রায়ই জৈনপুরীর বিশুদ্ধ রূপটি বাজাতেন। তাঁর লাইভ কনসার্টের সংকলন (ইউটিউবে Nikhil Banerjee Raga Jaunpuri লিখে সার্চ করলে পাওয়া যাবে)।

৩. পণ্ডিত রবিশঙ্কর (মাইহার ঘরানা): তিনি জৈনপুরী রাগের একটি অত্যন্ত রঞ্জক ও ছন্দময় রূপ পরিবেশন করতেন। তাঁর সেতারে এই রাগের ‘জোড়’ এবং বিভিন্ন তালের (যেমন—রূপক বা ঝাপতাল) প্রয়োগ লক্ষ্যণীয়। তাঁর ঐতিহাসিক কনসার্ট রেকর্ডিং দেখুন।

৪. উস্তাদ বিলায়েত খাঁ (ইমদাদখানী ঘরানা): শহীদ পারভেজ খাঁ সাহেবের ঘরানার এই প্রধান পুরুষ সেতারে জৈনপুরী রাগের যে সূক্ষ্ম মিড় ও ‘খটকা’ ব্যবহার করতেন, তা অনেকটা কণ্ঠসংগীতের মতো শোনায়। তাঁর বাজনায় জৈনপুরীর করুণ রস অত্যন্ত তীব্র।

 

সরদে জৈনপুরী:

সরদে রাগ জৈনপুরী এক গম্ভীর ও রাজকীয় মাত্রা পায়। সরদের ধাতব ও প্রতিধ্বনিময় শব্দ এই রাগের আশাবরী অঙ্গের গাম্ভীর্যকে চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তোলে। আপনার উল্লিখিত দুজন দিকপাল শিল্পীর পরিবেশনা এই রাগের প্রামাণ্য দলিল হিসেবে স্বীকৃত।

১. উস্তাদ আলী আকবর খাঁ (মাইহার ঘরানা): তাঁর সরদে রাগ জৈনপুরীর এক অত্যন্ত আধ্যাত্মিক ও মরমী রূপ পাওয়া যায়। তিনি মূলত এই রাগের ‘আলাপ’ এবং ‘জোড়’ অংশে মন্দ্র ও মধ্য সপ্তকের কাজ দিয়ে এক ধীরস্থির আবহের সৃষ্টি করতেন। তাঁর বাজানো জৈনপুরী অনেক সময় অত্যন্ত করুণ ও শান্ত রসের উদ্রেক করে। তাঁর বিখ্যাত অ্যালবামসমূহ এবং কনসার্ট আর্কাইভ (ইউটিউবে Ali Akbar Khan - Raga Jaunpuri লিখে সার্চ করলে তাঁর পূর্ণাঙ্গ পরিবেশনা পাওয়া যাবে)।

২. পণ্ডিত বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত (শাহজাহানপুর ঘরানা): তাঁর সরদে জৈনপুরী রাগের গাণিতিক শুদ্ধতা এবং রাগের কাঠামোগত স্পষ্টতা অতুলনীয়। বিশেষ করে তাঁর ‘তন্ত্ৰকারী’ এবং দ্রুত লয়ের ‘গৎ’-এ জৈনপুরীর উজ্জ্বল ও তেজোদীপ্ত রূপটি প্রকাশ পায়। তিনি এই রাগের আরোহ-অবরোহের ব্যাকরণ অত্যন্ত কঠোরভাবে মেনে চলতেন। তাঁর বিভিন্ন শাস্ত্রীয় সংকলন এবং আকাশবাণীর (AIR) রেকর্ডিং।

৩. উস্তাদ আমজাদ আলী খাঁ (সেনিয়া সেহরাওয়াত ঘরানা): তাঁর সরদে জৈনপুরী রাগের একটি অত্যন্ত দ্রুত এবং ছন্দময় রূপ পাওয়া যায়। তাঁর ‘একহারা তান’ এবং আঙুলের ক্ষিপ্র কাজ এই রাগে এক নতুন গতিশীলতা যোগ করে। তাঁর বিভিন্ন লাইভ কনসার্টের ভিডিও এবং অডিও রেকর্ড।

 

খেয়ালে জৈনপুরী :

১. উস্তাদ রশিদ খাঁ (রামপুর সহসওয়ান ঘরানা) তাঁর কণ্ঠে রাগ জৈনপুরী এক অনন্য উচ্চতা লাভ করেছে। বিশেষ করে তাঁর বিখ্যাত বন্দিশ ‘বাজ রে ঝনঝন প্যায়লিয়া’ (দ্রুত একতাল) এবং ‘পিয়া ঘর আও’ অত্যন্ত জনপ্রিয়। তাঁর গায়কিতে এই রাগের মধ্য ও তার সপ্তকের উজ্জ্বলতা চমৎকারভাবে ফুটে ওঠে।

২. উস্তাদ আমীর খাঁ (ইন্দোর ঘরানা) আমীর খাঁ সাহেব জৈনপুরী রাগের অত্যন্ত গম্ভীর এবং আধ্যাত্মিক রূপটি পরিবেশন করতেন। তাঁর বিলম্বিত খেয়ালের শান্ত ও মন্থর চলন এই রাগের ভক্তি রসকে পূর্ণতা দেয়। তাঁর ‘খাম্বাজ’ বা ‘মারোয়া’-র মতো জৈনপুরীও একটি প্রামাণ্য রেকর্ড হিসেবে স্বীকৃত।

৩. পণ্ডিত কুমার গান্ধর্ব (জোড়-রাগ: কেদার-জৈনপুরী) কুমার গান্ধর্ব তাঁর নিজস্ব সৃজনশীলতায় দুটি ভিন্ন প্রকৃতির রাগকে মিলিয়ে ‘কেদার-জৈনপুরী’ নামক একটি অপূর্ব মিশ্র রাগ তৈরি করেছিলেন। কেদারের শুদ্ধ মধ্যম এবং জৈনপুরীর কোমল স্বরের এই সংমিশ্রণ তাঁর গায়কির এক অনন্য সম্পদ।

৪. বিদুষী কিশোরী আমোনকর (জয়পুর-আত্রৌলি ঘরানা) জয়পুর ঘরানার বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী তাঁর জৈনপুরী ছিল অত্যন্ত জটিল স্বরবিন্যাস ও ‘বক্র’ তানের কাজে ঠাসা। তাঁর গাওয়া জৈনপুরীর বন্দিশ ‘কাহে কো ললচায়ে’ একটি মাইলফলক হিসেবে গণ্য হয়।

৫. পণ্ডিত মুকুল শিবপুত্র : কুমার গান্ধর্বের পুত্র এবং শিষ্য হিসেবে তিনি তাঁর পিতার উত্তরাধিকার বহন করেন। তাঁর কণ্ঠে জৈনপুরী রাগের শুদ্ধতা এবং ভাবগাম্ভীর্য অত্যন্ত প্রামাণ্য। তাঁর লাইভ কনসার্টের জৈনপুরী রেকর্ডিংগুলো ইন্টারনেটে এবং আর্কাইভে সংরক্ষিত আছে।

৬. বিদুষী শোভা মুডগাল : তাঁর শক্তিশালী ও ভরাট গলায় জৈনপুরী রাগের বীর ও করুণ রসের এক অদ্ভুত মিশ্রণ পাওয়া যায়। তিনি শাস্ত্রীয় খেয়ালের পাশাপাশি জৈনপুরী অঙ্গের ভজন ও আধা-শাস্ত্রীয় গানেও সমান পারদর্শী।

 

 

 

SufiFaruq.com Logo 252x68 1 রাগ জৈনপুরী । রাগের শ্রোতা সহায়িকা নোট । অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

 

তথ্যসূত্র ও প্রামাণ্য গ্রন্থপঞ্জি (Sources)

১. পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখণ্ডে — রাগ পরিচয় (দ্বিতীয় খণ্ড) এবং ক্রমিক পুস্তক মালিকা।
২. বসন্ত — সংগীত বিশারদ।
৩. বিমলাকান্ত রায় চৌধুরী — ভারতীয় সংগীতের অভিধান।
৪. Walter Kaufmann — The Ragas of North India.
আরও দেখুন:
শেয়ার করুন: Facebook X WhatsApp LinkedIn

প্রেস ডেস্ক, সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর এর অফিস

সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর এর নিজের সকল লেখা, শুভেচ্ছা, স্মরণ ইত্যাদি এই ডেস্ক থেকে প্রকাশিত হয়।

সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক, কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগ। ইতিহাস, রাজনীতি, প্রযুক্তি ও উন্নয়ন নিয়ে লেখালেখি।

যোগাযোগ

কুমারখালী বাস স্ট্যান্ড, দুর্গাপুর, কুমারখালী।
+৮৮০ (১৭) ৬৩০৩৮,৬৩০৩৯।contact@sufifaruq.com

© ২০২৬ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।