রাগ মুলতানি বা মুলতানী তোড়ী । অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের দিনান্তের বা অপরাহ্ণকালীন ভূখণ্ডে পা রাখলে এমন কিছু গভীর, মরমী এবং ব্যাকুল রাগের সাক্ষাৎ মেলে, যা গোধূলির আলো-আঁধারিতে মানবমনের সমস্ত ক্লান্তি, অলসতা এবং দিনের বিদায়বেলার আধ্যাত্মিক ব্যাকুলতাকে সুরের ক্যানভাসে ফুটিয়ে তোলে। তেমনই এক অতি-গম্ভীর, আভিজাত্যময় এবং পরম করুণ রসে ভরপুর কালজয়ী রূপ হলো ‘রাগ মুলতানী’। তোড়ী ঠাটের আশ্রয়ে শ্রেণীবদ্ধ হলেও মুলতানী তোড়ী পরিবারের ভোরের রাগগুলোর চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন সময়ের এবং ভিন্ন মেজাজের। অপরাহ্ণের প্রখর রোদ যখন পশ্চিমে ঢলে পড়তে শুরু করে, তখন মুলতানীর সুরপ্রক্ষেপণ চারপাশের প্রকৃতি ও মানুষের মনে এক গভীর আত্মমগ্ন বৈরাগ্যের উদ্রেক করে।

সঙ্গীত শাস্ত্রে এর প্রাচীন শিকড় এবং রূপান্তরের কারণে এটি ‘মুলতানী’, ‘মুলতানী তোড়ী’ বা ‘মুলতানি’ নামে বহুল সমাদৃত।

রাগ মুলতানি

ইতিহাস ও রাগের পরিচয়

ইতিহাসের পাতায় রাগ মুলতানীর শাব্দিক ও আঞ্চলিক শিকড় জড়িয়ে রয়েছে প্রাচীন ভারত ও অবিভক্ত পাঞ্জাবের ঐতিহাসিক নগরী ‘মুলতান’-এর (বর্তমান পাকিস্তানে অবস্থিত) লোকসুর ও দেবালয় সংস্কৃতির সাথে। পরবর্তীকালে ধ্রুপদী উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতে স্থান পাওয়ার পর এটি তোড়ী ঠাটের অন্যতম প্রধান অপরাহ্ণকালীন প্রতিনিধি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে।

অনেক সময় এর স্বরবিন্যাস তোড়ী ঠাটের রাগ ‘মিঞাঁ কি তোড়ী’-র সাথে মিলে যায় বলে নতুন শ্রোতারা ভ্রমের শিকার হন। তবে এদের গাওয়ার সময় সম্পূর্ণ আলাদা—তোড়ী যেখানে ভোরের প্রথম প্রহরের রাগ, মুলতানী সেখানে দিনের চতুর্থ প্রহর বা বিকেলের রাগ। এর প্রধান রস হলো করুণ, শৃঙ্গার এবং শান্ত রস। দিনের ক্লান্তি শেষে সন্ধ্যার মুখে এই রাগের সুরতরঙ্গ শ্রোতার মনকে জাগতিক ব্যস্ততা থেকে এক পরম বৈরাগ্যময় প্রশান্তির দিকে নিয়ে যায়।

রাগের শাস্ত্র

রাগ মুলতানির শাস্ত্রীয় নিয়ম ও গঠন নিচে দেওয়া হলো:

  • ঠাট: তোড়ি।
  • জাতি: ঔড়ব-সম্পূর্ণ (আরোহে ৫টি এবং অবরোহে ৭টি স্বর ব্যবহৃত হয়)।
  • আরোহ: নি সা গ্‌ ম্ প নি সঁ (এখানে ‘গ’ কোমল এবং ‘ম’ কড়ি। আরোহে রে ও ধ বর্জিত)।
  • অবরোহ: সঁ নি ধ্ প ম্ গ্‌ র্রে সা (এখানে রে, গ, ধ—কোমল এবং ম—কড়ি)।
  • বাদী স্বর: পঞ্চম (প)।
  • সমবাদী স্বর: ষড়জ (সা)।
  • বর্জিত স্বর: আরোহে ঋষভ (রে) এবং ধৈবত (ধ) বর্জিত।
  • ব্যবহৃত স্বর: ঋষভ (রে), গান্ধার (গ) ও ধৈবত (ধ) হলো কোমল; মধ্যম (ম) হলো কড়ি বা তীব্র; এবং নিষাদ (নি) ও ষড়জ (সা) হলো শুদ্ধ।
  • সময়: দিনের চতুর্থ প্রহর বা অপরাহ্ণ (বিকেল ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা)।
  • প্রকৃতি: অত্যন্ত গম্ভীর, করুণ এবং শান্ত।

 

সম্পর্কিত রাগের তালিকা

মুলতানি রাগের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ বা সম্পর্কিত রাগগুলোর তালিকা নিচে দেওয়া হলো:

  • রাগ তোড়ি: তোড়ি এবং মুলতানির স্বর একই হলেও তোড়ি সকালে গাওয়া হয় এবং এর চলনে ঋষভ ও ধৈবতের প্রাধান্য বেশি থাকে।
  • রাগ মধুবন্তী: মধুবন্তীতে শুদ্ধ ঋষভ ও শুদ্ধ ধৈবত ব্যবহৃত হয়, কিন্তু মুলতানিতে এই দুটি স্বরই কোমল।
  • রাগ গুর্জরী তোড়ি: গুর্জরী তোড়িতে পঞ্চম (প) বর্জিত, কিন্তু মুলতানিতে পঞ্চম হলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বা বাদী স্বর।
  • রাগ মিয়াঁ কি তোড়ি: এটি সকালে গাওয়া হয় এবং এর আরোহে ঋষভ বর্জিত থাকে না, যা একে মুলতানি থেকে পৃথক করে।

 

রাগ মুলতানি তার সূক্ষ্ম কারুকার্য এবং বিকেলের বিষণ্ণতাকে সুরের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলার ক্ষমতার জন্য সংগীত জগতে অনন্য। এই রাগটি গাওয়ার সময় কড়ি মধ্যম থেকে পঞ্চমে যাওয়ার যে চলন, তা শ্রোতার মনে এক ধরণের অপার্থিব ব্যাকুলতা তৈরি করে। এটি এমন একটি রাগ যা আয়ত্ত করতে গায়ককে প্রচুর ধৈর্যের পরিচয় দিতে হয়। শুদ্ধ শাস্ত্রীয় সংগীতের বিশালতা ও গভীরতা বুঝতে মুলতানি রাগের অবদান অনস্বীকার্য।

তথ্যসূত্র (Sources)

নিবন্ধটির তথ্যসমূহ নিম্নলিখিত প্রামাণ্য শাস্ত্র ও উৎস থেকে যাচাই করা হয়েছে:

১. রাগ পরিচয় (খণ্ড ৩) — পণ্ডিত হরিশ্চন্দ্র শ্রীবাস্তব।

২. ক্রমিক পুস্তক মালিকা — পণ্ডিত বিষ্ণু নারায়ণ ভাতখন্ডে।

৩. সংগীত বিশারদ — বসন্ত।

৪. রাগ তত্ত্ব ও রূপায়ন — বিভিন্ন প্রামাণ্য শাস্ত্রীয় সংগীত পাঠ্যক্রম।