হিন্দুস্থানি সঙ্গীতের রাগের নোট

রাগ শিবরঞ্জিনী । শ্রোতা সহায়িকা নোট । অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

রাগ শিবরঞ্জিনী ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের অন্যতম জনপ্রিয় এবং হৃদয়স্পর্শী একটি রাগ। এর সুর এতটাই আবেদনময় যে এটি শাস্ত্রীয় সংগীতের গণ্ডি পেরিয়ে চলচ্চিত্র এবং লোকসংগীতেও ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে।

রাগ শিবরঞ্জিনী

রাগ শিবরঞ্জিনী: পরিচয় ও বিশেষত্ব

রাগ শিবরঞ্জিনী (Shivaranjani) একটি অত্যন্ত করুণ ও গভীর ভাব উদ্রেককারী রাগ। এটি মূলত ‘কাফি’ ঠাটের অন্তর্গত একটি রাগ হিসেবে পরিচিত। এই রাগের বিশেষত্ব হলো এর সীমিত স্বর বিন্যাস। মাত্র পাঁচটি স্বরের সমন্বয়ে গঠিত হওয়া সত্ত্বেও এটি মানুষের মনে বিরহ, একাকিত্ব এবং ভক্তির এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ তৈরি করে।

ইতিহাসগতভাবে শিবরঞ্জিনী রাগটি কর্ণাটকী সংগীত এবং হিন্দুস্তানি সংগীত—উভয় ধারাতেই সমাদৃত। এই রাগে ‘কোমল গান্ধার’ (গ) স্বরটির প্রয়োগই এর প্রধান করুণ রসের উৎস। বিষাদগ্রস্ত মেজাজ ফুটিয়ে তোলার জন্য বাঁশি বা বেহালার মতো বাদ্যযন্ত্রে এই রাগের প্রয়োগ অতুলনীয়। বাংলা গানে এবং বলিউডের বহু কালজয়ী বিরহী গানে শিবরঞ্জিনী রাগের কাঠামো ব্যবহার করা হয়েছে।

রাগের শাস্ত্র

রাগ শিবরঞ্জিনীর শাস্ত্রীয় নিয়ম ও পরিচয় নিচে দেওয়া হলো:

  • ঠাট: কাফি।
  • জাতি: ঔড়ব-ঔড়ব (আরোহ এবং অবরোহ উভয় ক্ষেত্রেই ৫টি করে স্বর ব্যবহৃত হয়)।
  • আরোহ: সা রে গ ম প ধ সা (নোটেশন অনুযায়ী: সা রে গ্‌ প ধ সঁ — এখানে ‘গ’ কোমল)।
  • অবরোহ: সঁ ধ প গ রে সা (নোটেশন অনুযায়ী: সঁ ধ প গ্‌ রে সা — এখানে ‘গ’ কোমল)।
  • বাদী স্বর: পঞ্চম (প)।
  • সমবাদী স্বর: ষড়জ (সা)।
  • বর্জিত স্বর: এই রাগে ‘মধ্যম’ (ম) এবং ‘নিষাদ’ (নি) সম্পূর্ণ বর্জিত।
  • ব্যবহৃত স্বর: ঋষভ (রে), পঞ্চম (প) এবং ধৈবত (ধ) শুদ্ধ; কেবল গান্ধার (গ) কোমল ব্যবহৃত হয়।
  • সময়: মধ্যরাত্রি (রাত ১২টা থেকে ৩টা)। তবে এটি যেকোনো সময় গাওয়ার মতো ‘সর্বকালীন’ রাগ হিসেবেও সমাদৃত।
  • প্রকৃতি: অত্যন্ত করুণ, বিরহী এবং শান্ত।

 

সম্পর্কিত রাগের তালিকা

শিবরঞ্জিনী রাগের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ বা সম্পর্কিত রাগগুলোর তালিকা নিচে দেওয়া হলো:

  • রাগ ভূপালী: শিবরঞ্জিনীর শুদ্ধ গান্ধারের পরিবর্তে কোমল গান্ধার ব্যবহার করলেই তা ভূপালীর কাঠামো থেকে আলাদা হয়ে যায়।
  • রাগ দেশকার: এটিও ভূপালীর সমগোত্রীয়, তবে শিবরঞ্জিনীর কোমল গান্ধার একে একটি স্বতন্ত্র বিষাদময় রূপ দান করে।
  • রাগ মিশ্র শিবরঞ্জিনী: মূল শিবরঞ্জিনীর সাথে অন্তরা বা সঞ্চারীতে শুদ্ধ গান্ধার বা অন্যান্য স্বরের সূক্ষ্ম প্রয়োগ করলে তাকে মিশ্র শিবরঞ্জিনী বলা হয়।

রাগ শিবরঞ্জিনী তার সরল স্বর-বিন্যাসের মাধ্যমে মানুষের হৃদয়ের গভীরতম অনুভূতিকে স্পর্শ করতে সক্ষম। এর মধ্যে যে করুণ রসের উপস্থিতি রয়েছে, তা শ্রোতাকে এক ধরণের আধ্যাত্মিক নির্জনতায় নিয়ে যায়। যারা শাস্ত্রীয় সংগীতের গভীরে প্রবেশ করতে চান, তাদের জন্য শিবরঞ্জিনী রাগটি স্বর ও আবেগের মেলবন্ধন বোঝার এক অনন্য মাধ্যম। এর শান্ত ও বিষাদময় আবেদন একে বিশ্ব সংগীতের এক অমূল্য রত্নে পরিণত করেছে।

তথ্যসূত্র (Sources)

নিবন্ধটির তথ্যসমূহ নিম্নলিখিত প্রামাণ্য উৎস থেকে যাচাই করা হয়েছে:

১. রাগ পরিচয় — পণ্ডিত হরিশ্চন্দ্র শ্রীবাস্তব।

২. ক্রামিক পুস্তক মালিকা — পণ্ডিত বিষ্ণু নারায়ণ ভাতখন্ডে।

৩. সংগীত তত্ত্ব — প্রফুল্ল কুমার চক্রবর্তী।

৪. ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের কোষ — বিভিন্ন প্রামাণ্য আকাদেমি রেকর্ডস।

আরও দেখুন:

শেয়ার করুন: Facebook X WhatsApp LinkedIn

প্রেস ডেস্ক, সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর এর অফিস

সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর এর নিজের সকল লেখা, শুভেচ্ছা, স্মরণ ইত্যাদি এই ডেস্ক থেকে প্রকাশিত হয়।

সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক, কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগ। ইতিহাস, রাজনীতি, প্রযুক্তি ও উন্নয়ন নিয়ে লেখালেখি।

যোগাযোগ

কুমারখালী বাস স্ট্যান্ড, দুর্গাপুর, কুমারখালী।
+৮৮০ (১৭) ৬৩০৩৮,৬৩০৩৯।contact@sufifaruq.com

© ২০২৬ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।