ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সুবিশাল ও চিরন্তন সুরমণ্ডলে ‘রাগ সিন্ধু ভৈরবী’ (Sindhu Bhairavi) এক অতীব জনপ্রিয়, করুণ, ভক্তিপূর্ণ ও মাধুর্যময় রাগ। নাম শুনেই অনুধাবন করা যায়, এটি মূল প্রথাগত শুদ্ধ ভৈরবী এবং প্রাচীন সিন্ধু (বা সিন্ধুরা) রাগের এক অপূর্ব ও নিপুণ সাঙ্গীতিক সংমিশ্রণে গঠিত একটি মিশ্র ও আশ্রিত রাগ।
শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের মাহফিল, কনসার্ট বা আসরগুলোতে রাগ সিন্ধু ভৈরবী সাধারণত অনুষ্ঠানের ‘সমাপ্তিসঙ্গীত’ (Concluding Raga) হিসেবে গাওয়া হয়। এর সুমধুর চলন, বৈচিত্র্যময় স্বরপ্রক্ষেপণ এবং হৃদয়ের গভীরতম কাতরতা ও ভক্তি রসের স্নিগ্ধ প্রকাশ শ্রোতাদের মনে এক চিরস্থায়ী আধ্যাত্মিক আবেশ তৈরি করে।
পরিচয়, ঐতিহাসিক পটভূমি ও ‘বারো স্বরের’ রাজকীয় বৈচিত্র্য
ঐতিহাসিকভাবে রাগ সিন্ধু ভৈরবীর মূল উৎস নিহিত রয়েছে প্রাচীন সিন্ধু প্রদেশ (বর্তমান পাকিস্তান) ও উত্তর-পশ্চিম ভারতের লোকসুর এবং আঞ্চলিক গীতিধারার মধ্যে। লোকায়ত সুরধারা থেকে ধীরে ধীরে সুসংহত শাস্ত্রীয় ব্যাকরণে রূপান্তরের মধ্য দিয়ে এটি উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের মর্যাদায় উন্নীত হয়।
রাগ সিন্ধু ভৈরবীর সবচেয়ে বড় সাঙ্গীতিক বিশেষত্ব হলো এর নমনীয়তা এবং ‘বারোটি স্বরের’ (১২টি স্বর) প্রজ্ঞাময় ব্যবহার। যদিও রাগটির মূল সাঙ্গীতিক কাঠামো ভৈরবী ঠাটের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে এবং এতে চার কোমল স্বর (কোমল ঋষভ, কোমল গান্ধার, কোমল ধৈবত ও কোমল নিষাদ) ব্যবহৃত হয়; তবুও সিন্ধু অঙ্গের সংমিশ্রণের কারণে এতে কৌশলে শুদ্ধ ঋষভ, শুদ্ধ ধৈবত এবং ক্ষেত্রবিশেষে শুদ্ধ গান্ধার, শুদ্ধ নিষাদ ও তীব্র মধ্যমের স্পর্শ ঘটানো হয়। এই শুদ্ধ ও কোমল স্বরের অপূর্ব খেলা একে সাধারণ ভৈরবী থেকে এক অনন্য উজ্জ্বলতা ও স্বকীয়তা দান করে।
এটি মূলত একটি ‘সর্বকালিক রাগ’—অর্থাৎ সময়-নিয়মের প্রথাগত কঠোরতা পেরিয়ে শাস্ত্রীয় আসরের ইতি টানতে যেকোনো প্রহরে এই রাগ গাওয়া বা বাজানো যায়। তবে স্বতন্ত্রভাবে পরিবেশন করলে প্রাতঃকালে (ভোরে) এর পূর্ণ মাধুর্য সবচেয়ে সজীব হয়ে ওঠে। খেয়াল, ঠুমরি, দাদরা, গজল, ভজন থেকে শুরু করে লঘু-শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের (Semi-classical) জন্য এটি এক অপরিহার্য ও সর্বজনীন রাগ।
রাগের শাস্ত্রীয় কোষ্ঠী ও গঠনতত্ত্ব
| শাস্ত্রীয় অঙ্গ | বিশদ বিবরণ |
| ঠাটের নাম | ভৈরবী ঠাট (প্রথাগত ভৈরবীর মূল আশ্রয়)। |
| জাতি | সম্পূর্ণ-সম্পূর্ণ (আরোহে ৭টি এবং অবরোহে ৭টি স্বর ব্যবহৃত হয়)। |
| বাদী স্বর | মা (শুদ্ধ মধ্যম)। |
| সমবাদী স্বর | সা (ষড়জ)। |
| মূল ব্যবহৃত স্বর | ঋষভ (রে), গান্ধার (গা), ধৈবত (ধা) ও নিষাদ (নি) মূলত কোমল; মধ্যম (মা) শুদ্ধ। |
| বিশেষ প্রয়োগ | সুরের রঞ্জকতা ও বৈচিত্র্য বাড়াতে শিল্পীরা দক্ষতাভরে ১২টি স্বরই ব্যবহার করেন। |
| বর্জিত স্বর | কোনো স্বর বর্জিত নয়। |
| প্রথাগত সময় | প্রাতঃকাল (ভোর ৪টা থেকে সকাল ৭টা); তবে আসরের শেষ গান হিসেবে সর্বকালিক। |
| রস ও প্রকৃতি | প্রচ্ছন্ন করুণ, বাৎসল্য, ভক্তিপ্রধান ও পরম শান্ত। |
আরোহ, অবরোহ ও প্রধান চলন (পকড়)
- আরোহ: সা ঋ জ্ঞ মা পা ধ ণি র্সা (প্রয়োজনভেদে শুদ্ধ ‘রে’ ও শুদ্ধ ‘ধা’-এর স্পর্শ সহ)
- অবরোহ: র্সা ণি ধ পা মা জ্ঞ ঋ সা
- পকড় (মুখ্য সাঙ্গীতিক বাক্য): জ্ঞ মা পা ধ পা, মা জ্ঞ, ঋ সা, ন্ ধ্ ন্ সা / জ্ঞ মা পা ণি ধ পা, মা জ্ঞ ঋ সা
(বি.দ্র.: এখানে ‘ঋ, জ্ঞ, ধ, ণি’ দ্বারা কোমল স্বর এবং খাদ বা মন্দ্র সপ্তকের স্বরের নিচে বিন্দু ব্যবহার করা হয়েছে)।
দক্ষিণ ভারতীয় (কর্ণাটকী) সঙ্গীতে সিন্ধু ভৈরবী
উত্তর ভারতীয় হিন্দুস্থানি সঙ্গীতের মতো দক্ষিণ ভারতীয় কর্ণাটকী সঙ্গীত ধারাতেও ‘সিন্ধু ভৈরবী’ একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় ও সমাদৃত রাগ। তবে সাঙ্গীতিক ব্যাকরণের দিক থেকে দুটির মধ্যে কিছুটা সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে:
কর্ণাটকী সঙ্গীতে এটি ৫০ নম্বর মেলাকর্তা রাগ ‘নামানারায়ণী’ (Namanarayani)-এর সাথে সংগতিপূর্ণ হলেও গায়কী ও স্বরপ্রক্ষেপণরীতির ক্ষেত্রে এটি মূলত একটি ভাষাঙ্গা রাগ (Bhashanga Raga)। হিন্দুস্থানি সঙ্গীতের মতোই কর্ণাটকী পরিবেশনায় কনসার্টের শেষভাগে বা তিলানা ও জাভালি গাইতে সিন্ধু ভৈরবী ব্যবহৃত হয়। তবে দাক্ষিণাত্যের মিষ্টি গামক এবং তালের বৈচিত্র্যের কারণে কর্ণাটকী সিন্ধু ভৈরবী শুনতে হিন্দুস্থানি গায়কী থেকে কিছুটা আলাদা ও স্বতন্ত্র অনুভূতি তৈরি করে।
![Raga Sindhi Bhairavi Scale রাগ সিন্ধু ভৈরবী । অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ 2 Raga Sindhi-Bhairavi Scale [ রাগ সিন্ধু-ভৈরবী ]](https://sufifaruq.com/wp-content/uploads/2015/03/Raga-Sindhi-Bhairavi-Scale-300x64.png)
রাগ সিন্ধু ভৈরবী হলো ভারতীয় সংস্কৃতির সেই সার্বজনীন সুরমুকুট, যা শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের কঠিন নিয়মকানুনকে অক্ষুণ্ণ রেখেও সাধারণ মানুষের হৃদয় জয় করেছে। এর ১২টি স্বরের পরিমিত ও প্রজ্ঞাময় ব্যবহার একজন স্বাধীন শিল্পীকে পরম সুরসৃষ্টির স্বাধীনতা প্রদান করে, যা খুব কম রাগের ক্ষেত্রে দেখা যায়।
দীর্ঘ শাস্ত্রীয় আসরের শেষে যখন শিল্পী সিন্ধু ভৈরবীর বিস্তার শুরু করেন, তখন তা কেবল সঙ্গীতের সমাপ্তি ঘটায় না; বরং উপস্থিত শ্রোতামণ্ডলীকে এক পরম আধ্যাত্মিক পূর্ণতা ও প্রশান্তির জগতে পৌঁছে দেয়। সরলতা, সুরের বৈচিত্র্য এবং রসের গভীরতাই এই রাগকে যুগ যুগ ধরে চিরপ্রবহমান ও কালজয়ী করে রেখেছে।
দক্ষিণেও এই রাগটির নাম সিন্ধু ভৈরবী। গঠনও কাছাকাছি। শুধু গায়কীর কারণে শুনতে একটু আলাদা লাগতে পারে।
আরোহ-আবরোহ এই লিঙ্ক গুলোতে গিয়ে শুনে নিতে পারেন ।
রাগ সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা পেতে খাজা খুরশিদ আনোয়ারের রাগমালার ট্র্যাকটি শুনতে পারেন:
ianring.com মিউজিক থিওরিতে তে সিন্ধু-ভৈরবী:
ওস্তাদ সালামত আলী খান মুলতানী কাফী গেয়েছেন সিন্ধু-ভৈরবী :
ওস্তাদ সালামত আলী খাঁ সাহেবের ছেলে শাফকাত সালামত আলী সিন্ধু-ভৈরবী দেখিয়েছেন :
সংশ্লিষ্ট বা রিলেটেড রাগসমূহ
- রাগ ভৈরবী: সিন্ধু ভৈরবীর মূল ভিত্তি; ভৈরবীতে শুদ্ধ স্বরের প্রয়োগ কম কিন্তু সিন্ধুতে বেশি।
- রাগ সিন্ধু: এই রাগের চপলতা ও স্বরবিন্যাস সিন্ধু ভৈরবীর পূর্বাঙ্গ গঠনে সাহায্য করে।
- রাগ মিশ্র ভৈরবী: সিন্ধু ভৈরবীর মতোই এতেও বারো স্বরের ব্যবহার থাকে, তবে বিন্যাস ভিন্ন।
- রাগ কাফি: সিন্ধু ভৈরবীর অবরোহে অনেক সময় কাফি রাগের ছায়া পরিলক্ষিত হয়।
- রাগ আসাভরী: ঠাটগত মিল থাকলেও আসাবরীতে গান্ধার ও নিষাদ বর্জিত হওয়ার প্রবণতা থাকে।
কাজী নজরুল ইসলামের সিন্ধু ভৈরবী:
নজরুলের অনেক গান রাগাশ্রয়ী। নির্দিষ্ট রাগের আশ্রয়ে যে গানগুলোতে সুর করা হয়েছে, সেগুলোর পুরো সুরে রাগের অবয়ব বজায় রাখার চেষ্টা থেকেছে; খুব বেশি রাগভ্রষ্ট হয়নি। তাই নজরুলের গানগুলো কান তৈরিতে বেশি উপযোগী বলে আমার কাছে মনে হয়।
১. পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তীর কণ্ঠে- যাহা কিছু মম
২. পুরবী দত্তের কণ্ঠে- সই ভাল করে বিনোদবেণী
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের সিন্ধু ভৈরবী:
কবিগুরু তার অনেক কম্পোজিশনে প্রচলিত রাগের আশ্রয় নিলেও অনেক সময় রাগের কাঠামোতে তিনি আটকে থাকতে চাননি। তাঁর সুরের পথ রাগের বাইরে চলে গেছে প্রায়শই। আমার কাঁচা কান যা বলে, তাতে বিশুদ্ধ রাগাশ্রয়ী গান হিসেবে তাঁর গান অনেক ক্ষেত্রেই খুব ভালো উদাহরণ নয়।
সরদ:
১.মাইহার ঘরানার খলিফা ওস্তাদ আলী আকবর খানের সরদে রাগ সিন্ধু-ভৈরবী ।
তথ্যসূত্র:
১. পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখণ্ডে — ‘হিন্দুস্তানি সংগীত পদ্ধতি’ (খণ্ড ২ ও ৪): মিশ্র রাগ ও ভৈরবী অঙ্গের বিশ্লেষণের জন্য।
২. বসন্ত — ‘সংগীত বিশারদ’ (সংগীত কার্যালয়, হাতরস): রাগের শাস্ত্রীয় নিয়ম ও বারো স্বরের ব্যবহার নিশ্চিতকরণের জন্য।
৩. বিমলকান্ত রায় চৌধুরী — ‘ভারতীয় সংগীতকোষ’: রাগের ঐতিহাসিক বিবর্তন ও সিন্ধু প্রদেশের সুরের প্রভাব সংক্রান্ত তথ্যের জন্য।
৪. সঙ্গীত রিসার্চ একাডেমী (SRA): রাগের সময়কাল এবং প্রামাণ্য গায়নশৈলী যাচাইয়ের জন্য।
৫. পণ্ডিত ওমকারনাথ ঠাকুর — ‘প্রণব ভারতী’: রাগের রসতাত্ত্বিক ও গায়নশৈলী সংক্রান্ত বিশ্লেষণের জন্য।

আও দেখুন:
