ইতিহাস ও রাজনীতি সিরিজ

ছফামনের ময়নাতদন্ত: প্রগতির মুখোশ, নাকি সাম্প্রদায়িকতার বুদ্ধিবৃত্তিক আধার । ইতিহাস ও রাজনীতি সিরিজ

আহমদ ছফা

বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিবৃত্তে আহমদ ছফা (১৯৪৩–২০০১) এক অনন্য প্রথারূপী চরিত্র হিসেবে পরিগণিত হয়ে আসছেন। দীর্ঘকাল ধরে সাহিত্যিক ও রাজনৈতিক প্রাঙ্গণে তাঁকে চিত্রায়িত করা হয়েছে প্রতিষ্ঠানবিরোধী এক ‘একাকী বিদ্রোহী’, আপসহীন মুক্তচিন্তক এবং শাসকশ্রেণির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকা নিঃসঙ্গ কণ্ঠস্বর হিসেবে। তাঁর ক্ষুরধার গদ্যের ভঙ্গি, প্রথাভাঙা জীবনযাপন এবং বুদ্ধিবৃত্তিক এস্টাবলিশমেন্টকে অকাতরে আক্রমণ করার চটকদার পপুলিজম তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশকে প্রলুব্ধ করেছে। কিন্তু প্রথাবদ্ধ এই উদযাপনের আড়াল সরিয়ে যদি তাঁর সামগ্রিক সাহিত্য, প্রবন্ধ ও চিন্তা-কাঠামোকে নিরপেক্ষ ঐতিহাসিক অনুবীক্ষণের নিচে আনা যায়, তবে এক চরম বিপরীত ও বিপজ্জনক বাস্তবতা সামনে উন্মোচিত হয়।

এই বিশ্লেষণী পাঠের মূল প্রতিপাদ্য কোনো ব্যক্তি-আক্রমণ নয়; বরং ‘ছফামন’ নামক এক নির্দিষ্ট বুদ্ধিবৃত্তিক ব্যবস্থার সামগ্রিক ময়নাতদন্ত। ‘ছফামন’ হলো এমন এক বৈচারিক কাঠামো, যা বাহ্যিকভাবে প্রগতিশীলতার পরিভাষা, প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা এবং বোহেমিয়ান বিদ্রোহী ভাবমূর্তিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে; কিন্তু ভেতরগতভাবে রাষ্ট্র, সমাজ, ইতিহাস, ভাষা ও সংস্কৃতিকে বিচার করে একমাত্র ‘ধর্মীয় পরিচয়’ এবং ‘সাম্প্রদায়িক স্বাতন্ত্র্যবাদে’র অক্ষের ওপর দাঁড় করিয়ে। প্রগতির চটকদার পোশাক পরে কীভাবে পরিচয়ভিত্তিক উগ্র ডানপন্থী রাজনীতির তাত্ত্বিক রসদ জোগানো যায়, ছফামন হলো স্বাধীনোত্তর বাংলাদেশের ভূখণ্ডে তার সবচেয়ে সংক্রামক ও সফল কারখানা।

একজন লেখকের রাজনৈতিক অবস্থান বিচার করার দুটি স্বতন্ত্র পাঠপদ্ধতি রয়েছে। প্রথমটি হলো তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্য বা সাময়িক চটকদার বিবৃতি; দ্বিতীয়টি হলো তাঁর সাহিত্য ও প্রবন্ধের অন্তর্নিহিত তাত্ত্বিক সিদ্ধান্ত এবং সামাজিক প্রভাব। আহমদ ছফা এই দ্বিতীয় পথে এক মারাত্মক দ্বান্দ্বিক ছলনার আশ্রয় নিয়েছেন। জীবনভর তিনি তীব্র প্রথা বিরোধী ও প্রাতিষ্ঠানিকতাবিরোধী গদ্য লিখেছেন। ‘বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস’ (১৯৭২)-এ তিনি তৎকালীন সেক্যুলার বুদ্ধিজীবী সমাজকে তোপ দেগেছিলেন, ‘গাভী বিত্তান্ত’ (১৯৯৫)-এ তিনি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমাজের নৈতিক অবক্ষয়কে বিদ্রূপ করেছিলেন। বুর্জোয়া সেক্যুলার বা প্রগতিশীল শিবিরের এই বস্তুগত ত্রুটিবিচ্যুতিকে আক্রমণ করার ক্ষমতাই সাধারণ পাঠকের কাছে তাঁকে এক ‘মহান প্রগতিশীল ও সত্যভাষী বুদ্ধিজীবী’র মর্যাদা দিয়েছিল।

কিন্তু মূল সংকটটি সূচিত হয় ঠিক এর পরেই। বুর্জোয়া প্রগতিশীলদের আক্রমণ করার অর্থই স্বতঃসিদ্ধভাবে অসাম্প্রদায়িক বা সাম্যবাদী রাজনীতি নির্মাণ করা নয়। আহমদ ছফা সেক্যুলার বুদ্ধিজীবীদের আক্রমণ করেছিলেন কোনো গভীর অসাম্প্রদায়িক বা বৈপ্লবিক মানবিকতার জায়গা থেকে নয়; বরং তিনি তাঁদের আক্রমণ করেছিলেন তাঁদের ‘মুসলিম জনমিতি ও ধর্মীয় অনুভূতির সাথে বিচ্ছিন্ন’ বলে চিহ্নিত করার জন্য। প্যারিসভিত্তিক সমাজতাত্ত্বিক ফ্রাঙ্কোইস বুর্গার তত্ত্বের আলোকেও দেখা যায়, আধুনিক সমাজে উগ্র পরিচয়বাদী রাজনীতির সবচেয়ে বড় অনুঘটক হন তাঁরাই, যাঁরা প্রগতির বৈপ্লবিক ব্যাকরণ ব্যবহার করে সমাজকে বৈষম্যহীন নাগরিক কাঠামোর দিকে না নিয়ে ‘প্রাচীন ধর্মীয় পরিচয়ে’র সংকীর্ণ বাক্সে ফেরত পাঠান। আহমদ ছফা ঠিক এই কাজটাই নিখুঁতভাবে সম্পাদন করেছিলেন। তিনি প্রগতিশীলতার চটকদার গদ্যকে ব্যবহার করেছিলেন এক ধরনের ট্রোজান হর্স হিসেবে, যার পেটের ভেতর বন্দী ছিল সুপ্রচ্ছদ পরিচয়ভিত্তিক ধর্মীয় প্রতিক্রিয়াশীলতা।

Table of Contents

‘বাঙালি মুসলমানের মন’: শ্রেণিচেতনার বিলোপ ও ধর্মীয় মনস্তত্ত্বের প্রতিষ্ঠা

আহমদ ছফার চিন্তায় ‘ধর্মীয় পরিচয়’ কীভাবে সকল সমাজ-বিশ্লেষণের প্রধান নিয়ামক হয়ে উঠেছিল, তার সবচেয়ে বড় প্রাতিষ্ঠানিক দলিল তাঁর বহুল পঠিত প্রবন্ধগ্রন্থ ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ (১৯৮১)। বহু দশক ধরে আমাদের সাহিত্যিক সমালোচকেরা দাবি করে এসেছেন যে, এই গ্রন্থে ছফা বাঙালি মুসলিম সমাজের আত্মপরিচয়ের সংকট ও গোঁড়ামির এক নির্মোহ ‘আত্মসমালোচনা’ হাজির করেছেন। কিন্তু সমাজতাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক অর্থনীতির দৃষ্টিভঙ্গি থেকে গভীরভাবে পাঠ করলে দেখা যায়, এই বহুল প্রশংসিত ‘আত্মসমালোচনা’র গায়ে জড়ানো রয়েছে একটি চরম প্রতিক্রিয়াশীল রাজনৈতিক চাদর।

ছফা এখানে সমাজকে ব্যবচ্ছেদ করেছেন কোনো মার্কসীয় বা ঐতিহাসিক বস্তুবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে নয়; বরং তিনি আশ্রয় নিয়েছেন একপ্রকার আদর্শবাদী জাদুটোনার। যেখানে শ্রেণি, জমিদারি প্রথা, উৎপাদন সম্পর্ক এবং ঔপনিবেশিক অর্থনীতির বস্তুগত প্রভাবকে গৌণ করে দিয়ে ‘ধর্মীয় অনুভূতি’ ও ‘পৃথক মনস্তাত্ত্বিক সত্তা’কে ইতিহাসের মূল চালিকাশক্তি বানানো হয়েছে।

প্রবন্ধের শুরুতেই ছফা এক অকাট্য সাধারণীকরণ দাঁড় করান। তিনি দাবি করেন, বাঙালি মুসলমানের মন বলে যদি সত্যি কিছু থেকে থাকে, তবে তার প্রধান লক্ষণ হলো তা কোনো কালেই এক জায়গায় স্থির হয়ে থাকেনি। একই গ্রন্থে তিনি বাঙালি মুসলিম মানসের অনগ্রসরতা ও দ্বিধা বিচার করতে গিয়ে শ্রেণিসংগ্রাম, অর্থনৈতিক উৎপাদনের সম্পর্ক কিংবা ঔপনিবেশিক ভূ-সম্পত্তি আইনকে দূরে ঠেলে দিয়ে ধর্মীয় অনুভূতিকে মুখ্য করে তোলেন। তাঁর মতে, আজকের বাঙালি মুসলমানের আত্মপরিচয়ের সংকটের মূলে রয়েছে তাঁর ইতিহাস সচেতনতার অভাব, এবং বাঙালি মুসলমান হিন্দু সমাজের পাশাপাশি বাস করে আসলেও হিন্দু সংস্কৃতি তাকে কখনো গ্রহণ করেনি।

এখানে ছফার যুক্তিধারাটি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। সমাজবিজ্ঞানের মৌলিক নিয়ম হলো, মানুষের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অস্তিত্বই তার সামাজিক চেতনাকে রূপ দান করে। ১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত থেকে শুরু করে ২০ শতকের প্রথম ভাগ পর্যন্ত বাংলায় যে সামাজিক মেরুকরণ ঘটেছিল, তার মূলে ছিল ঔপনিবেশিক ভূ-সম্পত্তি আইন এবং সামন্তীয় শোষণের বাস্তব কাঠামো। কৃষকের ওপর জমিদারের নিপীড়ন কিংবা সুদের কারবার—এগুলোর প্রধান পরিচয় ছিল ‘শ্রেণিগত’। পূর্ব বাংলার লাখ লাখ হিন্দু ও মুসলিম প্রজা একইভাবে এই বস্তুগত শোষণের শিকার হয়েছিল। কিন্তু ছফা ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ গ্রন্থে এই বস্তুধর্মী সমাজতত্ত্বকে একঝটকায় মুছে ফেলে ধর্মীয় মনস্তত্ত্বকে ইতিহাস নিয়ন্ত্রক হিসেবে খাড়া করেছেন। এর ফলে ঐতিহাসিক কার্যকারণ ও ফলাফলের সম্পর্কটি উল্টে গেছে।

বাঙালি মুসলিমের অনগ্রসরতা কেন ঘটেছিল? বস্তুবাদী সামাজিক ব্যাখ্যা বলে, আধুনিক শিক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক অভাব, প্রশাসনিক বৈষম্য, পুঁজির অপ্রতুলতা ও ঔপনিবেশিক ভূ-সম্পত্তি নীতি ছিল এর মূল কারণ। কিন্তু ছফা এই অর্থনৈতিক কারণগুলোকে আড়াল করে অনগ্রসরতার মূল ‘কারণ’ হিসেবে সাব্যস্ত করলেন ‘মনস্তাত্ত্বিক অবরুদ্ধতা’কে। অর্থাৎ, বস্তুগত ও সামাজিক বাস্তবতার ফসলকে তিনি বানিয়ে দিলেন অনগ্রসরতার আদি কারণ। এর পাশাপাশি ঘটে গেল শ্রেণিচেতনার চরম গুম। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে যে হিন্দু জমিদার ও মুসলিম বা নিম্নবর্ণের হিন্দু প্রজার সামাজিক সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল, তা ছিল অর্থনৈতিক শ্রেণিসংগ্রাম। ছফা সেই অর্থনৈতিক সম্পর্ককে রূপ দিলেন এক চিরন্তন ‘ধর্মীয় দ্বন্দ্বে’। এর ফলে জমিদারদের শ্রেণিশোষণ আড়াল পেয়ে গেল, আর প্রজা-কৃষক সমাজ শ্রেণিচেতনা হারিয়ে সচেতন হলো কেবল তাদের ‘মুসলিম পরিচয়’ নিয়ে।

‘বাঙালি মুসলমানের মন’ গ্রন্থে ছফা আরেকটি মারাত্মক সমাজতাত্ত্বিক অপরাধ করেছেন—তিনি ‘বাঙালি মুসলমান’ নামক এক স্থির, অপরিবর্তনশীল ও একক সত্তা কল্পনা করে নিয়েছেন। সমাজতাত্ত্বিক পরিভাষায় একে বলা হয় সত্তাভিত্তিক এসেনশিয়ালিজম। একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ভেতরে অঞ্চল, বর্ণ, অর্থনৈতিক অবস্থান ও শ্রেণির ভিত্তিতে হাজারো বিভাজন থাকে। ১৯ শতক ও ২০ শতকের সূচনায় বাঙালি মুসলিম সমাজ তীব্রভাবে বিভক্ত ছিল দুই ভাগে: একদিকে উর্দুভাষী সামন্ত অভিজাত ‘আশরাফ’ সম্প্রদায়, যারা সাধারণ বাঙালি মুসলিমকে ঘৃণা করত এবং বাংলায় কথা বলাকে অপাঙ্কক্তেয় মনে করত; অন্যদিকে বাংলাভাষী কৃষক, কারিগর ও মেহনতি মানুষের ‘আতরাফ’ সমাজ। ছফা তাঁর বিশ্লেষণে এই অভ্যন্তরীণ শ্রেণীগত শোষণ ও আশরাফদের প্রতিক্রিয়াশীল ভূমিকার বিরুদ্ধে সোচ্চার না হয়ে, সকল স্তরকে মিলিয়ে-মিশিয়ে ‘বাঙালি মুসলমানের মানস’ নামক এক কাল্পনিক পাত্রে ঢেলে দিয়েছেন।

তিনি যখন দাবি করেন যে এই সমাজটি মূলত একটি বিশাল কৃষক সমাজ এবং তার মানস কাঠামোটি গঠিত হয়েছে ধর্মীয় সংস্কারের সংমিশ্রণে, তখন তিনি একটি গোটা বৈচিত্র্যময় জনসংখ্যাকে কেবল ‘ধর্মীয় রূপকথায় বিশ্বাসী কৃষক মানস’ হিসেবে দাগিয়ে দেন। এর মাধ্যমে তিনি তাদের ভেতরের অভ্যন্তরীণ শ্রেণি সংগ্রামকে ধূলিসাৎ করে দিয়েছেন এবং উচ্চবিত্ত মুসলিম শোষকদের পাপকে ঢাকা দিয়েছেন এক অখণ্ড ধর্মীয় পরিচয়ের নিচে।

অনগ্রসরতার একপেশে ব্যাখ্যা ও শোষকের শ্রেণি-পরিচয় লোপ

১৯ শতক ও ২০ শতকের প্রথমার্ধে বাঙালি মুসলিম সমাজের ঐতিহাসিক পিছিয়ে পড়া কোনো অকাট্য রহস্য ছিল না। অর্থনীতি ও সমাজবিজ্ঞানের যেকোনো নিরপেক্ষ গবেষক স্বীকার করবেন যে, এই অনগ্রসরতার নেপথ্যে কাজ করেছিল ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ নীতি, ১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের জমিদারি প্রথা, দেশীয় কুটির শিল্প ধ্বংসের ফলে কৃষির ওপর অতিরিক্ত চাপ, এবং সবচেয়ে আশঙ্কাজনকভাবে, মুসলিম সমাজের অভ্যন্তরীণ চরম ধর্মীয় গোঁড়ামি, মোল্লাতন্ত্র, ফতোয়াবাজি ও নারী-পীড়ন।

কিন্তু আহমদ ছফা তাঁর সামাজিক ও সাহিত্যিক প্রবন্ধাবলীতে অনগ্রসরতার এই জটিল, বহুমাত্রিক ও কাঠামোগত বাস্তবতাকে পরিকল্পিতভাবে ঢেকে দিয়েছেন। তিনি অনগ্রসরতার মূল কারণ হিসেবে সামন্তীয় উৎপাদন সম্পর্ক বা অভ্যন্তরীণ সামাজিক অন্ধকারের বিচার করেননি; বরং সমস্ত দায় একপেশেভাবে চাপিয়ে দিয়েছেন একটি বাহ্যিক পরিমণ্ডলের ওপর—অর্থাৎ ‘হিন্দু সমাজের আধিপত্য ও বর্জননীতি’র ওপর। নিজের সমাজের অভ্যন্তরীণ অন্ধকারের মুখোমুখি না হয়ে সকল সামাজিক ব্যর্থতার দায় ‘অন্য সম্প্রদায়ের’ ওপর চাপানোর যে প্রতিক্রিয়াশীল কৌশল, ছফা তাকে প্রগতিশীল গদ্যের মোড়কে বুদ্ধিবৃত্তিক বৈধতা দিয়েছেন।

ঐতিহাসিক বিচারে দেখা যায়, ১৮২৮ সালের পর থেকে কোম্পানি সরকার মুসলিম সামন্ত ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের নিষ্কর জমি বা লাখেরাজ ব্যাপকভাবে বাজেয়াপ্ত করে, যা তৎকালীন অর্থনৈতিক ব্যাকবোন ভেঙে দিয়েছিল। একই সাথে উর্দুভাষী আশরাফ সমাজ বাংলাভাষী সাধারণ মুসলিমকে প্রমিত বাংলায় শিক্ষা গ্রহণে বাধা দিত, আর স্থানীয় মোল্লা সমাজ আধুনিক ইংরেজি শিক্ষা ও বিজ্ঞানচর্চাকে ‘কাফেরী’ বলে ফতোয়া দিয়ে সাধারণ মানুষকে শতাব্দীকাল অন্ধকারে বন্দী করে রেখেছিল। কিন্তু ছফা যখন এই অনগ্রসরতার ব্যবচ্ছেদ করতে বসেন, তখন এই মূল কারণগুলো তাঁর কলমে গৌণ হয়ে যায়। তিনি প্রধান আসামি বানিয়ে তোলেন ‘হিন্দু শিক্ষিত মধ্যবিত্ত’কে।

ব্রিটিশ সরকার যখন ‘ভাগ করো ও শাসন করো’ নীতি চালাচ্ছে, আশরাফ মুসলিম জমিদাররা যখন পূর্ব বাংলার প্রজার রক্ত চুষছে, আর স্থানীয় মোল্লারা যখন স্কুলে যাওয়া শিশুকে ভয় দেখাচ্ছে—ছফা তখন কাঠগড়ায় দাঁড় করাচ্ছেন প্রতিবেশী সম্প্রদায়কে। এটি নিরপেক্ষ ঐতিহাসিক অনুসন্ধান নয়; এটি হলো শোষকের প্রকৃত পরিচয় ঢেকে দিয়ে কৃত্রিম সম্প্রদায়গত ক্ষোভ তৈরি করার চক্রান্ত।

যেকোনো খাঁটি সামাজিক সংস্কারকের প্রধান কাজ হলো নিজের সমাজের অভ্যন্তরীণ গলদগুলো আক্রমণ করা। রাজা রামমোহন রায় থেকে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর হিন্দু সমাজের অভ্যন্তরীণ জাতপাত, সতীদাহ ও বহুবিবাহের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন বলেই সে সমাজে আধুনিকতার সূচনা হয়েছিল। মুসলিম সমাজেও বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন কিংবা কাজী আবদুল ওদুদ ও ‘বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন’-এর ভাবুকেরা একই কাজ করার চেষ্টা করেছিলেন। বেগম রোকেয়া পরিষ্কার ভাষায় মুসলিম সমাজের ভেতরের অবরোধপ্রথা ও ধর্মীয় ভণ্ডামিকে আক্রমণ করে লিখেছিলেন যে, এই অধঃপতনের জন্য আমরা নিজেরাই দায়ী।

কিন্তু ছফার হাতে এসে এই ধারালো আত্মসমালোচনার ধারাটি পুরোপুরি ভেস্তে যায়। ছফা বেগম রোকেয়া বা আবদুল ওদুদের সেই প্রগতিশীল ঐতিহ্যকে স্তব্ধ করে দেন। তিনি মুসলিম সমাজের চরম প্রতিক্রিয়াশীল উপাদানগুলোকে ‘অন্য সম্প্রদায়ের আধিপত্যের বিরুদ্ধে স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া’ বলে সাফাই গেয়েছেন। ছফার যুক্তি অনুযায়ী, মোল্লারা যে আধুনিক শিক্ষাকে অবরুদ্ধ করেছিল, তা নাকি মোল্লাদের দোষ নয়—তা নাকি হিন্দু সংস্কৃতির আক্রমণের প্রতিক্রিয়া; আর নারীদের যে ঘরে বন্দী রাখা হয়েছিল, তা নাকি নিজেদের ধর্মীয় সত্তা বাঁচানোর আকুল চেষ্টা! প্রগতির পোশাক পরে আশরাফ শোষক ও ধর্মীয় প্রতিক্রিয়াশীলদের এমন সুসূক্ষ্ম নৈতিক দায়মুক্তি দেওয়ার কৌশল বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসে বিরল।

অনগ্রসরতার বিচারে ছফার সবচেয়ে বড় দেউলিয়াত্ব প্রকাশ পায় সামন্তীয় জমিদারি প্রথা বিশ্লেষণে। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে যে জমিদারি ব্যবস্থা কায়েম হয়েছিল, সেখানে জমিদারের অর্থনৈতিক শ্রেণিচাপ প্রজার ওপর পড়েছিল। প্রজারা হিন্দু হোক বা মুসলিম, খাজনা আদায়ের চাবুক সবার পিঠেই সমানভাবে পড়ত। পাবনা কৃষক বিদ্রোহ (১৮৭৩) কিংবা তিতুমীরের যুদ্ধের প্রজা-কৃষকের যৌথ অংশগ্রহণ তার ঐতিহাসিক প্রমাণ। কিন্তু ছফা কৃষক সমাজের এই যৌথ শোষণের অর্থনৈতিক সত্যকে ঢেকে দিয়েছেন। তিনি শোষকের শ্রেণি-পরিচয় মুছে দিয়ে কেবল তার ধর্মীয় পরিচয়কে প্রধান করে তুলেছেন। ছফার বিশ্লেষণে সমস্যাটি ‘সামন্তীয় জমিদারি প্রথা’ ছিল না; সমস্যা ছিল ‘জমিদারদের হিন্দু পরিচয়’।

এর ফলে খাজা সলিমুল্লাহ বা ঢাকার নওয়াব পরিবার কীভাবে পূর্ব বাংলার কৃষক সমাজকে শিক্ষা ও রাজনৈতিক চেতনা থেকে বঞ্চিত রেখে নিজেদের পারিবারিক সাম্রাজ্য গুছিয়েছিল, তা ছফার কলমে ঢাকা পড়ে যায়। একই সাথে সাধারণ মুসলিম কৃষকের দারিদ্র্য ও অশিক্ষার জন্য ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক নীতি ও সামন্ত কাঠামোর বিরুদ্ধে আন্দোলন না করে, ছফা সেই ক্ষোভকে ঘুরিয়ে দিলেন সাধারণ হিন্দু সমাজের দিকে। যখন কোনো চিন্তক একটি জনগোষ্ঠীকে শেখান যে, তাদের সকল দুঃখ ও অনগ্রসরতার জন্য তারা নিজেরা দায়ী নয়, বরং দায়ী অন্য একটি সম্প্রদায় বা বাইরের কোনো চক্রান্ত—তখন সেই জনগোষ্ঠীর মধ্যে আত্মসংস্কারের আর কোনো তাগিদ থাকে না। ছফা বাঙালি মুসলিমকে আত্মসমালোচনার আয়নার সামনে দাঁড় করাননি; বরং তাদের হাতে একটি অভিযোগপত্র তুলে দিয়েছেন।

স্থায়ী ‘ভিকটিমহুড’ ও ক্ষোভের সমাজমনস্তত্ত্ব (Ressentiment)

রাজনীতি ও সমাজবিজ্ঞানের একটি মৌলিক বিভাজনরেখা হলো ‘ঐতিহাসিক বঞ্চনা’ (Historical Deprivation) এবং ‘স্থায়ী ভিকটিমহুড’ (Permanent Victimhood Identity)-এর মধ্যকার পার্থক্য। কোনো জনগোষ্ঠীর ইতিহাসের একটি নির্দিষ্ট পর্বে অর্থনৈতিক, সামাজিক বা রাজনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া একটি ঐতিহাসিক বাস্তবতা, যা বস্তুনিষ্ঠ সাম্যভিত্তিক রাজনৈতিক লড়াই, ভূমি সংস্কার, শিক্ষার বিস্তার ও নাগরিক অধিকার অর্জনের মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব। কিন্তু সেই নির্দিষ্ট মেয়াদের ঐতিহাসিক বঞ্চনাকে যখন কোনো চিন্তক একটি জনগোষ্ঠীর চিরন্তন মনস্তাত্ত্বিক পরিচয় বা অস্তিত্বের একমাত্র সংজ্ঞায় রূপান্তর করেন, তখন তা আর প্রগতিশীল রাজনীতি থাকে না; তা পরিণত হয় উগ্র পরিচয়বাদ ও ক্ষোভের রাজনীতিতে।

আহমদ ছফা তাঁর প্রবন্ধাবলী ও চিন্তাকাঠামোতে এই কাজটাই অত্যন্ত নিখুঁতভাবে সম্পাদন করেছেন। তিনি ১৯ শতকের বাঙালি মুসলিম সমাজের ঐতিহাসিক অনগ্রসরতাকে প্রগতিশীল সামাজিক সাম্যের দিকে পরিচালিত না করে তাকে একটি ‘চিরস্থায়ী ভুক্তভোগী মানস’-এ উন্নীত করেছেন। ছফার ভাষ্যে বাঙালি মুসলিম কেবলই এক অসহায় শিকার, যার নিজস্ব কোনো সামাজিক ভুল, অভ্যন্তরীণ গোঁড়ামি বা আশরাফ শোষকদের চক্রান্ত ছিল না; তার যা কিছু দুর্দশা, তা কেবল অন্য সম্প্রদায়ের শোষণের কারণে। বঞ্চনাকে আন্দোলনের মাধ্যমে অতিক্রম করার বদলে ছফা একে একটি আত্মপরিচয়ের প্রতীক বানিয়ে দিয়েছেন। ফলে ভুক্তভোগী হওয়াটাই যেন বাঙালি মুসলিমের একমাত্র ঐতিহাসিক পরিচয় হয়ে দাঁড়ায়।

জার্মান দার্শনিক ফ্রিডরিশ নিচে ও সমাজবিজ্ঞানী মাক্স শেলারের তত্ত্বে Ressentiment (রেসোঁতিমা) ধারণার উল্লেখ পাওয়া যায়। এটি হলো এমন এক মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা, যেখানে কোনো নিগৃহীত বা পিছিয়ে পড়া গোষ্ঠী নিজেদের সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্বলতাকে কাঠামোগত সাধনার মাধ্যমে কাটিয়ে ওঠার বদলে, পরম সামাজিক ঈর্ষা, ক্ষোভ ও প্রতিশোধপ্রবণতাকে তাদের নৈতিক শ্রেষ্ঠত্বের ভিত্তি বানিয়ে নেয়। ছফামন হলো এই Ressentiment-এর সবচেয়ে বড় বুদ্ধিবৃত্তিক কারখানা। ছফা বাঙালি মুসলিমকে আত্মসংস্কার, বিজ্ঞানচর্চা, নারীমুক্তি বা আধুনিক চিন্তায় বলীয়ান হওয়ার আহ্বান জানাননি; তিনি তাদের মনে পুঞ্জীভূত ক্ষোভকে উসকে দিয়েছেন। তিনি বোঝাতে চেয়েছেন যে, বাঙালি মুসলিমের যে দৈন্য বা কূপমণ্ডূকতা—তা তার নিজস্ব সৃষ্ট নয়, তা হলো উচ্চবর্ণের হিন্দু সমাজের অবজ্ঞার প্রতিক্রিয়ামাত্র।

এই মন্তব্যের মধ্য দিয়ে ছফা দুটি ক্ষতিকর কাজ করেছেন: প্রথমত, তিনি বাঙালি মুসলিমকে শিখিয়েছেন যে নিজের ভেতরের ধর্মান্ধতা বা অবক্ষয় নিয়ে বিন্দুমাত্র লজ্জিত হওয়ার প্রয়োজন নেই, কারণ এর দায় অন্যের; দ্বিতীয়ত, তিনি আত্মোন্নয়নের বদলে বাহ্যিক প্রতিপক্ষের প্রতি ঘৃণাকে প্রগতির রূপ পরিয়ে দিয়েছেন।

গঠনমূলক আধুনিক রাজনীতি পরিচালিত হয় নাগরিক অধিকার, সাম্য ও সেক্যুলার আইনের ওপর ভিত্তি করে, যেখানে প্রতিটি নাগরিক রাষ্ট্রে সমান অধিকার দাবি করে। কিন্তু ‘ভিকটিমহুড কার্ড’-এর ওপর দাঁড়িয়ে যে রাজনীতি গড়ে ওঠে, তার মূল লক্ষ্য সাম্য নয়; তার মূল লক্ষ্য হলো প্রতিশোধ (Retribution)। ছফা তাঁর রাজনৈতিক নিবন্ধগুলোতে বহুবার ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদী রাজনীতিকে আক্রমণ করেছেন, কারণ সেই রাজনীতি সাম্য ও নাগরিক পরিচয়ের কথা বলে। ছফার দর্শনে এই বার্তা সুপ্রচ্ছন্ন ছিল যে, যেহেতু অতীতে বাঙালি মুসলিমরা বঞ্চিত হয়েছে, তাই এখন সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে রাষ্ট্র ও সংস্কৃতিতে তাদের একক প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করাই হলো প্রকৃত ঐতিহাসিক ন্যায়বিচার। এর ফলে মানুষ ‘রাষ্ট্রের সমান নাগরিক’ হওয়ার বদলে কেবল ‘ঐতিহাসিকভাবে নির্যাতিত ধর্মীয় সম্প্রদায়ের সদস্য’ হিসেবে নিজেকে দেখতে শুরু করে।

পৃথিবীর ইতিহাসের প্রতিটি প্রতিক্রিয়াশীল ও ফ্যাসিবাদী প্রবাহের মূল অস্ত্র হলো এই ভিকটিমহুড ন্যারেটিভ। হিটলার যেমন জার্মানদের বুঝিয়েছিলেন যে তারা মিত্রশক্তির চক্রান্তের ভুক্তভোগী, কিংবা ভারতের উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা যেমন দাবি করে তারা হাজার বছরের শাসনের ভুক্তভোগী—ঠিক একইভাবে বাংলাদেশে উগ্র ডানপন্থী ও মৌলবাদী রাজনীতির প্রধান জ্বালানি হলো ছফার তৈরি করা এই ‘বাঙালি মুসলিমের চিরস্থায়ী বঞ্চনার বয়ান’। ছফা ক্ষোভকে নীতিগত রূপ দিয়েছেন, ঈর্ষাকে প্রগতির পোশাক পরিয়েছেন এবং উগ্র গরিষ্ঠতাবাদী রাজনীতিকে সাম্যবাদের বিকল্প হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন।

বঙ্গীয় রেনেসাঁ ও আধুনিকতার পথিকৃৎদের সাম্প্রদায়িকীকরণ

উনিশ শতকের বঙ্গীয় রেনেসাঁ বা নবজাগরণ ছিল বাংলা সাহিত্য, জ্ঞানচর্চা, বিচারবুদ্ধি ও সামাজিক সংস্কারের এক অভূতপূর্ব ঐতিহাসিক মোড়। ইউরোপীয় আলোকায়নের (Enlightenment) প্রভাবে রামমোহন রায়, হেনরি ডিরোজিও ও ইয়াং বেঙ্গল গোষ্ঠী, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, অক্ষয়কুমার দত্ত থেকে শুরু করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মাধ্যমে যে প্রাতিষ্ঠানিক ও চিন্তাগত রূপান্তর ঘটেছিল, তার অনেক বস্তুগত সীমাবদ্ধতা ছিল। ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ কাঠামোর অধীনে ঘটা এই নবজাগরণ ছিল মূলত নগরকেন্দ্রিক, ঔপনিবেশিক শাসনের অনুগত এবং নবগঠিত হিন্দু মধ্যবিত্ত শ্রেণির স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত।

সুশোভন সরকার, সুমিত সরকার, বিনয় ঘোষ বা রণজিৎ গুহের মতো প্রখ্যাত সেক্যুলার ও মার্কসবাদী ইতিহাসবিদরা বহু আগেই বঙ্গীয় রেনেসাঁর এই শ্রেণিগত ও কলোনিয়াল সীমাবদ্ধতাকে অত্যন্ত বস্তুনিষ্ঠভাবে চিহ্নিত করেছেন। কিন্তু আহমদ ছফা যখন বঙ্গীয় রেনেসাঁর বিচার করতে যান, তখন তাঁর উদ্দেশ্য রেনেসাঁর শ্রেণিগত বা ঔপনিবেশিক সীমার প্রগতিশীল রূপান্তর উন্মোচন করা ছিল না। ছফা পুরো বঙ্গীয় রেনেসাঁকে চিহ্নিত করেছেন এক চরম ‘বর্ণহিন্দু চক্রান্ত’ এবং মুসলিম সমাজকে অবদমিত রাখার পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র হিসেবে। রেনেসাঁর আধুনিকতা ও সেক্যুলার মূল্যবোধকে কেবল ‘হিন্দুদের বিষয়’ আখ্যা দিয়ে বর্জন করার রাজনৈতিক ছলে ছফা কার্যত মুসলিম সমাজকে আধুনিক বিজ্ঞানচর্চা, যুক্তিবাদ ও সেক্যুলার মূল্যবোধ থেকেই বহুদূরে ঠেলে দিয়েছেন।

একটি ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার সীমানা চিহ্নিত করা এবং তাকে ঢালাওভাবে একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ষড়যন্ত্র বলে উড়িয়ে দেওয়ার মধ্যে মৌলিক তফাত রয়েছে। মার্কসবাদী ইতিহাসচর্চায় দেখানো হয়েছে কীভাবে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সুবিধাভোগী নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণি ঔপনিবেশিক শাসনকে মেনে নিয়েছিল এবং গ্রামীণ কৃষক সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল। এই সমালোচনার লক্ষ্য ছিল রেনেসাঁকে বর্জন করা নয়; বরং তার সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে অসাম্প্রদায়িক ও শ্রমজীবী মানুষের মুক্তির পথ তৈরি করা। কিন্তু ছফা ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ ও ‘বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস’ গ্রন্থে রেনেসাঁর শ্রেণিগত সমালোচনাকে গায়েব করে তাকে রূপ দিয়েছেন ধর্মীয় শত্রুতার আখ্যান হিসেবে। তিনি দাবি করলেন যে, কলকাতার রেনেসাঁ ছিল কেবল বর্ণহিন্দু সমাজের একমুখী বিকাশ, যা বাঙালি মুসলিমকে সাংস্কৃতিক দাসত্বের দিকে ঠেলে দিয়েছে। এই যুক্তির মাধ্যমে তিনি পুরো আধুনিক সামাজিক রূপান্তরকে কেবল ‘বর্ণহিন্দুদের নিজস্ব এজেন্ডা’ বলে দাগিয়ে দিলেন।

বঙ্গীয় রেনেসাঁর কেন্দ্রপুরুষেরা যুদ্ধ করেছিলেন তৎকালীন সামন্তীয় ও ধর্মীয় অন্ধকারের বিরুদ্ধে। রামমোহন রায় সতীতাহ প্রথার বিরুদ্ধাচরণ ও একেশ্বরবাদী চিন্তার প্রবর্তন করেছিলেন; ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর কুসংস্কার, বহুবিবাহ ও নারী-পীড়নের বিরুদ্ধে লড়ে বিদ্যাপীঠ নির্মাণ ও প্রমিত বাংলা গদ্যের ভিত্তি তৈরি করেছিলেন; ডিরোজিও ও তাঁর শিষ্যরা ধর্মীয় গোঁড়ামির মুখে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন সর্বপ্রকার কুসংস্কারের বিরুদ্ধে। তাঁদের এই সংস্কারগুলো কেবল হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের জন্য ছিল না; তা ছিল বাংলায় সার্বজনীন আধুনিকতার প্রথম স্ফুলিঙ্গ। কিন্তু ছফীয় তাত্ত্বিক ফিল্টারের ভেতর দিয়ে গেলে এই আন্দোলনগুলো তাদের সার্বজনীন মানবিক গুরুত্ব হারিয়ে ফেলে। ছফা এমন এক পরিবেশ তৈরি করেছেন যেন বিদ্যাসাগর বা রামমোহনের সংস্কারগুলো ছিল কেবল বর্ণহিন্দুদের গোষ্ঠীগত বিষয়, তাই মুসলিম সমাজের জন্য তার কোনো সর্বজনীন শিক্ষা নেই।

এখানে ছফার ইতিহাসপাঠের চরম অসাধুতা ফুটে ওঠে। বিদ্যাসাগর বা রামমোহনের যুগে মুসলিম সমাজের সামাজিক ও ধর্মীয় নেতৃত্ব ছিল চরম প্রতিক্রিয়াশীল উর্দুপন্থী আশরাফ ও ওয়াহাবি-ফরায়েজি আন্দোলনের নেতাদের হাতে। তাঁরা আধুনিক বিজ্ঞান, প্রমিত বাংলা সাহিত্য ও আধুনিক শিক্ষাকে কাফেরী ও ইসলামবিনাশী মনে করে সাধারণ মুসলিমদের স্কুল-কলেজ থেকে দূরে রেখেছিলেন। বিদ্যাসাগররা মুসলিম সমাজকে বর্জন করেননি; বরং মুসলিম সমাজের নিজস্ব প্রতিক্রিয়াশীল নেতৃত্বই সে সময় আধুনিকতার দুয়ারে তালা ঝুলিয়েছিল। কিন্তু ছফা রামমোহন বা বিদ্যাসাগরকে কেবল ‘হিন্দুদের নেতা’ বানিয়ে দিয়ে মুসলিম সমাজকে এই বার্তা দিয়েছেন যে, বিদ্যাসাগরের যুক্তিবাদ, বিজ্ঞানচেতনা বা ডিরোজিওর মুক্তচিন্তা থেকে আমাদের শেখার কিছু নেই, কারণ এগুলো আমাদের ধর্মীয় ঐতিহ্যের অংশ নয়।

একটি সম্প্রদায়কে যখন শেখানো হয় যে—বিজ্ঞান, যুক্তি ও আধুনিক সাহিত্যচর্চার ঐতিহাসিক কেন্দ্রটি অন্য সম্প্রদায়ের তৈরি চক্রান্ত, তখন সেই সম্প্রদায় আধুনিকতার মুখোমুখি হওয়ার সাহস হারায়। তারা আধুনিক জ্ঞান অর্জন করার বদলে নিজেদের মধ্যযুগীয় ধর্মীয় গোঁড়ামি ও পুঁথিসাহিত্যের খোলের ভেতর আশ্রয় নেওয়াকেই পরম কাজ মনে করতে শুরু করে। ছফা নিজেও এই বিচ্ছিন্নতাকে সমর্থন জানিয়েছেন এবং দাবি করেছেন যে, বাঙালি মুসলিমরা আধুনিক রেনেসাঁর ধারা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে যে পৃথক ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক খোলে আত্মগোপন করেছিল, তা নাকি তাদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য অনিবার্য ছিল। এর মাধ্যমে ছফা আধুনিক সেক্যুলার শিক্ষা বর্জন করে উগ্র ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্যবাদের দিকে হাঁটার প্রতিক্রিয়াশীল পথটিকে বুদ্ধিবৃত্তিক সাফাই দান করেছেন।

শোষণে ঢালাও সাম্প্রদায়িকীকরণ ও যৌথ আন্দোলন বিলোপের প্রচেষ্টা

সমাজবিজ্ঞান ও রাজনৈতিক অর্থনীতিতে সবচেয়ে বিপজ্জনক বুদ্ধিবৃত্তিক বিচ্যুতি ঘটে তখনই, যখন শোষক ও শোষিতের বস্তুগত পরিচয় বিচারে ‘শ্রেণি’ (Class) ক্যাটাগরিকে সরিয়ে সেখানে ‘সম্প্রদায়’ (Community) ক্যাটাগরিকে প্রতিস্থাপন করা হয়। সেক্যুলার ইতিহাসপাঠের মূল ভিত্তি হলো—উৎপাদন সম্পর্ক ও ভূ-সম্পত্তি ব্যবস্থার কাঠামোর কারণে সমাজ বিভাজিত হয় শোষক ও শোষিত শ্রেণিতে। সামন্তবাদে এই বিভাজন ছিল ‘জমিদার/জোতদার বনাম প্রজা/কৃষক’; আর পুঁজিবাদে তা ‘পুঁজিবতি বনাম শ্রমিক’। সেখানে শোষকের কোনো ধর্ম থাকে না; শোষকের একমাত্র ধর্ম হলো তার শ্রেণিস্বার্থ।

আহমদ ছফা তাঁর ইতিহাসচর্চায় অত্যন্ত সূক্ষ্ম চাতুরির আশ্রয় নিয়েছেন। উনিশ ও বিশ শতকের বাংলায় ব্রিটিশদের তৈরি চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সুযোগ নিয়ে গড়ে ওঠা ঔপনিবেশিক ‘হিন্দু মধ্যবিত্ত’, ‘জমিদার’ বা ‘জোতদার’ শ্রেণির রূপাত্মক অর্থনৈতিক শোষণকে বিশ্লেষণ করার নামে, ছফা ধীরে ধীরে সেই শোষণের দায় ঢালাওভাবে পুরো ‘হিন্দু সমাজ’-এর ওপর চাপিয়ে দিয়েছেন। ১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে পূর্ব বাংলায় যেসব ভূস্বামী গড়ে উঠেছিল, তাদের একটি বড় অংশ হিন্দু মধ্যবিত্তের অন্তর্ভুক্ত হলেও, তা ছিল সমাজবিজ্ঞানের একটি আংশিক সত্য। পূর্ণাঙ্গ সত্যটি হলো, পূর্ব বাংলার মোট হিন্দু জনসংখ্যার দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি ছিল নমশূদ্র, রাজবংশী ও নিম্নবর্ণের দরিদ্র মানুষ। তারা কিন্তু জমিদার ছিল না; তারা ছিল মুসলিম কৃষকদের মতোই ভূমিহীন প্রজা, ভাগচাষী ও মারাত্মক শোষণের শিকার। অন্যদিকে ঢাকা ও বগুড়ার নওয়াব পরিবার, কিংবা শায়েস্তাবাদের মুসলিম জমিদাররা একইভাবে সাধারণ মুসলিম ও হিন্দু কৃষকদের ওপর নির্মম চাবুক চালাত এবং ব্রিটিশ রাজের আনুগত্য করত।

কিন্তু ছফার তাত্ত্বিক ফ্রেমের ভেতর দিয়ে গেলে এই জটিল শ্রেণিগত কাঠামোটি অদৃশ্য হয়ে যায়। ছফা শোষকের শ্রেণি-পরিচয়কে মুছে দিয়ে শোষককে সংজ্ঞায়িত করেন তার ধর্মীয় পরিচয় দিয়ে। তিনি দাবি করেন, হিন্দু সমাজ সামগ্রিকভাবে বাঙালি মুসলমানকে কোনোদিন আপন বলে গ্রহণ করেনি এবং হিন্দু মধ্যবিত্ত তার আধিপত্য রক্ষার জন্য মুসলমান সম্প্রদায়কে শোষণের পাত্র হিসেবেই মনে করে এসেছে। ফলে শোষিত মুসলমানের কাছে হিন্দু পরিচয়টিই হয়ে উঠেছিল শোষকের প্রতিশব্দ।

এখানে ছফা শুরু করেন ‘হিন্দু মধ্যবিত্ত’ বা ‘জমিদার’ শ্রেণি দিয়ে, কিন্তু শেষ করেন পুরো ‘হিন্দু সমাজ’কে অভিযুক্ত করে। একজন নমশূদ্র ভূমিহীন কৃষকের দারিদ্র্য ও নিগ্রহকে ছফা একঝটকায় মুছে দিয়ে তাকেও বানিয়ে দিলেন মুসলিম প্রজার শোষক! এই ঢালাও সাম্প্রদায়িকীকরণের ফলে এটি প্রতিষ্ঠিত করা হলো যেন কোনো সাধারণ হিন্দু প্রজা কখনোই মুসলিম প্রজার ভাই বা সহযোদ্ধা হতে পারে না; কারণ হিন্দু মাত্রই বংশগতভাবে শোষক এবং মুসলিম মাত্রই জন্মগতভাবে শোষিত।

ছফার এই সাম্প্রদায়িক ইতিহাসপাঠের সবচেয়ে বড় শিকার হয়েছে বাংলায় গড়ে ওঠা ঐতিহাসিক যৌথ শ্রেণিসংগ্রামের ইতিবৃত্ত। ১৮৭৩ সালের পাবনা কৃষক বিদ্রোহে ঈশানচন্দ্র রায়ের পাশাপাশি শম্ভু পাল ও খুদি মোল্লা যৌথভাবে হিন্দু-মুসলিম জমিদারের অন্যায্য খাজনার বিরুদ্ধে লড়েছিলেন। ১৯৪৬–৪৭ সালের তেভাগা আন্দোলন ও ১৯৪৯–৫০ সালের নাচোল বিদ্রোহে ইলা মিত্রের নেতৃত্বে সাঁওতাল ও মুসলিম কৃষকেরা একজোটে জোতদার শোষণের বিরুদ্ধে দাঁড়ান। ছফা তাঁর লেখায় কৃষক আন্দোলনের এই আন্তঃসাম্প্রদায়িক ঐক্য ও লাল পতাকাতলে হিন্দু-মুসলিম কৃষকের একাত্মতাকে পুরোপুরি চেপে গেছেন। তিনি এমন একটি ইতিহাস বয়ান তৈরি করেন, যাতে মনে হয় বাঙালি মুসলিমের সমস্ত সামাজিক লড়াই ছিল কেবল ‘হিন্দুদের বিরুদ্ধে লড়াই’।

তিনি বামপন্থীদের আক্রমণ করতে গিয়ে দাবি করেন, বাংলায় বামপন্থীরা যে শ্রেণিসংগ্রামের কথা বলেছেন, তা ছিল একধরনের অলীক বিলাসিতা; কারণ তারা বাঙালি মুসলমানের প্রকৃত সামাজিক ক্ষোভকে বুঝতে পারেনি—যা ছিল মূলত বর্ণহিন্দু আধিপত্যের বিরুদ্ধে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যের লড়াই। এইভাবে ছফা কৃষকের পেটের ক্ষোভ, ভূমির দাবি ও শ্রেণিসংগ্রামকে লঘুপাত করে তাকে এক উগ্র ধর্মীয় ক্ষোভে পরিণত করেছেন।

যখন কোনো চিন্তক একটি রাষ্ট্রের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীকে শেখান যে, প্রতিবেশী সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সাধারণ মানুষও মূলত ঐতিহাসিক শোষক শ্রেণির অংশ, তখন সেই সমাজে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ও ভূমি দখলের নৈতিক বৈধতা তৈরি হয়। ছফার এই ‘হিন্দু সমাজ মানেই শোষক’ তাত্ত্বিক কাঠামোর রাজনৈতিক পরিণতি ছিল সুদূরপ্রসারী। প্রথমত, সাধারণ মুসলিম কৃষককে বোঝানো হলো যে, তাদের দারিদ্র্যের জন্য মুসলিম নওয়াব বা উদীয়মান মুসলিম বুর্জোয়া শ্রেণি দায়ী নয়; দায়ী হলো পাশের বাড়ির হিন্দু শিক্ষক বা ছোট ব্যবসায়ী। এর ফলে মুসলিম সমাজের ভেতরের শ্রেণি-শোষণ অলক্ষিত থেকে গেল। দ্বিতীয়ত, ১৯৬৫ সালের পাকিস্তান সরকারের কুখ্যাত ‘শত্রু সম্পত্তি আইন’ (Vested Property Act) এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের জমি ও ভিটেমাটি দখলের যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তার পেছনে মানসিক জাস্টিফায়ার হিসেবে কাজ করেছে এই ছফীয় যুক্তি। দখলকারীরা মনে করার সুযোগ পেয়েছে যে, সংখ্যালঘুদের সম্পদ দখল করা কোনো অপরাধ নয়, এটি অতীত শোষণের বিপরীতে একধরনের ঐতিহাসিক পাওনা আদায়!

মেট্রোপলিটন বিশ্লেষণ বনাম উগ্র অঞ্চলবাদ ও ভাষা-বিদ্বেষ

১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পর থেকে ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী হিসেবে কলকাতা কেবল ঔপনিবেশিক প্রশাসনিক ক্ষমতার কেন্দ্র ছিল না; তা হয়ে উঠেছিল বাংলা ভাষা, সাহিত্য, সংবাদপত্র ও মুদ্রণযন্ত্রের একমাত্র প্রধান মহানগর। রাজনৈতিক অর্থনীতি ও সেক্যুলার ইতিহাসপাঠের বিচারে ‘কেন্দ্র বনাম পরিধি’ (Center vs. Periphery)-র এই বৈষম্য ছিল মূলত একটি ঔপনিবেশিক স্থানিক ও অর্থনৈতিক শোষণ। রামমোহন, বিদ্যাসাগর, বঙ্কিম, রবীন্দ্রনাথ, প্রমথ চৌধুরী ও জীবনানন্দের মাধ্যমে আধুনিক বাংলা ভাষার যে প্রমিত রূপ (Standard Colloquial Bengali) গড়ে উঠেছিল, তার প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি ছিল এই মেট্রোপলিস।

কিন্তু আহমদ ছফা যখন কলকাতার এই কেন্দ্রিকতার ব্যবচ্ছেদ করতে যান, তখন তিনি স্থানিক অর্থনৈতিক বৈষম্যের বৈজ্ঞানিক ও মার্কসীয় বিশ্লেষণকে রূপ দেন এক উগ্র সাংস্কৃতিক ও সম্প্রদায়গত বিদ্বেষে। ঔপনিবেশিক কেন্দ্র হিসেবে কলকাতার ক্ষমতার আধিপত্যকে বিশ্লেষণ করার নামে ছফা বস্তুত অখণ্ড সার্বজনীন বাংলা সংস্কৃতি, প্রমিত বাংলা ভাষা এবং বাঙালির রেনেসাঁসজাত সাহিত্যিক উত্তরাধিকারকেই আক্রমণ করেছেন।

সমাজবিজ্ঞান ও অর্থনৈতিক ভূগোলের দৃষ্টিতে মেট্রোপলিস ও হিন্টারল্যান্ডের সম্পর্ক বিশ্লেষণ করতে গিয়ে ইতিহাসবিদরা দেখিয়েছেন কীভাবে ব্রিটিশ পুঁজিবাদ কলকাতাকে কেন্দ্র করে বাংলার গ্রামীণ উদ্বৃত্ত শোষণ করত। কিন্তু ছফার বিচারে এই কলোনিয়াল পুঁজিবাদী শোষণটি গৌণ হয়ে যায়; প্রধান হয়ে ওঠে অঞ্চলগত ও সম্প্রদায়গত দ্বেষ। তিনি কলকাতাকে কোনো অর্থনৈতিক চুষক কেন্দ্র হিসেবে নয়, বরং সংজ্ঞায়িত করেছেন এক ‘উচ্চবর্ণের হিন্দু দুর্গ’ হিসেবে—যা নাকি কেবলই মুসলিম জনসংখ্যাকে সাংস্কৃতিক দাসত্বের নিচে চেপে রাখার জন্য তৈরি হয়েছিল। তিনি দাবি করলেন যে, কলকাতাকেন্দ্রিক সাহিত্য ও সংস্কৃতি কোনোদিন পুরো বাংলা বা বাঙালি মুসলমানকে প্রতিনিধিত্ব করেনি; তা ছিল সুসংগঠিত বর্ণহিন্দু আধিপত্যের কেন্দ্র।

এই যুক্তির মাধ্যমে ছফা প্রচার করলেন যে, কলকাতায় বসে রচিত রবীন্দ্রনাথ বা জীবনানন্দের প্রমিত সাহিত্য নাকি পূর্ব বাংলার মানুষের জন্য অন্যের সংস্কৃতি! বাংলা ভাষার প্রমিতকরণ ঘটেছিল ১৯ ও ২০ শতকের কলকাতায়। প্রমথ চৌধুরীর ‘সবুজ পত্র’ (১৯১৪) এবং রবীন্দ্রনাথের হাত ধরে যে চলিত ভাষা বাংলা সাহিত্যের প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠল, তা সমগ্র বঙ্গভূখণ্ডের সাধারণ ভাষাভাষীদের যোগাযোগ ও জ্ঞানচর্চার প্রধান সেতু হিসেবে কাজ করেছিল। কিন্তু ছফামন এই প্রমিত বাংলা ভাষাকেও সেক্যুলার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে গ্রহণ করতে অস্বীকার করে। ছফার যুক্তি অনুযায়ী, এই প্রমিত বাংলা ভাষা হলো কলকাতার হিন্দু বাবুদের কৃত্রিম ভাষা, যা পূর্ব বাংলার মুসলিম অধিবাসীদের নিজস্ব ভাষা নয়।

তিনি অভিযোগ তোলেন যে, কলকাতার পণ্ডিতেরা যে প্রমিত বাংলা ভাষার চাদর চাপিয়ে দিয়েছেন, তার সাথে পূর্ব বাংলার মানুষের ভাষার কোনো সংযোগ ছিল না এবং এটি ছিল একধরনের সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদ। এর ফলে প্রমিত বাংলা ভাষাকে সেক্যুলার সাহিত্যচর্চার মাধ্যম হিসেবে দেখার বদলে তাকে সন্দেহ করার একটি মানসিকতা গড়ে তোলা হলো।

১৯৪৭ সালের দেশভাগ কেবল একটি রাজনৈতিক বা ভৌগোলিক বিভাজন ছিল না; তা ছিল ব্রিটিশ ও সাম্প্রদায়িক দলগুলোর চালিত দ্বিজাতিতত্ত্বের (Two-Nation Theory) চরম পরিণতি। দেশভাগের পর যেখানে সেক্যুলার বুদ্ধিজীবীদের কাজ ছিল বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির অখণ্ড সেক্যুলার ভিত্তিকে রক্ষা করা, সেখানে ছফা উল্টো দেশভাগের কালচারাল যুক্তিটিকে বুদ্ধিবৃত্তিক বৈধতা দিলেন। ছফা দাবি করলেন যে, কলকাতা ও ঢাকার সাংস্কৃতিক চেতনা কখনোই এক হতে পারে না, কারণ তাদের ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক মনস্তত্ত্ব সম্পূর্ণ আলাদা। তিনি ‘বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস’-এ লিখলেন যে, ঢাকার নিজস্ব কেন্দ্র গড়ে তুলতে হলে কলকাতার সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করতে হবে। এটি আঞ্চলিক স্বাধিকার আন্দোলন নয়; এটি হলো সংস্কৃতির ক্ষেত্রে দ্বিজাতিতত্ত্বের প্রয়োগ।

কলকাতার সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারকে বর্জন করার অর্থ হলো—রবীন্দ্রনাথ, বিদ্যাসাগর, মধুসূদন, বঙ্কিম, শরৎচন্দ্র ও জীবনানন্দকে ‘কলকাতার হিন্দু সাহিত্যিক’ বলে পর করে দেওয়া। আর এর বিপরীতে ‘ঢাকার নিজস্ব কেন্দ্র’ গড়ে তোলার নামে মূলত এক উগ্র, ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্যবাদী ও অণু-জাতীয়তাবাদী (Micro-nationalist) মনস্তাত্ত্বিক ফ্রেম তৈরি করা। ছফা কলোনিয়াল মেট্রোপলিস বা আঞ্চলিক অর্থনৈতিক শোষণের স্বাস্থ্যকর ও প্রগতিশীল সমাধান দেননি; তিনি আঞ্চলিক বৈষম্যের ক্ষোভকে উসকে দিয়ে অসাম্প্রদায়িক বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐক্যের মূল সেতুটি ভেঙে দিয়েছেন।

ক্লাসিক সাহিত্য বিচার: বঙ্কিম ও রবীন্দ্রনাথকে আদালতের কাঠগড়ায় তোলা

বাংলা সাহিত্যের প্রথম আধুনিক ঔপন্যাসিক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৩৮–১৮৯৪) এক অত্যন্ত জটিল, দ্বান্দ্বিক এবং ঔপনিবেশিক প্রেক্ষাপটে লালিত সাহিত্যিক সত্তা। ‘দুর্গেশনন্দিনী’ ও ‘কপালকুণ্ডলা’ থেকে শুরু করে ‘আনন্দমঠ’, ‘রাজসিংহ’ কিংবা ‘কমলাকান্তের দপ্তর’ ও ‘সাম্য’—বঙ্কিমের সাহিত্যিক ক্যানভাস যেমন বহুমুখী, তেমনই তাঁর চিন্তাধারা কলোনিয়াল আধুনিকতা ও হিন্দু পুনরুত্থানবাদের টানাপোড়েনে বিভক্ত। মার্কসবাদী ও সেক্যুলার সাহিত্যসমালোচকরা বঙ্কিমচন্দ্রের সাহিত্যের নান্দনিক উৎকর্ষ ও প্রমিত রূপকল্প নির্মাণের পাশাপাশি তাঁর ঔপনিবেশিক আনুগত্য এবং হিন্দু জাতীয়তাবাদী সুরকে বস্তুনিষ্ঠভাবে চিহ্নিত করেছেন।

কিন্তু আহমদ ছফা যখন বঙ্কিমচন্দ্রের বিচারে বসেন, তখন তা কোনো বস্তুনিষ্ঠ নান্দনিক সাহিত্যসমালোচনা থাকে না; তা রূপ নেয় এক নির্বাচিত ইতিহাসের উগ্র আদালতে। ছফা বঙ্কিমের সমগ্র সাহিত্যিক কাজকে কলোনিয়াল প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্ছিন্ন করে, তাঁর সাহিত্যিক দ্বান্দ্বিকতাকে মুছে ফেলে তাঁকে কেবল ‘মুসলিম-বিদ্বেষী উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদের মূল স্থপতি’ হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন।

একজন মহৎ সাহিত্যিকের বিচার করার সময় নান্দনিক সাহিত্যসমালোচনার মূল সূত্র হলো তাঁর রচনার বহুমাত্রিকতা, নান্দনিক রূপকল্প, ভাষার বিকাশ এবং তাঁর যুগের ঐতিহাসিক সীমাবদ্ধতাকে বোঝা। বঙ্কিমচন্দ্র একদিকে যেমন ‘আনন্দমঠ’ বা ‘রাজসিংহ’-এ হিন্দু পুনরুত্থানবাদী সুর তুলেছেন, অন্যদিকে তিনি ‘বঙ্গদেশের কৃষক’ (১৮৭৯) এবং ‘সাম্য’ (১৮৭৯) প্রবন্ধে সামন্তীয় জমিদারতন্ত্রের শোষণের বিরুদ্ধে তীব্র আঘাত হেনেছেন। কিন্তু ছফা ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ গ্রন্থে বঙ্কিমকে পাঠ করার সময় তাঁর এই সামাজিক ও রাজনৈতিক দ্বান্দ্বিকতাকে পুরোপুরি গায়েব করে দিয়েছেন। তিনি দাবি করেন, বঙ্কিমচন্দ্রের সাহিত্যিক প্রেরণার মূল চালিকাশক্তি ছিল মুসলমান-বিদ্বেষ।

বঙ্কিমচন্দ্র যখন ‘আনন্দমঠ’ লিখছেন, তখন ভারতজুড়ে ব্রিটিশ রাজের কঠোর সেন্সরশিপ বলবৎ ছিল। তৎকালীন সাহিত্যিকদের কাছে সরাসরি ব্রিটিশবিরোধী সশস্ত্র আন্দোলন রূপায়ন করা দুরূহ ছিল। ঐতিহাসিকদের মতে, বঙ্কিম ‘সন্ন্যাসী বিদ্রোহে’র পটভূমিতে ব্রিটিশবিরোধী ক্ষোভকে আড়াল করতে গিয়ে তৎকালীন ব্রিটিশদের শেখানো ইতিহাস—অর্থাৎ ‘মুসলিম শাসকরা অত্যাচারী এবং ব্রিটিশরা উদ্ধারকর্তা’—এই কলোনিয়াল ফ্রেমে আশ্রয় নিয়েছিলেন, যাতে উপন্যাসটি বাজেয়াপ্ত না হয়। কিন্তু ছফা বঙ্কিমচন্দ্রের এই ঔপনিবেশিক বাধ্যবাধকতা ও সেন্সরশিপের রাজনীতিকে পুরোপুরি চেপে গেছেন। তিনি দেখিয়েছেন বঙ্কিম নাকি স্বতঃস্ফূর্তভাবে এবং কেবলই মুসলিম জাতিকে ধ্বংস করার জন্য এই উপন্যাস লিখেছেন!

বঙ্কিমচন্দ্রকে যদি কেবল ‘মুসলিম-বিদ্বেষী’ হিসেবে খাড়া করা হয়, তবে তাঁর ‘বঙ্গদেশের কৃষক’ ও ‘সাম্য’ প্রবন্ধ দুটি সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ‘বঙ্গদেশের কৃষক’ প্রবন্ধে বঙ্কিম স্পষ্ট লিখেছেন যে, হাসিম শেখ আর রামা কৈবর্ত—উভয়েই আমাদের দেশের কৃষক; একজন মুসলমান, অপরজন হিন্দু; জমিদার ও মহাজনের শোষণে উভয়েই সমানভাবে নিঃস্ব। এখানে বঙ্কিম হিন্দু-মুসলিম দুই সম্প্রদায়ের কৃষককে শোষিত শ্রেণি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। কিন্তু ছফা তাঁর সমালোচনায় বঙ্কিমের এই শোষিত প্রজা-বান্ধব ও সাম্যবাদী লেখালিখি নিয়ে আশ্চর্যজনকভাবে নীরব থাকেন। ছফার রাজনৈতিক প্রজেক্টের জন্য বঙ্কিমকে সাম্যবাদী হিসেবে উপস্থাপন করা সম্ভব ছিল না; বঙ্কিমকে দরকার ছিল এক অখণ্ড খলনায়ক হিসেবে, যাকে দেখিয়ে মুসলিম জনমানসে প্রতিক্রিয়াশীল ক্ষোভ উসকে দেওয়া যায়।

ছফা দাবি করলেন যে, বঙ্কিমচন্দ্র বাঙালি মুসলমানকে আঘাত করেছেন, আর বাঙালি মুসলমান সেই আঘাতের জবাবে নিজের জাতীয় অস্তিত্ব আবিষ্কার করতে বাধ্য হয়েছে; সুতরাং বাঙালি মুসলমানের যে স্বাতন্ত্র্যবাদী মন, তার প্রধান ভাস্কর হলেন বঙ্কিমচন্দ্র স্বয়ং। এই যুক্তির মাধ্যমে ছফা একটি চরম বিপজ্জনক তাত্ত্বিক সিদ্ধান্ত দিলেন: বাঙালি মুসলিমের ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্যবাদ ও দ্বিজাতিতাত্ত্বিক মানসিকতা নাকি তৈরি হয়েছে বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস পড়ে! এটি সাহিত্য বিশ্লেষণের নামে একটি জাতিকে ঐতিহাসিক ভুক্তভোগী বানানোর রাজনৈতিক খেলা।

একই কৌশল প্রয়োগ করা হয়েছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের (১৮৬১–১৯৪১) ক্ষেত্রেও। আধুনিক বাংলা ভাষা, সাহিত্য, নান্দনিকতা ও সেক্যুলার বাঙালি আত্মপরিচয়ের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু হলেন রবীন্দ্রনাথ। উনিশ শতকের ঔপনিবেশিক আধুনিকতা ও সামন্তীয় কাঠামোর মধ্যে বেড়ে উঠেও রবীন্দ্রনাথ তাঁর সৃষ্টিশীলতায় যে অসাম্প্রদায়িক ও সার্বজনীন মানবিকতার রূপায়ণ ঘটিয়েছিলেন, তা অখণ্ড বাঙালি সংস্কৃতির প্রধান স্তম্ভ। প্রগতিশীল চিন্তকেরা রবীন্দ্রনাথের সামন্তীয় জমিদারি পটভূমি, শ্রেণিগত পরিধি এবং কলোনিয়াল কাঠামোর সামাজিক সীমাবদ্ধতার বস্তুনিষ্ঠ আলোচনা করেছেন। কিন্তু আহমদ ছফা যখন রবীন্দ্রনাথের ব্যবচ্ছেদে নামেন, তখন তাঁর লক্ষ্য কোনো প্রগতিশীল সাহিত্য-সমালোচনা ছিল না। ছফা রবীন্দ্রনাথকে বারবার উপস্থাপন করেছেন ‘বাঙালি মুসলিম মানসের প্রধান সাংস্কৃতিক প্রতিপক্ষ’ এবং ‘বর্ণহিন্দু এলিট আধিপত্যের পরম প্রতীক’ হিসেবে।

ছফা ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ গ্রন্থে লিখছেন, রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যের ভিত্তিভূমিটি ছিল বর্ণহিন্দু অভিজাত সমাজের সংস্কৃতির ওপর প্রতিষ্ঠিত; বাঙালি মুসলমানের আত্মপরিচয়, তার ধর্মীয় ও সামাজিক সত্তা রবীন্দ্রনাথের বিশাল ক্যানভাসে হয় অনুপস্থিত, না হয় অবজ্ঞাত; ফলে বাঙালি মুসলমান রবীন্দ্রনাথকে নিজের আত্মিক অভিভাবক বলে গ্রহণ করতে পারেনি।

এখানে সার্বজনীন সেক্যুলার নান্দনিকতাকে সম্পূর্ণরূপে চেপে যাওয়া হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের ‘গোরা’ উপন্যাসে যখন গোরা নিজেকে যেকোনো নির্দিষ্ট ধর্ম বা জাতের ঊর্ধ্বে উঠে কেবল ‘মানুষ’ হিসেবে ঘোষণা করে, কিংবা রবীন্দ্রনাথ যখন সামন্তীয় হিন্দু গোঁড়ামির তীব্র সমালোচনা করেন—ছফা সেই সার্বজনীন নান্দনিকতাকে এড়িয়ে যান। ছফা এটি প্রতিপন্ন করতে চান যে, যেহেতু রবীন্দ্রনাথ হিন্দু পরিবারে জন্মেছিলেন এবং তাঁর ভাষা উচ্চমার্গীয়, তাই মুসলিম সমাজ তাঁকে বর্জন করে ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্যবাদের দিকে হাঁটলে তা নাকি যৌক্তিক!

তিনি দাবি করলেন যে, রবীন্দ্রনাথের অখণ্ড বাংলা সংস্কৃতির ধারণাটি ছিল আসলে কলকাতার বর্ণহিন্দু আধিপত্যের রূপ, যার ভেতর বাঙালি মুসলমান নিজের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব খুঁজে পায়নি। ছফার এই বিশ্লেষণের মূল উদ্দেশ্য ছিল বাঙালি মুসলিমদের শেখানো যে—রবীন্দ্রনাথের গান, সাহিত্য বা সেক্যুলার দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের সংস্কৃতি নয়। এর মাধ্যমে ছফা বাঙালি মুসলিম সমাজকে অখণ্ড বাঙালি সংস্কৃতির প্রধান উৎস থেকে বিচ্ছিন্ন করে এক মানসিক নির্বাসনে পাঠিয়েছেন।

লোকায়ত ঐতিহ্য ও পুঁথিসাহিত্যের কালচারাল রি-প্যাকেজিং

১৮ শতক ও ১৯ শতকের শুরুতে বিকাশ লাভ করা দোভাষী বাংলা বা পুঁথিসাহিত্য এবং বাংলার গ্রামীণ মরমি লোকসংস্কৃতি (যেমন: বাউল, জারি, সারি, মারফতি) ছিল এই ভূখণ্ডের কৃষিভিত্তিক সমাজের এক স্বাভাবিক, স্বতঃস্ফূর্ত এবং মিশ্র (Syncretic) সাংস্কৃতিক প্রকাশ। আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ, মনসুর উদ্দীন, ড. মুহম্মদ এনামুল হক এবং কবি জসীমউদ্দীনের মতো গবেষকরা আমৃত্যু পরিশ্রম করে এই অবহেলিত পুঁথিসাহিত্য ও লোকায়ত ঐতিহ্যকে উদ্ধার করেছিলেন। তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল আধুনিক সেক্যুলার অখণ্ড বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে এই গ্রামীণ লোকজ ধারাকে যুক্ত করে যৌথ বাঙালি সংস্কৃতির ভিত্তি বহুমাত্রিক ও সর্বজনীন করা।

কিন্তু আহমদ ছফা যখন পুঁথিসাহিত্য এবং লোকায়ত সংস্কৃতির পুনর্ব্যাখ্যায় হাত দেন, তখন তাঁর রাজনৈতিক প্রজেক্ট প্রগতিশীল সমন্বয়ের বিপরীত মেরুতে অবস্থান নেয়। ছফা অবহেলিত লোকায়ত ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারের প্রচ্ছদে বস্তুত এমন এক উগ্র স্বাতন্ত্র্যবাদী ‘মুসলিম সাংস্কৃতিক ঘর’ (Muslim Cultural Enclave) নির্মাণ করেছেন, যা সরাসরি আধুনিক সেক্যুলারবাদ, যুক্তিবাদ এবং অসাম্প্রদায়িক অখণ্ড বাঙালি সংস্কৃতিকে বর্জন করে।

ঐতিহাসিক ও ভাষাতাত্ত্বিক বিচারে ১৮–১৯ শতকের দোভাষী বাংলা ছিল আরবি, ফারসি, তুর্কি এবং স্থানীয় কথ্য বাংলার এক স্বাভাবিক মিশ্রণ। এই ভাষায় কেবল মুসলিম পুঁথিকাররা নন, ক্ষেত্রবিশেষে অমুসলিম কবিরাও সাহিত্য রচনা করেছেন। এর মূল চালিকাশক্তি ছিল গ্রামীণ অধিবাসীদের মৌখিক বিনোদন। কিন্তু ছফা ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ গ্রন্থে দোভাষী পুঁথিসাহিত্যকে এই সামাজিক-ভাষিক বাস্তবতার বাইরে এনে রূপ দিয়েছেন এক ধর্মীয় যুদ্ধক্ষেত্রে। তিনি দাবি করেন, দোভাষী বাংলায় রচিত পুঁথিসাহিত্যই হলো বাঙালি মুসলমানের নিজস্ব সাংস্কৃতিক সত্তার প্রথম স্বাধীন রূপায়ণ, আর ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের পণ্ডিতেরা যে সংস্কৃতঘেঁষা গদ্য তৈরি করেছিলেন, তা ছিল বর্ণহিন্দুদের ভাষা; এর বিপরীতে দোভাষী পুঁথি ছিল মুসলমানের নিজস্ব পরিচয় ও ঈমান রক্ষার এক অপরাজেয় দুর্গ।

এখানে আধুনিক প্রমিত বাংলা গদ্যকে (যা বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ, প্রমথ চৌধুরী নির্মাণ করেছিলেন) ‘হিন্দুদের তৈরি কৃত্রিম ভাষা’ বলে উড়িয়ে দেওয়া হলো এবং দোভাষী পুঁথির মিশ্র ভাষাকে ‘বাঙালি মুসলিমের একমাত্র নিজস্ব ভাষা’ হিসেবে ঘোষণা করা হলো। আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ হাজার হাজার পুঁথি সংগ্রহ করে প্রমাণ করেছিলেন যে বাঙালি মুসলিম কবিরা মহাভারত, রামায়ণ ও নাথ সাহিত্য অনুবাদ করে অসাম্প্রদায়িক সংস্কৃতির সেতু তৈরি করেছিলেন। অথচ ছফা সাহিত্যবিশারদের সেই সমন্বয়বাদী আবিষ্কারকে বিকৃত করে পুঁথিকে বানালেন ‘হিন্দুদের বিরুদ্ধে মুসলিমদের প্রতিরোধক দুর্গ’!

বাংলার লোকায়ত সংস্কৃতির প্রধান শক্তি ছিল এর প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মহীনতা। লালন শাহ, হাছন রাজা বা পাগল কানাই যে দেহতত্ত্ব ও মরমি দর্শনের চর্চা করেছিলেন, তা বৈষ্ণব তত্ত্ব ও সুফিবাদের অসাম্প্রদায়িক মিশেল। কিন্তু ছফা লোকায়ত সংস্কৃতিকে এই অসাম্প্রদায়িক মানবিকতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে তাকে একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর স্বাতন্ত্র্যবাদী অস্ত্র হিসেবে রি-প্যাকেজিং করেছেন। তিনি যুক্তি দিয়েছেন যে, ঢাকাকেন্দ্রিক বা কলকাতাকেন্দ্রিক আধুনিক সাহিত্য বাঙালি মুসলমানের মনকে ছুঁতে পারেনি; বাঙালি মুসলমান নিজের অজান্তেই তার লোকায়ত মরমি গান, পুঁথিসাহিত্য এবং সুফি ঐতিহ্যের ভেতরে নিজের খাঁটি পরিচয়কে টিকিয়ে রেখেছিল।

এখানে ছফার উদ্দেশ্য পরিষ্কার: তিনি লোকায়ত সংস্কৃতিকে আধুনিক সেক্যুলার শিক্ষার সঙ্গে মেলাতে চাননি; তিনি একে ব্যবহার করেছেন আধুনিক প্রমিত সাহিত্য, যুক্তিবাদ ও আধুনিক বিজ্ঞানচর্চাকে বর্জন করার বাহানা হিসেবে। তিনি রাজনীতির দ্বিজাতিতত্ত্বকে সংস্কৃতির গভীরে নিয়ে গিয়ে তৈরি করলেন ‘সাংস্কৃতিক দ্বিজাতিতত্ত্ব’। যে সমাজকে শেখানো হয় যে তার প্রকৃত পরিচয় লুকিয়ে আছে ১৮ শতকের পুঁথিসাহিত্য ও কাসাসুল আম্বিয়ার ভেতরে, সেই সমাজ আধুনিক পৃথিবীর সাথে প্রতিযোগিতা করার সক্ষমতা হারায়। ছফা অবহেলিত পুঁথিসাহিত্যের প্রতি তথাকথিত দরদ দেখাতে গিয়ে মূলত মুসলিম সমাজকে এই নৈতিক সুযোগ দিলেন যে, তাদের আধুনিক বিজ্ঞান ও দর্শন শেখার প্রয়োজন নেই, কারণ তাদের নিজস্ব পুঁথিভিত্তিক ঐতিহ্য নাকি সবকিছুর চেয়ে শ্রেষ্ঠ!

সংস্কৃতির ‘স্বতন্ত্র মালিকানা’ ও সংখ্যাগুরুবাদী রূপরেখা

সংস্কৃতি কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় গোষ্ঠীর একচ্ছত্র ব্যক্তিগত সম্পত্তি বা ভূমির খতিয়ান নয়; সংস্কৃতি হলো শতাব্দীপ্রাচীন সহাবস্থান, ভাষিক আদান-প্রদান, উৎপাদন সম্পর্ক এবং লোকায়ত জীবনসংগ্রামের এক সম্মিলিত রূপান্তর। বাংলা ভাষা, সাহিত্য, বাউল-মরমি সঙ্গীত, লালনের অসাম্প্রদায়িক মানবতাবাদ কিংবা কাজী নজরুল ইসলামের সাম্যবাদী সৃষ্টিশীলতা—সবই গড়ে উঠেছিল হাজার বছরের যৌথ বাঙালি জীবনের জটিল মিথস্ক্রিয়ায়। সেক্যুলার ইতিহাসচর্চার মূল সত্যই হলো, বাঙালি সংস্কৃতির ইতিহাস মূলত বিভিন্ন ধর্ম, গোষ্ঠী ও দর্শনের রূপান্তরমূলক সহাবস্থানের ইতিহাস।

কিন্তু আহমদ ছফা যখন ‘বাঙালি সংস্কৃতি কার?’—এই মৌলিক প্রশ্নের মুখোমুখি হন, তখন তিনি সংস্কৃতির এই ঐতিহাসিক সহাবস্থান ও যৌথতার মূল ভিত্তিমূলে কুঠারঘাত করেন। ছফা সেক্যুলার অখণ্ড সংস্কৃতির ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করে ‘বাঙালি সংস্কৃতিতে মুসলমানদের স্বতন্ত্র ও একচ্ছত্র মালিকানা’ দাবি করার প্রতিক্রিয়াশীল দর্শন খাড়া করেছেন। তিনি সংস্কৃতিকে কোনো যৌথ উত্তরাধিকার হিসেবে না দেখে, তাকে ধর্মীয় সম্প্রদায়ের আলাদা আলাদা ‘সার্বভৌম জোনে’ বিভক্ত করেছেন।

ছফা ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ গ্রন্থে লিখছেন, বাঙালি সংস্কৃতি বলতে এতদিন যে জিনিসটিকে প্রমিত বলে চালিয়ে দেওয়া হয়েছে, তা ছিল প্রধানত বর্ণহিন্দু মধ্যবিত্তের সংস্কৃতি; কিন্তু বাঙালি বলতে যদি এই ভূখণ্ডের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীকে বোঝায়, তবে বাঙালি সংস্কৃতির প্রধান ধারাটি হতে হবে বাঙালি মুসলমানের নিজস্ব জীবনবোধ, ইতিহাস ও সংস্কৃতির প্রতিফলন; এই সংস্কৃতিতে মুসলমানদের মালিকানা কোনো দয়া বা দাক্ষিণ্যের বিষয় নয়, এটি তাদের ঐতিহাসিক অধিকার।

ছফা এখানে ‘সংস্কৃতি’কে গণতন্ত্রের নামে ‘সংখ্যাগুরুবাদ’ (Majoritarianism)-এর হাতিয়ার বানালেন। অর্থাৎ যার জনসংখ্যা বেশি, সংস্কৃতির আধেয় ও রূপায়নে তার স্বতন্ত্র ধর্মীয় মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হবে! ভাষা, লোকশিল্প বা আধুনিক সাহিত্যকে যৌথ অসাম্প্রদায়িক সম্পদ হিসেবে গ্রহণ করার বদলে, ছফা সার্বজনীন উপাদানগুলোকে ‘হিন্দুদের আধিপত্য’ এবং তার বিপরীতে এক উগ্র ‘মুসলিম সাংস্কৃতিক ঘর’কে প্রকৃত জাতীয় সংস্কৃতি হিসেবে খাড়া করলেন।

ছফীয় ‘সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যবাদী’ প্রজেক্টের সবচেয়ে বড় শিকার হয়েছেন কাজী নজরুল ইসলাম এবং লালন সাঁইয়ের মতো অসাম্প্রদায়িক ভাবুকেরা। কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন বাংলা সাহিত্যের চরমতম অসাম্প্রদায়িক ও সাম্যবাদী কণ্ঠ। তিনি একাধারে যেমন লিখেছেন ‘ইসলামের গান’, তেমনই লিখেছেন অমর ‘শ্যামাসঙ্গীত’, ‘কীর্তন’ এবং সোচ্চার হয়েছেন ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে। কিন্তু ছফা নজরুলকে বিচার করার সময় তাঁর শ্যামাসঙ্গীত, বৈষ্ণব পদাবলী এবং সেক্যুলার বিপ্লবকে একপাশে সরিয়ে রেখে তাঁকে কেবল ‘মুসলিম সাংস্কৃতিক জাগরণের স্বাতন্ত্র্যবাদী নায়ক’ হিসেবে চিত্রায়িত করেন।

তিনি লেখেন, নজরুলই প্রথম আধুনিক বাঙালি কবি যিনি বর্ণহিন্দুদের তৈরি বাংলা সাহিত্যের প্রাচীর ভেঙে বাঙালি মুসলমানের নিজস্ব রূপকল্প, ঐতিহ্য ও আরবি-ফারসি শব্দমালাকে আধুনিক সাহিত্যে সার্বভৌম আসন দিয়েছেন। এখানে নজরুলের সর্বজনীন সাম্যবাদী ও সেক্যুলার বিদ্রোহকে লঘু করে তাঁকে কেবল একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় সম্প্রদায়ের সাংস্কৃতিক প্রতিনিধি বানিয়ে দেওয়া হলো।

একইভাবে লালন শাহ স্পষ্ট ঘোষণা করেছিলেন, ‘সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে / লালন কয় জাতের কি রূপ দেখলাম না এ নজরে।’ লালনের দর্শন ছিল সর্বপ্রকার প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম, জাতপাত ও সাম্প্রদায়িক সীমানার বাইরে মানবধর্মের জয়গান। কিন্তু ছফা লালন ও বাউল ঐতিহ্যকে সেক্যুলার মানবতাবাদী দর্শনের স্তম্ভ হিসেবে না দেখে, তাকে উপস্থাপন করেছেন ‘উচ্চবর্ণের হিন্দু সংস্কৃতির বিরুদ্ধে গ্রামীণ মুসলিম প্রজাদের সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ’ হিসেবে। ছফা লালনের প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মহীনতাকে ঢেকে দিয়ে তাঁর অসাম্প্রদায়িক চেতনায় ধর্মীয়-আঞ্চলিক স্বাতন্ত্র্যের রং চড়িয়েছেন।

ছফা ‘বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস’-এ সাফ জানিয়ে দেন যে, বাঙালি সংস্কৃতির অখণ্ডতার দাবিটি একটি ভূয়া ধারণা; হিন্দু এবং মুসলমানের ঐতিহাসিক স্মৃতি, ধর্মীয় চেতনা এবং সাংস্কৃতিক উৎস ভিন্ন; এই দুই ভিন্ন ধারাকে জোর করে মেলানোর চেষ্টা ব্যর্থ হতে বাধ্য। জিন্নাহ রাজনীতির ক্ষেত্রে দাবি করেছিলেন হিন্দু ও মুসলিম দুটি আলাদা জাতি; আর ছফা সংস্কৃতির ক্ষেত্রে দাবি করলেন হিন্দু ও মুসলিমের সংস্কৃতি সম্পূর্ণ আলাদা এবং তাদের অখণ্ড যৌথতা অসম্ভব।

১৯৪৭, জিন্নাহর দ্বিজাতিতত্ত্ব এবং ১৯৭১-এর ইতিহাস বিকৃতি

১৯৪৭ সালের দেশভাগ ও বাংলা ব্যবচ্ছেদ ছিল আধুনিক দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসের অন্যতম মর্মান্তিক রাজনৈতিক ট্র্যাজেডি। সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশদের নীতি, সর্বভারতীয় মুসলিম লীগের সাম্প্রদায়িক দ্বিজাতিতত্ত্ব এবং বর্ণহিন্দু জমিদার-অভিজাত শ্রেণির স্বার্থরক্ষার ঘাতক মিশ্রণে লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রাণহানি, বাস্তুচ্যুতি এবং যৌথ বঙ্গীয় সংস্কৃতির ব্যবচ্ছেদ ঘটেছিল। সেক্যুলার ইতিহাসচর্চা ১৯৪৭-কে একটি কৃত্রিম, সাম্প্রদায়িক ও সামন্তীয় ষড়যন্ত্র হিসেবে চিহ্নিত করে—যা সাধারণ কৃষক, শ্রমিক ও মেহনতি মানুষকে ধর্মের ভিত্তিতে বিভক্ত করে শোষণের পথ উন্মুক্ত করেছিল।

কিন্তু আহমদ ছফা যখন ১৯৪৭-এর পাকিস্তান আন্দোলন ও দেশভাগের বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেন, তখন তিনি এই ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডিকে সেক্যুলার দৃষ্টিভঙ্গিতে না দেখে এক চরম প্রতিক্রিয়াশীল কোণ থেকে জাস্টিফাই করেন। ছফা ১৯৪৭-এর রক্তক্ষয়ী দেশভাগকে সাম্প্রদায়িক বিপর্যয় হিসেবে দেখার বদলে একে ‘বাঙালি মুসলমানের অনিবার্য সামাজিক মুক্তি ও আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার’ হিসেবে তত্ত্বায়িত করেছেন। এর মাধ্যমে ছফা প্রগতির প্রচ্ছদ পরে মূলত মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর বিভাজনমূলক দ্বিজাতিতত্ত্বকেই নতুন মোড়কে বুদ্ধিবৃত্তিক বৈধতা দান করেছেন।

সেক্যুলার ইতিহাসবিদরা দেখিয়েছেন, ১৯৪৭-এর পাকিস্তান আন্দোলন মূলত মুসলিম নবাব, জমিদার ও উদীয়মান বুর্জোয়া শ্রেণির ক্ষমতা দখলের লড়াই ছিল, যার শিকার হয়েছিল সাধারণ হিন্দু-মুসলিম কৃষিজীবী মানুষ। অথচ ছফা দাবি করেন যে, বাঙালি মুসলমানের পাকিস্তান আন্দোলন কেবল জিন্নাহর রাজনীতির ফল ছিল না; তা ছিল এই ভূখণ্ডের বর্ণহিন্দু জমিদার ও মধ্যবিত্তের শোষণের বিরুদ্ধে পূর্ববঙ্গের কৃষক ও উদীয়মান মুসলিম মধ্যবিত্তের শতবছরের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের আত্মপ্রকাশ; ১৯৪৭ সালে বাংলা ভাগ না হলে বাঙালি মুসলমান কোনোদিন অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারত না।

এখানে ইস্টবেঙ্গল এস্টেটস অ্যাকুইজিশন অ্যান্ড টেন্যান্সি অ্যাক্ট (১৯৫০) বা ভূমিসংস্কারকে ছফা দেখেন কেবল ‘মুসলিমদের মুক্তি’ হিসেবে। কিন্তু জমিদারি প্রথার বিলোপ একটি সেক্যুলার আর্থ-সামাজিক সংস্কার ছিল; তার জন্য একটি যৌথ দেশকে ধর্মের ভিত্তিতে খণ্ড-বিখণ্ড করে লক্ষ লক্ষ মানুষকে রিফ্যুজি বানানোর প্রয়োজন ছিল না। তাছাড়া ছফা চিত্রায়িত করেছেন যেন সব হিন্দু ছিল শোষণকারী জমিদার আর সব মুসলিম ছিল শোষিত প্রজা! অথচ পূর্ববঙ্গের কোটি কোটি নিম্নবর্ণের হিন্দু মুসলিম কৃষকের মতোই একই সামন্তীয় শোষণের শিকার ছিল। ছফা এই অসাম্প্রদায়িক কৃষিজোটকে অদৃশ্য করে সামন্তীয় শোষণকে একটি উগ্র ‘হিন্দু বনাম মুসলিম’ সাম্প্রদায়িক যুদ্ধে রূপান্তর করেছেন।

১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবে জিন্নাহ দাবি করেছিলেন যে, হিন্দু ও মুসলিম দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন জাতীয় সত্তা, যাদের ধর্ম, সংস্কৃতি ও ইতিহাস এক হতে পারে না। আহমদ ছফা প্রগতিশীল পোশাক পরে ঠিক একই জিন্নাহীয় তাত্ত্বিক কাঠামোর পুনরাবৃত্তি করেছেন। তিনি দাবি করেন যে, বাঙালি হিন্দু এবং বাঙালি মুসলমানের যৌথ সংস্কৃতি বলতে যা বোঝায়, তা একধরনের অলীক কল্পনামাত্র; তাদের ধর্ম আলাদা, জীবনের আকাঙ্ক্ষা আলাদা, এমনকি তাদের ভাষার উৎস ও রূপকল্পও আলাদা। জিন্নাহ রাজনীতির ময়দানে যে সাম্প্রদায়িক বিষবৃক্ষ রোপণ করেছিলেন, ছফা সাহিত্যের ও সংস্কৃতির ময়দানে সেই বিষবৃক্ষকেই বাঙালি মুসলিমের নিজস্ব পরিচয় বলে পানি সিঞ্চন করেছেন।

ছফার এই ১৯৪৭-তোষণ তত্ত্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক পরিণতি ঘটে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের ব্যাখ্যা দেওয়ার ক্ষেত্রে। ১৯৭১ ছিল মূলত ১৯৪৭-এর ধর্মভিত্তিক দ্বিজাতিতত্ত্ব, পাকিস্তান নামক কৃত্রিম রাষ্ট্রকাঠামো এবং ধর্মীয় শাসনব্যবস্থার চূড়ান্ত অকার্যকারিতার অসাম্প্রদায়িক ঘোষণা। বাঙালি জাতি ১৯৭১-এ রক্ত দিয়ে প্রমাণ করেছিল যে, ধর্মের ভিত্তিতে কোনো আধুনিক জাতিরাষ্ট্র হতে পারে না; ভাষা, সংস্কৃতি ও সেক্যুলার গণতান্ত্রিক মূল্যবোধই একটি রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি। কিন্তু ছফা ১৯৭১-কে দ্বিজাতিতত্ত্বের পরাজয় হিসেবে দেখতে অস্বীকৃতি জানান! তিনি এক নতুন কুযুক্তি খাড়া করেন, যা অনুযায়ী ১৯৭১ নাকি কোনো অসাম্প্রদায়িক আন্দোলন ছিল না, বরং ১৯৭১ ছিল ‘১৯৪৭-এর পাকিস্তান আন্দোলনেরই আসল ও অসমাপ্ত স্বপ্নপূরণ’!

ছফা দাবি করেন যে, ১৯৪৭ সালে বাঙালি মুসলমান যে স্বতন্ত্র আবাসভূমির স্বপ্ন দেখেছিল, জিন্নাহ ও পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকেরা তা বিশ্বাস করেছিল; ১৯৭১ সালে বাঙালি মুসলমান সেই ভুল শুধরে নিয়ে নিজের প্রকৃত স্বতন্ত্র ‘মুসলিম বাংলা’ প্রতিষ্ঠা করেছে। এর মাধ্যমে তিনি মুক্তিযুদ্ধের মূল ভিত্তি—ধর্মনিরপেক্ষতা ও বাঙালি জাতীয়তাবাদকে বাদ দিয়ে ১৯৭১-কে কেবল ‘মুসলিম ভূখণ্ডের নতুন পুনর্বিন্যাস’ বানিয়ে দিলেন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার ভুল ধারণাকে সঠিক প্রমাণ করতে গিয়ে ছফা দেখালেন যে, পাকিস্তান তৈরি করা ভুল ছিল না, ভুল ছিল কেবল পশ্চিম পাকিস্তানিদের শাসন করা! এর মাধ্যমে তিনি স্বাধীনতাবিরোধী পাকিস্তানপন্থীদের হাতে এক বিশাল বুদ্ধিবৃত্তিক অস্ত্র তুলে দিলেন।

১৯৭২-পরবর্তী বুদ্ধিবৃত্তিক শূন্যতা ও ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদে’র জ্বালানি

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর রেসকোর্স ময়দানে ৯৩ হাজার পাকিস্তানি সৈন্যের আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে জিন্নাহর দ্বিজাতিতত্ত্বের রাজনৈতিক অকার্যকারিতা প্রমাণিত হয়েছিল। ভাষা, সংস্কৃতি ও অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক চেতনার ভিত্তিতে অভ্যুদয় ঘটেছিল স্বাধীন বাংলাদেশের। ১৯৭২ সালের সংবিধান প্রগতির ইতিহাসে এক যুগান্তকারী দলিল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে, যেখানে ধর্মনিরপেক্ষতা, জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রকে রাষ্ট্রের মূল চার নীতি হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছিল। কিন্তু রাজনৈতিক ময়দানে পাকিস্তানের পতন ঘটলেও, বুদ্ধিবৃত্তিক ময়দানে মুসলিম স্বাতন্ত্র্যবাদের পরাচ্ছায়াকে টিকিয়ে রাখার চতুর চক্রান্ত শুরু করেন আহমদ ছফা।

স্বাধীনতার পরপরই রচিত তাঁর বহুল আলোচিত গ্রন্থ ‘বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস’ (১৯৭২) এবং পরবর্তী প্রবন্ধগুলোতে তিনি সেক্যুলার সম্ভাবনাকে স্বাগত না জানিয়ে, এর মধ্যে ‘বাঙালি মুসলিম অস্তিত্বের ভয়াবহ সংকট’ দেখতে পান। তিনি লিখলেন, পাকিস্তান ভেঙেছে ঠিকই, কিন্তু বাঙালি মুসলমান কি তার ভয় এবং স্বাতন্ত্র্যের সংকট থেকে মুক্ত হতে পেরেছে? প্রমিত সেক্যুলারিজমের নামে যদি বাঙালি মুসলমানের অবচেতনকে চেপে রাখা হয় এবং কলকাতার অনুসরণে এক কৃত্রিম সেক্যুলার সংস্কৃতি চাপিয়ে দেওয়া হয়, তবে বাঙালি মুসলমান আবার নিজের ঘরের মধ্যে পরবাসী বোধ করবে।

পাকিস্তান ভাঙার পর রাষ্ট্র ছিল শতভাগ বাঙালি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠদের হাতে। এখানে মুসলিম পরিচয় হারিয়ে যাওয়ার কোনো বস্তুগত ভয় ছিল না। তা সত্ত্বেও ছফা কাল্পনিক ‘সাংস্কৃতিক আগ্রাসনে’র ভয় দেখিয়ে মুসলিম স্বাতন্ত্র্যবাদের সেই পুরনো জিন্নাহীয় বর্মটিকে পুনরায় সচল রাখার ব্যবস্থা করলেন।

ছফা কৌশলগতভাবে রাষ্ট্রীয় দ্বিজাতিতত্ত্বের ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে ‘মনস্তাত্ত্বিক দ্বিজাতিতত্ত্ব’ (Psychological Two-Nation Theory) খাড়া করেন। ১৯৮১ সালে প্রকাশিত ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ গ্রন্থে তিনি সেক্যুলারিজম ও অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতীয়তাবাদকে সরাসরি আক্রমণ করেন। তিনি দাবি করেন যে, ১৯৭১-এর পর বাংলাদেশে যে সেক্যুলার সংস্কৃতির চর্চা করা হচ্ছে, তা নাকি বাঙালি মুসলিমের জন্য একধরনের মানসিক দাসত্ব। তাঁর মতে, বাঙালি মুসলিমের একটি আলাদা অবচেতন মন আছে, যা রবীন্দ্রসংস্কৃতি বা সেক্যুলার প্রমিত ধারার সঙ্গে খাপ খায় না; সেক্যুলার জাতীয়তাবাদ চর্চা করা মানে বাঙালি মুসলিমের নিজের পরিচয়কে অস্বীকার করা; এবং যতক্ষণ পর্যন্ত রাষ্ট্র ও সংস্কৃতিতে এই মুসলিম স্বাতন্ত্র্যকে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি না দেওয়া হচ্ছে, ততক্ষণ ১৯৭১-এর স্বাধীনতা অসম্পূর্ণ।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নির্মমভাবে হত্যার পর বাংলাদেশে যে সামরিক শাসন, ধর্মীয় রাজনীতির পুনর্বাসন এবং ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’-এর উত্থান ঘটেছিল, তার বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত তৈরিতে ছফার লেখালেখি সবচেয়ে বড় জ্বালানি জুগিয়েছিল। জিয়াউর রহমান যখন সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা ছেঁটে ফেলে অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতীয়তাবাদের জায়গায় ধর্মীয় প্রলেপযুক্ত ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ চালু করলেন, তখন সেই রাজনৈতিক পদক্ষেপের সবচেয়ে বড় সাফাই এসেছিল ছফীয় সাহিত্য ও প্রবন্ধ থেকে। জিয়াউর রহমান যে ‘বাঙালি বনাম বাংলাদেশি’ সাংস্কৃতিক বিভাজন তৈরি করেছিলেন, তার তাত্ত্বিক রূপরেখা ছফা আগেই লিখে রেখেছিলেন। তিনি প্রগতিশীল ও বামপন্থী শব্দমালা ব্যবহার করে দেখিয়েছিলেন কীভাবে বাঙালি জাতীয়তাবাদ মূলত সেক্যুলার চক্রান্ত, আর মুসলিম স্বাতন্ত্র্যভিত্তিক বাংলাদেশি পরিচয়ই হলো প্রকৃত সার্বভৌমত্ব!

১৯৫২-র ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত যে জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ঘটেছিল, তার মূল তাত্ত্বিক ভিত্তি ছিল: রাষ্ট্রীয় বা সামাজিক পরিচয় নির্ধারণে ধর্ম, বর্ণ বা ভূখণ্ডের চেয়ে অসাম্প্রদায়িক ভাষা ও সংস্কৃতির রূপই প্রধান এবং এ ভূমির সকল অধিবাসী সমান নাগরিক অধিকার ভোগ করবে। কিন্তু ছফা অসাম্প্রদায়িক ভাষাভিত্তিক নাগরিক পরিচয়কে ‘কৃত্রিম’ ও ‘উচ্চবর্ণের সংস্কৃতি’ বলে আক্রমণ করে মূলত এক উগ্র ‘মুসলিম সংখ্যাগুরুভিত্তিক ভূখণ্ডগত পরিচয়বাদ’ (Territorial Identity Politics)-এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। ছফা নাগরিকত্বকে সাম্প্রদায়িকীকরণ করলেন এবং প্রমিত ভাষা ও সেক্যুলার জাতীয়তাবাদকে উচ্চবর্ণের সংস্কৃতি বলে দেগে দিয়ে বাঙালি পরিচয়কে সংসংকুচিত করলেন।

ধর্মনিরপেক্ষতা আক্রমণ ও ‘সুশীল-বিদ্বেষী’ পপুলিজম

একটি আধুনিক, গণতান্ত্রিক ও সম-অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্রের মূল স্তম্ভ হলো ধর্মনিরপেক্ষতা (Secularism)। ১৯৭১ সালের যুদ্ধের পর ১৯৭২ সালের সংবিধানে যে ধর্মনিরপেক্ষতাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল, তার মূল অর্থ ছিল—রাষ্ট্র কোনো নির্দিষ্ট ধর্মকে প্রাধান্য দেবে না, ধর্মের ভিত্তিতে নাগরিক অধিকারের বৈষম্য করা যাবে না এবং ধর্মীয় অনুভূতিকে রাজনৈতিক শোষণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। কিন্তু আহমদ ছফা ধর্মনিরপেক্ষতাকে এদেশের মানুষের জন্য এক কৃত্রিম ইউরোপীয় বিলাসিতা, এলিটদের ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া ধারণা এবং সাধারণ মানুষের ধার্মিক অনুভূতির বিরোধী বিদেশি প্রপাগান্ডা হিসেবে চিত্রায়িত করেছেন।

ছফা দাবি করলেন যে, ইউরোপে সেক্যুলারিজমের জন্ম হয়েছিল চার্চের আধিপত্য ভাঙার জন্য; কিন্তু আমাদের দেশের প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন; এখানে সেক্যুলারিজম নামে যা চালু করা হয়েছে, তা সাধারণ মানুষের ঈমান ও ধর্মীয় অবচেতনকে তোয়াক্কা না করে ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া এক বিলাসিতা। ছফা এখানে সেক্যুলারিজমকে ‘ধর্মহীনতা’ বা ‘ধর্মের প্রতি শত্রুতা’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করলেন, যা মূলত উগ্র মৌলবাদী দলগুলোর চিরাচরিত বয়ান। লালন, সুফি ঐতিহ্য, ১৯৫২-র ভাষাপ্রেম এবং ১৯৭১-এর অসাম্প্রদায়িক চেতনা—ছফা সেই পুরো দেশীয় ঐতিহ্যকে অস্বীকার করে সেক্যুলারিজমকে কেবল বিদেশি আমদানি বলে উড়িয়ে দিলেন।

ছফার রাজনৈতিক কৌশলের সবচেয়ে ক্ষতিকর দিক হলো—তিনি সেক্যুলারিজমকে আক্রমণ করার জন্য ‘সাধারণ মানুষের অনুভূতি’ (Mass Sentiment) নামক পপুলিস্ট কার্ডটি ব্যবহার করেছেন। তিনি যুক্তি দেন যে, যেহেতু পূর্ব বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ধার্মিক মুসলিম, তাই রাষ্ট্র যদি ধর্মনিরপেক্ষ নীতি অনুসরণ করে, তবে তা নাকি জনগণের অনুভূতিকে আঘাত করা! তিনি দাবি করলেন, যে রাষ্ট্রনীতির সাথে এদেশের সাধারণ মানুষের হৃদয়ের কোনো সংযোগ নেই, তা শেষ পর্যন্ত প্রতিক্রিয়াশীলতারই জন্ম দেয়; সেক্যুলারিজমের নামে এদেশের মানুষের ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্যকে বাদ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে বলেই আজ প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির এত প্রবৃদ্ধি। এটি একটি মারাত্মক উল্টো যুক্তি! ছফা বলতে চাইলেন যে, মৌলবাদের উত্থানের জন্য মৌলবাদীরা দায়ী নয়; দায়ী নাকি সেক্যুলারিজম! অর্থাৎ রাষ্ট্র যদি ধর্মনিরপেক্ষ হতে চায়, তবেই নাকি মৌলবাদ বাড়ে—অতএব রাষ্ট্রকে সেক্যুলার নীতি বাদ দিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্মীয় অনুভূতির সামনে হাঁটু গেড়ে বসে থাকতে হবে!

১৯৭৫ সালে সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান সংবিধানে পরিবর্তন এনে ধর্মনিরপেক্ষতা উপড়ে ফেলেন এবং পরবর্তীতে সামরিক শাসক এরশাদ ১৯৮৮ সালে ‘ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম’ হিসেবে ঘোষণা করেন। এই যে অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রকাঠামোকে পঙ্গু করে দেওয়া পদক্ষেপগুলো—এর পেছনে রাজনৈতিক বৈধতা জুগিয়েছিল আহমদ ছফার এই ধর্মনিরপেক্ষতা-বিরোধী তাত্ত্বিক লেখালেখি। সামরিক শাসকরা যখন বলত যে ধর্মনিরপেক্ষতা এদেশের মানুষের মূল চেতনা নয়, তখন তারা মূলত আহমদ ছফার বইগুলোর উদ্ধৃতি ব্যবহার করত।

একইভাবে ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর পাকিস্তানি আল-বদর বাহিনী মুনীর চৌধুরী, শহীদুল্লা কায়সার, গোবیندচন্দ্র দেবদের মতো অগ্রগণ্য সেক্যুলার বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করার পর, স্বাধীন দেশে যে কজন সেক্যুলার বুদ্ধিজীবী বেঁচে ছিলেন, ১৯৭২ সালেই আহমদ ছফা প্রকাশ করেন ‘বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস’। এই বইটিতে ছফা পাকিস্তানি মতাদর্শের অবশিষ্টাংশ বা স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির ওপর আঘাত হানার বদলে তাঁর সমস্ত বুদ্ধিবৃত্তিক কামান দাগেন এদেশের সেক্যুলার, প্রগতিশীল ও বামপন্থী বুদ্ধিজীবীদের বিরুদ্ধে। ছফা ১৯৭১-পরবর্তী প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীদের ঢালাওভাবে সুবিধাবাদী, পরজীবী, পুরস্কারলোভী এবং ভারতের এজেন্ট বলে চরিত্রহনন করেন।

ছফা লিখলেন, আমাদের বুদ্ধিজীবীরা চিরকাল সরকারের ও রাষ্ট্রের উচ্ছিষ্টভোগী হয়েই রইলেন; ১৯৭১ সালে তারা কলকাতায় গিয়ে আরাম-আয়েশে দিন কাটিয়েছেন, আর আজ স্বাধীন বাংলাদেশে পদ, পদবী ও পুরস্কারের জন্য একে অপরের পেছনে ছুরি মারছেন। ১৯৫২-র ভাষা আন্দোলন, ৬২-র শিক্ষা আন্দোলন, ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান এবং ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে বুদ্ধিজীবীদের জীবনদান ও নেতৃত্বের রক্তস্নাত ইতিহাসকে ছফা একঝটকায় মুছে দিলেন। পপুলিস্ট উগ্রপন্থীদের অন্যতম প্রধান অস্ত্র হলো অ্যান্টি-ইন্টেলেকচুয়ালিজম বা বুদ্ধিজীবী-বিদ্বেষ। জনগণকে শেখানো হয় যে পণ্ডিত, অধ্যাপক ও সেক্যুলার চিন্তকরা হলো এলিট ও জনগণের শত্রু, আর একমাত্র কোনো উগ্র পপুলিস্ট নেতাই হলো জনগণের খাঁটি প্রতিনিধি। ছফা বাংলাদেশে ঠিক এই অ্যান্টি-ইন্টেলেকচুয়ালিজমের বিষবৃক্ষটি রোপণ করেছিলেন।

যখন একটি সমাজে প্রগতিশীল ও সেক্যুলার বুদ্ধিজীবীদের নৈতিকভাবে দেউলিয়া বলে প্রচার করা হয়, তখন সমাজে যে চিন্তার শূন্যতা তৈরি হয়, তা কখনো ফাঁকা থাকে না। ১৯৭৫-এর পটপরিবর্তনের পর জামায়াতে ইসলামী, শিবিরের তাত্ত্বিকেরা এবং সামরিক শাসনের মদদপুষ্ট ডানপন্থী বুদ্ধিজীবীরা ছফীয় ‘বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস’-কে তাদের মূল বাইবেল বানিয়ে ফেলে! তারা ছফার বই থেকে বাক্য উদ্ধৃত করে বলতে শুরু করে: প্রগতিশীল ও সেক্যুলার বুদ্ধিজীবীরা যে ভারতের দালাল ও দুর্নীতিগ্রস্ত, তা তো আপনাদের প্রগতিশীল আহমদ ছফাই বলে গেছেন!

একই কৌশল প্রয়োগ করা হয় সুশীল সমাজ ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও। ছফা দেখালেন যে, এদেশের সুশীল সমাজ ও মানবাধিকার কর্মীরা নাকি ইংরেজি জানা, বিদেশি টাকায় চলা এমন এক এলিট গোষ্ঠী—যাদের সাথে এদেশের ঈমানদার ও টুপি-পরা সাধারণ মানুষের কোনো আত্মিক সম্পর্ক নেই! তিনি মানবাধিকারকে ‘বিদেশি প্রভুদের ডলার খেয়ে চালানো ব্যবসা’ বলে গালি দিয়ে তার সার্বজনীন নৈতিক ভিত্তিকে অপরাধী সাব্যস্ত করলেন। জিয়াউর রহমান, এরশাদ বা উগ্র ধর্মীয় দলগুলো যখনই প্রগতিশীল সুশীল সমাজের তোপের মুখে পড়েছে, তখনই তারা ছফার এই একই যুক্তির আশ্রয় নিয়েছে—এরা সুশীল, এরা বিদেশি এনজিওর দালাল!

এমনকি নারী অধিকার আন্দোলনকেও ছফা আক্রমণ করে প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত দিলেন যে, আমাদের দেশের সুশীল সমাজ ও নারী অধিকারবাদীরা যেভাবে পশ্চিমা মূল্যবোধ চাপিয়ে দিতে চায়, তা এদেশের মুসলিম পারিবারিক কাঠামো ও সামাজিক মূল্যবোধের ওপর এক ভয়াবহ আঘাত। হুবহু এই যুক্তিটিই কিন্তু পরবর্তীতে কট্টর পুরুষতান্ত্রিক ও মৌলবাদী দলগুলোর দাবিতে উঠে এসেছিল! ছফা নারী মুক্তি ও সেক্যুলার সামাজিক সংস্কারকে পশ্চিমা চক্রান্ত বলে গালি দিয়ে এদেশের কট্টর পুরুষতান্ত্রিক শক্তিকেই বুদ্ধিবৃত্তিক হাতিয়ার জোগান দিয়েছেন।

নীতিগত দ্বৈততা ও উগ্র ডানপন্থার ‘ছফীয় পাইপলাইন’

আহমদ ছফার বুদ্ধিবৃত্তিক মূল্যায়নে সবচেয়ে বড় পদ্ধতিগত ভণ্ডামি উন্মোচিত হয় মৌলবাদ ও সেক্যুলার সুশীল সমাজের প্রতি তাঁর চরম দ্বৈত মানদণ্ডে (Double Standard)। প্রগতিশীল, ধর্মনিরপেক্ষ বুদ্ধিজীবী, মানবাধিকার কর্মী বা সেক্যুলার প্রতিষ্ঠানগুলোর সামান্য ভুলভ্রান্তি বা রাষ্ট্রীয় সীমাবদ্ধতা দেখা দিলেই ছফা আবির্ভূত হতেন চরম নির্দয় ও চরিত্রহননকারী এক বিচারক হিসেবে। তিনি তাদের গায়ে সাঁটিয়ে দিতেন উচ্ছিষ্টভোগী, জাতীয় শত্রু কিংবা ভারতের এজেন্টের তকমা।

অথচ, যখনই তিনি মুখোমুখি হতেন কট্টর ধর্মান্ধ, মৌলবাদী বা উগ্র সাম্প্রদায়িক শক্তির সহিংসতার, তখনই ছফার সেই ক্ষুরধার সমালোচনার অস্ত্র উধাও হয়ে যেত! সেখানে তাঁর কলমে নেমে আসত অপার করুণা, সমাজতাত্ত্বিক সহানুভূতি এবং ছদ্ম-প্রগতিশীল ব্যাখ্যা। ছফা উগ্র ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের সহিংসতাকে কোনো নীতিগত অপরাধ বা ভাবাদর্শিক হুমকি হিসেবে না দেখে, তাকে চিত্রায়িত করতেন প্রমিত সেক্যুলার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে পুঞ্জীভূত সামাজিক ক্ষোভের স্বাভাবিক ও প্রাণবন্ত প্রতিক্রিয়া হিসেবে!

ছফা ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ গ্রন্থে লিখছেন, এদেশের সাধারণ মানুষ যখন ধর্মের আহ্বানে সাড়া দেয় বা ধর্মীয় গোঁড়ামির আশ্রয় নেয়, তখন তাকে কেবল প্রতিক্রিয়াশীলতা বলে উড়িয়ে দিলে চলবে না; বুঝতে হবে, যে সেক্যুলার সংস্কৃতি তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, সেখানে তারা নিজেদের আত্মিক ও সামাজিক ঠাঁই পায়নি; সুতরাং মৌলবাদের এই উত্থান আসলে এলিটদের তৈরি সেক্যুলার চক্রান্তের বিরুদ্ধে অবহেলিত জনমানুষের এক স্বাভাবিক অবচেতন প্রতিরোধ।

এখানে প্রথমত, অপরাধের দায় ভুক্তভোগীর ওপর চাপানো হলো—ধর্মান্ধরা যে অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রের ওপর হামলা চালাচ্ছে, তার জন্য মৌলবাদীদের কোনো দোষ নেই, দায় নাকি সেক্যুলারিজমের! দ্বিতীয়ত, উগ্রবাদকে গণমানুষের ক্ষোভ বানিয়ে ধোয়া তুলসীপাতা করা হলো। ছফা উত্তর-ঔপনিবেশিক (Post-colonial) ও সাবঅল্টার্ন (Subaltern) শব্দমালা ব্যবহার করে উগ্র ধর্মীয় মৌলবাদের ‘বুদ্ধিবৃত্তিক ধোলাই’ (Intellectual Laundering) করেছেন।

এর ফলে তৈরি হয়েছে পাঁচ ধাপের এক সুনির্দিষ্ট ‘ছফীয় পাইপলাইন’ (Chofamon Pipeline):

১. ইতিহাস বিকৃতি: রেনেসাঁ, আধুনিক গদ্য ও প্রমিত বাংলা ভাষাকে বর্ণহিন্দু চক্রান্ত আখ্যা দিয়ে অসাম্প্রদায়িক ইতিহাসের ভিত নড়বড়ে করা।

২. স্থায়ী ভিকটিমহুড: শ্রেণি বিশ্লেষণ মুছে ফেলে বাঙালি মুসলিমকে চিরন্তন শোষিত শিকার বানিয়ে সামাজিক আক্রোশ ও রেসোঁতিমা তৈরি করা।

৩. সাংস্কৃতিক পৃথকীকরণ: অখণ্ড যৌথ সংস্কৃতি বর্জন করে পুঁথি ও ধর্মীয় গাথাভিত্তিক পৃথক ‘মুসলিম সাংস্কৃতিক ঘর’ নির্মাণ করা।

৪. সেক্যুলারিজমে আক্রমণ: ধর্মনিরপেক্ষতাকে ইউরোপীয় বিলাসিতা ও ধর্মবিরোধী প্রপাগান্ডা আখ্যা দিয়ে রাষ্ট্রীয় অক্ষে ধর্মীয় রাজনীতির পথ সুগম করা।

৫. বুদ্ধিজীবী নিধন ও শূন্যতা সৃষ্টি: সেক্যুলার ও প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীদের ঢালাও ভারতের দালাল ও সুবিধাবাদী বানিয়ে প্রগতিশীল বলয় ধ্বংস করা এবং সেই শূন্যতায় উগ্র ডানপন্থীদের স্থায়ী রাজত্ব স্থাপন করা।

ছফাপন্থীরা প্রায়শই সাফাই গান যে ছফা তো নিজে জামায়াত করেননি, তিনি তো ১৯৭১-এ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ছিলেন! কিন্তু রাজনৈতিক তত্ত্বের বিচারে একজন লেখকের ব্যক্তিগত ইচ্ছা বা উদ্দেশ্য একেবারেই গৌণ বিষয়। মুখ্য বিষয় হলো তাঁর লিখিত টেক্সটের সামাজিক-রাজনৈতিক কার্যকারিতা (Functional Utility)। আজকের বাংলাদেশে যখন কোনো উগ্র ডানপন্থী কলামিস্ট বা ডিজিটাল ভাবাদর্শিক ক্যাডার সেক্যুলারিজমের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করে, বৈশাখী উৎসবের বিরুদ্ধে কথা বলে, কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের আক্রমণ করে—তারা কুরআন-হাদিসের আগে উদ্ধৃতি দেয় আহমদ ছফার ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ বা ‘বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস’ থেকে!

ছফা উগ্র ডানপন্থীদের হাতে এমন এক বুদ্ধিবৃত্তিক অস্ত্র তুলে দিয়েছেন, যার মাধ্যমে তারা সেক্যুলার রাজনীতিকে আক্রমণ করার সময় কোনো ধর্মীয় উন্মাদ হিসেবে নয়, বরং নিজেদের ‘উপনিবেশবাদ-বিরোধী, নিম্নবর্গীয় ও প্রাতিষ্ঠানিকতাবোধের বিরুদ্ধে লড়াইরত প্রগতিশীল যোদ্ধা’ হিসেবে উপস্থাপন করার সুযোগ পায়! মৌলবাদকে প্রগতির ভাষায় সাজিয়ে দেওয়ার এই ছফীয় শিল্পই হলো আধুনিক বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডি।

আহমদ ছফা কোনো নিরাসক্ত মুক্তচিন্তক বা প্রগতির বাতিঘর ছিলেন না; তিনি ছিলেন প্রগতির ছদ্মবেশ পরা এক চরম প্রতিক্রিয়াশীল দর্শনের প্রকৌশলী। তিনি প্রগতির ভাষা ব্যবহার করে বাঙালি মুসলিমকে সেক্যুলার রেনেসাঁর ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার থেকে বিচ্ছিন্ন করেছেন, যৌথ সংস্কৃতিকে ধর্মীয় সংখ্যাগুরুত্বের সম্পত্তিতে পরিণত করেছেন, ১৯৪৭-এর বিভাজনকে জাস্টিফাই করেছেন, এবং ১৯৭১-পরবর্তী সেক্যুলার রাষ্ট্রচেতনার মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছেন।

বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রকে যদি সত্যিকার অর্থে একটি অসাম্প্রদায়িক, সাম্যবাদী, বৈষম্যহীন ও নাগরিক অধিকারভিত্তিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে হয়, তবে আহমদ ছফার তৈরি এই ‘ভিকটিমহুড কার্ড’, ‘সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যবাদ’ এবং ‘সুশীল-বিদ্বেষী পপুলিজম’কে স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করতে হবে। প্রগতির রূপ ধারণ করা এই সাম্প্রদায়িক বিষবৃক্ষকে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে উপড়ে ফেলা ছাড়া এদেশের সেক্যুলার ও মানবিক ভবিষ্যৎ রক্ষা করার আর কোনো পথ খোলা নেই।

শেয়ার করুন: Facebook X WhatsApp LinkedIn

প্রেস ডেস্ক, সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর এর অফিস

সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর এর নিজের সকল লেখা, শুভেচ্ছা, স্মরণ ইত্যাদি এই ডেস্ক থেকে প্রকাশিত হয়।

সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক, কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগ। ইতিহাস, রাজনীতি, প্রযুক্তি ও উন্নয়ন নিয়ে লেখালেখি।

যোগাযোগ

কুমারখালী বাস স্ট্যান্ড, দুর্গাপুর, কুমারখালী।
+৮৮০ (১৭) ৬৩০৩৮,৬৩০৩৯।contact@sufifaruq.com

© ২০২৬ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।