গানের সংগ্রহশালা

শোন একটি মুজিবরের থেকে লক্ষ মুজিবরের কন্ঠস্বরের ধ্বনি-প্রতিধ্বনি

শোন একটি মুজিবরের থেকে লক্ষ মুজিবরের কন্ঠস্বরের ধ্বনি-প্রতিধ্বনি

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ কেবল রণাঙ্গনে অস্ত্র হাতে সাহসিকতার লড়াই ছিল না; ছিল সুর, শব্দ আর চেতনার এক অদম্য মুক্তিসংগ্রাম। সেই সময়ে স্বাধীনতাকামী সাড়ে সাত কোটি বাঙালি ও মুক্তিযোদ্ধাদের হৃদয়ে যে গানটি দাবানলের মতো প্রেরণা জুগিয়েছিল, তার শীর্ষে রয়েছে ‘শোনো একটি মুজিবরের থেকে লক্ষ মুজিবরের কণ্ঠস্বরের ধ্বনি-প্রতিধ্বনি আকাশে বাতাসে ওঠে রণি’। গানটি মূলত কলকাতার আকাশবাণী ও পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত হয়ে পুরো মুক্তিসংগ্রামের অনবদ্য রণসঙ্গীত ও উদ্দীপনায় পরিণত হয়।

১৯৭১ সালের মার্চে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণ এবং ২৫শে মার্চের কালরাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর পর বাংলাদেশে রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম শুরু হয়। এপ্রিলে ভারতে আশ্রয় নিতে শুরু করেন লাখ লাখ শরণার্থী ও মুক্তিকামী বাঙালি। এমন এক প্রেক্ষাপটে ১৯৭১ সালের এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে কলকাতার পার্ক সার্কাসের কাছে গড়িয়াহাট রোডের এক চায়ের দোকানে বসে গানটির বীজ রোপিত হয়।

অংশুমান রায়
অংশুমান রায়

সংক্ষিপ্ত তথ্যসারণি

উপাদানবিবরণ
 গীতিকারগৌরী প্রসন্ন মজুমদার
সুরকারঅংশুমান রায়
প্রথম সম্প্রচার২২ এপ্রিল ১৯৭১, আকাশবাণী কলকাতা কেন্দ্র
রেকর্ড লেবেলহিন্দুস্তান রেকর্ড
প্রেক্ষাপটবঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণের সঙ্গে মিলিয়ে সম্প্রচারিত

 

আড্ডার টেবিল থেকে সৃষ্টি

প্রখ্যাত বাঙালি গীতিপ্রতিনিধি ও গীতিকার গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার, সুরকার ও শিল্পী অংশুমান রায়, এবং আকাশবাণী কলকাতার তৎকালীন কর্মকর্তা দেবদাস চ্যাটার্জী এক চায়ের দোকানে আড্ডা দিচ্ছিলেন। সেখানে বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম এবং বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ নিয়ে আলোচনা চলাকালীন গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার একটি সাধারণ সিগারেটের প্যাকেটের উল্টো পিঠে কয়েক মিনিটে গানটির ঐতিহাসিক কথাগুলো লিখে ফেলেন।

সুরারোপ ও দ্রুত রেকর্ডিং

কালবিলম্ব না করে সুরকার অংশুমান রায় সেখানে বসেই তাঁর হারমোনিয়াম ও একতারা নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে লোকসুরের ছোঁয়ায় গানটিতে সুরারোপ করেন। গানটির মূল আবেদন ছিল মার্চিং রিদম ও উদ্দীপনামূলক লোকসঙ্গীতের এক অভূতপূর্ব মিশ্রণ। গানটি রচনার পরপরই আকাশবাণী কলকাতা কেন্দ্র থেকে এটি প্রচারের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

প্রথম রেকর্ডিং ও সম্প্রচার

১৯৭১ সালের ২২ এপ্রিল সন্ধ্যায় কলকাতার আকাশবাণী কেন্দ্র থেকে গানটি প্রথম সম্প্রচারিত হয়। গানটিতে একক কণ্ঠ দেন অংশুমান রায় এবং কোরাসে (সহযোগী কণ্ঠে) কণ্ঠ মেলান প্রখ্যাত সঙ্গীতশিল্পী করবী নাথ ও তাঁর সহশিল্পীরা।

বঙ্গবন্ধুর ভাষণের সংযোজন

গানটির বিশেষত্ব ও নাটকীয়তা বাড়াতে আকাশবাণী কর্তৃপক্ষ গানটির সুরের মাঝখানে ও শেষে বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের মূল অংশ—”এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম”—সংযোজন করে। সংগীতের সাথে বঙ্গবন্ধুর সেই বজ্রকণ্ঠ যুক্ত হওয়ায় গানটির প্রভাব শতগুণ বৃদ্ধি পায়। আকাশবাণীতে প্রচারের পর গানটি দাবানলের মতো জনপ্রিয়তা লাভ করে।

হিজ মাস্টার্স ভয়েস (HMV)-এর রেকর্ড

জনপ্রিয়তার কারণে ঐতিহ্যবাহী রেকর্ড কোম্পানি এইচএমভি (HMV) দ্রুত গানটি ৯৬২১২/ডি-১০১ ক্যাটালগ নম্বরে গ্রামোফোন ডিস্ক হিসেবে প্রকাশ করে। এর এক পিঠে ছিল ‘শোনো একটি মুজিবরের থেকে’ এবং অন্য পিঠে ছিল মান্না দে-র কণ্ঠে ‘জয় জয় নবজাত বাংলাদেশ’।

 

 

ইংরেজি সংস্করণ: The Voice of Not One, But Millions of Mujibars

গানটির সার্বজনীন আবেদন বৈশ্বিক অঙ্গনে পৌঁছানোর জন্য এর একটি ইংরেজি সংস্করণ তৈরি করা হয়। প্রখ্যাত ভারতীয় ইংরেজি কবি ও অনুবাদক প্রণব নন্দী গানটি ইংরেজিতে রূপান্তর করেন। ইংরেজি সংস্করণে কণ্ঠ দেন স্বয়ং অংশুমান রায়। ইংরেজি রেকর্ডটি আন্তর্জাতিকভাবে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে জনমত গঠনে বিরাট ভূমিকা রাখে।

 

 

মনোবল সৃষ্টি ও দূরদর্শিতা

২৫শে মার্চের পর যখন সাধারণ বাঙালি ও মুক্তিকামী মানুষ এক অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন এই গানটি বাঙালির মনে এই বিশ্বাস দৃঢ় করে যে—এক মুজিবকে গ্রেপ্তার বা বন্দী করা গেলেও বাংলার প্রতিটি ঘরে ঘরে আজ “লক্ষ মুজিব” জাগ্রত হয়েছে।

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে সংযোজন

আকাশবাণীতে প্রচারিত হওয়ার পর এটি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অন্যতম প্রধান ও নিয়মিত প্রচারিত গান হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়। রণাঙ্গনে মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল বাড়াতে প্রতিদিন এই গান বাজানো হতো।

সাংস্কৃতিক সংহতি

পশ্চিমবঙ্গের শিল্পী ও বুদ্ধিজীবীরা কীভাবে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন, এই গানটি তার অন্যতম উজ্জ্বল নিদর্শন।
গৌরী প্রসন্ন মজুমদার
গৌরী প্রসন্ন মজুমদার

শোন একটি মুজিবরের থেকে পুরো গানের লিরিক্স

শোন একটি মুজিবরের থেকে
লক্ষ মুজিবরের কন্ঠস্বরের ধ্বনি-প্রতিধ্বনি
আকাশে বাতাসে ওঠে রণী
বাংলাদেশ, আমার বাংলাদেশ।।

এই সবুজের বুকে চেরা মেঠো পথে
আবার যে যাব ফিরে, আমার
হারানো বাংলাকে আবার তো ফিরে পাব
শিল্পে-কাব্যে কোথায় আছে
হায়রে এমন সোনার খনি।।

বিশ্ব কবির ‘সোনার বাংলা’,
নজরুলের ‘বাংলাদেশ’,
জীবনানন্দের ‘রূপসী বাংলা’
রূপের যে তার নেই কো শেষ, বাংলাদেশ।

জয় বাংলা বলতে মন রে আমার
এখনও কেন ভাবো আবার
হারানো বাংলাকে আবার তো ফিরে পাব
অন্ধকারে পূর্বাকাশে-, উঠবে আবার দিনমণি।।

স্বীকৃতি ও অপরাজেয় উত্তরাধিকার

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের পর, ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গভবনে এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বয়ং গীতিকার গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার ও সুরকার অংশুমান রায়কে আমন্ত্রণ জানান এবং এই কালজয়ী সৃষ্টির জন্য তাঁদের ব্যক্তিগতভাবে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা ও সংবর্ধনা জ্ঞাপন করেন।

পরবর্তীতে ২০১২ সালে বাংলাদেশ সরকার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও সংস্কৃতির ওপর অনন্য অবদানের জন্য গীতিকার গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার এবং সুরকার ও শিল্পী অংশুমান রায়কে মরণোত্তর ‘মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা’ (Friends of Liberation War Honour)-এ ভূষিত করে।

‘শোনো একটি মুজিবরের থেকে’ গানটি কেবল একটি সুরের সৃষ্টি নয়; এটি স্বাধীন বাংলাদেশের অস্তিত্ব, বঙ্গবন্ধুর কালজয়ী ব্যক্তিত্ব এবং মুক্তিযুদ্ধের অবিনাশী চেতনার এক ঐতিহাসিক সঙ্গীত-দলিল।

 

 

শেয়ার করুন: Facebook X WhatsApp LinkedIn

প্রেস ডেস্ক, সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর এর অফিস

সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর এর নিজের সকল লেখা, শুভেচ্ছা, স্মরণ ইত্যাদি এই ডেস্ক থেকে প্রকাশিত হয়।

সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক, কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগ। ইতিহাস, রাজনীতি, প্রযুক্তি ও উন্নয়ন নিয়ে লেখালেখি।

যোগাযোগ

কুমারখালী বাস স্ট্যান্ড, দুর্গাপুর, কুমারখালী।
+৮৮০ (১৭) ৬৩০৩৮,৬৩০৩৯।contact@sufifaruq.com

© ২০২৬ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।