রাজনীতিতে মতভেদ থাকবে, আদর্শিক লড়াই থাকবে, এমনকি তীব্র শত্রুতাও থাকতে পারে; কিন্তু তাই বলে প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করতে গিয়ে কারও পেশা, দারিদ্র্য, ধর্ম কিংবা লিঙ্গকে খাটো করে গালি দেওয়া কি বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সাথে যায়? এটি কি একজন প্রকৃত আত্মমর্যাদাশীল রাজনৈতিক কর্মীর কাজ হতে পারে?
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর সারাটি জীবন উৎসর্গ করেছিলেন এই বাংলার সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য। অধিকারবঞ্চিত মানুষের মুখে হাসি ফোটানোই ছিল তাঁর রাজনীতির মূল দর্শন। তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি কখনোই কোনো পেশা, ধর্ম বা লিঙ্গকে ছোট করে কাউকে তাচ্ছিল্য করেননি।
“ড্রাইভারের বাচ্চা”, “হেল্পারের জাত” কিংবা “ফকিন্নির বাচ্চা”—এমন কুরুচিপূর্ণ শব্দচয়ন বঙ্গবন্ধুর অভিধানে ছিল না। বরং তিনি রিকশাচালক থেকে শুরু করে সমাজের সবচেয়ে অবহেলিত মেহনতি মানুষটিকেও পরম মমতায় বুকে জড়িয়ে ধরেছেন, তাঁদের ‘ভাই’ বলে সম্বোধন করেছেন। আজ যাঁরা নিজেদের বঙ্গবন্ধুর সৈনিক বা অনুসারী বলে দাবি করেন, তাঁদের মুখে কি এই ধরনের সামন্তবাদী ও বিদ্বেষপূর্ণ ভাষা মানায়?
আমাদের মনে রাখতে হবে, অশালীন ও দম্ভপূর্ণ ভাষা কেবল তাঁদেরই মানায়, যাঁরা নিজেদের ‘এলিট’ বা শাসক মনে করে—যাঁদের রাজনীতি ছিল সাধারণ মানুষকে প্রজা ভাবার। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখবেন, এই ঔদ্ধত্যপূর্ণ ভাষা ছিল ফকা চৌধুরী (সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বাবা) বা তাঁদের মতো স্বৈরাচারী ও সামন্ততান্ত্রিক মানসিকতার উত্তরসূরিদের; এটি কখনোই আওয়ামী লীগের আদর্শিক ভাষা হতে পারে না।
পরিস্থিতি যতই উত্তপ্ত হোক বা প্রতিপক্ষ যত বড়ই শত্রু হোক—কারও পেশা, জাত-পাত, ধর্ম বা জেন্ডারকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে গালি দেওয়া চরম রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বের লক্ষণ।
আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের জন্মই হয়েছিল কৃষক, শ্রমিক, মজুর এবং প্রান্তিক মেহনতি মানুষের অধিকার আদায়ের লড়াই থেকে। তথাকথিত ড্রইংরুমের ‘ভদ্রলোক’ বা সুবিধাবাদী সুশীল সমাজ নয়, বরং রোদ-বৃষ্টিতে পোড়া খেটে খাওয়া এই মানুষগুলোই দলটির মূল ভিত্তি এবং প্রধান চালিকাশক্তি। আজ হয়তো আধুনিকতার বাহ্যিক চাকচিক্যে সেটা সবসময় দৃশ্যমান হয় না, কিন্তু এই শ্রেণী-পেশার মানুষগুলোকে অপমান করা মানে দলের আত্মাকেই অপমান করা।
তাই আসুন, মুখে বঙ্গবন্ধুর নাম নেওয়ার আগে তাঁর জীবনাচরণ ও শিষ্টাচারকে হৃদয়ে ধারণ করি। রাজনৈতিক বিরোধ থাকবে, কিন্তু শালীনতা যেন হারিয়ে না যায়। ঘৃণা বা বিদ্বেষ ছড়ানো নয়, বরং মানুষের মানবিক মর্যাদাই হোক আমাদের রাজনীতির মূল ভাষা।