ইতিহাসের এক অদ্ভুত ও নিষ্ঠুর পরিহাসের নাম ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলিম সমাজ। এই জনপদে যখনই কোনো দূরদর্শী নেতা বা সংস্কারক জাতিকে অন্ধকার কূপ থেকে তুলে আলোর রাজপথে দাঁড় করাতে চেয়েছেন, ঠিক তখনই তাঁর সবচেয়ে বড় শত্রু হয়ে দাঁড়িয়েছে তাঁরই স্বজাতীয় তথাকথিত ধর্মীয় নেতৃত্ব। আমরা এমন এক জাতি, যারা সবসময় মুক্তির দিশারীকে ‘শত্রু’ আর উসকানিদাতাকে ‘ত্রাতা’ হিসেবে গ্রহণ করি।
আমাদের এই দীর্ঘ পথচলায় যখনই জ্ঞান-বিজ্ঞানের ডাক এসেছে, তখনই ‘ধর্ম গেল’ রব তুলে সাধারণ ও আবেগী মুসলিমদের খেপিয়ে তোলা হয়েছে। ফতোয়ার কারখানায় রাতারাতি তৈরি করা হয়েছে ‘কাফের’ কিংবা ‘দাজ্জাল’-এর তকমা। আমাদের ট্র্যাজেডি হলো—আমরা আমাদের প্রকৃত বন্ধুদের চিনতে বরাবরই ভুল করেছি; আমরা তাঁদের কণ্ঠনালী কেটে দিয়েছি, হাত-পা ভেঙে দিয়েছি, আর তাঁরা যখন মারা গেছেন, তখন তাঁদের চিতা বা কবরের ওপর দাঁড়িয়ে প্রগতির বুলি কপচিয়েছি।
আমার আজকের এই লেখাটির উদ্দেশ্য হলো আমাদের সেই আত্মঘাতী ইতিহাসকে চেনা এবং বর্তমানের আয়নায় নিজেদের ক্ষতবিক্ষত মুখগুলো একবার দেখে নেওয়া। আসুন কিছু মহাপ্রাণ মানুষের আমরা কি করেছি, তার একটু আলোচান করি।
আমাদের শত্রু মিত্র । ইসলাম ও মুসলিম সিরিজ

স্যার সৈয়দ আহমদ খান:
আজ আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়কে আমরা গর্বের প্রতীক মানি। স্যার সৈয়দ আহমদ খানকে আধুনিক মুসলিম রেনেসাঁর স্থপতি বলে ডাকি। কিন্তু ১৮৭৫ সালে যখন তিনি এই স্বপ্ন বুনেছিলেন, তখন দৃশ্যপট ছিল ভয়াবহ। তৎকালীন আলেমরা তাঁকে ‘দাজ্জাল’ ও ‘ধর্মত্যাগী’ উপাধি দিয়েছিলেন।
তৎকালীন আলেমরা একাট্টা হয়ে তাঁর বিরুদ্ধে ৬৪টি ফতোয়া দিয়েছিলেন। মক্কা থেকে এসেছিল আরও ৮টি ফতোয়া। এমনকি তাঁকে ‘কতল করা ওয়াজিব’ (হত্যা করা আবশ্যক) ঘোষণা করা হয়েছিল। আলিগড় প্রতিষ্ঠায় যত রকম বাধা দেওয়া সম্ভব, সব দেওয়া হয়েছিল; তাঁকে সাহায্য করাকে করা হয়েছিল ‘হারাম’। আজ ভারতের মুসলিমরা তাঁর নামের সাথে “রহমতুল্লাহ আলাইহি” যোগ করে। ধর্মভিত্তিক ইসলামিক দলগুলো এখন তাঁর নামকে রাজনীতির ‘পুঁজি’ হিসেবে ব্যবহার করে, তাঁকে প্রগতির প্রতীক হিসেবে ‘Showcase’ করে। অথচ ইতিহাস সাক্ষী, আজ যারা তাঁর নামে শোকেস সাজায়, তাদের পূর্বপুরুষরাই সেদিন তাঁর কণ্ঠরোধ করতে সর্বোচ্চ শক্তি ব্যয় করেছিল।
আলিগড় প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে স্যার সৈয়দ এতটাই অর্থাভাবে পড়েছিলেন যে, দ্বারে দ্বারে ঘুরেও যখন পর্যাপ্ত সাহায্য পাচ্ছিলেন না, তখন তিনি শেষ পর্যন্ত ‘তবায়েফ’ (বারবনিতা বা নর্তকী) পাড়ায় গিয়ে অর্থ সাহায্য চাইতে বাধ্য হয়েছিলেন। ইতিহাস বলে, শুরুতে তবায়েফরা তাঁকে খোঁচা দিয়ে বলেছিলেন— “এত মুসলিম রইস (বিত্তশালী) থাকতে আমাদের কাছে কেন আসতে হবে? আর আমাদের অর্থ যদি নিতেই হয়, তবে আপনাকে পায়ে ঝুমুর বেঁধে আসতে হবে।” শিক্ষার প্রসারের নেশায় বুঁদ এই মহৎ মানুষটি সেদিন নিজের আত্মসম্মানের চেয়ে কওমের ভবিষ্যৎকে বড় করে দেখেছিলেন। তিনি সত্যিই যখন পায়ে ঝুমুর বেঁধে তবায়েফদের সামনে এসে দাঁড়ালেন, তখন তাঁর সেই ত্যাগ দেখে তারা কান্নায় লুটিয়ে পড়েছিল। তারা তাদের সোনা-হীরা ও গয়নাগাটি অকাতরে দান করেছিলেন আলিগড় নির্মাণের জন্য। যে কওমকে তিনি অন্ধকার থেকে আলোর পথে আনতে চেয়েছিলেন, সেই কওমের ‘শরিফ’ মানুষেরা তাঁকে তাড়িয়ে দিয়েছিল, অথচ ‘গুনাহগার’ তবায়েফরা সেদিন তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছিল।
সেই সময়ের আলেমদের দ্বিচারিতা বা মুনাফেকি দেখুন—আলিগড় প্রতিষ্ঠার সময় তারা যে ভয়াবহ বিরোধিতা করেছিলেন, কয়েক বছর পর যখন আলিগড়ের সুফল দেখা দিতে শুরু করল, তখন সেই তারাই আবার সবার আগে নিজেদের সন্তানদের আলিগড়ে পড়তে পাঠালেন। ইংরেজি শিক্ষা যাকে তারা ‘জাহান্নামের পথ’ বলেছিলেন, শেষ পর্যন্ত সেই পথকেই তারা বৈষয়িক উন্নতির একমাত্র চাবিকাঠি হিসেবে মেনে নিলেন। কিন্তু ততদিনে স্যার সৈয়দের পিঠে অপমানের শত শত ক্ষত হয়ে গেছে।

মাওলানা আবুল কালাম আজাদ
মাওলানা আজাদ ছিলেন ইসলামের অগাধ পাণ্ডিত্য ও আধুনিক রাজনৈতিক প্রজ্ঞার এক বিরল সংমিশ্রণ। কিন্তু আমাদের কওম তাঁর সেই প্রজ্ঞার কদর করার বদলে তাঁকে আজীবন একাকীত্বের দহনে পুড়িয়েছে।
১৯১৪ সালের দিকে মাওলানা আজাদের জ্ঞান ও পাণ্ডিত্যে মুগ্ধ হয়ে তৎকালীন ভারতের শীর্ষস্থানীয় আলেম ও চিন্তাবিদদের একাংশ তাঁকে ‘ইমামে হিন্দ’ (ভারতের ধর্মীয় নেতা) হিসেবে ঘোষণা করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু বিধি বাম! একদল কট্টরপন্থী আলেম ও রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী কেবল রাজনৈতিক মতভেদের কারণে এই উদ্যোগের তীব্র বিরোধিতা করেন। তাঁরা যুক্তি দিলেন—মাওলানা আজাদের বয়স কম এবং তাঁর রাজনৈতিক চিন্তাধারা ‘ভিন্ন’। অথচ ইসলামের সূক্ষ্ম ব্যাখ্যায় তাঁর সমকক্ষ তখন ভারতে খুব কমই ছিল। শেষ পর্যন্ত কাদা ছোড়াছুড়ি আর অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে তাঁকে সেই প্রাপ্য সম্মানটুকু দেওয়া হয়নি। আমরা এমন এক জাতি, যারা যোগ্যতাকে সম্মানের চেয়ে ঈর্ষার চোখে দেখতে বেশি পছন্দ করি।
যখন মুসলিম সমাজ আবেগের জোয়ারে ভেসে দেশভাগের স্বপ্নে বিভোর, তখন আজাদ চড়া গলায় সাবধান করেছিলেন। তিনি জানতেন, এই দেশভাগ ভারতীয় মুসলমানদের জন্য এক দীর্ঘস্থায়ী যন্ত্রণার কারণ হবে। ১৯৪৭ সালের সেই থমথমে সময়ে দিল্লির জামে মসজিদের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে নিঃসঙ্গ এক আজাদের সেই আর্তনাদ আজও আকাশে-বাতাসে প্রতিধ্বনিত হয়। তিনি বলেছিলেন:
“আমি তোমাদের সাবধান করতে ডাক দিয়েছিলাম, তোমরা আমার কণ্ঠনালী কেটে দিলে।
আমি কলম উঠালাম, তোমরা আমার হাত কেটে নিলে।
আমি আগানোর চেষ্টা করলাম, তোমরা আমার পা কেটে দিলে।
আমি ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলাম, তোমরা আমার মাজা ভেঙে দিলে।”
মুসলিম লীগ ও তৎকালীন রক্ষণশীল আলেমরা তাঁকে ‘কংগ্রেসের শো-বয়’ বা ‘ইসলামের শত্রু’ বলে গালি দিয়েছিলেন। অথচ আজ যখন আমরা ভারতের মুসলিমদের প্রান্তিক অবস্থান দেখি, তখন আজাদের সেই চূর্ণ হওয়া ‘মাজা’ আর ‘ভাঙা পা’-এর বেদনা প্রতিটি ধুলিকণায় অনুভব করি।
দেশভাগের পর যখন কয়েক লাখ বিধ্বস্ত মুসলমান ভারতে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন, তখন তাঁরা ছিলেন সম্পূর্ণ দিশেহারা, আতঙ্কিত এবং অভিভাবকহীন। ঠিক সেই মুহূর্তে মাওলানা আজাদ তাঁর বিশাল ব্যক্তিত্ব নিয়ে পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়েছিলেন। তিনি পণ্ডিত নেহরু ও প্যাটেলকে চোখে চোখ রেখে স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন যে, ভারতের সংবিধানে মুসলমানদের সমান অধিকার থাকতে হবে।
আজাদ যখন ভারতের প্রথম শিক্ষামন্ত্রী হলেন, তিনি কেবল স্কুল-কলেজ গড়েননি, বরং মুসলমানদের মনে এই আত্মবিশ্বাস বুনে দিয়েছিলেন যে— “এই মাটি তোমাদেরও, এখান থেকে পালানোর কিছু নেই।” তাঁর বিখ্যাত একটি উক্তি ছিল, “ভারতের প্রতিটি ধূলিকণা তোমাদের পূর্বপুরুষদের ঘাম আর রক্তে ভেজা, তাই এখানে পরগাছা হয়ে নয়, নাগরিক হয়ে বাঁচো।”

নবাব আব্দুল লতিফ: বাংলার বিস্মৃত নায়ক
বাংলার মুসলিম রেনেসাঁর ইতিহাসে নবাব আব্দুল লতিফ এমন এক নাম, যাকে ছাড়া আধুনিক বাঙালি মুসলমানের অস্তিত্ব কল্পনা করা কঠিন। কিন্তু তাঁকে যে বাধার মুখে পড়তে হয়েছিল, তা আজকে ভাবলে আপনি শিউরে উঠবেন।
১৮৫৩ সালের কথা। কলকাতার আলিয়া মাদ্রাসার শিক্ষা পদ্ধতি কেমন হওয়া উচিত, তা নিয়ে একটি সরকারি কমিটি গঠন করা হয়। নবাব আব্দুল লতিফ প্রস্তাব দিলেন— মুসলিম ছাত্রদের আধুনিক বিশ্বের সাথে পাল্লা দিতে হলে অবশ্যই ইংরেজি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করতে হবে।
এই প্রস্তাব জানাজানি হতেই তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজ ও একদল আলেম ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। তাঁর এই প্রস্তাবের বিরোধিতায় এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করা হয় যে, তাঁকে সরাসরি ‘কাফের’ এবং ‘ইসলামের দুশমন’ বলে গালি দেওয়া হয়। সেই সময়ের একটি সুনির্দিষ্ট ঘটনা হলো— কলকাতার কতিপয় প্রভাবশালী ব্যক্তি একটি সভা ডেকে ফতোয়া দেন যে, ইংরেজি শেখা আর শুকরের মাংস খাওয়া সমান গুনাহের কাজ। এমনকি নবাব আব্দুল লতিফ যখন পথে বের হতেন, তখন তাঁকে দেখে লোকে থুথু ফেলত এবং ‘ব্রিটিশদের গোলাম’ বলে টিটকারি দিত।
(সূত্র: “A Short Account of My Public Life” – Nawab Abdul Lutf, ১৮৮৫)
১৮৬৩ সালে যখন তিনি ‘মোহামেডান লিটারারি সোসাইটি’ প্রতিষ্ঠা করলেন, তখন কট্টরপন্থীরা অপপ্রচার চালিয়েছিল যে, এখানে গেলে মুসলিমদের খ্রিস্টান বানানো হয়। কিন্তু তিনি দমে যাননি। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, যদি মুসলমানরা ইংরেজি না শেখে, তবে তারা চিরকাল হিন্দুদের পেছনে পড়ে থাকবে এবং কেবল পিয়ন-চাপরাশি হয়েই জীবন কাটাবে। আজ আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা আধুনিক আলিয়া মাদ্রাসার যে গৌরব দেখি, তার ভিত্তিপ্রস্তর ছিল তাঁর এই প্রচণ্ড নিন্দিত হওয়া উদ্যোগগুলোই।
আজ বাংলার মুসলিম সমাজ যতটুকু শিক্ষিত বা প্রতিষ্ঠিত, তার শেকড় প্রোথিত ছিল তাঁর সেই ‘ধর্মত্যাগী’ খেতাব পাওয়া উদ্যোগে। অথচ আজ আমরা নবাব আব্দুল লতিফের নাম জানি না বললেই চলে। তাঁকে আমরা ইতিহাসের ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছি। অথচ তাঁর সমসাময়িক যে আলেমরা তাঁকে ‘জাহান্নামি’ বলে গালি দিয়েছিলেন, তাঁদের উত্তরসূরিরাই আজ বিদেশের বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি নিয়ে গর্ব করে বেড়ান।
নবাব আব্দুল লতিফ প্রমাণ করে গেছেন যে, এই সমাজে নিজের জাতির জন্য ভালো কিছু করতে হলে ‘কাফের’ হওয়ার গালি কপালে নিয়েই নামতে হয়। আমরা তাঁকে জীবদ্দশায় সামাজিক বয়কট করেছি, আর মৃত্যুর পর তাঁকে বিস্মৃতির অতলে পাঠিয়ে দিয়েছি। আমরা আসলে এমনই এক অকৃতজ্ঞ জাতি, যারা অন্ধকারের ব্যবসায়ীদের মাথায় তুলে রাখি আর আলোর মশালবাহীদের পাথর ছুড়ে মারি।

বেগম রোকেয়া: অন্দরমহলের যুদ্ধ
নারী শিক্ষার অগ্রদূত বেগম রোকেয়া যখন মুসলিম মেয়েদের অন্ধকার কুঠুরি থেকে আলোর পথে আনার সংগ্রাম শুরু করেছিলেন, তখন তাঁর সবচেয়ে বড় শত্রু ছিল ঘরের কাছের ধর্মব্যবসায়ীরা। যে ধর্ম নারীকে জ্ঞান অর্জনের নির্দেশ দিয়েছে, সেই ধর্মের অপব্যাখ্যা দিয়েই তাঁর পথকে কণ্টকাকীর্ণ করা হয়েছিল।
১৯০৯ সালে ভাগলপুরে যখন তিনি প্রথম পাঁচটি মেয়ে নিয়ে স্কুল শুরু করলেন, তখন স্থানীয় তথাকথিত ‘শরিফ’ বা সম্ভ্রান্ত মুসলিম সমাজ এবং মোল্লারা তাঁর ওপর এমন আক্রমণ শুরু করেন যা কল্পনা করাও কঠিন। ঐতিহাসিক সূত্র থেকে জানা যায়, তিনি যখন মেয়েদের স্কুলে আনার জন্য বাড়ি বাড়ি যেতেন, তখন তাঁকে কেবল অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজই করা হতো না, বরং তাঁর ওপর পাথর পর্যন্ত ছোড়া হয়েছিল। তাঁকে ‘বেহায়া’ এবং ‘ধর্ম নষ্টকারী’ বলে প্রচার করা হতো যাতে কোনো পরিবার তাদের মেয়েদের তাঁর স্কুলে না পাঠায়।
(সূত্র: “বেগম রোকেয়া: সময় ও সাহিত্য” – মোবাশ্বের আলী)
পরবর্তীতে ১৯১১ সালে যখন তিনি কলকাতায় ‘সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল’ প্রতিষ্ঠা করেন, তখন বাধা আরও প্রকট হয়। তৎকালীন কট্টরপন্থী পত্রিকাগুলোতে তাঁর বিরুদ্ধে প্রবন্ধ লিখে প্রচার করা হতো যে, রোকেয়া মুসলিম মেয়েদের খ্রিস্টান বানাচ্ছেন এবং সমাজকে ধ্বংস করছেন। তাঁকে সরাসরি ‘নাস্তিক’ এবং ‘ইসলাম বিরোধী’ আখ্যা দিয়ে সামাজিক বয়কটের ডাক দেওয়া হয়েছিল। এমনকি তাঁর নিজের আত্মীয়-স্বজনরাও তাঁর সাথে যোগাযোগ রাখতে ভয় পেতেন পাছে সমাজ তাদের ত্যাগ করে।
বেগম রোকেয়া বুঝতে পেরেছিলেন যে, এই অন্ধকার মানসিকতার মানুষদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হলে কলম ও কাজ দুটোই সমানতালে চালাতে হবে। তিনি তাঁর ‘অবরোধবাসিনী’ ও ‘মতিচূর’ বইতে এই ধর্মব্যবসায়ীদের ভণ্ডামিকে তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গবাণে বিদ্ধ করেছেন। আজ যারা গদগদ হয়ে ‘রোকেয়া দিবস’ পালন করেন এবং তাঁকে নারী জাগরণের আইকন হিসেবে Showcase করেন, তাঁদের অনেকেই ভুলে যান যে—সেদিন রোকেয়াকে পথে ঘাটে অপমান করার মানুষগুলো অন্য কেউ ছিল না, ছিল তাঁরই স্বজাতি এবং তথাকথিত ধর্মরক্ষকরা।
আজ যদি এই উপমহাদেশের মুসলিম নারীরা শিক্ষিত হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে কিংবা বড় পদে আসীন হয়—তবে তা বেগম রোকেয়ার একরোখা জেদের কারণে হয়েছে, সেই সময়কার ফতোয়াবাজদের করুণায় নয়। বেগম রোকেয়া প্রমাণ করে গেছেন, মুসলিম সমাজে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে গেলে খোদ ধর্মের ধ্বজাধারীদের বিরুদ্ধেই সবার আগে লড়তে হয়।

কাজী নজরুল ইসলাম: ‘কাফের’ থেকে তথাকথিত ‘ইসলামী আইকন’
যিনি আমাদের ঘুমন্ত জাতিকে জাগিয়ে তুলতে ‘বিদ্রোহী’র মতো কবিতা উপহার দিলেন, যাঁর কণ্ঠে উচ্চারিত হলো সাম্য আর মানবতার জয়গান—সেই কাজী নজরুল ইসলামকে নিজের কওমের লোকেরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতবিক্ষত করেছে।
নজরুল যখন সংকীর্ণ সাম্প্রদায়িকতার উর্ধ্বে উঠে মানুষের জয়গান গাইলেন, তখন তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজ তাঁকে ত্যাজ্য ঘোষণা করেছিল। ১৯২৩ সালের দিকে ‘ইসলাম দর্শন’ নামক পত্রিকায় নজরুলের বিরুদ্ধে বিষোদগার করে বলা হয়েছিল— “নজরুল ইসলাম শয়তানের চ্যালা, তাঁহার ঈমান ধ্বংস হইয়া গিয়াছে।” নজরুলকে সরাসরি ‘কাফের’ ও ‘মুরতাদ’ ঘোষণা করা হয়েছিল কারণ তিনি ধর্মকে ভণ্ডামির বোরখা হিসেবে ব্যবহার না করে ভালোবাসার পথ দেখিয়েছিলেন।
আজকের দিনের সবচেয়ে বড় পরিহাস হলো, এদেশের সেই ধর্মজীবী ও ‘বেহেশতের বিক্রেতারা’ এখন নজরুলকে নিয়ে সবচেয়ে বেশি গর্ব করে। যে নজরুলকে তাঁদের পূর্বপুরুষেরা ‘কাফের’ বলে গালি দিয়েছিল, আজ সেই নজরুলকেই তাঁরা তাঁদের সাম্প্রদায়িক এজেন্ডা বাস্তবায়নের প্রধান অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে।
তাঁরা অত্যন্ত চতুরতার সাথে নজরুলকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিরুদ্ধে এক কাল্পনিক যুদ্ধে দাঁড় করানোর চেষ্টা করে। নজরুলকে একটি নির্দিষ্ট গণ্ডিতে বন্দী করে তাঁকে ‘মুসলিম কবি’ হিসেবে Showcase করা হয়, যেন তিনি কেবল হিন্দুদের বা অন্যদের বিরোধী ছিলেন। অথচ নজরুল নিজেই লিখেছিলেন—
“কেউ বলে হিন্দু কেউ বলে মোসলেমান, আমি বলি ওরে ভাই তোরা একই মায়ের সন্তান।”
যারা আজ নজরুলকে রবীন্দ্রনাথের প্রতিপক্ষ বানিয়ে সাম্প্রদায়িক বিভেদ সৃষ্টি করতে চায়, তারা নজরুলের উদারতাবাদ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে গলা টিপে হত্যা করছে।
আজ আমরা কাজী নজরুল ইসলামকে আমাদের ‘জাতীয় কবি’ হিসেবে পুঁজিতে রূপান্তর করেছি। তাঁর মাজারের পাশে মসজিদের আজান হয় বলে আমরা গর্ব করি, অথচ তাঁর সেই অসাম্প্রদায়িক আর প্রগতিশীল দর্শনকে আমরা আজও মনে-প্রাণে ঘৃণা করি। যে নজরুলকে আমরা জীবদ্দশায় অভুক্ত রেখেছি, ফতোয়া দিয়ে অপমান করেছি, আজ তাঁকে ‘ধর্মীয় ঢাল’ হিসেবে ব্যবহার করা আমাদের ঐতিহাসিক মুনাফেকিরই নামান্তর।
আমরা নজরুলের ‘বিদ্রোহী’র স্তুতি করি, কিন্তু আমাদের সমাজের কোনো তরুণ নজরুলের মতো স্বাধীন চিন্তা করলে তাকেই সবার আগে ‘নাস্তিক’ বলে পাথর ছুড়ি। নজরুল প্রমাণ করে গেছেন যে, এই কওম কেবল সেই সত্যকেই ভালোবাসে যা মৃত এবং যাকে নিজেদের সুবিধামতো ব্যাখ্যা করা যায়।

শেখ আবদুল্লাহ (পাপা মিঞা)
বেগম রোকেয়া যেমন বাংলায় লড়েছেন, শেখ আবদুল্লাহ লড়েছেন উত্তর ভারতের আলিগড়ে। কিন্তু তাঁর পথটি ছিল অবিশ্বাস্য রকমের কণ্টকাকীর্ণ।
১৯০৬ সালে যখন তিনি আলিগড়ে মেয়েদের জন্য প্রথম স্কুলটি চালু করার চেষ্টা করেন, তখন আলেমরা পুরো মুসলিম সমাজকে তাঁর বিরুদ্ধে খেপিয়ে তোলেন। সেই সময় প্রগতিশীল পত্রিকাগুলোতে নারী শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নিবন্ধ ছাপা হতো। রক্ষণশীল গোষ্ঠী অপপ্রচার চালায় যে, শেখ আবদুল্লাহর স্কুলে মেয়েদের ছবি তোলা হবে এবং তা পরপুরুষদের দেখানো হবে।
এই সামান্য গুজবকে কেন্দ্র করে আলিগড়ের একদল প্রভাবশালী ব্যক্তি ও আলেম একটি সভা ডেকে শেখ আবদুল্লাহকে ‘শয়তানের বন্ধু’ হিসেবে ঘোষণা করেন। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, এক জুমার নামাজের পর একদল উত্তেজিত জনতা তাঁর ওপর চড়াও হওয়ার জন্য তাঁর বাসার সামনে জড়ো হয়। তাঁর বাসার জানালা লক্ষ্য করে পাথর ছোড়া হয়েছিল। এমনকি মসজিদের খুতবায় ফতোয়া দেওয়া হয়েছিল যে— “যে ব্যক্তি শেখ আবদুল্লাহর স্কুলে নিজের মেয়েকে পাঠাবে, সে ইসলাম থেকে খারিজ হয়ে যাবে এবং তার জানাজা পড়া হবে না।”
(সূত্র: “Ariel” – Aligarh Muslim University Women’s College Journal এবং শেখ আবদুল্লাহর আত্মজীবনী “Mushahidat-o-Taasurat”)
সবচেয়ে বড় লড়াইটি লড়েছিলেন তাঁর স্ত্রী ওয়াহিদ জাহান বেগম (যাকে ছাত্রীরা ‘আলা বি’ ডাকতেন)। যখন কোনো অভিভাবক মেয়েকে স্কুলে পাঠাতে রাজি হচ্ছিলেন না, তখন তিনি পর্দা প্রথা বজায় রেখেই ঘরে ঘরে গিয়ে মায়েদের বোঝাতেন। রক্ষণশীল মহিলারা তখন তাঁকে ‘খ্রিস্টান’ বলে গালি দিয়ে দরজা বন্ধ করে দিতেন। কিন্তু দমে না গিয়ে এই দম্পতি নিজের পকেটের টাকা খরচ করে ঘোড়ার গাড়ি পাঠিয়ে মেয়েদের স্কুলে আনার ব্যবস্থা করেন, যাতে কেউ বলতে না পারে যে মেয়েরা রাস্তায় পরপুরুষের সামনে পড়ছে।
আজ আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘উইমেন্স কলেজ’ সারা বিশ্বের কাছে একটি গর্বের নাম। আমরা গর্ব করে বলি যে আমাদের একটি নারী শিক্ষার ঐতিহ্য আছে। কিন্তু ইতিহাস বলে, আজ যারা এই কলেজ নিয়ে গর্ব করে, তাদের পূর্বপুরুষরা সেদিন শেখ আবদুল্লাহর প্রাণনাশের চেষ্টা করেছিল। আজ তাঁকে আমরা ‘পাপা মিঞা’ বলে আদরে ডাকি এবং তাঁর নামকে প্রগতির প্রতীক হিসেবে Showcase করি, কিন্তু তাঁর সময়ের সেই ফতোয়া আর অপমানের দগদগে ক্ষতগুলো আমরা সুকৌশলে চেপে যাই।
শেখ আবদুল্লাহ প্রমাণ করে গেছেন যে, মুসলিম সমাজে সংস্কার আনতে গেলে আপনাকে শত্রুর আগে নিজের আপনজনদের নিক্ষিপ্ত পাথরের সাথেও যুদ্ধ করতে হবে।

ফজলুর রহমান
ফজলুর রহমান ছিলেন বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইসলামিক স্কলার এবং দার্শনিক। অক্সফোর্ড থেকে পিএইচডি করা এই মানুষটি যখন নিজের জ্ঞানকে মুসলিম উম্মাহর আধুনিকায়নে ব্যয় করতে চাইলেন, তখন দেশ ও জাতি তাঁকে কী প্রতিদান দিয়েছিল, তা আমাদের জন্য এক পরম লজ্জা।
১৯৬০-এর দশকে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান তাঁকে ‘ইসলামিক রিসার্চ ইনস্টিটিউট’-এর পরিচালক নিযুক্ত করেন। ১৯৬৮ সালে ফজলুর রহমান তাঁর বিখ্যাত ‘Islam’ গ্রন্থটি প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি ওহির প্রকৃতি এবং ফেরেশতা জিবরাইলের (আ.) ওহি নিয়ে আসার প্রক্রিয়া সম্পর্কে একটি তাত্ত্বিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন।
এই ব্যাখ্যাকে কেন্দ্র করে তৎকালীন জামায়াতে ইসলামীসহ কট্টরপন্থী দলগুলো দাবি করে যে, ফজলুর রহমান ওহিকে অস্বীকার করেছেন। করাচি এবং লাহোরের রাজপথে হাজার হাজার মানুষ নেমে আসে। তাদের স্লোগান ছিল— “ফজলুর রহমানকে ফাঁসি দাও”। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ ছিল যে, সে সময় পাকিস্তানের ছোট শহরগুলোতেও তাঁর কুশপুত্তলিকা পোড়ানো হয়েছিল। এমনকি অনেক মসজিদের খুতবায় তাঁকে প্রকাশ্য ‘মুরতাদ’ ঘোষণা করে তাঁকে হত্যা করা জান্নাতের পথ হিসেবে প্রচার করা হয়।
(সূত্র: “Islam and Modernity” – Fazlur Rahman এবং পাকিস্তানের তৎকালীন সংবাদপত্রের আর্কাইভ)
তিনি যখন সুদের (Riba) আধুনিক অর্থনৈতিক ব্যাখ্যা দিলেন এবং বহুবিবাহ নিয়ন্ত্রণে ‘মুসলিম পারিবারিক আইন’ (Family Laws Ordinance) সংস্কারের পক্ষে যুক্তি দিলেন, তখন মোল্লারা তাঁর বিরুদ্ধে এক অলিখিত যুদ্ধ ঘোষণা করে। আইয়ুব খান শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক চাপের মুখে নতি স্বীকার করেন এবং তাঁর সবচেয়ে যোগ্য এই বুদ্ধিজীবীকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়।
অবস্থা যখন এমন পর্যায়ে পৌঁছাল যে, তাঁকে পাহারা দেওয়ার জন্য সার্বক্ষণিক পুলিশ মোতায়েন করতে হতো এবং যে কোনো মুহূর্তে তাঁকে গুপ্তহত্যার সম্ভাবনা দেখা দিল, তখন এই মহীরুহ ১৯৬৯ সালে পাকিস্তান ত্যাগ করতে বাধ্য হন। তিনি আমেরিকায় চলে যান এবং শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। অবাক করা বিষয় হলো, যে মানুষটিকে আমরা দেশ থেকে তাড়িয়েছিলাম, তাঁর হাত ধরেই শিকাগোতে আধুনিক ইসলামিক স্টাডিজের একটি নতুন ধারা তৈরি হয়, যা আজ বিশ্বজুড়ে সমাদৃত।
আমরা আমাদের শ্রেষ্ঠ মস্তিষ্কগুলোকে দেশছাড়া করতে ওস্তাদ। যে ফজলুর রহমান হতে পারতেন মুসলিম বিশ্বের আধুনিক রেনেসাঁর ‘থিংক ট্যাংক’, তাঁকে আমরা ‘মুরতাদ’ গালি দিয়ে বিদায় করেছি। আর আজ যখন পশ্চিমা বিশ্বে তাঁর বইগুলো শ্রেষ্ঠ রেফারেন্স হিসেবে পড়ানো হয়, তখন আমরা বুক ফুলিয়ে বলি— “ফজলুর রহমান তো আমাদের লোক ছিল!”
মুহাম্মদ শাহাদাত আলী ক্বারী:
মুহাম্মদ শাহাদাত আলী ক্বারী ছিলেন উনিশ শতকের শেষভাগে উত্তরবঙ্গের (বিশেষ করে বর্তমান পাবনা-সিরাজগঞ্জ অঞ্চল) একজন প্রখ্যাত আলেম ও শিক্ষা সংস্কারক। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে, আধুনিক বিজ্ঞান ও ইংরেজি ভাষা না শিখলে মুসলিম ছাত্ররা কেবল সমাজের বোঝা হয়ে থাকবে। কিন্তু এই দূরদর্শিতাই তাঁর জীবনের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
শাহাদাত আলী ক্বারী যখন তাঁর প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসার পাঠ্যসূচিতে প্রথমবারের মতো ইংরেজি বর্ণমালা ও সাধারণ গণিত অন্তর্ভুক্ত করলেন, তখন স্থানীয় রক্ষণশীল মৌলভীরা একে ‘ধর্মের অবমাননা’ হিসেবে প্রচার শুরু করেন।
একবার মাদ্রাসার এক ছাত্রের ব্যাগে একটি ইংরেজি বই পাওয়া গিয়েছিল। স্থানীয় প্রভাবশালী কিছু ব্যক্তি ও ধর্মব্যবসায়ী সেই বইটিকে অপবিত্র ঘোষণা করে এবং দাবি করে যে, “মাদ্রাসার ভেতর ইংরেজি বই ঢোকানো মানে মসজিদকে নাপাক করা।” এর শাস্তিস্বরূপ শাহাদাত আলী ক্বারীকে জনসমক্ষে তওবা করতে বলা হয়। তিনি যখন যুক্তি দিয়ে ইংরেজি শিক্ষার গুরুত্ব বোঝাতে চাইলেন, তখন উত্তেজিত জনতা তাঁকে ‘নাসারাদের দালাল’ বলে গালি দেয় এবং তাঁর মাদ্রাসার আসবাবপত্র ভাঙচুর করে। পরিস্থিতি এতটাই চরমে পৌঁছেছিল যে, তাঁকে হত্যার হুমকি দিয়ে এলাকা ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছিল।
এমনকি জুমার নামাজে তাঁকে মসজিদে ঢুকতে বাধা দেওয়া হতো এই যুক্তিতে যে— “যিনি বিধর্মীদের ভাষা শিক্ষার প্রচার করেন, তাঁর পেছনে নামাজ হবে না।”
তিনি বুঝতে পেরেছিলেন কেবল ধর্মীয় বুলিতে পেট ভরবে না, জাগতিক উন্নতির জন্য আধুনিক শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু তাঁর মাদ্রাসাকে ‘খ্রিস্টান তৈরির কারখানা’ বলে যে অপপ্রচার চালানো হয়েছিল, তার ক্ষত তিনি সারা জীবন বয়ে বেড়িয়েছেন। তাঁকে সামাজিকভাবে বয়কট করা হয়েছিল যাতে সাধারণ মানুষ তাদের সন্তানদের তাঁর কাছে না পাঠায়।
আজ যখন আমরা মাদ্রাসায় ‘আলিয়া’ নেসাব বা আধুনিক কারিকুলাম দেখি, তখন আমরা ভুলে যাই শাহাদাত আলী ক্বারীর মতো মানুষদের, যাঁদের জীবনের বিনিময়ে এই পথ তৈরি হয়েছে।
আসুন নিজের মধ্যে তাকাই
স্যার সৈয়দ আহমদ খান থেকে ড. ফজলুর রহমান, কিংবা বেগম রোকেয়া থেকে শাহাদাত আলী ক্বারী—এই মহাপ্রাণ মানুষগুলোর জীবনগাথা আমাদের সমাজের একটি ভয়ানক মনস্তাত্ত্বিক অসুখকে নগ্ন করে দেয়। আমাদের এই কওমের ট্র্যাজেডি হলো, আমরা জ্যান্ত মেধাবীদের ‘পায়ে ঝুমুর’ বাঁধতে বাধ্য করি, তাঁদের সামাজিকভাবে একঘরে করি, এমনকি ‘মুরতাদ’ বা ‘কাফের’ তকমা দিয়ে তাঁদের রক্তকে জায়েজ মনে করি। অথচ তাঁরা যখন ইতিহাসের পাতায় ধ্রুবতারা হয়ে ওঠেন, তখন আমরাই আবার তাঁদের হাড় দিয়ে তৈরি ‘শোকেস’ সাজিয়ে বিশ্ব দরবারে নিজেদের প্রগতিশীল প্রমাণ করতে চাই।
আমরা আজ সৈয়দ আহমদ বা মাওলানা আজাদের নাম জপি কারণ তাঁরা এখন একেকটি ‘ব্র্যান্ড’ বা রাজনৈতিক ‘পুঁজি’। কিন্তু ট্র্যাজেডি হলো, আমরা তাঁদের ব্যক্তিত্বের পূজা করলেও তাঁদের দর্শনকে আজও গ্রহণ করতে পারিনি। আমাদের সমসাময়িক সময়ে আজকেও যদি কেউ একই রকম আধুনিক সংস্কার বা মুক্তবুদ্ধির কথা বলেন, আমরা ঠিক আমাদের পূর্বপুরুষদের মতোই তাঁকে ‘ধর্মের শত্রু’ বা ‘এজেন্ট’ ট্যাগ দিয়ে আক্রমণ করতে দ্বিধা করি না।
আমাদের ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—যারা আমাদের আবেগের উসকানি দিয়ে দুনিয়া ও আখিরাত দুটোই ধ্বংসের কিনারে নিয়ে গেছে, আমরা তাঁদেরই মাথায় করে রেখেছি। আর যারা তিল তিল করে নিজেদের বিসর্জন দিয়ে আমাদের অন্ধকূপ থেকে বের করতে চেয়েছেন, আমরা তাঁদেরই হাত কামড়ে ধরেছি। এই অকৃতজ্ঞতার শেকল ভাঙা ছাড়া আমাদের উদ্ধার নেই।
পরিশেষে, ইতিহাস থেকে আমরা এই শিক্ষাই পেয়েছি যে, আমরা ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেই না। যতদিন পর্যন্ত আমরা উসকানিদাতার ‘জান্নাতের টিকিট’ আর সংস্কারকের ‘মুক্তির দিশা’-র মধ্যে পার্থক্য করতে না শিখব, ততদিন আমাদের বুদ্ধির তালা খুলবে না। মহান আল্লাহ আমাদের সেই হরণ হয়ে যাওয়া ‘আক্কেল’ বা বিচারবুদ্ধি ফিরিয়ে দিন, যা আমরা শতাব্দী আগে কোনো এক সস্তার ফতোয়ার বাজারে বন্ধক রেখে এসেছি।
তথ্যসূত্র:
১. স্যার সৈয়দ আহমদ খান
Graham, G. F. I. (1885). The Life and Work of Syed Ahmed Khan. (আলিগড় আন্দোলনের প্রাথমিক বিরোধিতা এবং ফতোয়া সংক্রান্ত তথ্যের জন্য)।
Hali, Altaf Hussain. Hayat-i-Javed. (স্যার সৈয়দের জীবনীগ্রন্থ, যেখানে তাঁর আর্থিক সংকট এবং তবায়েফ বা নর্তকীদের থেকে সাহায্য নেওয়ার সেই আবেগঘন ঘটনাটি বিস্তারিত বর্ণিত আছে)।
Lelyveld, David. (1978). Aligarh’s First Generation: Muslim Solidarity in British India.
২. মাওলানা আবুল কালাম আজাদ
Azad, Abul Kalam. India Wins Freedom. (দেশভাগ এবং ভারতের মুসলিমদের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর উদ্বেগের জন্য)।
Douglas, Ian Henderson. (1988). Abul Kalam Azad: An Intellectual and Religious Biography. (ইমামে হিন্দ উপাধি এবং আলেমদের বিরোধিতার তথ্যের জন্য)।
জৈদী, এ. এম. The Al-Hilal and Al-Balagh Era. (জামে মসজিদের সেই ঐতিহাসিক খুতবার প্রেক্ষাপট)।
৩. নবাব আব্দুল লতিফ
Lutf, Nawab Abdul. (1885). A Short Account of My Public Life. (কলকাতার রক্ষণশীল সমাজের বাধা এবং ইংরেজি শিক্ষা সংক্রান্ত বিরোধিতার মূল উৎস)।
Bradley-Birt, F. B. (1906). Twelve Men of Bengal in the Nineteenth Century.
মোল্লা, এম. কে. ইউ. (1993). The New Province of Eastern Bengal and Assam.
৪. বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
আলী, মোবাশ্বের। বেগম রোকেয়া: সময় ও সাহিত্য। (ভাগলপুর ও কলকাতায় তাঁর ওপর হওয়া শারীরিক ও মানসিক আক্রমণের বর্ণনার জন্য)।
কাদির, আব্দুল (সম্পাদিত)। রোকেয়া রচনাবলী। (বিশেষ করে ‘অবরোধবাসিনী’ ও ‘মতিচূর’-এর ভূমিকা ও প্রেক্ষাপট)।
Hossain, Rokeya Sakhawat. Sultana’s Dream and Selections from The Secluded Ones.
৫. কাজী নজরুল ইসলাম
আনিসুজ্জামান, ড. নজরুল-চরিতমানস। (ইসলাম দর্শন পত্রিকা ও সমকালীন আলেমদের ফতোয়া এবং ‘কাফের’ ঘোষণার সুনির্দিষ্ট তারিখ ও বর্ণনার জন্য)।
চক্রবর্তী, রতনলাল। নজরুল ইসলাম ও সমকাল। (রবীন্দ্রনাথের সাথে কৃত্রিম দ্বন্দ্ব তৈরির চেষ্টার ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ)।
গোপাল হালদার। কাজী নজরুল ইসলাম।
৬. শেখ আবদুল্লাহ (পাপা মিঞা)
Abdullah, Sheikh. Mushahidat-o-Taasurat (তাঁর আত্মজীবনী, যেখানে আলিগড় উইমেন্স কলেজ প্রতিষ্ঠার সময়কার দাঙ্গা ও পাথর ছোড়ার ঘটনা বর্ণিত আছে)।
AMU Women’s College Archive. Ariel: The College Journal.
Minault, Gail. (1998). Secluded Scholars: Women’s Education and Muslim Social Reform in Colonial India.
৭. ড. ফজলুর রহমান
Rahman, Fazlur. (1982). Islam and Modernity: Transformation of an Intellectual Tradition. (শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেস থেকে প্রকাশিত)।
Rahman, Fazlur. (1966). Islam. (যে বইটি নিয়ে পাকিস্তানে দাঙ্গা ও তাঁর ফাঁসির দাবি উঠেছিল)।
Siddiqui, Safdar. The Trial of Fazlur Rahman. (পাকিস্তানের সেই উত্তাল সময়ের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় বিশ্লেষণের জন্য)।
৮. মুহাম্মদ শাহাদাত আলী ক্বারী
মুনতাসীর মামুন (সম্পাদিত)। ঢাকার স্মৃতি ও অন্যান্য এবং উত্তরবঙ্গের স্থানীয় শিক্ষা সংস্কারের ইতিহাস সংক্রান্ত আর্কাইভাল রেকর্ড।
সিরাজগঞ্জ জেলা গেজেটিয়ার এবং পাবনা অঞ্চলের স্থানীয় ইতিহাস।
খাতুন, হালিমা। মাদ্রাসা শিক্ষার ইতিহাস ও বাঙালি মুসলমান।
আরও দেখুন: