ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গীত তার ভৌগোলিক বৈচিত্র্যের মতোই বিশাল এবং বর্ণিল। ১৭ হাজারেরও বেশি দ্বীপের এই দেশে সুরের বিন্যাস যেমন জটিল, তেমনি এর সাংস্কৃতিক শিকড় অত্যন্ত গভীর। “অসুরের সুরলোকযাত্রা” সিরিজের এই পর্বে আমরা জাভা এবং বালির দ্বীপপুঞ্জ থেকে উঠে আসা সঙ্গীত নিয়ে আলোচনা করব।
ইন্দোনেশিয়ান সঙ্গীত: ধাতব ঐকতান ও দ্বীপান্তরের সুর
ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গীতের কথা বললে প্রথমেই যে ধারাটি মনে আসে, তা হলো গামেলান। এটি কেবল একটি সঙ্গীতশৈলী নয়, বরং এটি ইন্দোনেশিয়ার জাতীয় পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
১. গামেলান (Gamelan): শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের প্রাণ
গামেলান হলো ইন্দোনেশিয়ার ঐতিহ্যবাহী শাস্ত্রীয় অর্কেস্ট্রা। ‘গামেল’ শব্দ থেকে এর উৎপত্তি, যার অর্থ ‘হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করা’। এই অর্কেস্ট্রা মূলত ব্রোঞ্জ, লোহা বা বাঁশের তৈরি ঘাতযন্ত্রের (Percussion) সমন্বয়ে গঠিত।
- বিবর্তন ও গুরুত্ব: হিন্দু-বৌদ্ধ আমল থেকে রাজদরবারে গামেলান রাজকীয় অনুষ্ঠান এবং ওয়ায়াং কুলিত (ছায়াপুতুল নাচ)-এর প্রধান আবহ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
- জাভানিজ বনাম বালিনিজ গামেলান: জাভানিজ গামেলান সাধারণত ধীর, গম্ভীর এবং আধ্যাত্মিক। অন্যদিকে, বালিনিজ গামেলান অত্যন্ত দ্রুত, উজ্জ্বল এবং গতিশীল।
২. প্রধান সঙ্গীত জনরাসমূহ
গামেলান ছাড়াও ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গীতের আরও কিছু জনপ্রিয় ধারা রয়েছে:
- ওয়ায়াং কুলিত (Wayang Kulit): এটি সঙ্গীতের সাথে ছায়াপুতুল নাচের এক ধ্রুপদী রূপ। এখানে ‘ডালং’ (পুতুল নাচক) গল্প বলেন এবং পেছনে গামেলান দল সুরের মাধ্যমে নাটকীয়তা তৈরি করে।
- তেমবাং (Tembang): এটি জাভানিজ কবিতার গান। এটি মূলত কণ্ঠসঙ্গীত প্রধান এবং এর সুর অত্যন্ত অলঙ্কৃত ও মার্জিত।
- কেটোপরাক (Ketoprak): এটি জাভানিজ লোকনাট্য, যেখানে সঙ্গীতের মাধ্যমে ঐতিহাসিক কাহিনী বর্ণনা করা হয়।
- ড্যাংডুট (Dangdut): এটি ইন্দোনেশিয়ার সবচেয়ে জনপ্রিয় আধুনিক-লোকজ ধারা। এতে ভারতীয় চলচ্চিত্রের সঙ্গীত এবং আরবি সুরের এক অপূর্ব সংমিশ্রণ লক্ষ্য করা যায়। এর তালের প্রধান উৎস হলো ‘তবলা’ জাতীয় ড্রাম।
- কেরোcong (Keroncong): এটি পর্তুগিজ প্রভাবে তৈরি হওয়া একটি ধারা, যেখানে ইউকুলেলে এবং ভায়োলিনের ব্যবহার বেশি থাকে।
৩. প্রধান বাদ্যযন্ত্রসমূহ
গামেলান অর্কেস্ট্রার যন্ত্রগুলো অত্যন্ত জটিল এবং কারিগরিভাবে অনন্য:
- বোনং (Bonang): ব্রোঞ্জের তৈরি ছোট গং-এর একটি সেট, যা কাঠের তাকে সাজানো থাকে।
- গেন্ডার (Gender): ধাতব পাতের তৈরি জাইলোফোন জাতীয় যন্ত্র, যার নিচে অনুরণনের জন্য বাঁশের নল থাকে।
- গং আগেং (Gong Ageng): অর্কেস্ট্রার সবচেয়ে বড় এবং পবিত্র গং, যা একটি সাঙ্গীতিক চক্রের সমাপ্তি নির্দেশ করে।
- কেন্দাং (Kendang): দুই পাশের চামড়ার ড্রাম, যা পুরো অর্কেস্ট্রার গতি নিয়ন্ত্রণ করে।
৪. কারিগরি বৈশিষ্ট্য: পেলোগ এবং সলেন্দ্রো
গামেলানের টিউনিং সিস্টেম পশ্চিমা সঙ্গীতের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। এখানে মূলত দুটি স্কেল ব্যবহৃত হয়:
- সলেন্দ্রো (Slendro): পাঁচ স্বরের স্কেল যা অত্যন্ত উজ্জ্বল অনুভূতি দেয়।
- পেলোগ (Pelog): সাত স্বরের স্কেল যা কিছুটা গম্ভীর এবং বিষণ্ণ।
মজার ব্যাপার হলো, প্রতিটি গামেলান সেটের টিউনিং একে অপরের থেকে আলাদা হয়, তাই দুটি আলাদা দলের যন্ত্র একসাথে বাজানো সম্ভব নয়।

ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গীত তার ধাতব শব্দের ঝংকারে এক অতীন্দ্রিয় পরিবেশ তৈরি করে। গামেলানের প্রতিটি আঘাত যেন প্রকৃতির কোনো আদিম স্পন্দনকে স্মরণ করিয়ে দেয়।