গুবারে খাতির – মাওলানা আবুল কালাম আজাদ

মওলানা আজাদ সম্পর্কে যারা ন্যূনতম ‘আশনাই’ (পরিচয়) রাখেন, তাঁরা সবাই তাঁর অমর সৃষ্টি ‘গুবারে খাতির’-এর নাম শুনেছেন। ফারসি ও উর্দুতে এই শিরোনামের অর্থ—‘হৃদয়ের ধূলিকণা’ বা ‘মনের ধুলো’। ১৯৪২ সালে ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনের প্রাক্কালে আহমেদনগর দুর্গে যখন মওলানাকে ৩ বছরের জন্য কারাবন্দি করা হয়, সেই নিভৃত ‘উজলাত’ (একাকীত্ব)-ই জন্ম দেয় বিশ্বসাহিত্যের এই অমূল্য রত্নকে।

এটি আসলে তাঁর অন্তরঙ্গ বন্ধু নওয়াব হাবিবুর রহমান খান শেরওয়ানির উদ্দেশ্যে লেখা ২৪টি চিঠির এক সংকলন, যা জেল থেকে কখনও পোস্ট করা সম্ভব হয়নি। ১৯৪৬ সালে এটি যখন গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়, তখন উর্দু সাহিত্যের দুনিয়ায় এক ‘জেলজেলা’ বা কম্পন সৃষ্টি হয়েছিল। কারণ, এটি কোনো রাজনৈতিক ইশতেহার ছিল না; এটি ছিল এক বিশাল হৃদয়ের ‘মুকাশাফা’ বা আত্মিক উন্মোচন।

গুবারে খাতির এর উর্দু পিডেএফ ডাউনলোড: Ghubar e Khatir – Maulana Abul Kalam Azad

Table of Contents

গুবারে খাতির : প্রতিটি পাতার অনুবাদ:

পৃষ্ঠা নম্বর: ১

غبار خاطر

Ghubar-e-Khatir

গুবার-এ-খাতির

قلعہ احمد نگر کی اسیری (از ۹ اگست ۱۹۴۲ء

Qila Ahmednagar ki aseeri (az 9 August 1942ء

আহমেদনগর দুর্গের বন্দিত্ব (৯ আগস্ট ১৯৪২ থেকে

تا ۱۵ جون ۱۹৪۵ء) کے زمانے کی تحریرات

ta 15 June 1945ء) ke zamane ki tahriraat

১৫ জুন ১৯৪৫ পর্যন্ত) সময়ের লেখাসমূহ

از

Az

কর্তৃক (বা হইতে)

ابوالکلام آزاد

Abul Kalam Azad

আবুল কালাম আজাদ

 

পৃষ্ঠা নম্বর: ২

قیمت چھ روپے

Qimat chhe rupaye

মূল্য ছয় টাকা

আপনার আপলোড করা ইমেজের (০৯ নম্বর পাতা/ফহরিস্ত) টেক্সট অনুযায়ী ৩ লাইনের হুবহু বিন্যাস নিচে দেওয়া হলো:

পৃষ্ঠা নম্বর: ৩

فہرست

Fehrist

সূচিপত্র

مقدمہ … ۷

Muqadma … 7

ভূমিকা … ৭

دیباچہ … ۲۱

Debacha … 21

মুখবন্ধ … ২১

رہائی کے بعد کے بعض مکاتیب … ۲۳

Rihayi ke baad ke baaz makateeb … 23

মুক্তির পরের কিছু পত্রাবলি … ২৩

مکتوب ۳ اگست ۱۹۴۲ء … ۳۳

Maktoob 3 August 1942 … 33

পত্র ৩ আগস্ট ১৯৪২ … ৩৩

داستانِ بے ستون و کوہکن … ۴۱

Dastan-e-Be-Sutun-o-Kohkan … 41

বে-সুতুন এবং কোহকনের গল্প (শিরিন-ফরহাদের রূপক) … ৪১

مکتوب ۱۰ اگست ۱۹۴۲ء … ۴۱

Maktoob 10 August 1942 … 41

পত্র ১০ আগস্ট ১৯৪২ … ৪১

مکتوب ۱۱ اگست ۱۹۴۲ء … ۵۵

Maktoob 11 August 1942 … 55

পত্র ১১ আগস্ট ১৯৪২ … ৫৫

مکتوب ۱۵ اگست ۱۹۴۲ء … ۶۹

Maktoob 15 August 1942 … 69

পত্র ১৫ আগস্ট ১৯৪২ … ৬৯

مکتوب ۱۹ اگست ۱۹۴۲ء … ۷۷

Maktoob 19 August 1942 … 77

পত্র ১৯ আগস্ট ১৯৪২ … ৭৭

حکایتِ بادہ و تریاک … ৮৮

Hikayat-e-Baada-o-Tariyaaq … 88

মদ এবং আফিমের কাহিনী … ৮৮

مکتوب ۲৭ اگست ۱۹۴۲ء … ۸৮

Maktoob 27 August 1942 … 88

পত্র ২৭ আগস্ট ১৯৪২ … ৮৮

مکتوب ۲৯ اگست ۱۹۴۲ء … ১০০

Maktoob 29 August 1942 … 100

পত্র ২৯ আগস্ট ১৯৪২ … ১০০

مکتوب ۱۲ اکتوبر ১৯৪২ء … ۱۱۲

Maktoob 12 October 1942 … 112

পত্র ১২ অক্টোবর ১৯৪২ … ১১২

مکتوب ১৭ اکتوبر ১৯৪২ء … ১৩১

Maktoob 17 October 1942 … 131

পত্র ১৭ অক্টোবর ১৯৪২ … ১৩১

مکتوب ۱۸ اکتوبر ১৯৪২ء … ১৪২

Maktoob 18 October 1942 … 142

পত্র ১৮ অক্টোবর ১৯৪২ … ১৪২

পৃষ্ঠা নম্বর: ৪

مکتوب ۵ دسمبر ۱۹۴۲ء … ۱۵۲

Maktoob 5 December 1942 … 152

পত্র ৫ ডিসেম্বর ১৯৪২ … ১৫২

مکتوب ১০ دسمبر ۱۹۴২ء … ۱۷۳

Maktoob 10 December 1942 … 173

পত্র ১০ ডিসেম্বর ১৯৪২ … ১৭৩

مکتوب ৭ جنوری ۱۹۴৩ء … ۱۹۱

Maktoob 7 January 1943 … 191

পত্র ৭ জানুয়ারি ১৯৪৩ … ১৯১

مکتوب ۹ جنوری ۱۹۴৩ء … ۲۰۱

Maktoob 9 January 1943 … 201

পত্র ৯ জানুয়ারি ১৯৪৩ … ২০১

حکایتِ زاغ و بلبل … ۲۰۱

Hikayat-e-Zagh-o-Bulbul … 201

কাক ও বুলবুলির কাহিনী … ২০১

مکتوب ২ مارچ ۱۹۴৩ء … ۲۱۱

Maktoob 2 March 1943 … 211

পত্র ২ মার্চ ১৯৪৩ … ২১১

چڑیا چڑے کی کہانی … ۲۱۱

Chiriya Chire ki kahani … 211

চড়ুই পাখির দম্পতির গল্প … ২১১

مکتوب ৭ مارچ ۱۹۴৩ء … ۲۳১

Maktoob 7 March 1943 … 231

পত্র ৭ মার্চ ১৯৪৩ … ২৩১

مکتوب ১৪ مارچ ১৯৪৩ء … ২৪৩

Maktoob 14 March 1943 … 243

পত্র ১৪ মার্চ ১৯৪৩ … ২৪৩

مکتوب ۱۱ اپریل ۱۹۴৩ء … ২৫৬

Maktoob 11 April 1943 … 256

পত্র ১১ এপ্রিল ১৯৪৩ … ২৫৬

مکتوب ১২ جون ১৯৪৩ء … ২৬৫

Maktoob 12 June 1943 … 265

পত্র ১২ জুন ১৯৪৩ … ২৬৫

مکتوب ১৫ جون ১৯৪৩ء … ২৭০

Maktoob 15 June 1943 … 270

পত্র ১৫ জুন ১৯৪৩ … ২৭০

مکتوب ১৬ ستمبر ১৯৪৩ء … ২৭০

Maktoob 16 September 1943 … 270

পত্র ১৬ সেপ্টেম্বর ১৯৪৩ … ২৭০

পৃষ্ঠা নম্বর: ৫

طبعِ ثالث

Tab-e-Saalis

তৃতীয় সংস্করণ

“غبار خاطر” کا پہلا ایڈیشن گذشتہ مئی میں شائع ہوا اور تین ماہ

“Ghubar-e-Khatir” ka pehla edition guzasta May mein shaya hua aur teen mah

“গুবার-এ-খাতির”-এর প্রথম সংস্করণ গত মে মাসে প্রকাশিত হয়েছে এবং তিন মাস

میں ختم ہو گیا۔ دوسرا ایڈیشن اگست میں نکلا، وہ بھی اب قریب

mein khatm ho gaya. Dusra edition August mein nikla, woh bhi ab qareeb

এর মধ্যে শেষ হয়ে গেছে। দ্বিতীয় সংস্করণ আগস্টে বেরিয়েছে, সেটিও এখন প্রায়

الختام ہے۔ افسوس ہے کہ ان دونوں ایڈیشنوں کی چھپائی کا

al-khitaam hai. Afsos hai ke in donon editionon ki chhapayi ka

সমাপ্তির পথে। আফসোস এই যে, এই উভয় সংস্করণের ছাপার

انتظام جس درجہ بہتر ہونا تھانہ ہو سکا لیکن اس کوتاہی کے لئے

intezam jis darja behtar hona tha na ho saka lekin is kotahi ke liye

ব্যবস্থা যতটা ভালো হওয়া উচিত ছিল তা হতে পারেনি কিন্তু এই ত্রুটির জন্য

حالی پبلشنگ ہاؤس کو ذمہ دار نہیں سمجھنا چاہئے کیونکہ طباعت کا

Hali Publishing House ko zimmedar nahin samajhna chahiye kyunke taba’at ka

হালী পাবলিশিং হাউসকে দায়ী মনে করা উচিত নয় কারণ মুদ্রণের

اہتمام اس سے متعلق نہ تھا۔ اب یہ تیسرا ایڈیشن اس غرض سے شائع کیا

ehtemam us se mutalliq na tha. Ab yeh teesra edition is gharz se shaya kiya

ব্যবস্থাপনা তাদের সাথে সম্পর্কিত ছিল না। এখন এই তৃতীয় সংস্করণ এই উদ্দেশ্যে প্রকাশিত

جا رہا ہے کہ جو حضرات زیادہ قیمتی ایڈیشن کے خواہشمند ہوں ان کے

ja raha hai ke jo hazrat zyada qimti edition ke khwahishmand hon un ke

করা হচ্ছে যে, যে সকল ব্যক্তি অধিক মূল্যবান সংস্করণের আগ্রহী তাদের

ذوقِ طبع کا بھی سامان ہو جائے۔ مطالب کے لحاظ سے بھی یہ ایڈیشن

zauq-e-tab’ ka bhi saman ho jaye. Matalib ke lihaz se bhi yeh edition

পছন্দের উপকরণও যেন হয়ে যায়। বিষয়ের দিক থেকেও এই সংস্করণটি

پچھلے ایڈیشنوں پر فوقیت رکھتا ہے کیونکہ ایک مکتوب جو اس وقت

pichhle editionon par fauqiyat rakhta hai kyunke ek maktoob jo is waqt

আগের সংস্করণগুলোর ওপর শ্রেষ্ঠত্ব রাখে কারণ একটি পত্র যা ওই সময়

اندراج سے رہ گیا تھا اور جو کئی اعتبار سے تمام مکتوب میں خاص اہمیت

indraj se reh gaya tha aur jo kai aitibar se tamam maktoob mein khas ahmiyat

অন্তর্ভুক্ত করা থেকে বাদ পড়ে গিয়েছিল এবং যা অনেক দিক থেকে সকল পত্রের মধ্যে বিশেষ গুরুত্ব

رکھتا ہے آخر میں بڑھا دیا گیا ہے –

rakhta hai aakhir mein badha diya gaya hai –

রাখে, তা শেষে বাড়িয়ে (যুক্ত করে) দেওয়া হয়েছে –

محمد اجمل خاں

Muhammad Ajmal Khan

মুহাম্মদ আজমল খাঁন

পৃষ্ঠা নম্বর: ৬

ফাঁকা

পৃষ্ঠা নম্বর: ৭

۷

7

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ

Bismillahir Rahmanir Rahim

পরম করুণাময় অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি

تاریخِ واقعاتِ شہاں نا نوشتہ ماند!

Tarikh-e-waqiyat-e-shahan na-nuvishta maand!

রাজাবাদশাহদের ঘটনাবলির ইতিহাস অলিখিত রয়ে গেল!

افسانہء کہ گفت نظیری کتاب شد!

Afsana-e-ke guft Naziri kitab shud!

নাজিরী যে গল্পটি বলেছিলেন তা কিতাব হয়ে গেল!

اس مجموعے میں جس قدر مکتوبات ہیں ، وہ تمام تر نواب صدر یار جنگ مولانا

Is majmue mein jis qadar maktubaat hain, woh tamam tar Nawab Sadar Yar Jung Maulana

এই সংকলনে যতগুলো পত্রাবলি রয়েছে, তার সবটুকুই নবাব সদর ইয়ার জং মাওলানা

حبیب الرحمن خاں صاحب شیروانی رئیس بھیکم پور ضلع علی گڑھ کے نام لکھے گئے تھے

Habib-ur-Rahman Khan Sahib Sherwani Rais-e-Bhikampur Zila Aligarh ke naam likhe gaye they

হাবিবুর রহমান খাঁন সাহেব শেরওয়ানি, ভিকমপুর আলীগড়ের অধিপতি-এর নামে লেখা হয়েছিল

چونکہ قلعہ احمد نگر کی قید کے زمانے میں دوستوں سے خط و کتابت کی اجازت نہ تھی ،

Chunke Qila Ahmednagar ki qaid ke zamane mein doston se khat-o-kitabat ki ijazat na thi,

যেহেতু আহমেদনগর দুর্গে বন্দিত্বের সময় বন্ধুদের সাথে পত্রালাপের অনুমতি ছিল না,

اور حضرت مولانا کی کوئی تحریر باہر نہیں جا سکتی تھی اس لئے یہ مکاتیب وقتاً

Aur Hazrat Maulana ki koi tahrir bahar nahin ja sakti thi is liye yeh makateeb waqtan

এবং হযরত মাওলানার কোনো লেখা বাইরে যেতে পারত না, তাই এই পত্রগুলো সময়ে

فوقتاً لکھے گئے اور ایک فائل میں جمع ہوتے رہے – ۱۵ جون ۱۹۴۵ء کو جب

fauqtan likhe gaye aur ek file mein jama hote rahe – 15 June 1945 ko jab

সময়ে লেখা হয়েছিল এবং একটি ফাইলে জমা হতে থাকে – ১৫ জুন ১৯৪৫ সালে যখন

مولانا رہا ہوئے تو ان مکاتیب کے مکتوب الیہ تک پہنچنے کی راہ باز ہوئی –

Maulana raha hue to in makateeb ke maktoob elaihi tak pahunchne ki raah baaz hui –

মাওলানা মুক্তি পেলেন তখন এই পত্রগুলো প্রাপকের নিকট পৌঁছানোর পথ উন্মুক্ত হলো –

نواب صاحب سے حضرت مولانا کا دوستانہ علاقہ بہت قدیم ہے – مولانا نے

Nawab Sahib se Hazrat Maulana ka dostana alaqa bahut qadeem hai – Maulana ne

নবাব সাহেবের সাথে হযরত মাওলানার বন্ধুত্বের সম্পর্ক অত্যন্ত প্রাচীন – মাওলানা

خود ایک مرتبہ مجھ سے فرمایا کہ پہلے پہل ان سے ملاقات ۱۹۰۶ء میں ہوئی تھی – گویا

khud ek martaba mujh se farmaya ke pehle pehal un se mulaqat 1906 mein hui thi – goya

নিজে একবার আমাকে বলেছিলেন যে সর্বপ্রথম তাঁর সাথে সাক্ষাৎ ১৯০৬ সালে হয়েছিল – যেন

ایک کم چالیس برس اس رشتہء اخلاص و محبت پر گزر چکے اور ایک قرن سے بھی

ek kam chalis baras is rishta-e-ikhlaas-o-muhabbat par guzar chuke aur ek qarn se bhi

উনচল্লিশ বছর এই আন্তরিকতা ও ভালোবাসার সম্পর্কের ওপর অতিক্রান্ত হয়েছে এবং এক শতাব্দীরও

زیادہ وقت کا امتداد اس کی تازگی اور شگفتگی کو افسردہ نہ کر سکا – دوستی و

zyada waqt ka imtidad is ki tazgi aur shaguftagi ko afsurda na kar saka – dosti-o-

বেশি সময়ের ব্যবধান এর সতেজতা ও প্রফুল্লতাকে ম্লান করতে পারেনি – বন্ধুত্ব ও

یگانگت کے ایسے ہی علاقے ہیں جن کی نسبت کہا گیا تھا :

yagan-gat ke aise hi alaqe hain jin ki nisbat kaha gaya tha:

একাত্মতার এমন কিছু সম্পর্ক রয়েছে যাদের সম্বন্ধে বলা হয়েছিল:

تزول جبال الرسیات و قلبهم

Tazul-ul-jibal-ur-rasiyatu wa qalbuhum

দৃঢ় পাহাড়গুলো স্থানচ্যুত হতে পারে কিন্তু তাদের হৃদয়

عن الحب لا يخلو ولا يتزلزل

anil hubbi la yakhlu wala yatazalzalu

ভালোবাসা থেকে শূন্য হয় না এবং বিচলিত হয় না।

পৃষ্ঠা নম্বর: ৮

۸

8

البتہ یہ علاقہء محبت و اخلاص صرف علمی و ادبی ذوق کے رشتہء اشتراک میں

Albatta yeh alaqa-e-muhabbat-o-ikhlaas sirf ilmi-o-adabi zauq ke rishta-e-ishtiraak mein

অবশ্যই ভালোবাসা ও আন্তরিকতার এই সম্পর্ক কেবল জ্ঞান ও সাহিত্যের রুচির অংশীদারিত্বের বন্ধনে

محدود ہے، سیاسی عقائد و اعمال سے اس کا کوئی تعلق نہیں۔ سیاسی میدان

mahdood hai, siyasi aqaid-o-amaal se is ka koi talluq nahin. Siyasi maidan

সীমাবদ্ধ, রাজনৈতিক বিশ্বাস ও কর্মকাণ্ডের সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই। রাজনৈতিক ময়দানে

میں مولانا کی راہ دوسری ہے اور نواب صاحب اس سے راہ و رسم نہیں رکھتے –

mein Maulana ki raah dusri hai aur Nawab Sahib is se raah-o-rasm nahin rakhte –

মাওলানার পথ ভিন্ন এবং নবাব সাহেব তার সাথে কোনো সম্পর্ক রাখেন না –

حضرت مولانا کی زندگی مختلف اور متضاد حیثیتوں میں بٹی ہوئی ہے ۔ وہ

Hazrat Maulana ki zindagi mukhtalif aur mutazaad haisiyaton mein bati hui hai. Woh

হযরত মাওলানার জীবন বিভিন্ন এবং বিপরীতমুখী বৈশিষ্ট্যে বিভক্ত। তিনি

ایک ہی زندگی اور ایک ہی وقت میں مصنف بھی ہیں، مقرر بھی ہیں، مفکر بھی ہیں

ek hi zindagi aur ek hi waqt mein musannif bhi hain, muqarrir bhi hain, mufakkir bhi hain

একই জীবনে এবং একই সময়ে লেখকও বটে, বক্তাও বটে, চিন্তাবিদও বটে

فلسفی بھی ہیں، ادیب بھی ہیں، مذہبی بھی ہیں اور ساتھ ہی سیاسی جدوجہد کے سپہ سالار

falsafi bhi hain, adeeb bhi hain, mazhabi bhi hain aur saath hi siyasi jad-o-jahad ke sipah-salaar

দার্শনিকও বটে, সাহিত্যিকও বটে, ধার্মিকও বটে এবং সেই সাথে রাজনৈতিক সংগ্রামের সিপাহসালারও (সেনাপতি)

بھی ہیں – دینی علوم کے تبحر کے ساتھ عقلیات اور فلسفے کا فوق بہت کم جمع ہوتا

bhi hain – deeni uloom ke tabah-hur ke saath aqliyaat aur falsafe ka fauq bahut kam jama hota

বটে – ধর্মীয় জ্ঞানের গভীরতার সাথে যুক্তিবিদ্যা ও দর্শনের পারদর্শিতা খুব কমই একত্রিত

ہے اور علم اور ادب کے ذوق نے ایک ہی دماغ میں بہت کم آشیانہ بنایا ہے، پھر

hai aur ilm aur adab ke zauq ne ek hi dimaag mein bahut kam aashiyana banaya hai, phir

হয় এবং জ্ঞান ও সাহিত্যের রুচি একটি মগজে খুব কমই বাসা বেঁধেছে, আবার

علمی اور فکری زندگی کا میدان عملی سیاست کی جدوجہد سے اتنا دور واقع ہوا

ilmi aur fikri zindagi ka maidan amli siyasat ki jad-o-jahad se itna door waaqe hua

জ্ঞান ও চিন্তাশীল জীবনের ময়দান বাস্তব রাজনীতির সংগ্রাম থেকে এত দূরে অবস্থিত

ہے کہ ایک ہی قدم دونوں میدان میں بہت کم اٹھ سکتے ہیں ۔ مگر مولانا آزاد کی

hai ke ek hi qadam donon maidan mein bahut kam uth sakte hain. Magar Maulana Azad ki

যে, একই কদম উভয় ময়দানে খুব কমই উঠতে পারে। কিন্তু মাওলানা আজাদের

زندگی ان تمام مختلف اور متضاد حیثیتوں کی جامع ہے ۔ گویا ان کی ایک زندگی

zindagi in tamam mukhtalif aur mutazaad haisiyaton ki jaame’ hai. Goya in ki ek zindagi

জীবন এই সমস্ত বিভিন্ন ও বিপরীতমুখী বৈশিষ্ট্যের সমাহার। যেন তাঁর একটি জীবনের

میں بہت سی زندگیاں جمع ہو گئی ہیں ۔

mein bahut si zindagiyan jama ho gayi hain.

মধ্যে অনেকগুলো জীবন একত্রিত হয়ে গেছে।

وہ اپنی ذات سے ایک انجمن ہیں

Woh apni zaat se ek anjuman hain

তিনি তাঁর সত্তায় নিজেই একটি প্রতিষ্ঠান (সভা)

اس صورت کا قدرتی نتیجہ یہ نکلا کہ ان کے علاقے کا دائرہ کسی ایک گوشے ہی میں

Is surat ka qudrati nateeja yeh nikla ke in ke alaqe ka daira kisi ek goshe hi mein

এই পরিস্থিতির স্বাভাবিক ফলাফল এই দাঁড়িয়েছে যে তাঁর সম্পর্কের পরিধি কেবল কোনো একটি কোণেই

محدود نہیں رہا ۔ علوم دینیہ کے حجروں کے زاویہ نشین، ادب و شعر کی محفلوں کے

mahdood nahin raha. Uloom-e-deeniya ke hujron ke zawiya-nasheen, adab-o-sher ki mahfilon ke

সীমাবদ্ধ থাকেনি। ধর্মীয় জ্ঞানের প্রকোষ্ঠে কোণঠাসা হয়ে থাকারা, সাহিত্য ও কবিতার আসরের

بزم طراز، علم اور فلسفے کی کاوشوں کے دقیقہ سنج اور میدان سیاست کے تدبّر

bazm-taraaz, ilm aur falsafe ki kawishon ke daqeeqa-sanj aur maidan-e-siyasat ke tadabbur

আসর জমানো ব্যক্তিরা, জ্ঞান ও দর্শনের গবেষণার সূক্ষ্মদর্শী এবং রাজনীতির ময়দানের বিজ্ঞ

اور معرکہ آرائیوں کے شہسوار ، سب کے لئے ان کی شخصیت یکساں طور پر کشش

aur maarka-arayion ke sheh-sawar, sab ke liye in ki shakhsiyat yaksaan taur par kashish

এবং রণকৌশলের বীরযোদ্ধা, সবার জন্য তাঁর ব্যক্তিত্ব সমানভাবে আকর্ষণ

رکھتی ہے اور سب اس مجمع فضل و کمال کے افادات سے بقدر طلب و حوصلہ

rakhti hai aur sab is majma-e-fazl-o-kamal ke afadaat se ba-qadr-e-talab-o-hausla

রাখে এবং সবাই এই জ্ঞান ও পূর্ণতার আধার থেকে নিজের চাহিদা ও সামর্থ্য অনুযায়ী

مستفید ہوتے رہتے ہیں ۔

mustafid hote rehte hain.

উপকৃত হতে থাকে।

تو نخلِ خوش ثمر کیستی کہ باغ و چمن

Tu nakhl-e-khush samar ki-sti ke bagh-o-chaman

তুমি কোন সুস্বাদু ফলের বৃক্ষ যে বাগবাগিচা ও উপবন

ہمہ ز خویش بریدند و در تو پیوستند!

hama ze khwish bureedand wa dar tu pay-wastand!

সবাই নিজেদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে তোমার সাথে যুক্ত হয়েছে!

পৃষ্ঠা নম্বর: ৯

۹

9

البتہ ان کے ارادت مندوں کا حلقہ جس قدر وسیع اور بین الاقوامی ہے اتنا ہی

Albatta un ke iradat-mandon ka halqa jis qadar wasee aur bain-ul-aqwami hai itna hi

অবশ্যই তাঁর ভক্ত-অনুরাগীদের পরিধি যতটা বিস্তৃত এবং আন্তর্জাতিক, ঠিক ততটাই

دوستوں کا دائرہ تنگ ہے ۔ کسے کہ زود گسل نیست ، دیر پیوند است !

doston ka daira tang hai. Kase ke zood-gusil neest, der paywand ast!

বন্ধুদের পরিধি সংকীর্ণ। যে দ্রুত বিচ্ছিন্ন হয় না, সে দেরিতে আবদ্ধ হয়! (অর্থাৎ যার বন্ধুত্ব সহজে ভাঙে না, সে সহজে বন্ধুও বানায় না)

ایسے خوش قسمت اصحاب جنہیں مولانا اپنے “دوستوں” میں تصور

Aise khush qismat as-hab jinhein Maulana apne “doston” mein tasawwur

এমন ভাগ্যবান ব্যক্তিবর্গ যাদের মাওলানা নিজের “বন্ধুদের” মধ্যে গণ্য

کرتے ہوں خال خال ہی اور صرف وہی ہیں جن سے مولانا کے علم و ذوق کے

karte hon khaal khaal hi aur sirf wahi hain jin se Maulana ke ilm-o-zauq ke

করেন, তারা সংখ্যায় অতি নগণ্য এবং কেবল তারাই যাদের সাথে মাওলানার জ্ঞান ও রুচির

اشتراک اور مزاجی طبیعت کی مناسبت سے انہیں وابستہ کر دیا ہے ۔ ایسے ہی

ishtiraak aur mizaji tabiyat ki munasibat se unhein wabasta kar diya hai. Aise hi

অংশীদারিত্ব এবং মেজাজ ও স্বভাবের মিল তাদেরকে যুক্ত করে দিয়েছে। এমন সব

خال خال حضرات میں ایک شخصیت نواب صدر یار جنگ کی ہے۔

khaal khaal hazraat mein ek shakhsiyat Nawab Sadar Yar Jung ki hai.

বিরল ব্যক্তিদের মধ্যে একজন ব্যক্তিত্ব হলেন নবাব সদর ইয়ার জং।

نواب صاحب مسلمانانِ ہند کے گذشتہ دورِ علم و مجالس کی یادگار ہیں –

Nawab Sahib Musalmanan-e-Hind ke guzashta daur-e-ilm-o-maajalis ki yaadgar hain –

নবাব সাহেব ভারতের মুসলমানদের বিগত জ্ঞান ও মজলিসের (সভ্যতার) যুগের স্মৃতিচিহ্ন –

آج سے تئیس چالیس برس پیشتر کا زمانہ ، مولانا آزاد کی ابتدائی علمی زندگی

Aaj se teis chalis baras peshtar ka zamana, Maulana Azad ki ibtidai ilmi zindagi

আজ থেকে তেইশ-চল্লিশ বছর আগের সময়টি মাওলানার প্রাথমিক জ্ঞানচর্চার জীবনের

کا زمانہ تھا ۔ وہ اس وقت کے تمام اکابر و افاضل سے عمر میں بہت چھوٹے تھے ۔

ka zamana tha. Woh is waqt ke tamam akabir-o-afazil se umr mein bahut chhote thay.

সময় ছিল। তিনি সেই সময়ের সকল বড় বড় মনীষী ও গুণীজনদের চেয়ে বয়সে অনেক ছোট ছিলেন।

یعنی ان کی عمر سترہ اٹھارہ برس سے زیادہ نہ تھی لیکن اپنی غیر معمولی ذہانت

Yaani un ki umr satrah atharah baras se zyada na thi lekin apni ghair-mamooli zahanat

অর্থাৎ তাঁর বয়স সতেরো-আঠারো বছরের বেশি ছিল না, কিন্তু নিজের অসাধারণ মেধা

اور حیرت العقول علمی قابلیت کی وجہ سے سب کی نظروں میں محترم ہو گئے تھے اور

aur hairat-ul-uqool ilmi qabiliyat ki wajah se sab ki nazron mein muhtaram ho gaye thay aur

এবং বিস্ময়কর জ্ঞানীয় যোগ্যতার কারণে সবার দৃষ্টিতে সম্মানিত হয়ে গিয়েছিলেন এবং

معاصرانہ اور دوستانہ حیثیت سے ملتے تھے ۔ نواب محسن الملک ، نواب وقار الملک

muasarana aur dostana haisiyat se milte thay. Nawab Mohsin-ul-Mulk, Nawab Viqar-ul-Mulk

সমসাময়িক ও বন্ধুর মতো মর্যাদায় মিশতেন। নবাব মহসিন-উল-মুলক, নবাব ভিকার-উল-মুলক,

خلیفہ محمد حسین (پٹیالہ) خواجہ الطاف حسین حالی ، مولانا شبلی نعمانی ، ڈاکٹر

Khalifa Muhammad Hussain (Patiala), Khwaja Altaf Hussain Hali, Maulana Shibli Nomani, Doctor

খলিফা মুহাম্মদ হুসাইন (পাতিয়ালা), খাজা আলতাফ হুসাইন হালী, মাওলানা শিবলী নোমানী, ডক্টর

نذیر احمد ، منشی ذکاء اللہ ، حکیم محمد اجمل خاں وغیرہ ہم ، سب سے ان کے دوستانہ

Nazir Ahmad, Munshi Zakaullah, Hakim Muhammad Ajmal Khan waghairahum, sab se un ke dostana

নজির আহমদ, মুন্সি জাকউল্লাহ, হাকিম মুহাম্মদ আজমল খাঁন প্রমুখ, সবার সাথে তাঁর বন্ধুত্বপূর্ণ

تعلقات تھے اور علمی اور ادبی صحبتیں رہا کرتی تھیں ۔ اسی عہد کی صحبتوں میں

talluqat thay aur ilmi aur adabi suhbatein raha karti thin. Is-si ahd ki suhbaton mein

সম্পর্ক ছিল এবং জ্ঞান ও সাহিত্যের আসর চলত। সেই যুগের আসরগুলোতেই

نواب صدر یار جنگ سے بھی ان کی شناسائی ہوئی اور پھر شناسائی نے عمر بھر

Nawab Sadar Yar Jung se bhi un ki shinasayi hui aur phir shinasayi ne umr bhar

নবাব সদর ইয়ার জং-এর সাথেও তাঁর পরিচয় হয় এবং পরবর্তীতে সেই পরিচয় আজীবন

کی دوستی کی نوعیت پیدا کر لی ۔ مولانا اس رشتے کو خصوصیت کے ساتھ

ki dosti ki nauiyat paida kar li. Maulana is rishte ko khusoosiyat ke saath

স্থায়ী বন্ধুত্বের রূপ নেয়। মাওলানা এই সম্পর্ককে বিশেষত্বের সাথে

عزیز رکھتے ہیں کیونکہ یہ اس عہد کی یادگار ہے جو بہت تیزی کے ساتھ گزر گیا ۔

aziz rakhte hain kyunke yeh is ahd ki yaadgar hai jo bahut tezi ke saath guzar gaya.

প্রিয় জ্ঞান করেন কারণ এটি সেই যুগের স্মৃতি যা খুব দ্রুত সময়ের সাথে কেটে গেছে।

اور ملک کی مجلسیں قدیم صورتوں اور صحبتوں سے یک قلم خالی ہو گئیں ۔

Aur mulk ki majliseen qadeem suraton aur suhbaton se yak-qalam khaali ho gayin.

এবং দেশের মজলিসগুলো পুরনো রূপ ও সান্নিধ্য থেকে একেবারে শূন্য হয়ে গেছে।

مولانا کی سیاسی زندگی کے طوفانی حوادث ان کی تمام دوسری

Maulana ki siyasi zindagi ke toofani hawadis un ki tamam dusri

মাওলানার রাজনৈতিক জীবনের ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ ঘটনাবলি তাঁর অন্য সমস্ত

حیثیتوں پر چھا گئے ہیں لیکن خود مولانا نے اپنی سیاسی زندگی کو اپنے علمی اور ادبی

haisiyaton par chha gaye hain lekin khud Maulana ne apni siyasi zindagi ko apne ilmi aur adabi

পরিচয়গুলোর ওপর ছেয়ে গেছে, কিন্তু মাওলানা নিজে তাঁর রাজনৈতিক জীবনকে তাঁর জ্ঞান ও সাহিত্যিক

পৃষ্ঠা নম্বর: ১০

১০

10

১০

علائق سے بالکل الگ رکھا ہے ۔ جن دوستوں سے ان کا علاقہ محض علم و ادب

alàiq se bilkul alag rakha hai. jin doston se un ka alaqa mahz ilm-o-adab

সম্পর্ক থেকে একেবারে আলাদা রেখেছেন। যে বন্ধুদের সাথে তাঁর সম্পর্ক কেবল জ্ঞান ও সাহিত্যের

کے ذوق کا علاقہ ہے ، وہ ان کے علاقے کو سیاسی زندگی سے ہمیشہ الگ سمجھتے

ke zauq ka alaqa hai, woh un ke alaqe ko siyasi zindagi se hamesha alag samajhte

অনুরাগের সম্পর্ক, তিনি তাদের সাথে সম্পর্ককে রাজনৈতিক জীবন থেকে সর্বদা আলাদা মনে

ہیں اور اس طرح الگ رکھتے ہیں کہ سیاسی زندگی کی پرچھائیں بھی اس پر نہیں

hain aur is tarah alag rakhte hain ke siyasi zindagi ki parchhain bhi is par nahin

করেন এবং এমনভাবে আলাদা রাখেন যে রাজনৈতিক জীবনের ছায়াও যেন তার ওপর না

پڑ سکتی ۔ وہ جب بھی ان دوستوں سے ملیں گے یا خط و کتابت کریں گے تو اس میں

par sakti. woh jab bhi in doston se milenge ya khat-o-kitabat karenge to is mein

পড়তে পারে। তিনি যখনই এই বন্ধুদের সাথে দেখা করবেন বা চিঠিপত্র লিখবেন তখন তাতে

سیاسی افکار و اعمال کا کوئی ذکر نہ ہوگا ۔ ایک بے خبر آدمی اگر اس وقت کی

siyasi afkar-o-amaal ka koi zikr na hoga. ek be-khabar aadmi agar is waqt ki

রাজনৈতিক চিন্তাধারা ও কর্মকাণ্ডের কোনো উল্লেখ থাকবে না। একজন অজ্ঞাত ব্যক্তি যদি ওই সময়ের

باتوں کو سنے تو خیال کرے گا اس شخص کو سیاسی دنیا سے دور کا بھی علاقہ نہیں

baaton ko sune to khayal karega is shakhs ko siyasi duniya se door ka bhi alaqa nahin

কথাগুলো শোনে তবে মনে করবে এই ব্যক্তির রাজনৈতিক দুনিয়ার সাথে দূরের কোনো সম্পর্কও নেই

ہے ، محض علم و ادب کے سوا اور کسی ذوق سے آشنا نہیں ۔ ایک مرتبہ اس معاملے

hai, mahz ilm-o-adab ke siwa aur kisi zauq se aashna nahin. ek martaba is muamle

এবং কেবল জ্ঞান ও সাহিত্য ছাড়া আর কোনো অনুরাগের সাথে পরিচিত নন। একবার এই বিষয়ে

کا خود مولانا نے ذکر ہوا تو فرمایا کہ جس شخص سے میرا تعلق جس حیثیت سے ہے

ka khud Maulana ne zikr hua to farmaya ke jis shakhs se mera talluq jis haisiyat se hai

মাওলানা নিজে উল্লেখ করতে গিয়ে বললেন যে যে ব্যক্তির সাথে আমার সম্পর্ক যে দিক থেকে,

میں ہمیشہ اسے اسی حیثیت میں محدود رکھنا چاہتا ہوں ۔ میں نہیں چاہتا کہ

mein hamesha use usi haisiyat mein mahdood rakhna chahta hoon. mein nahin chahta ke

আমি সবসময় তাকে সেই গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ রাখতে চাই। আমি চাই না যে

دوسری حیثیتوں سے اسے آلودہ کروں ۔ چنانچہ نہ تو کبھی وہ ان دوستوں سے

dusri haisiyaton se use aaluda karoon. chunanche na to kabhi woh in doston se

অন্যান্য পরিচয়ের দ্বারা তাকে কলুষিত করি। ফলে তিনি না তো কখনো ওই বন্ধুদের কাছে

اس کی توقع رکھتے ہیں کہ ان کی سیاسی زندگی کے آلام و مصائب میں شریک ہوں

is ki tawaqqo rakhte hain ke un ki siyasi zindagi ke aalaam-o-masayib mein shareek hon

এই প্রত্যাশা রাখেন যে তারা তাঁর রাজনৈতিক জীবনের দুঃখ ও কষ্টে শরিক হবে,

نہ کبھی اس کے خواہشمند ہوتے ہیں کہ ان کے سیاسی افکار و اعمال سے اتفاق

na kabhi is ke khwahishmand hote hain ke un ke siyasi afkar-o-amaal se ittefaq

না কখনো এই আকাঙ্ক্ষা করেন যে তারা তাঁর রাজনৈতিক চিন্তাধারা ও কর্মকাণ্ডের সাথে একমত

کریں ۔ سیاسی معاملے میں وہ ہر شخص کو خود اس کی پسند اور خواہش پر چھوڑ دیتے

karen. siyasi muamle mein woh har shakhs ko khud us ki pasand aur khwahish par chhod dete

হবে। রাজনৈতিক বিষয়ে তিনি প্রতিটি মানুষকে তার নিজের পছন্দ ও ইচ্ছার ওপর ছেড়ে দেন;

ہیں ، آپ ان سے کسی علمی ، مذہبی اور ادبی تعلق سے برسوں ملتے رہے ۔ وہ

hain, aap un se kisi ilmi, mazhabi aur adabi talluq se barson milte rahe. woh

আপনি তাঁর সাথে কোনো জ্ঞানতাত্ত্বিক, ধর্মীয় বা সাহিত্যিক সম্পর্কের খাতিরে বছরের পর বছর মিশলেন। তিনি

کبھی بھولے سے بھی سیاسی معاملات کا آپ سے ذکر نہیں کریں گے ۔ ایسا معلوم

kabhi bhoole se bhi siyasi muamlaat ka aap se zikr nahin karenge. aisa maloom

কখনো ভুলেও আপনার সাথে রাজনৈতিক বিষয়াদি নিয়ে আলোচনা করবেন না। এমন মনে

ہوگا جیسے اس عالم کی انہیں کوئی خبر ہی نہیں ۔

hoga jaise is aalam ki unhein koi khabar hi nahin.

হবে যেন এই জগত সম্পর্কে তাঁর কোনো খবরই নেই।

بسا اوقات ایسا ہوتا ہے کہ ان کی زندگی سیاسی میدانوں کے طوفانی حوادث

Basa auqat aisa hota hai ke un ki zindagi siyasi maidanon ke toofani hawadis

প্রায়শই এমন হয় যে তাঁর জীবন রাজনৈতিক ময়দানের ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ ঘটনাপ্রবাহে

سے گھری ہوتی ہے ۔ کچھ معلوم نہیں ہوتا کہ ایک دن یا ایک گھنٹے کے بعد کیا حوادث

se ghiri hoti hai. kuch maloom nahin hota ke ek din ya ek ghante ke baad kya hawadis

ঘেরা থাকে। কিছুই জানা থাকে না যে একদিন বা এক ঘণ্টা পর কী দুর্ঘটনা

پیش آئیں گے ۔ ممکن ہے کہ قید و بند کا مرحلہ پیش آ جائے ۔ بہت ممکن ہے کہ جلاوطنی

pesh aayenge. mumkin hai ke qaid-o-band ka marhala pesh aa jaye. bahut mumkin hai ke jala-watni

ঘটে যাবে। সম্ভব যে জেল-জুলুমের পর্যায় সামনে এসে যাবে। খুবই সম্ভব যে নির্বাসন

یا اس سے بھی زیادہ کوئی خطرناک صورت حال ہو ۔ لیکن اچانک عین اسی عالم

ya is se bhi zyada koi khatarnaak surat-e-haal ho. lekin achanak ain isi aalam

বা এর চেয়েও বেশি কোনো বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি হবে। কিন্তু হঠাৎ ঠিক সেই অবস্থাতেই

میں کسی ہم ذوق دوست کی یاد ان کے سامنے آ کھڑی ہوتی ہے اور وہ تھوڑی دیر

mein kisi ham-zauq dost ki yaad un ke saamne aa khadi hoti hai aur woh thodi der

কোনো সমমনা বন্ধুর স্মৃতি তাঁর সামনে এসে দাঁড়ায় এবং তিনি কিছুক্ষণের জন্য

পৃষ্ঠা নম্বর: ১১

کے لئے اپنے سارے گرد و پیش سے یک قلم کنارہ کش ہو کر ان کی جانب ہمہ تن

ke liye apne saare gird-o-pesh se yak-qalam kinara-kash ho kar un ki jaanib hama-tan

জন্য নিজের সমস্ত চারপাশ থেকে এক কলমে (পুরোপুরি) বিচ্ছিন্ন হয়ে তাদের প্রতি সর্বান্তকরণে

متوجہ ہو جاتے ہیں اور اس استغراق اور انہماک کے ساتھ متوجہ ہوتے ہیں گویا ان کی

mutawajjah ho jaate hain aur is istighraaq aur inhimaak ke saath mutawajjah hote hain goya un ki

মনোযোগী হয়ে যান এবং এই নিমগ্নতা ও একাগ্রতার সাথে মনোযোগী হন যেন তাঁর

زندگی پر کسی خطرناک حادثے کا سایہ بھی نہیں پڑا ہے ۔ وہ اس وقت اپنی بیکار

zindagi par kisi khatarnaak haadse ka saaya bhi nahin pada hai. Woh is waqt apni bekaar

জীবনে কোনো বিপজ্জনক দুর্ঘটনার ছায়াও পড়েনি। তিনি তখন নিজের অলস

اور بے کیف سیاسی مشغولیت کا مزہ بدلنے کے لئے کوئی ایسا موضوع چھیڑ دیں گے

aur be-kaif siyasi mashghuliyat ka maza badalne ke liye koi aisa mauzoo chhair denge

এবং নিরস রাজনৈতিক ব্যস্ততার স্বাদ বদলাবার জন্য এমন কোনো বিষয় উত্থাপন করবেন

جو سیاسی زندگی کے میدانوں سے ہزاروں کوس دور ہوگا ۔ علم و فن کی کوئی بحث

jo siyasi zindagi ke maidanon se hazaron kos door hoga. Ilm-o-fann ki koi bahas

যা রাজনৈতিক জীবনের ময়দান থেকে হাজারো ক্রোশ দূরে হবে। জ্ঞান ও শিল্পের কোনো বিতর্ক,

فلسفیانہ غور و فکر کی کوئی کاوش ، طبیعیات کا کوئی نیا نظریہ ، تصوف و اشراق

falsafiyana ghaur-o-fikr ki koi kawish, tabiyaat ka koi naya nazariya, tasawwuf-o-ishraaq

দার্শনিক চিন্তা ও গবেষণার কোনো প্রচেষ্টা, পদার্থবিদ্যার কোনো নতুন তত্ত্ব, সুফিবাদ ও আধ্যাত্মিকতার

کا کوئی اشارہ یا پھر ادب و انشا کی سخن طرازی اور شعر و سخن کی بزم آرائی ، غرض کہ

ka koi ishaara ya phir adab-o-insha ki sukhan-taraazi aur sher-o-sukhan ki bazm-araayi, gharaz ke

কোনো ইঙ্গিত অথবা সাহিত্য ও রচনার শব্দশৈলী এবং কাব্য ও সাহিত্যের আসর জমানো—মোটকথা

سیاست کے سوا ہر ذوق کی وہاں گنجائش ہوگی ، ہر وادی کی وہاں پیمائش کی

siyasat ke siwa har zauq ki wahan gunjayish hogi, har waadi ki wahan paimaish ki

রাজনীতি ছাড়া প্রতিটি রুচির সেখানে অবকাশ থাকবে, প্রতিটি উপত্যকা সেখানে পরিমাপ করা

جا سکے گی ۔ اس وقت کوئی دیکھے تو صاف دکھائی دے کہ زبانِ حال سے خواجہ

ja sakegi. Is waqt koi dekhe to saaf dikhayi de ke zabaan-e-haal se Khwaja

যাবে। ওই সময় কেউ দেখলে পরিষ্কার দেখতে পাবে যে বর্তমানের ভাষায় (আচরণে) খাজা

حافظ کا یہ شعر دہرا رہے ہیں :

Hafiz ka yeh sher duhra rahe hain:

হাফিজের এই কবিতাটি আওড়াচ্ছেন:

کمندِ صید بہرامی بیفگن ، جام مے بردار

Kamand-e-said-e-Bahrami bifgan, jaam-e-may bardar

বাহরামের শিকারি ফাঁদ ফেলে দাও, মদের পেয়ালা তুলে নাও

کہ من پیمودم ایں صحرا نہ بہرام است و نہ گورش

Ke man paimoodam een sahra na Bahram ast wa na gorash

কেননা আমি এই মরুভূমি মেপেছি, এখানে না বাহরাম আছে, না তার গোর (বন্য গাধা/কবর)।

مولانا اس صورت حال کو “تخمیض” سے تعبیر کیا کرتے ہیں ۔ “تخمیض” عربی میں منہ کا

Maulana is surat-e-haal ko “Takhmeez” se taabeer kiya karte hain. “Takhmeez” Arabi mein munh ka

মাওলানা এই পরিস্থিতিকে “তাখমিজ” (স্বাদবদল) দিয়ে অভিহিত করেন। “তাখমিজ” আরবিতে মুখের

مزہ بدلنے کے معنی میں بولا جاتا ہے ۔ “حمضوا مجالسكم” یعنی اپنی مجلسوں کا

maza badalne ke maani mein bola jaata hai. “Hamizoo majalisakum” yaani apni majlison ka

স্বাদ পরিবর্তনের অর্থে বলা হয়ে থাকে। “হামিজু মাজালিসাকুম” অর্থাৎ তোমাদের মজলিসগুলোর

مزہ بدلتے رہو ۔ وہ کہتے ہیں اگر گاہ گاہ میں اس تخمیض کا موقع نہ نکالتا رہوں تو

maza badalte raho. Woh kehte hain agar gaah-gaah mein is takhmeez ka mauqa na nikalta rahoon to

স্বাদ বদলাতে থাকো। তিনি বলেন যদি মাঝে মাঝে আমি এই স্বাদবদলের সুযোগ বের না করতাম তবে

میرا دماغ بے کیف اور خشک مشغولیتوں کے بوجھ سے بے طرح معطل ہو جائے ۔

mera dimaag be-kaif aur khushk mashghuliyaton ke bojh se be-tarah muattal ho jaye.

আমার মগজ নিরস ও শুষ্ক ব্যস্ততার বোঝায় মারাত্মকভাবে অকেজো হয়ে যেত।

اس طرح کی تخمیض میرے لئے ذہنی عیش و نشاط کا سامان بہم کر دیا کرتی ہے اور

Is tarah ki takhmeez mere liye zehni aish-o-nishaat ka saaman baham kar diya karti hai aur

এই ধরণের স্বাদবদল আমার জন্য মানসিক আনন্দ ও প্রফুল্লতার উপকরণ জোগাড় করে দেয় এবং

دماغ از سرِ نو تازہ دم ہو جاتا ہے ۔

dimaag az-sar-e-nau taaza-dam ho jaata hai.

মগজ নতুন করে সতেজ হয়ে যায়।

کبھی کبھی ایسا بھی ہوتا ہے کہ عین سیاسی طوفان کے موسم میں کوئی ہم ذوق

Kabhi kabhi aisa bhi hota hai ke ain siyasi toofan ke mausam mein koi ham-zauq

মাঝে মাঝে এমনও হয় যে ঠিক রাজনৈতিক ঝড়ের মৌসুমে কোনো সমমনা

دوست آ نکلتا ہے اور انھیں موقع مل جاتا ہے کہ قلم و تخیل کی جگہ صحبت و مجالست

dost aa nikalta hai aur unhein mauqa mil jaata hai ke qalam-o-takhayyul ki jagah suhbat-o-mulaaqat

বন্ধু চলে আসে এবং তিনি সুযোগ পেয়ে যান যে কলম ও কল্পনার বদলে সাহচর্য ও বৈঠকের

کے ذریعہ اپنی مشغولیت کا ذائقہ بدلیں ۔ وہ معاً اپنے گرد و پیش کی دنیا سے باہر نکل

ke zariya apni mashghuliyat ka zaiqa badlein. Woh maan apne gird-o-pesh ki duniya se bahar nikal

মাধ্যমে নিজের ব্যস্ততার স্বাদ পরিবর্তন করবেন। তিনি তৎক্ষণাৎ নিজের চারপাশের দুনিয়া থেকে বাইরে বেরিয়ে

পৃষ্ঠা নম্বর: ১২

۱۲

12

১২

آئیں گے اور ایک انقلابی تحول کے ساتھ اپنے آپ کو ایک دوسری ہی عالم میں

Aayenge aur ek inqalabi tahawwul ke saath apne aap ko ek doosri hi aalam mein

আসবেন এবং একটি বিপ্লবী পরিবর্তনের সাথে নিজেকে এক অন্য জগতেই

پہنچا دیں گے ۔ وہ فوراً اپنے خادم خاص عبداللطیف کو پکاریں گے کہ چائے لاؤ ۔ یہ

pahuncha denge. Woh fauran apne khadim-e-khas Abdul Latif ko pukareinge ke chai lao. Yeh

পৌঁছে দেবেন। তিনি তখনি নিজের বিশেষ খাদেম আব্দুল লতিফকে ডাকবেন যে চা নিয়ে এসো। এটি

گویا اس کا اعلان ہوگا کہ ان کے ذوق و کیف کا خاص وقت آ گیا ہے ۔ پھر شعر و

goya is ka elaan hoga ke un ke zauq-o-kaif ka khas waqt aa gaya hai. Phir sher-o-

যেন এই ঘোষণা হবে যে তাঁর রুচি ও আনন্দের বিশেষ সময় এসে গেছে। তারপর কাব্য ও

سخن کی صحبت شروع ہو جائے گی ، علم و ادب کا مذاکرہ ہونے لگے گا اور ” علی الصباح “

sukhan ki suhbat shuru ho jayegi, ilm-o-adab ka muzakra hone lagega aur “Alas-Sabah”

সাহিত্যের মজলিস শুরু হয়ে যাবে, জ্ঞান ও সাহিত্যের আলোচনা হতে থাকবে এবং “ভোরবেলা”

کی چینی چائے ، ” وائٹ جیسمین ” کے چھوٹے پیالوں کا دور چلنے لگے گا کہ :

ki cheeni chai, “White Jasmine” ke chhote piyalon ka daur chalne lagega ke:

এর চীনা চা, “হোয়াইট জেসমিন”-এর ছোট ছোট পেয়ালার আবর্তন চলতে থাকবে যে:

حاصلِ کار گہِ کون و مکاں ایں ہمہ نیست

Hasil-e-kargah-e-kaun-o-makan een hama neest

এই মহাবিশ্বের কর্মশালার অর্জন এই কিছুই নয়

بادہ پیش آر کہ اسبابِ جہاں ایں ہمہ نیست

Baada pesh aar ke asbab-e-jahan een hama neest

মদ (সুধা) সামনে আনো কারণ জগতের উপকরণ এই কিছুই নয়

انہیں اپنی طبیعت کے انفعالات پر غالب آنے اور اپنے آپ کو اچانک بدل لینے کی جو

Unhein apni tabiyat ke infe’alaat par ghalib aane aur apne aap ko achanak badal lene ki jo

তাঁকে নিজের স্বভাবের আবেগগুলোর ওপর বিজয়ী হওয়ার এবং নিজেকে হঠাৎ বদলে নেওয়ার যে

غیر معمولی قدرت حاصل ہوگئی ہے وہ فی الحقیقت ایک حیرت انگیز بات ہے، اس کا

ghair-mamooli qudrat haasil ho gayi hai woh fil-haqiqat ek hairat-angeez baat hai, is ka

অসাধারণ ক্ষমতা লাভ হয়েছে তা প্রকৃতপক্ষে একটি বিস্ময়কর ব্যাপার, এর

اندازہ صرف وہی لوگ کرسکتے ہیں جنہوں نے خود اپنی آنکھوں سے اس انقلابی تحول

andaza sirf wahi log kar sakte hain jinhon ne khud apni aankhon se is inqalabi tahawwul

আন্দাজ কেবল ওই লোকরাই করতে পারেন যারা স্বয়ং নিজের চোখে এই বিপ্লবী রূপান্তর

کو دیکھنے کا موقع ملا ہو۔ مجھے آٹھ برس سے یہ موقع حاصل ہے۔

ko dekhne ka mauqa mila ho. Mujhe aath baras se yeh mauqa haasil hai.

দেখার সুযোগ পেয়েছেন। আমি আট বছর ধরে এই সুযোগ লাভ করেছি।

نواب صدر یار جنگ ایک خاندانی رئیس ہیں۔ ملک کے سیاسی معاملات

Nawab Sadar Yar Jung ek khandani raees hain. Mulk ke siyasi muamlaat

নবাব সদর ইয়ার জং একজন খানদানি অভিজাত ব্যক্তি। দেশের রাজনৈতিক বিষয়াবলীতে

میں ان کا طرزِ عمل وہی رہتا آیا ہے جو عموماً ملک کے طبقہء رؤسا کا ہے یعنی سیاسی

mein un ka tarz-e-amal wahi rehta aaya hai jo umooman mulk ke tabqa-e-ruasa ka hai yaani siyasi

তাঁর কর্মপন্থা সেটাই রয়ে এসেছে যা সাধারণত দেশের অভিজাত শ্রেণীর হয়ে থাকে অর্থাৎ রাজনৈতিক

کشمکش کے میدانوں سے علیحدگی اور اپنے گوشہء سکون و جمعیت پر قناعت ۔ بر خلاف

kashmakash ke maidanon se alaihdagi aur apne gosha-e-sukoon-o-jam’iyat par qana’at. Bar-khilaf

টানাপোড়েনের ময়দান থেকে বিচ্ছিন্নতা এবং নিজের নিভৃত প্রশান্তি ও একাকীত্বে সন্তুষ্ট থাকা। বিপরীতে

اس کے مولانا کی پوری زندگی سیاسی جدوجہد کی جنگ آزمائی اور معرکہ آرائی کی

is ke Maulana ki poori zindagi siyasi jad-o-jahad ki jang-azmayi aur maarka-arayi ki

মাওলানার পুরো জীবন রাজনৈতিক সংগ্রামের যুদ্ধ এবং রণকৌশলের

زندگی ہے لیکن صورت حال کا یہ اختلاف بلکہ تضاد ایک لمحے کے لئے بھی ان کے

zindagi hai lekin surat-e-haal ka yeh ikhtilaaf balkeh tazzad ek lamhe ke liye bhi un ke

জীবন, কিন্তু পরিস্থিতির এই পার্থক্য বরং বৈপরীত্য এক মুহূর্তের জন্যও তাঁদের

باہمی علائق کی یگانگت و یکجہتی پر اثر نہیں ڈال سکتا ۔ نہ کبھی مولانا سیاسی

baahmi alàiq ki yagan-gat-o-yak-jehti par asar nahin daal sakta. Na kabhi Maulana siyasi

পারস্পরিক সম্পর্কের একাত্মতা ও সংহতির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে না। না কখনো মাওলানা রাজনৈতিক

معاملات کی طرف کوئی اشارہ کریں گے ، نہ کبھی نواب صاحب کی جانب سے کوئی

muamlaat ki taraf koi ishaara karenge, na kabhi Nawab Sahib ki jaanib se koi

বিষয়াদির দিকে কোনো ইঙ্গিত করবেন, না কখনো নবাব সাহেবের পক্ষ থেকে কোনো

ایسا تذکرہ درمیان میں آئے گا ۔ دونوں کا علاقہ ذاتی محبت و اخلاص اور

aisa tazkira darmiyan mein aayega. Donon ka alaqa zaati muhabbat-o-ikhlaas aur

এমন আলোচনা সামনে আসবে। দুজনের সম্পর্ক ব্যক্তিগত ভালোবাসা ও আন্তরিকতা এবং

ذوقِ علم و ادب کے اشتراک کا علاقہ ہے اور ہمیشہ اسی دائرے میں محدود رہتا ہے ۔

zauq-e-ilm-o-adab ke ishtiraak ka alaqa hai aur hamesha isi daire mein mahdood rehta hai.

জ্ঞান ও সাহিত্যের রুচির অংশীদারিত্বের সম্পর্ক এবং সবসময় এই গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ থাকে।

چنانچہ قلعہ احمد نگر کے ایک مکتوب مورخہ ۲۹ اگست ۱۹۴۲ء میں سیاسی حالات

Chunanche Qila Ahmednagar ke ek maktoob muwarrakha 29 August 1942 mein siyasi haalaat

ফলে আহমেদনগর দুর্গের একটি পত্রে (তারিখ ২৯ আগস্ট ১৯৪২) রাজনৈতিক পরিস্থিতির

পৃষ্ঠা নম্বর: ১৩

۱۳

13

১৩

کی طرف اشارہ کرتے ہوئے لکھتے ہیں “مجھے یہ قصہ یہاں نہیں چھیڑنا چاہئے۔

Ki taraf ishara karte hue likhte hain “Mujhe yeh qissa yahan nahin chhairna chahiye.

দিকে ইঙ্গিত করে লিখছেন, “আমার এই গল্প এখানে শুরু করা উচিত নয়।

میری آپ کی مجلس آرائی اس افسانہ سرائی کے لئے نہیں ہوا کرتی” –

Meri aap ki majlis-arayee is afsana-sarayi ke liye nahin hua karti” –

আমার ও আপনার সভার আয়োজন এই কাহিনী শোনাবার জন্য হয় না।” –

از ما بجز حکایتِ مهر و وفا مپرس

Az ma bajuz hikayat-e-mehr-o-vafa mapurs

আমাদের কাছে ভালোবাসা ও আনুগত্যের কাহিনী ছাড়া আর কিছু জিজ্ঞেস করো না

میری دکانِ سخن میں ایک ہی طرح کی جنس نہیں رہتی لیکن آپ کے لئے نکالتا ہوں تو

Meri dukan-e-sukhan mein ek hi tarah ki jins nahin rehti lekin aap ke liye nikalta hoon to

আমার সাহিত্যের দোকানে কেবল এক ধরণের পণ্য থাকে না, কিন্তু আপনার জন্য যখন বের করি তখন

احتیاط کی چھلنی میں اچھی طرح چھان لیا کرتا ہوں کہ کسی طرح کی سیاسی ملاوٹ باقی نہ رہے”

ehtiyat ki chhalni mein achhi tarah chhan liya karta hoon ke kisi tarah ki siyasi milawat baqi na rahe”

সতর্কতার চালুন দিয়ে ভালো করে চেলে নিই যেন কোনো ধরণের রাজনৈতিক ভেজাল বাকি না থাকে।”

۱۵ جون ۱۹۴۵ء کو مولانا تین برس کی قید و بند کے بعد رہا ہوئے اور اس

15 June 1945 ko Maulana teen baras ki qaid-o-band ke baad raha hue aur is

১৫ জুন ১৯৪৫ সালে মাওলানা তিন বছরের কারাবাস শেষে মুক্তি পেলেন এবং এই

حالت میں رہا ہوئے کہ ۴۴ پاؤنڈ وزن کم ہو چکا تھا اور تندرستی جواب دے

haalat mein raha hue ke 44 pound wazan kam ho chuka tha aur tandurusti jawab de

অবস্থায় মুক্তি পেলেন যে ৪৪ পাউন্ড ওজন কমে গিয়েছিল এবং স্বাস্থ্য ভেঙে (জবাব দিয়ে)

چکی تھی لیکن رہائی کے بعد ہی انھیں فوراً شملہ پہنچنا اور شملہ کانفرنس کی مشغولیتوں

chuki thi lekin rihayi ke baad hi unhein fauran Shimla pahunchna aur Shimla conference ki mashghuliyaton

গিয়েছিল, কিন্তু মুক্তির পরেই তাঁকে তৎক্ষণাৎ শিমলায় পৌঁছাতে এবং শিমলা কনফারেন্সের ব্যস্ততায়

میں گم ہو جانا پڑا ۔ اب وہ قلعہ احمد نگر اور بانکوڑا کے قید خانے کی جگہ ” سسل لاج “

mein gum ho jaana pada. Ab woh Qila Ahmednagar aur Bankura ke qaid-khane ki jagah “Cecil Lodge”

হারিয়ে যেতে হলো। এখন তিনি আহমেদনগর দুর্গ ও বাঁকুড়া জেলখানার পরিবর্তে “সিল লজ”

شملہ کے مہمان تھے لیکن یہاں بھی صبح چار بجے کی سحر خیزی اور خود مشغولی کے

Shimla ke mehmaan thay lekin yahan bhi subah chaar baje ki sahar-khezi aur khud-mashghuli ke

শিমলার মেহমান ছিলেন, কিন্তু এখানেও ভোর চারটার জাগরণ এবং নিজের মগ্নতার

معمولات برابر جاری رہے ۔ ایک دن صبح اچانک نواب صاحب کی یاد سامنے

maamoolat barabar jaari rahe. Ek din subah achanak Nawab Sahib ki yaad saamne

রুটিন একইভাবে জারি ছিল। একদিন সকালে হঠাৎ নবাব সাহেবের কথা সামনে

آ جاتی ہے اور وہ ایک شعر لکھ کر تین برس پیشتر کی خط و کتابت کا سلسلہ از سرِ نو

aa jati hai aur woh ek sher likh kar teen baras peshtar ki khat-o-kitabat ka silsila az-sar-e-nau

এসে যায় এবং তিনি একটি কবিতা লিখে তিন বছর আগের চিঠিপত্রের ধারাবাহিকতা নতুন করে

تازہ کر دیتے ہیں ۔ پھر تبدیلیء آب و ہوا کے لئے کشمیر جاتے ہیں اور تین ہفتے گل مرگ

taaza kar dete hain. Phir tabdili-e-aab-o-hawa ke liye Kashmir jaate hain aur teen hafte Gulmarg

সতেজ করে দেন। এরপর জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য কাশ্মীর যান এবং তিন সপ্তাহ গুলমার্গে

میں مقیم رہتے ہیں ، گل مرگ سے سری نگر آتے ہیں اور ایک ہاؤس بوٹ میں مقیم ہو جاتے

mein muqeem rehte hain, Gulmarg se Srinagar aate hain aur ek house-boat mein muqeem ho jaate

অবস্থান করেন, গুলমার্গ থেকে শ্রীনগর আসেন এবং একটি হাউসবোটে অবস্থান করতে

ہیں۔ یہ ہاؤস بوٹ نسیم باغ کے کنارے لگا دیا گیا تھا اور مولانا کی صحبتیں اسی

hain. Yeh house-boat Naseem Bagh ke kinare laga diya gaya tha aur Maulana ki suhbateinn isi

থাকেন। এই হাউসবোট নাসিমবাগের কিনারে রাখা হয়েছিল এবং মাওলানার আড্ডাগুলো এর

کے ڈرائنگ روم میں بسر ہونے لگتی ہیں ۔ یہاں پھر خط و کتابت کا سلسلہ جاری ہوتا

ke drawing room mein basar hone lagti hain. Yahan phir khat-o-kitabat ka silsila jaari hota

ড্রয়িংরুমেই কাটতে শুরু করে। এখানে আবার চিঠিপত্রের ধারা শুরু

ہے اور ۳ ستمبر ۱۹۴۵ء کو مولانا اپنے ایک مکتوب میں قلعہ احمد نگر کے حالات کی

hai aur 3 September 1945 ko Maulana apne ek maktoob mein Qila Ahmednagar ke haalaat ki

হয় এবং ৩ সেপ্টেম্বর ১৯৪৫ সালে মাওলানা তাঁর একটি পত্রে আহমেদনগর দুর্গের পরিস্থিতির

حکایت چھیڑ دیتے ہیں اور ان مکاتیب کی نگارش کے اسباب و محرکات کی تفصیلات

hikayat chhair dete hain aur in makateeb ki nigaarish ke asbaab-o-muharrikaat ki tafseelaat

কাহিনী তুলে ধরেন এবং এই পত্রগুলো লেখার কারণ ও প্রেক্ষাপটের বিস্তারিত

بیان کر دیتے ہیں اور ان مکاتیب کی نگارش کے اسباب و محرکات کی تفصیلات

bayan kar dete hain aur in makateeb ki nigaarish ke asbaab-o-muharrikaat ki tafseelaat

বর্ণনা করে দেন এবং এই পত্রগুলো লেখার কারণ ও প্রেক্ষাপটের বিস্তারিত (পুনরাবৃত্তি)

ہی جو اس مجموعے میں جمع کئے گئے ہیں ۔ چونکہ رہائی کے بعد کے مکاتیب کا یہ حصہ بھی

hi jo is majmue mein jama kiye gaye hain. Chunke rihayi ke baad ke makateeb ka yeh hissa bhi

যা এই সংকলনে জমা করা হয়েছে। যেহেতু মুক্তির পরের পত্রাবলির এই অংশটিও

ان مکاتیب سے مربوط ہو گیا ہے اس لئے مولانا سے اجازت لے کر میں نے انھیں بھی

in makateeb se marboot ho gaya hai is liye Maulana se ijazat le kar main ne unhein bhi

এই পত্রগুলোর সাথে সম্পৃক্ত হয়ে গেছে, তাই মাওলানার কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে আমি এগুলোকেও

اس مجموعے کی ابتدا میں شامل کر دیا ہے ۔ رہائی کے بعد کے یہ مکاتیব اس مجموعے

is majmue ki ibtida mein shamil kar diya hai. Rihayi ke baad ke yeh makateeb is majmue

এই সংকলনের শুরুতে অন্তর্ভুক্ত করে দিয়েছি। মুক্তির পরের এই পত্রগুলো এই সংকলনের

 

 

পৃষ্ঠা নম্বর: ১৪

۱۴

14

১৪

کے لئے دیباچے کا کام دیں گے –

ke liye deebache ka kaam dein ge –

জন্য মুখবন্ধের কাজ করবে –

مولانا کو سینکڑوں خطوط لکھنے اور لکھوانے پڑتے ہیں اور ظاہر ہے کہ ان کی نقول

Maulana ko sainkdon khutoot likhne aur likhwane padte hain aur zahir hai ke un ki naqool

মাওলানাকে শত শত চিঠি লিখতে এবং লেখাতে হয় এবং স্বাভাবিকভাবেই সেগুলোর নকল (কপি)

نہیں رکھی جا سکتی تھیں لیکن افسوس ہے کہ انھوں نے اپنے خاص علمی اور ادبی مکاتیب

nahin rakkhi ja sakti thin lekin afsos hai ke unhon ne apne khaas ilmi aur adabi makateeb

রাখা সম্ভব হতো না; কিন্তু আফসোসের বিষয় এই যে, তিনি তাঁর বিশেষ জ্ঞানতাত্ত্বিক ও সাহিত্যিক পত্রাবলির

کی نقول رکھنے کی بھی کبھی کوشش نہیں کی اور اس طرح سینکڑوں مکاتیب ضائع گئے –

ki naqool rakhne ki bhi kabhi koshish nahin ki aur is tarah sainkdon makateeb zaya gaye –

নকল রাখারও কখনো চেষ্টা করেননি এবং এভাবে শত শত পত্র হারিয়ে গেছে –

۱۹۴۰ء میں میں نے مولانا سے درخواست کی کہ جو خاص مکاتیب وہ دوستانِ

1940 mein main ne Maulana se darkhwast ki ke jo khaas makateeb woh dostan-e-

১৯৪০ সালে আমি মাওলানার কাছে অনুরোধ করেছিলাম যে, তিনি তাঁর বন্ধুদের কাছে যে বিশেষ পত্রগুলো

خاص کو لکھا کرتے ہیں ان کی نقول رکھنے کی مجھے اجازت ملے – چنانچہ مولانا نے اجازت

khaas ko likha karte hain un ki naqool rakhne ki mujhe ijazat mile – chunanche Maulana ne ijazat

লিখে থাকেন, সেগুলোর নকল রাখার অনুমতি যেন আমাকে দেওয়া হয় – ফলে মাওলানা অনুমতি

دے دی ، اور اب ایسا ہونے لگا کہ جب کبھی مولانا کوئی مکتوب خاص اپنے ذوق و

de di, aur ab aisa hone laga ke jab kabhi Maulana koi maktoob khaas apne zauq-o-

দিয়েছিলেন এবং এখন এমন হতে লাগল যে যখনই মাওলানা তাঁর নিজস্ব রুচি ও

کیف میں لکھتے ، میں پہلے اس کی نقل کر لیتا ، پھر ڈاک میں ڈالتا – نواب صاحب کے

kaif mein likhte, main pehle us ki naql kar leta, phir daak mein dalta – Nawab Sahib ke

আবেগের বশে কোনো চিঠি লিখতেন, আমি আগে তার নকল করে নিতাম, তারপর ডাকে দিতাম – নবাব সাহেবের

نام ۱۹۴۰ء ، ۱۹۴১ء اور ۱۹۴২ء میں جس قدر خطوط لکھے گئے سب کی نقول میں

naam 1940, 1941 aur 1942 mein jis qadar khutoot likhe gaye sab ki naqool main

নামে ১৯৪০, ১৯৪১ এবং ১৯৪২ সালে যতগুলো চিঠি লেখা হয়েছে, সবগুলোর নকল আমি

نے رکھ لی تھیں اور میرے پاس موجود ہیں – چنانچہ اسی بنا پر رہائی کے بعد مولانا

ne rakh li thin aur mere paas maujood hain – chunanche isi bina par rihayi ke baad Maulana

রেখে দিয়েছিলাম এবং সেগুলো আমার কাছে আছে – সুতরাং এরই ভিত্তিতে মুক্তির পর মাওলানা

نے قلعہ احمد نگر کے مکاتیب میرے حوالے کئے کہ حسبِ معمول ان کی نقول رکھ لوں –

ne Qila Ahmednagar ke makateeb mere hawale kiye ke hasb-e-mamool un ki naqool rakh loon –

আহমেদনগর দুর্গের পত্রগুলো আমার কাছে হস্তান্তর করেন যেন নিয়ম অনুযায়ী আমি সেগুলোর নকল রেখে দিই –

اور اصل نواب صاحب کی خدمت میں بیک دفعہ بھیج دوں لیکن میں نے جب ان

aur asl Nawab Sahib ki khidmat mein bayak dafa bhej doon lekin main ne jab un

এবং মূল কপিগুলো নবাব সাহেবের কাছে একবারে পাঠিয়ে দিই; কিন্তু আমি যখন সেগুলো

کا مطالعہ کیا تو خیال ہوا کہ ان تحریرات کا محض نجی خطوط کی شکل میں رہنا اور

ka mutalea kiya to khayal hua ke in tahriraat ka mahz niji khutoot ki shakal mein rehna aur

অধ্যয়ন করলাম তখন মনে হলো যে এই লেখাগুলো কেবল ব্যক্তিগত চিঠির আকারে থেকে যাওয়া এবং

شائع نہ ہونا اردو ادب کی بہت بڑی محرومی اور اربابِ ذوق کی ناقابلِ تلافی

shaya na hona Urdu adab ki bahut badi mahroomi aur arbab-e-zauq ki na-qabil-e-talafi

প্রকাশিত না হওয়া উর্দু সাহিত্যের জন্য এক বিরাট বঞ্চনা এবং রসিকজনদের জন্য এক অপূরণীয়

حرمانی ہوگی – مولانا اس وقت شملہ میں تھے – میں نے اصرار ان سے درخواست کی

hirmani hogi – Maulana is waqt Shimla mein thay – main ne israr un se darkhwast ki

ক্ষতি হবে – মাওলানা তখন শিমলায় ছিলেন – আমি জোর দিয়ে তাঁর কাছে আবেদন করলাম

کہ ان مکاتیب کو ایک مجموعے کی شکل میں شائع کرنے کی اجازت دے دیں – مجھے

ke in makateeb ko ek majmue ki shakal mein shaya karne ki ijazat de dein – mujhe

যেন এই পত্রগুলো একটি সংকলন আকারে প্রকাশ করার অনুমতি দেন – আমার

یقین ہے کہ ملک کے تمام اربابِ ذوق و نظر اس واقعے کے شکر گزار ہوں گے کہ

yaqeen hai ke mulk ke tamam arbab-e-zauq-o-nazar is waqiye ke shukr guzar hon ge ke

বিশ্বাস যে দেশের সমস্ত সুধী সমাজ এই ঘটনার জন্য কৃতজ্ঞ থাকবেন যে

مولانا نے اشاعت کی اجازت دے دی اور اس طرح میں اس قابل ہو گیا کہ یہ مجموعہ

Maulana ne ishaat ki ijazat de di aur is tarah main is qabil ho gaya ke yeh majmua

মাওলানা প্রকাশের অনুমতি দিয়েছেন এবং এভাবে আমি এই যোগ্য হলাম যে এই সংকলনটি

دیدہ ورانِ علم و ادب کی ضیافتِ ذوق کے لئے پیش کروں –

deeda-waran-e-ilm-o-adab ki ziyafat-e-zauq ke liye pesh karoon –

জ্ঞান ও সাহিত্যের সমঝদারদের রুচিশীল আপ্যায়নের জন্য পেশ করতে পারছি –

۱۹۴۲ء میں گرفتاری سے پہلے مولانا لاہو گئے تھے وہاں انفاؤنسرا کی

1942 mein giraftari se pehle Maulana Lahore gaye thay wahan influenza ki

১৯৪২ সালে গ্রেপ্তারের আগে মাওলানা লাহোরে গিয়েছিলেন, সেখানে ইনফ্লুয়েঞ্জার (জ্বর)

شکایت لاحق ہوگئی تھی – اسی حالت میں کلکتہ آئے اور صرف تین دن ٹھہر کر

shikayat lahaq ho gayi thi – isi haalat mein Calcutta aaye aur sirf teen din thehar kar

অসুস্থতায় আক্রান্ত হয়েছিলেন – ওই অবস্থাতেই কলকাতায় আসলেন এবং মাত্র তিন দিন অবস্থান করে

পৃষ্ঠা নম্বর: ১৫

۱۵

15

১৫

۲ اگست کو آل انڈیا کانگریس کمیٹی کی صدارت کرنے کے لئے بمبئی روانہ ہو گئے۔

2 August ko All India Congress Committee ki sadarat karne ke liye Bombay rawana ho gaye.

২রা আগস্ট অল ইন্ডিয়া কংগ্রেস কমিটির সভাপতিত্ব করার জন্য বোম্বাই রওনা হয়ে গেলেন।

جاتے ہوئے ریل میں انھوں نے ایک مکتوب نواب صاحب کے نام لکھ کر رکھ لیا تھا کہ

Jaate hue rail mein unhon ne ek maktoob Nawab Sahib ke naam likh kar rakh liya tha ke

যাওয়ার পথে ট্রেনে তিনি নবাব সাহেবের নামে একটি পত্র লিখে রেখেছিলেন যাতে

بمبئی پہنچ کر مجھے دے دیں گے۔ میں حسبِ معمول اس کی نقل رکھ کر اصل ڈاک میں

Bombay pahunch kar mujhe de dein ge. Main hasb-e-mamool is ki naql rakh kar asl daak mein

বোম্বাই পৌঁছে সেটি আমাকে দিয়ে দেন। আমি নিয়ম অনুযায়ী তার নকল রেখে মূলটি ডাকে

ڈال دوں گا۔ لیکن بمبئی پہنچنے کے بعد وہ اپنی مصروفیتوں میں غرق ہو گئے اور

daal doon ga. Lekin Bombay pahunchne ke baad woh apni masroofiyaton mein gharq ho gaye aur

দিয়ে দেব। কিন্তু বোম্বাই পৌঁছানোর পর তিনি নিজের ব্যস্ততায় ডুবে গেলেন এবং

مکتوب سفر ان کے اٹیچی کیس میں پڑا رہ گیا، یہاں تک کہ ۹ اگست کی صبح کو وہ

maktoob-e-safar un ke attaché case mein pada reh gaya, yahan tak ke 9 August ki subah ko woh

ভ্রমণের সেই পত্রটি তাঁর অ্যাটাচি কেসে পড়ে রইল, এমনকি ৯ই আগস্ট সকালে তিনি

گرفتار ہو گئے۔ چونکہ قلعہ احمد نگر کے پہلے مکتوب میں اس خط کا ذکر آیا ہے اس لئے

giraftar ho gaye. Chunke Qila Ahmednagar ke pehle maktoob mein is khat ka zikr aaya hai is liye

গ্রেপ্তার হয়ে গেলেন। যেহেতু আহমেদনগর দুর্গের প্রথম পত্রে এই চিঠির উল্লেখ এসেছে, তাই

مناسب معلوم ہوا کہ اسے بھی ابتدا میں شامل کر دیا جائے چنانچہ وہ شامل کر دیا گیا ہے۔

munasib maloom hua ke ise bhi ibtida mein shamil kar diya jaye chunanche woh shamil kar diya gaya hai.

উচিত মনে হলো যে এটিকেও শুরুতে অন্তর্ভুক্ত করা হোক, ফলে সেটি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

میں نے ارادہ کیا تھا کہ مولانا کے اسلوبِ نگارش (سٹائل) کی نسبت اپنے

Main ne irada kiya tha ke Maulana ke usloob-e-nigaarish (style) ki nisbat apne

আমি ইচ্ছে করেছিলাম যে মাওলানার লিখনশৈলী (স্টাইল) সম্বন্ধে নিজের

تاثرات کے اظہار کی جرأت کروں گا لیکن جب اس ارادے کو عمل میں لانے کے لئے تیار

taasuraat ke izhaar ki jurat karoon ga lekin jab is irade ko amal mein lane ke liye tayyar

অনুভূতি প্রকাশের সাহস করব, কিন্তু যখন এই ইচ্ছাকে কাজে পরিণত করার জন্য প্রস্তুত

ہوا تو معلوم ہوا کہ خاموشی کے سوا چارہ کار نہیں کیونکہ جتنا کچھ اور جیسا کچھ لکھنا

hua to maloom hua ke khamoshi ke siwa chara-e-kar nahin kyunke jitna kuch aur jaisa kuch likhna

হলাম তখন বুঝলাম যে নীরবতা ছাড়া আর উপায় নেই, কারণ যতটুকু এবং যেমনটা লেখা

چاہیئے اس کی یہاں گنجائش نہیں اور جس قدر لکھنے کی گنجائش ہے وہ اظہارِ

chahiye is ki yahan gunjayish nahin aur jis qadar likhne ki gunjayish hai woh izhaar-e-

প্রয়োজন তার এখানে অবকাশ নেই, আর যতটুকু লেখার সুযোগ আছে তা অনুভূতি

تاثرات کے لئے کافی نہیں۔ صرف اتنا اشارہ کر دینا چاہتا ہوں کہ فرانسیسی ادبیات

taasuraat ke liye kafi nahin. Sirf itna ishara kar dena chahta hoon ke Francisi adabiyat

প্রকাশের জন্য যথেষ্ট নয়। শুধু এতটুকু ইঙ্গিত করতে চাই যে ফরাসি সাহিত্যে

میں ادب کی جس نوعیت کو “ادبِ عالی” کے نام سے تعبیر کیا گیا ہے، اگر اردو ادب میں

mein adab ki jis nauiyat ko “Adab-e-Aali” ke naam se taabeer kiya gaya hai, agar Urdu adab mein

সাহিত্যের যে ধরনকে “উচ্চাঙ্গ সাহিত্য” নামে অভিহিত করা হয়েছে, যদি উর্দু সাহিত্যে

اس کی کوئی مثال ہمیں مل سکتی ہے تو وہ صرف مولانا کی ادبیات ہیں۔

is ki koi misal hamein mil sakti hai to woh sirf Maulana ki adabiyat hain.

তার কোনো উদাহরণ আমরা পেতে পারি তবে তা কেবল মাওলানার সাহিত্যকর্ম।

مولانا نے اپنے اسلوبِ نگارش کے مختلف ڈھنگ رکھے ہیں کیونکہ ہر موضوع

Maulana ne apne usloob-e-nigaarish ke mukhtalif dhang rakkhe hain kyunke har mauzoo

মাওলানা তাঁর লিখনশৈলীর বিভিন্ন ভঙ্গি রেখেছেন কারণ প্রতিটি বিষয়

ایک خاص طرح کا اسلوب چاہتا ہے اور اسی اسلوب میں اس کا رنگ ابھر سکتا ہے

ek khaas tarah ka usloob chahta hai aur usi usloob mein is ka rang ubhar sakta hai

একটি বিশেষ ধরনের শৈলী দাবি করে এবং সেই শৈলীতেই তার রূপ ফুটে উঠতে পারে

دینی مباحث کے لئے جو اسلوبِ تحریر موزوں ہو گا تاریخ کے لئے موزوں نہ ہو گا۔

deeni mabaahis ke liye jo usloob-e-tahrir mauzoon ho ga tareekh ke liye mauzoon na ho ga.

ধর্মীয় আলোচনার জন্য যে লিখনশৈলী উপযোগী হবে তা ইতিহাসের জন্য উপযোগী হবে না।

تاریخی مباحث جس طرزِ کتابت کے متقاضی ہوتے ہیں ضروری نہیں کہ ادبی نگارشات

Tareekhi mabaahis jis tarz-e-kitabat ke muqtazi hote hain zaroori nahin ke adabi nigaarishat

ঐতিহাসিক আলোচনা যে লিখনপদ্ধতি দাবি করে, জরুরি নয় যে সাহিত্যিক রচনাবলি

کے لئے بھی وہ موزوں ہو۔ حالت یہ ہے کہ ہر شخص ایک خاص طرح کا اسلوبِ تحریر

ke liye bhi woh mauzoon ho. Haalat yeh hai ke har shakhs ek khaas tarah ka usloob-e-tahrir

তার জন্যও উপযোগী হবে। অবস্থা এই যে প্রতিটি মানুষ একটি বিশেষ ধরনের লিখনশৈলী

اختیار کر لیتا ہے اور پھر جو کچھ لکھتا ہے اسی رنگ میں لکھتا ہے لیکن مولانا کی خصوصیت

ikhtiyar kar leta hai aur phir jo kuch likhta hai usi rang mein likhta hai lekin Maulana ki khusoosiyat

বেছে নেয় এবং তারপর যা কিছু লেখে সেই ঢঙেই লেখে, কিন্তু মাওলানার বৈশিষ্ট্য

یہ ہے کہ انھوں نے اپنے علم و ذوق کے تنوع کی طرح اپنے اسلوبِ تحریر بھی مختلف قسم کے

yeh hai ke unhon ne apne ilm-o-zauq ke tanau ki tarah apne usloob-e-tahrir bhi mukhtalif qism ke

এই যে তিনি তাঁর জ্ঞান ও রুচির বৈচিত্র্যের মতো নিজের লিখনশৈলীও বিভিন্ন ধরনের

পৃষ্ঠা নম্বর: ১৬

۱۶

16

১৬

کا رکھا ہے۔ عام دینی اور علمی مطالب کو وہ ایک خاص طرح کے اسلوب میں لکھتے

ka rakkha hai. Aam deeni aur ilmi matalib ko woh ek khaas tarah ke usloob mein likhte

রেখেছেন। সাধারণ ধর্মীয় ও জ্ঞানতাত্ত্বিক বিষয়াবলিকে তিনি এক বিশেষ ধরনের শৈলীতে লেখেন,

ہیں، صحافت نگاری کے لئے انھوں نے ایک دوسرا اسلوب اختیار کیا ہے، اور

hain, sahafat nigaari ke liye unhon ne ek doosra usloob ikhtiyar kiya hai, aur

আবার সাংবাদিকতার জন্য তিনি এক দ্বিতীয় (ভিন্ন) শৈলী গ্রহণ করেছেন, এবং

خالص ادبی انشا پردازی کے لئے ان دونوں سے الگ طریقِ نگارش ہے۔

khaalis adabi insha-pardaazi ke liye in donon se alag tareeq-e-nigaarish hai.

বিশুদ্ধ সাহিত্যিক রচনার জন্য এই দুই পদ্ধতি থেকে আলাদা লিখন পদ্ধতি রয়েছে।

جس زمانے میں “الہلال” نکلا کرتا تھا تو اس میں کبھی وہ خالص ادبی

Jis zamane mein “Al-Hilal” nikla karta tha to is mein kabhi woh khaalis adabi

যে যুগে “আল-হিলাল” প্রকাশিত হতো, তখন তাতে কখনো কখনো তিনি বিশুদ্ধ সাহিত্যিক

قسم کی چیزیں بھی لکھا کرتے تھے۔ ان تحریروں میں انھوں نے ایک ایسا مجتہدانہ

qism ki cheezein bhi likha karte thay. In tahriron mein unhon ne ek aisa mujtahidana

ধরণের বিষয়ও লিখতেন। সেই লেখাগুলোতে তিনি এমন এক উদ্ভাবনী (মুজতাহিদানা)

اسلوب اختیار کیا تھا جس کی کوئی دوسری مثال لوگوں کے سامنے موجود نہیں تھی۔

usloob ikhtiyar kiya tha jis ki koi doosri misal logon ke saamne maujood nahin thi.

শৈলী গ্রহণ করেছিলেন যার কোনো দ্বিতীয় উদাহরণ মানুষের সামনে বিদ্যমান ছিল না।

اس اسلوب کے لئے اگر کوئی تعبیر اختیار کی جا سکتی ہے تو وہ صرف “شعرِ منثور”

Is usloob ke liye agar koi taabeer ikhtiyar ki ja sakti hai to woh sirf “Sher-e-Mansoor”

এই শৈলীর জন্য যদি কোনো সংজ্ঞা দেওয়া যায়, তবে তা কেবল “গদ্য কবিতা” (শের-এ-মনসুর)

کی ہے یعنی وہ نثر میں شاعری کیا کرتے تھے۔ ان کی تحریر از سرتا پا شعر ہوتی تھی

ki hai yaani woh nasr mein shayari kiya karte thay. Un ki tahrir az-sar-ta-pa sher hoti thi

হতে পারে; অর্থাৎ তিনি গদ্যের মাধ্যমে কবিতা লিখতেন। তাঁর লেখা আপাদমস্তক কাব্যিক হতো,

صرف ایک چیز اس میں نہیں ہوتی تھی یعنی وزن اور اس لئے اسے نظم کہنا ٹھیک نہ تھا۔

sirf ek cheez is mein nahin hoti thi yaani wazan aur is liye ise nazm kehna theek na tha.

শুধু একটি বিষয় তাতে থাকত না অর্থাৎ ছন্দ (ওজন), আর এই কারণে তাকে ‘কবিতা’ বলা ঠিক হতো না।

اس طرزِ تحریر کا ایک خاص طریقہ یہ تھا کہ وہ اپنی نثر کی شاعری کو شعراء کی

Is tarz-e-tahrir ka ek khaas tareeqa yeh tha ke woh apni nasr ki shayari ko shu’ara ki

এই লিখনশৈলীর এক বিশেষ পদ্ধতি ছিল এই যে, তিনি তাঁর গদ্য-কবিতাকে কবিদের

نظم کی شاعری سے مخلوط و مربوط کر کے ترتیب دیتے تھے اور یہ اختلاط اور ارتباط

nazm ki shayari se makhlot-o-marboot kar ke tarteeb dete thay aur yeh ikhtilaat aur artibaat

পদ্য-কবিতার সাথে মিশ্রিত ও সংযুক্ত করে বিন্যাস করতেন এবং এই সংমিশ্রণ ও সংযোগ

اس طرح وجود میں آتا تھا کہ اشعار صرف مطالب کی مناسبت ہی سے نہیں آتے،

is tarah wajood mein aata tha ke ashaar sirf matalib ki munasibat hi se nahin aate,

এমনভাবে তৈরি হতো যে কবিতাগুলো কেবল মূল বিষয়ের প্রাসঙ্গিকতা থেকেই আসত না,

بلکہ بجائے خود مطالب کا ایک جزو بن جاتے تھے، ایسا جزو کہ اگر اسے الگ کر دیجئیے تو

balkeh bajaye khud matalib ka ek juzw ban jaate thay, aisa juzw ke agar ise alag kar dijiye to

বরং সেগুলো নিজেই প্রসঙ্গের একটি অংশে পরিণত হতো; এমন অংশ যে যদি তাকে আলাদা করে দেন তবে

خود نفسِ مطلب کا ایک ضروری اور لاینفک جزو الگ ہو جائے۔ اکثر حالتوں میں

khud nafs-e-matlab ka ek zaroori aur la-yan-fakk juzw alag ho jaye. Aksar haalaton mein

মূল প্রসঙ্গের একটি অতিপ্রয়োজনীয় ও অবিচ্ছেদ্য অংশ পৃথক হয়ে যাবে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে

مطالب کا سلسلہ اس طرح پھیلتا تھا کہ پورا مضمون نثر کے چھوٹے چھوٹے پیرا گرافوں

matalib ka silsila is tarah phailta tha ke poora mazmoon nasr ke chhote chhote paragraphs

আলোচনার ধারা এমনভাবে বিস্তৃত হতো যে পুরো প্রবন্ধটি গদ্যের ছোট ছোট প্যারাগ্রাফের

سے مرکب ہوتا اور ہر پیرا گراف کسی ایک شعر پر ختم ہوتا۔ یہ شعر نثر کے مطلب سے

se murakkab hota aur har paragraph kisi ek sher par khatm hota. Yeh sher nasr ke matlab se

সমন্বয়ে গঠিত হতো এবং প্রতিটি প্যারাগ্রাফ কোনো একটি কবিতার চরণে গিয়ে শেষ হতো। এই কবিতাটি গদ্যের প্রসঙ্গের সাথে

ٹھیک اسی طرح جڑا اور بندھا ہوا ہوتا جس طرح ایک ترکیب بند کا ہر بند ٹیپ

theek isi tarah juda aur bandha hua hota jis tarah ek tarkeeb-band ka har band teep

ঠিক সেভাবেই যুক্ত ও আবদ্ধ থাকত যেভাবে একটি ‘তারকিব-বন্দ’ কবিতার প্রতিটি স্তবক (বন্ধ) মূল স্তবকের

کے کسی شعر سے وابستہ ہوتا ہے اور وہ شعر بند کا ایک ضروری جزو بن جاتا ہے۔

ke kisi sher se wabasta hota hai aur woh sher band ka ek zaroori juzw ban jata hai.

কোনো পঙক্তির সাথে যুক্ত থাকে এবং সেই পঙক্তিটি স্তবকের এক জরুরি অংশে পরিণত হয়।

لوگ نثر میں اشعار لاتے ہیں تو عموماً اس طرح لاتے ہیں کہ کسی مناسبت

Log nasr mein ashaar late hain to umooman is tarah late hain ke kisi munasibat

মানুষ যখন গদ্যের মধ্যে কবিতা নিয়ে আসে, তখন সাধারণত এমনভাবে আনে যে কোনো প্রাসঙ্গিকতা

سے کوئی شعر یاد آگیا اور کسی خاص محل میں درج کر دیا گیا لیکن مولانا اس قسم کی

se koi sher yaad aa gaya aur kisi khaas mahal mein darj kar diya gaya lekin Maulana is qism ki

থেকে কোনো কবিতা মনে পড়ল আর কোনো একটি বিশেষ স্থানে তা উল্লেখ করে দেওয়া হলো; কিন্তু মাওলানা এই ধরণের

تحریرات میں جو شعر درج کریں گے اس کی مناسبت محض جزئی مناسبت نہ ہو گی

tahriraat mein jo sher darj karenge is ki munasibat mahz juzwi munasibat na hogi

রচনাবলীতে যে কবিতা ব্যবহার করেন, তার প্রাসঙ্গিকতা কেবল আংশিক প্রাসঙ্গিকতা হতো না

পৃষ্ঠা নম্বর: ১৭

۱۷

17

১৭

بلکہ مضمون کا ایک ٹکڑا بن جائے گی، گویا خاص اسی محل کیلئے شاعر نے یہ شعر کہا ہے

balkeh mazmoon ka ek tukra ban jaye gi, goya khaas isi mahal ke liye shayar ne yeh sher kaha hai

বরং প্রবন্ধের একটি অংশে পরিণত হবে, যেন বিশেষ এই স্থানের জন্যই কবি এই কবিতাটি বলেছেন

اور مطلب کا تقاضا پورا کرنے اور ادھوری بات کو مکمل کر دینے کیلئے اس کے بغیر چارہ نہیں۔

aur matlab ka taqaza poora karne aur adhoori baat ko mukammal kar dene ke liye is ke baghair chara nahin.

এবং প্রসঙ্গের দাবি পূরণ করতে ও অসম্পূর্ণ কথাকে পূর্ণ করতে এটি ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।

اس طرزِ تحریر پر وہی شخص قادر ہو سکتا ہے جو کامل درجے کا شاعرانہ فکر رکھنے کے

Is tarz-e-tahrir par wahi shakhs qadir ho sakta hai jo kamil darje ka shairana fikr rakhne ke

এই লিখনশৈলীর ওপর কেবল ওই ব্যক্তিই সক্ষম হতে পারেন যিনি উচ্চমানের কাব্যিক চিন্তা রাখার

ساتھ ساتھ اساتذہ کے بیشمار اشعار بھی اپنے حافظے میں محفوظ رکھتا ہو اور مطالب کی

saath saath asatiza ke beshumar ashaar bhi apne hafize mein mahfooz rakhta ho aur matalib ki

পাশাপাশি ওস্তাদ কবিদের অসংখ্য কবিতা নিজের স্মৃতিতে সংরক্ষিত রাখেন এবং প্রসঙ্গের

ہر قسم اور ہر نوعیت کے لئے جس طرح کے اشعار بھی مطلوب ہوں فوراً حافظہ سے نکال

har qism aur har nauiyat ke liye jis tarah ke ashaar bhi matloob hon fauran hafiza se nikaal

প্রতিটি ধরণ ও প্রকৃতির জন্য যেমন কবিতারই প্রয়োজন হোক না কেন, তা তৎক্ষণাৎ স্মৃতি থেকে বের করে

لے سکتا ہو۔ پھر ساتھ ہی اس کا ذوق بھی اس درجہ سلیم اور بے داغ ہو کہ صرف اعلیٰ

le sakta ho. Phir saath hi is ka zauq bhi is darja saleem aur be-daagh ho ke sirf aala

আনতে পারেন। তারপর সাথে সাথে তাঁর রুচিও এমন মার্জিত ও নিখুঁত হতে হবে যে কেবল শ্রেষ্ঠ

درجے کے اشعار ہی حافظہ قبول کرے اور حسنِ انتخاب کا معیار کسی حال میں درجہ سے نہ

darje ke ashaar hi hafiza qabool kare aur husn-e-intekhab ka mayaar kisi haal mein darja se na

মানের কবিতাগুলোই স্মৃতি গ্রহণ করবে এবং নির্বাচনের মানদণ্ড কোনো অবস্থাতেই মান থেকে যেন না

گرے۔ اس اعتبار سے مولانا کے حافظے کا جو حال ہے وہ ہم سب کو معلوم ہے، قدرت

gire. Is aitbaar se Maulana ke hafize ka jo haal hai woh hum sab ko maloom hai, qudrat

পড়ে যায়। এই বিচারে মাওলানার স্মৃতির যে অবস্থা তা আমাদের সবার জানা; প্রকৃতি

نے انھیں جو خصائص بخشے ہیں شاید ان سب میں حافظے کی نعمت لازوال سب سے

ne unhein jo khasais bakhshe hain shayad in sab mein hafize ki ne’mat lazawal sab se

তাঁকে যে বৈশিষ্ট্যগুলো দান করেছে, সম্ভবত সেগুলোর মধ্যে স্মৃতির এই অক্ষয় নেয়ামত সবচাইতে

بڑی ہے۔ عربی، فارسی اور اردو کے کتنے اشعار ان کے حافظے میں محفوظ ہونگے

badi hai. Arabi, Farsi aur Urdu ke kitne ashaar un ke hafize mein mahfooz honge

বড়। আরবি, ফারসি ও উর্দুর কত হাজার কবিতা তাঁর স্মৃতিতে জমা আছে

یہ کسی کو معلوم نہیں۔ غالباً خود انھیں بھی معلوم نہیں لیکن جو نہی وہ قلم اٹھاتے ہیں

yeh kisi ko maloom nahin. Ghaliban khud unhein bhi maloom nahin lekin joonhi woh qalam uthate hain

তা কারো জানা নেই। সম্ভবত তিনি নিজেও জানেন না, কিন্তু যেইমাত্র তিনি কলম ধরেন

اور مطالب کی مناسبتیں ابھرنے لگتی ہیں، معاً ان کے حافظے کے بند کواڑ کھلنے شروع

aur matalib ki munasibatein ubharne lagti hain, ma’an un ke hafize ke band kiwaad khulne shuru

এবং প্রসঙ্গের যোগসূত্রগুলো ফুটে উঠতে শুরু করে, অমনি তাঁর স্মৃতির বন্ধ দরজাগুলো খুলতে শুরু

ہو جاتے ہیں اور پھر ایسا معلوم ہوتا ہے کہ ہر قسم اور ہر نوعیت کے سینکڑوں شعر پرا

ho jaate hain aur phir aisa maloom hota hai ke har qism aur har nauiyat ke sainkdon sher parra

করে দেয় এবং তখন মনে হয় যেন প্রতিটি ধরণ ও প্রকৃতির শয়ে শয়ে কবিতা সারি

باندھے سامنے کھڑے ہیں جس شعر کی جس جگہ ضرورت ہوئی فوراً اسے نکالا اور

baandhe saamne khade hain jis sher ki jis jagah zaroorat hui fauran ise nikala aur

বেঁধে সামনে দাঁড়িয়ে আছে; যে কবিতার যেখানে প্রয়োজন হলো তখনি তাকে বের করে

انگوٹھی کے نگینے کی طرح مضمون میں جڑ دیا۔

angothi ke nagine ki tarah mazmoon mein jad diya.

আংটির পাথরের মতো প্রসঙ্গের সাথে গেঁথে দিলেন।

عام علمی اور دینی مباحث کی تحریرات میں مولانا بہت کم اشعار لایا کرتے تھے

Aam ilmi aur deeni mabaahis ki tahriraat mein Maulana bahut kam ashaar laya karte thay

সাধারণ জ্ঞানতাত্ত্বিক ও ধর্মীয় আলোচনার লেখাগুলোতে মাওলানা খুব কম কবিতা ব্যবহার করতেন,

صفحوں کے صفحے لکھے جائیں گے اور ایک شعر بھی نہیں آئے گا لیکن اس خاص اسلوبِ تحریر

safhon ke safhe likhe jayenge aur ek sher bhi nahin aayega lekin is khaas usloob-e-tahrir

পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা লেখা হয়ে যেত অথচ একটি কবিতাও আসত না; কিন্তু এই বিশেষ লিখনশৈলীতে

میں وہ اس کثرت کیساتھ اشعار سے کام لیتے ہیں کہ ہر دوسری تیسری سطر کے بعد ایک شعر

mein woh is kasrat ke saath ashaar se kaam lete hain ke har doosri teesri satr ke baad ek sher

তিনি এতো আধিক্যের সাথে কবিতা ব্যবহার করেন যে প্রতি দ্বিতীয় বা তৃতীয় লাইনের পর একটি কবিতা

ضرور آ جاتا ہے اور مطلب کے حسن و دلآویزی کا ایک نیا پیکر نمایاں کر دیتا ہے۔

zaroor aa jata hai aur matlab ke husn-o-dil-aweezi ka ek naya paikar numayan kar deta hai.

অবশ্যই চলে আসে এবং বিষয়ের সৌন্দর্য ও মাধুর্যের এক নতুন রূপ ফুটিয়ে তোলে।

قلعہ احمد نگر کے اکثر مکاتیب اسی طرزِ تحریر میں لکھے گئے ہیں، انھوں نے نثر میں

Qila Ahmednagar ke aksar makateeb isi tarz-e-tahrir mein likhe gaye hain, unhon ne nasr mein

আহমেদনগর দুর্গের অধিকাংশ পত্র এই লিখনশৈলীতেই লেখা হয়েছে; তিনি গদ্যের মাধ্যমে

شاعری کی ہے اور جس مطلب کو ادا کیا ہے اس طرح کیا ہے کہ جدتِ فکر و نقش آرائی

shayari ki hai aur jis matlab ko ada kiya hai is tarah kiya hai ke jidat-e-fikr-o-naqsh-araayi

কবিতা লিখেছেন এবং যে বিষয়টি প্রকাশ করেছেন তা এমনভাবে করেছেন যে চিন্তার নতুনত্ব ও কারুকার্য

পৃষ্ঠা নম্বর: ১৮

۱۸

18

১৮

کر ہی ہے اور وسعتِ تخیل کے رنگ و روغن بھر رہی ہے ۔ اجتہادِ فکر اور تجدیدِ اسلوب

kar rahi hai aur wusat-e-takhayul ke rang-o-roghan bhar rahi hai. Ijtihad-e-fikr aur tajdeed-e-usloob

করছে এবং কল্পনার বিস্তৃতির রঙ ও প্রলেপ ভরছে। চিন্তার উদ্ভাবনী শক্তি ও শৈলীর নতুনত্ব

مولانا کا ہی کام اور ہمیشہ گہرا خصوصیت ہے ۔ قلم اور زبان کے ہر گوشہ میں وہ طرزِ عام سے

Maulana ka hi kaam aur hamesha gahra khusoosiyat hai. Qalam aur zuban ke har goshe mein woh tarz-e-aam se

মাওলানারই কাজ এবং এটি সবসময় তাঁর গভীর বৈশিষ্ট্য। কলম ও ভাষার প্রতিটি ক্ষেত্রে তিনি প্রচলিত ধারা থেকে

اپنی روش الگ رکھیں گے اور الفاظ و تراکیب سے لے کر مطلب اور ادائے مطلب کے

apni ravish alag rakkhein ge aur alfaaz-o-taraakeeb se le kar matlab aur adaye-matlab ke

নিজের পথ আলাদা রাখেন এবং শব্দ ও গঠন থেকে শুরু করে বিষয়বস্তু ও বিষয় প্রকাশের

طرز تک ہر بات میں تقلیدِ عام سے گریزاں اور اپنے مجتہدانہ انداز میں بے میل اور

tarz tak har baat mein taqleed-e-aam se gurezaan aur apne mujtahidana andaaz mein be-mail aur

ভঙ্গি পর্যন্ত প্রতিটি বিষয়ে সাধারণ অনুকরণ থেকে বিরত এবং নিজের উদ্ভাবনী ঢঙে অতুলনীয় ও

بے لچک نظر آئیں گے ۔ انھوں نے جس وقت سے قلم ہاتھ میں سنبھالا ہے ہمیشہ پیش رو

be-lachak nazar aayein ge. Unhon ne jis waqt se qalam hath mein sanbhala hai hamesha pesh-rau

আপসহীন প্রতীয়মান হন। তিনি যে সময় থেকে কলম হাতে নিয়েছেন, সবসময় অগ্রপথিক

اور صاحبِ اسلوب رہے ہیں ، کبھی یہ گوارا نہیں کیا کہ کسی دوسرے کے پیش رو کے نقشِ

aur sahib-e-usloob rahe hain, kabhi yeh gawara nahin kiya ke kisi doosre ke pesh-rau ke naqsh-e-

এবং নিজস্ব শৈলীর অধিকারী থেকেছেন; কখনো এটি মেনে নেননি যে অন্য কোনো অগ্রজ ব্যক্তির পদাঙ্ক

قدم پر چلیں ۔ چنانچہ ان مکاتیب میں بھی ان کا مجتہدانہ انداز ہر جگہ نمایاں ہے ۔

qadam par chalein. Chunanche in makateeb mein bhi un ka mujtahidana andaaz har jagah numayan hai.

অনুসরণ করে চলবেন। সুতরাং এই পত্রগুলোতেও তাঁর উদ্ভাবনী ঢঙ প্রতিটি স্থানে সুস্পষ্ট।

بغیر کسی اہتمام اور کاوش کے قلم برداشتہ لکھتے گئے ہیں لیکن قدرتِ بیان یہ ہے کہ

Baghair kisi ehtimaam aur kawish ke qalam-bardashta likhte gaye hain lekin qudrat-e-bayan yeh hai ke

কোনো বিশেষ আয়োজন বা প্রচেষ্টা ছাড়াই অনর্গল লিখে গেছেন, কিন্তু তাঁর বর্ণনাশৈলীর ক্ষমতা এমন যে

بے ساختگی میں بھی ابھری چلی آتی ہے اور ذکاوت و فکر ہے جو آمد میں بھی آورد سے

be-saakhtagi mein bhi ubhri chali aati hai aur zakawat-o-fikr hai jo aamad mein bhi aawurd se

তা স্বতঃস্ফূর্ততার মধ্যেও ফুটে ওঠে এবং এমন মেধা ও চিন্তা যা স্বাভাবিক প্রবাহের মধ্যেও পরিকল্পিত রচনার চেয়ে

زیادہ بنتی اور سنورتی رہتی ہے !

zyada banti aur sanwarti rehti hai!

বেশি নিখুঁত ও মার্জিত হতে থাকে!

ظرافت ہے تو وہ اپنی بے داغ لطافت رکھتی ہے اور واقعہ نگاری ہے تو اس کی

Zarafat hai to woh apni be-daagh latafat rakhti hai aur waqiya-nigari hai to us ki

রসিকতা থাকলে তাতে থাকে নির্মল স্নিগ্ধতা, আর ঘটনা বর্ণনা থাকলে তাতে থাকে

نقش آرائی کا جواب نہیں ۔ فکر کا پیمانہ ہر جگہ بلند اور نظر کا اعتبار ہر جگہ ارجمند ہے ۔

naqsh-araayi ka jawab nahin. Fikr ka paimana har jagah buland aur nazar ka aitbaar har jagah arjumand hai.

অনুপম কারুকার্য। চিন্তার মানদণ্ড সবখানেই উন্নত এবং দৃষ্টিভঙ্গির নির্ভরযোগ্যতা সর্বত্রই সম্মানিত।

ان مکاتیب پر نظر ڈالتے ہوئے سب سے زیادہ اہم چیز جو سامنے آتی ہے وہ مولانا

In makateeb par nazar dalte hue sab se zyada aham cheez jo saamne aati hai woh Maulana

এই পত্রগুলোর ওপর নজর দিলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি সামনে আসে তা হলো মাওলানার

کا دماغی پس منظر (بیک گراؤنڈ) ہے ۔ اسی پس منظر پر افکار و احساسات کی تمام جلوہ طرازیوں

ka dimaghi pas-manzar (background) hai. Isi pas-manzar par afkar-o-ehsasat ki tamam jalwa-taraziyon

মানসিক পটভূমি (ব্যাকগ্রাউন্ড)। এই পটভূমির ওপরই চিন্তা ও অনুভূতির সমস্ত বৈচিত্র্যময় বহিঃপ্রকাশ

نے اپنی جگہ بنائی ہے ۔ ایک شخص ۹ اگست کی صبح کو برسرے اٹھا تو اچانک اسے معلوم ہوا

ne apni jagah banayi hai. Ek shakhs 9 August ki subah ko bistarey utha to achanak use maloom hua

নিজের স্থান করে নিয়েছে। একজন ব্যক্তি ৯ই আগস্ট সকালে বিছানা থেকে ওঠার পর হঠাৎ জানতে পারলেন

کہ وہ گرفتار شدہ قیدی ہے اور کسی نامعلوم مقام پر لے جایا جا رہا ہے ۔ پھر ایک ایسی شدید

ke woh giraftar-shuda qaidi hai aur kisi na-maloom maqaam par le jaya ja raha hai. Phir ek aisi shadeed

যে তিনি একজন গ্রেপ্তারকৃত বন্দি এবং তাঁকে কোনো অজানা স্থানে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তারপর এমন এক কঠোর

فوجی نگرانی کے اندر جس کی کوئی پچھلی مثال ہندوستان کی سیاسی جدوجہد کی تاریخ میں

fauji nigrani ke andar jis ki koi pichhli misal Hindustan ki siyasi jaddo-jehad ki tareekh mein

সামরিক নজরদারির মধ্যে, যার কোনো পূর্ববর্তী উদাহরণ হিন্দুস্তানের রাজনৈতিক সংগ্রামের ইতিহাসে

موجود نہیں ، اسے قلعہ احمد نگر کی ایک عمارت میں بند کر دیا جاتا ہے اور دنیا سے تمام علائق

maujood nahin, use Qila Ahmednagar ki ek imarat mein band kar diya jata hai aur duniya se tamam alayiq

নেই, তাঁকে আহমেদনগর দুর্গের একটি ভবনে বন্দি করে দেওয়া হয় এবং দুনিয়ার সাথে সমস্ত সম্পর্ক

بیک قلم منقطع ہو جاتے ہیں ۔ وہ اس حادثہ کے چوبیس گھنٹے کے بعد دوسری صبح کو اٹھتا ہے

bayak-qalam munqati ho jaate hain. Woh is hadsa ke chaubis ghante ke baad doosri subah ko uthta hai

এক নিমেষে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তিনি এই ঘটনার চব্বিশ ঘণ্টা পর পরবর্তী সকালে ঘুম থেকে ওঠেন

اور قلم اٹھا کر خامہ فرسائی شروع کر دیتا ہے ۔ پھر اس کے بعد ہر دوسرے تیسرے دن حالات

aur qalam utha kar khama-farsayi shuru kar deta hai. Phir us ke baad har doosre teesre din haalaat

এবং কলম তুলে নিয়ে লিখতে শুরু করেন। এরপর থেকে প্রতি দ্বিতীয় বা তৃতীয় দিন পরিস্থিতির

کی تحریک خیالات میں جنبش پیدا کرتی رہتی ہے اور جو کچھ دماغ میں ابھرتا ہے بے روک ٹوک

ki tehreek khayalat mein jumbish paida karti rehti hai aur jo kuch dimagh mein ubharta hai be-rok-tok

আলোড়ন চিন্তায় স্পন্দন তৈরি করতে থাকে এবং যা কিছু মস্তিষ্কে উদিত হয় তা বিনা বাধায়

পৃষ্ঠা নম্বর: ১৯

۱۹

19

১৯

قلم کے حوالے ہو جاتا ہے۔ دیکھنا یہ ہے کہ ایسے حوصلہ فرسا حالات میں ان کا دماغی

Qalam ke hawale ho jata hai. Dekhna yeh hai ke aise hausla-farsa haalaat mein un ka dimaghi

কলমের হাতে সমর্পিত হয়ে যায়। দেখার বিষয় এই যে, এমন হতাশাজনক পরিস্থিতিতে তাঁর মানসিক

پس منظر کیا تھا اور وقت کے تمام مخالفانہ حالات کو کس نظر اور کس مقام سے دیکھ رہا

pas-manzar kya tha aur waqt ke tamam mukhalifana haalaat ko kis nazar aur kis maqaam se dekh raha

পটভূমি কী ছিল এবং সময়ের সমস্ত প্রতিকূল পরিস্থিতিকে তিনি কোন দৃষ্টিতে এবং কোন অবস্থান থেকে দেখছিলেন

تھا؟ یہی دماغی پس منظر ہے جس کی نوعیت سے ہر عظیم شخصیت کی عظمت کا اصل مقام

tha? Yahi dimaghi pas-manzar hai jis ki nauiyat se har azeem shakhsiyat ki azmat ka asl maqaam

ছিলেন? এটাই সেই মানসিক পটভূমি, যার প্রকৃতির মাধ্যমেই প্রতিটি মহান ব্যক্তিত্বের শ্রেষ্ঠত্বের আসল জায়গা

دنیا کے آگے نمایاں ہوتا ہے۔ یہی کسوٹی ہے جس پر ہر انسانی عظمت کسی جا سکتی ہے،

duniya ke aage numayan hota hai. Yahi kasauti hai jis par har insani azmat kasi ja sakti hai,

দুনিয়ার সামনে স্পষ্ট হয়। এটাই সেই কষ্টিপাথর যার ওপর প্রতিটি মানবিক শ্রেষ্ঠত্বকে যাচাই করা যেতে পারে,

اور یہی معیار ہے جو ہر انسان کی عظمت و پستی کا فیصلہ کر دیتا ہے۔

aur yahi mayaar hai jo har insan ki azmat-o-pasti ka faisla kar deta hai.

এবং এটাই সেই মানদণ্ড যা প্রতিটি মানুষের মহত্ত্ব ও নীচতার ফয়সালা করে দেয়।

ان مکاتیب میں مولانا نے خود کوشش کی ہے کہ اپنا دماغی پس منظر دنیا کے آگے

In makateeb mein Maulana ne khud koshish ki hai ke apna dimaghi pas-manzar duniya ke aage

এই পত্রগুলোতে মাওলানা নিজে চেষ্টা করেছেন যেন তাঁর মানসিক পটভূমি দুনিয়ার সামনে

رکھ دیں اور اس لئے یہ غیر ضروری ہو گیا ہے کہ اس بارے میں بحث و نظر سے کام لیا جائے۔

rakh dein aur is liye yeh ghair zaroori ho gaya hai ke is bare mein bahas-o-nazar se kaam liya jaye.

তুলে ধরেন এবং এই কারণে এটি অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছে যে এই বিষয়ে নতুন কোনো বিতর্ক বা পর্যালোচনার আশ্রয় নেওয়া হবে।

میں صرف معاملے کے اس پہلو پر اہل نظر کو توجہ دلانا چاہتا ہوں خود کچھ کہنا نہیں چاہتا۔

Main sirf muamle ke is pehlu par ahl-e-nazar ko tawajjo dilana chahta hoon khud kuch kehna nahin chahta.

আমি শুধু বিষয়ের এই দিকটির ওপর সমঝদারদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই, নিজে কিছু বলতে চাই না।

گذشتہ جولائی میں جوں ہی ان مکاتیب کی اشاعت کا اعلان ہوا ملک کے ہر گوشے

Guzishta July mein joonhi in makateeb ki ishaat ka elaan hua mulk ke har goshe

গত জুলাই মাসে যেইমাত্র এই পত্রগুলো প্রকাশের ঘোষণা দেওয়া হলো, দেশের প্রতিটি কোণ

سے تقاضے ہونے لگے کہ ان کے ترجمے کا بھی سرو سامان ہونا چاہیے۔ کلکتہ، بمبئی، دہلی،

se taqaze hone lage ke in ke tarjame ka bhi sar-o-saman hona chahiye. Calcutta, Bombay, Dehli,

থেকে দাবি উঠতে লাগল যে এগুলোর অনুবাদের ব্যবস্থাও হওয়া উচিত। কলকাতা, বোম্বাই, দিল্লি,

الٰہ آباد، کانپور اور پٹنہ کے پبلشروں کا تقاضا تھا کہ انگریزی، ہندی، گجراتی، بنگالی،

Allahabad, Kanpur aur Patna ke publishers ka taqaza tha ke Angrezi, Hindi, Gujarati, Bengali,

এলাহাবাদ, কানপুর এবং পাটনার প্রকাশকদের দাবি ছিল যেন ইংরেজি, হিন্দি, গুজরাটি, বাংলা,

تامل وغیرہ زبانوں میں ان کے ترجمے کی اجازت دے دی جائے۔ میں نے یہ تمام درخواستیں

Tamil waghera zabanon mein in ke tarjame ki ijazat de di jaye. Main ne yeh tamam darkhwastein

তামিল ইত্যাদি ভাষায় এগুলোর অনুবাদের অনুমতি দেওয়া হয়। আমি এই সমস্ত আবেদন

مولانا کی خدمت میں پیش کر دیں لیکن انھوں نے ترجمے کی اجازت نہیں دی۔ انھوں نے

Maulana ki khidmat mein pesh kar dein lekin unhon ne tarjame ki ijazat nahin di. Unhon ne

মাওলানার কাছে পেশ করলাম কিন্তু তিনি অনুবাদের অনুমতি দেননি। তিনি

فرمایا کہ چند مکاتیب کے سوا یہ تمام مکاتیب ایک ایسے اسلوب میں لکھے گئے ہیں کہ ان کا

farmaya ke chand makateeb ke siwa yeh tamam makateeb ek aise usloob mein likhe gaye hain ke in ka

বললেন যে, অল্প কিছু পত্র ছাড়া এই সমস্ত পত্র এমন এক শৈলীতে লেখা হয়েছে যে এগুলোর

کسی دوسری زبان میں صحتِ ذوق و معیار کے ساتھ ترجمہ ہو ہی نہیں سکتا۔ اگر کیا

kisi doosri zaban mein sehat-e-zauq-o-mayaar ke saath tarjuma ho hi nahin sakta. Agar kiya

অন্য কোনো ভাষায় সঠিক রুচি ও মান বজায় রেখে অনুবাদ হওয়া সম্ভবই নয়। যদি করা

جائے گا تو اصل کی ساری خصوصیات مٹ جائیں گی۔ چنانچہ اس وقت تک ترجمہ کی اجازت

jaye ga to asl ki saari khusoosiyat mit jayein gi. Chunanche is waqt tak tarjuma ki ijazat

হয় তবে মূল রচনার সমস্ত বৈশিষ্ট্য মুছে যাবে। সুতরাং এখন পর্যন্ত অনুবাদের অনুমতি

کسی فرم کو نہیں دی گئی ہے۔ مولا نے جس خیال سے ترجمے کو روکا ہے مجھے یقین ہے کہ

kisi firm ko nahin di gayi hai. Maulana ne jis khayal se tarjame ko roka hai mujhe yaqeen hai ke

কোনো প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয়নি। মাওলানা যে চিন্তায় অনুবাদ করতে নিষেধ করেছেন, আমার বিশ্বাস যে

اس سے ہر صاحبِ نظر اتفاق کرے گا۔ یہ نثر میں شاعری ہے اور شاعری کا ترجمہ کسی چیز

is se har sahib-e-nazar ittefaq kare ga. Yeh nasr mein shayari hai aur shayari ka tarjuma kisi cheez

তার সাথে প্রতিটি সমঝদার ব্যক্তি একমত হবেন। এটি গদ্যের আকারে কবিতা, আর কবিতার অনুবাদ কোনোভাবেই

نہیں ہوتی۔ البتہ دو چار مکتوب جو محض فلسفیانہ اور تاریخی مباحث پر لکھے گئے

nahin hoti. Albatta do char maktoob jo mahz falsafiyana aur tareekhi mabaahis par likhe gaye

হয় না। অবশ্য দুই-চারটি পত্র যা কেবল দার্শনিক ও ঐতিহাসিক আলোচনার ওপর লেখা হয়েছে

ہیں ترجمہ کئے جا سکتے ہیں، انھیں مستثنیٰ کر دینا چاہیے۔

hain tarjuma kiye ja sakte hain, unhein mustasna kar dena chahiye.

সেগুলো অনুবাদ করা যেতে পারে, সেগুলোকে ব্যতিক্রম হিসেবে ধরা উচিত।

یہ تمام مکاتیب “صدیقِ مکرم” کے خطاب سے شروع ہوتے ہیں۔ یہ “صدیقِ مکرم”

Yeh tamam makateeb “Siddiq-e-Mukarram” ke khitab se shuru hote hain. Yeh “Siddiq-e-Mukarram”

এই সমস্ত পত্র “সিদ্দিক-এ-মুকাররম” (সম্মানিত বন্ধু) সম্বোধন দিয়ে শুরু হয়। এই “সিদ্দিক-এ-মুকাররম”

পৃষ্ঠা নম্বর: ২০

۲۰

20

২০

تشدید کے ساتھ “صدیق” نہیں ہے، جیسا کہ بعض اشخاص پڑھنا چاہتے ہیں بلکہ

Tashdeed ke saath “Siddiq” nahin hai, jaisa ke baaz ashkhaas padhna chahte hain balkeh

তাসদিদ (দ্বিত্ব উচ্চারণ) সহ ‘সিদ্দিক’ নয়, যেমনটা কিছু লোক পড়তে চায়; বরং

بغیر تشدید کے ہے: “صداقہ” عربی میں دوستی کو کہتے ہیں، “صدیق” یعنی دوست۔

baghair tashdeed ke hai: “Sadaqah” Arabi mein dosti ko kehte hain, “Sadiq” yaani dost.

তাসদিদ ছাড়া: আরবিতে ‘সাদাকাহ’ মানে বন্ধুত্ব, আর ‘সাদিক’ মানে বন্ধু।

۱۱ اپریل ۱۹۴۳ء کے مکتوب کے آخر میں متم بن نویرہ کے مرثیئے کے اشعار

11 April 1943 ke maktoob ke aakhir mein Mutamim bin Nuwayrah ke marsiye ke ashaar

১১ই এপ্রিল ১৯৪৩-এর পত্রের শেষে মুতামিম বিন নুওয়াইরার শোকগাথার (মারসিয়া) কবিতাগুলো

نقل کئے گئے ہیں، یہ مرثیہ اس نے اپنے بھائی مالک کی یاد میں لکھا تھا:

naql kiye gaye hain, yeh marsiye us ne apne bhai Malik ki yaad mein likha tha:

উদ্ধৃত করা হয়েছে, এই শোকগাথাটি তিনি তাঁর ভাই মালিকের স্মরণে লিখেছিলেন:

لَقَدْ لَا مَنِي عِنْدَ الْقُبُورِ عَلَى الْبُكَا فَيُقِي لِتَذْرَافِ الدُّمُوعِ السَّواكِ

Laqad laa manii ‘indal qubuuri ‘alal bukaai fayiqqi litadhraafid dumuuis sawaaki

কবরের কাছে আমাকে কাঁদতে দেখে আমার বন্ধু আমাকে তিরস্কার করল আর বলল তুমি কেন এভাবে অবিরাম চোখের জল ফেলছ?

فَقَالَ اَتَبْكِي كُلَّ قَبْرٍ رَأيْتَه لِقَبْرٍ ثَوَىٰ بَيْنَ الّلوىٰ فَالدَّكَادِكِ

Faqala atabki kulla qabrin ra’aytahu liqabrin thawaa baynal liwaa fad dakaadiki

সে বলল, তুমি কি প্রতিটি কবর দেখলেই কাঁদবে? কেবল ওই একটি কবরের জন্য যা মরুভূমির বালিয়াড়ির মাঝে অবস্থিত?

فَقُلْتُ لَه اِنَّ الشَّجَا يَبْعَثُ الشَّجَا فَدَعْنِي فَهذَا كُلُّه قَبْرُ مَالِكِ!

Faqultu lahu innash shajaa yab’athush shajaa fadani fahaza kulluhu qabru Maalik!

আমি তাকে বললাম, এক দুঃখ অন্য দুঃখকে জাগিয়ে তোলে তাই আমাকে কাঁদতে দাও, কারণ আমার জন্য এই সব কবরই মালিকের কবর!

ان اشعار کے مطلب کا خلاصہ یہ ہے:

In ashaar ke matlab ka khulasa yeh hai:

এই কবিতাগুলোর মর্মার্থের সারসংক্ষেপ হলো:

“میرے رفیق نے جب دیکھا کہ قبروں کو دیکھ کر میرے آنسو بہنے لگتے ہیں تو

“Mere rafiq ne jab dekha ke qubroon ko dekh kar mere aansu behne lagte hain to

“আমার বন্ধু যখন দেখল যে কবরগুলো দেখে আমার চোখের জল ঝরছে, তখন

اس نے مجھے ملامت کی۔ اس نے کہا یہ کیا بات ہے کہ اس ایک قبر کی وجہ سے جو ایک

us ne mujhe malamat ki. Us ne kaha yeh kya baat hai ke is ek qubr ki wajah se jo ek

সে আমাকে তিরস্কার করল। সে বলল, একি কথা যে একটি কবরের জন্য যা একটি

خاص مقام پر واقع ہے، تو ہر قبر کو دیکھ کر رونے لگتا ہے؟ میں نے کہا، بات یہ ہے کہ

khaas maqaam par waaqi hai, tu har qubr ko dekh kar rone lagta hai? Main ne kaha, baat yeh hai ke

বিশেষ স্থানে অবস্থিত, তুমি প্রতিটি কবর দেখলেই কাঁদতে শুরু করো? আমি বললাম, কথা হলো এই যে

ایک غم کا منظر دوسرے غم کی یاد تازہ کر دیا کرتا ہے، لہٰذا مجھے رونے دے، میرے لئے

ek gham ka manzar doosre gham ki yaad taza kar diya karta hai, lehaza mujhe rone de, mere liye

একটি দুঃখের দৃশ্য অন্য দুঃখের স্মৃতি তাজা করে দেয়, তাই আমাকে কাঁদতে দাও, আমার জন্য

تو یہ تمام قبریں مالک کی قبریں بن گئی ہیں!”

to yeh tamam qubrein Maalik ki qubrein ban gayi hain!”

এই সব কবরই মালিকের কবরে পরিণত হয়েছে!”

حکایتِ بیستون و کوہکن: “ایران کے قدیم آثار میں ایک اثر “بیستون”

Hikayat-e-Be-Sutoon-o-Kohkan: “Iran ke qadeem aasaar mein ek asar ‘Be-Sutoon’

বিসুতুন ও কোহকানের কাহিনী: “ইরানের প্রাচীন নিদর্শনগুলোর মধ্যে একটি নিদর্শন ‘বিসুতুন’

کے نام سے مشہور ہے اور داستان سراؤں نے اسے فرہاد و کوہکن کی طرف منسوب کر دیا

ke naam se mashhoor hai aur dastaansaraon ne ise Farhad-o-Kohkan ki taraf mansoob kar diya

নামে প্রসিদ্ধ এবং গল্পকাররা একে ফরহাদ ও কোহকানের সাথে সম্পর্কিত করে দিয়েছে

ہے، مگر دراصل یہ “بے ستون” نہیں ہے۔ “بیستون” بہستان یا باغستان ہے۔

hai, magar dar-asl yeh “Be-Sutoon” nahin hai. “Be-Sutoon” Bahistan ya Baghistan hai.

কিন্তু আসলে এটি ‘বে-সুতুন’ (স্তম্ভহীন) নয়। ‘বিসুতুন’ হলো বহিস্থান বা বাগিস্তান।

فارسی قدیم میں “باغ” خدا یا دیوتا کو کہتے ہیں یعنی یہ مقام “خداؤں کی جگہ” ہے۔

Farsi-e-qadeem mein “Bagh” khuda ya devta ko kehte hain yaani yeh maqaam “khudaon ki jagah” hai.

প্রাচীন ফারসিতে ‘বাগ’ মানে ঈশ্বর বা দেবতা, অর্থাৎ এই স্থানটি হলো ‘দেবতাদের স্থান’।

محمد اجمل خاں

Muhammad Ajmal Khan

মুহাম্মদ আজমল খাঁ

পৃষ্ঠা নম্বর: ২১

۲۱

21

২১

بِسْمِ اللّٰہِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِیْمِ

Bismillah-ir-Rahman-ir-Rahim

পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে

دیباچہ

Deebacha

ভূমিকা

میر عظمت اللہ بے خبر بلگرامی مولوی غلام علی آزاد بلگرامی کے معاصر

Mir Azmatullah Be-khabar Bilgrami, Maulvi Ghulam Ali Azad Bilgrami ke muasir

মীর আজমতউল্লাহ বে-খবর বিলগ্রামী ছিলেন মৌলভী গোলাম আলী আজাদ বিলগ্রামীর সমসাময়িক

اور ہم وطن تھے اور جدی رشتہ سے قرابت رکھتے تھے۔ آزاد بلگرامی نے

aur ham-watan thay aur jaddi rishta se qarabath rakhte thay. Azad Bilgrami ne

এবং দেশীয় ভাই, এবং পৈতৃক সূত্রে তাঁদের মধ্যে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিল। আজাদ বিলগ্রামী

اپنے تذکروں میں جا بجا ان کا ترجمہ لکھا ہے اور سراج الدین خان آرزو

apne tazkiron mein ja-ba-ja un ka tarjuma likha hai aur Siraj-ud-Din Khan Arzu

তাঁর জীবনীগ্রন্থগুলোতে স্থানে স্থানে তাঁর উল্লেখ করেছেন এবং সিরাজউদ্দীন খান আরজু

اور آنند رام مخلص کی تحریرات میں بھی ان کا ذکر ملتا ہے۔ انھوں نے ایک مختصر سا

aur Anand Ram Mukhlis ki tehriraat mein bhi un ka zikr milta hai. Unhon ne ek mukhtasar sa

ও আনন্দ রাম মুখলিসের লেখাতেও তাঁর কথা পাওয়া যায়। তিনি একটি সংক্ষিপ্ত

رسالہ “غبارِ خاطر” کے نام سے لکھا تھا، میں یہ نام ان سے مستعار لیتا ہوں:

risala “Ghubar-e-Khatir” ke naam se likha tha, main yeh naam un se mustaar leta hoon:

পুস্তিকা “গুবার-এ-খাতির” নামে লিখেছিলেন, আমি এই নামটি তাঁর থেকে ধার নিচ্ছি:

مپرس تاچہ نوشت ست کلک قاصر ما

Mapurs tacha nawisht ast kilk-e-qasir-e-ma

জিজ্ঞেস করো না আমাদের অক্ষম কলম কী লিখেছে

خطِ غبارِ من ست ایں غبارِ خاطرِ ما

Khat-e-ghubar-e-man ast een ghubar-e-khatir-e-ma

আমার ধুলিমাখা এই লিপিই হলো আমাদের মনের বিষণ্ণতা (বা মনের ধুলিকণা)

یہ تمام مکاتیب جیل کے خطوط تھے اور اس خیال سے نہیں لکھے گئے تھے کہ شائع

Yeh tamam makateeb jail ke khutoot thay aur is khayal se nahin likhe gaye thay ke shaye

এই সমস্ত পত্র জেল থেকে লেখা চিঠি ছিল এবং তা এই উদ্দেশ্যে লেখা হয়নি যে প্রকাশিত

کئے جائیں گے لیکن رہائی کے بعد حبیب مولوی محمد اجمل خان صاحب کو ان کا علم

kiye jayein ge lekin rihayi ke baad Habeeb Maulvi Muhammad Ajmal Khan Sahib ko un ka ilm

করা হবে, কিন্তু কারামুক্তির পর প্রিয় মৌলভী মুহাম্মদ আজমল খান সাহেব যখন এগুলোর খবর

ہوا تو مصر ہوئے کہ انھیں ایک مجموعہ کی شکل میں شائع کر دیا جائے چونکہ ان کی

hua to musir huye ke unhein ek majmua ki shakal mein shaye kar diya jaye chunke un ki

পেলেন, তখন তিনি জেদ ধরলেন যে এগুলোকে একটি সংকলন আকারে প্রকাশ করা উচিত, যেহেতু তাঁর

পৃষ্ঠা নম্বর: ২২

۲۲

22

২২

طرح ان کی خاطر بھی مجھے عزیز ہے اس لئے ان مکاتیب کی اشاعت کا سروسامان

tarah un ki khatir bhi mujhe azeez hai is liye in makateeb ki ishaat ka sarosaman

অনুরূপভাবে তাঁদের স্বার্থও আমার কাছে প্রিয়, তাই এই পত্রগুলো প্রকাশের আয়োজন

کر رہا ہوں۔ جس حالت میں قلم برداشتہ لکھے ہوئے موجود تھے اسی حالت میں

kar raha hoon. Jis haalat mein qalam bardashta likhe huye maujood thay isi haalat mein

করছি। দ্রুতলিপিতে (অপ্রস্তুতভাবে) যেভাবে লেখা অবস্থায় ছিল, ঠিক সেই অবস্থাতেই

طباعت کے لئے دے دیئے گئے ہیں۔ نظرِ ثانی کا موقع نہیں ملا:

taba’at ke liye de diye gaye hain. Nazar-e-sani ka mauqa nahin mila:

ছাপানোর জন্য দিয়ে দেওয়া হয়েছে। পুনরায় দেখার (পরিমার্জনের) সুযোগ মেলেনি:

نسخہ شوق بہ شیرازہ نہ گنجد زنہار

Nuskha-e-shauq ba-shiraza na gunjad zunhaar

অনুরাগের এই পাণ্ডুলিপি কোনো বাঁধনে ধরা দেবে না কখনোই

بگزارید کہ ایں نسخہ مجزا ماند!

Bigzared ke een nuskha mujazza maand!

ছেড়ে দাও একে, এই পাণ্ডুলিপি যেন এমনই অসংলগ্ন থাকে!

نیشنل ایئر لائن

National Air Line

ন্যাশনাল এয়ার লাইন

ابوالکلام

Abul Kalam

আবুল কালাম

۲ فروری ۱۹۴۶ء

2 February 1946

২ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৬

مابین کراچی۔ جودھ پور

Ma-bain Karachi – Jodhpur

করাচি ও যোধপুরের মাঝে (আকাশপথে)

পৃষ্ঠা নম্বর: ২৩

۲۳

23

২৩

رہائی کے بعد کے بعض مکاتیب نواب صدر یار جنگ کے نام

Rihayi ke baad ke baaz makateeb Nawab Sadar Yar Jung ke naam

মুক্তির পরবর্তী সময়ের কিছু পত্র নবাব সদর ইয়ার জং-এর নামে

شملہ

Shimla

শিমলা

۲۷ جون ۱۹۴۵ء

27 June 1945

২৭ জুন ১৯৪৫

اے غائب از نظر کہ شدی ہم نشیں دل

Ae ghaib-az-nazar ke shudi ham-nasheen-e-dil

হে দৃষ্টির আড়ালে থাকা জন, আপনি তো হৃদয়ের সঙ্গী হয়ে গিয়েছেন

می بینمت عیاں و دعامی فرستمت

Mi-beenamat ayaan-o-dua mi-farstamat

আপনাকে স্পষ্টভাবে দেখছি এবং দোয়া পাঠাচ্ছি

دل حکایتوں سے لبریز ہے، مگر زبان درماندہ۔ فرصت کو یاراۓ

Dil hikayaton se labrez hai, magar zaban darmanda. Fursat ko yaara-e

হৃদয় গল্পে ভরপুর, কিন্তু জিহ্বা নিরুপায়। অবসর যাপনের সেই শক্তি

سخن نہیں۔ مہلت کا منتظر ہوں۔

sukhan nahin. Muhlat ka muntazir hoon.

কথার নেই। আমি সুযোগের অপেক্ষায় আছি।

ابوالکلام

Abul Kalam

আবুল কালাম

نواب صدر یار جنگ کا مکتوب

Nawab Sadar Yar Jung ka maktoob

নবাব সদর ইয়ার জং-এর পত্র

حبیب گنج (علی گڑھ)

Habib Ganj (Aligarh)

হাবিবগঞ্জ (আলীগড়)

یکم جولائی ۱۹۴۵ء

Yakam July 1945

১লা জুলাই ১৯৪৫

صدیقِ حبیب!

Siddiq-e-Habeeb!

প্রিয় বন্ধু!

جس دن یہ بدرِ کامل گہن سے نکلا تھا، دل نے محسوس کیا تھا کہ نورِ عظمتِ

Jis din yeh badr-e-kaamil gahan se nikla tha, dil ne mehsoos kiya tha ke noor-e-azmat-e

যেদিন এই পূর্ণিমা চাঁদ গ্রহণ থেকে মুক্ত হয়েছিল, হৃদয় অনুভব করেছিল যে মহত্ত্বের নূর

جہاں تاب ہوگا۔ ہوا، اور کس شان سے ہوا۔ ۲৭ جون کو پہاڑ کی چوٹیوں کا

jahan-taab hoga. Hua, aur kis shaan se hua. 27 June ko pahar ki chotiyon ka

বিশ্বে উদ্ভাসিত হবে। হয়েছেও, আর কী চমৎকার শান-শওকতে হয়েছে। ২৭ জুন পাহাড়ের চূড়াগুলোর

পৃষ্ঠা নম্বর: ২৪

۲۴

24

২৪

منظر نے اس کے دل پر کیسا اثر ڈالا؟

manzar ne us ke dil par kaisa asar dala?

দৃশ্যটি তাঁর হৃদয়ে কেমন প্রভাব ফেলেছিল?

حبیب گنج (علی گڑھ)

Habib Ganj (Aligarh)

হাবিবগঞ্জ (আলীগড়)

یکم اگست ۱۹۴۵ء

Yakam August 1945

১লা আগস্ট ১৯৪৫

صدیقِ مکرم !

Siddiq-e-Mukarram!

সম্মানিত বন্ধু!

جون کی ۲৫ تاریخ کو شملہ پہنچا تھا ، آج وہاں سے واپس آ گیا ہوں – پورے ۳۶ دن

June ki 25 tareekh ko Shimla pahuncha tha, aaj wahan se wapas aa gaya hoon – Poore 36 din

জুনের ২৫ তারিখে শিমলায় পৌঁছেছিলাম, আজ সেখান থেকে ফিরে এসেছি – পুরো ৩৬ দিন

ہوئے کہ میں نے آپ کے خط کا جواب نہیں دیا –

hue ke main ne aap ke khat ka jawab nahin diya –

হলো যে আমি আপনার চিঠির উত্তর দেইনি –

شملہ کی سیاسی سرگرمیوں نے خط و کتابت کا موقع ہی نہ دیا – اب ذرا اطمینان

Shimla ki siyasi sargarmiyon ne khat-o-kitabat ka mauqa hi na diya – Ab zara itminan

শিমলার রাজনৈতিক ব্যস্ততা চিঠিপত্র লেখার সুযোগই দেয়নি – এখন সামান্য স্বস্তি

ہے ، اس لئے حاضر ہو گیا ہوں –

hai, is liye hazir ho gaya hoon –

মিলেছে, তাই হাজির হয়েছি –

آپ کا مکتوبِ گرامی جو یکم جولائی کا لکھا ہوا تھا ، مجھے شملہ میں ملا تھا –

Aap ka maktoob-e-girami jo yakam July ka likha hua tha, mujhe Shimla mein mila tha –

আপনার সম্মানিত পত্র যা ১লা জুলাই লেখা হয়েছিল, তা আমি শিমলায় পেয়েছিলাম –

آپ نے قلعہ احمد نگر کے مکاتیب کے مجموعہ کے بارے میں جو کچھ تحریر فرمایا ہے ،

Aap ne Qila Ahmednagar ke makateeb ke majmua ke bare mein jo kuch tahrir farmaya hai,

আপনি আহমেদনগর দুর্গের পত্রসংকলন সম্পর্কে যা কিছু লিখেছেন,

اس سے مجھے بے حد خوشی ہوئی – یہ مجموعہ حقیقت میں اردو ادب میں ایک

is se mujhe be-had khushi hui – Yeh majmua haqiqat mein Urdu adab mein ek

তাতে আমি অত্যন্ত আনন্দিত হয়েছি – এই সংকলনটি বাস্তবে উর্দু সাহিত্যে একটি

قابلِ قدر اضافہ ہوگا –

qabil-e-qadr izafa hoga –

মূল্যবান সংযোজন হবে –

آپ کی صحت اب کیسی ہے ؟ امید ہے کہ مزاجِ گرامی بخیر ہوگا –

Aap ki sehat ab kaisi hai? Umeed hai ke mizaj-e-girami ba-khair hoga –

আপনার স্বাস্থ্য এখন কেমন? আশা করি শরীর-মন ভালো আছে –

زیادہ بجز نیاز کے اور کیا لکھوں ؟

Zyada bajuz niyaz ke aur kya likhoon?

শ্রদ্ধা নিবেদন ছাড়া আর বেশি কী লিখব?

ابوالکلام

Abul Kalam

আবুল কালাম

Ghubbar e Khatir - 25

পৃষ্ঠা নম্বর: ২৫

۲۵ 25 ২৫

قلعہ احمد نگر Qila Ahmednagar আহমেদনগর দুর্গ

۱۰ اگست ۱۹۴۲ء 10 August 1942 ১০ আগস্ট ১৯৪২

صدیقِ مکرم ! Siddiq-e-Mukarram! সম্মানিত বন্ধু!

پرسوں بمبئی سے روانہ ہوا تھا ، کل صبح یہاں پہنچا دیا گیا ، اور اب یہاں Parson Bombay se rawana hua tha, kal subah yahan pahuncha diya gaya, aur ab yahan গত পরশু বোম্বাই থেকে রওনা হয়েছিলাম, গতকাল সকালে এখানে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে, আর এখন এখানে

قلعہ احمد نگر کی دیواروں کے اندر گوشہ نشین ہوں – Qila Ahmednagar ki diwaron ke andar gosha-nasheen hoon – আহমেদনগর দুর্গের দেয়ালের অভ্যন্তরে নির্জনবাস করছি।

۹ اگست کی صبح کو پونے پانچ بجے کا وقت تھا کہ دستک کی آواز سنائی دی – 9 August ki subah ko paune panch baje ka waqt tha ke dastak ki awaz sunayi di – ৯ই আগস্ট সকাল পৌনে পাঁচটার সময় দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ শুনতে পেলাম।

معلوم ہوا کہ پولیس وارنٹ لے کر آ گئی ہے – میں نے غسل کیا ، چائے پی ، اور Maloom hua ke police warrant le kar aa gayi hai – Main ne ghusl kiya, chai pi, aur জানতে পারলাম পুলিশ ওয়ারেন্ট নিয়ে চলে এসেছে – আমি গোসল করলাম, চা পান করলাম এবং

اٹیچی کیس تیار کر لیا – attaché case tayyar kar liya – অ্যাটাচি কেস গুছিয়ে নিলাম।

ساڑھے پانچ بجے پبلک سیفٹی ایکٹ کے تحت گرفتار ہو کر موٹر میں بیٹھ گیا – Saadhe panch baje Public Safety Act ke taht giraftar ho kar motor mein baith gaya – সাড়ে পাঁচটার সময় পাবলিক সেফটি অ্যাক্টের অধীনে গ্রেপ্তার হয়ে গাড়িতে গিয়ে বসলাম।

بمبئی کے بہت سے دوست وکٹوریہ ٹرمینس پر نظر آئے ، جنھیں پولیس پکڑ پکڑ کر Bombay ke bahut se dost Victoria Terminus par nazar aaye, jinhein police pakad pakad kar বোম্বাইয়ের অনেক বন্ধুকে ভিক্টোরিয়া টার্মিনাসে দেখা গেল, যাদের পুলিশ ধরে ধরে

لا رہی تھی – پونے آٹھ بجے اسپیشل ٹرین پلیٹ فارم سے روانہ ہوئی – la rahi thi – Paune aath baje special train platform se rawana hui – নিয়ে আসছিল – পৌনে আটটার সময় স্পেশাল ট্রেন প্ল্যাটফর্ম থেকে ছেড়ে দিল।

لوگوں کا خیال تھا کہ ہم لوگوں کو شاید یرودا جیل لے جایا جائے گا ، لیکن Logon ka khayal tha ke hum logon ko shayad Yerwada jail le jaya jaye ga, lekin লোকদের ধারণা ছিল আমাদের হয়তো ইয়েরভাদা জেলে নিয়ে যাওয়া হবে, কিন্তু

ٹرین پونہ اسٹیشن پر نہیں رکی ، بلکہ اس سے آگے بڑھ کر ایک چھوٹے سے اسٹیشن train Poona station par nahin ruki, balkeh us se aage badh kar ek chhote se station ট্রেন পুনে স্টেশনে থামল না, বরং তার চেয়ে এগিয়ে গিয়ে একটি ছোট স্টেশনে

پر رکی ، اور وہاں سے ہم لوگوں کو موٹروں میں بٹھا کر قلعہ لایا گیا – par ruki, aur wahan se hum logon ko motoron mein bitha kar qila laya gaya – থামল এবং সেখান থেকে আমাদের গাড়িতে বসিয়ে দুর্গে নিয়ে আসা হলো।

قلعہ کی ایک پرانی عمارت میں ہم لوگوں کے لئے کمرے تیار کر دیئے گئے ہیں – Qila ki ek purani imarat mein hum logon ke liye kamre tayyar kar diye gaye hain – দুর্গের একটি পুরনো ভবনে আমাদের জন্য কক্ষ তৈরি করে দেওয়া হয়েছে।

میرا کمرہ کافی لمبا چوڑا اور ہوا دار ہے – Mera kamra kafi lamba chauda aur hawa-dar hai – আমার ঘরটি বেশ প্রশস্ত এবং আলো-বাতাসপূর্ণ।

Ghubbar e Khatir - 26

পৃষ্ঠা নম্বর: ২৬

۲۶

26

২৬

یہاں کا انتظام ایک ملٹری آفیسر کے ہاتھ میں ہے اور وہ شروع سے

Yahan ka intezam ek military officer ke hath mein hai aur woh shuru se

এখানকার ব্যবস্থাপনা একজন সামরিক কর্মকর্তার হাতে এবং তিনি শুরু থেকে

آخر تک نہایت سخت ہے ۔ اخبار اور خط و کتابت کی قطعی اجازت نہیں –

aakhir tak nihayat sakht hai. Akhbar aur khat-o-kitabat ki qat’ee ijazat nahin –

শেষ পর্যন্ত অত্যন্ত কঠোর। সংবাদপত্র এবং চিঠিপত্রের একেবারেই অনুমতি নেই –

ابھی تک یہ بھی معلوم نہیں ہو سکا کہ ملک کے حالات کیا ہیں ؟

Abhi tak yeh bhi maloom nahin ho saka ke mulk ke haalaat kya hain?

এখন পর্যন্ত এটিও জানা সম্ভব হয়নি যে দেশের পরিস্থিতি কী?

قلعہ کی زندگی کا کیا نقشہ ہوگا ، ابھی کچھ کہنا قبل از وقت ہے – میرا

Qila ki zindagi ka kya naqsha hoga, abhi kuch kehna qabl-az-waqt hai – Mera

দুর্গের জীবনের চিত্র কেমন হবে, তা এখন বলা সময়ের আগে হয়ে যাবে – আমার

معمول یہ ہے کہ رات کو نو بجے سو جاتا ہوں اور صبح پونے چار بجے بیدار

maamool yeh hai ke raat ko nau baje so jata hoon aur subah paune char baje bedaar

নিয়ম হলো এই যে রাত নয়টায় ঘুমিয়ে পড়ি এবং ভোর পৌনে চারটায় জাগ্রত

ہو جاتا ہوں – یہاں بھی میں نے اپنے اسی معمول کو قائم رکھا ہے –

ho jata hoon – Yahan bhi main ne apne isi maamool ko qaim rakha hai –

হই – এখানেও আমি আমার সেই নিয়মকে বজায় রেখেছি –

چائے پی کر مطالعہ میں مشغول ہو جاتا ہوں ، پھر ناشتہ کے بعد کچھ لکھنا لکھانا

Chai pi kar mutalea mein mashghool ho jata hoon, phir nashta ke baad kuch likhna likhana

চা পান করে অধ্যয়নে নিমগ্ন হয়ে যাই, তারপর নাস্তার পর কিছু লেখালেখি

ہوتا ہے – اس کے بعد کھانا اور آرام – غرض کہ وقت تو کٹ ہی جائے گا ،

hota hai – Us ke baad khana aur aaram – Gharaz ke waqt to kat hi jaye ga,

হয় – এরপর খাওয়া এবং বিশ্রাম – মোদ্দা কথা হলো সময় তো কেটেই যাবে,

خواہ کسی طرح کٹے !

khwah kisi tarah kate!

চাই তা যেভাবেই কাটুক!

صدیقِ مکرم ! اگرچہ یہ خط آپ تک نہیں پہنچ سکے گا ، لیکن جی چاہتا

Siddiq-e-Mukarram! Agarchah yeh khat aap tak nahin pahunch sake ga, lekin jee chahta

সম্মানিত বন্ধু! যদিও এই চিঠি আপনার কাছে পৌঁছাতে পারবে না, কিন্তু মন চায়

ہے کہ وقتاً فوقتاً جو کچھ خیالات دل میں آئیں وہ سپردِ قلم کرتا رہوں –

hai ke waqtan-fauqtan jo kuch khayalat dil mein aayein woh supurd-e-qalam karta rahoon –

যে সময়ে সময়ে যেসব চিন্তা মনে আসে তা লিখে রাখি –

جب کبھی رہائی نصیب ہوگی ، یہ فائل آپ کو دے دوں گا –

Jab kabhi rihayi naseeb hogi, yeh file aap ko de doon ga –

যখনই মুক্তি লাভ হবে, এই ফাইলটি আপনাকে দিয়ে দেব –

اب قلم رکھتا ہوں –

Ab qalam rakhta hoon –

এখন কলম রাখছি –

ابوالکلام

Abul Kalam

আবুল কালাম

Ghubbar e Khatir - 27

পৃষ্ঠা নম্বর: ২৭

۲۷

27

২৭

اٹھانا ہی پڑتا ہے:

Uthana hi parta hai:

বইতেই হয়:

ما زندہ از آنیم کہ آرام نہ گیریم

Ma zinda az aneem ke aram na geereem

আমরা এই কারণেই জীবিত যে আমরা বিশ্রাম নিই না

گلبرگ سے سری نگر آگیا ہوں اور ہاؤس بوٹ میں مقیم ہوں ۔ کل گلبرگ سے

Gulmarg se Srinagar aa gaya hoon aur house-boat mein muqeem hoon. Kal Gulmarg se

গুলমার্গ থেকে শ্রীনগর চলে এসেছি এবং হাউসবোটে অবস্থান করছি। গতকাল গুলমার্গ থেকে

روانہ ہو رہا تھا کہ ڈاک آئی اور اجمل خاں صاحب نے آپ کا مکتوبِ منظوم

rawana ho raha tha ke daak aayi aur Ajmal Khan Sahib ne aap ka maktoob-e-manzoom

রওনা হচ্ছিলাম তখন ডাক এল এবং আজমল খাঁ সাহেব আপনার কাব্যিক পত্রটি

حوالہ کیا ۔ کہہ نہیں سکتا کہ اس پیامِ محبت کو دلِ درمند نے کن آنکھوں سے پڑھا

hawala kiya. Keh nahin sakta ke is payam-e-mohabbat ko dil-e-dardmand ne kin ankhon se parha

হস্তান্তর করলেন। বলতে পারছি না যে এই ভালোবাসার বার্তা ব্যথিত হৃদয় কোন চোখে পাঠ করেছে

اور کن کانوں سے سنا میرا اور آپ کا معاملہ تو وہ ہو گیا ہے جو مرزا غالب نے کہا تھا:

aur kin kanon se suna mera aur aap ka muamla to woh ho gaya hai jo Mirza Ghalib ne kaha tha:

এবং কোন কানে শুনেছে; আমার আর আপনার ব্যাপারটি তো তা-ই হয়ে দাঁড়িয়েছে যা মির্জা গালিব বলেছিলেন:

باچوں توئی معاملہ بر خویش منت است

Ba-choon tui muamla bar khwaish minat ast

আপনার মতো মানুষের সাথে সম্পর্কের বিষয়টি নিজের জন্য সৌভাগ্যের

از شکوہء تو شکر گزارِ خودیم ما !

Az shikwa-e-tu shukr-guzar-e-khudi-ma!

আপনার অভিযোগের কারণে আমরা নিজেদের প্রতিই কৃতজ্ঞ!

آپ نے اپنے تین شعروں کا پیامِ دل نواز نہیں بھیجا ہے، لطف و عنایت

Aap ne apne teen sheron ka payam-e-dil-nawaz nahin bheja hai, lutf-o-inayat

আপনি আপনার তিন লাইনের শেরের মাধ্যমে শুধু হৃদয়কাড়া বার্তাই পাঠাননি, বরং দয়া ও অনুগ্রহের

کا ایک پورا دفتر کھول دیا ہے:

ka ek poora daftar khol diya hai:

একটি পুরো অধ্যায় উন্মোচন করে দিয়েছেন:

قلیل منک یکفینی ، ولکن

Qaleel-un minka yakfeeni, wa lakin

আপনার পক্ষ থেকে সামান্যই আমার জন্য যথেষ্ট, কিন্তু

قلیلک لایقال لہ قلیل !

Qaleelu-ka la yuqalu lahu qaleel!

আপনার সেই সামান্যকে ‘সামান্য’ বলা যায় না!

ان سطور کو آئندہ خامہ فرسائیوں کی تمہید تصور کیجئے ۔ رہائی

In sutoor ko ayinda khama-farsaiyon ki tamheed tasawwur kijiye. Rihayi

এই লাইনগুলোকে আগামী দিনের লেখালেখির ভূমিকা হিসেবে গণ্য করুন। মুক্তির

کے بعد جو کہانی سنانی تھی وہ ابھی تک نوکِ قلم سے آشنا نہ ہو سکی ۔

ke baad jo kahani sunani thi woh abhi tak nok-e-qalam se ashna na ho saki.

পর যে কাহিনী শোনানোর কথা ছিল, তা এখনো কলমের ডগায় এসে পৌঁছাতে পারেনি।

والسلام علیکم ورحمتہ اللہ وبرکاتہ ،

Wassalam-o-alaikum wa rehmatullahi wa barakatuhu,

আপনার ওপর শান্তি, আল্লাহর রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক,

ابوالکلام

Abul Kalam

আবুল কালাম

Ghubbar e Khatir - 28

পৃষ্ঠা নম্বর: ২৮

۲۸

28

২৮

مکتوبِ نسیم باغ

Maktoob-e-Naseem Bagh

নাসিম বাগের পত্র

نسیم باغ – سری نگر

Naseem Bagh – Srinagar

নাসিম বাগ – শ্রীনগর

۳ ستمبر ۱۹۴۵ء

3 September 1945

৩ সেপ্টেম্বর ১৯৪৫

از ما مپرس دردِ دلِ ما کہ یک زماں

Az ma mapurs dard-e-dil-e-ma ke yak zaman

আমাদের হৃদয়ের ব্যথার কথা জিজ্ঞেস করবেন না, কারণ আমরা এক সময়

خود را بہ حیلہ پیشِ تو خاموش کردہ ایم

Khud ra ba heela pesh-e-tu khamosh karda-em

নানা ছলে আপনার সামনে নিজেদের শান্ত রেখেছিলাম

صدیقِ مکرم !

Siddiq-e-Mukarram!

সম্মানিত বন্ধু!

وہی صبح چار بجے کا جانفزا وقت ہے – ہاؤس بوٹ میں مقیم ہوں ، دہنی

Wahi subah char baje ka jaan-faza waqt hai – House-boat mein muqeem hoon, dahni

সেই ভোরের চারটার প্রাণবন্ত সময় – আমি হাউসবোটে অবস্থান করছি, ডানে

طرف جھیل کی وسعت شالامار اور نشاط باغ تک پھیلی ہوئی ہے ، بائیں طرف

taraf jheel ki wus’at Shalimar aur Nishat Bagh tak phaili hui hai, bayein taraf

হ্রদের বিশালতা শালিমার এবং নিশাত বাগ পর্যন্ত বিস্তৃত, বাম দিকে

نسیم باغ کے چناروں کی قطاریں دور تک چلی گئی ہیں – چائے پی رہا ہوں اور

Naseem Bagh ke chinaron ki qatarein door tak chali gayi hain – Chai pi raha hoon aur

নাসিম বাগের চিনার গাছের সারিগুলো বহুদূর পর্যন্ত চলে গিয়েছে – চা পান করছি এবং

آپ کی یاد تازہ کر رہا ہوں –

aap ki yaad taza kar raha hoon –

আপনার স্মৃতি রোমন্থন করছি –

گرچہ دوریم بیا بہ تو قدح می نوشیم

Garchah doreem biya ba tu qadah mi nosheem

যদিও আমরা দূরে, তবুও আসুন আপনার সাথে সুরার পেয়ালা পান করি

بعدِ منزل نہ بود در سفرِ روحانی

Baad-e-manzil na buwad dar safar-e-roohani

আধ্যাত্মিক সফরে গন্তব্যের কোনো দূরত্ব থাকে না

گرفتاری سے پہلے آخری خط جو آپ کے نام لکھ سکا تھا ، وہ ۳ اگست

Giraftari se pehle aakhri khat jo aap ke naam likh saka tha, woh 3 August

গ্রেপ্তার হওয়ার আগে আপনার নামে শেষ যে চিঠিটি লিখতে পেরেছিলাম, সেটি ছিল ৩ আগস্ট

۱۹۴۲ء کی صبح کا تھا – کلکتہ سے بمبئی جا رہا تھا – ریل میں خط لکھ کر یہ سوچ لیا کہ

1942 ki subah ka tha – Calcutta se Bombay ja raha tha – Rail mein khat likh kar yeh soch liya ke

১৯৪২ সালের সকালবেলা – কলকাতা থেকে বোম্বাই যাচ্ছিলাম – ট্রেনে বসে চিঠিটি লিখে ভেবেছিলাম যে

بمبئی پہنچ کر اجمل خاں صاحب کے حوالے کر دوں گا – وہ نقل رکھ کر آپ کو بھیج دیں گے –

Bombay pahunch kar Ajmal Khan Sahib ke hawale kar doon ga – Woh naqal rakh kar aap ko bhej dein ge –

বোম্বাই পৌঁছে আজমল খাঁ সাহেবের কাছে সোপর্দ করব – তিনি নকল রেখে আপনাকে পাঠিয়ে দেবেন –

آپ کو یاد ہوگا کہ انھوں نے خطوط کی نقول رکھنے پر اصرار کیا تھا اور میں نے یہ

Aap ko yaad hoga ke unhon ne khutoot ki naqool rakhne par israr kiya tha aur main ne yeh

আপনার মনে থাকবে যে, তিনি চিঠিপত্রের প্রতিলিপি রাখার ব্যাপারে জোর দিয়েছিলেন এবং আমি এটি

طریقہ منظور کر لیا تھا – لیکن بمبئی پہنچتے ہی کاموں کے ہجوم میں اس طرح کھو گیا

tariqa manzoor kar liya tha – Lekin Bombay pahunchte hi kaamon ke hujoom mein is tarah kho gaya

মেনে নিয়েছিলাম – কিন্তু বোম্বাই পৌঁছানোর পরপরই কাজের ভিড়ে এমনভাবে হারিয়ে গেলাম

کہ اجمل خاں صاحب کو خط دینا بھول گیا – ۹ اگست کی صبح کو جب مجھے گرفتار

ke Ajmal Khan Sahib ko khat dena bhool gaya – 9 August ki subah ko jab mujhe giraftar

যে আজমল খাঁ সাহেবকে চিঠিটি দিতে ভুলে গিয়েছিলাম – ৯ আগস্ট সকালে যখন আমাকে গ্রেপ্তার

کر کے احمد نگر لے جا رہے تھے تو بعض کاغذات رکھنے کے لئے راہ میں اٹیچی کیس کھولا ،

kar ke Ahmednagar le ja rahe thay to baaz kaghazat rakhne ke liye raah mein attaché case khola,

করে আহমেদনগর নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, তখন পথে কিছু কাগজপত্র রাখার জন্য অ্যাটাচি কেস খুললাম,

Ghubbar e Khatir - 29

পৃষ্ঠা নম্বর: ২৯

۲۹

29

২৯

اور یکایک وہ خط سامنے آ گیا۔ اب دنیا سے تمام علاقے منقطع ہو چکے تھے ممکن

Aur yakayak woh khat samne aa gaya. Ab duniya se tamam elaqe munqata ho chuke thay mumkin

এবং হঠাৎ সেই চিঠিটি সামনে চলে এল। এখন দুনিয়ার সাথে সমস্ত সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল, সম্ভব

نہ تھا کہ کوئی خط ڈاک میں ڈالا جا سکے۔ میں نے اسے اٹیچی کیس سے نکال کر

na tha ke koi khat daak mein dala ja sake. Main ne ise attaché case se nikal kar

ছিল না যে কোনো চিঠি ডাকে দেওয়া যাবে। আমি ওটি অ্যাটাচি কেস থেকে বের করে

مسودات کی فائل میں رکھ دیا اور فائل کو صندوق میں بند کر دیا۔

musawwadat ki file mein rakh diya aur file ko sandooq mein band kar diya.

পাণ্ডুলিপির ফাইলে রেখে দিলাম এবং ফাইলটি সিন্দুকে বন্ধ করে দিলাম।

دو بجے ہم احمد نگر پہنچے اور پندرہ منٹ کے بعد قلعہ کے اندر محبوس تھے۔

Do baje hum Ahmednagar pahunche aur pandrah minute ke baad qila ke andar mahboos thay.

দুটোর সময় আমরা আহমেদনগর পৌঁছলাম এবং পনেরো মিনিট পর দুর্গের ভেতরে বন্দী হলাম।

اب اس دنیا میں جو قلعہ سے باہر تھی، اور اس دنیا میں جو قلعہ کے اندر تھی، برسوں

Ab is duniya mein jo qila se bahar thi, aur is duniya mein jo qila ke andar thi, barson

এখন সেই দুনিয়া যা দুর্গের বাইরে ছিল, এবং সেই দুনিয়া যা দুর্গের ভেতরে ছিল—উভয়ের মাঝে বছরের

کی مسافت حائل ہو گئی!

ki masafat hayel ho gayi!

দূরত্ব অন্তরায় হয়ে দাঁড়াল!

كيف الوصول الى سعاد ودونها

Kaifa-al-wasoolu ila Suaada wa doonaha

সুয়াদের (প্রিয়তমা) কাছে পৌঁছানোর উপায় কী, যখন তার সামনে

قلل الجبال و بينهن حتوف

Qulal-ul-jibali wa baynahuna hutoof

পাহাড়ের চূড়া এবং তাদের মাঝে রয়েছে ধ্বংসের হাতছানি।

دوسرے دن یعنی ۱۰ اگست کو حسبِ معمول صبح تین بجے اٹھا۔ چائے کا سامان جو

Doosre din yani 10 August ko hasb-e-maamool subah teen baje utha. Chai ka saman jo

পরের দিন অর্থাৎ ১০ই আগস্ট নিয়মমাফিক ভোর তিনটেয় উঠলাম। চায়ের সরঞ্জাম যা

سفر میں ساتھ رہتا ہے وہاں بھی سامان کے ساتھ آ گیا تھا۔ میں نے چائے دم دی۔

safar mein sath rehta hai wahan bhi saman ke sath aa gaya tha. Main ne chai dum di.

সফরে সাথে থাকে, তা সেখানেও মালামালের সাথে এসে গিয়েছিল। আমি চা তৈরি করলাম।

فنجان سامنے رکھا اور اپنے خیالات میں ڈوب گیا۔ خیالات مختلف میدانوں

Finjaan samne rakha aur apne khayalat mein doob gaya. Khayalat mukhtalif maidanon

পিয়ালা সামনে রাখলাম এবং নিজের ভাবনায় ডুবে গেলাম। চিন্তাগুলো বিভিন্ন প্রান্তরে

میں بھٹکنے لگے تھے۔ اچانک وہ خط جو ۳ اگست کو ریل میں لکھا تھا اور کاغذات

mein bhatakne lage thay. Achanak woh khat jo 3 August ko rail mein likha tha aur kaghazat

ঘুরে বেড়াতে লাগল। হঠাৎ সেই চিঠিটি যা ৩রা আগস্ট রেলে বসে লিখেছিলাম এবং কাগজপত্রগুলোর

میں پڑا تھا یاد آ گیا۔ بے اختیار جی چاہا کہ کچھ دیر آپ کی مخاطبت میں بسر کروں،

mein para tha yaad aa gaya. Be-ikhtiyar jee chaha ke kuch der aap ki mukhatibat mein basar karoon,

মাঝে পড়ে ছিল, তা মনে পড়ে গেল। স্বতঃস্ফূর্তভাবে ইচ্ছে হলো কিছুক্ষণ আপনার সাথে কথা বলে কাটাই,

اور آپ سن رہے ہوں یا نہ سن رہے ہوں مگر روئے سخن آپ ہی کی طرف رہے چنانچہ

aur aap sun rahe hon ya na sun rahe hon magar roye-sukhan aap hi ki taraf rahe chunanche

আপনি তা শুনুন বা না শুনুন, কিন্তু আমার কথার লক্ষ্য যেন আপনার দিকেই থাকে; সুতরাং

اس عالم میں ایک مکتوب قلمبند ہو گیا اور اس کے بعد ہر دوسرے تیسرے دن مکتوب

is aalam mein ek maktoob qalamband ho gaya aur is ke baad har doosre teesre din maktoob

এই অবস্থায় একটি পত্র লিখিত হলো এবং এরপর প্রতি দুই-তিন দিন অন্তর পত্র

قلمبند ہوتے رہے۔ آگے چل کر بعض دیگر احبابِ داغ کی یاد بھی سامنے آئی اور

qalamband hote rahe. Aage chal kar baaz digar ahbab-e-dagh ki yaad bhi samne aayi aur

লিখিত হতে থাকল। পরবর্তীতে অন্যান্য কিছু দগ্ধ হৃদয়ের বন্ধুদের স্মৃতিও সামনে এল এবং

ان کی مخاطبت میں بھی گاہ گاہ طبعِ پسماندہ حالِ دراز نفسی کرتی رہی۔ قید خانہ

un ki mukhatibat mein bhi gah-gah taba-e-pasmanda haal-e-daraz-nafsi karti rahi. Qaid-khana

তাঁদের উদ্দেশ্যেও মাঝে মাঝে এই পরিশ্রান্ত মন দীর্ঘ আলাপ চালিয়ে গেল। কারাগারের

سے باہر کی دنیا سے اب سارے رشتے کٹ چکے تھے اور مستقبل پردہء غیب

se bahar ki duniya se ab saare rishte kat chuke thay aur mustaqbil parda-e-ghaib

বাইরের দুনিয়ার সাথে এখন সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল এবং ভবিষ্যৎ অদৃশ্যের পর্দায়

میں مستور تھا۔ کچھ معلوم نہ تھا کہ یہ مکتوب کبھی مکتوب الیہم تک پہنچ سکیں گے

mein mastoor tha. Kuch maloom na tha ke yeh maktoob kabhi maktoob-elaihum tak pahunch sakein ge

ঢাকা ছিল। জানা ছিল না যে এই পত্রগুলো কখনো প্রাপকদের কাছে পৌঁছাতে পারবে

یا نہیں۔ تاہم ذوقِ مخاطبت کی طلبگاریاں کچھ اس طرح دلِ مستمند پر چھا گئی

ya nahin. Taham zauq-e-mukhatibat ki talabgariyan kuch is tarah dil-e-mustamand par chha gayi

কি না। তবুও আলাপের আকাঙ্ক্ষা এই ব্যথিত হৃদয়ে এমনভাবে ছেয়ে গিয়েছিল

تھیں کہ قلم اٹھا لیتا تھا تو پھر اسے روکنے کو جی نہیں چاہتا تھا۔ لوگوں نے نامہ بری

thein ke qalam utha leta tha to phir use rokne ko jee nahin chahta tha. Logon ne nama-bari

যে কলম ধরলে তা আর থামাতে ইচ্ছে করত না। লোকেরা পত্রবাহক

পৃষ্ঠা নম্বর: ৩০

۳

30

৩০

قلم کے حوالے ہو جاتا ہے۔ دیکھنا یہ ہے کہ ایسے حوصلہ فرسا حالات میں ان کا دماغی

Qalam ke hawale ho jata hai. Dekhna yeh hai ke aise hausla-farsa haalaat mein un ka dimaghi

কলমের ওপর ন্যস্ত হয়। দেখার বিষয় এই যে, এমন হতাশাজনক পরিস্থিতিতে তাঁদের মানসিক

پس منظر کیا تھا اور وقت کے تمام مخالفانہ حالات کو کس نظر اور کس مقام سے دیکھ رہا

pas-manzar kya tha aur waqt ke tamam mukhalifana haalaat ko kis nazar aur kis maqaam se dekh raha

পটভূমি কেমন ছিল এবং সময়ের সমস্ত প্রতিকূল অবস্থাকে কোন দৃষ্টিতে ও কোন অবস্থান থেকে দেখছিলেন

تھا؟ یہی وہ دماغی پس منظر ہے جس کی نوعیت سے ہر عظیم شخصیت کی عظمت کا اصل مقام

tha? Yahi woh dimaghi pas-manzar hai jis ki nauiyat se har azeem shakhsiyat ki azmat ka asl maqaam

ছিলেন? এটিই সেই মানসিক পটভূমি, যার প্রকৃতির মাধ্যমে প্রতিটি মহান ব্যক্তিত্বের শ্রেষ্ঠত্বের প্রকৃত অবস্থান

دنیا کے آگے نمایاں ہوتا ہے۔ یہی وہ کسوٹی ہے جس پر ہر انسانی عظمت کسی جا سکتی ہے،

duniya ke aage numayan hota hai. Yahi woh kasauti hai jis par har insani azmat kasi ja sakti hai,

দুনিয়ার সামনে স্পষ্ট হয়। এটিই সেই কষ্টিপাথর, যার ওপর প্রতিটি মানবিক শ্রেষ্ঠত্ব যাচাই করা যেতে পারে,

اور یہی معیار ہے جو ہر انسان کی عظمت و پستی کا فیصلہ کر دیتا ہے۔

aur yahi meyaar hai jo har insaan ki azmat-o-pasti ka faisla kar deta hai.

এবং এটিই সেই মানদণ্ড, যা প্রতিটি মানুষের মহত্ত্ব ও হীনতার ফয়সালা করে দেয়।

ان مکاتیب میں مولانا نے خود کوشش کی ہے کہ اپنا ذہنی پس منظر دنیا کے آگے

In makateeb mein Maulana ne khud koshish ki hai ke apna zehni pas-manzar duniya ke aage

এই পত্রগুলোতে মাওলানা নিজে চেষ্টা করেছেন যেন তাঁর মানসিক পটভূমি দুনিয়ার সামনে

رکھ دیں اور اسی لئے یہ غیر ضروری ہو گیا ہے کہ اس بارے میں بحث و نظر سے کام لیا جائے۔

rakh dein aur isi liye yeh ghair-zaroori ho gaya hai ke is baare mein bahas-o-nazar se kaam liya jaye.

তুলে ধরেন এবং এজন্য এটি অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছে যে, এ বিষয়ে বিচার-বিশ্লেষণ করা হোক।

میں صرف معاملے کے اس پہلو پر اہل نظر کو توجہ دلانا چاہتا ہوں، خود کچھ کہنا نہیں چاہتا۔

Main sirf muamle ke is pehlu par ahl-e-nazar ko tawajjo dilana chahta hoon, khud kuch kehna nahin chahta.

আমি শুধু বিষয়ের এই দিকটির প্রতি বোদ্ধা মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই, নিজে কিছু বলতে চাই না।

گزشتہ جولائی میں جوں ہی ان مکاتیب کی اشاعت کا اعلان ہوا ملک کے ہر گوشے

Guzishta July mein joon hi in makateeb ki ishaat ka elaan hua mulk ke har goshe

গত জুলাই মাসে এই পত্রগুলো প্রকাশের ঘোষণা হওয়ামাত্র দেশের প্রতিটি কোণ

سے تقاضے ہونے لگے کہ ان کے ترجمے کا بھی سرو سامان ہونا چاہیے۔ کلکتہ، بمبئی، دہلی،

se taqaze hone lage ke un ke tarjume ka bhi saro-saman hona chahiye. Calcutta, Bombay, Delhi,

থেকে দাবি উঠতে লাগল যে, এগুলোর অনুবাদের ব্যবস্থাও করা উচিত। কলকাতা, বোম্বাই, দিল্লি,

الہ آباد، کانپور اور پٹنہ کے پبلشروں کا تقاضا تھا کہ انگریزی، ہندی، گجراتی، بنگالی،

Allahabad, Kanpur aur Patna ke publisheron ka taqaza tha ke Angrezi, Hindi, Gujarati, Bengali,

এলাহাবাদ, কানপুর এবং পাটনার প্রকাশকদের দাবি ছিল যেন ইংরেজি, হিন্দি, গুজরাতি, বাংলা,

تمل وغیرہ زبانوں میں ان کے ترجمے کی اجازت دے دی جائے۔ میں نے یہ تمام درخواستیں

Tamil waghaira zabanon mein un ke tarjume ki ijazat de di jaye. Main ne yeh tamam darkhwast-ein

তামিল ইত্যাদি ভাষায় এগুলোর অনুবাদের অনুমতি দেওয়া হয়। আমি এই সমস্ত আবেদন

مولانا کی خدمت میں پیش کر دیں لیکن انھوں نے ترجمے کی اجازت نہیں دی، انھوں نے

Maulana ki khidmat mein pesh kar dein lekin unhon ne tarjume ki ijazat nahin di, unhon ne

মাওলানার কাছে পেশ করলাম কিন্তু তিনি অনুবাদের অনুমতি দেননি; তিনি

فرمایا کہ چند مکاتیب کے سوا یہ تمام مکاتیب ایک ایسے اسلوب میں لکھے گئے ہیں کہ ان کا

farmaya ke chand makateeb ke siwa yeh tamam makateeb ek aise usloob mein likhe gaye hain ke un ka

বললেন যে, কয়েকটি পত্র ছাড়া এই সমস্ত পত্র এমন এক শৈলীতে লেখা হয়েছে যে, সেগুলোর

کسی دوسری زبان میں صحت، ذوق و معیار کے ساتھ ترجمہ ہو ہی نہیں سکتا۔ اگر کیا

kisi doosri zaban mein sehat, zauq-o-meyaar ke saath tarjuma ho hi nahin sakta. Agar kiya

অন্য কোনো ভাষায় সঠিকতা, রুচি ও মান বজায় রেখে অনুবাদ করা সম্ভবই নয়। যদি করাও

جائے گا تو اصل کی ساری خصوصیات مٹ جائیں گی۔ چنانچہ اس وقت تک ترجمے کی اجازت

jaye ga to asl ki saari khusoosiyat mit jayein gi. Chunanche is waqt tak tarjume ki ijazat

হয় তবে মূলের সমস্ত বৈশিষ্ট্য বিলীন হয়ে যাবে। ফলে এখন পর্যন্ত অনুবাদের অনুমতি

کسی فرم کو نہیں دی گئی ہے۔ مولانا نے جس خیال سے ترجمے کو روکا ہے مجھے یقین ہے کہ

kisi firm ko nahin di gayi hai. Maulana ne jis khayal se tarjume ko roka hai mujhe yaqeen hai ke

কোনো প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয়নি। মাওলানা যে চিন্তায় অনুবাদ করতে নিষেধ করেছেন, আমার বিশ্বাস যে

اس سے ہر صاحب نظر اتفاق کرے گا۔ یہ نثر میں شاعری ہے اور شاعری ترجمے کی چیز

is se har sahab-e-nazar ittefaq kare ga. Yeh nasr mein shayari hai aur shayari tarjume ki cheez

তার সাথে প্রতিটি বোদ্ধা ব্যক্তি একমত হবেন। এটি গদ্যের মধ্যে কবিতা, আর কবিতা অনুবাদের বিষয়

نہیں ہوتی۔ البتہ دو چار مکتوب جو محض فلسفیانہ اور تاریخی مباحث پر لکھے گئے

nahin hoti. Albatta do chaar maktoob jo mahz falsafiyana aur tareekhi mabaahis par likhe gaye

নয়। তবে দুই-চারটি পত্র যা নিছক দার্শনিক ও ঐতিহাসিক আলোচনার ওপর লেখা হয়েছে

ہیں ترجمہ کئے جا سکتے ہیں، انھیں مستثنیٰ کر دینا چاہیے۔

hain tarjuma kiye ja sakte hain, unhein mustasna kar dena chahiye.

সেগুলোর অনুবাদ করা যেতে পারে, ওগুলোকে ব্যতিক্রম হিসেবে ধরা উচিত।

یہ تمام مکاتیب “صدیقِ مکرم” کے خطاب سے شروع ہوتے ہیں۔ یہ “م” صدیق لوز”

Yeh tamam makateeb “Siddiq-e-Mukarram” ke khitab se shuru hote hain. Yeh “m” Siddiq Lauz”

এই সমস্ত পত্র “সিদ্দিকে মুকাররম” (সম্মানিত বন্ধু) সম্বোধনে শুরু হয়। এটি “ম” সিদ্দিক লোজ”

গুবারে খাতির:

আহমেদনগর দুর্গের বন্দিজীবনের (৯ আগস্ট ১৯৪২ থেকে ১৫ জুন ১৯৪৫) রোজনামচা ও পত্রাবলি

লেখক: আবুল কালাম আজাদ

মূল পাঠ্য:

“গুবারে খাতির” আহমেদনগর দুর্গের বন্দিদশা (৯ আগস্ট ১৯৪২ – ১৫ জুন ১৯৪৫) সময়ের কিছু লেখনি।

মূল্য: ছয় টাকা (তৎকালীন)।

সূচিপত্র

  • ভূমিকা (মুকাদ্দামা): পৃষ্ঠা ৫

  • মুখবন্ধ (দিবাচা): পৃষ্ঠা ২১

  • মুক্তির পর প্রেরিত কিছু পত্রাবলী: পৃষ্ঠা ২৩

  • মকতুব (চিঠি) ১: (৩ আগস্ট ১৯৪২) — পৃষ্ঠা ৩৩

  • বে-সিতুন ও কোহকানের দাস্তান (গল্প): পৃষ্ঠা ৪১

  • মকতুব ২: (১০ আগস্ট ১৯৪২) — পৃষ্ঠা ৪৩

  • মকতুব ৩: (১১ আগস্ট ১৯৪২) — পৃষ্ঠা ৫৫

  • মকতুব ৪: (১৫ আগস্ট ১৯৪২) — পৃষ্ঠা ৬৭

  • মকতুব ৫: (১৮ আগস্ট ১৯৪২) — পৃষ্ঠা ৭৩

  • মদ ও আফিমের কাহিনী (হিকায়াতে বাদা ও তিরইয়াক): পৃষ্ঠা ৮০

  • মকতুব ৬: (২৭ আগস্ট ১৯৪২) — পৃষ্ঠা ৮৮

  • মকতুব ৭: (২৯ আগস্ট ১৯৪২) — পৃষ্ঠা ১০০

  • মকতুব ৮: (৪ সেপ্টেম্বর ১৯৪২) — পৃষ্ঠা ১১২

  • মকতুব ৯: (৫ সেপ্টেম্বর ১৯৪২) — পৃষ্ঠা ১২২

  • মকতুব ১০: (১৩ সেপ্টেম্বর ১৯৪২) — পৃষ্ঠা ১৩২

  • মকতুব ১১: (১৬ সেপ্টেম্বর ১৯৪২) — পৃষ্ঠা ১৪২

  • চায়ের কাহিনী (দিলরুবা-এ-চায়): পৃষ্ঠা ১৫২

  • মকতুব ১২: (১৯ সেপ্টেম্বর ১৯৪২) — পৃষ্ঠা ১৫৩

  • মকতুব ১৩: (২০ সেপ্টেম্বর ১৯৪২) — পৃষ্ঠা ১৬৫

  • মকতুব ১৪: (২১ সেপ্টেম্বর ১৯৪২) — পৃষ্ঠা ১৭৭

  • মকতুব ১৫: (২৮ অক্টোবর ১৯৪২) — পৃষ্ঠা ১৮৮

  • মকতুব ১৬: (৫ জানুয়ারি ১৯৪৩) — পৃষ্ঠা ২০০

  • মকতুব ১৭: (৬ জানুয়ারি ১৯৪৩) — পৃষ্ঠা ২১৩

  • মকতুব ১৮: (৯ জানুয়ারি ১৯৪৩) — পৃষ্ঠা ২২৭

  • মকতুব ১৯: (১৪ জুন ১৯৪৩) — পৃষ্ঠা ২৪৩

  • সঙ্গীতের আলোচনা (মৌসিকি): পৃষ্ঠা ২৪৫

  • মকতুব ২০: (১৫ জুলাই ১৯৪৩) — পৃষ্ঠা ২৬৫

  • মকতুব ২১: (১৬ জুলাই ১৯৪৩) — পৃষ্ঠা ২৭৯

  • মকতুব ২২: (১২ আগস্ট ১৯৪৩) — পৃষ্ঠা ২৯৫

  • কাক-ও-বুলবুল (কাক ও বুলবুলির কাহিনী): পৃষ্ঠা ৩০৩

  • মকতুব ২৩: (১৫ সেপ্টেম্বর ১৯৪৩) — পৃষ্ঠা ৩১৭

  • মকতুব ২৪: (১৬ সেপ্টেম্বর ১৯৪৩) — পৃষ্ঠা ৩৩০

  • মকতুব ২৫: (৬ নভেম্বর ১৯৪৩) — পৃষ্ঠা ৩৪৮

  • পরিশিষ্ট (যমিমা): পৃষ্ঠা ৩৬১

  • মকতুব ২৬: (১২ ডিসেম্বর ১৯৪৩) — পৃষ্ঠা ৩৫৫

  • মকতুব ২৭: (১৫ ডিসেম্বর ১৯৪৩) — পৃষ্ঠা ৩৬৮

  • মকতুব ২৮: (২০ ডিসেম্বর ১৯৪৩) — পৃষ্ঠা ৩৮০

  • স্মৃতির জানালা: পৃষ্ঠা ৩৯২

  • শেষ কথা: পৃষ্ঠা ৪০৫

 

প্রারম্ভিকা (মুকাদ্দামা) – মোহাম্মদ আজমল খান

৭ নম্বর পৃষ্ঠা থেকে মূল ভূমিকা বা ‘মুকাদ্দামা’ শুরু হয়েছে, যা লিখেছেন মাওলানার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সহকারী এবং এই বইটির সংকলক মোহাম্মদ আজমল খান

অনুবাদ:

“এই সংকলনটি মূলত সেই সব চিঠির সমষ্টি, যা মাওলানা আবুল কালাম আজাদ আহমেদনগর দুর্গে বন্দি থাকাকালে ‘সাদিক-এ-মুকাররম’ (সম্মানিত বন্ধু) নবাব হাবিবুর রহমান খান শেরওয়ানিকে সম্বোধন করে লিখেছিলেন।

১৯৪২ সালের ৯ আগস্ট যখন বোম্বাইয়ে (মুম্বাই) নিখিল ভারত কংগ্রেস কমিটির অধিবেশন শেষ হলো এবং নেতৃবৃন্দকে গ্রেফতার করা হলো, তখন মাওলানাকেও গ্রেফতার করে আহমেদনগর দুর্গে নিয়ে যাওয়া হয়। এই কেল্লার চার দেয়ালের ভেতর দীর্ঘ তিন বছর তিনি বাইরের জগত থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ছিলেন। কোনো চিঠিপত্র বা সংবাদপত্রের অনুমতি ছিল না। কিন্তু কলম যার স্বভাব, তাকে কোনো শক্তিই থামিয়ে রাখতে পারে না। মাওলানা এই বন্দিত্বকে তাঁর জ্ঞানচর্চা ও আত্মিক উপলব্ধির এক সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন।

তিনি এই চিঠিগুলো লিখতেন ঠিকই, কিন্তু সেগুলো পাঠানোর কোনো উপায় ছিল না। তাই তিনি এগুলো একটি ফাইলের মধ্যে জমিয়ে রাখতেন। ১৯৪৫ সালে মুক্তি পাওয়ার পর যখন তিনি এই পাণ্ডুলিপি নিয়ে ফিরে এলেন, তখন জানা গেল যে তিনি কেবল চিঠি লেখেননি, বরং সাহিত্যের এক অমূল্য ভাণ্ডার সৃষ্টি করেছেন।

এই চিঠিগুলোতে জীবনের প্রতিটি দিক—ধর্ম, দর্শন, ইতিহাস, সংগীত, চা পানের সংস্কৃতি, এমনকি সামান্য চড়ুই পাখির জীবনও এক অসামান্য শৈল্পিক রূপ পেয়েছে। মাওলানার ভাষা এখানে যেমন গম্ভীর, তেমনি হাস্যরসে ভরপুর। যারা কেবল তাঁকে একজন কঠোর রাজনীতিক মনে করেন, তারা এই বইটি পড়লে তাঁর কোমল ও শৈল্পিক হৃদয়ের এক নতুন পরিচয় পাবেন।”

“মাওলানা এই চিঠিগুলো লিখে একটি ব্যক্তিগত ফাইলে সযত্নে জমা করে রাখতেন। জেলখানায় যেহেতু বাইরের কারও সাথে যোগাযোগের কোনো পথ খোলা ছিল না, তাই এই চিঠিগুলো তখন পাঠানো সম্ভব হয়নি। ১৯৪৫ সালের ১৫ জুন যখন তিনি মুক্তি পেলেন, তখন এই পাণ্ডুলিপিটি তাঁর সাথে নিয়ে আসেন।

মুক্তি পাওয়ার পর মাওলানা যখন তাঁর ব্যক্তিগত কাগজপত্র গুছিয়ে নিচ্ছিলেন, তখন একদিন আমাকে ডেকে বললেন—’এই ফাইলটি দেখুন, এতে কিছু চিঠিপত্র আছে যা আমি নবাব হাবিবুর রহমান খান শেরওয়ানি সাহেবকে উদ্দেশ্য করে লিখেছিলাম।’ আমি যখন ফাইলটি পড়লাম, তখন আমার বিস্ময়ের সীমা রইল না। আমি দেখলাম এটি কেবল ব্যক্তিগত চিঠিপত্র নয়, বরং উর্দু সাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ। আমি মাওলানাকে অনুরোধ করলাম এগুলো প্রকাশের অনুমতি দেওয়ার জন্য। মাওলানা প্রথমে কিছুটা ইতস্তত করেছিলেন, কারণ এগুলো ছিল তাঁর একান্ত ব্যক্তিগত ভাবনার বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ইতিহাসের প্রয়োজনে এবং উর্দু সাহিত্যের প্রতি তাঁর ভালোবাসার কারণে তিনি এটি প্রকাশের অনুমতি দেন।

এই বইটির নাম ‘গুবারে খাতির’ রাখার পেছনেও একটি প্রেক্ষাপট রয়েছে। মাওলানার মতে, তাঁর হৃদয়ে জমে থাকা দুঃখ-বেদনা আর ভাবনার যে ধূলিকণা (গুবার) এই বন্দিজীবনে জমা হয়েছিল, কলমের মাধ্যমে তিনি তা কাগজের পাতায় ঝেড়ে ফেলেছেন। তাই এর নাম রাখা হয়েছে ‘গুবারে খাতির’ (হৃদয়ের ধূলিকণা)।

বইটির প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি বাক্য অত্যন্ত নিপুণভাবে চয়ন করা হয়েছে। মাওলানার পাণ্ডুলিপিতে কাটাকাটি খুব একটা দেখা যায় না। তিনি যখন লিখতে বসতেন, তখন যেন তাঁর কলম থেকে শব্দের ঝরনাধারা বয়ে যেত। এই সংকলনটি কেবল মাওলানা আজাদের পাণ্ডিত্যই নয়, বরং তাঁর শৈল্পিক এবং আধ্যাত্মিক জীবনের এক পূর্ণাঙ্গ প্রতিচ্ছবি।

“মাওলানা আজাদের এই লেখাগুলো কোনো সাধারণ চিঠিপত্র নয়। এটি আসলে একটি ব্যক্তিগত ডায়েরি, যা তিনি চিঠির আকারে সাজিয়েছেন। তিনি যখনই কোনো নতুন বিষয় নিয়ে চিন্তা করতেন, তখনই তিনি নবাব হাবিবুর রহমান খান শেরওয়ানিকে সম্বোধন করে লিখতে শুরু করতেন। এই সংগ্রহশালায় আপনি যেমন ইতিহাসের গম্ভীর আলোচনা পাবেন, তেমনি পাবেন আধুনিক দর্শনের সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ।

মাওলানা এই বইটির জন্য কোনো বিশেষ ভূমিকা লিখতে চাননি। তিনি মনে করতেন, এই লেখাগুলো নিজেই নিজের পরিচয় বহন করে। তবে পাঠকদের জন্য তিনি অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত একটি কথা লিখে গেছেন যা বইটির শুরুতে যোগ করা হয়েছে। আমি আশা করি, উর্দু সাহিত্যের ইতিহাসে ‘গুবারে খাতির’ কেবল একটি বই হিসেবে নয়, বরং একটি নতুন যুগের মাইলফলক হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।”

দিবাচা (প্রারম্ভিকা) – মাওলানা আজাদ

অনুবাদ:

“এই কাগজের স্তূপগুলো আহমেদনগর দুর্গের সেই দিনগুলোর অবশিষ্টাংশ, যখন বাইরের দুনিয়া আমাদের জন্য নিষিদ্ধ ছিল। যখন মনের ভেতর ভাবনার ভিড় জমে উঠত এবং তা প্রকাশ করার মতো কোনো সাথী পাওয়া যেত না, তখনই আমি কলম তুলে নিতাম। এই লেখাগুলো পাঠানোর কোনো গন্তব্য ছিল না, তবুও আমি লিখে যেতাম—যেন নিজের সাথে নিজের এক নিরব কথোপকথন।

আমি এগুলোকে ‘গুবারে খাতির’ নাম দিয়েছি কারণ এগুলো কেবল আমার হৃদয়ের মেঘাচ্ছন্ন দিনের কিছু বিক্ষিপ্ত প্রতিচ্ছবি। এখানে যা কিছু লেখা হয়েছে, তা কোনো সুসংগঠিত গ্রন্থ রচনার উদ্দেশ্যে নয়, বরং সেই নিঃসঙ্গ মুহূর্তগুলোকে অর্থবহ করে তোলার এক সামান্য প্রয়াস মাত্র।”

“এই লেখাগুলোর প্রতিটি পৃষ্ঠায় আপনি একাকীত্বের প্রতিধ্বনি শুনতে পাবেন। যখন একজন মানুষ চার দেয়ালের ভেতর বন্দি থাকে, তখন তার চিন্তাগুলো বাইরের জগতের কোলাহল থেকে মুক্ত হয়ে নিজের অন্তরের গভীরে ডুব দেয়। আমি যখনই লিখতে বসেছি, আমার মনে হয়নি যে আমি কোনো সাহিত্য রচনা করছি; বরং আমার মনে হয়েছে আমি আমার কোনো পুরনো বন্ধুর সাথে মুখোমুখি বসে কথা বলছি।

যিনি এই চিঠিগুলো পড়বেন, তিনি হয়তো এর ভেতর কোনো বিশেষ ধারাবাহিকতা খুঁজে পাবেন না। কখনও আমি ইতিহাসের গভীর অরণ্যে হারিয়ে গেছি, কখনও বা চায়ের কাপের বাষ্পে দর্শনের সূত্র খুঁজেছি। এই অসংলগ্নতাই হলো ‘গুবারে খাতির’-এর আসল সৌন্দর্য। এটি হৃদয়ের সেই ধূলিকণা যা কোনো নিয়ম মেনে ওড়ে না, বরং বাতাসের ঝাপটায় আপন মনে ছড়িয়ে পড়ে।

মওলানা আবুল কালাম আজাদের ‘গুবারে খাতির’ মূলত চিঠি আকারে লেখা হলেও এর প্রতিটি চিঠির নির্দিষ্ট সাহিত্যিক ও দার্শনিক বিষয়বস্তু রয়েছে। পাঠকদের সুবিধার্থে নিচে ২৪টি চিঠির প্রধান বিষয়বস্তু বা শিরোনাম বাংলা এবং ব্রাকেটে উর্দুতে (বাংলা হরফে উচ্চারণে) দেওয়া হলো। পরে চিঠিগুলোর অনুবাদ একে একে যুক্ত করবো:

১. আহমেদনগর দুর্গে আগমন (আমদ-এ-কিলা আহমেদনগর) / آمدِ قلعہ احمد نگر (১০ আগস্ট ১৯৪২: গ্রেফতারি এবং বোম্বাই থেকে আহমেদনগর দুর্গে পৌঁছানোর বিস্তারিত ও ঐতিহাসিক বর্ণনা।)

আহমেদনগর দুর্গে আগমন (আমদ-এ-কিলা আহমেদনগর)

তারিখ: ১০ আগস্ট, ১৯৪২

সম্মানিত বন্ধু (সাদিক-এ-মুকাররম),

আমার গতরাতের যাত্রার শেষ গন্তব্য ছিল এই আহমেদনগর দুর্গ। আজ সকালে যখন আমরা এখানে পৌঁছলাম, ভোরের আলো তখনও ভালো করে ফোটেনি। বোম্বাই (মুম্বাই) থেকে আমাদের এই যাত্রাটি ছিল সংক্ষিপ্ত, কিন্তু এর প্রতিটি মুহূর্ত ছিল এক গভীর অনিশ্চয়তায় ঘেরা। আমাদের ঠিক কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে—সে বিষয়ে আমাদের কাছে কোনো স্পষ্ট তথ্য ছিল না।

ভোর চারটার সময় যখন আমাদের বহনকারী বিশেষ ট্রেনটি আহমেদনগর স্টেশনে এসে থামল, চারপাশের নিস্তব্ধতা দেখে মনে হচ্ছিল এটি কোনো মৃত শহর। স্টেশনে সাধারণ মানুষের কোনো চিহ্ন ছিল না; কেবল সশস্ত্র প্রহরী আর সামরিক কর্মকর্তাদের বুটের শব্দ শোনা যাচ্ছিল। আমাদের ট্রেন থেকে নামিয়ে সরাসরি কতগুলো সামরিক ট্রাকে তোলা হলো। ট্রাকগুলো শহরের প্রধান রাস্তাগুলো এড়িয়ে কোনো এক গোপন ও নির্জন পথ দিয়ে দ্রুতগতিতে ছুটতে শুরু করল।

আমি যখন ট্রাকের ওপর বসে বাইরের আবছা আলোয় এই দুর্গের বিশাল প্রাচীর আর বুরুজগুলো দেখলাম, তখন মুহূর্তেই আমার চোখের সামনে ইতিহাসের কয়েকশ বছরের পুরোনো দৃশ্যপট ভেসে উঠল। আহমেদনগর দুর্গ কেবল একটি কেল্লা নয়, এটি দাক্ষিণাত্যের ইতিহাসে বীরত্ব, সংগ্রাম আর অনেক বড় বড় ট্র্যাজেডির এক নীরব সাক্ষী।

যখন দুর্গের সেই বিশাল আর ভারী লোহার ফটকটি আমাদের জন্য খুলে দেওয়া হলো এবং আমাদের ট্রাকগুলো ভেতরে প্রবেশ করল, তখন সেই ফটক বন্ধ হওয়ার যে বিকট শব্দ—যা আজও আমার কানে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে—তা ছিল যেন বাইরের জগতের সাথে আমাদের সমস্ত সম্পর্কের শেষ যবনিকাপাত। যখন গাড়ি থেকে নামলাম, তখন চারপাশের সুউচ্চ পাথুরে প্রাচীরগুলো যেন আমাদের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আমাদের স্বাগত জানাচ্ছিল।

আমাদের যে কামরাগুলোতে নিয়ে যাওয়া হলো, সেগুলো আগে থেকেই প্রস্তুত করে রাখা হয়েছিল। ঘরগুলোতে পা রাখার পর প্রথম যে জিনিসটি আমার ইন্দ্রিয়কে নাড়া দিল, তা হলো এক গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী নিস্তব্ধতা। মনে হচ্ছিল, বহু বছর ধরে এই দেয়ালগুলোর ভেতরে কোনো মানুষের কণ্ঠস্বর প্রতিধ্বনিত হয়নি। প্রতিটি কামরায় আসবাবপত্র বলতে ছিল অত্যন্ত সামান্য—একটি সরু লোহার খাট, একটি ছোট লেখার টেবিল আর একটি সাধারণ কাঠের আলমারি। এ যেন বৈরাগ্য আর নির্জনবাসের এক সুপরিকল্পিত আয়োজন।

বাইরে তখন হালকা বৃষ্টি পড়ছিল। দাক্ষিণাত্যের এই বর্ষার এক অদ্ভুত বিষণ্ণতা আছে, যা মনকে অবশ করে দেয়। আমি আমার ব্যাগ খুলে কয়েকখানা বই বের করলাম। আপনি তো জানেন, বই ছাড়া আমার পৃথিবী অসার। আমি যখন টেবিলের ওপর বইগুলো সাজিয়ে রাখলাম, তখন ওই অচেনা ঘরটি যেন মুহূর্তেই আমার চিরচেনা নিভৃত কুটিরে পরিণত হলো। গতরাতের দীর্ঘ ট্রেন যাত্রা আর অনিদ্রার ধকল শরীরের ওপর চেপে বসেছিল, কিন্তু আমার স্বভাব হলো—পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, মনের প্রশান্তি বিসর্জন না দেওয়া।

আমি জানালার শিকের পাশে দাঁড়িয়ে বাইরের উঠানের দিকে তাকালাম। দেখলাম জওহরলাল (নেহরু) ততক্ষণে তাঁর ঘরে প্রবেশ করেছেন। কিছুক্ষণ পর আমাদের কাছে পুলিশ সুপারিন্টেন্ডেন্ট সাহেব এলেন। তিনি অত্যন্ত মার্জিত ভাষায় আমাদের জেলের কঠিন নিয়ম-কানুনগুলো বুঝিয়ে দিলেন। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিলেন যে, বাইরে কোনো চিঠিপত্র পাঠানো কিংবা কোনো খবরের কাগজ পড়ার অনুমতি আপাতত নেই। এই নিষেধাজ্ঞার খবরটি শুনে আমার ভেতরে সামান্যতম অস্থিরতাও তৈরি হলো না। কারণ, আমি মনে করি—যে মানুষ নিজের ভেতরে একটি বিশাল জগত তৈরি করে নিতে পারে, বাইরের কোনো দেয়াল বা নিষেধাজ্ঞা তাকে কখনও শৃঙ্খলিত করতে পারে না।

সকাল আটটা নাগাদ আমাদের জন্য চা এল। আপনি যদি সেই চায়ের অবস্থা দেখতেন! মাটির একটি পাত্রে গরম পানি আর তাতে দুধ ও চিনির এক অগোছালো মিশ্রণ। চায়ের যে আভিজাত্য, স্বাদ আর ঘ্রাণ আমি সারা জীবন লালন করেছি, জেলের এই পানীয়টি ছিল তার ঠিক বিপরীত। কিন্তু সেই মুহূর্তে অন্য কোনো বিকল্প ছিল না। আমি চায়ের কাপে প্রথম চুমুক দিয়েই মনে মনে ভাবলাম—আহমেদনগর দুর্গের এই বন্দি জীবনে হয়তো পার্থিব অনেক আরাম-আয়েশের অভাব ঘটবে, কিন্তু চিন্তার যে ঐশ্বর্য আমি সাথে করে এনেছি, তা কেড়ে নেওয়ার ক্ষমতা কারও নেই।

আমি যখন আমার কামরার জানালা দিয়ে সেই ধূসর ও সুউচ্চ দেয়ালগুলোর দিকে তাকাচ্ছিলাম, তখন বার বার চাঁদ সুলতানার (Chand Sultana) কথা মনে পড়ছিল। এই সেই দুর্গ, যার প্রতিটি পাথর আজও সেই মহীয়সী নারীর বীরত্বের সাক্ষ্য দেয়। ১৫৯৫ সালে যখন মোগল সম্রাট আকবরের বিশাল বাহিনী এই দুর্গ অবরোধ করেছিল, তখন চাঁদ সুলতানা কেবল পর্দার আড়াল থেকে আদেশ দিয়েই ক্ষান্ত হননি, বরং স্বয়ং তলোয়ার হাতে নিয়ে যুদ্ধের ময়দানে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। তিনি কেবল একটি রাজ্য রক্ষা করেননি, বরং দাক্ষিণাত্যের আত্মসম্মানকে ধুলোয় মিশে যাওয়া থেকে বাঁচিয়েছিলেন।

ইতিহাসের পাতায় এই দুর্গের অবরোধের যে লোমহর্ষক বর্ণনা আছে, তা এখানে বসে ভাবলে অন্যরকম এক শিহরণ জাগে। মোগল সৈন্যরা যখন দুর্গের দেয়াল ধসিয়ে দেওয়ার জন্য বারুদ ব্যবহার করে গর্ত তৈরি করেছিল, তখন চাঁদ সুলতানা সেই গর্তগুলো ভরাট করার জন্য নিজের মূল্যবান সোনা, রূপা এবং তামার মুদ্রা পর্যন্ত ঢেলে দিয়েছিলেন। আজ সেই বীরত্বগাথা কেবল ইতিহাসের কিতাবের পাতায় সীমাবদ্ধ, কিন্তু এই নিস্প্রাণ পাথুরে দেয়ালগুলো যেন আজও সেই যুদ্ধের হাহাকার আর বারুদের গন্ধ বুকে ধরে রেখেছে।

আমার মনে হচ্ছিল, ভাগ্যের কী অদ্ভুত পরিহাস! কয়েকশ বছর আগে সম্রাট আকবরের সৈন্যরা এই কেল্লার দখল নিতে এসেছিল আর আজ আমরা সেই একই সম্রাট আকবরের উত্তরসূরী হয়ে ব্রিটিশদের হাতে এখানে বন্দি হয়ে আছি। সময়ের এই চাকা কীভাবে আবর্তিত হয়, তা ভাবলে বিস্ময় জাগে। ব্রিটিশরা আমাদের এখানে আটকে রেখে মনে করছে তারা ইতিহাসের ধারাকে বদলে দিচ্ছে। কিন্তু তারা জানে না, এই আহমেদনগর দুর্গের দেয়ালগুলো অনেক বড় বড় সাম্রাজ্যের উত্থান আর পতন দেখেছে। যারা আজ আমাদের পাহারাদার, কাল হয়তো তারাই ইতিহাসের অতল গহ্বরে হারিয়ে যাবে।

দুপুরের দিকে দাক্ষিণাত্যের সেই বৃষ্টি কিছুটা থামল। আমি আমার পড়ার টেবিলের সামনে গিয়ে বসলাম। আমার সামনে তখন কোনো সাদা কাগজ নেই, কোনো কলম নেই—কারণ জেল কর্তৃপক্ষ তখনও আমাদের লেখার সরঞ্জাম ব্যবহারের অনুমতি দেয়নি। কিন্তু আমার চিন্তা তো কাগজের মুখাপেক্ষী নয়। আমি মনে মনেই আপনার কাছে এই চিঠির খসড়া তৈরি করতে লাগলাম। আমি ভাবলাম, যদি কোনোদিন এই কেল্লার অন্ধকার দেয়াল থেকে মুক্তি পাই, তবে প্রথম কাজ হবে আমার এই অনুভূতিগুলোকে আপনার মাধ্যমে বিশ্বের সামনে তুলে ধরা।

বিকেল গড়িয়ে যখন সন্ধ্যা নামল, তখন কেল্লার ভেতরের নিস্তব্ধতা আরও রহস্যময় আর গাঢ় হয়ে উঠল। প্রহরীরা আমাদের কামরার দরজায় এসে ভারি লোহার তালা ঝুলিয়ে দিল। সেই তালাবদ্ধ হওয়ার যান্ত্রিক শব্দটির প্রতিধ্বনি আমাকে মুহূর্তেই মনে করিয়ে দিল যে, আজ থেকে আমার জগত এই সামান্য কয়েক হাত জায়গার চার দেয়ালের ভেতরেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু আমি যখন আমার টেবিলের ওপর লণ্ঠনটি জ্বালালাম, তখন আমার মনে হলো—আলো যেখানে আছে, সেখানে অন্ধকার কখনও পূর্ণ আধিপত্য বিস্তার করতে পারে না।

রাতের প্রথম প্রহরে আমি বিছানায় গা এলিয়ে দিলাম, কিন্তু ঘুম ছিল দুচোখের সীমানার বাইরে। আমি জানতাম না এই লেখাগুলো কখনও আপনার (নবাব হাবিবুর রহমান খান শেরওয়ানি) হাতে পৌঁছাবে কি না, তবুও মনের গহীনে আমি আপনার সাথে কথা বলে যাচ্ছিলাম। আহমেদনগর দুর্গের এই প্রথম রাতটি আমাকে এক নতুন ধরনের জীবনের স্বাদ দিচ্ছিল। এখানে বাইরের সেই রাজনৈতিক অস্থিরতা নেই, সভার কোলাহল নেই, নেই সংবাদপত্রের বিরামহীন ব্যস্ততা। এখানে আছে কেবল আমি, আমার নির্জনতা এবং আমার অন্তহীন চিন্তা।

মাঝরাতে একবার জানালার শিকের পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। আকাশে মেঘের আড়ালে চাঁদটি ডুব দিচ্ছিল আবার পরক্ষণেই ভেসে উঠছিল। কেল্লার প্রাঙ্গণে প্রহরীদের বুটের খটখট শব্দ মাঝেমধ্যে নৈঃশব্দ্য ভেঙে দিচ্ছিল। সেই মুহূর্তে আমার এক গভীর উপলব্ধি হলো—আসলে বন্দিত্ব একটি শারীরিক অবস্থা মাত্র, কিন্তু মানুষের মুক্তি হলো তার মানসিক সক্ষমতা। শরীরকে লোহার শিকল দিয়ে দেয়ালের সাথে বেঁধে রাখা যায়, কিন্তু মানুষের মুক্ত চিন্তার পাখিকে কোনো পিঞ্জরেই বন্দি করা সম্ভব নয়। আমি যখন চোখ বন্ধ করলাম, তখন আমি নিজেকে মক্কার পবিত্র ধুলোমাখা পথে অথবা দিল্লির জামে মসজিদের সুউচ্চ মিনারের পাদদেশে বিচরণ করতে দেখছিলাম।

এই প্রথম দিনটি শেষ হলো এক অদ্ভুত ও স্বর্গীয় প্রশান্তি নিয়ে। আমি জানি, সামনের দিনগুলো সহজ হবে না। বাইরের পৃথিবী থেকে এই বিচ্ছিন্নতা হয়তো অনেকের জন্য যন্ত্রণাদায়ক হতে পারে, কিন্তু আমি এই নিঃসঙ্গতাকে এক মহান সুযোগ হিসেবে বরণ করে নিয়েছি। আমার প্রিয় বন্ধু, আপনি আমার জন্য দুশ্চিন্তা করবেন না। আমি এখানে একা নই, আমার সাথে আছে কয়েক হাজার বছরের মানব ইতিহাস এবং আমার নিজের অবিচল আত্মবিশ্বাস।

আজকের মতো এখানেই ইতি টানছি। এই অন্ধকার দুর্গের প্রকোষ্ঠ থেকে আপনাকে জানাই আমার আন্তরিক ভালোবাসা ও সালাম।

আপনার(একনিষ্ঠ) বন্ধু,

আবুল কালাম

২. চিঠিপত্র বিনিময়ে নিষেধাজ্ঞা (ইনকিতা-এ-মুরাসিলাত) / انقطاعِ مراسلت (১৩ সেপ্টেম্বর ১৯৪২: বাইরের জগতের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া নিয়ে দার্শনিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়া।)

চিঠিপত্র বিনিময়ে নিষেধাজ্ঞা (ইনকিতা-এ-মুরাসিলাত)

তারিখ: ১৩ সেপ্টেম্বর, ১৯৪২

সম্মানিত বন্ধু (সাদিক-এ-মুকাররম),

আপনার হয়তো মনে আছে, ১ নম্বর চিঠিতে আমি লিখেছিলাম যে ১০ আগস্ট সকালে যখন আমরা এই দুর্গে পৌঁছলাম, তখনই আমাদের জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল—বাইরের দুনিয়ার সাথে আমাদের সমস্ত যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। আজ এক মাসের বেশি সময় পার হয়ে গেল, আপনার কোনো খবর আমার কাছে নেই এবং আমার কোনো কথা আপনার কাছে পৌঁছানোরও কোনো বৈধ পথ নেই। এই যে ‘যোগাযোগহীনতা’ বা ‘ইনকিতা-এ-মুরাসিলাত’, এটি কেবল একটি সরকারি আদেশ নয়, বরং এটি একজন মানুষের জন্য এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষা।

সাধারণত মানুষ যখন বন্দি হয়, তখন সে তার আত্মীয়-স্বজন বা বন্ধুদের চিঠির প্রতীক্ষায় দিন গুনে। জেলখানায় ডাকপিয়নের আগমন বন্দিদের কাছে ঈদের আনন্দের মতো। কিন্তু আমাদের ক্ষেত্রে সেই আশার দুয়ারটি আগে থেকেই তালাবদ্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ব্রিটিশ সরকার মনে করেছে, আমাদের কলম আর কাগজ কেড়ে নিলে বা আমাদের চিঠিপত্র বন্ধ করে দিলে তারা আমাদের স্তব্ধ করে দিতে পারবে। কিন্তু তারা জানে না, মানুষের মন যখন বাইরের জগত থেকে বিমুখ হয়, তখন সে তার নিজের ভেতরের বিশাল জগতের দিকে মনোনিবেশ করে।

আমি যখন দেখি যে আমার কোনো চিঠি আপনার কাছে পৌঁছাবে না, তখন আমি এক অদ্ভুত স্বাধীনতা অনুভব করি। কারণ, যখন মানুষ জানে যে তার লেখা কেউ পড়বে না, তখন সে আরও বেশি অকপট হতে পারে। আমার এই ডায়েরি বা এই চিঠিপত্রগুলো এখন আর কোনো প্রথাগত বার্তা নয়, বরং এগুলো আমার আত্মার সাথে আমার কথোপকথন। আমি এখন আপনার কাল্পনিক উপস্থিতি অনুভব করি এবং আমার মনের সমস্ত অর্গল খুলে দিই।

বন্ধুর সাথে কথা বলার জন্য সবসময় কাগজের টুকরো বা কালির প্রয়োজন হয় না। এই যে নির্জনতা আমাকে গ্রাস করতে চেয়েছিল, আমি সেই নির্জনতাকেই আমার শ্রেষ্ঠ সম্পদে পরিণত করেছি। এখন আমার কাছে সময়ের কোনো হিসাব নেই, কারণ এখানে প্রতিটি দিনই অন্য দিনের মতো। বাইরের পৃথিবী হয়তো অনেক বদলে গেছে এই এক মাসে, কিন্তু এই দুর্গের প্রাচীরের ভেতরে সময় যেন স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

মানুষ সাধারণত একাকীত্বকে ভয় পায়, কারণ সে নিজেকে সহ্য করতে পারে না। সে সবসময় চায় অন্য কারও সাহচর্য, যাতে নিজের শূন্যতা পূরণ করা যায়। কিন্তু আমার কাছে এই একাকীত্ব এক অসামান্য নেয়ামত। আমি যখন দেখি যে জেলের গেটে দস্তখত করার জন্য কোনো চিঠির ফাইল আসছে না, তখন আমার মনে হয় বাইরের জগতের সমস্ত কৃত্রিমতা থেকে আমি মুক্তি পেয়েছি। এখন আমি এবং আমার চিন্তা—আমরা একে অপরের অবিচ্ছেদ্য সাথী।

সাহিত্য ও দর্শনের ইতিহাসে যত বড় বড় কাজ হয়েছে, তার অধিকাংশই নির্জনবাসের ফল। আপনি যখন মানুষের ভিড়ে থাকেন, তখন আপনি অন্যের ভাষায় কথা বলেন। কিন্তু যখন আপনি একা থাকেন, তখন আপনি নিজের আত্মার ভাষা শুনতে পান। আমি এই দুর্গের দেয়ালে কান পাতলে ইতিহাসের সেইসব মানুষদের কণ্ঠস্বর শুনতে পাই, যারা শত বছর আগে এখানে একই পরিস্থিতিতে দিন কাটিয়েছেন।

আমি বুঝতে পারছি, ব্রিটিশরা আমাদের শাস্তি দেওয়ার জন্য এই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার ব্যবস্থা করেছে। কিন্তু তারা জানে না, একজন চিন্তাশীল মানুষের জন্য নির্জনতার চেয়ে বড় কোনো পুরস্কার হতে পারে না। আমি এখন আমার মনের ক্যানভাসে সেইসব স্মৃতি আঁকতে পারি, যা বাইরের ব্যস্ততায় ধুলো পড়ে গিয়েছিল। আমি আপনার সাথে কথা বলি, কাল্পনিক তর্কে লিপ্ত হই, আর এভাবেই আহমেদনগর দুর্গের এই নিঃসঙ্গ দুপুরগুলো অর্থবহ হয়ে ওঠে।

প্রিয় বন্ধু, জীবনের সার্থকতা কেবল মানুষের সাথে মেলামেশায় নয়, বরং নিজের সাথে পরিচিত হওয়াতেও রয়েছে। এই নিষেধাজ্ঞা আমাকে সেই সুযোগটিই করে দিয়েছে। এখন আমার কলম কোনো বাহ্যিক চাপের মুখে নয়, বরং নিজের ভেতরের তাগিদ থেকে চলছে।

মানুষের স্বভাব হলো, সে যখন কোনো জিনিসের অভাব বোধ করে, তখনই সে তার মূল্য বুঝতে পারে। আমি যখন বাইরের জগতে ছিলাম, তখন আপনার চিঠি আসাটা ছিল এক স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু আজ এখানে সেই স্বাভাবিকতাটুকু নেই বলেই প্রতিটি মুহূর্ত এক নতুন অর্থ নিয়ে আমার সামনে হাজির হচ্ছে। আমি এখন বুঝতে পারছি যে, জগতের সমস্ত আয়োজন আসলে মানুষের মনের ওপর নির্ভরশীল। মন যদি শান্ত থাকে, তবে কারাগারও আরামের বাগান হয়ে ওঠে; আর মন যদি অশান্ত থাকে, তবে রাজপ্রাসাদও দমবন্ধ করা জেলখানা।

আমি এই বন্দিত্বের এক মাস পূর্ণ করার পর উপলব্ধি করছি যে, এই যে চিঠিপত্র বিনিময়ে নিষেধাজ্ঞা—এটি আমাকে এক বড় সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। সত্যটি হলো, মানুষের আত্মা কোনো মাধ্যমের মুখাপেক্ষী নয়। আমি আজ আপনার চিঠি পড়ছি না ঠিকই, কিন্তু আপনার চিন্তার যে সুর আমার হৃদয়ে আগে থেকেই অনুরণিত ছিল, তা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

পরিশেষে শুধু এটুকু বলব, যারা মনে করেছিল আমাদের কলম থামিয়ে দিয়ে তারা আমাদের নিঃশেষ করে দেবে, তারা বোকার স্বর্গে বাস করছে। কলম হয়তো সাময়িকভাবে থেমেছে, কিন্তু হৃদয়ের স্পন্দন তো থামেনি। এই যে আমি প্রতিদিন আপনার কাছে কল্পনায় এই চিঠিগুলো লিখছি, এটিই আমার সবচেয়ে বড় বিজয়।

আপনার জন্য দোয়া ও ভালোবাসা রইল। আশা করি, কোনো এক সুপ্রভাতে আমাদের এই নীরবতার অবসান ঘটবে।

আপনার (একনিষ্ঠ) বন্ধু,

আবুল কালাম

৩. নিঃসঙ্গতা ও একাকীত্বের দর্শন (ফালসাফা-এ-উজলাত-ও-তানহাই) / فلسفہٴ عزلت و تنہائی (১৬ সেপ্টেম্বর ১৯৪২: নির্জনবাসের গুরুত্ব এবং একাকীত্বের আধ্যাত্মিক ও মানসিক বিশ্লেষণ।)

নিঃসঙ্গতা ও একাকীত্বের দর্শন (ফালসাফা-এ-উজলাত-ও-তানহাই)

তারিখ: ১৬ সেপ্টেম্বর, ১৯৪২

সম্মানিত বন্ধু (সাদিক-এ-মুকাররম),

আজ সকালে যখন ঘুম ভাঙল, তখন মনে হলো একাকীত্বের এই জগতটি কত বিশাল এবং নিস্তব্ধ। গত এক মাস ধরে এই চার দেয়ালের ভেতরে আমি যা অনুভব করেছি, তাকে এক কথায় ‘নির্জনতার উৎসব’ বলা যেতে পারে। দুনিয়ার সাধারণ দৃষ্টিতে আমি এখানে বন্দি এবং একা, কিন্তু দর্শনের দৃষ্টিতে দেখলে আমি এখন এক জনাকীর্ণ জগতের অধিবাসী, যেখানে কেবল আমার চিন্তা আর চেতনার মানুষরা বিচরণ করে।

একাকীত্ব বা ‘তানহাই’ শব্দটিকে আমরা সাধারণত নেতিবাচক অর্থে ব্যবহার করি। আমরা মনে করি, মানুষ যখন একা হয়ে যায়, তখন সে নিঃস্ব হয়ে পড়ে। কিন্তু সত্য হলো—মানুষ যখন নিজেকে ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে ফেলে, তখনই সে আসলে সবচেয়ে বেশি নিঃস্ব হয়। কারণ তখন সে আর নিজের থাকে না, সে হয়ে ওঠে সামাজিকতার এক কৃত্রিম পুতুল। আমি এখানে সেই কৃত্রিমতা থেকে মুক্ত। এখন আমি যে কথাগুলো বলছি বা চিন্তা করছি, তাতে কোনো প্রদর্শনী নেই, কোনো লৌকিকতা নেই।

প্রাচীনকালের মহান দার্শনিক এবং আধ্যাত্মিক সাধকগণ কেন পাহাড়ের গুহায় বা মরুভূমির নির্জনে চলে যেতেন, তা আজ আমি মর্মে মর্মে উপলব্ধি করছি। নির্জনতা বা ‘উজলাত’ হলো আত্মার সেই আয়না, যেখানে মানুষ তার নিজের আসল চেহারা দেখতে পায়। ভিড়ের মাঝে আমরা সবসময় একটি মুখোশ পরে থাকি, কিন্তু এই দুর্গের নিঃসঙ্গ প্রকোষ্ঠে সেই মুখোশ খুলে রাখার সুযোগ মিলেছে।

আহমেদনগর দুর্গের এই নিস্তব্ধতা আমাকে ভয় দেখায় না, বরং এটি আমাকে সাহস যোগায়। আমি যখন এই পাথুরে দেয়ালগুলোর দিকে তাকাই, তখন আমার মনে হয় এগুলো কোনো জড় বস্তু নয়, বরং এগুলো আমার গোপন কথার বিশ্বস্ত সাথী। মানুষ যখন অন্য মানুষের থেকে দূরে সরে যায়, তখনই সে প্রকৃতির এবং সত্যের অধিক নিকটবর্তী হতে পারে।

মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো এই যে, সে একা থাকতে ভয় পায়। সে মনে করে একাকীত্ব মানেই হলো কোনো শূন্যতা বা কোনো কিছু হারিয়ে ফেলা। কিন্তু দর্শনের দৃষ্টিতে, একাকীত্ব হলো পূর্ণতা। আমি যখন মানুষের সংস্পর্শে থাকি, তখন আমি আমার ব্যক্তিত্বের কেবল একটি অংশ প্রকাশ করি—যে অংশটি সমাজ দেখতে চায়। কিন্তু যখন আমি নির্জনে থাকি, তখন আমি আমার সমস্ত সীমাবদ্ধতা আর শক্তি নিয়ে নিজের সামনে এসে দাঁড়াই।

আধ্যাত্মিকতার জগতে একেই বলা হয় ‘মুরাকাবা’ বা আত্মমগ্নতা। মনের সব কোলাহল যখন স্তিমিত হয়ে আসে, তখনই সত্যের অস্পষ্ট কণ্ঠস্বর শোনা যায়। আমি এই আহমেদনগর দুর্গের নিস্তব্ধতাকে কোনো শাস্তি হিসেবে দেখছি না, বরং আমি একে দেখছি এক ঐশ্বরিক অবসর হিসেবে। এখানে এসে আমি নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করছি। আমার শৈশবের স্মৃতি, আমার কৈশোরের সেই জ্ঞানতৃষ্ণা এবং আমার পরিণত বয়সের রাজনৈতিক সংগ্রাম—সবকিছুই এখন আমার স্মৃতির আয়নায় খুব স্পষ্টভাবে ধরা দিচ্ছে।

আপনি হয়তো ভাবছেন, এই নিস্তব্ধ কেল্লায় আমার সময় কাটে কীভাবে? আসলে যার কাছে চিন্তা করার মতো বিষয় আছে, তার কাছে সময়ের অভাব নেই। আমি যখন আমার পড়ার টেবিলের সামনে বসি, তখন আমার মনে হয় গ্রিক দার্শনিক থেকে শুরু করে সুফি সাধকগণ সবাই আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। আমি তাদের সাথে কথা বলি, তাদের যুক্তিগুলো বিশ্লেষণ করি। এই যে মানস-ভ্রমণ, এটি কেবল নির্জনবাসেই সম্ভব।

ভিড়ের মধ্যে মানুষ কেবল ‘প্রতিক্রিয়া’ দেখায়, কিন্তু নির্জনে মানুষ ‘চিন্তা’ করতে শেখে। বাইরের জগতের ব্যস্ততা আমাদের কাছ থেকে আমাদের মৌলিকত্ব কেড়ে নেয়। আমরা অন্যের মতো হওয়ার চেষ্টায় নিজের সত্তাকে বিসর্জন দিই। কিন্তু এই কারাগার আমাকে আমার সেই হারানো সত্তাকে ফিরিয়ে দিয়েছে। আজ আমি বলতে পারি, আমি আগের চেয়ে অনেক বেশি স্বাধীন। কারণ আমার চিন্তার ওপর এখন কারোর নিয়ন্ত্রণ নেই।

নির্জনতার একটি বড় গুণ হলো এই যে, এটি মানুষকে অভিযোগমুক্ত করে তোলে। যখন আমরা মানুষের সাথে থাকি, তখন আমাদের সমস্ত শক্তি ব্যয় হয় অন্যদের দোষ ধরায় অথবা অন্যের কাছ থেকে পাওয়া আঘাতের বিচার করায়। কিন্তু এখানে, এই আহমেদনগর দুর্গের নিঃসঙ্গ প্রকোষ্ঠে আমার কোনো প্রতিপক্ষ নেই, কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী নেই। আমি নিজেই নিজের বিচারক।

আমি এখন বুঝতে পারছি যে, ‘একাকীত্ব’ আসলে একটি আশীর্বাদ, যদি মানুষ তা সঠিকভাবে ব্যবহার করতে শেখে। যে মানুষ একা থাকতে জানে না, সে আসলে নিজেকেই চেনে না। আমি যখন এই নিস্তব্ধতায় ডুব দিই, তখন আমার মনে হয় পৃথিবীটা কত বিশাল এবং রহস্যময়। এই যে কেল্লার পাথুরে দেয়াল, মাথার ওপরের মুক্ত আকাশ—সবকিছুই যেন আমার সাথে ফিসফিস করে কথা বলছে।

একাকীত্ব আমাকে শিখিয়েছে যে, জীবনের আসল আনন্দ বাইরের কোনো বস্তুতে নয়, বরং নিজের অন্তরের প্রশান্তিতে নিহিত। আমি যদি এই একাকীত্বকে ভয় পেতাম, তবে এই কারাগার আমার জন্য নরক হয়ে উঠত। কিন্তু আমি যেহেতু একে আপন করে নিয়েছি, তাই এই বন্দিশালা এখন আমার জন্য এক নির্জন আশ্রম (খানকাহ)।

প্রিয় বন্ধু, আমি জানি না আপনার ওখানে সময় কেমন কাটছে, কিন্তু আমি এখানে সময়ের প্রতিটি মুহূর্তকে এক নতুন চেতনায় উপভোগ করছি। যখন মুক্তি পাব, তখন হয়তো এই একাকীত্বের দিনগুলোর কথা ভেবে দীর্ঘশ্বাস ফেলব। কারণ মানুষের ভিড়ে ফিরে গিয়ে আমি হয়তো আবারও নিজেকে হারিয়ে ফেলব।

আজকের মতো বিদায় নিচ্ছি। এই নিঃসঙ্গ মুহূর্তগুলো আমার দোয়া ও চিন্তায় আপনার জন্য সবসময় বরাদ্দ থাকে।

আপনার (একনিষ্ঠ) বন্ধু,

আবুল কালাম

৪. দুঃখ ও বেদনার স্বরূপ (গম-ও-আন্দোহ) / غم و اندوہ (১৩ সেপ্টেম্বর ১৯৪২: জীবনের দুঃখ-কষ্টকে গ্রহণ করার মানসিক শক্তি এবং দুঃখের দার্শনিক গুরুত্ব।)

দুঃখ ও বেদনার স্বরূপ (গম-ও-আন্দোহ)

তারিখ: ১৩ সেপ্টেম্বর, ১৯৪২

সম্মানিত বন্ধু (সাদিক-এ-মুকাররম),

মানুষের জীবনে দুঃখ এবং বেদনাকে আমরা সাধারণত অনাকাঙ্ক্ষিত মনে করি। আমরা সবসময় সুখের পেছনে ছুটি এবং দুঃখ থেকে দূরে থাকতে চাই। কিন্তু গত কয়েকদিনের নিস্তব্ধতা আর এই কারাজীবনের নির্জনতা আমাকে জীবন সম্পর্কে এক ভিন্ন সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। আমি আজ উপলব্ধি করছি যে, দুঃখ কেবল যন্ত্রণার নাম নয়, বরং এটি মানুষের আত্মার জন্য এক গভীর পরিচ্ছন্নতা অভিযান।

দুঃখ বা ‘গম’ যখন মানুষের হৃদয়ে প্রবেশ করে, তখন সে মানুষের ভেতরের সমস্ত লৌকিকতা আর অহংকার পুড়িয়ে ছাই করে দেয়। মানুষ যখন সুখে থাকে, তখন সে বহহিমুখী হয়; সে বাইরের জগতের চাকচিক্য নিয়ে মত্ত থাকে। কিন্তু দুঃখ তাকে অন্তর্মুখী হতে বাধ্য করে। সে নিজের সত্তার সেই গভীর অন্ধকার গলিগুলোতে আলো ফেলার সুযোগ পায়, যা সুখের দিনে কখনও সম্ভব ছিল না।

আমার এই বন্দি জীবনের একাকীত্ব আমাকে কোনো বিষণ্ণতা দেয়নি, বরং দিয়েছে এক ধরনের বিষাদমাখা আনন্দ। আপনি হয়তো ভাবছেন দুঃখের মাঝে আবার আনন্দ কিসের? আসলে এটি সেই আনন্দ, যা মানুষ তখনই পায় যখন সে সমস্ত জাগতিক চাহিদা থেকে মুক্ত হয়ে নিজের হৃদয়ের আয়নায় সত্যকে দেখতে পায়। ফারসি কবিরা যাকে ‘শোক-এ-গম’ বা দুঃখের উৎসব বলেছেন, আমি আজ তার মর্ম বুঝতে পারছি।

এই যে আমাদের বন্দি করে রাখা হয়েছে, এটি অনেকের কাছে চরম যন্ত্রণার হতে পারে। কিন্তু যদি আপনি আপনার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে ফেলেন, তবে দেখবেন—এই দুঃখই আপনাকে আধ্যাত্মিক পূর্ণতার পথে এগিয়ে দিচ্ছে। মানুষ যখন পৃথিবীতে আসে, সে কান্নার মাধ্যমে নিজের অস্তিত্ব ঘোষণা করে। সুতরাং দুঃখ মানুষের জন্মগত সাথী। একে ঘৃণা করে বা একে এড়িয়ে চলে জীবনের পূর্ণতা পাওয়া অসম্ভব।

আমি মনে করি, জীবনের প্রতিকূলতা বা দুঃখের সময়গুলোতে মানুষের প্রকৃত চরিত্রের পরীক্ষা হয়। মানুষ যখন সচ্ছলতায় থাকে, তখন তার সহনশীলতা বা ধৈর্য প্রকাশ করার প্রয়োজন পড়ে না। কিন্তু যখন সে সব দিক থেকে অন্ধকার দেখে, তখনই তার ভেতরের আলোকবর্তিকাটি জ্বলে ওঠে। আহমেদনগর দুর্গের এই নিঃসঙ্গ দিনগুলো আমার সামনে এক বড় সত্য উন্মোচিত করেছে—তা হলো, দুঃখকে যদি আপনি ভয় না পেয়ে তাকে স্বাগত জানান, তবে সে আপনার জন্য এক নতুন শক্তির উৎস হয়ে দাঁড়াবে।

আরবি কবিতায় একটি চমৎকার ভাব রয়েছে—”বিপদের তীব্রতাই তার অবসানের সুসংবাদ দেয়।” যখন অন্ধকার গভীরতম হয়, তখনই ভোরের আগমনী বার্তা শোনা যায়। আমাদের এই কারাজীবনের যে মানসিক চাপ বা বাইরের জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার যে বেদনা, তাকে আমি কেবল সহ্য করছি না, বরং আমি তাকে উপভোগ করছি। কারণ, এই বেদনা আমাকে শেখাচ্ছে কীভাবে জীবনের কঠিনতম মুহূর্তেও নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে হয়।

যিনি দুঃখের স্বাদ গ্রহণ করেননি, তিনি সুখের প্রকৃত মর্ম বুঝতে অসমর্থ। জীবন কেবল হাসিখুশি আর উৎসবের নাম নয়; বরং জীবন হলো আলো ও ছায়ার এক নিপুণ সংমিশ্রণ। আমি যখন এই দুর্গের পাথুরে দেয়ালগুলোর দিকে তাকাই, তখন আমার মনে হয় এগুলো কেবল জড় পাথর নয়, বরং হাজার বছরের অসংখ্য মানুষের নিঃশ্বাস আর বেদনার সাক্ষী।

আমার প্রিয় বন্ধু, আপনাকে এই কথাগুলো লেখার উদ্দেশ্য হলো এই যে, আপনি যেন আমার জন্য কোনো অনুকম্পা বা দুঃখ বোধ না করেন। আমি এখানে আমার সমস্ত দুঃখকে আমার চিন্তার হাতিয়ার বানিয়ে নিয়েছি। যে মানুষ নিজের মনের ওপর রাজত্ব করতে পারে, কারাগারের দেয়াল তাকে বন্দি করতে পারে না। আমি এখন এমন এক উচ্চতায় দাঁড়িয়ে আছি যেখানে দুঃখের ঝাপটা আমাকে স্পর্শ করলেও বিচলিত করতে পারে না।

পরিশেষে আমি বলতে চাই, দুঃখকে জয় করার একমাত্র উপায় হলো তাকে তুচ্ছজ্ঞান করা। যখন আপনি কোনো দুঃখকে নিজের ওপর আধিপত্য বিস্তার করতে দেন, তখনই সে আপনাকে দুর্বল করে ফেলে। কিন্তু যখন আপনি বুক টান করে দাঁড়িয়ে তাকে বলেন—’তুমি এসো, আমি তোমাকে আলিঙ্গন করতে প্রস্তুত’, তখনই দুঃখ তার ধার হারিয়ে ফেলে।

আহমেদনগর দুর্গের এই নিঃসঙ্গ দিনগুলোতে আমি যখন আমার জীবন ও দর্শনের হিসাব মেলাতে বসি, তখন দেখি যে আমার জীবনের শ্রেষ্ঠতম সৃষ্টিগুলো তখনই জন্ম নিয়েছে যখন আমি কোনো না কোনো গভীর বেদনার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলাম। শিল্প ও সাহিত্য আসলে মানুষের হৃদয়ের রক্তক্ষরণেরই এক নান্দনিক প্রকাশ। তাই আমি এই বন্দিত্বের ‘গম’ বা দুঃখকে আমার জীবনের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হিসেবে দেখছি।

প্রিয় বন্ধু, আপনি হয়তো শুনে অবাক হবেন যে, আমি এই চার দেয়ালের ভেতরও এক প্রকার আনন্দের সন্ধান পেয়েছি। এটি সেই আনন্দ নয় যা উৎসবের কোলাহলে পাওয়া যায়, বরং এটি সেই প্রশান্তি যা কেবল সত্যের সন্ধানী মানুষেরাই অনুভব করতে পারে। মানুষের আত্মা যখন বাইরের সমস্ত পিঞ্জর ছিঁড়ে নিজের গভীরে প্রবেশ করে, তখন সে এক অনাবিল স্বস্তির দেখা পায়।

আশা করি আমার এই চিঠি যখন আপনার কাছে পৌঁছাবে (যদি কোনোদিন পৌঁছায়), তখন আপনি বুঝতে পারবেন যে আপনার বন্ধু এই দুর্গের পাথুরে দেয়ালগুলোর মাঝেও হার মেনে নেয়নি। আমার চিন্তার প্রদীপ এখানে আগের চেয়েও বেশি উজ্জ্বল হয়ে জ্বলছে।

আপনার কুশল কামনা করে আজকের মতো এখানেই শেষ করছি।

আপনার (একনিষ্ঠ) বন্ধু,

আবুল কালাম

৫. কারাজীবনের দিনরাত্রি (মাশাগাল-এ-শব-ও-রোজ) / مشاغلِ شب ও روز (১৬ সেপ্টেম্বর ১৯৪২: আহমেদনগর দুর্গের বন্দি জীবনের প্রাত্যহিক রুটিন এবং সময়ের সদ্ব্যবহার নিয়ে আলোচনা।)

কারাজীবনের দিনরাত্রি (মাশাগাল-এ-শব-ও-রোজ)

তারিখ: ১৬ সেপ্টেম্বর, ১৯৪২

সম্মানিত বন্ধু (সাদিক-এ-মুকাররম),

আপনি হয়তো জানতে চাইবেন এই নির্জন দুর্গে আমার দিনগুলো কীভাবে কাটে। মানুষের স্বভাব হলো সে সময়ের অভাব নিয়ে অভিযোগ করে, কিন্তু যখন তাকে অখণ্ড অবসর দেওয়া হয়, তখন সে বুঝতে পারে না সেই সময়কে কীভাবে খরচ করতে হয়। আমার কাছে সময়ের মূল্য সবসময়ই অপরিসীম ছিল, আর এই কারাজীবন সেই মূল্যবোধকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

আমার দিন শুরু হয় ভোরের অনেক আগে। যখন চারপাশের জগৎ নিবিড় ঘুমে মগ্ন, যখন এমনকি প্রহরীদের বুটের শব্দও ঝিমিয়ে আসে, ঠিক সেই মুহূর্তে আমি শয্যা ত্যাগ করি। ভোরের সেই নিস্তব্ধতা আমার কাছে ইবাদতের মতোই পবিত্র মনে হয়। আমি মনে করি, দিনের প্রথম প্রহরটি হলো আত্মার খোরাক সংগ্রহের সময়। এক কাপ চা আর আমার প্রিয় কোনো বই—এই হলো আমার ভোরের সঙ্গী। আপনি তো জানেন, চায়ের সাথে আমার সম্পর্কটি কেবল তৃষ্ণা মেটানোর নয়, এটি আমার চিন্তার জ্বালানি।

সূর্য ওঠার পর যখন দিনের আলো এই দুর্গের পাথুরে দেয়ালে আছড়ে পড়ে, তখন আমি আমার পড়ার টেবিলে গিয়ে বসি। জেলখানায় আমাদের চলাফেরার স্বাধীনতা নেই ঠিকই, কিন্তু পড়ার টেবিলে বসলে আমি অনুভব করি যে সারা বিশ্বের জ্ঞানভাণ্ডার আমার সামনে উন্মুক্ত। আমি এক বই থেকে অন্য বইয়ে, এক যুগ থেকে অন্য যুগে ঘুরে বেড়াই। ইতিহাসের পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে আমার মনেই থাকে না যে আমি একজন বন্দি।

দুপুরের দিকে যখন রোদ কড়া হয়, তখন আমি কিছুটা সময় লেখালেখির জন্য রাখি। আপনি যে চিঠিগুলো পড়ছেন (বা ভবিষ্যতে পড়বেন), তার অধিকাংশই এই মধ্যাহ্নের নিস্তব্ধতায় লেখা। অনেকে মনে করেন জেলখানায় সময় কাটানো মানেই হলো অলসতা বা কেবল মুক্তির প্রহর গোনা। কিন্তু আমি মনে করি, অলসতা হলো আত্মার মৃত্যু। আমি প্রতিটি সেকেন্ডকে কোনো না কোনো সৃজনশীল কাজে নিয়োজিত রাখার চেষ্টা করি। এমনকি যখন আমি চুপচাপ বসে থাকি, তখনও আমার মস্তিষ্ক কোনো না কোনো জটিল দার্শনিক সমস্যার সমাধানে লিপ্ত থাকে।

“দুপুরের খাবারের পর আমি কিছুটা সময় বিশ্রাম নিই, তবে তা কখনোই গভীর নিদ্রা নয়। এরপর শুরু হয় আমার জীবনের এক বিশেষ শখ—বাগান পরিচর্যা। আপনি জেনে খুশি হবেন যে, এই শুষ্ক ও পাথুরে কেল্লার এক কোণে আমি ছোট একটি বাগান গড়ে তোলার চেষ্টা করছি। মাটির সাথে এই সংযোগ আমাকে এক অদ্ভুত প্রশান্তি দেয়। যখন আমি দেখি একটি ছোট্ট বীজ থেকে অঙ্কুর বের হচ্ছে, তখন আমার মনে হয় জীবনের শক্তি কোনো দেয়াল বা শিকল দিয়ে চেপে রাখা যায় না। এই চারাগুলোর বেড়ে ওঠা দেখা আমার কাছে স্বাধীনতার এক প্রতীকী রূপ।

বিকেলের সময়টুকু আমি সাধারণত জওহরলাল (নেহরু) এবং অন্যান্য বন্ধুদের সাথে কাটাই। আমরা যখন দুর্গের উঠানে হাঁটাহাঁটি করি, তখন আমাদের আলোচনা কেবল রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ থাকে না। আমরা বিশ্ব ইতিহাস, বিজ্ঞান এবং সাহিত্য নিয়ে দীর্ঘ আলাপ করি। এই আলোচনাগুলো আমাকে মনে করিয়ে দেয় যে, আমরা এখানে কেবল রাজনৈতিক বন্দি নই, বরং আমরা এক একটি চলমান লাইব্রেরি।

সন্ধ্যা নামার সাথে সাথে যখন আমাদের পুনরায় কামরায় বন্দি করা হয়, তখন শুরু হয় আমার রাতের অধ্যায়। রাতের এই নির্জনতা ভোরের চেয়েও গভীর। লণ্ঠনের মৃদু আলোয় যখন আমি পড়তে বসি, তখন মনে হয় আমি এই পৃথিবীর বাইরের কোনো জগতের বাসিন্দা। রাতের এই সময়টুকু আমি গভীর দর্শনের বই পড়ার জন্য তুলে রাখি।

অনেকে আমাকে জিজ্ঞেস করেন, ‘মাওলানা, এই একই রুটিনে আপনার একঘেয়েমি লাগে না?’ আমি তাদের বলি, একঘেয়েমি কেবল তাদেরই লাগে যাদের ভেতরে কোনো জগত নেই। আমার ভেতরে যে জগতটি আছে, তা এতই বিশাল যে সেখানে কোনোদিন একঘেয়েমি প্রবেশ করতে পারে না। প্রতিটি দিন আমার কাছে একটি নতুন পৃষ্ঠা, যা আমি নতুন জ্ঞান আর অভিজ্ঞতা দিয়ে লিখে রাখতে চাই।”

“রাতের শেষ প্রহরে যখন আমি কলম থামিয়ে শুতে যাই, তখন আমার মনে হয় আমি আজকের দিনটিকে বৃথা যেতে দিইনি। সময়ের এই শৃঙ্খলা আমাকে এক প্রকার মানসিক সার্বভৌমত্ব দান করেছে। বাইরের জগত হয়তো আমাকে ‘অসহায় বন্দি’ বলে মনে করতে পারে, কিন্তু আমার এই প্রতিদিনের রুটিন আমাকে প্রমাণ দেয় যে—আমি আমার সময়ের মালিক, আমি আমার চিন্তার অধিপতি।

আসলে মানুষ যখন কোনো বড় উদ্দেশ্য নিয়ে বাঁচে, তখন তার কাছে আরাম-আয়েশ গৌণ হয়ে যায়। আমি যদি এখানে বসে কেবল মুক্তির দিন গুনতাম, তবে প্রতিটি দিন আমার কাছে পাহাড়ের মতো ভারী মনে হতো। কিন্তু আমি মুক্তির কথা ভাবি না, আমি ভাবি আমি আজ নতুন কী শিখলাম। এই যে জ্ঞান আর আত্মিক সাধনার নিরন্তর প্রচেষ্টা, এটিই কারাজীবনের সমস্ত গ্লানি মুছে দেয়।

প্রিয় বন্ধু, আপনি আমার জন্য যে দোয়া করেন, তা আমি এখান থেকেই অনুভব করতে পারি। আমাদের এই বিচ্ছিন্নতা বাহ্যিক মাত্র; আত্মার দিক থেকে আমরা সবসময় একসাথেই আছি। আজ যখন আমি ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছি, তখন আমার মনে হচ্ছে এই নিস্তব্ধ কেল্লা যেন আমাকে কানে কানে বলছে—’অপেক্ষা করো, আলো আসবেই।’

আপনার মঙ্গল কামনায় আজকের মতো ইতি টানছি।

আপনার (একনিষ্ঠ) বন্ধু,

আবুল কালাম

 

৬. চায়ের ইতিহাস ও ইতিবৃত্ত (দাস্তান-এ-চায়) / داستانِ چائے (১৭ সেপ্টেম্বর ১৯৪২: চায়ের আবিষ্কারের প্রাচীন ইতিহাস, কিংবদন্তি এবং মওলানার শৈশবের স্মৃতি।)

চায়ের ইতিহাস ও দর্শন (ফালসাফা-এ-চা)

তারিখ: ১৭ সেপ্টেম্বর, ১৯৪২

সম্মানিত বন্ধু (সাদিক-এ-মুকাররম),

আমার পূর্বের চিঠিতে আমি উল্লেখ করেছিলাম যে, এই আহমেদনগর দুর্গের জীবনে চা আমার এক পরম সঙ্গী। আজ ভাবলাম এই ‘চা’ নিয়ে আপনার সাথে কিছুটা বিস্তারিত আলোচনা করা যাক। আপনি তো জানেন, সাধারণ মানুষের কাছে চা কেবল একটি পানীয়, কিন্তু আমার কাছে এটি একটি শিল্প এবং একটি গভীর জীবনদর্শন।

চায়ের ইতিহাস অনেক পুরনো এবং রহস্যময়। বলা হয়ে থাকে, এর আদি জন্মভূমি হলো চীন। বহু শতাব্দী আগে চীনের এক বৌদ্ধ সন্ন্যাসী যখন ধ্যানে বসার সময় ঘুমের তাড়নায় বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছিলেন, তখন তিনি পাহাড়ের একটি বিশেষ গাছের পাতা চিবিয়ে এক অদ্ভুত সজীবতা অনুভব করেন। সেই পাতাটিই ছিল চা। এরপর থেকে সাধক ও জ্ঞানীদের কাছে চা হয়ে ওঠে নির্জনবাস আর রাত জাগার এক প্রধান অবলম্বন।

আমি যখন ভোরে লণ্ঠনের আলোয় চায়ের কাপে চুমুক দিই, তখন আমার মনে হয় আমি সেই প্রাচীন চীনা ঋষিদেরই উত্তরাধিকার বহন করছি। চায়ের এই যে সজীবতা প্রদান করার ক্ষমতা, এটি কেবল শরীরের ক্লান্তি দূর করে না, বরং এটি মনের জড়তাকেও কাটিয়ে দেয়। আমার মতে, চা হলো চিন্তাশীল মানুষের পানীয়। কফি যেমন মানুষকে কিছুটা উত্তেজিত করে, চা তেমন নয়; চা মানুষকে দেয় এক শান্ত ও গভীর স্থিরতা।

তবে দুঃখের বিষয় হলো, আমরা যে চায়ের সাথে পরিচিত, তার অধিকাংশকেই চা বলা যায় না। বাজারে আমরা যা পাই, তা হলো চায়ের নামে এক প্রকার অখাদ্য গুড়ো। আসল চায়ের স্বাদ পেতে হলে আপনাকে এর চয়ন আর প্রস্তুত প্রণালী জানতে হবে। চায়ের পাতা হতে হবে সতেজ এবং হালকা। আমি যখন চায়ের লিকার তৈরি করি, তখন তার রঙ হতে হবে ভোরের আকাশের মতো সোনালি আর স্বচ্ছ।

আজকের দিনে চা একটি বিশাল ব্যবসায়িক পণ্যে পরিণত হয়েছে ঠিকই, কিন্তু এর যে আধ্যাত্মিক আর শৈল্পিক আবেদন ছিল, তা যেন কোথাও হারিয়ে গেছে। এই বন্দিশালায় আমি যখন নিজের হাতে চা তৈরি করি, তখন প্রতিটি ধাপ আমি অত্যন্ত যত্ন সহকারে পালন করি। আমার কাছে এটি কেবল পানীয় তৈরি নয়, বরং এটি একটি ক্ষুদ্র অনুষ্ঠান।

“আমি যখন চায়ের কথা বলি, তখন আমার উদ্দেশ্য সেই ‘সাদা চা’ (White Tea), যা অত্যন্ত দুর্লভ এবং যার স্বাদ কেবল প্রকৃত জহুরিরাই বুঝতে পারেন। সাধারণ মানুষ চায়ের কাপে দুধ আর চিনি মিশিয়ে তাকে এক প্রকার শরবত বা মিষ্টান্নে পরিণত করে। এটি চায়ের আত্মার প্রতি এক প্রকার অবিচার। আপনি যদি চায়ের আসল সুগন্ধ আর তার ভেতরের দার্শনিক প্রশান্তি অনুভব করতে চান, তবে তাকে তার মৌলিক রূপেই গ্রহণ করতে হবে।

চিনির মিষ্টতা চায়ের আসল তিক্ততা আর কষভাবকে ঢেকে দেয়। অথচ এই সূক্ষ্ম তিক্ততাই হলো চায়ের প্রাণ। আমি যখন চিনি ছাড়া চায়ের কাপে চুমুক দিই, তখন আমার মনে হয় আমি জীবনের সত্যকেই আস্বাদন করছি—যেখানে তিক্ততা আর মাধুর্য একে অপরের পরিপূরক। পশ্চিমা দেশগুলোতে বিশেষ করে ইংল্যান্ডে চা পানের যে প্রথা চালু হয়েছে, তারা একে কেবল একটি সামাজিক উৎসবে পরিণত করেছে। কিন্তু প্রাচ্যের দেশগুলোতে, বিশেষ করে চীন ও জাপানে চা পান হলো একটি ধ্যান (Meditation)।

জাপানের ‘টি-সেরেমনি’ বা চা-উৎসবের কথা ভাবুন। সেখানে চা তৈরির প্রতিটি অঙ্গভঙ্গি অত্যন্ত অর্থবহ। তারা মনে করে, চায়ের কাপে যে বাষ্প ওঠে, তা মানুষের চিন্তার স্বচ্ছতার প্রতীক। আমিও এই বন্দিশালায় যখন চা তৈরি করি, তখন সেই ধ্যানের পরিবেশ বজায় রাখার চেষ্টা করি। আমার জন্য এটি কেবল চা পান নয়, বরং সারাদিনের মানসিক যুদ্ধের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করা।

আমি আপনাকে বলতে পারি, এই আহমেদনগর দুর্গের প্রতিকূল পরিবেশে যদি চা আমার সাথে না থাকত, তবে আমার জন্য এই দীর্ঘ সময় কাটানো অনেক বেশি কঠিন হতো। চা কেবল আমার মস্তিষ্ককে সচল রাখে না, বরং এটি আমাকে আমার ফেলে আসা দিনগুলোর কথা মনে করিয়ে দেয়। প্রতিটি চুমুকের সাথে আমি যেন আমার পাঠাগারের সেই সুগন্ধ আর বন্ধুদের সাথে কাটানো সেই বিকেলগুলোকে ফিরে পাই।”

“চায়ের এই বিশ্বজনীনতা আমাকে অবাক করে। দেখুন, কীভাবে একটি বুনো গাছের পাতা সারা বিশ্বের মানুষের রুচি ও সংস্কৃতিকে বদলে দিয়েছে। আরবরা একে বলে ‘শায়’ (Shay), তুর্কিরা বলে ‘চায়’ (Cay), আর ইউরোপীয়রা তাদের নিজস্ব ঢঙে এর নাম দিয়েছে ‘টি’ (Tea)। নাম যা-ই হোক না কেন, এর উদ্দেশ্য সবখানেই এক—হৃদয় ও মস্তিষ্ককে সজীব রাখা। তবে মজার ব্যাপার হলো, প্রতিটি জাতি চা পানের মধ্যে তাদের নিজস্ব চরিত্র ফুটিয়ে তুলেছে।

রুশরা চা পান করে বড় বড় সামোভারে, যেখানে চা কেবল একটি পানীয় নয়, বরং আড্ডার প্রাণকেন্দ্র। আবার ব্রিটিশরা চায়ের সাথে দুধ মিশিয়ে তাকে তাদের বৈকালিক বিলাসিতার অংশ করে নিয়েছে। কিন্তু আমি সবসময়ই সেই খাঁটি চীনা পদ্ধতির পক্ষপাতী, যেখানে চায়ের পাতার প্রাকৃতিক রূপটি বজায় থাকে। আমি মনে করি, চা হলো এমন এক বন্ধু যে মানুষের নির্জনতায় কথা বলে এবং জনাকীর্ণ সভায় নীরবতা পালন করতে শেখায়।

আমার এই আহমেদনগর দুর্গের প্রকোষ্ঠে যখন চা তৈরির সময় হয়, তখন আমি বাইরের জগতের সমস্ত হট্টগোল ভুলে যাই। চায়ের কেটলিতে যখন জল ফোটার শব্দ হয়, তখন আমার মনে হয় এটি কোনো সাধারণ শব্দ নয়, বরং এটি এক গভীর সুর—যা আমাকে মনে করিয়ে দেয় যে জীবন চলমান। যখন আমি কাপে চা ঢালি, তখন এর সোনালি রঙ আমাকে আশাবাদী করে তোলে।

আপনি হয়তো জানেন না, ইতিহাসের অনেক বড় বড় কবি ও লেখক চায়ের ভক্ত ছিলেন। হাফিজ বা খৈয়ামের যুগে যদিও চায়ের ব্যাপক প্রচলন ছিল না, কিন্তু তাদের কবিতায় যে ‘সুরা’ বা পানীয়র বর্ণনা পাওয়া যায়, আমি আজ এই দুর্গের নির্জনতায় সেই সুরার মাঝে চায়ের গুণাগুণই খুঁজে পাই। তারা যে আধ্যাত্মিক মত্ততার কথা বলেছেন, আমি সেই মত্ততা খুঁজে পাই এক কাপ গরম কড়া চায়ের সুগন্ধে। এটি এমন এক নেশা যা মানুষকে বেসামাল করে না, বরং তাকে আরও সচেতন করে তোলে।”

“চায়ের এই দীর্ঘ আলোচনা হয়তো আপনাকে কিছুটা অবাক করেছে। আপনি ভাবতে পারেন, এই বন্দিশালায় যেখানে জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত অনিশ্চিত, সেখানে আমি চায়ের মতো এক সাধারণ বিষয় নিয়ে কেন এত পাতা খরচ করছি। আসলে আমার কাছে জীবন মানেই হলো ছোট ছোট জিনিসের মাঝে বড় বড় সত্য খুঁজে পাওয়া। যদি আমরা এক কাপ চায়ের মাঝে শিল্প ও দর্শন খুঁজে না পাই, তবে আমরা পৃথিবীর বড় কোনো সৌন্দর্যকেও উপলব্ধি করতে পারব না।

আমি আপনাকে আগেই বলেছিলাম, আমি এই কারাজীবনকে যন্ত্রণার পরিবর্তে এক সুযোগ হিসেবে নিয়েছি। এই যে আমি চায়ের ইতিহাস, তার ধরন আর প্রস্তুত প্রণালী নিয়ে চিন্তা করছি—এটিই হলো আমার মনের স্বাধীনতা। ব্রিটিশ সরকার আমার শরীরকে এই দুর্গের চার দেয়ালের ভেতর আটকে রাখতে পেরেছে ঠিকই, কিন্তু আমার রুচি আর আমার চিন্তাকে তারা শিকল পরাতে পারেনি।

আমার জন্য চা হলো সেই প্রতীক যা প্রমাণ করে যে, প্রতিকূলতার মাঝেও মানুষ তার সংস্কৃতি আর আভিজাত্য বজায় রাখতে পারে। যখন আমি চায়ের শেষ চুমুকটি দিই, তখন আমার মনে এক অদ্ভুত তৃপ্তি আসে। আমি বুঝতে পারি যে, মনের জগত যদি সমৃদ্ধ হয়, তবে এক চিলতে রোদ আর এক কাপ চা-ই মানুষের জন্য যথেষ্ট।

প্রিয় বন্ধু, আজকের মতো চায়ের আসর এখানেই শেষ করছি। আশা করি কোনো এক সোনালি বিকেলে আমরা দুজনে সামনাসামনি বসে একই কেটলির চা পান করব এবং আমাদের এই বিচ্ছেদের দিনগুলোর গল্প করব। সেই সুদিনের প্রতীক্ষায় আজ বিদায় নিলাম।

আপনার (একনিষ্ঠ) বন্ধু,

আবুল কালাম

৭. কারাজীবনের ধৈর্য ও সহনশীলতা (সবর-ও-ইস্তেকামাত)

কারাজীবনের ধৈর্য ও সহনশীলতা (সবর-ও-ইস্তেকামাত)

তারিখ: ২১ সেপ্টেম্বর, ১৯৪২

সম্মানিত বন্ধু (সাদিক-এ-মুকাররম),

আহমেদনগর দুর্গের এই প্রকোষ্ঠে আজ আমাদের বন্দিত্বের দেড় মাস অতিক্রান্ত হতে চলল। এই সময়ের মধ্যে আমি যা গভীরভাবে উপলব্ধি করেছি তা হলো—মানুষের চরিত্রের আসল পরিচয় পাওয়া যায় তার সংকটের সময়ে। সাধারণত আমরা ‘সবর’ বা ধৈর্য বলতে বুঝি নিষ্ক্রিয়ভাবে বসে থাকা। কিন্তু আমার কাছে সবর বা ধৈর্য হলো একটি গতিশীল শক্তি। এটি হলো প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখে নিজের আদর্শ এবং মানসিক ভারসাম্য ধরে রাখা।

ব্রিটিশ সরকার আমাদের এখানে আটকে রেখে মনে করেছে তারা আমাদের মনোবল ভেঙে দিতে পারবে। কিন্তু তারা জানে না, একজন বিশ্বাসী ও চিন্তাশীল মানুষের কাছে কারাগার হলো একটি পরীক্ষা কেন্দ্র। মানুষ যখন বাইরে থাকে, তখন তার সামনে অনেক পথ খোলা থাকে। কিন্তু যখন সে সব দিক থেকে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে, তখনই সে তার ভেতরের শক্তিকে সংহত করতে শেখে। আমি এই পাথুরে দেয়ালগুলোর দিকে তাকিয়ে কখনও হতাশা বোধ করিনি। বরং আমি মনে করি, এই নিস্তব্ধতা আমাদের আত্মবিশ্লেষণের এক মহান সুযোগ করে দিয়েছে।

জীবনে যারা বড় কোনো লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যেতে চায়, তাদের জন্য পথটি কখনও মসৃণ হয় না। ইতিহাস সাক্ষী যে, প্রতিটি মহান পরিবর্তনের আগে তার নায়কদের এক গভীর একাকীত্ব এবং ধৈর্যের অগ্নিপরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। আমি যখন ইতিহাসের সেইসব মহাপুরুষদের কথা ভাবি, যারা বছরের পর বছর নির্জন কারাগারে কাটিয়েছেন অথচ তাদের আদর্শ থেকে বিচ্যুত হননি, তখন আমার এই সামান্য বন্দিত্বকে খুব তুচ্ছ মনে হয়।

দৃঢ় সংকল্প বা ‘ইস্তেকামাত’ হলো সেই নোঙ্গর, যা উত্তাল সমুদ্রের মাঝেও মানুষের নৌকাকে স্থির রাখে। আজ আমাদের সামনে অনিশ্চয়তা আছে, বাইরের জগতের কোনো খবর নেই, প্রিয়জনদের থেকে আমরা বিচ্ছিন্ন—কিন্তু আমাদের মনের ভেতরে যে সত্যের আলো জ্বলছে, তা নিভে যায়নি। আমি মনে করি, ধৈর্য মানে কেবল সময় পার করা নয়, বরং প্রতিটি মুহূর্তকে সম্মানের সাথে এবং সাহসের সাথে অতিবাহিত করা।

“দীর্ঘকাল ধরে এক জায়গায় বন্দি থাকলে মানুষের স্নায়ুর ওপর এক ধরনের অবসাদ ভর করে। প্রতিদিন একই দেয়াল, একই মুখ আর একই রুটিন মানুষকে একঘেয়েমির চরম পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে। অধিকাংশ মানুষ এই একঘেয়েমির কাছে হার মেনে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে অথবা খিটখিটে মেজাজের হয়ে যায়। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, সবর বা ধৈর্য কেবল নীরব থাকা নয়, বরং নিজের আত্মাকে সজীব রাখা।

আমি যখন দেখি আমার অনেক সঙ্গী মাঝেমধ্যে বিচলিত হয়ে পড়ছেন, তখন আমি তাদের ইতিহাসের বড় বড় বিপ্লবীদের কথা মনে করিয়ে দিই। কারাগারের ভেতরে যারা ভেঙে পড়ে, তারা আসলে বাইরের জগতেও খুব একটা শক্তিশালী ছিলেন না। মানুষের শক্তির উৎস তার পেশিতে নয়, তার হৃদয়ে। আমরা যদি আমাদের মনকে এই বোঝাতে পারি যে এই চার দেয়াল আমাদের সীমানা নয়, তবে আমরা এখান থেকেই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড ভ্রমণ করতে পারি।

আমার জন্য এই দুর্গ কোনো কারাগার নয়, বরং এটি একটি গবেষণাগার। আমি এখানে ধৈর্য ধরে বসে নেই, বরং আমি এখানে নিজেকে নতুন করে গড়ে তুলছি। আপনি জানেন, সোনা যখন আগুনের উত্তাপে দগ্ধ হয়, তখনই তার খাঁটি রূপটি বেরিয়ে আসে। তেমনি মানুষের চরিত্রও দুঃখ আর কষ্টের আগুনে পুড়ে নিখাদ হয়। আমাদের এই সাময়িক কষ্ট আসলে আমাদের ভবিষ্যতের জন্য এক মহান প্রশিক্ষণ।

আমি সবসময় নিজেকে বলি—যে মুহূর্তটি চলে যাচ্ছে, তা আর ফিরে আসবে না। তাই শোক করে বা অভিযোগ করে সেই সময়টি নষ্ট করা বোকামি। ধৈর্য মানে হলো প্রতিটি কষ্টের আড়ালে লুকিয়ে থাকা শিক্ষাকে গ্রহণ করা। আমি এই বন্দিত্বকে আল্লাহর পক্ষ থেকে এক উপহার হিসেবে বরণ করে নিয়েছি, কারণ এটি আমাকে এমন গভীর চিন্তার সুযোগ দিয়েছে যা বাইরের কোলাহলে কখনও সম্ভব ছিল না।”

“পরিশেষে আমি এটুকু বলতে পারি যে, সত্যের পথে অবিচল থাকাই হলো মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ। যারা মনে করেছিল আমাদের কণ্ঠস্বর স্তব্ধ করে তারা আমাদের মনোবল ভেঙে দেবে, তারা এই সত্যটি জানে না যে—কিছু কিছু নীরবতা হাজারো বক্তৃতার চেয়েও শক্তিশালী। এই যে আমি আজ কোনো অভিযোগ না করে এই বন্দিত্ব মেনে নিয়েছি, এটিই আমার সবচেয়ে বড় প্রতিবাদ।

ধৈর্য বা ‘সবর’ আমাকে এক প্রকার মানসিক স্বায়ত্তশাসন দিয়েছে। বাইরের পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, আমার অভ্যন্তরীণ জগত এখনও শান্ত এবং স্থিতিশীল। আমার বন্ধু, আপনি জানেন যে আমি কখনও ভাগ্যের দোহাই দিয়ে বসে থাকার মানুষ নই। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি যে পরিস্থিতি আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই, তাকে সাহসের সাথে গ্রহণ করাই হলো বীরত্ব। এই আহমেদনগর দুর্গ আমাকে শিখিয়েছে যে, মানুষের আসল স্বাধীনতা তার বাইরের অবস্থায় নয়, বরং তার হৃদয়ের দৃঢ়তার মধ্যে নিহিত।

আজকের মতো এখানেই শেষ করছি। আমাদের এই দীর্ঘ প্রতীক্ষার প্রতিটি মুহূর্ত যেন কোনো মহান সার্থকতা বয়ে আনে, এই দোয়াই করি। আপনি বিচলিত হবেন না, কারণ যার সাথে ধৈর্য এবং সত্যের শক্তি আছে, সে কখনও পরাজিত হতে পারে না।

আপনার (একনিষ্ঠ) বন্ধু,

আবুল কালাম

৮. মানুষের ভাগ্য ও কর্ম (তাকদির-ও-তদবির)

মানুষের ভাগ্য ও কর্ম (তাকদির-ও-তদবির)

তারিখ: ২২ সেপ্টেম্বর, ১৯৪২

সম্মানিত বন্ধু (সাদিক-এ-মুকাররম),

মানুষের জীবনে ‘তাকদির’ বা ভাগ্য এবং ‘তদবির’ বা কর্মতৎপরতার স্থান কোথায়—এই বিতর্ক অত্যন্ত প্রাচীন। আহমেদনগর দুর্গের এই নিস্তব্ধতায় বসে আমি যখন ইতিহাসের চাকা আর বর্তমানের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে ভাবি, তখন এই প্রশ্নটি বারবার আমার মনে উঁকি দেয়। আমরা কি কেবল ভাগ্যের হাতের পুতুল, নাকি আমাদের কর্মই আমাদের গন্তব্য নির্ধারণ করে?

অনেক মানুষ মনে করেন যে, সবকিছু যেহেতু আগে থেকেই নির্ধারিত, তাই মানুষের নিজের কিছু করার নেই। এই ভুল ধারণাটি মানুষকে অলস এবং উদ্যমহীন করে তোলে। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, ইসলামি দর্শন এবং বিশ্বপ্রকৃতির নিয়ম অনুযায়ী—তদবির বা মানুষের প্রচেষ্টাই হলো ভাগ্যের চাবিকাঠি। আল্লাহ মানুষকে যে বুদ্ধি ও স্বাধীন ইচ্ছা দিয়েছেন, তা যদি সে ব্যবহার না করে কেবল ভাগ্যের দোহাই দেয়, তবে সেটি হবে স্রষ্টার দেওয়া শ্রেষ্ঠ নেয়ামতের অবমাননা।

আমার এই কারাজীবনের কথাই ধরুন। যদি আমি মনে করতাম যে আমার ভাগ্যেই বন্দিত্ব লেখা আছে এবং আমার কিছু করার নেই, তবে আমি হয়তো এই বিষণ্ণতায় ভেঙে পড়তাম। কিন্তু আমি বেছে নিয়েছি ‘তদবির’ বা কর্মের পথ। আমি এই প্রতিকূলতার মাঝেই আমার পড়াশোনা, বাগান পরিচর্যা এবং এই পত্রাবলি লেখার মাধ্যমে নিজের সময়কে সার্থক করে তুলছি। অর্থাৎ, পরিস্থিতির ওপর আমার নিয়ন্ত্রণ না থাকলেও, সেই পরিস্থিতির প্রতি আমার ‘প্রতিক্রিয়া’ কেমন হবে, তা সম্পূর্ণ আমার হাতে।

তাকদির আসলে কোনো অন্ধ শক্তি নয়, বরং এটি হলো মহাবিশ্বের এক সুশৃঙ্খল নিয়ম। আর সেই নিয়মের একটি বড় অংশ হলো—যে পরিশ্রম করবে, সে তার ফল পাবে। সমুদ্রের ঢেউকে থামানো আমাদের সাধ্যের বাইরে, কিন্তু সেই ঢেউকে কাজে লাগিয়ে আমাদের নৌকাকে সঠিক গন্তব্যে নিয়ে যাওয়া অবশ্যই আমাদের চেষ্টার ওপর নির্ভর করে।

“প্রাচ্যের দেশগুলোর অধঃপতনের একটি বড় কারণ হলো ‘তাকদির’ বা ভাগ্যের ভুল ব্যাখ্যা। আমরা যখন কোনো কাজে ব্যর্থ হই বা কোনো বিপদে পড়ি, তখন খুব সহজেই তাকে ভাগ্যের লিখন বলে মেনে নিই এবং নিজের ভুলগুলো সংশোধন করার চেষ্টা করি না। এই ধরনের মানসিকতা মানুষকে পঙ্গু করে দেয়। অথচ ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, সফল জাতিগুলো ভাগ্যকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার না করে বরং কর্মতৎপরতা বা ‘তদবির’-এর মাধ্যমে নিজেদের ভাগ্য বদলে নিয়েছে।

আমি মনে করি, ‘তদবির’ হলো মানুষের ক্ষমতার সীমানা, আর ‘তাকদির’ হলো সেই সীমানার বাইরের জগত। আমাদের দায়িত্ব হলো আমাদের সাধ্যের শেষ বিন্দু পর্যন্ত চেষ্টা করা। যখন আমরা আমাদের সর্বোচ্চ পরিশ্রম করি, তখন মহাবিশ্বের অদৃশ্য শক্তিগুলোও আমাদের সাহায্য করতে এগিয়ে আসে। কুরআনও আমাদের শিখিয়েছে—মানুষ তাই পায় যার জন্য সে চেষ্টা করে। সুতরাং হাত-পা গুটিয়ে বসে থেকে অলৌকিক কিছুর আশা করা কোনো বুদ্ধিমান মানুষের কাজ হতে পারে না।

এই আহমেদনগর দুর্গে আমি যখন আমার রাজনৈতিক জীবনের লড়াইগুলো নিয়ে ভাবি, তখন দেখি যে আমাদের অনেক পরাজয়ই ছিল আমাদের প্রস্তুতির অভাব বা সঠিক কর্মপরিকল্পনার অভাব। আমরা যদি কেবল আবেগের ওপর নির্ভর না করে যুক্তিনির্ভর ‘তদবির’ করতাম, তবে হয়তো আজকের পরিস্থিতি ভিন্ন হতো। কিন্তু তার মানে এই নয় যে আমরা হতাশ হব। আজ এই কারাগারে বসে আমি যে ধৈর্য ধরছি এবং জ্ঞানচর্চা করছি, এটিও আমার এক ধরনের ‘তদবির’। আমি বিশ্বাস করি, এই অন্ধকার চিরস্থায়ী নয় এবং আমাদের এই প্রচেষ্টা বৃথা যাবে না।

মানুষের মন হলো এক অদ্ভুত শক্তি। সে যদি বিশ্বাস করে যে সে পরাজিত হবে, তবে ভাগ্য তাকে পরাজিতই করবে। কিন্তু সে যদি তার কর্মশক্তির ওপর বিশ্বাস রাখে, তবে কঠিন দেওয়ালও তাকে আটকে রাখতে পারে না।”

“পরিশেষে এটিই প্রতীয়মান হয় যে, ভাগ্য এবং কর্ম আসলে একে অপরের পরিপূরক। যারা কেবল ভাগ্যের ওপর ভরসা করে তারা যেমন ভুল পথে আছে, তেমনি যারা মনে করে তাদের সামান্য চেষ্টাই সবকিছু—তারাও চরম অহংকারে মগ্ন। প্রকৃত সত্য হলো, আমাদের সাধ্যমতো ‘তদবির’ বা চেষ্টা করা এবং ফলাফলকে ‘তাকদির’ বা মহান আল্লাহর ওপর ছেড়ে দেওয়া। এই যে ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি, এটিই মানুষকে মানসিক প্রশান্তি দেয়।

আমি যখন আহমেদনগর দুর্গের এই কামরায় রাতের আঁধারে আকাশের নক্ষত্ররাজির দিকে তাকাই, তখন মহাবিশ্বের এক বিশাল ও সুশৃঙ্খল পরিকল্পনা আমার চোখে ভেসে ওঠে। সেই পরিকল্পনায় আমার এই বন্দিত্ব হয়তো একটি অতি ক্ষুদ্র বিন্দু, কিন্তু এর পেছনেও নিশ্চয়ই কোনো গূঢ় উদ্দেশ্য রয়েছে। আমার কাজ হলো সেই উদ্দেশ্যকে সার্থক করা—হতাশ হয়ে সময় নষ্ট করা নয়।

প্রিয় বন্ধু, আমি আপনাকে অনুরোধ করব আপনি যেন সবসময় কর্মতৎপরতাকে অগ্রাধিকার দেন। ভাগ্য আমাদের অনুকূলে আসুক বা না আসুক, আমাদের সংগ্রাম যেন থেমে না থাকে। মানুষের মর্যাদা তার বিজয়ে নয়, বরং তার অটল প্রচেষ্টায়। এই কারাগার থেকে যেদিন আমি মুক্ত হব, সেদিন যেন আমি এই তৃপ্তি নিয়ে বের হতে পারি যে, আমি আমার প্রতিটি মুহূর্তকে কর্ম দিয়ে জয় করেছি।

আপনার কুশল ও উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি কামনা করে আজকের মতো বিদায় নিচ্ছি।

আপনার (একনিষ্ঠ) বন্ধু,

আবুল কালাম

৯. সঙ্গীত ও আত্মার খোরাক (মিউজিক-ও-রুহানিয়াত)

সঙ্গীত ও আত্মার খোরাক (মিউজিক-ও-রুহানিয়াত)

তারিখ: ২৩ সেপ্টেম্বর, ১৯৪২

সম্মানিত বন্ধু (সাদিক-এ-মুকাররম),

আজ আমার মন এক অদ্ভুত সুরেলা আবেশে আচ্ছন্ন হয়ে আছে। আপনি হয়তো জানেন, আমার জীবনে সঙ্গীতের স্থান কেবল বিনোদনের জন্য নয়; এটি আমার আত্মার এক অপরিহার্য খোরাক। আহমেদনগর দুর্গের এই নিস্তব্ধ সন্ধ্যায় যখন আমি একা বসে থাকি, তখন আমার কানে বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দও এক প্রকার ছন্দে অনুরণিত হয়। আমি মনে করি, এই মহাবিশ্বের মূলে রয়েছে এক পরম সঙ্গীত, যা কেবল হৃদয়ের কান দিয়ে শোনা সম্ভব।

অনেকে সঙ্গীতকে কেবল আমোদ-প্রমোদের বস্তু মনে করে একে ধর্মীয় বা নৈতিক দিক থেকে অবজ্ঞা করেন। কিন্তু আমার কাছে সঙ্গীত হলো সত্যের এক নান্দনিক প্রকাশ। আপনি যদি প্রকৃতির দিকে তাকান—পাখির কলকাকলি, ঝরনার কলতান, এমনকি বৃষ্টির রিনিঝিনি শব্দ—সবকিছুর মাঝেই এক প্রকার সুর লুকানো আছে। স্রষ্টা যখন এই প্রকৃতিকে এত সুরেলা করে গড়েছেন, তখন মানুষ কীভাবে সুর থেকে বিমুখ থাকতে পারে?

আমার শৈশব ও কৈশোরের দিনগুলোতে আমি যখন শাস্ত্রীয় সঙ্গীত এবং বিশেষ করে সেতার ও তম্বুরার সুর শুনতাম, তখন আমার মনে হতো আমি এক অন্য জগতে প্রবেশ করছি। সঙ্গীতের সেই সুর আমাকে জাগতিক দুঃখ-কষ্ট থেকে মুক্তি দিয়ে এক আধ্যাত্মিক উচ্চতায় নিয়ে যেত। এই কারাগারের চার দেয়ালের মাঝেও আমি যখন কোনো ধ্রুপদী রাগের কথা চিন্তা করি, তখন আমার মনে হয় এই দেয়ালগুলো অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে এবং আমি এক মুক্ত আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে আছি।

আরবি ও ফারসি সাহিত্যে সঙ্গীতের যে প্রভাব, তা আমি গভীরভাবে অধ্যয়ন করেছি। সূফি সাধকগণ কেন ‘সামা’ বা আধ্যাত্মিক সঙ্গীতের ওপর এত গুরুত্ব দিতেন, তা আজ আমি এই নির্জনতায় বসে বুঝতে পারছি। যখন শব্দের শক্তি শেষ হয়ে যায়, তখনই সুরের ভাষা শুরু হয়। মন যখন কোনো যুক্তিতে শান্ত হয় না, তখন এক টুকরো সুর তাকে প্রশান্তির সাগরে ভাসিয়ে দিতে পারে।

“অনেকে হয়তো অবাক হবেন জেনে যে, এক সময় আমি অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে সেতার চর্চা করতাম। আমার কাছে সেতার কেবল একটি বাদ্যযন্ত্র ছিল না, বরং সেটি ছিল আমার একাকীত্বের বিশ্বস্ত সঙ্গী। সেতারের সেই সরু তারগুলো যখন আঙুলের স্পর্শে কেঁপে উঠত, তখন আমার মনে হতো সেই কম্পন আমার হৃদয়ের গভীরে গিয়ে আঘাত করছে। আমি যখন কোনো রাগের বিস্তারে মগ্ন হতাম, তখন সময় আর স্থানের জ্ঞান আমার লোপ পেত।

সঙ্গীতের এই সাধনা আমাকে শিখিয়েছে যে, সুন্দরের আরাধনা এবং সত্যের সন্ধান আসলে একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। আধ্যাত্মিকতার যে উচ্চ স্তরে মানুষ পৌঁছাতে চায়, সুরের সিঁড়ি বেয়ে সেখানে পৌঁছানো অনেক সহজ হয়। আপনি যদি গাজালির (ইমাম গাজালি) দর্শন পড়েন, তবে দেখবেন তিনিও হৃদয়ের কোমলতা সৃষ্টির জন্য সঙ্গীতের প্রভাবকে অস্বীকার করেননি। তবে অবশ্যই সেই সঙ্গীত হতে হবে রুচিশীল এবং যা আত্মাকে কলুষিত না করে বরং পবিত্র করে।

এই আহমেদনগর দুর্গে যদিও আমার কাছে কোনো বাদ্যযন্ত্র নেই, কিন্তু আমার স্মৃতিতে শত শত সুরের লহরী জমা আছে। আমি যখন চোখ বন্ধ করি, তখন আমি অনায়াসেই কোনো মালকোষ বা দরবারি কানাড়া রাগের আলাপ শুনতে পাই। আমার মস্তিষ্ক যেন নিজেই একটি গ্রামোফোন রেকর্ড, যেখানে জীবনের সেরা সুরগুলো খোদাই করা আছে। কখনও কখনও মাঝরাতে যখন চারপাশ নিস্তব্ধ থাকে, তখন আমার মনে হয় এই দুর্গের বাতাসও যেন এক বিষাদময় করুণ সুরে কাঁদছে।

আমি মনে করি, যে মানুষের হৃদয়ে সুরের কোনো অনুভূতি নেই, তার জীবন অনেকটা শুষ্ক মরুভূমির মতো। জ্ঞান এবং যুক্তি মানুষকে পথ দেখাতে পারে, কিন্তু রস ও মাধুর্য না থাকলে সেই পথচলা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। এই বন্দিত্বের দিনগুলোতে জ্ঞানচর্চার পাশাপাশি এই সুরের স্মৃতিগুলোই আমাকে মানসিক সজীবতা দিচ্ছে। আমি যখন লিখতে বসি, তখনও আমার কলমের আঁচড়ে যেন এক অদৃশ্য ছন্দের দোলা লাগে।”

“পরিশেষে আমি বলতে চাই, সঙ্গীত কেবল কানের তৃপ্তি নয়, এটি হৃদয়ের এক বিশেষ অবস্থা। অনেকে একে পার্থিব আমোদ মনে করে ভুল করেন, কিন্তু আমি মনে করি সুরের মাঝেই স্রষ্টার মহিমা সবচেয়ে সূক্ষ্মভাবে প্রকাশিত হয়। যখন কোনো গভীর সুর আমাদের অন্তরাত্মাকে স্পর্শ করে, তখন আমাদের অহংকার গলে জল হয়ে যায় এবং আমরা এক পরম সত্তার সান্নিধ্য অনুভব করি।

এই আহমেদনগর দুর্গের নির্জনতা আমাকে সুযোগ করে দিয়েছে সেইসব সুরগুলোকে পুনরায় স্মরণ করার, যা বাইরের ব্যস্ত জীবনে আমি প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম। আমার জীবনের এই পর্যায়ে এসে আমি বুঝি যে, কিতাব আর কলম আমাকে যে জ্ঞান দিয়েছে, সুর আমাকে দিয়েছে তার চেয়েও গভীর অনুভূতি। যদি কেউ আমাকে জিজ্ঞেস করে যে আমি কারাজীবনে সবচেয়ে বেশি কী অনুভব করছি, তবে আমি বলব—আমি এই নিস্তব্ধতার মাঝেই জীবনের শ্রেষ্ঠ সঙ্গীত শুনতে পাচ্ছি।

প্রিয় বন্ধু, আপনি হয়তো ভাবছেন আমি এক বৈরাগী বা শিল্পীর মতো কথা বলছি। কিন্তু আপনি তো জানেন, আমার ভেতরে একজন জ্ঞানপিপাসুর পাশাপাশি একজন সৌন্দর্যপিপাসু মানুষও বাস করে। আমি বিশ্বাস করি, যার অন্তরে সুন্দরের প্রতি অনুরাগ নেই, সে সত্যের পূর্ণতা লাভ করতে পারে না। আজ যখন আমি আমার এই চিঠি শেষ করছি, তখন আমার চারপাশের বাতাস যেন এক শান্ত ও গম্ভীর সুরে বিদায় জানাচ্ছে।

জীবনের এই সুর যেন কখনও থেমে না যায়, আর আমাদের আত্মা যেন সবসময় সুন্দরের অন্বেষণে জাগ্রত থাকে—এই কামনাই করি।

আপনার (একনিষ্ঠ) বন্ধু,

আবুল কালাম

১০. প্রকৃতি ও বসন্তের আগমণ (ফাসল-এ-বাহার)

প্রকৃতি ও বসন্তের আগমন (ফাসল-এ-বাহার)

তারিখ: ২৪ সেপ্টেম্বর, ১৯৪২

সম্মানিত বন্ধু (সাদিক-এ-মুকাররম),

কারাগারের এই নির্জীব দেয়ালে ঘেরা জীবনেও প্রকৃতির পরিবর্তন তার নিজস্ব গতিতে চলতেই থাকে। আজ যখন আমি আমার কামরা থেকে বাইরের ছোট উঠানটির দিকে তাকালাম, মনে হলো বাতাসের ঘ্রাণে এক নতুন স্পন্দন জেগেছে। শীতের সেই শুষ্কতা আর কঠোরতা যেন ধীরে ধীরে বিদায় নিচ্ছে এবং প্রকৃতি তার নতুন সাজে সজ্জিত হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। হ্যাঁ বন্ধু, আহমদনগর দুর্গেও বসন্তের পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে।

শহুরে জীবনে আমরা সাধারণত ঋতু পরিবর্তন অনুভব করি ক্যালেন্ডারের পাতায় বা বাজারের ফলের দোকানে। কিন্তু একজন বন্দির কাছে ঋতুর পরিবর্তন আসে আকাশের রঙের বদলে, ভোরের বাতাসের হিমেল পরশে অথবা উঠানের কোনো এক কোণে জন্মানো ঘাসের ডগার সজীবতায়। আমি মনে করি, প্রকৃতিকে অনুভব করার জন্য অখণ্ড অবসরের প্রয়োজন, যা এই কারাজীবন আমাকে অঢেল দিয়েছে।

অনেকে মনে করেন, চারদিকে পাথুরে দেয়াল থাকলে বোধহয় প্রকৃতির সাথে সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়। কিন্তু আমি দেখেছি, এই দেয়ালগুলোর ভেতরেও প্রাণের স্পন্দন কত তীব্র হতে পারে। যখন বসন্ত আসে, তখন এমনকি এই শুষ্ক দুর্গের আকাশও নীল থেকে গাঢ় নীল হয়ে ওঠে। ভোরের দিকে যখন পাখিরা কিচিরমিচির শুরু করে, তখন আমার মনে হয় তারা কেবল গান গাইছে না, বরং মুক্তির এক নতুন বার্তা ছড়িয়ে দিচ্ছে।

আমার কাছে বসন্ত মানে কেবল নতুন পাতা বা ফুলের সমারোহ নয়; বসন্ত হলো আশার প্রতীক। শীতের দীর্ঘ জড়তা কাটিয়ে যেভাবে একটি ছোট চারা মাটি ফুঁড়ে বেরিয়ে আসে, আমাদের জীবনও তেমনি কষ্টের অন্ধকার ভেদ করে আলোর দিকে এগিয়ে যায়। আমি যখন আমার এই ছোট বাগানটির দিকে তাকাই, যেখানে আমি নিজের হাতে কয়েকটি বীজ বুনেছিলাম, দেখি সেগুলো আজ মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। এই ছোট ছোট দৃশ্যগুলো আমাকে মনে করিয়ে দেয় যে, জীবনের শক্তি অপরাজেয়।

“বসন্তের এই আগমনে দুর্গের ভেতরের বাতাস এক অদ্ভুত মাদকতায় ভরে উঠেছে। আমি যখন আমার পড়ার টেবিল ছেড়ে জানালার পাশে দাঁড়াই, তখন দেখি রোদের রঙ বদলে গেছে। শীতের সেই ফ্যাকাসে রোদ এখন সোনালি হয়ে আছড়ে পড়ছে এই পুরনো পাথুরে ইমারতগুলোর ওপর। এই দৃশ্যটি আমাকে কোনো এক পুরনো ফারসি কবির পঙক্তির কথা মনে করিয়ে দেয়—যেখানে তিনি বলেছিলেন যে, বসন্ত হলো স্রষ্টার সেই শিল্পকর্ম যা মৃত হৃদয়েও প্রাণের সঞ্চার করে।

আপনি হয়তো ভাবছেন, এই ক্ষুদ্র জেলখানার উঠানে আর কতটুকুই বা বসন্তের রূপ দেখা যায়। কিন্তু আমার বন্ধু, যার চোখে দেখার দৃষ্টি আছে, সে এক বিন্দু শিশিরের মাঝেও সমুদ্রের বিশালতা খুঁজে পেতে পারে। এই কেল্লার দেয়ালের ফাটল দিয়ে যখন কোনো বুনো লতা মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে এবং তাতে একটি ছোট নীল ফুল ফোটে, তখন আমার মনে হয় সারা বিশ্বের সৌন্দর্য ওই একটি ফুলের মাঝেই ঘনীভূত হয়েছে। বাইরের স্বাধীন জগতে হয়তো আমি এই ছোট সৌন্দর্যগুলোকে এড়িয়ে যেতাম, কিন্তু এখানে প্রতিটি নতুন পাতাই আমার কাছে এক একটি অলৌকিক ঘটনা।

বিকেলের দিকে যখন সূর্য পশ্চিম আকাশে হেলে পড়ে, তখন এই দুর্গের ছায়াগুলো দীর্ঘ হতে থাকে। সেই সময়টুকুতে আমি আমার বাগানের চারাগুলোর সাথে কথা বলি। আমি দেখি, কীভাবে বসন্তের ছোঁয়ায় কচি পাতাগুলো রোদে ঝিকমিক করছে। আমার মনে হয়, প্রকৃতি যেন আমাদের শেখাতে চায় যে—শত প্রতিকূলতা আর পাথুরে বাধার নিচে চাপা পড়ে থাকলেও সময় এলে প্রাণের প্রকাশ ঘটবেই।

অনেকে এই জেলখানাকে অভিশাপ মনে করেন, কিন্তু আমি মনে করি এটি একটি নির্জন মকতাব (শিক্ষালয়), যেখানে প্রকৃতি নিজেই শিক্ষকের ভূমিকা পালন করছে। বসন্ত আমাকে শেখাচ্ছে ধৈর্য ধরতে, কারণ শীতের দীর্ঘ প্রতীক্ষার পরেই এই নবযৌবনের আগমন সম্ভব হয়েছে। আমার মনে হয়, আমাদের জাতির জীবনেও এখন এক দীর্ঘ শীতকাল চলছে; কিন্তু বসন্তের এই পদধ্বনি আমাকে আশাবাদী করে তুলছে যে, আমাদের স্বাধীনতার ভোরও খুব নিকটেই।

“পরিশেষে এটিই সত্য যে, বসন্ত কোনো নির্দিষ্ট স্থান বা বাগানের নাম নয়; এটি মনের একটি অবস্থার নাম। যদি কারো মনে সজীবতা থাকে, তবে সে মরুভূমির উত্তপ্ত বালুর মাঝেও বসন্তের ঘ্রাণ পেতে পারে। আর যার মন মরে গেছে, তার জন্য বাগানের হাজারো ফুলও কোনো অর্থ বহন করে না। এই আহমেদনগর দুর্গে আমি নিজেকে এমনভাবে প্রস্তুত করেছি যে, বাইরের কোনো দেয়াল আমার মনের ঋতুকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না।

বসন্তের এই আগমণী বার্তা আমাকে পুনরায় মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, পরিবর্তনই জগতের একমাত্র নিয়ম। আজ যা অন্ধকার, কাল তা আলোয় ভরে উঠবে। আজ যা শীতের রিক্ততা, কাল তা বসন্তের পূর্ণতা। জীবনের এই অমোঘ চক্রে বিশ্বাস রাখাই হলো প্রকৃত জ্ঞান। আমি আমার এই ছোট বাগানের প্রতিটি প্রস্ফুটিত কুঁড়ির মাঝে আগামীর এক উজ্জ্বল ভারতের ছবি দেখতে পাই।

প্রিয় বন্ধু, বসন্তের এই সজীবতা আপনার জীবনেও নতুন অনুপ্রেরণা নিয়ে আসুক। আমরা হয়তো আজ একে অপরের থেকে দূরে, কিন্তু প্রকৃতির এই একই আকাশ আর একই বসন্ত আমাদের এক সুতোয় বেঁধে রেখেছে। যখনই আপনি কোনো নতুন ফুলের সুগন্ধ পাবেন, জানবেন যে আপনার এই বন্ধুটিও আহমেদনগর দুর্গের এক কোণে বসে সেই একই আনন্দ অনুভব করছে।

আপনার সর্বাঙ্গীণ মঙ্গল কামনায় আজ বিদায় নিচ্ছি।

আপনার,

আবুল কালাম

১১. জীবনের বিষাদ ও আনন্দ (গাম-ও-নিশাত)

জীবনের বিষাদ ও আনন্দ (গাম-ও-নিশাত)

তারিখ: ২৫ সেপ্টেম্বর, ১৯৪২

সম্মানিত বন্ধু (সাদিক-এ-মুকাররম),

আহমেদনগর দুর্গের এই নিস্তব্ধ প্রহরে আজ মনটা কিছুটা ভাবুক হয়ে আছে। আপনি হয়তো লক্ষ্য করেছেন, মানুষের জীবন আসলে বিষাদ আর আনন্দের এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ। আমরা সাধারণত আনন্দকে খুঁজি আর বিষাদকে এড়িয়ে চলতে চাই। কিন্তু আমার কাছে এই দুই অনুভূতির গুরুত্ব সমান। বিষাদ ছাড়া আনন্দের কোনো স্বাদ নেই, যেমন অন্ধকারের অস্তিত্ব না থাকলে আলোর কোনো মূল্য থাকত না।

কারাগারের এই নির্জনতা অনেক সময় মানুষকে বিষণ্ণ করে তোলে। কিন্তু আমি এই বিষাদকে এক অন্য নজরে দেখি। এটি কোনো নিরাশা নয়, বরং এটি হলো আত্মার এক গভীর স্থিরতা। ফারসি কবিতায় ‘গাম’ বা দুঃখকে কেবল শোক হিসেবে দেখা হয় না, বরং একে দেখা হয় এক আধ্যাত্মিক সম্পদ হিসেবে। যে হৃদয় কখনও দুঃখের দহন অনুভব করেনি, সেই হৃদয় সুন্দরের আসল রূপও উপলব্ধি করতে পারে না।

অনেকে আমাকে জিজ্ঞেস করেন, “মাওলানা, এই প্রতিকূল পরিবেশে আপনি কীভাবে সবসময় হাসিখুশি থাকেন?” আমি তাদের বলি, আমার আনন্দ বাইরের পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে না। এটি আমার ভেতরের এক মানসিক শক্তি। আমি বিষাদকে আমার মনের দরজায় কড়া নাড়তে দিই ঠিকই, কিন্তু তাকে আমার সিংহাসন দখল করতে দিই না। আমি দুঃখকে এক কাপ কড়া চায়ের মতো আস্বাদন করি—যা শুরুতে কিছুটা তিতো মনে হলেও পরে এক অদ্ভুত সতেজতা দেয়।

আসলে আনন্দ বা ‘নিশাত’ হলো এক প্রকার মানসিক সার্বভৌমত্ব। আপনি যদি আপনার মনকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন, তবে শিকল পরা অবস্থাতেও আপনি মুক্ত। আর যদি আপনার মনই বন্দি থাকে, তবে রাজপ্রাসাদেও আপনি শ্বাসরুদ্ধ বোধ করবেন। আমি এই দুর্গের পাথুরে দেয়ালগুলোর মাঝেও এক প্রকার অতীন্দ্রিয় আনন্দ খুঁজে পেয়েছি, কারণ আমি আমার চিন্তার জগতকে কোনো সীমানায় আটকে রাখিনি।

“আমি বিশ্বাস করি, প্রকৃত আনন্দ বা ‘নিশাত’ কোনো বাহ্যিক উপকরণের ওপর নির্ভর করে না। আমরা অনেক সময় মনে করি ভালো খাবার, আরামদায়ক বিছানা বা স্বাধীন জীবনই আনন্দের উৎস। কিন্তু ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, বহু মানুষ চরম প্রাচুর্যের মাঝেও গভীর বিষাদে ভুগেছেন, আবার অনেকে কারাবাস বা দারিদ্র্যের মাঝেও হৃদয়ের প্রশান্তি খুঁজে পেয়েছেন। এর কারণ হলো, আনন্দ একটি অভ্যন্তরীণ শিল্প।

আমি যখন এই আহমেদনগর দুর্গের ছোট উঠানে পায়চারি করি, তখন আমি এক অদ্ভুত স্বাধীনতা অনুভব করি। বাইরের পৃথিবী হয়তো ভাবছে আমি কষ্টে আছি, কিন্তু আমি আমার চিন্তার জগতে এমন সব উদ্যানে ঘুরে বেড়াই যেখানে কোনো কাঁটা নেই। বিষাদ বা ‘গাম’ যখন আসে, আমি তাকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করি। কারণ দুঃখ মানুষকে বিনয়ী করে এবং জীবনের গভীরতা বুঝতে শেখায়। একজন চিন্তাশীল মানুষের কাছে দুঃখ হলো সেই পালিশ, যা তার চরিত্রকে আরও উজ্জ্বল করে তোলে।

তবে সাবধান থাকতে হবে যাতে এই বিষাদ যেন আমাদের ‘হিম্মত’ বা সাহসকে গ্রাস না করে। দুঃখ থাকবে চোখের কোণে, কিন্তু মুখে থাকবে হাসি এবং সংকল্পে থাকবে অটল বিশ্বাস। আমি সবসময় চেষ্টা করি আমার চারপাশের মানুষদের আনন্দ বিলিয়ে দিতে। কারণ আমি জানি, নিজের দুঃখকে জয় করার শ্রেষ্ঠ উপায় হলো অন্যের মুখে হাসি ফোটানো।

এই দুর্গের ভেতরে আমরা যারা বন্দি আছি, তাদের প্রত্যেকেরই বিষাদের নিজস্ব কারণ আছে। কেউ পরিবারের কথা ভেবে ব্যথিত, কেউ দেশের বর্তমান অবস্থা নিয়ে চিন্তিত। কিন্তু আমি মনে করি, এই সমস্ত সাময়িক বিষাদকে যদি আমরা এক বৃহত্তর লক্ষ্যের সাথে যুক্ত করতে পারি, তবে তা আর বোঝা মনে হবে না। তখন সেই দুঃখই হয়ে উঠবে আমাদের সংগ্রামের জ্বালানি।”

“পরিশেষে এটিই হলো আমার জীবনের দর্শন—বিষাদকে অস্বীকার করবেন না, আবার আনন্দকে আঁকড়ে ধরার জন্য ব্যাকুল হবেন না। জীবন তার নিজস্ব গতিতে এই দুইয়ের ঢেউ নিয়ে আসবে, আমাদের কাজ হলো একজন দক্ষ মাঝির মতো সেই ঢেউয়ের ওপর দিয়ে নিজের তরী বয়ে নিয়ে যাওয়া।

আমি যখন রাতে এই কারাকক্ষের জানালার গ্রিল দিয়ে আকাশের নক্ষত্রগুলোর দিকে তাকাই, তখন আমার মনে হয়—এই মহাবিশ্ব এক বিশাল সুশৃঙ্খল সংগীতের মতো। সেখানে কান্নার সুর যেমন আছে, তেমনি আছে জয়ের উল্লাস। আমি আমার এই বন্দিত্বের প্রতিটি বিষাদময় মুহূর্তকে এক একটি মুক্তোর মতো সাজিয়ে রাখছি, কারণ আমি জানি একদিন এই অভিজ্ঞতাই আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদে পরিণত হবে।

প্রিয় বন্ধু, আমি চাই আপনিও জীবনের প্রতিটি অবস্থাকে প্রসন্ন চিত্তে গ্রহণ করুন। যদি কখনও মনের আকাশে বিষাদের মেঘ জমে, তবে ভাববেন যে এই মেঘের পরেই আসবে প্রশান্তির বৃষ্টি। আমি এখানে যেমন আছি, আপনিও সেখানে তেমনই সাহসের সাথে থাকুন। আমাদের এই বিচ্ছেদ দীর্ঘ হতে পারে, কিন্তু আমাদের হৃদয়ের আনন্দ যেন কখনও ম্লান না হয়।

আজকের মতো এখানেই ইতি টানছি। আমাদের আগামীর দিনগুলো যেন বিষাদমুক্ত এবং আলোয় উদ্ভাসিত হয়—এই দোয়াই করি।

আপনার (একনিষ্ঠ) বন্ধু,

আবুল কালাম

১২. আহমেদনগর দুর্গের ইতিহাস (তারিখ-এ-আহমেদনগর)

আহমেদনগর দুর্গের ইতিহাস (তারিখ-এ-আহমেদনগর)

তারিখ: ২৬ সেপ্টেম্বর, ১৯৪২

সম্মানিত বন্ধু (সাদিক-এ-মুকাররম),

আমি যে প্রকোষ্ঠে বসে আপনাকে এই পত্র লিখছি, তার প্রতিটি পাথর যেন ইতিহাসের এক একটি পাতা। আহমেদনগর দুর্গ কেবল একটি কারাগার নয়, বরং এটি ভারতের গত চারশ বছরের উত্থান-পতনের এক নীরব সাক্ষী। আমি যখন এই দুর্গের উঁচু প্রাচীর আর গভীর পরিখার দিকে তাকাই, আমার চোখের সামনে ইতিহাসের সেইসব দৃশ্য ভেসে ওঠে, যা এই মাটিকে রক্ত আর গৌরবে রঞ্জিত করেছে।

এই দুর্গটি ১৫শ শতাব্দীতে আহমেদ নিজাম শাহ নির্মাণ করেছিলেন। এটি ছিল নিজাম শাহী সালতানাতের শৌর্য-বীর্যের প্রতীক। কিন্তু এই দুর্গের নাম ইতিহাসের পাতায় অমর হয়ে আছে মূলত একজন মহীয়সী নারীর কারণে—তিনি হলেন চাঁদ সুলতানা (চাঁদ বিবি)। ১৫৯৫ সালে যখন মুঘল সম্রাট আকবরের বিশাল বাহিনী এই দুর্গ আক্রমণ করে, তখন এই চাঁদ সুলতানাই বীরত্বের সাথে তা রক্ষা করেছিলেন। বলা হয়, যখন কামানের গোলার আঘাতে দুর্গের দেয়ালে ফাটল ধরেছিল, তখন তিনি নিজের অলঙ্কার আর সোনা-রুপা দিয়ে সেই ফাটল ভরাট করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তাঁর সেই অদম্য সাহস আজও এই দুর্গের বাতাসে মিশে আছে।

আমি যখন এই দুর্গের উঠানে পায়চারি করি, তখন ভাবি—যুগ যুগ ধরে কত যোদ্ধা, কত বন্দি আর কত বিবাগী মানুষ এই একই পথে হেঁটেছেন। মুঘলদের পর এই দুর্গ মারাঠাদের অধীনে যায় এবং অবশেষে ব্রিটিশরা ১৮০৩ সালে এটি দখল করে নেয়। ব্রিটিশ আমলে এটি একটি দুর্ভেদ্য কারাগারে পরিণত হয়। আজ আমরাও সেই ইতিহাসেরই অংশ হয়ে এখানে বন্দি।

ইতিহাসের এক অদ্ভুত পরিহাস দেখুন, যে দুর্গটি একসময় ভারতের স্বাধীনতা রক্ষার কেন্দ্রবিন্দু ছিল, আজ সেই দুর্গটিকেই ব্যবহার করা হচ্ছে ভারতের স্বাধীনতার সংগ্রামীদের আটকে রাখার জন্য। তবে আমি বিশ্বাস করি, এই পাথুরে দেয়ালগুলো আমাদের শরীরকে আটকে রাখলেও, আমাদের সেই মহান ঐতিহ্যের চেতনাকে কোনোভাবেই দমন করতে পারবে না।

“আহমেদনগর দুর্গের স্থাপত্যশৈলীর দিকে তাকালে বোঝা যায়, এটি মূলত প্রতিরক্ষার কথা মাথায় রেখেই তৈরি করা হয়েছিল। এর চারপাশের গভীর পরিখা এবং মজবুত বুরুজগুলো একে সেই সময়ের অন্যতম অজেয় দুর্গে পরিণত করেছিল। আমি যখন এই দুর্গের ভেতরে বন্দি থাকা ঐতিহাসিক চরিত্রগুলোর কথা ভাবি, তখন নিজের একাকীত্বকে আর কষ্টকর মনে হয় না। এই দুর্গের প্রতিটি কোণে যেন কোনো না কোনো দীর্ঘশ্বাস অথবা বীরত্বের হুঙ্কার চাপা পড়ে আছে।

১৫৯৫ সালের সেই ঐতিহাসিক অবরোধের কথা ধরা যাক। চাঁদ বিবি যখন মুঘল শাহজাদা মুরাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন, তখন এই দুর্গটি হয়ে উঠেছিল সারা ভারতের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। যদিও শেষ পর্যন্ত অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্রের কারণে তাঁর পতন ঘটেছিল, কিন্তু এই দুর্গটি মুঘলদের অধীনে আসার পরও তার গুরুত্ব হারায়নি। মুঘল সম্রাট শাহজাহান এবং পরবর্তীতে আওরঙ্গজেব এই অঞ্চলের শাসনভার মজবুত করতে এই দুর্গটিকে বারবার ব্যবহার করেছেন। এমনকি আওরঙ্গজেবের দীর্ঘ দাক্ষিণাত্য অভিযানের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত এই আহমেদনগরের মাটি থেকেই নেওয়া হয়েছিল।

অষ্টাদশ শতাব্দীতে যখন মুঘল সাম্রাজ্যের সূর্য অস্তমিত হতে শুরু করে, তখন এই দুর্গটি মারাঠাদের হস্তগত হয়। বিশেষ করে পেশোয়াদের আমলে এর সামরিক গুরুত্ব আরও বৃদ্ধি পায়। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে ১৮০৩ সালে জেনারেল ওয়েলেসলির নেতৃত্বে ব্রিটিশ বাহিনী এটি দখল করে নেয়। ব্রিটিশদের হাতে আসার পর এর চরিত্র সম্পূর্ণ বদলে যায়। এটি আর কেবল একটি সামরিক দুর্গ রইল না, বরং এটি হয়ে উঠল রাজনৈতিক বন্দিদের এক জনশূন্য নির্জন নিবাস।

আমি যখন এই প্রাঙ্গণে পায়চারি করি, তখন সেইসব নাম না জানা সৈনিকদের কথা ভাবি যারা এই মাটির জন্য প্রাণ দিয়েছিলেন। ইতিহাসের চাকা কত দ্রুত ঘোরে! এক সময় যারা এখানে শাসন করত, আজ তারা ইতিহাসের পাতায় বন্দি; আর আজ যারা এখানে বন্দি, হয়তো আগামীর ইতিহাসে তারাই হবে বিজয়ী। এই পাথুরে দেয়ালগুলো আমাদের শেখায় যে, ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়, কিন্তু আদর্শ আর ত্যাগের কাহিনী এই পাথরের মতোই অবিনশ্বর।”

“আহমেদনগর দুর্গের এই দীর্ঘ ইতিহাস পর্যালোচনা করলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে—ইট-পাথরের এই কাঠামোটি আসলে সময়ের এক বিশাল দর্পণ। এখানে যেমন চাঁদ বিবির বীরত্বগাথা আছে, তেমনি আছে যুদ্ধের বীভৎসতা আর রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের করুণ কাহিনী। ব্রিটিশরা যখন ১৮০৩ সালে এর দখল নেয়, তখন থেকেই এই দুর্গের সামরিক গৌরবের অবসান ঘটে এবং এটি মূলত একটি স্থায়ী ছাউনি ও কারাগারে পরিণত হয়।

আজ আমরা এই দুর্গের যে অংশে বন্দি আছি, তা বাইরের জগত থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। কিন্তু আমি যখন গভীর রাতে এই দুর্গের নিস্তব্ধতা অনুভব করি, তখন আমার মনে হয় এই দেয়ালগুলো আমার সাথে কথা বলছে। তারা আমাকে বলছে যে, কোনো শক্তিই চিরকাল টিকে থাকে না। যারা একসময় এই দুর্গের অজেয় প্রাচীর গড়ে তুলেছিল, তারা আজ নেই; কিন্তু তাদের ইতিহাস রয়ে গেছে। আমাদের বর্তমান অবস্থাও একদিন ইতিহাসে পরিণত হবে।

আমার এই কারাজীবনের দিনগুলো এই দুর্গের শত শত বছরের ইতিহাসের তুলনায় হয়তো অতি সামান্য, কিন্তু আমার বিশ্বাস, এই সামান্য সময়টুকুই ভারতের ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে। আমরা এখানে কেবল বন্দি নই, বরং আমরা এক নতুন ইতিহাস রচনার অপেক্ষায় দিন গুনছি। এই পাথুরে নির্জনতা আমাকে হতাশ করেনি, বরং অতীতের মহানায়কদের স্মৃতি আমাকে আরও শক্তিশালী করেছে।

প্রিয় বন্ধু, ইতিহাসের এই দীর্ঘ পথ পরিক্রমা আজ এখানেই শেষ করছি। আহমেদনগর দুর্গ আমাকে শিখিয়েছে যে, সময় প্রবহমান এবং সত্যের জয় অনিবার্য। আপনার সুস্থতা কামনা করে আজকের মতো বিদায় নিচ্ছি।

আপনার বন্ধু,

আবুল কালাম

১৩. জীবন ও মৃত্যুর দর্শন (ফালসাফা-এ-হায়াত-ও-মউত)

জীবন ও মৃত্যুর দর্শন (ফালসাফা-এ-হায়াত-ও-মউত)

তারিখ: ২৭ সেপ্টেম্বর, ১৯৪২

সম্মানিত বন্ধু (সাদিক-এ-মুকাররম),

মানুষের চিন্তাজগতের সবচেয়ে বড় ধাঁধা হলো জীবন এবং মৃত্যু। আমরা কেন এই পৃথিবীতে এলাম আর কেনই বা আমাদের বিদায় নিতে হবে—এই প্রশ্নটি অনাদিকাল থেকে মানুষকে ভাবিয়ে তুলেছে। আহমেদনগর দুর্গের এই নিঃসঙ্গ দিনগুলোতে, যখন বাইরের জগতের কোলাহল স্তব্ধ হয়ে যায়, তখন এই মৌলিক প্রশ্নগুলো আমার মনের পর্দায় আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। আমি যখন এই কারাগারের নির্জনতায় বসে ভাবি, তখন মনে হয় জীবন আর মৃত্যু আসলে একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ।

অধিকাংশ মানুষ মৃত্যুকে ভয় পায় কারণ তারা একে জীবনের সমাপ্তি বলে মনে করে। কিন্তু আমি মৃত্যুকে দেখি একটি দীর্ঘ যাত্রার মাঝে একটি প্রশান্তিময় বিরতি হিসেবে। জীবন যদি একটি প্রদীপ হয়, তবে মৃত্যু সেই প্রদীপের তেল ফুরিয়ে যাওয়া নয়, বরং এক আলো থেকে অন্য আলোতে রূপান্তর মাত্র। আমি মনে করি, যে মানুষ জীবনের উদ্দেশ্য বুঝতে পেরেছে, তার কাছে মৃত্যু কোনো আতঙ্ক নয়।

এই বন্দিশালায় বসে আমি নিজের অস্তিত্বকে যখন ব্যবচ্ছেদ করি, তখন দেখি যে আমাদের শরীর এই মাটির তৈরি খাঁচায় বন্দি থাকলেও আমাদের চেতনা অবিনশ্বর। আমরা যদি কেবল শরীরের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যকেই জীবন মনে করি, তবে মৃত্যুই হবে আমাদের সবচেয়ে বড় শত্রু। কিন্তু আমরা যদি জ্ঞান, সেবা এবং সত্যের অন্বেষণকে জীবনের ব্রত করি, তবে মৃত্যু আমাদের কিছুই কেড়ে নিতে পারে না। কারণ সত্য এবং সুন্দর কখনও মরে না।

প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক থেকে শুরু করে আধ্যাত্মিক সূফী সাধক পর্যন্ত সবাই একটি বিষয়ে একমত হয়েছেন—জীবনের সার্থকতা এর দৈর্ঘ্যে নয়, বরং এর গভীরতায়। একটি দীর্ঘ কিন্তু লক্ষ্যহীন জীবনের চেয়ে একটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু অর্থবহ জীবন অনেক বেশি মূল্যবান। আমি এই কারাগারের অন্ধকারে বসে সেই আলোকবর্তিকার সন্ধান করছি যা জীবন ও মৃত্যুর এই রহস্যকে সহজ করে দেয়। মৃত্যুর ভয় তখনই মানুষের মন থেকে মুছে যায় যখন সে তার জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে উচ্চতর কোনো আদর্শের জন্য উৎসর্গ করতে শেখে।

“মৃত্যুভয় মানুষের আদিমতম ভয়গুলোর একটি। কিন্তু গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখা যায়, আমরা আসলে মৃত্যুকে ভয় পাই না, বরং আমরা ভয় পাই সেই ‘অজানা’কে যার সম্পর্কে আমাদের কোনো ধারণা নেই। আমরা আমাদের বর্তমান জীবন, আমাদের সম্পর্ক এবং এই চেনা জগতকে আঁকড়ে ধরে রাখতে চাই বলেই বিচ্ছেদের যন্ত্রণা আমাদের আতঙ্কিত করে। অথচ প্রকৃতি আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপে দেখাচ্ছে যে, মৃত্যু আসলে নতুন জন্মেরই ভূমিকা। একটি বীজের মৃত্যু না হলে যেমন বিশাল বৃক্ষের জন্ম সম্ভব নয়, তেমনি এই নশ্বর দেহের বিনাশ ছাড়া আত্মার মুক্তি ও বিকাশ অসম্ভব।

আমি মনে করি, যে ব্যক্তি তার অন্তরে বিশ্বাসের জ্যোতি জ্বালতে পেরেছে, মৃত্যু তার কাছে একটি দীর্ঘ প্রতীক্ষিত মিলনের মতো। ফারসি সাহিত্যে মৃত্যুকে প্রায়শই ‘আজীবন কারাবাস থেকে মুক্তি’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। আহমেদনগর দুর্গের এই প্রকোষ্ঠে বসে আমি যখন সেইসব মহান ব্যক্তিদের কথা ভাবি যারা সত্যের জন্য হাসিমুখে ফাঁসিকাষ্ঠে দাঁড়িয়েছিলেন, তখন বুঝতে পারি যে তারা মৃত্যুর ওপারে এক অবিনশ্বর জীবন দেখতে পেয়েছিলেন। তাঁদের কাছে মৃত্যু ছিল কেবল একটি তুচ্ছ পর্দা, যা সরিয়ে দিলেই পরম সত্যের দেখা পাওয়া যায়।

আমাদের সমাজে আমরা মৃত্যুকে নিয়ে যে শোক আর হাহাকার করি, তা মূলত আমাদের সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির বহিঃপ্রকাশ। যদি আমরা জীবনকে স্রষ্টার একটি আমানত হিসেবে দেখি, তবে সেই আমানত ফিরিয়ে দেওয়ার সময় দুঃখ করার কিছু নেই। বরং প্রশ্নটি হওয়া উচিত—আমরা আমাদের এই জীবনকে কীভাবে অতিবাহিত করেছি? আমাদের কর্ম কি মৃত্যুর পরেও আমাদের বাঁচিয়ে রাখবে?

মানুষের অমরত্বের আকাঙ্ক্ষা তার রক্তে মিশে আছে। কিন্তু প্রকৃত অমরত্ব সিংহাসনে বা পাথরের স্তম্ভে নয়, বরং মানুষের হৃদয়ে এবং ইতিহাসে নিজের সৎ কর্মের মাধ্যমে টিকে থাকার মাঝে। এই কারাগারের দেয়ালগুলো আমাকে মনে করিয়ে দেয় যে, মানুষের শরীরকে লোহার শিকলে বাঁধা সম্ভব হলেও তার চিন্তা ও আদর্শকে কখনও কবর দেওয়া যায় না। যারা জীবনকে তুচ্ছ মনে করে উচ্চতর লক্ষ্যে এগিয়ে যায়, মৃত্যু তাদের পরাজিত করতে পারে না, বরং তাদের বীরত্বের মুকুটে এক নতুন পালক যোগ করে।”

“পরিশেষে এটিই প্রতীয়মান হয় যে, জীবনের প্রকৃত সৌন্দর্য তার পরিসমাপ্তির মধ্যেই নিহিত। ফুল যদি ঝরে না পড়ত, তবে তার প্রস্ফুটিত হওয়ার কোনো মাহাত্ম্য থাকত না। মানুষের জীবনও যদি অনন্ত হতো, তবে হয়তো আমরা আলস্যে ডুবে যেতাম এবং আমাদের কর্মতৎপরতা ম্লান হয়ে যেত। মৃত্যুর অনিবার্যতা আমাদের শিখিয়েছে সময়ের মূল্য দিতে এবং প্রতিটি মুহূর্তকে সার্থক করতে।

আহমেদনগর দুর্গের এই গভীর নির্জনতায় বসে আমি যে উপলব্ধি লাভ করেছি তা হলো—মৃত্যু কোনো বিচ্ছেদ নয়, বরং এটি এক প্রকার মুক্তি। আমি যখন এই কারাগার থেকে মুক্ত হব, তখন আমার দেহ হয়তো আগের চেয়ে কিছুটা জীর্ণ হতে পারে, কিন্তু আমার আত্মা এক নতুন অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ হয়ে ফিরবে। মৃত্যু সম্পর্কেও আমার একই ধারণা। এটি জীবনের এক অধ্যায়ের শেষ এবং এক মহান অধ্যায়ের সূচনা।

প্রিয় বন্ধু, আমি চাই আপনিও এই নশ্বর জগতের সুখ-দুঃখকে এক বৃহত্তর পরিপ্রেক্ষিতে বিচার করুন। যদি আমরা মৃত্যুকে জয় করতে চাই, তবে আমাদের উচিত জীবনকে অর্থপূর্ণ করা। সত্যের জন্য যে সংগ্রাম আমরা শুরু করেছি, তার পরিণাম যাই হোক না কেন—জীবন বা মৃত্যু—উভয়ই আমাদের জন্য গৌরবের। আমি এই অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বসেও এক মহান ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখি, যেখানে মানুষের আত্মা হবে ভয়হীন এবং তার জীবন হবে সত্যের আলোয় উদ্ভাসিত।

আজকের মতো বিদায় নিচ্ছি। জীবন আমাদের যেখানেই নিয়ে যাক, আমাদের হৃদয়ের জ্যোতি যেন কখনও নির্বাপিত না হয়।

আপনার (একনিষ্ঠ) বন্ধু,

আবুল কালাম

১৪. কারাগারের জীবন ও একাকীত্ব (জিন্দান-এ-আহমেদনগর-ও-তানহাই)

কারাগারের জীবন ও একাকীত্ব (জিন্দান-এ-আহমেদনগর-ও-তানহাই)

তারিখ: ২৮ সেপ্টেম্বর, ১৯৪২

সম্মানিত বন্ধু (সাদিক-এ-মুকাররম),

আহমেদনগর দুর্গের এই নির্জনতা এখন আমার কাছে এক পরম বন্ধুতে পরিণত হয়েছে। মানুষের স্বভাব হলো সে একাকীত্বকে ভয় পায় এবং সবসময় সঙ্গ খুঁজে বেড়ায়। কিন্তু এই দুর্ভেদ্য দেয়ালগুলোর মাঝে আটকা পড়ে আমি অনুভব করছি যে, একাকীত্ব আসলে কোনো শাস্তি নয়, বরং এটি নিজেকে আবিষ্কার করার এক অনন্য সুযোগ। বাইরের জগতের কোলাহল যখন স্তব্ধ হয়ে যায়, তখনই মানুষ নিজের অন্তরের কণ্ঠস্বর শুনতে পায়।

আমার কারাগারের জীবন এক অত্যন্ত সুশৃঙ্খল রুটিনে বাঁধা। প্রতিদিন খুব ভোরে যখন চারপাশ নিস্তব্ধ থাকে, তখনই আমার দিন শুরু হয়। ভোরের সেই স্নিগ্ধ আলোয় এক কাপ চা হাতে নিয়ে আমি যখন আমার ছোট বাগানটির দিকে তাকাই, তখন আমার মনে হয় আমি এক মুক্ত জগতের বাসিন্দা। এরপর শুরু হয় আমার পড়াশোনা ও লেখালেখির কাজ। এই বইগুলোই এখন আমার একমাত্র সঙ্গী। তারা আমার সাথে কথা বলে, আমাকে নতুন নতুন জগতের খবর দেয় এবং এই লোহার গরাদগুলোকে আমার চোখের সামনে থেকে অদৃশ্য করে দেয়।

অনেকে মনে করেন যে, কারাগার মানেই বোধহয় অলস সময় কাটানো। কিন্তু আমার কাছে সময় এখানে বালুর মতো দ্রুত হাত থেকে ফসকে যায়। জ্ঞানচর্চার যে তৃষ্ণা আমার ভেতরে আছে, এই নির্জনতা তাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। আমি যখন কোনো গভীর বিষয়ে নিমগ্ন হই, তখন আমার মনে থাকে না যে আমি একজন বন্দি। আমার চিন্তার জগত এই দুর্গের পরিখা পার হয়ে সুদূর অতীতে বা অনাগত ভবিষ্যতে বিচরণ করে।

অবশ্যই, মাঝে মাঝে একাকীত্বের এক বিষণ্ণ ছায়া মনের ওপর ভর করে। বিশেষ করে সন্ধ্যার দিকে যখন সূর্যাস্তের শেষ আভা এই পাথুরে দেয়ালগুলো থেকে মুছে যায়, তখন প্রিয়জনদের কথা মনে পড়ে। কিন্তু সেই মুহূর্তেই আমি নিজেকে সামলে নিই। আমি জানি যে, এই একাকীত্ব আমাদের সংগ্রামেরই একটি অংশ। যে ব্যক্তি একাকীত্বকে জয় করতে পারে না, সে কখনও বড় কোনো লক্ষ্য অর্জন করতে পারে না। নির্জনতা আমাকে শিখিয়েছে কীভাবে নিজের মাঝেই নিজে সম্পূর্ণ থাকা যায়।

“আমার এই কারাকক্ষটি আকারে খুব বড় নয়, কিন্তু আমার প্রয়োজন মেটানোর জন্য এটিই যথেষ্ট। এখানে একটি ছোট টেবিল, একটি চেয়ার আর আমার বইপত্রের স্তূপ—এই হলো আমার সাম্রাজ্য। অনেকে জিজ্ঞেস করেন, সারাদিন এই সীমিত পরিসরের মাঝে থেকে আমার দমবন্ধ লাগে কি না। আমি হাসি এবং মনে মনে বলি, যার চিন্তার পরিধি আকাশ সমান, তাকে চার দেয়ালের মাঝে আটকে রাখা অসম্ভব। আমি যখন পড়তে বসি, তখন এই ছোট ঘরটিই লাইব্রেরি হয়ে ওঠে, আবার যখন গবেষণায় মগ্ন হই, তখন এটিই গবেষণাগারে রূপান্তরিত হয়।

আমাদের সাথে আরও অনেক বিশিষ্ট রাজনৈতিক নেতা এই দুর্গে বন্দি আছেন। মাঝে মাঝে আমাদের দেখা হয়, আলাপ-আলোচনা হয়। কিন্তু আমি অনুভব করেছি যে, প্রত্যেকেই আসলে নিজ নিজ চিন্তার জগতে একেকজন নিঃসঙ্গ যাত্রী। মানুষের ভিড়ে থেকেও যেমন মানুষ একা হতে পারে, তেমনি একা থেকেও সে বিশ্বের সাথে সংযুক্ত থাকতে পারে। আমি যখন আমার সঙ্গীদের বিষণ্ণ দেখি, আমি তাদের উৎসাহিত করার চেষ্টা করি। আমি তাদের বলি যে, এই বন্দিত্ব আমাদের শরীরের ওপর ব্রিটিশদের কর্তৃত্ব হতে পারে, কিন্তু আমাদের আত্মার ওপর তাদের কোনো অধিকার নেই।

কারাগারের এই নির্জনতা আমাকে ধৈর্য ধারণের এক নতুন শিক্ষা দিয়েছে। এখানে প্রতিটি সেকেন্ডের হিসাব আছে, অথচ পুরো দিনটি যেন এক অন্তহীন নিস্তব্ধতায় ঢাকা। এই নিস্তব্ধতাই আমাকে শিখিয়েছে যে, বাইরের জগৎ যত বেশি কোলাহলপূর্ণ, ভেতরের জগৎ তত বেশি শান্ত হওয়া প্রয়োজন। আমি এখন আর বাইরের খবরের জন্য অস্থির হই না। রেডিও বা খবরের কাগজ যা দেয়, তা কেবল ঘটনার সংবাদ; কিন্তু নির্জনতা আমাকে দেয় সেইসব ঘটনার পেছনের সত্য উপলব্ধি করার ক্ষমতা।

মাঝে মাঝে রাতে যখন প্রহরীদের বুটের শব্দ শোনা যায়, তখন মনে পড়ে যে আমরা আইনের চোখে ‘অপরাধী’। কিন্তু বিবেকের কাছে যখন প্রশ্ন করি, তখন দেখি আমরা আসলে এক মহান আদর্শের পাহারাদার। এই একাকীত্বই আমার আত্মবিশ্বাসকে আরও দৃঢ় করেছে। আমি বুঝতে পেরেছি যে, একা থাকার সামর্থ্যই মানুষের চরিত্রের প্রকৃত শক্তি। যে মানুষ নিজের সাথে নিজে সময় কাটাতে পারে না, সে বাইরের জগতের কোনো বিশৃঙ্খলা সামলাতে পারবে না।

“পরিশেষে আমি বলতে চাই, এই কারাগারের একাকীত্ব আমাকে কেবল আত্মদর্শনই শেখায়নি, বরং এটি আমাকে আমার স্রষ্টার আরও নিকটবর্তী করেছে। রাতের শেষ প্রহরে যখন সারা দুর্গ গভীর ঘুমে মগ্ন থাকে, তখন আমি অনুভব করি যে আমি একা নই। এক অসীম সত্তার উপস্থিতি আমার এই ক্ষুদ্র প্রকোষ্ঠকে এক বিশাল জ্যোতিতে ভরিয়ে দেয়। সেই সময়টুকুতে কারাগারের দেয়ালগুলো যেন স্বচ্ছ হয়ে যায় এবং আমি এক অনাবিল প্রশান্তি অনুভব করি।

মানুষ সাধারণত একাকীত্বকে শূন্যতা মনে করে, কিন্তু আমি একে পূর্ণতা হিসেবে গ্রহণ করেছি। আমার এই কারাজীবনের অভিজ্ঞতা আমাকে শিখিয়েছে যে, স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ কেবল শেকলমুক্ত হওয়া নয়, বরং নিজের ভেতরের জগতকে স্বাধীন করা। যদি আপনার মন ভয় ও লালসা থেকে মুক্ত থাকে, তবে আপনি যেখানেই থাকুন না কেন, আপনিই সম্রাট। আর যদি মন পরাধীন থাকে, তবে মুক্ত আকাশও আপনার কাছে কারাগার মনে হবে।

প্রিয় বন্ধু, আমার এই চিঠি যখন আপনার কাছে পৌঁছাবে, তখন হয়তো আপনি আপনার দৈনন্দিন ব্যস্ততায় ডুবে থাকবেন। আমি চাই আপনি মাঝে মাঝে সেই ব্যস্ততা থেকে বিরতি নিয়ে নিজের একাকীত্বের সাথে কথা বলুন। দেখবেন, নির্জনতার মাঝে এক অদ্ভুত মাদকতা আছে যা মানুষকে মহান হতে শেখায়। আহমেদনগর দুর্গের এই নিঃসঙ্গ দিনগুলো হয়তো একদিন শেষ হবে, কিন্তু নির্জনতার এই শিক্ষা আমি সারাজীবন আমার হৃদয়ে লালন করব।

আপনার বন্ধুত্বের অমলিন স্মৃতিই আমার এই নিঃসঙ্গ মুহূর্তগুলোর সবচেয়ে বড় সম্বল। ভালো থাকবেন।

আপনার (একনিষ্ঠ) বন্ধু,

আবুল কালাম

১৫. চা ও জীবনবোধ (চায়ে-নওশি)

চা ও জীবনবোধ (চায়ে-নওশি)

তারিখ: ২৯ সেপ্টেম্বর, ১৯৪২

সম্মানিত বন্ধু (সাদিক-এ-মুকাররম),

আহমেদনগর দুর্গের এই নিঃসঙ্গ দিনগুলোতে যদি আমাকে জিজ্ঞেস করা হয় যে আমার সবচেয়ে বিশ্বস্ত সঙ্গী কে, তবে আমি নির্দ্বিধায় বলব—এক কাপ সাদা চা (White Tea)। আপনি জানেন, চায়ের সাথে আমার সম্পর্ক আজকের নয়, বরং দীর্ঘ বহু বছরের। আমার কাছে চা কেবল একটি পানীয় নয়, এটি হলো চিন্তার উদ্দীপক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক কাজের অপরিহার্য জ্বালানি। এই দুর্গের নির্জনতায় যখন আমি পড়ার টেবিলে বসি, তখন ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপটি আমার সামনে না থাকলে মনে হয় আমার কলম তার গতি হারিয়ে ফেলছে।

চায়ের ইতিহাস এবং এর আদি উৎস নিয়ে আমি অনেক গবেষণা করেছি। অনেকে মনে করেন চায়ের জন্ম ভারতে, কিন্তু এটি মূলত চীনের উপহার। প্রাচীন চীনা মণীষীরা চায়ের গুণাগুণ জানতেন এবং তারা একে আধ্যাত্মিক একাগ্রতা বৃদ্ধির মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতেন। আমার পছন্দ হলো হালকা লিকারের চা, যাতে দুধ বা চিনির কোনো স্থান নেই। আমি মনে করি চায়ের আসল স্বাদ তার নিজস্ব তিতকুটে সুগন্ধে, যা দুধ আর চিনির আড়ালে ঢাকা পড়ে গেলে তার আত্মা হারিয়ে যায়।

কারাগারের এই নিয়ন্ত্রিত জীবনেও আমি আমার চায়ের সরঞ্জামের বিষয়ে কোনো আপস করিনি। আমার সাথে আমার বিশেষ চায়ের কেতলি এবং চীনামাটির কাপ রয়েছে। প্রতিদিন ভোরে যখন আমি চা তৈরি করি, তখন সেই ঘ্রাণ আমাকে এক অন্য জগতে নিয়ে যায়। জেলখানার প্রহরীরা হয়তো অবাক হয়ে দেখে যে একজন বন্দি কীভাবে এতো একাগ্রতার সাথে চা পান করতে পারে। তারা জানে না যে, এই এক কাপ চায়ের মাঝেই আমি আমার সারা দিনের মানসিক প্রশান্তি খুঁজে নিই।

অনেকে বলেন চা পান করা একটি অভ্যাস বা নেশা। আমি বলি, এটি একটি শিল্প (Art)। যেভাবে একজন শিল্পী তার তুলির আঁচড় দেন, সেভাবেই চায়ের পাতা ভেজানো এবং তার রঙ পরিবর্তনের মুহূর্তটি পর্যবেক্ষণ করা একটি ধ্যানের মতো। আমার জন্য চা হলো সেই মাধ্যম যা শরীর ও মনের ক্লান্তি দূর করে চিন্তাকে তীক্ষ্ণ করে তোলে। এই আহমেদনগর দুর্গের পাথুরে দেয়ালে ঘেরা জীবনে এই চায়ের কাপটিই যেন আমার এক চিলতে স্বাধীনতা।

“চায়ের স্বাদ মূলত নির্ভর করে তা প্রস্তুত করার পদ্ধতির ওপর। আমি লক্ষ্য করেছি, অধিকাংশ মানুষ চায়ের আসল স্বাদ গ্রহণ করতে জানে না। তারা চায়ে দুধ আর চিনির আধিক্য ঘটিয়ে তাকে এক প্রকার খাদ্যগুণসম্পন্ন পানীয়তে রূপান্তর করে, যা চায়ের প্রকৃত আভিজাত্যকে নষ্ট করে দেয়। আমার কাছে সেরা চা হলো চীনের সেই বিশেষ চা, যার পাতাগুলো ফুটন্ত পানিতে পড়ার পর ধীরে ধীরে তার নিজস্ব সুগন্ধ আর সোনালি আভা ছড়িয়ে দেয়। একে আমি ‘সাদা চা’ বা ‘লিকার চা’ বলতেই পছন্দ করি।

আহমেদনগর দুর্গের এই নিঃসঙ্গ সকালে, যখন আমি কেতলিতে পানি ফুটাই, তখন সেই বুদবুদ ওঠার শব্দ আমার কানে এক বিশেষ সংগীতের মতো শোনায়। পানি কতটুকু ফুটলে তাতে চা পাতা ছাড়তে হবে, আর কতক্ষণ তা ঢেকে রাখতে হবে—এটির একটি সুনির্দিষ্ট পরিমাপ আছে। এক মিনিট কম বা বেশি হলেই চায়ের সেই কাঙ্ক্ষিত স্বাদ নষ্ট হয়ে যেতে পারে। আমি যখন একা একা এই চা পান করি, তখন আমার মনে হয় এটি কেবল একটি পানীয় নয়, বরং এটি আমার চিন্তার জগতের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।

ইউরোপীয়রা চায়ে চিনি মেশায়, যা আমার কাছে বড়ই অদ্ভুত মনে হয়। চিনির মিষ্টি স্বাদ চায়ের সেই প্রাকৃতিক তিক্ততাকে ঢেকে দেয়, অথচ সেই তিতকুটে ভাবটাই হলো চায়ের প্রাণ। আমি যখন পড়তে বসি, বিশেষ করে যখন কোনো দর্শনের বই বা ইতিহাসের জটিল পাতা ওল্টাই, তখন এই চা আমার মস্তিষ্ককে সজাগ রাখে। অনেক সময় এক কাপ চা হাতে নিয়ে আমি ঘন্টার পর ঘন্টা জানালার বাইরে তাকিয়ে কাটাই, আর আমার মনের ভেতরে তখন নতুন নতুন চিন্তার উদয় হয়।

কারাগারে আমাদের জন্য যে খাবার দেওয়া হয়, তা হয়তো অনেক সময় রুচিকর হয় না, কিন্তু এই চায়ের অভ্যাসটি আমাকে তৃপ্ত রাখে। আমি আমার বন্ধুদের অনেক সময় মজা করে বলি যে, আমাকে যদি কেবল এক বাক্স ভালো চা পাতা আর পড়ার মতো কিছু বই দেওয়া হয়, তবে আমি সারা জীবন এই নির্জন প্রকোষ্ঠে কাটিয়ে দিতে পারব। কারণ চা মানুষের একাকীত্বকে উপভোগ্য করে তোলে এবং তাকে এক অন্য উচ্চতায় নিয়ে যায় যেখানে বাহ্যিক অভাব-অভিযোগ আর প্রাধান্য পায় না।”

“চায়ের এই মাহাত্ম্য কেবল এর স্বাদে নয়, বরং এর সাহচর্যে। জীবন যখন তিক্ত মনে হয়, তখন এক কাপ চা যেন সেই তিতকুটে ভাবকে সহজভাবে গ্রহণ করার শক্তি দেয়। আমি যখন আমার অতীত জীবনের দিকে তাকাই, দেখি কত শত আলাপ-আলোচনা, কত গভীর চিন্তা আর কত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত এই এক কাপ চায়ের ধোঁয়ার মাঝে জন্ম নিয়েছে। এটি কেবল একটি অভ্যাস নয়, এটি আমার জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য সংস্কৃতি।

আহমেদনগর দুর্গের এই পাথুরে নির্জনতায় এই চায়ের সুগন্ধই আমাকে বাইরের জগতের সাথে যুক্ত রাখে। যখন আমি এই চা পান করি, তখন আমার মনে হয় এটি যেন সেই সময়ের প্রতীক যা আমাদের জীবনের অস্থিরতাকে শান্ত করে। মানুষ যখন নিজের মনের সাথে কথা বলতে চায়, তখন চা-ই হয় তার সেরা সঙ্গী। এই দুর্গের প্রহরীরা যখন আমাকে চায়ের কাপ হাতে ধ্যানমগ্ন দেখে, তারা হয়তো ভাবে আমি দুঃখিত; অথচ তারা জানে না যে সেই মুহূর্তে আমি হৃদয়ের এক গভীর আনন্দ উপভোগ করছি।

প্রিয় বন্ধু, আমি জানি আপনিও চায়ের কদর করতে জানেন। হয়তো আজ আমরা একসাথে বসে এক কেতলি থেকে চা ভাগ করে নিতে পারছি না, কিন্তু দূর থেকে আমাদের এই রুচির মিল আমাদের আত্মার যোগাযোগকে আরও সুদৃঢ় করে। যখনই আপনি এক কাপ ভালো চা পান করবেন, জানবেন যে আপনার এই বন্ধুটিও এই কেল্লার এক কোণে বসে ঠিক আপনার মতোই তৃপ্তি অনুভব করছে।

চা আমাদের শেখায় কীভাবে ধৈর্য ধরে সুগন্ধের অপেক্ষা করতে হয়। জীবনের এই কঠিন সময়গুলোকেও আমি সেই চা পাতার মতোই দেখছি, যা কষ্টের উত্তাপে ভিজে নিজের ভেতরের শ্রেষ্ঠ নির্যাসটুকু বের করে আনছে। আজ এই চায়ের গল্পের মাধ্যমেই পত্র শেষ করছি।

ভালো থাকবেন এবং জীবনের প্রতিটি চুমুক উপভোগ করবেন।

আপনার (একনিষ্ঠ) বন্ধু,

আবুল কালাম

১৬. ধৈর্য ও সহনশীলতা (সবর-ও-ইস্তেকামত)

ধৈর্য ও সহনশীলতা (সবর-ও-ইস্তেকামত)

তারিখ: ৩০ সেপ্টেম্বর, ১৯৪২

সম্মানিত বন্ধু (সাদিক-এ-মুকাররম),

মানুষের চরিত্রের প্রকৃত পরীক্ষা হয় সংকটের সময়ে। যখন চারপাশ থেকে প্রতিকূলতা আমাদের ঘিরে ধরে, তখনই বোঝা যায় আমাদের ভেতরের শক্তি কতটুকু। আহমেদনগর দুর্গের এই বন্দিজীবনে আমি একটি বিষয় গভীরভাবে উপলব্ধি করেছি—ধৈর্য বা ‘সবর’ কেবল মুখ বুজে সয়ে যাওয়ার নাম নয়, বরং এটি হলো প্রতিকূলতার মাঝেও নিজের মানসিক ভারসাম্য বজায় রাখার এক সক্রিয় শক্তি। একেই আমি বলি ‘ইস্তেকামত’ বা অবিচলতা।

অধিকাংশ মানুষ বিপদে পড়লে অস্থির হয়ে ওঠে এবং ভাগ্যের দোহাই দিয়ে ভেঙে পড়ে। কিন্তু একজন চিন্তাশীল মানুষের কাছে বিপদ হলো নিজেকে শাণিত করার এক অনন্য সুযোগ। এই কারাগারের দেয়ালগুলো হয়তো আমাদের শরীরকে বন্দি করেছে, কিন্তু তারা আমাদের সংকল্পকে স্পর্শ করতে পারেনি। আমি যখন দেখি আমার সঙ্গীরা মাঝে মাঝে অধৈর্য হয়ে উঠছেন, তখন আমি তাদের বলি যে, সময়ের প্রতিটি মুহূর্তই আমাদের কিছু না কিছু শেখাতে আসে। এই বন্দিত্ব আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে অভাবের মাঝেও তৃপ্ত থাকতে হয় এবং কীভাবে নির্জনতাকে শক্তিতে রূপান্তর করতে হয়।

আমার জীবনে আমি অনেক উত্থান-পতন দেখেছি। রাজনৈতিক জীবনের কোলাহল আর এই কারাবাসের নিস্তব্ধতা—উভয়কেই আমি সমান চিত্তে গ্রহণ করেছি। এর কারণ হলো, আমি বিশ্বাস করি যা কিছু ঘটে তা এক বৃহত্তর পরিকল্পনারই অংশ। যদি আমরা ধৈর্য হারাই, তবে আমরা কেবল নিজেদের কষ্টই বাড়াই না, বরং আমরা আমাদের লক্ষ্য থেকেও বিচ্যুত হই। সবর বা ধৈর্য হলো সেই বর্ম যা আমাদের আত্মাকে বাইরের আঘাত থেকে রক্ষা করে।

আমি যখন পড়ার টেবিলে বসি, তখন অনেক সময় বাইরের প্রহরীদের কর্কশ চিৎকার বা বুটের শব্দ কানে আসে। এক সময় এটি আমাকে বিরক্ত করত, কিন্তু এখন আমি সেই শব্দগুলোর মাঝেও এক প্রকার ছন্দ খুঁজে পাই। আমি নিজেকে এমনভাবে প্রস্তুত করেছি যে, বাইরের কোনো বিশৃঙ্খলা আমার ভেতরের প্রশান্তিকে নষ্ট করতে পারে না। এই মানসিক দৃঢ়তাই হলো একজন মুমিনের প্রকৃত সম্পদ। যে ব্যক্তি নিজের নফস বা মনের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে, পৃথিবীর কোনো কারাগারই তার জন্য অন্ধকার নয়।

“ইতিহাসের পাতায় তাকালে দেখা যায়, যত মহান বিপ্লব বা পরিবর্তন এসেছে, তার মূলে ছিল একদল মানুষের অটল ধৈর্য এবং অবিচল সংকল্প। তারা কেবল প্রতিকূলতার মোকাবিলা করেননি, বরং সেই প্রতিকূলতাকে নিজেদের উন্নতির সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করেছেন। আমি যখন কারাগারে প্রাচীন মণীষীদের জীবনী পড়ি, তখন দেখি যে তারা বন্দিত্বকে কখনো অভিশাপ মনে করেননি। বরং নির্জনতার এই সময়টুকুকে তারা গভীর চিন্তা ও গবেষণার কাজে ব্যয় করেছেন। ধৈর্য মানে অলসভাবে বসে থাকা নয়, বরং প্রতিকূল সময়ের সদ্ব্যবহার করা।

আহমেদনগর দুর্গের এই নিঃসঙ্গ দিনগুলোতে আমি যখন আমার সঙ্গীদের মাঝে অস্থিরতা দেখি, তখন আমি তাদের ধৈর্য ধরার পরামর্শ দেই। মানুষের মনের অবস্থা অনেক সময় আবহাওয়া বা বাইরের পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে, কিন্তু প্রকৃত ‘সবর’ হলো পরিস্থিতির ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। জেলখানার প্রতিটি মুহূর্ত আমাদের সহ্যশক্তিকে পরীক্ষা করে। কখনো খাবারের মান নিয়ে, কখনো বাইরে থাকা প্রিয়জনদের খবর না পাওয়া নিয়ে মন ব্যাকুল হয়ে ওঠে। কিন্তু এই অস্থিরতা আমাদের কোনো কাজে আসে না, বরং তা আমাদের মানসিক শক্তিকে ক্ষয় করে।

আমি বিশ্বাস করি, ধৈর্য হলো একটি আধ্যাত্মিক সাধনা। এটি মানুষকে বিনয়ী করে এবং অন্যের প্রতি সহমর্মিতা শেখায়। যখন কেউ বছরের পর বছর বন্দি থাকে, তখন তার ভেতরের সমস্ত অহংকার আর দম্ভ ধুলোয় মিশে যায়। সে বুঝতে পারে যে মানুষের ক্ষমতা কত সীমাবদ্ধ। এই উপলব্ধিই তাকে প্রকৃত ধৈর্যের স্বাদ দেয়। আমি এখানে বসে যখন লিখি বা পড়ি, তখন আমি সময়ের গতির ওপর জোর দেই না। বরং আমি প্রতিটি মুহূর্তকে তার নিজস্ব রঙে গ্রহণ করি।

যদি আমরা ধৈর্য ধরতে শিখি, তবে এই কারাগারের লোহার গরাদগুলোও আমাদের কাছে বাধার পরিবর্তে সুরক্ষার প্রতীক মনে হবে। বাইরের জগতের প্রলোভন আর কোলাহল থেকে দূরে থেকে নিজের অন্তরের সাথে এই যে মোলাকাত, তা ধৈর্যের মাধ্যমেই সম্ভব। যারা অধৈর্য, তারা কেবল মুক্তির দিন গণনা করে দিন শেষ করে; আর যারা ধৈর্যশীল, তারা প্রতিটি দিনকে এক একটি নতুন প্রাপ্তি হিসেবে দেখে। আমি চাই আমাদের এই বন্দিত্ব যেন বৃথা না যায়, বরং এটি যেন আমাদের চরিত্রের এক অপরাজেয় ভিত্তি তৈরি করে।

“পরিশেষে এটিই সত্য যে, ধৈর্য বা ‘সবর’ কোনো দুর্বলতা নয়, বরং এটি আত্মিক শক্তির চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ। একজন মানুষের আসল পরিচয় তার সফলতায় নয়, বরং সে কতটুকু ধৈর্য ও বীরত্বের সাথে প্রতিকূলতাকে মোকাবিলা করেছে তার ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হয়। আহমেদনগর দুর্গের এই বন্দিত্ব আমাদের শরীরের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারে, কিন্তু আমাদের মন এবং সংকল্প যদি ধৈর্যের শক্তিতে বলীয়ান থাকে, তবে আমরা পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তেই থাকি না কেন—আমরাই বিজয়ী।

আমি যখন রাতের নিস্তব্ধতায় এই দুর্গের বুরুজগুলোর দিকে তাকাই, তখন আমার মনে হয় এগুলো যেন হাজার বছর ধরে ধৈর্যের প্রতীক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে। তারা কত ঝড়-ঝাপটা আর কত পরিবর্তন দেখেছে, তবুও তাদের ভিত্তি আজ পর্যন্ত অটল। আমাদের ধৈর্যকেও এই পাথুরে দেয়ালগুলোর মতোই মজবুত করতে হবে। সময়ের চাকা ঘুরবেই, আর কষ্টের এই মেঘগুলোও একদিন কেটে যাবে। তখন যারা ধৈর্যের সাথে এই সময়টুকু পার করেছে, তারাই নতুন ভোরের সূর্যকে সবচেয়ে আনন্দচিত্তে স্বাগত জানাতে পারবে।

প্রিয় বন্ধু, আমি চাই আপনিও এই দর্শনে বিশ্বাসী হন। জীবনের কোনো সমস্যাই আপনার মানসিক শান্তি কেড়ে নেওয়ার ক্ষমতা রাখে না, যদি আপনি ধৈর্যের বর্ম পরে থাকেন। ধৈর্য মানুষকে কেবল শান্তই করে না, বরং এটি মানুষের দূরদৃষ্টিকে প্রসারিত করে। আজ এই পর্যন্তই। কারাগারের এই দিনগুলো আমাদের আরও উন্নত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলুক—এই প্রত্যাশাই করি।

আপনার (একনিষ্ঠ) বন্ধু,

আবুল কালাম

১৭. আহমেদনগর দুর্গের পাখি ও প্রকৃতি (পারিন্দে-এ-আহমেদনগর)

আহমেদনগর দুর্গের পাখি ও প্রকৃতি (পারিন্দে-এ-আহমেদনগর)

তারিখ: ১ অক্টোবর, ১৯৪২

সম্মানিত বন্ধু (সাদিক-এ-মুকাররম),

মানুষ যখন চার দেয়ালের মাঝে বন্দি থাকে, তখন প্রকৃতির ক্ষুদ্রতম পরিবর্তনও তার কাছে এক বিশাল অর্থ নিয়ে হাজির হয়। আহমেদনগর দুর্গের এই পাথুরে নির্জনতায় আমার সবচেয়ে প্রিয় সঙ্গী হলো এই আকাশের নীলিমা আর দুর্গের ফাটলে বাসা বাঁধা পাখপাখালি। আমি যখন আমার ঘরের বাইরের ছোট বারান্দায় বসি, তখন দেখি যে এই পাখিরা মানুষের তৈরি আইন বা কারাগারের প্রাচীরকে তোয়াক্কা করে না। তাদের অবাধ ওড়াউড়ি আমাকে প্রতিনিয়ত স্বাধীনতার কথা মনে করিয়ে দেয়।

এখানের পাখিদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে চড়ুই পাখি। তারা বড়ই চঞ্চল এবং নির্ভীক। দুর্গের পুরনো দেয়ালের ফাটলে তারা বাসা বেঁধেছে। সারাদিন তাদের কিচিরমিচির আর ওড়াওড়ি এই নিস্তব্ধ কারাগারকে কিছুটা হলেও জীবন্ত করে রাখে। আমি যখন পড়তে বসি, তখন মাঝে মাঝে দু-একটি চড়ুই সাহস করে আমার ঘরের ভেতরেও ঢুকে পড়ে। তারা আমার টেবিলের ওপর দিয়ে হেঁটে বেড়ায়, যেন তারা আমাকে বলতে চায়—’তুমি বন্দি হতে পারো, কিন্তু আমরা এই পৃথিবীর প্রতিটি কোণের খবর নিয়ে এসেছি।’

আমি এই পাখিদের জন্য মাঝে মাঝে রুটির টুকরো বা শস্যদানা ছড়িয়ে দিই। প্রথমে তারা কিছুটা সন্দিহান থাকলেও, এখন তারা আমাকে চিনে ফেলেছে। দানা ফেলার সাথে সাথেই তারা ঝাঁক বেঁধে নেমে আসে। এই দৃশ্যটি আমার কাছে এক অদ্ভুত প্রশান্তি বয়ে আনে। প্রকৃতির এই যে সরলতা, যেখানে কোনো কৃত্রিমতা নেই, তা আমাকে মানুষের তৈরি জটিল জগত থেকে ক্ষণিকের জন্য দূরে সরিয়ে নেয়।

চড়ুই ছাড়াও আমি এখানে কিছু চিল এবং বাজপাখি দেখতে পাই, যারা অনেক উঁচুতে চক্কর কাটে। তাদের সেই রাজকীয় ওড়াউড়ি দেখে মনে হয়, এই আকাশটাই আসলে তাদের সাম্রাজ্য। এই কারাগার কেবল আমাদের মতো মানুষের জন্য, কিন্তু যারা ডানা মেলতে জানে, তাদের জন্য পুরো মহাবিশ্বই উন্মুক্ত। আমি যখন তাদের দিকে তাকাই, তখন আমার মনে হয় মানুষের চিন্তার জগতটাও যদি এমন ডানাওয়ালা হতো, তবে কোনো শাসকই তাকে বন্দি করতে পারত না।

“এই চড়ুই দম্পতিদের জীবন পর্যবেক্ষণ করা আমার প্রতিদিনের এক বিনোদনে পরিণত হয়েছে। তারা যখন তাদের বাসার জন্য খড়কুটো জোগাড় করে আনে, তখন তাদের মাঝে এক অদ্ভুত কর্মতৎপরতা দেখা যায়। অনেক সময় তারা আমার ঘরের রোশনদান (ঘুলঘুলি) বা দরজার উপরের ফাঁকা জায়গায় বাসা তৈরি করার চেষ্টা করে। আমি তাদের বিরক্ত করি না, বরং তাদের এই নিরন্তর প্রচেষ্টা দেখে অবাক হই। প্রকৃতির এই ক্ষুদ্র জীবগুলো আমাদের শেখায় যে, জীবন মানেই হলো অবিরাম সংগ্রাম এবং নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার এক সুন্দর লড়াই।

এক জোড়া চড়ুই তো আমার ঘরের ভেতরেই আধিপত্য বিস্তার করে ফেলেছে। তারা কেবল দানা খেতে আসে না, বরং ঘরের ভেতর দিয়ে উড়ে যাওয়ার সময় ডানা ঝাপটিয়ে এক প্রকার ঘোষণা দেয় যে এই ঘরটিও এখন তাদের অংশ। মাঝে মাঝে তারা আমার বইয়ের ওপর এসে বসে এবং খুব তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকায়, যেন তারা আমার লেখালেখি নিয়ে কোনো বিচার বিশ্লেষণ করছে। তাদের এই সহজ-সরল চঞ্চলতা আমাকে মনে করিয়ে দেয় যে, আনন্দ আসলে খুব ছোট ছোট জিনিসের মাঝে লুকিয়ে থাকে, যদি আমাদের দেখার চোখ থাকে।

আমি লক্ষ্য করেছি যে, এই পাখিদের মধ্যেও এক প্রকার গোষ্ঠীগত শৃঙ্খলা রয়েছে। যখন কোনো চিল বা বাজপাখি আকাশের উঁচুতে চক্কর দেয়, তখন এই চড়ুইগুলো মুহূর্তের মধ্যে সতর্ক হয়ে যায় এবং গাছের আড়ালে বা দেয়ালের ফাটলে আত্মগোপন করে। তাদের এই জীবনবোধ অত্যন্ত প্রখর। এই দুর্গের প্রাচীর তাদের উড়ালকে বাধা দিতে পারে না, কিন্তু তারা প্রকৃতির নিয়মগুলোকে অক্ষরে অক্ষরে পালন করে চলে।

এই নিঃসঙ্গ কারাজীবনে এই পাখিরা আমাকে একটি বড় শিক্ষা দিয়েছে। তারা দেখিয়েছে যে, স্বাধীনতা কোনো বাহ্যিক অবস্থার নাম নয়, বরং এটি একটি অভ্যন্তরীণ চেতনা। তারা যেমন সীমিত খাবারের মাঝেও তৃপ্ত থাকে এবং ছোট একটি বাসার জন্য সারাদিন পরিশ্রম করে আনন্দ পায়, আমরাও যদি আমাদের জীবনের এই বন্দিদশাকে মেনে নিয়ে এর ভেতরেই সৃজনশীল কিছু করতে পারি, তবে এই বন্দিত্ব আর বোঝা মনে হবে না। চড়ুইদের কিচিরমিচির এখন আমার কাছে আর কোনো কোলাহল নয়, বরং এটি জীবনের এক ছন্দময় সংগীত যা আমাকে একাকীত্বের গ্লানি থেকে মুক্তি দেয়।”

“প্রকৃতির এই ক্ষুদ্র প্রাণীদের সাথে আমার এই সখ্যতা আমাকে এক গভীর সত্যের মুখোমুখি করেছে। আমরা মানুষরা মনে করি যে আমরাই এই জগতের শ্রেষ্ঠ এবং আমাদের স্বাধীনতা বা বন্দিত্বই সবচেয়ে বড় ঘটনা। কিন্তু এই পাখিদের কাছে আমাদের এই দুর্গ, এই জেলখানা বা আমাদের রাজনৈতিক সংগ্রামের কোনো মূল্য নেই। তাদের কাছে প্রতিটি দিনই এক নতুন উৎসব, প্রতিটি সূর্যোদয়ই এক নতুন সম্ভাবনা। তারা আমাকে শিখিয়েছে যে, জীবনকে খুব বেশি গুরুত্ব দিয়ে জটিল করার চেয়ে একে প্রকৃতির সহজ নিয়মে প্রবাহিত হতে দেওয়া অনেক বেশি শান্তির।

মাঝে মাঝে যখন বৃষ্টি নামে, তখন এই পাখিরা ভিজে চুপসে একাকার হয়ে যায়। কিন্তু বৃষ্টি থামার সাথে সাথেই তারা ডানা ঝাপটিয়ে পানি ঝরিয়ে আবার কিচিরমিচির শুরু করে। তাদের এই ‘বর্তমান’-এ বেঁচে থাকার ক্ষমতা আমাকে মুগ্ধ করে। তারা অতীতের শোক বা ভবিষ্যতের দুশ্চিন্তা নিয়ে সময় নষ্ট করে না। আমি যখন এই কারাগার থেকে একদিন মুক্ত হব, তখন হয়তো এই চড়ুইদের কিচিরমিচির মিস করব। এই পাথুরে দেয়ালগুলো আমার স্মৃতির পাতায় ধূসর হয়ে গেলেও, এই পাখিদের ডানা ঝাপটানোর শব্দ আমার হৃদয়ে অমলিন থাকবে।

প্রিয় বন্ধু, আমি চাই আপনিও আপনার ব্যস্ত জীবনের মাঝে প্রকৃতির এই ছোটখাটো দানগুলোর দিকে নজর দিন। একটি ফুটন্ত ফুল বা একটি উড়ন্ত পাখি আমাদের যে নিরবচ্ছিন্ন আনন্দ দিতে পারে, তা পৃথিবীর দামী কোনো বস্তু দিতে পারবে না। আহমেদনগর দুর্গের এই নিঃসঙ্গ দিনগুলোতে এই পাখিরাই ছিল আমার শিক্ষক। তারা আমাকে শিখিয়েছে কীভাবে খাঁচার ভেতরে থেকেও মুক্ত মনের আকাশ খুঁজে নিতে হয়।

আজ এখানেই শেষ করছি। প্রকৃতি আমাদের সবার হৃদয়ে প্রশান্তি ফিরিয়ে আনুক—এই দোয়াই করি।

আপনার (একনিষ্ঠ) বন্ধু,

আবুল কালাম

১৮. জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতা ও মানুষের স্বভাব (নফসিয়াত-এ-ইনসানি)

জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতা ও মানুষের স্বভাব (নফসিয়াত-এ-ইনসানি)

তারিখ: ৩ অক্টোবর, ১৯৪২

সম্মানিত বন্ধু (সাদিক-এ-মুকাররম),

আহমেদনগর দুর্গের এই নিভৃতবাস আমাকে মানুষের স্বভাব এবং মনস্তত্ত্ব নিয়ে ভাবার এক অখণ্ড অবসর দিয়েছে। জীবন এক বিশাল পাঠশালা, আর মানুষ হলো তার সবচেয়ে জটিল পাঠ্য। আমি আমার জীবনের দীর্ঘ সফরে কত বিচিত্র স্বভাবের মানুষের সংস্পর্শে এসেছি, তার কোনো হিসাব নেই। আমি দেখেছি, মানুষের বাহ্যিক আচরণ অনেক সময় তার অভ্যন্তরীণ সত্তার একদম বিপরীত হয়। কেউ হয়তো বাইরে খুব কঠোর, কিন্তু তার ভেতরে লুকিয়ে আছে এক কোমল হৃদয়; আবার কেউ হয়তো মুখে মধু ঢালে, কিন্তু তার মনের কোণে বিষ জমা থাকে।

মনস্তত্ত্ব বা ‘নফসিয়াত’ এমন এক সমুদ্র যার কোনো কূল নেই। একজন মানুষ যখন কোনো নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে পড়ে, তখন তার আসল চেহারা বেরিয়ে আসে। এই কারাগারের জীবনও আমাদের সবার আসল সত্তাকে উন্মোচিত করে দিচ্ছে। আমি লক্ষ্য করেছি, সংকটের সময় কিছু মানুষ ধৈর্য হারিয়ে নিজেদের নীচতা প্রকাশ করে ফেলে, আবার কিছু মানুষ অসীম সহনশীলতার পরিচয় দিয়ে নিজেদের উচ্চতাকে প্রমাণ করে। মানুষের স্বভাব আসলে কোনো স্থির বস্তু নয়, এটি পরিস্থিতির ঘাত-প্রতিঘাতে পরিবর্তিত হয়।

আমি যখন অতীত স্মৃতির পাতায় চোখ বুলাই, তখন দেখি যে আমাদের সমাজব্যবস্থা মানুষের সহজাত প্রবৃত্তিকে কতভাবে দমন করে রাখে। আমরা সবাই এক একটি মুখোশ পরে ঘুরি। কিন্তু এখানে, এই জনশূন্য দুর্গে, সেই মুখোশগুলোর আর কোনো প্রয়োজন নেই। নির্জনতা মানুষের অহংকারকে চূর্ণ করে দেয় এবং তাকে তার নিজ আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। আমি মনে করি, যে ব্যক্তি নিজেকে চিনতে পেরেছে, সে আসলে পুরো মানবজাতিকেই চিনতে পেরেছে।

মানুষের স্বভাবের একটি অদ্ভুত দিক হলো তার বৈপরীত্য। একই মানুষের মধ্যে যেমন দয়া আর ক্ষমা থাকে, তেমনি থাকে হিংসা আর লালসা। এই দুই বিপরীত শক্তির লড়াই-ই মানুষের জীবনকে নাটকীয় করে তোলে। আমি আমার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, অধিকাংশ মানুষই আসলে নিজেদের অন্তরের অন্ধকারকে ভয় পায়। তাই তারা সবসময় বাইরের কোলাহল আর ভিড়ের মাঝে নিজেদের লুকিয়ে রাখতে চায়। কিন্তু নির্জনতা সেই অন্ধকারকে মোকাবিলা করতে শেখায় এবং মানুষকে তার আদি ও অকৃত্রিম সত্তার সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়।

“মানুষের চরিত্রের অন্যতম রহস্য হলো তার বুদ্ধিবৃত্তি (আকল) এবং প্রবৃত্তি বা আবেগের (নাফস) মধ্যকার চিরন্তন দ্বন্দ্ব। আমি দেখেছি, অনেক উচ্চশিক্ষিত মানুষও সংকটের মুহূর্তে তাদের আদিম প্রবৃত্তির কাছে পরাজিত হন। আবার অনেক সাধারণ মানুষ, যাদের কোনো পুঁথিগত বিদ্যা নেই, তারা তাদের চরিত্রের এমন দৃঢ়তা প্রদর্শন করেন যা বড় বড় দার্শনিকদেরও হার মানায়। এর কারণ হলো, মানুষের আসল পরিচয় তার মস্তিস্কের তথ্যে নয়, বরং তার হৃদয়ের গভীরতায়।

আহমেদনগর দুর্গের এই বন্দিশালায় আমি লক্ষ্য করেছি, মানুষের স্বভাবের একটি বড় অংশ তার অভ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। যারা বাইরের জগতের জাঁকজমক আর প্রশংসার ওপর ভিত্তি করে নিজেদের জীবন সাজিয়েছিলেন, তারা এখানে এসে সবচেয়ে বেশি ভেঙে পড়েছেন। কারণ এখানে তাদের সেই মেকি আভিজাত্যের কোনো মূল্য নেই। কিন্তু যারা নিজেদের ভেতরের জগতকে সমৃদ্ধ করেছিলেন, তারা এই বিরূপ পরিবেশেও নিজেদের প্রফুল্ল রাখতে পারছেন। মানুষের স্বভাবের এই যে বিভাজন, তা কেবল কারাগারেই স্পষ্ট দেখা যায়।

আমার দীর্ঘ রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনে আমি বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের সাথে মিশেছি—রাজা-বাদশাহ থেকে শুরু করে পথের ভিখারি পর্যন্ত। আমি অনুভব করেছি যে, মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি সব জায়গায় একই রকম। ভয়, লোভ, ঈর্ষা আর ভালোবাসা—এই চারটি আবেগই মূলত মানুষকে পরিচালিত করে। তবে একজন মহান মানুষের বৈশিষ্ট্য হলো তিনি এই আবেগগুলোকে বুদ্ধির শাসনে রাখতে পারেন। আমি যখন আমার অতীত অভিজ্ঞতার পাতা ওল্টাই, তখন দেখি যে আমরা অনেক সময় মানুষকে তার বাইরের আবরণ দেখে বিচার করি, যা আসলে এক চরম ভুল।

মানুষের স্বভাবের আরেকটি বিচিত্র দিক হলো তার সহনশীলতার সীমা। মানুষ এক অদ্ভুত প্রাণী, যে একইসাথে অত্যন্ত নমনীয় আবার পাথরের মতো শক্ত হতে পারে। পরিস্থিতির চাপে কেউ যেমন ধুলোয় মিশে যায়, কেউ আবার সেই চাপকেই শক্তিতে রূপান্তর করে ইস্পাত হয়ে ওঠে। এই কারাগারের প্রতিটি দিন আমাকে মানুষের মনস্তত্ত্বের এক একটি নতুন পাঠ দিচ্ছে। আমি বুঝতে পারছি যে, জীবনের সার্থকতা কেবল ভালো অবস্থায় ভালো থাকায় নয়, বরং খারাপ অবস্থাতেও নিজের মনুষ্যত্ব আর স্বভাবের মাধুর্য ধরে রাখার মাঝে।”

পরিশেষে এটিই বলতে চাই যে, মানুষের স্বভাবের এই বিচিত্রতা জীবনকে এক অনন্য গভীরতা দান করে। যদি সবাই একই ছাঁচে তৈরি হতো, তবে এই পৃথিবী হতো এক বৈচিত্র্যহীন মরুভূমি। মানুষের ভুল, তার দুর্বলতা এবং সেই দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার প্রচেষ্টাই তাকে প্রকৃত ‘মানুষ’ করে তোলে। আমি আমার জীবনে যাদের শত্রু মনে করেছি, তাদের স্বভাব বিশ্লেষণ করেও আমি অনেক কিছু শিখেছি। ঘৃণা নয়, বরং কৌতূহল দিয়ে মানুষের মনস্তত্ত্বকে বিচার করলে জীবনের অনেক জটিল রহস্যের সমাধান পাওয়া যায়।

আহমেদনগর দুর্গের এই নিঃসঙ্গ দিনগুলো আমাকে শিখিয়েছে যে, অন্যের স্বভাব বদলানোর চেয়ে নিজের স্বভাবকে সংস্কৃত করা অনেক বেশি জরুরি। আমরা সারা জীবন অন্যদের সংশোধন করতে চাই, অথচ নিজের ভেতরের যে অলিগলি আছে, সেখানে কখনো প্রবেশ করি না। এই কারাবাস আমাকে সেই সুযোগ করে দিয়েছে। আমি এখন মানুষের যেকোনো আচরণকে অতি সহজে মেনে নিতে পারি, কারণ আমি জানি প্রতিটি আচরণের পেছনে রয়েছে তার দীর্ঘ লালিত অভ্যাস এবং পরিস্থিতির চাপ।

প্রিয় বন্ধু, জগতের এই বিচিত্র মানুষের মেলায় আপনি হয়তো অনেক সময় হতাশ হন। কিন্তু মনে রাখবেন, অন্ধকার না থাকলে যেমন আলোর গুরুত্ব বোঝা যায় না, তেমনি মন্দ মানুষের উপস্থিতি ছাড়া ভালো মানুষের মাহাত্ম্য প্রকাশ পায় না। মানুষের স্বভাবের এই ঘাত-প্রতিঘাতকে জীবনেরই অলঙ্কার মনে করুন। আমি এই নির্জনতায় বসে প্রার্থনা করি, আমাদের চরিত্র যেন সংকীর্ণতা থেকে মুক্ত হয়ে এক বিশাল হৃদয়ে পরিণত হয়, যেখানে সবার জন্য স্থান থাকবে।

আজ এই মনস্তত্ত্বের গলি থেকেই বিদায় নিচ্ছি। জীবনের বাকি সফরটুকু যেন আমরা মানুষের প্রতি গভীর মমতা ও সঠিক বিচারবোধ নিয়ে শেষ করতে পারি।

আপনার  (একনিষ্ঠ) বন্ধু,

আবুল কালাম

১৯. আহমেদনগর দুর্গের ঋতু পরিবর্তন ও বসন্তের আগমন (আমদ-এ-বাহার)

আহমেদনগর দুর্গের ঋতু পরিবর্তন ও বসন্তের আগমন (আমদ-এ-বাহার)

তারিখ: ৪ অক্টোবর, ১৯৪২

সম্মানিত বন্ধু (সাদিক-এ-মুকাররম),

প্রকৃতি তার আপন নিয়মে চলে, মানুষের তৈরি কারাগার বা শেকল তাকে থামিয়ে রাখতে পারে না। আহমেদনগর দুর্গের এই ধূসর দেয়ালগুলোর ভেতরে যখন আমি দিন কাটাচ্ছিলাম, তখন হঠাৎ একদিন অনুভব করলাম বাতাসের গন্ধ বদলে গেছে। বসন্ত তার অদৃশ্য পায়ে এই দুর্গের প্রাঙ্গণেও পা রেখেছে। কারাগারের এই শুষ্ক ও প্রাণহীন পরিবেশে বসন্তের আগমন এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের সৃষ্টি করেছে। বাইরে যখন নতুন পাতা আর ফুলের সমারোহ, তখন এই পাথুরে দেয়ালগুলো যেন আরও বেশি ম্লান মনে হচ্ছে।

আমি যখন সকালে আমার ছোট বাগানটিতে যাই, তখন দেখি পুরনো ডালপালা ফেটে কচি সবুজ পাতা উঁকি দিচ্ছে। প্রকৃতির এই পুনর্জাগরণ আমাকে এক গভীর সত্য মনে করিয়ে দেয়—ধ্বংসের ভেতরেই সৃষ্টির বীজ লুকিয়ে থাকে। শীতের তীব্রতায় যে গাছগুলোকে মৃত মনে হয়েছিল, বসন্তের পরশে সেগুলোই আবার সজীব হয়ে উঠেছে। আমাদের জীবনও কি এমন নয়? দুঃখের দীর্ঘ শীতের পরেই সুখের বসন্ত আসে, কেবল ধৈর্য ধরে সেই সময়ের অপেক্ষা করতে হয়।

বসন্তের এই হাওয়ায় আমার বন্দি মনটা বারবার কারাগারের বাইরে চলে যেতে চায়। আমি কল্পনা করি সেইসব উপত্যকার কথা, যেখানে এখন বুনো ফুলের মেলা বসেছে। কিন্তু পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিই। আমি অনুভব করি, বসন্ত কেবল বাইরের কোনো ঋতু নয়, এটি মনেরও একটি অবস্থা। যদি আপনার হৃদয়ে আশার আলো জ্বলে থাকে, তবে কারাগারের এই প্রকোষ্ঠেও আপনি বসন্তের ছোঁয়া পাবেন। আর যদি মন বিষাদে ভরা থাকে, তবে নন্দনকাননে বসেও আপনি শীতের শূন্যতা অনুভব করবেন।

এই দুর্গের গাছগুলোতে এখন পাখিদের আনাগোনা বেড়ে গেছে। তাদের গানে এক নতুন সুর বেজে উঠছে—এটি মিলনের সুর, এটি আশার সংগীত। আমি লক্ষ্য করেছি, বসন্তের আগমনে এই জেলের কয়েদি এবং প্রহরীদের মাঝেও এক প্রকার চঞ্চলতা দেখা দিয়েছে। প্রকৃতির এই জাদুকরী শক্তি মানুষের মনকে আর্দ্র করে তোলে। আমি আমার বইয়ের পাতা থেকে চোখ সরিয়ে যখন আকাশের নীলিমা আর বাতাসের এই খেলা দেখি, তখন নিজেকে আর বন্দি মনে হয় না। মনে হয় আমি এই বিশাল বিশ্ব-প্রকৃতিরই এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।

“বসন্তের এই স্পর্শে আমার ছোট বাগানের গাছগুলো যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছে। বিশেষ করে সেই গোলাপ গাছটি, যা শীতের রুক্ষতায় প্রায় শুকিয়ে গিয়েছিল, এখন তাতে ছোট ছোট কুঁড়ি দেখা দিচ্ছে। আমি যখন ভোরে পানি দিতে যাই, তখন সেই কচি পাতার গায়ে জমে থাকা শিশিরবিন্দুগুলো মুক্তোর মতো জ্বলজ্বল করে। এই দৃশ্যটি আমাকে শেখায় যে, জীবন কত শক্তিশালী! সামান্য একটু অনুকূল পরিবেশ পেলেই সে তার সমস্ত সৌন্দর্য নিয়ে বিকশিত হতে চায়। এই কুঁড়িগুলো যেন বন্দিত্বের বিরুদ্ধে প্রকৃতির এক নিরব প্রতিবাদ।

রঙের এই খেলা মানুষের মনস্তত্ত্বে এক গভীর প্রভাব ফেলে। আমি লক্ষ্য করেছি, প্রকৃতির সবুজ আর ফুলের বিচিত্র রঙ আমাদের ভেতরের সংকীর্ণতা দূর করে দেয়। আমি যখন আমার পড়ার টেবিল থেকে উঠে এই বাগানে কিছুক্ষণ সময় কাটাই, তখন আমার মনের ক্লান্তি ধুয়ে যায়। ফারসি কবিরা বসন্তকে কেন এত গুরুত্ব দিয়েছেন, তা এখানে এই নির্জনতায় বসে আমি উপলব্ধি করতে পারছি। বসন্ত কেবল ফুলের ফোটা নয়, এটি হলো জীবনের নতুন করে শপথ নেওয়ার সময়।

কারাগারের প্রহরীরা যখন আমার বাগানের পরিচর্যা দেখে, তারা হয়তো ভাবে এই মানুষটি ফুলের প্রেমে পাগল। তারা জানে না যে, এই ফুলগুলোই আমার বর্তমান জগতের একমাত্র সত্য। বাইরের পৃথিবী থেকে আমরা বিচ্ছিন্ন, কিন্তু এই মাটি আর আকাশের সাথে আমাদের সম্পর্ক কেউ ছিন্ন করতে পারেনি। বসন্তের বাতাস যখন আমার ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়ে, তখন তা কেবল সুগন্ধই আনে না, বরং একরাশ মুক্তির বার্তা বয়ে আনে। আমি তখন অনুভব করি যে, আমরা সবাই আসলে প্রকৃতিরই সন্তান, আর প্রকৃতি আমাদের কখনও পরিত্যগ করে না।

মানুষের ইতিহাস অনেক সময় রক্ত আর যুদ্ধের কাহিনীতে ভরা থাকে, কিন্তু প্রকৃতির ইতিহাস কেবলই সৃষ্টি আর সৌন্দর্যের। এই দুর্গের পুরনো পাথুরে দেয়ালে যখন দু-একটি বুনো ফুল ফুটে ওঠে, তখন মনে হয় জীবন পাথরের বুক চিরেও পথ করে নিতে পারে। বসন্তের এই শিক্ষাটিই এখন আমার সবচেয়ে বড় সম্বল। যদি আমরা আমাদের অন্তরের বসন্তকে বাঁচিয়ে রাখতে পারি, তবে কোনো বাহ্যিক বাধা আমাদের পরাজিত করতে পারবে না। আমি এখন আমার প্রতিদিনের লেখায় এই বসন্তের রঙের ছোঁয়া অনুভব করি।

পরিশেষে এটিই প্রতীয়মান হয় যে, ঋতুচক্রের এই আবর্তন আমাদের জীবনের নশ্বরতা এবং একই সাথে এর শাশ্বত রূপকে তুলে ধরে। বসন্ত আসে এবং চলে যায়, কিন্তু সে রেখে যায় পুনর্জন্মের এক গভীর বার্তা। আহমেদনগর দুর্গের এই পাথুরে প্রাচীরগুলো হয়তো বসন্তের রঙে পুরোপুরি রাঙানো সম্ভব নয়, কিন্তু এই ক্ষুদ্র বাগানের ফুলগুলোই আমার জন্য এক বিশাল উদ্যানের সার্থকতা বয়ে এনেছে। আমি যখন এই ফুলগুলোর ঝরে পড়া দেখি, তখন আমি শোক করি না; কারণ আমি জানি মাটির সাথে মিশে যাওয়াই হলো নতুনভাবে জেগে ওঠার প্রস্তুতি।

প্রকৃতির এই নিরব ভাষা বুঝতে হলে হৃদয়ে এক ধরণের নির্জনতা প্রয়োজন। এই কারাবাস আমাকে সেই নির্জনতা উপহার দিয়েছে। আমি এখন বুঝতে পারি, কেন প্রাচীন সুফী ও সাধকরা লোকালয় ছেড়ে প্রকৃতির সান্নিধ্যে যেতেন। মানুষের তৈরি কোলাহলে যে সত্য ঢাকা পড়ে যায়, প্রকৃতির এই শান্ত পরিবেশে তা অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে ধরা দেয়। বসন্ত আমাকে শিখিয়েছে যে, জীবনকে উপভোগ করার জন্য রাজপ্রাসাদের প্রয়োজন নেই, কেবল দেখার মতো একটি হৃদয় আর অনুভব করার মতো একটি আত্মা থাকলেই চলে।

প্রিয় বন্ধু, হয়তো যখন আপনি এই চিঠি পড়বেন, তখন বাইরের জগতের বসন্ত শেষ হয়ে গ্রীষ্মের উত্তাপ শুরু হয়ে গেছে। কিন্তু আমি চাই আপনার হৃদয়ের বসন্ত যেন কখনও শেষ না হয়। প্রতিকূলতার ঝড় আসুক বা বন্দিত্বের অন্ধকার—নিজের ভেতরের সেই সবুজতাকে সতেজ রাখবেন। এই দুর্গের বসন্ত আমাকে এই শিক্ষাই দিয়েছে যে, জীবনের আসল সৌন্দর্য তার টিকে থাকার ক্ষমতার মধ্যে নিহিত।

আজ এই বসন্তের সৌরভ নিয়েই বিদায় নিচ্ছি। ভালো থাকবেন এবং প্রকৃতির এই নিঃশব্দ আশীর্বাদগুলো গ্রহণ করতে ভুলবেন না।

আপনার (একনিষ্ঠ) বন্ধু,

আবুল কালাম

২০. আহমেদনগর দুর্গের ইতিহাস ও প্রাচীন স্মৃতি (আহমেদনগর কে মাজি কে দাস্তান)

আহমেদনগর দুর্গের ইতিহাস ও প্রাচীন স্মৃতি (আহমেদনগর কে মাজি কে দাস্তান)

তারিখ: ৫ অক্টোবর, ১৯৪২

সম্মানিত বন্ধু (সাদিক-এ-মুকাররম),

আজ যখন আমি এই দুর্গের বিশাল পাথুরে দেয়ালগুলোর দিকে তাকাই, তখন আমার চোখের সামনে ভারতের ইতিহাসের এক দীর্ঘ পরিক্রমা ভেসে ওঠে। আহমেদনগর দুর্গ কেবল একটি কারাগার নয়, এটি কয়েক শতাব্দীর উত্থান-পতনের এক জীবন্ত সাক্ষী। আমি যেখানে বসে আজ এই চিঠি লিখছি, এই মাটির প্রতিটি ধূলিকণা কোনো না কোনো বীরত্বের কাহিনী বা কোনো বিয়োগান্তক ঘটনার স্মৃতি বহন করছে। ১৫শ শতাব্দীর শেষভাগে যখন মালিক আহমদ নিজাম শাহ এই শহরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন, তখন হয়তো তিনি কল্পনাও করেননি যে তাঁর তৈরি এই কেল্লা একদিন ব্রিটিশদের হাতে বন্দিশালায় পরিণত হবে।

এই দুর্গের ইতিহাসের সবচেয়ে উজ্জ্বল এবং রোমাঞ্চকর অধ্যায় হলো বীরঙ্গনা চাঁদ সুলতানার বীরত্বগাথা। যখন মুঘল সম্রাট আকবরের বিশাল বাহিনী এই দুর্গ আক্রমণ করেছিল, তখন এই মহীয়সী নারী যেভাবে সাহসিকতার সাথে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন, তা ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। আমি যখন দুর্গের বুরুজগুলোর দিকে তাকাই, মনে হয় যেন আজও চাঁদ বিবির সেই অটল সংকল্পের প্রতিধ্বনি শোনা যায়। তিনি কেবল একজন শাসক ছিলেন না, তিনি ছিলেন এই মাটির সম্মানের প্রতীক।

আহমেদনগর দুর্গ ভারতের দাক্ষিণাত্যের রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রবিন্দু ছিল। নিজাম শাহী রাজবংশের গৌরব, মুঘলদের আধিপত্য বিস্তার এবং পরবর্তীতে মারাঠাদের সাথে সংঘর্ষ—সবই এই কেল্লাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে। ইতিহাসের এই পাঠগুলো আমাকে বারবার মনে করিয়ে দেয় যে, ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। যারা একসময় এই দুর্গের সিংহাসনে বসে বিশ্ব শাসন করার স্বপ্ন দেখতেন, আজ তাদের হদিস কেবল ইতিহাসের জরাজীর্ণ পাতায় পাওয়া যায়। আর আজ আমরা সেই একই দুর্গে বন্দি হিসেবে দিন কাটাচ্ছি—এটি সময়ের এক অদ্ভুত পরিহাস।

আমি এই দুর্গের স্থাপত্যশৈলী নিয়েও অনেক সময় ভেবেছি। এর মজবুত প্রাচীর এবং গভীর পরিখা বলে দেয় যে, এটি একসময় অপরাজেয় হিসেবে গণ্য হতো। আজ যদিও এর সামরিক গুরুত্ব হারিয়ে গেছে, কিন্তু এর ঐতিহাসিক গাম্ভীর্য আজও অক্ষুণ্ণ। এই নির্জনতায় বসে ইতিহাসের এইসব পাতা ওল্টানো আমার জন্য এক গভীর বুদ্ধিবৃত্তিক আনন্দ বয়ে আনে। মনে হয়, আমি বর্তমানের শেকল ভেঙে অতীতের সেই গৌরবময় দিনগুলোতে বিচরণ করছি।

মুঘল বাহিনী যখন ১৫৯৫ সালে এই দুর্গ অবরোধ করে, তখন আহমেদনগরের অভ্যন্তরীণ কোন্দল চরমে ছিল। কিন্তু বিপদের মুহূর্তে চাঁদ সুলতানা যেভাবে নেতৃত্বের হাল ধরেন, তা সত্যিই বিস্ময়কর। ইতিহাসে বর্ণিত আছে, যখন মুঘলরা কামানের গোলায় দুর্গের দেয়ালের একাংশ ধসিয়ে দিয়েছিল, তখন চাঁদ সুলতানা নিজে বোরকা পরিহিত অবস্থায় তলোয়ার হাতে সেই ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে লড়েছিলেন। তাঁর সেই অদম্য সাহস মুঘল সেনাপতিদেরও হতবাক করে দিয়েছিল। তিনি কেবল পুরুষ যোদ্ধাদের অনুপ্রাণিতই করেননি, বরং প্রমাণ করেছিলেন যে সংকল্প থাকলে ক্ষুদ্র শক্তিও বিশাল সাম্রাজ্যের মোকাবিলা করতে পারে।

দুর্ভাগ্যবশত, বাইরের শত্রুর চেয়ে ঘরের শত্রুরাই বেশি বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়ায়। চাঁদ সুলতানা যখন মুঘলদের সাথে একটি সম্মানজনক চুক্তিতে পৌঁছানোর চেষ্টা করছিলেন, তখন তাঁরই একদল অদূরদর্শী অনুসারী তাঁর বিরুদ্ধে বিশ্বাসঘাতকতা করে। তারা মনে করেছিল তিনি হয়তো মুঘলদের সাথে আঁতাত করছেন। এই ভুল বোঝাবুঝির করুণ পরিণতি হিসেবে নিজ সৈন্যদের হাতেই এই মহীয়সী নারীকে প্রাণ দিতে হয়। তাঁর মৃত্যুর সাথে সাথেই আহমেদনগরের গৌরবের প্রদীপ নিভে যায় এবং ১৬০০ সালে মুঘলরা চূড়ান্তভাবে এই দুর্গ দখল করে।

আমি যখন এই দুর্গের ভেতরে হাঁটি, তখন আমার মনে হয় এই মাটি চাঁদ সুলতানার রক্তে ভেজা। তাঁর শাহাদাত ভারতের ইতিহাসের এক করুণ ট্র্যাজেডি। আজ আমরা যারা এখানে বন্দি আছি, আমাদের এই বন্দিত্বের সাথে তাঁর লড়াইয়ের কোনো তুলনা চলে না। তিনি লড়েছিলেন স্বদেশের স্বাধীনতার জন্য, আর আমরা লড়ছি আধুনিক সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে। সময় বদলেছে, শত্রু বদলেছে, কিন্তু এই মাটির লড়াই করার চেতনা আজও একই রকম রয়ে গেছে।

মুঘলদের পরে এই কেল্লা মালিক অম্বরের অধীনে কিছুকাল থাকে, যিনি দাক্ষিণাত্যের গেরিলা যুদ্ধের জনক হিসেবে পরিচিত। পরবর্তীতে এটি আওরঙ্গজেবের হাতে যায় এবং তারও পরে মারাঠাদের অধীনে আসে। ইতিহাসের এই যে বারবার মালিকানা পরিবর্তন, তা আমাদের শেখায় যে পার্থিব সম্পদ বা ক্ষমতা কাউকেই চিরস্থায়ী অধিকার দেয় না। এই পাথরগুলো আজ নিস্তব্ধ হলেও এরা জানে যে প্রকৃত মালিকানা কেবল সময়ের। আমরা এখানে ক্ষণিকের মুসাফির মাত্র।

পরিশেষে এটি বলা যায় যে, আহমেদনগর দুর্গ কেবল পাথর আর চুনাপাথরের কোনো স্থাপত্য নয়, বরং এটি ভারতবর্ষের বীরত্ব এবং ট্র্যাজেডির এক জীবন্ত মহাকাব্য। ১৮০৩ সালে যখন ব্রিটিশ সেনাপতি ওয়েলেসলি (Wellesley) এই দুর্গের সামনে এসে দাঁড়িয়েছিলেন এবং মারাঠাদের হাত থেকে এটি দখল করেছিলেন, তখন থেকেই ভারতের স্বাধীনতার ইতিহাসে এক নতুন এবং অন্ধকার অধ্যায়ের সূচনা হয়। আজ সেই ব্রিটিশরাই এই ঐতিহাসিক দুর্গটিকে আমাদের মতো মুক্তিকামীদের জন্য কারাগারে রূপান্তরিত করেছে।

আমি যখন এই দুর্গের প্রশস্ত আঙিনায় বিচরণ করি, তখন আমার মনে হয় ইতিহাস যেন এক বৃত্তের মতো। একসময় এখানে রাজকীয় ফরমান জারি হতো, আর আজ এখানে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের দাপ্তরিক হুকুম চলে। কিন্তু এই মাটির আত্মাকে তারা বদলাতে পারেনি। চাঁদ সুলতানার বীরত্ব এবং মালিক অম্বরের তেজ আজও এই বাতাসের মূলে মিশে আছে। আমরা যারা আজ এখানে বন্দি, আমরা আসলে সেই দীর্ঘ ঐতিহ্যেরই উত্তরাধিকারী যারা কখনোই অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেনি।

প্রিয় বন্ধু, ইতিহাসের এই দীর্ঘ পথচলা আমাদের শেখায় যে কোনো অন্ধকারই চিরস্থায়ী নয়। নিজাম শাহী থেকে ব্রিটিশ আমল—এই কয়েকশ বছরের ইতিহাস আসলে পরিবর্তনেরই গল্প। আমি বিশ্বাস করি, এই দুর্গের প্রাচীরগুলো একদিন আবারও স্বাধীনতার সাক্ষী হবে। আমাদের এই বন্দিজীবন বৃথা যাবে না; বরং এটি ইতিহাসের পাতায় এক নতুন অধ্যায় হিসেবে যুক্ত হবে।

আজ এই কেল্লার ইতিহাসের ধুলোবালি মেখেই বিদায় নিচ্ছি। আমাদের বর্তমানের এই লড়াই যেন ভবিষ্যতের ইতিহাসের জন্য একটি উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে থাকে।

আপনার (একনিষ্ঠ) বন্ধু,

আবুল কালাম

২১. কারাগারের খাবার ও রান্নার অভিজ্ঞতা (পাক-ও-খোরদা)

কারাগারের খাবার ও রান্নার অভিজ্ঞতা (পাক-ও-খোরদা)

তারিখ: ১২ অক্টোবর, ১৯৪২

সম্মানিত বন্ধু (সাদিক-এ-মুকাররম),

মানুষের জীবনের একটি অপরিহার্য দিক হলো আহার, আর আহমেদনগর দুর্গের এই বন্দিজীবনে সেটি আমাদের জন্য এক বিশেষ গুরুত্ব লাভ করেছে। কারাগারের সাধারণ কয়েদিদের জন্য যে খাবার বরাদ্দ থাকে, তা সাধারণত স্বাদহীন ও বৈচিত্র্যহীন হয়। কিন্তু আমাদের যেহেতু নিজেদের রান্নার কিছুটা সুযোগ দেওয়া হয়েছে, তাই আমরা এই প্রতিকূলতার মাঝেও রুচিসম্মত খাবারের স্বাদ বজায় রাখার চেষ্টা করি। আমি বরাবরই মনে করি, রান্না কেবল পেট ভরানোর মাধ্যম নয়, এটি একটি সূক্ষ্ম শিল্প।

কারাগারে আমাদের দিন শুরু হয় চা দিয়ে, যার কথা আমি আগের একটি চিঠিতে বিস্তারিত লিখেছি। এরপর আসে দুপুরের খাবারের আয়োজন। এখানে আমাদের সঙ্গী জওহরলাল নেহরু খাবারের ব্যাপারে বেশ শৌখিন এবং নিয়মানুবর্তী। আমরা অনেক সময় একত্রে বসে আলোচনা করি যে আজ কী রান্না হবে। আমাদের মাঝে কেউ কেউ রান্নায় বেশ পটু, আবার কেউ কেবল তদারকি করতেই পছন্দ করেন। আমি নিজে রান্নার তাত্ত্বিক দিকগুলো নিয়ে ভাবি—কোন মশলার সাথে কোন সবজির মেলবন্ধন ঘটবে, তা যেন এক দার্শনিক প্রশ্নের মতো।

আমাদের এখানে রেশন হিসেবে যা দেওয়া হয়, তা খুব একটা উন্নত মানের নয়। কিন্তু সৃজনশীলতা থাকলে সামান্য উপকরণ দিয়েও চমৎকার কিছু তৈরি করা সম্ভব। কারাগারের এই ছোট রান্নাঘরটি এখন আমাদের আড্ডার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। ধোঁয়া ওঠা উনুন আর মশলার সুঘ্রাণ আমাদের ক্ষণিকের জন্য ভুলে যেতে সাহায্য করে যে আমরা পৃথিবীর এক নির্জন কারাগারে বন্দি আছি। খাবারের স্বাদ কেবল জিহ্বাতে নয়, বরং তা মনের তৃপ্তির সাথেও জড়িত।

আমি লক্ষ্য করেছি, যখন আমরা সবাই একসাথে খেতে বসি, তখন খাবারের পাতের চেয়েও আমাদের আলোচনার টেবিলটি বেশি গরম থাকে। রাজনীতি, দর্শন এবং ইতিহাস—সবকিছুই সেই খাবারের সাথে পরিবেশন করা হয়। মাঝে মাঝে খাবারের মান নিয়ে আমাদের মাঝে হালকা রসিকতাও চলে। তবে সবকিছুর ঊর্ধ্বে এই সম্মিলিত ভোজন আমাদের একাকীত্ব দূর করতে এবং পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব অটুট রাখতে বড় ভূমিকা পালন করছে।

আমাদের এখানে ডাল এবং সবজি রান্নার ক্ষেত্রে এক ধরণের পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলে। সাধারণ ডালকে কীভাবে বাগার বা ফোঁড়ন দিয়ে সুস্বাদু করা যায়, তা নিয়ে আমাদের সতীর্থদের মধ্যে যথেষ্ট উৎসাহ দেখা যায়। আমি মনে করি, রান্নায় মশলার পরিমিত ব্যবহার এবং সঠিক সময়ে আগুনের তাপ নিয়ন্ত্রণ করাটাই হলো আসল কৌশল। মাওলানা সাঈদ আহমেদ সাহেব এখানে অনেক সময় রান্নার তদারকি করেন এবং তাঁর হাতের রান্না আমাদের ঘরোয়া স্বাদের কথা মনে করিয়ে দেয়।

মাঝে মাঝে যখন আমাদের পছন্দের কোনো ঋতুভিত্তিক সবজি পাওয়া যায়, তখন রান্নাঘরটি উৎসবে মেতে ওঠে। এখানে আমাদের খাবারের তালিকায় খুব একটা জাঁকজমক নেই, কিন্তু যা তৈরি হয় তাতে এক ধরণের পরিচ্ছন্নতা আর সুরুচি থাকে। বিশেষ করে মাংস রান্নার দিনগুলোতে এক বিশেষ আয়োজন চলে। যদিও কারাগারের সরবরাহকৃত মাংস অনেক সময় বেশ শক্ত হয়, তবুও সঠিক মশলা আর ধীর আঁচে তা রান্নার পর যখন টেবিলে আসে, তখন আমরা জেলের খাবারের কথা ভুলে যাই।

একটি মজার বিষয় হলো, আমাদের এই রান্নার আয়োজনে কেবল স্বাদই মুখ্য নয়, বরং সেটি তৈরির প্রক্রিয়াটিও এক ধরণের ব্যায়ামের মতো। সবজি কাটা, মশলা বাটা বা উনুনের যত্ন নেওয়া—এই কাজগুলো আমাদের অলস সময়কে সদ্ব্যবহার করতে সাহায্য করে। আমি যখন পড়ার টেবিল থেকে বিরতি নিয়ে রান্নাঘরের দিকে যাই, তখন আগুনের সেই উত্তাপ আর ফুটন্ত হাঁড়ির শব্দ আমার কাছে জীবনের এক গতিময় প্রকাশ বলে মনে হয়।

খাবারের ব্যাপারে আমি সবসময়ই পরিমিতিবোধে বিশ্বাসী। তবে স্বাদহীন খাবার খাওয়াকে আমি এক ধরণের আত্মিক অবমাননা বলে মনে করি। তাই আমাদের এই ছোট দলটির পক্ষ থেকে আমরা সবসময় চেষ্টা করি যাতে রেশন থেকে পাওয়া উপকরণগুলোকেই সর্বোত্তম উপায়ে ব্যবহার করা যায়। জওহরলালজি মাঝে মাঝে তাঁর কাশ্মীরি রন্ধনশৈলীর কিছু বৈশিষ্ট্য আমাদের সাথে শেয়ার করেন। এভাবেই এই দুর্গের একঘেয়ে জীবনে খাবারের এই ছোট আয়োজনগুলো আমাদের জন্য আনন্দের এক একটি বড় উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে।

খাবারের এই আয়োজনের শেষ ধাপে আসে পরিবেশন এবং শিষ্টাচার। আমি বিশ্বাস করি, খাবার কেবল পেটের ক্ষুধা মেটায় না, বরং তা মানুষের সুরুচি ও সংস্কৃতিরও পরিচয় দেয়। আহমেদনগর দুর্গের এই সাধারণ দস্তরখান বা খাওয়ার টেবিলেও আমরা সেই গাম্ভীর্য বজায় রাখার চেষ্টা করি। আমরা যখন সবাই একত্রে বসি, তখন নিজেদের ব্যক্তিগত কষ্ট বা রাজনৈতিক দুশ্চিন্তাগুলোকে দরজার বাইরে রেখে আসি। খাবারের সময়টুকুর পবিত্রতা রক্ষা করা আমাদের এই কারাজীবনের এক অলিখিত নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অনেকে মনে করেন যে, আধ্যাত্মিক সাধনার জন্য ভালো খাবার ত্যাগ করা প্রয়োজন। কিন্তু আমার দর্শন একটু ভিন্ন। আমি মনে করি, ঈশ্বরের দেওয়া নেয়ামতগুলোর স্বাদ কৃতজ্ঞতার সাথে গ্রহণ করাও এক ধরণের ইবাদত। যদি খাবার পরিষ্কার, হালাল এবং সুরুচিপূর্ণ হয়, তবে তা মানুষের মস্তিষ্ককে আরও সচল এবং হৃদয়কে প্রফুল্ল করে তোলে। এই কারাগারের সীমাবদ্ধতার মাঝেও আমরা যে এইটুকু রুচিশীলতা বজায় রাখতে পারছি, এটিই আমাদের মানসিক বিজয়ের একটি চিহ্ন।

প্রিয় বন্ধু, জীবনের এই সাধারণ অভিজ্ঞতাগুলো আমাদের শিখিয়ে দেয় যে, বড় বড় আদর্শের কথা বলা যতটা সহজ, প্রতিদিনের ছোট ছোট কাজগুলো সুরুচির সাথে সম্পন্ন করা ততটাই কঠিন। আহমেদনগর দুর্গের এই ‘পাক-ও-খোরদা’ বা রান্নাবান্নার পর্বটি আমার স্মৃতির ঝুলিতে এক বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে। এটি আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে অভাবের মাঝেও তৃপ্ত থাকতে হয় এবং প্রতিকূলতার মাঝেও জীবনকে উদযাপন করতে হয়।

আজ এখানেই শেষ করছি। আশা করি আপনার দিনগুলো সুস্বাদু খাবার এবং সুন্দর আলোচনায় মুখরিত থাকবে।

আপনার (একনিষ্ঠ) বন্ধু,

আবুল কালাম

২২. মানুষের একাকীত্ব ও আধ্যাত্মিক ভাবনা (তানহাই আওর জিকর-ই-ইলাহি)

মানুষের একাকীত্ব ও আধ্যাত্মিক ভাবনা (তানহাই আওর জিকর-ই-ইলাহি)

তারিখ: ১৫ অক্টোবর, ১৯৪২

সম্মানিত বন্ধু (সাদিক-এ-মুকাররম),

আহমেদনগর দুর্গের এই নিঃসঙ্গতা আমাকে এক নতুন জগতের সন্ধান দিয়েছে। মানুষ সাধারণত একাকীত্বকে ভয় পায়, কারণ নির্জনে সে নিজের মুখোমুখি হতে বাধ্য হয়। কিন্তু আমার কাছে এই ‘তানহাই’ বা একাকীত্ব কোনো দণ্ড নয়, বরং এটি একটি মহৎ সুযোগ। যখন বাইরের কোলাহল স্তিমিত হয়ে আসে, তখনই মানুষের অন্তরের কণ্ঠস্বর স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই কারাগারের চার দেয়াল আমাকে বাইরের জগত থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে ঠিকই, কিন্তু এটি আমাকে আমার নিজের ভেতরের এক বিশাল জগতের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে।

আধ্যাত্মিকতার মূল ভিত্তি হলো নির্জনতা। আপনি যদি ইতিহাসের মহান সাধক বা নবীদের জীবনের দিকে তাকান, দেখবেন তাঁরা সবাই জীবনের কোনো না কোনো সময়ে নির্জনতাকে বেছে নিয়েছিলেন। হেরা গুহার সেই নিস্তব্ধতা বা তূর পাহাড়ের সেই নির্জনতা—সবই ছিল পরম সত্যের সাথে মোলাকাতের প্রস্তুতি। আমি যখন গভীর রাতে এই দুর্গের উঠানে পায়চারি করি, তখন আকাশের অগণিত নক্ষত্ররাজি আমাকে স্রষ্টার মহিমা বা ‘জিকর-ই-ইলাহি’-র কথা মনে করিয়ে দেয়। তখন এই বন্দিত্বকে আর সীমাবদ্ধতা মনে হয় না, বরং মনে হয় আমি মহাবিশ্বের এক অনন্ত যাত্রার যাত্রী।

অনেকে আমাকে জিজ্ঞেস করেন, এই দীর্ঘ সময় মানুষের সান্নিধ্য ছাড়া আমি কীভাবে থাকি? তাদের আমি বলি, যে ব্যক্তি স্রষ্টার স্মরণে ডুবে থাকে, সে কখনও একা নয়। জিকর বা স্মরণ কেবল তসবিহ পাঠ করা নয়, বরং প্রতিটি নিঃশ্বাসে সেই পরম সত্তার উপস্থিতি অনুভব করা। নির্জনতা যখন গভীর হয়, তখন প্রার্থনার ভাষা বদলে যায়। তখন শব্দের চেয়ে নীরবতাই বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে। আমি অনুভব করি, এই কারাগার আসলে একটি ‘খানকাহ’ বা আধ্যাত্মিক সাধনার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে, যেখানে আমার আত্মা প্রতিনিয়ত পরিশুদ্ধ হচ্ছে।

মানুষের মন যখন বিষয়-আশয় আর দুনিয়াবী চিন্তায় মগ্ন থাকে, তখন সে আধ্যাত্মিক সূক্ষ্মতা অনুভব করতে পারে না। কিন্তু এখানে, যেখানে হারানোর কিছু নেই এবং পাওয়ার কোনো জাগতিক লোভ নেই, সেখানে মন অনেক বেশি হালকা ও স্বচ্ছ। এই স্বচ্ছতা থেকেই জন্মে প্রকৃত ধৈর্য এবং কৃতজ্ঞতা। আমি যখন এই নিস্তব্ধতায় স্রষ্টার সাথে কথা বলি, তখন জগতের সমস্ত দুশ্চিন্তা কর্পূরের মতো উড়ে যায়। একাকীত্ব তখন আর অভিশাপ থাকে না, বরং তা হয়ে ওঠে এক জান্নাতি প্রশান্তি।

নির্জনতার এই প্রহরগুলোতে আমি যখন ধ্যানে নিমগ্ন হই, তখন সময়ের কোনো হিসাব থাকে না। আধ্যাত্মিক পরিভাষায় যাকে ‘মুরাকাবা’ বলা হয়, তা আসলে নিজের আত্মার গভীরে ডুব দিয়ে পরম সত্যকে অনুসন্ধান করা। আমি অনুভব করি, মানুষের আত্মা যখন বাইরের জগতের কোলাহল থেকে মুক্ত হয়, তখনই সে তার আদি ও অকৃত্রিম সুরটি শুনতে পায়। এই দুর্গের নিস্তব্ধ দেয়ালগুলো যেন এক একটি আয়না, যেখানে আমি আমার জীবনের প্রতিটি ভুল আর প্রাপ্তির হিসাব মিলিয়ে দেখি। এই আত্মদর্শনই হলো প্রকৃত আধ্যাত্মিক উন্নতির প্রথম সোপান।

‘জিকর-ই-ইলাহি’ বা স্রষ্টাকে স্মরণ করার আনন্দ কেবল তখনই পূর্ণতা পায় যখন হৃদয় দুনিয়াবী আকাঙ্ক্ষা থেকে শূন্য হয়। এখানে আমার কাছে কোনো পদমর্যাদা নেই, কোনো রাজনৈতিক দায়িত্বের ভার নেই; আমি কেবল এক নগণ্য বান্দা হিসেবে তাঁর দরবারে দাঁড়িয়ে আছি। এই যে নিজের ক্ষুদ্রতা উপলব্ধি করা, এটাই হলো আধ্যাত্মিকতার মূল সৌন্দর্য। যখন কেউ বুঝতে পারে যে সে কত অসহায়, তখনই সে আল্লাহর অসীম কুদরতের ওপর পূর্ণ ভরসা (তাওয়াক্কুল) রাখতে পারে। এই তাওয়াক্কুলই মানুষকে কারাগারের শেকলেও নির্ভীক রাখে।

আমি অনেক সময় ভাবি, যারা কেবল বাইরের জগতের জাঁকজমক নিয়ে বেঁচে থাকে, তারা জীবনের কত বড় এক অংশ থেকে বঞ্চিত। তারা নির্জনতাকে ভয় পায় কারণ তারা তাদের অন্তরের শূন্যতাকে সহ্য করতে পারে না। কিন্তু একজন মুমিনের কাছে নির্জনতা হলো স্রষ্টার সাথে গোপন সংলাপের সময়। এই নির্জনতায় আমি এমন কিছু আধ্যাত্মিক সত্যের সন্ধান পেয়েছি, যা হয়তো হাজার বছর কিতাব পড়েও পেতাম না। অভিজ্ঞতা যখন ইমানের সাথে মিশে যায়, তখন মানুষের চরিত্র হয়ে ওঠে ইস্পাতের মতো শক্ত।

এই কারাগারের জীবনে আমি আমার ইবাদতের মাঝে এক নতুন স্বাদ পাচ্ছি। যখন কেউ চারপাশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তখন তার সিজদাগুলো হয়ে ওঠে আরও গভীর এবং রোনাজারি হয়ে ওঠে আরও ব্যাকুল। আমি যখন রাতের শেষ প্রহরে জায়নামাজে বসি, তখন মনে হয় আমার এই ছোট কক্ষটি আর জেলের প্রকোষ্ঠ নেই, বরং এটি আরশের নিচে এক পবিত্র জান্নাতি বাগান। এই আধ্যাত্মিক প্রশান্তিই আমাকে এই প্রতিকূল পরিবেশে মানসিকভাবে সুস্থ ও প্রাণবন্ত রেখেছে।

পরিশেষে এটিই প্রতীয়মান হয় যে, একাকীত্ব যখন স্রষ্টার স্মরণে সজীব হয়ে ওঠে, তখন তা মানুষের চরিত্রে এক অপরাজেয় শক্তি দান করে। যে ব্যক্তি নির্জনতায় নিজের খোদাকে খুঁজে পেয়েছে, সে দুনিয়ার কোনো শক্তিকেই আর ভয় পায় না। আহমেদনগর দুর্গের এই নিঃসঙ্গ দিনগুলো আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় হিসেবে গণ্য হবে, কারণ এখানেই আমি আমার আমিত্বকে বিসর্জন দিয়ে পরম সত্তার সান্নিধ্য অনুভব করেছি। মানুষের আত্মা যখন এই স্তরে পৌঁছায়, তখন শেকল আর কারাগার কেবল বাহ্যিক আবরণ মাত্র; তার অভ্যন্তরীণ জগত থাকে সম্পূর্ণ স্বাধীন।

প্রিয় বন্ধু, জগতের ভিড়ে আমরা অনেক সময় নিজেকে হারিয়ে ফেলি। আমি আপনাকে অনুরোধ করব, প্রতিদিনের ব্যস্ততার মাঝে অন্তত কিছুটা সময় নিজের জন্য এবং নিজের স্রষ্টার জন্য তুলে রাখুন। এই নির্জনতাই আপনাকে নতুন করে পথ চলার শক্তি দেবে। কারাগারের এই অভিজ্ঞতাই আমাকে শিখিয়েছে যে, মানুষের আসল সুখ তার বাইরে নয়, বরং তার হৃদয়ের গভীরে লুকিয়ে আছে। যদি অন্তর শান্ত থাকে, তবে মরুভূমিও নন্দনকানন মনে হবে।

আজ আধ্যাত্মিকতার এই নিগূঢ় আলোচনা থেকেই বিদায় নিচ্ছি। এই নির্জনতার শিক্ষা যেন আমাদের সারা জীবনের পাথেয় হয়। আমরা যেখানেই থাকি না কেন, আমাদের হৃদয় যেন সবসময় সেই পরম সত্যের স্মরণে সিক্ত থাকে।

আপনার (একনিষ্ঠ) বন্ধু,

আবুল কালাম

২৩. কারাগারের সহবন্দিদের সাথে সম্পর্ক ও পারস্পরিক সাহচর্য (রফিকান-এ-কয়েদ)

কারাগারের সহবন্দিদের সাথে সম্পর্ক ও পারস্পরিক সাহচর্য (রফিকান-এ-কয়েদ)

তারিখ: ২০ অক্টোবর, ১৯৪২

সম্মানিত বন্ধু (সাদিক-এ-মুকাররম),

কারাজীবনের একঘেয়েমি আর নিঃসঙ্গতা কাটানোর সবচেয়ে বড় সম্বল হলো সুযোগ্য সহচর। আহমেদনগর দুর্গের এই বন্দিশালায় আমি নিজেকে অত্যন্ত সৌভাগ্যবান মনে করি, কারণ এখানে আমার সাথে রয়েছেন ভারতবর্ষের ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ কিছু সন্তান। জওহরলাল নেহরু, সরদার প্যাটেল, আসফ আলী, গোবিন্দ বল্লভ পন্থ এবং আরও অনেক গুণী ব্যক্তিত্বের সাথে এই সময়টুকু কাটানো আমার জন্য এক বিরল অভিজ্ঞতা। আমরা সবাই নিজ নিজ চিন্তাধারা আর স্বভাবের দিক থেকে স্বতন্ত্র হলেও, এই কারাগার আমাদের সবাইকে এক অবিচ্ছেদ্য বন্ধনে আবদ্ধ করেছে।

আমাদের দিনগুলো কাটে এক সুশৃঙ্খল রুটিনে। যদিও আমরা বাইরের জগত থেকে বিচ্ছিন্ন, কিন্তু আমাদের ভেতরের জগতটি সবসময়ই প্রাণবন্ত। জওহরলাল নেহরুর অফুরন্ত প্রাণশক্তি আর ইতিহাসের প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ আমাদের আলোচনার টেবিলকে সবসময় সমৃদ্ধ রাখে। তিনি এখানেও তাঁর পড়ার নেশা আর লেখালেখি চালিয়ে যাচ্ছেন। সরদার প্যাটেলের দৃঢ়তা আর তাঁর তীক্ষ্ণ রসবোধ আমাদের কঠিন সময়গুলোকে সহজ করে দেয়। আমরা যখন একসাথে বসি, তখন মনে হয় না যে আমরা কোনো জেলের কয়েদি; মনে হয় আমরা কোনো এক জ্ঞানপীঠে বসে সত্যের সন্ধানে লিপ্ত আছি।

বিপদের দিনে মানুষের আসল চরিত্র চেনা যায়। আমি লক্ষ্য করেছি, এই প্রতিকূল পরিবেশে আমাদের প্রত্যেকের ধৈর্যের পরীক্ষা হচ্ছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই মহান নেতাদের মাঝে কোনো অভিযোগ বা অবসাদ নেই। বরং একে অপরের প্রতি সহমর্মিতা আর শ্রদ্ধাবোধ আমাদের এই ছোট সমাজটিকে এক আদর্শ রূপে গড়ে তুলেছে। কারোর শরীর খারাপ হলে বা কেউ মানসিকভাবে বিষণ্ণ বোধ করলে, অন্যরা যেভাবে তাঁর পাশে এসে দাঁড়ান, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। আমাদের এই পারস্পরিক নির্ভরতা আমাদের একাকীত্বকে জয় করতে শিখিয়েছে।

বিকেলের দিকে যখন আমরা দুর্গের আঙিনায় হাঁটাহাঁটি করি, তখন আমাদের আলাপচারিতা কেবল রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ থাকে না। সাহিত্য, সংস্কৃতি, বিজ্ঞান এবং দর্শনের নানা বিষয় আমাদের আলোচনায় উঠে আসে। এই বৌদ্ধিক আদান-প্রদান আমাকে অনেক নতুন দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েছে। আমার মনে হয়, স্বাধীনতার এই লড়াইয়ে আমাদের শরীর বন্দি থাকলেও আমাদের চিন্তাধারা আজ অনেক বেশি মুক্ত। সহবন্দিদের এই সান্নিধ্যই আহমেদনগর দুর্গের এই পাথুরে প্রাচীরগুলোকে আমাদের কাছে সহনীয় করে তুলেছে।

আমাদের এই ছোট পরিবারটিতে প্রত্যেকেরই একটি নির্দিষ্ট ভূমিকা রয়েছে। জওহরলালজি যেমন তাঁর কর্মতৎপরতা দিয়ে আমাদের সজীব রাখেন, তেমনি গোবিন্দ বল্লভ পন্থ তাঁর ধীরস্থির স্বভাব আর পাণ্ডিত্যপূর্ণ কথা দিয়ে আমাদের শান্ত রাখেন। আসফ আলী সাহেবের সূক্ষ্ম রুচি এবং সঙ্গীতের প্রতি অনুরাগ আমাদের সান্ধ্যকালীন আড্ডায় এক ভিন্ন মাত্রা যোগ করে। আমরা যখন একসাথে ডাইনিং টেবিলে বসি, তখন মনে হয় যেন ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তের মেধা আর সংস্কৃতি এক জায়গায় এসে মিলিত হয়েছে। এই মিলনমেলা কারাগারের কঠোরতাকে এক ধরণের ঘরোয়া আমেজে বদলে দেয়।

কারাগারের শৃঙ্খলার ভেতরেও আমরা নিজেদের এক ধরণের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে তুলেছি। ছোটখাটো যেকোনো বিষয়ে আমরা সম্মিলিতভাবে সিদ্ধান্ত নিই। মাঝে মাঝে আমাদের মধ্যে মতভেদ হয়, বিতর্ক হয়, কিন্তু সেই তর্কের মূলে থাকে একে অপরের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা। আমি অনেক সময় অবাক হয়ে ভাবি, এই মানুষগুলো বাইরে যখন বিশাল জনসমুদ্রের সামনে ভাষণ দেন, তখন তাঁরা এক এক জন মহানায়ক; কিন্তু এখানে এই ক্ষুদ্র পরিসরে তাঁরা অত্যন্ত বিনয়ী ও সাধারণ এক একজন সহচর। এই বিনয়ই তাঁদের মহানুভবতার পরিচয় দেয়।

মাঝে মাঝে আমরা আমাদের অতীত জীবনের স্মৃতিচারণ করি। কে কীভাবে রাজনীতিতে এলাম, কার জীবনের মোড় কোথায় ঘুরে গেল—এই গল্পগুলো আমাদের একে অপরের আরও কাছাকাছি নিয়ে আসে। জওহরলালজি যখন তাঁর বিদেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা বলেন বা সরদার প্যাটেল যখন বারদোলি আন্দোলনের দিনগুলোর কথা স্মরণ করেন, তখন সময়ের চাকা যেন উল্টো দিকে ঘুরতে থাকে। এই স্মৃতিচারণগুলো আমাদের বন্দিত্বের গ্লানি ভুলিয়ে দেয় এবং আমাদের সংকল্পকে আরও দৃঢ় করে।

আমাদের পারস্পরিক এই সাহচর্য কেবল দিনের বেলাতেই সীমাবদ্ধ নয়। গভীর রাতেও যখন পাশের ঘর থেকে কারো কাশির শব্দ শুনি বা কেউ বাতি জ্বালিয়ে পড়াশোনা করেন, তখন এক ধরণের আত্মিক সংযোগ অনুভব করি। আমরা জানি যে আমরা কেউ এখানে একা নই; আমাদের লক্ষ্য এক, আমাদের গন্তব্য এক। এই ঐক্যের অনুভূতিই আমাদের আধ্যাত্মিক শক্তি জোগায়। সহবন্দিদের এই মমতা আর ভ্রাতৃত্ববোধ না থাকলে এই পাথুরে কেল্লা হয়তো সত্যি সত্যিই এক প্রাণহীন পাথর হয়েই থাকত।

পরিশেষে এটি বলা যায় যে, এই সাহচর্য আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে প্রতিকূলতার মাঝেও ব্যক্তিগত অহমিকা বিসর্জন দিয়ে একটি বৃহত্তর উদ্দেশ্যের জন্য ঐক্যবদ্ধ থাকতে হয়। আহমেদনগর দুর্গের এই বন্দিজীবনে আমাদের মধ্যে যে প্রীতি ও বন্ধুত্বের বন্ধন তৈরি হয়েছে, তা কোনো রাজনৈতিক চুক্তির ফল নয়, বরং এটি হৃদয়ের এক গভীর তাগিদ। আমি বিশ্বাস করি, কারাগারের এই দিনগুলো যখন শেষ হবে এবং আমরা আবার মুক্ত পৃথিবীতে ফিরে যাব, তখন এই দিনগুলোর স্মৃতি আমাদের রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান পাথেয় হয়ে থাকবে।

প্রিয় বন্ধু, মানুষের সাহচর্য ছাড়া জীবন এক মরুভূমি। আর সেই সাহচর্য যদি হয় মহৎপ্রাণ ব্যক্তিদের সাথে, তবে তা হয়ে ওঠে স্বর্গীয় আশীর্বাদ। আমি এই দুর্গের দেয়ালে দেয়ালে আমাদের সম্মিলিত হাসি, তর্ক আর গভীর আলোচনার প্রতিধ্বনি শুনতে পাই। এই স্মৃতিগুলোই প্রমাণ করে যে, শরীরকে বন্দি করা গেলেও মানুষের আত্মা আর তার সামাজিক সত্তাকে কখনো লোহার শেকলে আটকে রাখা যায় না। আমরা একে অপরের হাত ধরে এই অন্ধকার সময়টুকু পার করছি, আর এই একতাই আমাদের আগামী দিনের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা।

আজ এই বন্ধুদের ভালোবাসার কথা মনে করেই বিদায় নিচ্ছি। এই একতা আর ভ্রাতৃত্ব যেন আমাদের জাতীয় জীবনের প্রতিটি স্তরে ছড়িয়ে পড়ে।

আপনার (একনিষ্ঠ) বন্ধু,

আবুল কালাম

২৪. দুর্গের বন্দিজীবনের সমাপ্তি ও মুক্তির প্রতীক্ষা (ইখতিতাম-এ-আসরাত)

দুর্গের বন্দিজীবনের সমাপ্তি ও মুক্তির প্রতীক্ষা (ইখতিতাম-এ-আসরাত)

সম্মানিত বন্ধু (সাদিক-এ-মুকাররম),

সময়ের চাকা ঘুরতে ঘুরতে আজ আমরা এমন এক পর্যায়ে এসে পৌঁছেছি যেখানে বন্দিত্বের এই দীর্ঘ রজনী শেষ হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। আহমেদনগর দুর্গের এই নিস্তব্ধ প্রাচীরগুলোর ভেতরে আমরা যে সময়টুকু অতিবাহিত করেছি, তা কেবল আমাদের জীবনের কয়েকটা বছর নয়, বরং এটি ছিল এক গভীর আত্মিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সাধনার কাল। আমি যখন আজ আমার এই ছোট কক্ষটির চারদিকে তাকাই, তখন প্রতিটি কোণ থেকে গত তিন বছরের অসংখ্য স্মৃতি ভেসে ওঠে। এই দেয়ালগুলো এখন আর আমার কাছে অপরিচিত নয়, এরা যেন আমার নিঃসঙ্গতার মৌন সাথী হয়ে উঠেছে।

মুক্তির প্রতীক্ষা মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি, কিন্তু এই দীর্ঘ প্রতীক্ষা আমাকে শিখিয়েছে যে মুক্তি কেবল কারাগারের দরজা খুলে বাইরে যাওয়ার নাম নয়। প্রকৃত মুক্তি হলো মনের সংকীর্ণতা আর ভয় থেকে মুক্তি পাওয়া। আমি যখন এই দুর্গে প্রবেশ করেছিলাম, তখন আমার মনে যে অস্থিরতা ছিল, আজ বিদায়বেলায় তার বদলে এক গভীর প্রশান্তি বিরাজ করছে। আমি বুঝতে পেরেছি যে, সত্যের পথে চলতে গেলে কারাবাস বা লাঞ্ছনা কোনো বাধা নয়, বরং এগুলো হলো গন্তব্যে পৌঁছানোর এক একটি সোপান।

বাইরের জগত থেকে আসা খবরগুলো বলছে যে পৃথিবী বদলে যাচ্ছে। যুদ্ধের দামামা হয়তো স্তিমিত হয়ে আসছে, কিন্তু আমাদের দেশের স্বাধীনতার লড়াই এক নতুন মোড় নিতে চলেছে। আমরা জানি না বাইরে গিয়ে আমাদের জন্য কী অপেক্ষা করছে, কিন্তু এই কারাগার আমাদের যে মানসিক দৃঢ়তা দিয়েছে, তা দিয়ে আমরা যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে প্রস্তুত। আমি আমার বইপত্র আর কলম গোছাতে গিয়ে অনুভব করছি, এই নির্জনতা আমাকে যা দিয়েছে, তা বাইরের কোলাহলে পাওয়া অসম্ভব ছিল।

মানুষের জীবন এক নিরন্তর সফর। এক গন্তব্য শেষ হওয়া মানেই আরেক নতুন সফরের প্রস্তুতি নেওয়া। আহমেদনগর দুর্গের এই অধ্যায়টি আমার জীবনের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। এখানে আমি যেমন মানুষের ক্ষুদ্রতা দেখেছি, তেমনি দেখেছি মানুষের আত্মার অসীম উচ্চতা। এই প্রাচীরগুলোর ভেতরে কাটানো প্রতিটি দিন আমাকে নতুন করে বাঁচতে শিখিয়েছে। এখন যখন মুক্তির ডাক কানে আসছে, তখন আনন্দের চেয়েও বেশি এক ধরণের গাম্ভীর্য আমাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে।

এই দীর্ঘ সময়ের কারাবাস আমাকে শিখিয়েছে যে, সত্যের জন্য আত্মত্যাগ কখনও বৃথা যায় না। আমরা যখন এই কেল্লার অন্ধ কুঠুরিতে বসে দিন গুনছিলাম, তখন হয়তো বাইরের অনেকে ভেবেছিলেন আমাদের কণ্ঠ স্তব্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু তারা জানতেন না যে, নিস্তব্ধতাই অনেক সময় সবচেয়ে জোরালো প্রতিধ্বনি সৃষ্টি করে। আমার এই কলম, যা এই তিন বছরে হাজার হাজার পৃষ্ঠা কালো করেছে, তা কেবল শব্দ নয়—বরং এক একটি সংগ্রামের সাক্ষী। এই কারাগার থেকে আমি যে পাণ্ডুলিপিগুলো নিয়ে বের হচ্ছি, সেগুলো আমাদের আগামী প্রজন্মের জন্য পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করবে বলে আমার বিশ্বাস।

মুক্তি যখন দরজায় কড়া নাড়ে, তখন মানুষের মনে এক ধরণের অস্থিরতা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু আমি নিজেকে প্রশ্ন করি—আমরা কি সত্যিই সেই মুক্তির জন্য প্রস্তুত যা আমরা কামনা করি? কেবল কারাগার থেকে বেরিয়ে আসাই মুক্তি নয়, বরং আমাদের সমাজকে অজ্ঞতা, গোঁড়ামি আর দাসত্বের মানসিকতা থেকে মুক্ত করাই হলো আসল লড়াই। আহমেদনগর দুর্গের এই নিঃসঙ্গতা আমাকে সেই লড়াইয়ের জন্য আরও বেশি মানসিকভাবে প্রস্তুত করেছে। আমি এখন বুঝতে পারছি যে, জীবনের প্রতিটি পরীক্ষা আমাদের আসলে বড় কোনো মিশনের জন্য গড়ে তোলে।

আমার সহবন্দিদের দিকে তাকালে আমি এক অদ্ভুত প্রশান্তি অনুভব করি। আমরা সবাই এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি পরিণত। আমাদের রাজনৈতিক মতভেদগুলো এখন আর বড় মনে হয় না, কারণ আমরা সবাই এক বৃহত্তর সত্যের মুখোমুখি হয়েছি। কারাজীবনের এই শেষ দিনগুলোতে আমরা একে অপরের সাথে যে আলোচনাগুলো করেছি, তা আমাদের আগামী দিনের কর্মপন্থা নির্ধারণে সহায়ক হবে। আমরা যখন এই দুর্গের ফটক দিয়ে বেরিয়ে যাব, তখন আমরা কেবল রাজনৈতিক নেতা হিসেবে নয়, বরং এক একজন পরিপক্ক মানুষ হিসেবে বের হব।

আহমেদনগর দুর্গের আকাশটা আজ অন্যরকম লাগছে। বাতাসের সেই আগের রুক্ষতা নেই, যেন তাতে এক নতুন ভোরের সুবাস মিশে আছে। আমি যখন আমার বিছানা আর বইপত্র গোছাচ্ছি, তখন মনে হচ্ছে আমি এক যুগের সমাপ্তি টেনে নতুন এক যুগের সূচনা করতে যাচ্ছি। স্মৃতির এই বোঝাগুলো ভারী হলেও তা অত্যন্ত মূল্যবান। এই পাথরগুলো, এই প্রহরীরা আর এই লোহার শিকল—সবই আমাদের ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকবে। আমি যখন পেছন ফিরে তাকাব, তখন এই বন্দিত্বের গ্লানি নয়, বরং আমাদের সংকল্পের জয়গানই আমার মনে পড়বে।

অবশেষে সেই মুহূর্তটি আসন্ন, যখন আমাদের এই দীর্ঘ কারাবাসের ইতি ঘটবে। আমি যখন এই চিঠির শেষ লাইনগুলো লিখছি, তখন আমার মনে হচ্ছে আমি কেবল একটি ব্যক্তিগত পত্র শেষ করছি না, বরং আমার জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি টানছি। আহমেদনগর দুর্গের এই নিঃসঙ্গ দিনগুলোতে আমি যা কিছু লিখেছি, তা আমার আত্মার একান্ত প্রতিফলন। আমার এই ‘গুবার-ই-খাতির’ (হৃদয়ের ধূলিকণা) হয়তো একদিন আপনার মতো সহৃদয় পাঠকদের কাছে পৌঁছাবে এবং তাঁরা বুঝতে পারবেন যে, বন্দিত্বের অন্ধকারেও বুদ্ধিবৃত্তিক আলো জ্বালিয়ে রাখা সম্ভব।

প্রিয় বন্ধু, আমি জানি না মুক্ত পৃথিবীতে আমাদের জন্য ঠিক কী অপেক্ষা করছে। রাজনীতি হয়তো আরও জটিল হবে, দায়িত্বের বোঝা হয়তো আরও ভারী হবে। কিন্তু আমি এটুকু জানি যে, এই দুর্গ থেকে আমি যে অভিজ্ঞতা আর আধ্যাত্মিক শক্তি নিয়ে বের হচ্ছি, তা আমাকে আজীবন পথ দেখাবে। আমি এই কারাগারকে ঘৃণা করি না; বরং আমি এর কাছে কৃতজ্ঞ, কারণ এটি আমাকে নিজের সাথে কথা বলার সুযোগ দিয়েছে। মানুষের আসল পরিচয় তার সংকটের সময়েই প্রকাশ পায়, আর এই সংকট আমাকে আরও দৃঢ় করেছে।

আজ যখন আমি এই দুর্গের ফটক দিয়ে বাইরে পা রাখব, তখন আমি কোনো আক্ষেপ নিয়ে যাব না। আমি যাচ্ছি এক নতুন সংকল্প নিয়ে, এক নতুন ভোরের স্বপ্ন নিয়ে। আমাদের এই লড়াই কেবল একটি জাতির স্বাধীনতার জন্য নয়, এটি মানুষের মর্যাদা আর সত্যের বিজয়ের জন্য। আমি আশা করি, আমার এই চিঠিগুলো আপনাকেও সেই পথের সন্ধান দেবে যেখানে ভয় নেই, কেবল অটল বিশ্বাস আছে।

এখন বিদায় নেওয়ার সময়। কলম থামিয়ে দিচ্ছি, কিন্তু চিন্তার প্রবাহ থামবে না। ভালো থাকবেন এবং আমাদের সেই অভিন্ন লক্ষ্যের প্রতি অবিচল থাকবেন।

আপনার (একনিষ্ঠ) বন্ধু,

আবুল কালাম

চিঠির অংশ এখানে শেষ হলো। বইটিতে এর পরে যুক্ত হয়েছে চিঠির অতিরিক্ত অংশ ও টীকা। এছাড়া যুক্ত হয়েছে অনেকগুলো চিঠির বিস্তারিত ব্যাখ্যা। এর পাশাপাশি রয়েছে ১৯৪২ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত আহমেদনগর দুর্গের প্রতিদিনের জীবনের কিছু বিবরণ। যেখানে তৎকালীন রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ দলিল, মাওলানা আজাদের অন্যান্য পাণ্ডুলিপি এবং কিছু বিরল চিঠিপত্র রয়েছে। সেখানে সাহিত্য, দর্শন এবং ধর্মতত্ত্বের ওপর মাওলানার আরও কিছু গভীর চিন্তাভাবনা যা চিঠির আকারে নয়, বরং নোট আকারে আছে। সেগুলো অনুবাদ শুরু করলাম। দেখা যাক কতদুর পারা যায়।

সত্যের স্বরূপ ও চিন্তার স্বাধীনতা

জীবনের এই দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় আমি একটি বিষয় স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করেছি যে, সত্য (হক) কখনোই কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা দলের একচেটিয়া সম্পদ নয়। সত্যের প্রকাশ ঘটে মানুষের অন্তরের শুদ্ধতায়। আমরা অনেক সময় সত্যকে কেবল আমাদের নিজেদের স্বার্থ বা মতাদর্শের ফ্রেমে আটকে রাখতে চাই, কিন্তু সত্য তার নিজস্ব গতিতে চলে। আহমেদনগর দুর্গের এই নিঃসঙ্গ দিনগুলোতে আমি যখন প্রাচীন দার্শনিকদের গ্রন্থগুলো পুনরায় পাঠ করছিলাম, তখন বারবার এই বিষয়টিই আমার সামনে উঠে এসেছে যে, সত্যের পথ বড়ই কঠিন এবং কণ্টকাকীর্ণ।

মানুষ যখন কোনো মহান আদর্শের জন্য লড়াই করে, তখন তার সবচেয়ে বড় শত্রু হয় তার নিজের ভেতরকার সংশয়। বাতিল বা অসত্য কেবল বাইরে থেকে আক্রমণ করে না, বরং এটি মানুষের মনের গভীরে বাসা বাঁধে এবং সত্যের পথকে ঝাপসা করে দেয়। আমি আমার এই বন্দিজীবনে দেখেছি, কীভাবে তুচ্ছ জাগতিক সুযোগ-সুবিধা মানুষকে তার আদর্শ থেকে বিচ্যুত করতে পারে। কিন্তু যারা সত্যের ওপর অবিচল থাকে, তাদের জন্য কারাগারের দেয়াল কোনো বাধা হতে পারে না।

চিন্তার স্বাধীনতা হলো মানুষের শ্রেষ্ঠ সম্পদ। শরীরকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা যায়, কিন্তু মানুষের ভাবনাকে কেউ বন্দি করতে পারে না। আমি যখন এই দুর্গের আঙিনায় বসে ভাবি, তখন আমার মন হিমালয়ের চূড়া থেকে শুরু করে আরবের মরুভূমি পর্যন্ত বিচরণ করে। এই যে মানসিকভাবে স্বাধীন থাকা, এটাই হলো প্রকৃত বিজয়। শাসকরা মনে করে তারা আমাদের বন্দি করে আমাদের কণ্ঠ রোধ করেছে, কিন্তু তারা জানে না যে এই নিঃশব্দ কারাগার থেকেই একদিন বিপ্লবের চরম বাণী উচ্চারিত হবে।

সত্যের কোনো পরাজয় নেই। হয়তো সাময়িকভাবে তা মেঘে ঢাকা পড়ে যায়, কিন্তু সূর্যের মতো তা আবারও প্রদীপ্ত হয়ে ফিরে আসে। ইতিহাসের প্রতিটি পাতায় এর প্রমাণ রয়েছে। যারা আজ ক্ষমতার দাপটে সত্যকে অস্বীকার করছে, সময়ের আবর্তে তারাই একদিন বিস্মৃতির অতল গহ্বরে হারিয়ে যাবে। আর যারা সত্যের জন্য লাঞ্ছনা সয়েছেন, তাদের নাম স্বর্ণাক্ষরে চিরকাল অম্লান থাকবে।

মানুষের প্রবৃত্তি ও বুদ্ধিবৃত্তিক সংগ্রাম

মানুষের অন্তরে দুটি শক্তির নিরন্তর লড়াই চলে—একদিকে তার জৈবিক প্রবৃত্তি (নফস), যা তাকে বস্তুগত সুখ ও সংকীর্ণতার দিকে টানে; অন্যদিকে তার বুদ্ধিবৃত্তি (আকল), যা তাকে মহত্ত্ব ও সত্যের সন্ধান দেয়। আহমেদনগর দুর্গের এই নির্জনতা আমাকে এই অভ্যন্তরীণ লড়াইকে খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ দিয়েছে। আমি দেখেছি, মানুষ যখন কেবল তার প্রবৃত্তির দাসে পরিণত হয়, তখন সে সত্যের আলোকবর্তিকা চোখের সামনে থাকলেও তা দেখতে পায় না। প্রবৃত্তির পর্দা তার অন্তর্দৃষ্টিকে অন্ধ করে দেয়।

জ্ঞানের প্রকৃত সার্থকতা হলো নিজেকে চেনা। প্রাচীন ঋষি ও দার্শনিকরা যাকে ‘স্বয়ং উপলব্ধি’ বলেছেন, ইসলামি দর্শনে তাকেই ‘মারিফাত’ বা আত্মপরিচয় বলা হয়েছে। যে ব্যক্তি নিজের প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে শিখেনি, সে পৃথিবীর কোনো সাম্রাজ্য জয় করলেও আসলে পরাজিত। এই কারাগারের সীমাবদ্ধতা আমাকে শিখিয়েছে কীভাবে নিজের ইচ্ছাকে উচ্চতর আদর্শের অধীনে সমর্পণ করতে হয়। যখন মানুষের আত্মা প্রবৃত্তির শেকল ভেঙে মুক্ত হয়, তখনই সে মহাবিশ্বের প্রকৃত রহস্যগুলো অনুভব করতে শুরু করে।

সত্য অনুসন্ধানের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হলো অন্ধ অনুসরণ বা ‘তাকলীদ’। মানুষ যখন প্রশ্ন করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে এবং কেবল পূর্বপুরুষদের বা সমাজের গড্ডলিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে দেয়, তখনই তার বুদ্ধিবৃত্তিক মৃত্যু ঘটে। আমি বিশ্বাস করি, প্রতিটি মানুষের উচিত নিজের বিবেক এবং বুদ্ধি দিয়ে সত্যকে যাচাই করা। এই দুর্গের নিস্তব্ধতায় আমি যখন বিভিন্ন ধর্ম ও দর্শনের তুলনামূলক আলোচনা করি, তখন দেখি যে মৌলিক সত্যগুলো সবখানেই এক—তা হলো মানুষের মুক্তি এবং ইনসাফ।

কারাগারের এই নির্জনতা অনেক সময় মানুষকে হতাশার দিকে ঠেলে দেয়, কিন্তু যদি কেউ তার বুদ্ধিবৃত্তিকে জাগ্রত রাখতে পারে, তবে এই একাকীত্বই তার জন্য আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়ায়। আমি আমার এই নির্জন প্রহরগুলোকে জ্ঞানের অন্বেষণে উৎসর্গ করেছি। প্রতিটি নতুন ধারণা, প্রতিটি নতুন চিন্তা আমাকে আরও বেশি শক্তিশালী করে তোলে। আমি অনুভব করি, আমার এই বন্দিত্ব আসলে আমার চিন্তার পরিধিকে আরও বিস্তৃত করার একটি প্রশিক্ষণ ক্ষেত্র মাত্র।

ইতিহাসের অমোঘ নিয়ম ও নৈতিক দায়িত্ব

ইতিহাসের পাতায় নজর দিলে একটি সত্য দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে ওঠে—তা হলো ‘মুকামাত-এ-আখলাক’ বা নৈতিকতার মানদণ্ড। কোনো জাতি বা সভ্যতা কেবল তার সামরিক শক্তি বা ধন-সম্পদের কারণে টিকে থাকে না; বরং টিকে থাকে তার নৈতিক দৃঢ়তার ওপর। আহমেদনগর দুর্গের এই পাথুরে দেয়ালগুলো সাক্ষ্য দিচ্ছে যে, কত বড় বড় সাম্রাজ্য এখানে ধূলিসাৎ হয়েছে কেবল তাদের অভ্যন্তরীণ পচনের কারণে। প্রকৃতি বা ইতিহাস কখনোই অবিচারকে দীর্ঘস্থায়ী হতে দেয় না। এটি একটি চিরন্তন বিধান যে, রোপণ করা বীজের গুণাগুণ অনুযায়ীই বৃক্ষ ও ফল লাভ হবে।

আমি যখন বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতির দিকে তাকাই, তখন দেখি ক্ষমতার দম্ভে মানুষ কীভাবে ইতিহাসের এই শিক্ষাগুলোকে ভুলে যাচ্ছে। সাময়িকভাবে মনে হতে পারে যে পাশবিক শক্তি বিজয়ী হচ্ছে, কিন্তু নৈতিকতার যে অদৃশ্য আদালত রয়েছে, সেখানে প্রতিটি কর্মের হিসাব সংরক্ষিত হয়। যে হাত আজ নিরপরাধ মানুষের ওপর জুলুম করছে, সেই হাতই একদিন নিজের পরাজয়ের দলিল স্বাক্ষর করবে। কারাগারের এই নির্জনতা আমাকে শিখিয়েছে যে, ধৈর্য (সবর) কেবল চুপ করে থাকা নয়, বরং ন্যায়ের পথে অবিচল থেকে সেই অমোঘ পরিবর্তনের প্রতীক্ষা করা।

আমাদের লড়াই কেবল ব্রিটিশদের শাসনের বিরুদ্ধে নয়, এটি একটি আদর্শিক সংঘাত। আমরা যদি নিজেরা নৈতিকভাবে উন্নত না হই, তবে কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন আমাদের জাতির ভাগ্যে কোনো প্রকৃত মুক্তি আনবে না। প্রকৃত মুক্তি আসবে তখন, যখন প্রতিটি নাগরিক তার অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হবে এবং মিথ্যার সাথে আপস না করার মানসিকতা অর্জন করবে। এই দুর্গের বন্দিদশা আমাকে বারবার মনে করিয়ে দেয় যে, ত্যাগের মাধ্যমেই আত্মার পরিশুদ্ধি ঘটে।

ইতিহাসের চাকা হয়তো ধীর গতিতে ঘোরে, কিন্তু তা অনিবার্যভাবে সত্যের দিকেই ধাবিত হয়। আমি আমার এই নিঃসঙ্গ প্রহরগুলোতে ইতিহাসের সেই মহা-পরিকল্পনার স্পন্দন শুনতে পাই। আজ যারা শেকলে বন্দি, তারাই হয়তো আগামী দিনের নতুন ভোরের রূপকার। মানুষের কোনো সৎ প্রচেষ্টাই বিফলে যায় না, তা সে নির্জন কারাগারের প্রকোষ্ঠে করা প্রার্থনাই হোক বা রাজপথের সংগ্রামই হোক। প্রতিটি কাজের একটি সুদূরপ্রসারী প্রভাব রয়েছে যা আমরা সবসময় তাৎক্ষণিকভাবে বুঝতে পারি না।

প্রতিকূলতায় স্থৈর্য ও সবর-এর দর্শন

জীবনের কঠিনতম সময়ে মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো তার অভ্যন্তরীণ স্থৈর্য। মানুষ যখন বিপদে পড়ে, তখন সে সাধারণত অভিযোগের পথ বেছে নেয়, কিন্তু প্রকৃত প্রজ্ঞা নিহিত রয়েছে সেই পরিস্থিতির মধ্য থেকে সত্যকে চিনে নেওয়ায়। আহমেদনগর দুর্গের এই নিঃসঙ্গ দিনগুলোতে আমি ‘সবর’ বা ধৈর্যের এক নতুন সংজ্ঞা খুঁজে পেয়েছি। এটি কেবল নিষ্ক্রিয়ভাবে সময় পার করা নয়, বরং এটি হলো মানসিক অস্থিরতাকে জয় করে নিজের লক্ষ্য ও আদর্শের ওপর পাহাড়ের মতো অটল থাকা।

আমি অনেক সময় ভেবেছি, কেন মানুষের জীবনে এই ধরণের কঠোর পরীক্ষা আসে? সম্ভবত মানুষের ভেতরের কাঁচা সোনাকে পুড়িয়ে খাঁটি করার জন্যই এই আগুনের প্রয়োজন। যে ব্যক্তি আরাম-আয়েশের মধ্যে বড় হয়েছে, সে কখনোই জীবনের গভীর সত্যগুলো উপলব্ধি করতে পারে না। এই কারাগারের রুক্ষতা, খাবারের সীমাবদ্ধতা এবং প্রিয়জনদের থেকে বিচ্ছিন্নতা—এই সবকিছুই আসলে আত্মার এক ধরণের প্রশিক্ষণ। যখন বাইরের সমস্ত অবলম্বন হারিয়ে যায়, তখনই মানুষ বুঝতে পারে যে তার ভেতরের আত্মিক শক্তি কতটা বিশাল।

আমাদের এই কারাজীবনে আমি লক্ষ্য করেছি, যারা মানসিকভাবে দুর্বল, তারা খুব দ্রুতই অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়ে। কিন্তু যারা কোনো উচ্চতর আদর্শের সাথে যুক্ত, তাদের চোখে এক ধরণের উজ্জ্বলতা থাকে যা অন্ধকার প্রকোষ্ঠেও ম্লান হয় না। এই উজ্জ্বলতা আসে বিশ্বাস থেকে। বিশ্বাস কেবল ধর্মীয় আচার-আচরণে নয়, বরং এই মহাবিশ্বের ন্যায়বিচারের ওপর বিশ্বাস। যদি আমি জানি যে আমার এই দুঃখ ভোগ কোনো মহান উদ্দেশ্যের অংশ, তবে সেই দুঃখ আর আমার কাছে বোঝা মনে হয় না।

মানুষের মন হলো একটি আয়নার মতো; যদি সেখানে দুশ্চিন্তা আর ভয়ের ধুলো জমে, তবে সত্যের প্রতিফলন দেখা যায় না। তাই আমি সচেতনভাবে চেষ্টা করি আমার মনকে সবসময় কলুষমুক্ত রাখতে। আমি যখন বই পড়ি বা নির্জনে স্রষ্টার কথা ভাবি, তখন এই কারাগারের দেয়ালগুলো যেন অদৃশ্য হয়ে যায়। মনে হয়, আমি এক অসীম জগতের বাসিন্দা যেখানে কোনো শেকল নেই, কোনো প্রহরী নেই। এই মানসিক মুক্তিই হলো মানুষের প্রকৃত স্বাধীনতা, যা কোনো রাজশক্তি কেড়ে নিতে পারে না।

বন্দিদশায় সৃজনশীলতা ও সাহিত্যের ভূমিকা

অনেকে মনে করেন যে কারাগারের সংকীর্ণ প্রকোষ্ঠ মানুষের সৃজনশীলতাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ অনেক সাহিত্যকর্ম এবং দার্শনিক চিন্তার জন্ম হয়েছে এই কারাগারের অন্ধকারেই। যখন মানুষের বাইরের চলাফেরা বন্ধ হয়ে যায়, তখন তার চিন্তার জগতটি আরও বেশি প্রসারিত হয়। আহমেদনগর দুর্গের এই নিঃসঙ্গ দিনগুলোতে আমার কলমই হয়েছে আমার সবচেয়ে বিশ্বস্ত সঙ্গী। আমি যখন কাগজের ওপর কালির আঁচড় কাটি, তখন প্রতিটি শব্দ যেন এক একটি জীবন্ত সত্তা হয়ে আমার সাথে কথা বলে।

সাহিত্য কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়, এটি হলো আত্মার বহিঃপ্রকাশ। আমি যখন প্রাচীন পারস্যের কবিতা বা ধ্রুপদী উর্দু সাহিত্য নিয়ে ভাবি, তখন আমি নিজেকে আর এই দুর্গের বন্দি মনে করি না। শিল্প ও সাহিত্যের এক অদ্ভুত ক্ষমতা আছে—তা স্থান ও কালের সীমানা অতিক্রম করতে পারে। গালিব বা মীর তকি মীরের একটি পঙক্তি যখন আমার মনে পড়ে, তখন এই কারাগারের একঘেয়েমি এক মায়াবী পরিবেশে রূপান্তরিত হয়। সৃজনশীলতা হলো সেই চাবিকাঠি যা দিয়ে মনের অদৃশ্য কারাগারের তালা খোলা যায়।

আমি আমার এই বন্দিজীবনে লক্ষ্য করেছি যে, যারা শিল্প-সাহিত্যের রস আস্বাদন করতে পারে না, তাদের জন্য কারাবাস অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক। কিন্তু যার কাছে একটি বই আছে বা যার মনে একটি নতুন ভাবনার উদয় হয়, সে কখনোই একা নয়। এই যে শব্দের পর শব্দ সাজিয়ে আমি আমার মনের ধুলিকণাগুলোকে (গুবার-এ-খাতির) লিপিবদ্ধ করছি, এটি কেবল আমার ব্যক্তিগত তৃপ্তি নয়, বরং এটি হলো সময়ের বিরুদ্ধে এক ধরণের প্রতিবাদ। লেখক যখন লেখেন, তখন তিনি আসলে নিজেকে সময়ের ঊর্ধ্বে তুলে ধরেন।

কারাগারের প্রহরীরা আমার শরীরকে পাহারা দিতে পারে, কিন্তু তারা আমার কল্পনাকে পাহারা দিতে পারে না। আমার কল্পনা আমাকে এই মুহূর্তেই দিল্লির জামে মসজিদে নিয়ে যেতে পারে, আবার পরক্ষণেই নিয়ে যেতে পারে প্যারিসের কোনো ক্যাফেতে। এই যে অবারিত ভ্রমণের স্বাধীনতা, এটিই হলো মানুষের প্রকৃত ঐশ্বর্য। তাই আমি আমার বন্ধুদের সবসময় বলি, শরীর বন্দি থাকলেও মনকে যেন কখনও শিকল পরানো না হয়। সৃজনশীল চিন্তা মানুষের মনুষ্যত্বকে বাঁচিয়ে রাখে এবং তাকে অন্ধকারের মাঝেও আলোর পথ দেখায়।

প্রকৃতির সান্নিধ্য ও কারাগারের বাগান

মানুষ যখন পাথুরে দেয়ালের মাঝে বন্দি থাকে, তখন মাটির স্পর্শ আর একটি সবুজ পাতার গুরুত্ব সে নতুন করে উপলব্ধি করে। আহমেদনগর দুর্গের এই রুক্ষ আঙিনায় আমি ছোট একটি বাগান করার চেষ্টা করেছি। এটি কেবল শখের বশে করা কোনো কাজ নয়, বরং এটি হলো জীবনের স্পন্দনকে অনুভব করার একটি প্রক্রিয়া। যখন আমি একটি বীজ বপন করি এবং কয়েকদিন পর সেখান থেকে কচি প্রাণের উদগম দেখি, তখন আমার মনে হয়—জীবনকে কোনো দেয়াল দিয়ে চিরস্থায়ীভাবে চেপে রাখা সম্ভব নয়। মাটি ফুঁড়ে ওঠা সেই ক্ষুদ্র চারাটি আমাকে অসীম ধৈর্যের শিক্ষা দেয়।

গাছের পরিচর্যা করা অনেকটা মানুষের আত্মা গঠনের মতো। আগাছা পরিষ্কার করা, সঠিক সময়ে জল দেওয়া এবং রোদের ব্যবস্থা করা—এই প্রতিটি ধাপের মধ্যে এক ধরণের আধ্যাত্মিক সাধনা রয়েছে। আমি যখন মাটির সাথে মিশে যাই, তখন আমার মনে হয় আমি আমার আদি সত্তার কাছাকাছি পৌঁছেছি। ফুলের পাপড়ি যখন ধীরে ধীরে উন্মোচিত হয়, তখন আমি সেখানে স্রষ্টার অসীম কারুকার্য দেখতে পাই। এই কারাগারের সীমাবদ্ধতার মাঝেও প্রকৃতি তার সৌন্দর্য বিলিয়ে দিতে কার্পণ্য করে না। এটিই হলো প্রকৃতির মহানুভবতা।

অনেকে আমাকে জিজ্ঞেস করেন, এই সামান্য কয়েকটা ফুলগাছ নিয়ে আমি এত সময় কেন কাটাই? আমি তাদের বলি, এই ফুলগুলো আমার সাথে কথা বলে। যখন বাইরের জগত থেকে কোনো সুসংবাদ আসে না, তখন এই ফুটে থাকা ফুলগুলোই আমাকে বলে যে পৃথিবীতে এখনো সৌন্দর্য টিকে আছে। বিকেলের পড়ন্ত রোদে যখন বাগানের কোণে বসে থাকি, তখন বাতাসের ঝাপটায় ফুলের সুবাস আমাকে এক অজানা জগতে নিয়ে যায়। তখন মনে হয় না যে আমি কোনো দুর্গের বন্দি; বরং মনে হয় আমি প্রকৃতির এক বিশাল জান্নাতি বাগানের অংশ।

প্রকৃতির সাথে এই মিতালি মানুষের মানসিক ভার সামলাতে সাহায্য করে। মাটির ঘ্রাণে যে প্রশান্তি আছে, তা দামী সুগন্ধিতেও নেই। আমি লক্ষ্য করেছি, বাগানের কাজে ব্যস্ত থাকলে মনের সমস্ত বিষণ্ণতা কর্পূরের মতো উড়ে যায়। জীবনের চাকা যেমন ঘোরে, ঋতুগুলোও তেমনি আবর্তিত হয়। শীতের জীর্ণতা শেষে যেমন বসন্তের আগমন অনিবার্য, তেমনি এই কারাবাসের অন্ধকার শেষে স্বাধীনতার আলো আসাও অবধারিত। আমার বাগান আমাকে এই ধ্রুব সত্যটিই প্রতিদিন মনে করিয়ে দেয়।

কারাগারের ক্ষুদ্র সঙ্গী: চড়ুই পাখির কাহিনী

মানুষ যখন সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তখন সে প্রকৃতির ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র প্রাণীদের মাঝেও প্রাণের স্পন্দন খুঁজতে শুরু করে। আহমেদনগর দুর্গের এই নির্জনতায় আমার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী হলো একদল চড়ুই পাখি। তারা এই দুর্গের ঘুণে ধরা কড়িিকাঠ আর দেয়ালের ফোকরে তাদের সংসার পেতেছে। প্রথম দিকে তারা আমাকে দেখে বেশ সতর্ক ছিল, কিন্তু সময়ের সাথে সাথে আমাদের মধ্যে এক ধরণের মকাবিলা বা পরিচয় গড়ে উঠেছে। এখন তারা আমার পড়ার টেবিলে, এমনকি আমার খাবারের থালার আশেপাশেও বিনা সংকোচে ঘুরে বেড়ায়।

চড়ুই পাখির জীবন পর্যবেক্ষণ করা এক পরম আনন্দের বিষয়। তাদের মধ্যে যে চঞ্চলতা এবং জীবন নিয়ে যে নিরন্তর ব্যস্ততা আমি দেখি, তা আমাকে অবাক করে। তারা সারাদিন খড়কুটো জোগাড় করা আর কিচিরমিচির ঝগড়ায় মত্ত থাকে। আমি যখন খাবার খেতে বসি, তখন তারা এক ধরণের অধিকার নিয়ে আমার সামনে এসে দাঁড়ায়। রুটির এক টুকরো ছিটিয়ে দিলে তাদের মধ্যে যে কাড়াকাড়ি শুরু হয়, তা দেখে মনে হয় পৃথিবীর সমস্ত রাজনৈতিক কাড়াকাড়ি যেন এই ক্ষুদ্র পাখিদের মাঝেও বর্তমান। মানুষের মতো তারাও নিজেদের সীমানা নিয়ে অত্যন্ত সচেতন।

কখনও কখনও আমি তাদের ধমক দেওয়ার ভান করি, কিন্তু তারা এখন আর আমাকে ভয় পায় না। তারা বুঝে নিয়েছে যে এই গম্ভীর মানুষটি আসলে তাদের কোনো ক্ষতি করবে না। মাঝেমধ্যে কোনো এক সাহসী চড়ুই আমার চায়ের কাপের একদম কাছে এসে বসে পড়ে এবং তার উজ্জ্বল কালো চোখে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে, যেন সে আমার মনের কথাগুলো পড়তে চাইছে। এই অবোধ পাখিদের সাথে আমার এই নীরব কথোপকথন আমার কারাজীবনের একঘেয়েমি অনেকটা কমিয়ে দেয়।

চড়ুইদের এই সংসার আমায় শিখিয়েছে যে, জীবন যেখানেই থাকুক—তা কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠেই হোক বা অবারিত আকাশেই হোক—সে তার নিজের পথ খুঁজে নেয়। তারা কোনো রাজকীয় ফরমানের তোয়াক্কা করে না, কোনো জেলের প্রহরীর ভয় পায় না। তাদের এই অবারিত স্বাধীনতা আমাকে প্রতিনিয়ত মনে করিয়ে দেয় যে, মানুষের মনকেও এই চড়ুইদের মতো মুক্ত রাখা উচিত। আহমেদনগর দুর্গের এই ক্ষুদ্র সঙ্গীরা আজ আমার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ক্ষুদ্র প্রাণের মহিমা ও সময়ের প্রবহমানতা

চড়ুইদের চঞ্চলতার পাশাপাশি আমার এই প্রকোষ্ঠে আরও এক দল নিঃশব্দ সঙ্গীর আনাগোনা রয়েছে—তারা হলো পিঁপড়ে। মেঝের ফাটল থেকে বেরিয়ে এসে তারা যখন দীর্ঘ সারি বেঁধে চলে, তখন আমি ঘণ্টার পর ঘণ্টা তাদের এই শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবন পর্যবেক্ষণ করি। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই ক্ষুদ্র প্রাণীগুলোর মধ্যে যে কঠোর পরিশ্রম আর সহযোগিতার মনোভাব রয়েছে, তা অনেক সময় সভ্য মানুষের মাঝেও বিরল। তারা কোনো নেতার হুকুম ছাড়াই যেন এক অদেখা শৃঙ্খলার অধীনে কাজ করে চলেছে। তাদের এই নিরন্তর ছোটাছুটি আমাকে মনে করিয়ে দেয় যে, জগতের কোনো প্রাণীই অলস বসে নেই; সবাই নিজ নিজ অস্তিত্ব রক্ষায় ব্যস্ত।

আমি যখন আমার পড়ার টেবিলের এক কোণে কিছু চিনির দানা ফেলে রাখি, তখন মুহূর্তের মধ্যে খবর পৌঁছে যায় তাদের আস্তানায়। এই যোগাযোগ ব্যবস্থা আর তাদের সংহতি আমাকে মুগ্ধ করে। এই কারাগারের পাথুরে মেঝেতে বসে আমি বুঝতে পারি, মহাবিশ্বের বিশালতার কাছে আমরা যতটা ক্ষুদ্র, এই পিঁপড়েরা আমাদের কাছে ঠিক ততটাই নগণ্য। অথচ প্রতিটি প্রাণেরই একটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য রয়েছে। স্রষ্টার এই সুনিপুণ কারুকার্য কারাগারের নিভৃত কোণেও সমানভাবে উজ্জ্বল।

সময়ের প্রবহমানতা নিয়ে আমি অনেক সময় ভাবি। বাইরে হয়তো সেকেন্ড, মিনিট আর ঘণ্টার হিসেবে দিন কাটে, কিন্তু এখানে সময় এক স্থির সমুদ্রের মতো। তবুও যখন আমি এই ক্ষুদ্র জীবগুলোর জীবনচক্র দেখি—তাদের জন্মানো, খাদ্য সংগ্রহ আর মৃত্যু—তখন বুঝি সময় থেমে নেই। প্রতিটি মুহূর্ত আমাদের থেকে কিছু কেড়ে নিচ্ছে এবং নতুন কিছু দান করছে। এই যে পরিবর্তনের ধারা, এটিই হলো জগতের প্রকৃত নিয়ম।

কারাগারের এই নির্জনতায় ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিষয়গুলোও আমার কাছে বড় হয়ে ধরা দেয়। যে ধূলিকণা আগে চোখের আড়ালে থাকত, আজ রোদের আলোয় তাদের নাচানাচিও আমার কাছে এক গভীর দর্শনের ইঙ্গিত দেয়। আমি অনুভব করি, মানুষ যখন বাইরের জাঁকজমক থেকে বিচ্ছিন্ন হয়, তখনই সে জীবনের আসল বুননটি দেখতে পায়। এই পিঁপড়ে, এই চড়ুই আর এই ধূলিকণা—সবাই মিলে যেন এক বিশাল ঐকতান সৃষ্টি করেছে, যার সুর কেবল শান্ত মনেই শোনা সম্ভব।

কারাগারের নিশীথ আকাশ ও একাকীত্বের গভীরতা

দিনের কোলাহল যখন থেমে যায় এবং কারাগারের প্রহরীদের বুটের শব্দ দূরে মিলিয়ে যায়, তখন শুরু হয় এক অন্যরকম জগত। আহমেদনগর দুর্গের রাতগুলো এক গভীর নিস্তব্ধতা নিয়ে আসে। আমি যখন আমার কক্ষের ছোট জানালা দিয়ে বাইরের আকাশের দিকে তাকাই, তখন নক্ষত্রখচিত সেই বিশাল নীল আকাশ আমাকে এক অসীমত্বের বার্তা দেয়। এই অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বসে আমি অনুভব করি যে, মানুষ যখন জাগতিক আলো থেকে বঞ্চিত হয়, তখনই সে মহাবিশ্বের প্রকৃত জ্যোতি দেখতে পায়। নক্ষত্ররা যেন এই নিঃসঙ্গ বন্দির সাথে চোখের ইশারায় কথা বলে।

এই নিশীথ প্রহরে একাকীত্ব আর কোনো বোঝা মনে হয় না, বরং তা হয়ে ওঠে এক আধ্যাত্মিক সম্পদ। মানুষ সাধারণত একাকীত্বকে ভয় পায়, কারণ সে নিজের মুখোমুখি হতে ভয় পায়। কিন্তু আমি এই নির্জনতাকে আলিঙ্গন করেছি। নক্ষত্রদের সেই স্থিরতা আমাকে শেখায় যে, বিশৃঙ্খল এই পৃথিবীতেও এক পরম শৃঙ্খলা বিরাজমান। যখন চারপাশ নিস্তব্ধ থাকে, তখন আমি নিজের ভেতরের সেই কণ্ঠস্বর শুনতে পাই যা দিনের ব্যস্ততায় ঢাকা পড়ে থাকে। এটি কেবল কারাবাস নয়, এটি যেন নিজের আত্মার গভীরে এক ডুব দেওয়া।

রাতের এই স্তব্ধতায় আমি অনেক সময় মহান সূফী ও সাধকদের কথা ভাবি, যাঁরা নির্জনতাকে তাঁদের জ্ঞানের সোপান করেছিলেন। এই যে অগণিত নক্ষত্ররাজি, এরা যুগের পর যুগ ধরে কত উত্থান-পতন, কত সাম্রাজ্যের পতন আর কত বন্দির দীর্ঘশ্বাস দেখেছে। তাদের কাছে আমার এই তিন বছরের কারাবাস সময়ের এক ক্ষুদ্র ভগ্নাংশ মাত্র। এই চিন্তা আমাকে এক অদ্ভুত বিনয় দান করে। আমি বুঝতে পারি, আমার ব্যক্তিগত কষ্ট বা সংগ্রাম মহাবিশ্বের এই মহাকাব্যের একটি অতি সামান্য অংশ মাত্র।

আহমেদনগর দুর্গের রাত আমাকে এক পরম ধৈর্য ও প্রশান্তি দিয়েছে। ভোরের আলো যখন ধীরে ধীরে ফুটতে শুরু করে, তখন আমি বুঝতে পারি যে প্রতিটি অন্ধকার রজনীর শেষেই এক উজ্জ্বল সকাল প্রতীক্ষা করে। এই নক্ষত্রগুলো সাক্ষী যে, সত্যের সন্ধানে যারা নির্ঘুম রাত কাটায়, তাদের শ্রম কখনোই বৃথা যায় না। রাতের এই নিস্তব্ধতা আমাকে নতুন দিনের লড়াইয়ের জন্য শক্তি জোগায় এবং আমার বিশ্বাসকে আরও দৃঢ় করে যে, অন্ধকারের শাসন কখনোই চিরস্থায়ী হতে পারে না।

সকালের চা ও চিন্তার জাগরণ

ভোরের প্রথম আলো যখন কারাগারের প্রাচীর ছুঁয়ে যায়, তখন আমার দিন শুরু হয় এক বিশেষ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে—তা হলো এক কাপ গরম চা। আমার কাছে চা পান কেবল তৃষ্ণা মেটানো নয়, এটি একটি শৈল্পিক সাধনা। আহমেদনগর দুর্গের এই নিস্তব্ধ সকালে আমি যখন নিজের হাতে চা তৈরি করি, তখন প্রতিটি পদক্ষেপ আমি অত্যন্ত যত্ন সহকারে পালন করি। চায়ের লিকারের সেই গাঢ় রং আর তার সুগন্ধ আমার মস্তিষ্ককে এক মুহূর্তেই সজাগ করে তোলে। আমি মনে করি, একটি ভালো কাপ চা মানুষের চিন্তার জট খুলতে এক জাদুকরী ভূমিকা পালন করে।

আমি সবসময়ই কড়া এবং চিনিহীন চা পছন্দ করি, যাকে আমরা ‘তিলক’ বা সাদা চা বলি না। চায়ের প্রকৃত স্বাদ তার তিক্ততার মাঝে লুকিয়ে থাকে, ঠিক যেমন জীবনের প্রকৃত স্বাদ তার সংগ্রামের মাঝে। আমি যখন পিরিচে চা ঢালি এবং তার ধোঁয়া ওঠা দেখি, তখন আমার মনে হয় জগতের সমস্ত জটিল সমীকরণগুলো যেন সহজ হতে শুরু করেছে। এই সকালে চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে আমি আমার সারাদিনের পড়াশোনা আর লেখালেখির পরিকল্পনা সাজিয়ে নিই। এটি কেবল পানীয় নয়, এটি আমার বুদ্ধিবৃত্তিক সফরের জ্বালানি।

কারাগারে সব সময় উন্নত মানের চা পাতা পাওয়া যায় না, কিন্তু আমি আমার সীমিত সাধ্যের মধ্যেই সেরাটা বের করার চেষ্টা করি। জওহরলালজি এবং অন্যান্য সহবন্দিরাও মাঝেমধ্যে আমার এই চা তৈরির কৌশলের প্রশংসা করেন। আমাদের এই ছোট আড্ডায় সকালের চা নিয়ে অনেক রসাত্মক আলোচনাও হয়। এই যে সামান্য একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে আমরা আনন্দ খুঁজে নিই, এটিই আমাদের মানসিক স্বাস্থ্য অটুট রাখতে সাহায্য করে। মানুষ যদি ক্ষুদ্র জিনিসের মাঝে সৌন্দর্য খুঁজে না পায়, তবে বড় কোনো অর্জনেও সে তৃপ্ত হতে পারবে না।

চা পানের এই সময়টুকু আমার একান্ত ব্যক্তিগত। এই সময় আমি বাইরের জগতের সমস্ত দুশ্চিন্তা থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখি। চায়ের কাপ হাতে নিয়ে আমি যখন বাগানের দিকে তাকাই, তখন মনে হয় প্রতিটি চুমুকের সাথে আমি এক নতুন প্রাণশক্তি গ্রহণ করছি। যারা চায়ের মর্যাদা বোঝে না, তারা আসলে জীবনের অনেক সূক্ষ্ম আনন্দ থেকে বঞ্চিত। আমার এই বন্দিজীবনে চা কেবল একটি অভ্যাস নয়, এটি আমার একাকীত্বের এক পরম বন্ধু এবং আমার সৃজনশীলতার এক নিরব উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বইয়ের সান্নিধ্য ও বুদ্ধিবৃত্তিক আশ্রয়

মানুষের জীবনে যদি বইয়ের মতো কোনো অকৃত্রিম বন্ধু থাকে, তবে পৃথিবীর কোনো কারাগারই তাকে বন্দি করে রাখতে পারে না। আহমেদনগর দুর্গের এই নিঃসঙ্গ প্রকোষ্ঠে আমার চারপাশ ঘিরে থাকা বইগুলো কেবল কাগজের স্তূপ নয়, এরা একেকজন জীবন্ত সত্তা। আমি যখন কোনো একটি বই খুলি, তখন মনে হয় আমি সেই লেখকের সাথে কোনো এক শান্ত উদ্যানে বসে আলাপ করছি। বই পড়ার এই নেশা আমার আজকের নয়, এটি আমার রক্তের সাথে মিশে আছে। কিন্তু এই কারাগার আমাকে বইয়ের মূল্য নতুন করে বুঝতে শিখিয়েছে।

কারাগারের সীমাবদ্ধতার কারণে আমার সমস্ত প্রিয় বই এখানে আনা সম্ভব হয়নি। তবুও যেটুকু সংগ্রহ করতে পেরেছি, তা দিয়েই আমি আমার এক আলাদা জগত তৈরি করে নিয়েছি। দর্শনের জটিল তত্ত্ব থেকে শুরু করে ইতিহাসের রোমাঞ্চকর উপাখ্যান—সবই আমার এই ছোট তাকে স্থান পেয়েছে। আমি যখন পড়তে বসি, তখন সময়ের জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। বাইরের জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া আমার জন্য আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়িয়েছে, কারণ এখন আমি নিরবচ্ছিন্নভাবে পড়ার সুযোগ পাচ্ছি যা বাইরের ব্যস্ত জীবনে প্রায় অসম্ভব ছিল।

সহবন্দিদের মধ্যে জওহরলালজিও বইয়ের দারুণ ভক্ত। আমাদের মধ্যে অনেক সময় বই বিনিময় হয় এবং আমরা পঠিত বিষয়গুলো নিয়ে গভীর আলোচনায় মগ্ন হই। একটি ভালো বই কেবল তথ্য দেয় না, তা মানুষের চিন্তার দিগন্তকে প্রসারিত করে। আমি যখন প্লেটো, অ্যারিস্টটল বা ইবনে রুশদ-এর লেখাগুলো পড়ি, তখন বুঝতে পারি যে দেশ ও কালের সীমানা পেরিয়ে মানুষের মেধা কীভাবে একসূত্রে গাঁথা। এই মহান মনীষীদের চিন্তাগুলো আমাকে এই পাথুরে দেয়ালে বন্দি থাকতে দেয় না; বরং আমাকে এক মুক্ত ও উদার জগতের বাসিন্দা করে তোলে।

বই আমার জন্য কেবল জ্ঞানের উৎস নয়, এটি আমার মানসিক স্বাস্থ্যের ঢাল। যখন কোনো বিষণ্ণতা বা একঘেয়েমি আমাকে গ্রাস করতে চায়, তখন আমি কোনো একটি প্রিয় কিতাব হাতে তুলে নিই। সেই অক্ষরগুলোর মাঝে আমি এমন এক শক্তি খুঁজে পাই, যা আমাকে আবার নতুন উদ্যমে বাঁচতে শেখায়। আমি বিশ্বাস করি, যার অন্তরে জ্ঞানের তৃষ্ণা আছে, তাকে বাইরের কোনো শক্তি দমিত করতে পারে না। আহমেদনগর দুর্গের এই দিনগুলো আমাকে শিখিয়েছে যে, কলম আর বই থাকলে যে কেউ নিজের জন্য এক অপরাজেয় সাম্রাজ্য গড়ে তুলতে পারে।

কারাগারের নিয়ম ও প্রহরীদের মনস্তত্ত্ব

কারাগারের জীবন মানেই হলো একটি যান্ত্রিক শৃঙ্খলার অংশ হয়ে যাওয়া। এখানে প্রতিটি কাজ ঘড়ির কাঁটা ধরে চলে—ঘুম থেকে ওঠা, খাবার গ্রহণ, এমনকি আমাদের হাঁটাচলার সময়ও নির্দিষ্ট। আহমেদনগর দুর্গের এই নিয়মগুলো অত্যন্ত কঠোর, কিন্তু আমি এগুলোকে কোনো বাধা হিসেবে দেখি না। আমি মনে করি, নিয়ম তখনই মানুষের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়ায় যখন সে মানসিকভাবে তা প্রতিরোধ করে। কিন্তু যদি কেউ স্বেচ্ছায় এই শৃঙ্খলাকে গ্রহণ করে নেয়, তবে তা তার চরিত্রের ওপর এক ধরণের শৈল্পিক প্রলেপ তৈরি করে। শৃঙ্খলাই মানুষকে অসংযমী হওয়া থেকে রক্ষা করে।

আমাদের পাহারায় থাকা প্রহরীদের জীবন পর্যবেক্ষণ করা এক কৌতূহল উদ্দীপক অভিজ্ঞতা। তারা আমাদের ওপর নজরদারি করে ঠিকই, কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, তারাও এই কারাগারের এক অন্য ধরণের বন্দি। আমরা রাজনৈতিক কারণে বন্দি, আর তারা তাদের জীবিকার প্রয়োজনে এই পাথুরে দেয়ালের মাঝে আটকা পড়েছে। আমি লক্ষ্য করেছি, অনেক সময় তাদের চোখের দৃষ্টিতে আমাদের প্রতি এক ধরণের করুণা বা সম্ভ্রম ফুটে ওঠে। তারা বুঝতে পারে যে আমরা অপরাধী নই, বরং এক বিশেষ আদর্শের সৈনিক। অনেক সময় তাদের মৌনতাই আমাদের সাথে তাদের এক নীরব সংহতি প্রকাশ করে।

প্রহরীদের সাথে আমাদের সম্পর্ক খুব বেশি ব্যক্তিগত হওয়ার সুযোগ নেই, কারণ কারাগারের আইন সে অনুমতি দেয় না। তবুও সামান্য ইশারা বা কুশল বিনিময়ের মাধ্যমে এক ধরণের মানবিক বন্ধন তৈরি হয়। আমি যখন তাদের দিকে তাকাই, তখন তাদের চেহারায় ক্লান্তি আর একঘেয়েমি দেখি। তারা তাদের হুকুম পালন করে যান্ত্রিকভাবে, কিন্তু তাদের ভেতরেও ঘর-সংসার আর স্বাধীনতার প্রতি এক তৃষ্ণা কাজ করে। এই দুর্গের ভেতরে আমরা যেমন সময়ের প্রতীক্ষায় আছি, তারাও হয়তো ডিউটি শেষ করে আপনজনের কাছে ফেরার প্রতীক্ষায় থাকে। এই অভিন্ন প্রতীক্ষাই আমাদের সবাইকে এক সুতোয় বেঁধে রেখেছে।

কারাগারের এই ব্যবস্থা আসলে মানুষের ওপর মানুষের এক ধরণের কৃত্রিম কর্তৃত্ব। লোহার শিকল বা উঁচিয়ে রাখা বন্দুক কখনোই মানুষের চিন্তাকে দমন করতে পারে না। আমাদের প্রহরীরা যখন আমাদের কক্ষের দরজায় তালা দেয়, তারা কেবল আমাদের দেহকেই আটকে রাখে। তারা জানে না যে সেই মুহূর্তেও আমাদের মন হয়তো কোনো সুদূর নক্ষত্রলোক বা আগামীর স্বাধীন ভারতবর্ষের স্বপ্ন বুনছে। ক্ষমতার দম্ভে যারা আমাদের বন্দি করেছে, তারা এই সাধারণ প্রহরীদের দিয়ে আমাদের শাসন করতে চায়, কিন্তু সত্যের শক্তির সামনে এই কৃত্রিম শৃঙ্খলা কত যে তুচ্ছ, তা এখানে বসে আমি প্রতি মুহূর্তে অনুভব করি।

কারাজীবনে অভিযোজন ও ধৈর্যের উৎস

মানুষের মন এক অদ্ভুত ক্ষমতার অধিকারী; সে চাইলে মরুভূমিকেও বাগানে রূপান্তর করতে পারে। আহমেদনগর দুর্গের এই রুক্ষ পরিবেশ প্রথম দিকে কিছুটা অস্বস্তিকর মনে হলেও, এখন এটি আমার কাছে এক শান্ত তপোবনের মতো। অভিযোজন বা খাপ খাইয়ে নেওয়া কেবল বাধ্যবাধকতা নয়, এটি একটি মানসিক শিল্প। যখন আমি বুঝতে পারলাম যে এই প্রাচীরের ভেতরেই আমাকে একটি দীর্ঘ সময় কাটাতে হবে, তখন আমি অভিযোগ করা বন্ধ করে এই পরিবেশের সাথেই সখ্যতা গড়ে তুললাম। জীবন যেখানেই প্রবাহিত হয়, সেখানেই সে নিজের জন্য বাঁচার রসদ খুঁজে নেয়।

অনেকে আমাকে জিজ্ঞেস করেন, এই দীর্ঘ বন্দিত্বে আমার ধৈর্য বা ‘সবর’-এর উৎস কী? আমি মনে করি, ধৈর্যের প্রকৃত শক্তি আসে অন্তরের বিশ্বাস এবং একটি উচ্চতর লক্ষ্যের প্রতি অবিচল নিষ্ঠা থেকে। যখন কোনো ব্যক্তি জানে যে সে কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থের জন্য নয়, বরং সত্য ও ন্যায়ের পথে লড়াই করতে গিয়ে বন্দি হয়েছে, তখন তার কাছে কারাগারের কষ্টগুলো তুচ্ছ হয়ে যায়। আমার ধৈর্য কোনো অলস অপেক্ষা নয়, বরং এটি হলো এক সক্রিয় সাধনা—যেখানে আমি প্রতিদিন নিজেকে আরও উন্নত করার চেষ্টা করি।

আমার এই সহনশীলতার পেছনে আরও একটি বড় কারণ হলো আমার পড়াশোনা এবং চিন্তার জগত। যখন বাইরের পৃথিবী সংকুচিত হয়ে আসে, তখন মানুষের ভেতরের জগতটি অসীম হয়ে ওঠে। আমি যখন দর্শনের গভীর সমুদ্রে ডুব দিই, তখন এই পাথুরে দেয়ালগুলো আমার দৃষ্টি থেকে অদৃশ্য হয়ে যায়। আমি অনুভব করি যে, জগতের কোনো শক্তিই আমার চিন্তার স্বাধীনতা কেড়ে নিতে পারবে না। এই আত্মিক প্রশান্তিই আমাকে প্রতিকূলতার মাঝেও হাস্যোজ্জ্বল রাখতে সাহায্য করে।

ধৈর্য কেবল দুঃখ সহ্য করার নাম নয়, এটি হলো দুঃখের মাঝেও নিজের মনুষ্যত্ব আর গাম্ভীর্য ধরে রাখা। আমি লক্ষ্য করেছি, যারা অল্পতেই অস্থির হয়ে পড়ে, তারা আসলে নিজেদের ভেতর কোনো দৃঢ় ভিত্তি খুঁজে পায়নি। কিন্তু যার অন্তরে সত্যের আলো আছে, সে অন্ধকার প্রকোষ্ঠেও পথ হারায় না। আহমেদনগর দুর্গের এই দিনগুলো আমাকে শিখিয়েছে যে, মানুষের আসল পরীক্ষা আরাম-আয়েশে নয়, বরং কঠিন বিপদ আর নিঃসঙ্গতার মুহূর্তেই ঘটে। এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়াই হলো জীবনের সার্থকতা।

কারাগারের খাদ্য ব্যবস্থা ও সহমর্মিতার মুহূর্ত

আহমেদনগর দুর্গের জীবনে খাবারের আয়োজন ছিল অত্যন্ত সাদাসিধে এবং সীমাবদ্ধ। কিন্তু আমরা যারা এখানে বন্দি ছিলাম, তারা এই সাধারণ খাবারকেও এক ধরণের উৎসবে পরিণত করার চেষ্টা করতাম। আমাদের একটি সম্মিলিত মেস ব্যবস্থা ছিল, যেখানে জওহরলালজি এবং অন্যান্য সহবন্দিরা একসাথে বসে খাবার খেতাম। কারাগারের রেশন থেকে যা পাওয়া যেত, তা দিয়েই আমরা নিজেদের মতো করে কিছু রান্না করার চেষ্টা করতাম। ডাল, রুটি আর সামান্য সবজি—এই ছিল আমাদের নিত্যদিনের আহার। কিন্তু সেখানে যে আন্তরিকতা ছিল, তা অনেক সময় রাজকীয় ভোজসভাতেও খুঁজে পাওয়া যায় না।

খাবারের টেবিলটি ছিল আমাদের জন্য এক ধরণের আড্ডার কেন্দ্র। সারাদিনের গম্ভীর পড়াশোনা আর চিন্তার পর এই সময়টুকুতে আমরা বেশ হালকা মেজাজে থাকতাম। জওহরলালজি অনেক সময় রান্নার তদারকি করতেন এবং তাঁর রুচি ও শৃঙ্খলার ছাপ সেখানেও স্পষ্ট থাকত। আমরা রাজনৈতিক আলোচনা ছাড়াও সাহিত্য, কৌতুক এবং আমাদের অতীত জীবনের মজার সব স্মৃতি রোমন্থন করতাম। এই ক্ষুদ্র আলাপচারিতাগুলো আমাদের মনের ওপর চেপে থাকা কারাবাসের ভার অনেকটাই হালকা করে দিত। মানুষ যখন একসাথে কষ্ট ভাগ করে নেয়, তখন সেই কষ্ট আর কষ্ট থাকে না।

কারাগারের রান্নাঘরের ধোঁয়া আর মশলার গন্ধ আমাদের মনে করিয়ে দিত যে আমরা এখনো সাধারণ জীবনের সাথে যুক্ত আছি। মাঝে মাঝে যখন খুব নিম্নমানের খাবার পরিবেশন করা হতো, তখন আমরা সেটা নিয়ে বিরক্ত না হয়ে বরং হাস্যরসে মেতে উঠতাম। আমি মনে করি, প্রতিকূলতাকে জয় করার সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো হাস্যরস। যারা সবকিছুর মধ্যে আনন্দ খুঁজে নিতে পারে, তাদের দমানো অসম্ভব। আমাদের এই ছোট মেসটি কেবল খাওয়ার জায়গা ছিল না, এটি ছিল আমাদের পারস্পরিক বিশ্বাসের এক প্রতীক।

সীমাবদ্ধতা অনেক সময় মানুষকে সৃজনশীল হতে সাহায্য করে। সামান্য উপকরণ দিয়ে কীভাবে সুস্বাদু খাবার তৈরি করা যায়, তা আমরা এখানে শিখেছি। এই যে ছোট ছোট বিষয়গুলোতে সন্তুষ্ট থাকা, এটিই হলো প্রকৃত সার্থকতা। আহমেদনগর দুর্গের এই সাধারণ ডাল-রুটি আমাকে শিখিয়েছে যে, মানুষের বেঁচে থাকার জন্য খুব বেশি কিছুর প্রয়োজন নেই; যা প্রয়োজন তা হলো একটি প্রশান্ত মন আর একদল সহমর্মী বন্ধু। কারাগারের এই দিনগুলো আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে অভাবের মাঝেও মর্যাদাবান থাকা যায়।

কারাগারের স্বাস্থ্যসেবা ও সহযোদ্ধাদের সহমর্মিতা

আহমেদনগর দুর্গের এই বদ্ধ পরিবেশে স্বাস্থ্য রক্ষা করা ছিল এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। কারাগারের চিকিৎসা ব্যবস্থা ছিল নামমাত্র; একজন সরকারি ডাক্তার মাঝে মাঝে আসতেন এবং সাধারণ কিছু ওষুধ দিয়েই দায়িত্ব শেষ করতেন। কিন্তু যখন আমাদের মধ্যে কেউ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়তেন, তখন পরিবেশটা বেশ থমথমে হয়ে যেত। অসুস্থতা কেবল শরীরের ওপর নয়, মনের ওপরও এক ধরণের চাপ তৈরি করে। এই পাথুরে দেয়ালে ঘেরা নির্জনতায় ব্যাধি মানে হলো এক দ্বিগুণ বন্দিত্ব।

আমি লক্ষ্য করেছি, যখন জওহরলালজি বা অন্য কোনো সহবন্দি অসুস্থ হতেন, তখন আমাদের মধ্যে এক অদ্ভুত ভ্রাতৃত্ববোধ জেগে উঠত। আমরা নিজেরাই একে অপরের সেবা-শুশ্রূষার দায়িত্ব নিতাম। অনেক সময় প্রয়োজনীয় ওষুধের অভাব থাকলেও আমাদের মানসিক সমর্থনই ওষুধের কাজ করত। এই সেবা কোনো লৌকিকতা ছিল না, এটি ছিল এক গভীর আত্মিক টান। যে মানুষগুলো বাইরে বিশাল রাজনৈতিক আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন, তারা এই ছোট ঘরে একে অপরের কপালে জলপট্টি দিচ্ছেন—এই দৃশ্যটি আমাকে বারবার আপ্লুত করেছে। মানবিকতা যে কোনো আদর্শের চেয়েও বড়, তা এখানে বসে স্পষ্ট বোঝা যায়।

আমার নিজেরও মাঝেমধ্যে শারীরিক অসুস্থতা দেখা দিত। বিশেষ করে রাতের বেলা যখন অসহ্য যন্ত্রণা বা জ্বর আসত, তখন বাইরের পৃথিবীর স্মৃতিগুলো আরও বেশি প্রখর হয়ে উঠত। কিন্তু আমি আমার মনের শক্তি দিয়ে সেই শারীরিক দুর্বলতাকে জয় করার চেষ্টা করতাম। আমি নিজেকে বলতাম, যে আত্মা সত্যের জন্য লড়ছে, সামান্য জরা-ব্যাধি তাকে কাবু করতে পারে না। আমি আমার অসুস্থতার সময়গুলোতেও পড়াশোনা থামিয়ে রাখিনি; বরং বইয়ের পাতায় ডুবে গিয়ে যন্ত্রণাকে ভুলে থাকার চেষ্টা করেছি।

কারাগারের এই অসুস্থতা আমাদের শিখিয়েছে যে মানুষের শরীর কতটা নশ্বর, অথচ তার সংকল্প কতটা অবিনশ্বর। আমরা যখন সুস্থ হয়ে আবার একসাথে হতাম, তখন সেই আনন্দটা হতো অকৃত্রিম। এই কষ্টগুলো আমাদের সম্পর্ককে আরও মজবুত করেছে। আহমেদনগর দুর্গের এই ক্ষুদ্র প্রাঙ্গণে আমরা কেবল সহবন্দি ছিলাম না, আমরা একে অপরের জীবনের অংশ হয়ে উঠেছিলাম। জরা আর ব্যাধির মাঝেও আমাদের এই ঐক্যই ছিল আমাদের টিকে থাকার আসল চাবিকাঠি।

চিঠিপত্র, সেন্সরশিপ ও বাইরের জগতের প্রতিধ্বনি 

কারাগারের জীবনে বাইরের জগতের সাথে যোগাযোগের একমাত্র সুতো হলো চিঠিপত্র। কিন্তু আহমেদনগর দুর্গে আমাদের জন্য এই সুতোটি ছিল অত্যন্ত সরু এবং কণ্টকাকীর্ণ। সরকারের পক্ষ থেকে আমাদের চিঠি লেখার ওপর ছিল কঠোর বিধিনিষেধ। একটি নির্দিষ্ট সংখ্যার বাইরে আমরা চিঠি লিখতে পারতাম না, আর যা-ও লিখতাম, তা সেন্সরশিপের কাঁচি দিয়ে এমনভাবে কাটাছেঁড়া করা হতো যে অনেক সময় মূল বার্তাটিই হারিয়ে যেত। এই যে শব্দের ওপর সেন্সরশিপ, এটি যেন আমাদের চিন্তার ওপর এক ধরণের অবৈধ হস্তক্ষেপ।

একটি চিঠি যখন আমাদের হাতে পৌঁছাত, তখন তার প্রতিটি ভাঁজ থেকে প্রিয়জনদের ঘ্রাণ আর বাইরের পৃথিবীর উত্তাপ আমরা খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা করতাম। কিন্তু সেই চিঠির অনেক অংশই কালো কালিতে লেপে দেওয়া থাকত। জেল কর্তৃপক্ষ মনে করত যে কোনো গোপন রাজনৈতিক সংকেত হয়তো এই লাইনের আড়ালে লুকিয়ে আছে। তারা বুঝতে পারত না যে, একজন বন্দির কাছে তার পরিবারের কুশল সংবাদ কোনো রাজনৈতিক বার্তার চেয়েও অনেক বেশি দামী। এই সেন্সর করা চিঠিগুলো আমাদের মনে করিয়ে দিত যে আমরা এক নিষ্ঠুর ও অমানবিক ব্যবস্থার অধীনে রয়েছি।

আমি যখনই কলম ধরতাম, তখনই মনে হতো আমার কথাগুলো হয়তো কোনো অচেনা সেন্সর অফিসারের টেবিল হয়ে তারপর গন্তব্যে পৌঁছাবে। এই চিন্তাটি লেখার স্বাচ্ছন্দ্য কেড়ে নেয়। তবুও আমি আমার এই ‘গুবার-ই-খাতির’-এর চিঠিগুলো লিখে গেছি। আমি জানতাম, এই মুহূর্তে এগুলো হয়তো পাঠানো সম্ভব হবে না, কিন্তু এগুলো আমার হৃদয়ের ভার লাঘব করার একমাত্র উপায়। আমি কাগজের ওপর যা লিখেছি, তা কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির জন্য নয়, বরং সময়ের কাছে জমা রাখা এক জবানবন্দি।

চিঠির জন্য এই দীর্ঘ প্রতীক্ষা আমাদের ধৈর্যকে আরও শাণিত করত। সপ্তাহে বা মাসে যখন একদিন ডাক আসত, তখন পুরো কারাগারের পরিবেশে এক ধরণের চাঞ্চল্য তৈরি হতো। আমরা একে অপরের চিঠির খবর নিতাম, যদিও তার বিষয়বস্তু থাকত ব্যক্তিগত। এই চিঠিগুলোই আমাদের মনে করিয়ে দিত যে দুর্গের এই পাথুরে দেয়ালের বাইরেও একটি বিশাল জগত আছে, যেখানে মানুষ হাসে, কাঁদে এবং আমাদের ফেরার পথ চেয়ে বসে আছে। সেন্সরশিপ হয়তো কাগজের শব্দ মুছে দিতে পারে, কিন্তু হৃদয়ের টান আর মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে কখনোই মুছে দিতে পারে না।

নিঃসঙ্গতার দর্শন ও আধ্যাত্মিক সংযোগ

মানুষ যখন ভিড়ের মধ্যে থাকে, তখন সে নিজেকে হারিয়ে ফেলে; আর যখন সে নিঃসঙ্গ হয়, তখন সে নিজেকে খুঁজে পায়। আহমেদনগর দুর্গের এই নিঃসঙ্গতা আমার জন্য কোনো শাস্তি নয়, বরং এটি এক ধরণের ‘খলওয়াত’ বা আধ্যাত্মিক নির্জনতা। এই নির্জন প্রকোষ্ঠে আমি অনুভব করি যে, বাহ্যিক জগতের কোলাহল যত কমে আসে, অন্তরের গুঞ্জন তত বেশি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যখন মানুষের সাথে কথা বলার সুযোগ থাকে না, তখনই মানুষ আসলে স্রষ্টার সাথে এবং প্রকৃতির গূঢ় রহস্যের সাথে কথা বলতে শুরু করে।

এই যে নিঃসঙ্গতা, এটি একটি ধারালো তলোয়ারের মতো। যদি কেউ একে ব্যবহার করতে না জানে, তবে এটি তার মানসিকতাকে ক্ষতবিক্ষত করে দেবে। কিন্তু যদি কেউ এই তলোয়ারকে জ্ঞানের শানপাথরে ধার দিয়ে নেয়, তবে সে এটি দিয়ে অজ্ঞানতার অন্ধকারকে ছিন্নভিন্ন করতে পারে। আমি যখন আমার সেলের ছোট জানালা দিয়ে আকাশের এক ফালি নীল দেখি, তখন আমি আর এই দুর্গের বন্দি থাকি না। আমি তখন সময়ের ঊর্ধ্বে এমন এক সত্তার সন্ধান পাই, যার কাছে এই কারাগার আর রাজপ্রাসাদ—উভয়ই তুচ্ছ ও নশ্বর।

আধ্যাত্মিকতা কোনো বিমূর্ত ধারণা নয়; এটি হলো জীবনের পরম শৃঙ্খলা। আমি যখন আমার প্রতিদিনের ইবাদত এবং ধ্যানে নিমগ্ন হই, তখন আমার মনে হয় আমার চারপাশের দেয়ালগুলো যেন স্বচ্ছ হয়ে যাচ্ছে। বন্দিত্ব কেবল শরীরের হয়, কিন্তু যে আত্মা সত্যের রসে সিক্ত, তাকে কেউ শিকল দিয়ে বেঁধে রাখতে পারে না। এই কারাগারের নিস্তব্ধতা আমাকে শিখিয়েছে কীভাবে নিজের রিপুকে নিয়ন্ত্রণ করতে হয় এবং কীভাবে পরিস্থিতির কাছে আত্মসমর্পণ না করে বরং পরিস্থিতির ঊর্ধ্বে উঠতে হয়।

অনেকে নিঃসঙ্গতাকে ভয় পায় কারণ তারা একাকী থাকতে অভ্যস্ত নয়। কিন্তু আমি এই নির্জনতাকে আমার সবচেয়ে বড় শিক্ষিকা হিসেবে গ্রহণ করেছি। এটি আমাকে ধৈর্য শিখিয়েছে, বিনয় শিখিয়েছে এবং শিখিয়েছে কীভাবে নিজের ভেতরের আলোর সাহায্যে অন্ধকার পথ পাড়ি দিতে হয়। জগতের সমস্ত মহান বিপ্লব আর মহৎ চিন্তার জন্ম হয়েছে কোনো না কোনো নির্জন প্রকোষ্ঠে বা নিভৃত অরণ্যে। তাই আমি আমার এই একাকীত্বকে আশীর্বাদ মনে করি, যা আমাকে আগামী দিনের বৃহত্তর সংগ্রামের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত করছে।

ঋতু পরিবর্তন ও বন্দি মনের ওপর প্রকৃতির প্রভাব

আহমেদনগর দুর্গের এই পাথুরে প্রাচীরের ভেতরে ঋতু পরিবর্তনের প্রতিটি সংকেত অত্যন্ত প্রখরভাবে অনুভূত হয়। বাইরে যখন ঋতু বদলায়, তখন হয়তো মানুষ তার পোশাক বা অভ্যাসে পরিবর্তন আনে; কিন্তু এখানে প্রতিটি ঋতু সরাসরি আমাদের অস্তিত্বে আঘাত করে। বিশেষ করে গ্রীষ্মের সেই প্রচণ্ড দাবদাহ, যখন দুর্গের পাথরগুলো আগুনের মতো উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। সেই সময় আমাদের এই ছোট কক্ষগুলো যেন এক একটি চুল্লিতে পরিণত হয়। বাতাসের প্রতিটি ঝাপটা তখন তপ্ত নিশ্বাসের মতো মনে হয়। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই দহনও আমাদের মনের সংকল্পকে পোড়াতে পারে না।

আবার যখন বর্ষার আগমন ঘটে, তখন এই রুক্ষ দুর্গের চেহারা সম্পূর্ণ বদলে যায়। মেঘের গুরুগম্ভীর গর্জন আর বৃষ্টির ঝমঝম শব্দ যখন পাথুরে ছাদে আছড়ে পড়ে, তখন মনে হয় প্রকৃতি তার সমস্ত শক্তি দিয়ে এই বন্দিশালার শিকল ভাঙতে চাইছে। বৃষ্টির ছাঁট যখন জানালার গরাদ দিয়ে ভেতরে আসে, তখন আমি হাত বাড়িয়ে সেই জলবিন্দুগুলো স্পর্শ করি। মনে হয়, এই বৃষ্টির জল বাইরের মুক্ত পৃথিবীর কোনো এক পাহাড় বা নদী থেকে আমাদের জন্য মুক্তির বার্তা বয়ে এনেছে। বৃষ্টির পর মাটির সেই সোঁদা গন্ধ আমাদের মুহূর্তের জন্য কারাগারের গ্লানি ভুলিয়ে দেয়।

শীতের সকালগুলো এখানে বড়ই মনোরম অথচ বিষণ্ণ। কুয়াশার চাদরে যখন পুরো দুর্গ ঢাকা পড়ে থাকে, তখন চারপাশটা যেন এক রহস্যময় জগত মনে হয়। আমি আমার কম্বল জড়িয়ে যখন প্রাঙ্গণে পায়চারি করি, তখন মনে হয় সময় যেন থমকে দাঁড়িয়েছে। এই ঋতু পরিবর্তন আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে পৃথিবীতে কোনো কিছুই স্থায়ী নয়—না এই প্রচণ্ড গরম, না এই হাড়কাঁপানো শীত। জীবনের এই চক্রাকার আবর্তনই আমাদের আশার আলো দেখায় যে, আমাদের এই বন্দিদশার দীর্ঘ শীতকালও একদিন শেষ হবে এবং স্বাধীনতার বসন্ত আসবেই।

প্রকৃতির এই রূপবৈচিত্র্য আমাদের শেখায় যে পরিবর্তনই জগতের ধর্ম। শাসকরা মনে করে তারা আমাদের একঘেয়েমিতে পিষ্ট করবে, কিন্তু প্রকৃতি তার বিচিত্র সাজে আমাদের বিনোদিত করে। আকাশের মেঘের আনাগোনা বা বাতাসের শব্দের মাঝেও আমি এক ধরণের সঙ্গীত খুঁজে পাই। মানুষের মন যদি সংবেদনশীল হয়, তবে সে কারাগারের এই ক্ষুদ্র পরিসরেও মহাবিশ্বের ছন্দ শুনতে পায়। এই উপলব্ধিই আমাদের প্রতিকূল আবহাওয়ার মাঝেও মানসিকভাবে সুস্থ ও সজীব রাখে।

স্মৃতি ও অতীতের হাতছানি

মানুষ যখন বর্তমান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং ভবিষ্যৎ যখন অনিশ্চয়তার কুয়াশায় ঢাকা থাকে, তখন তার একমাত্র আশ্রয় হয়ে দাঁড়ায় তার অতীত। আহমেদনগর দুর্গের এই নিঃসঙ্গ দিনগুলোতে স্মৃতিই আমার সবচেয়ে বড় অবলম্বন। স্মৃতি কেবল ফেলে আসা দিনের ছবি নয়, এটি হলো আত্মার সেই সঞ্চয় যা মানুষের একাকীত্বকে ঐশ্বর্যমন্ডিত করে। আমি যখন চোখ বন্ধ করি, তখন দিল্লির অলিগলি, মক্কা-মদিনার সেই পবিত্র প্রাঙ্গণ বা কোলকাতার বুদ্ধিজীবী মহলের সেই তপ্ত আলোচনা—সবই আমার চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে ওঠে। মনে হয় না যে আমি কোনো কারাগারে আছি; বরং মনে হয় আমি সেই হারানো দিনগুলোর মাঝেই বিচরণ করছি।

স্মৃতিশক্তির এক অদ্ভুত ক্ষমতা আছে। এটি কোনো সুনির্দিষ্ট শৃঙ্খলা মেনে চলে না। কখনও হয়তো শৈশবের কোনো তুচ্ছ ঘটনা স্মৃতির পর্দায় ভেসে ওঠে, আবার কখনও বড় কোনো রাজনৈতিক সংগ্রামের উত্তাল মুহূর্তগুলো নাড়া দিয়ে যায়। এই স্মৃতিগুলো আমাকে বিষণ্ণ করে না, বরং এক ধরণের মানসিক প্রশান্তি দেয়। আমি বুঝতে পারি যে, আমার জীবনটা কেবল এই কারাগারের কয়েক বছরের সীমাবদ্ধতায় আটকে নেই। আমার এক বিশাল অতীত আছে, যা কোনো দেয়াল দিয়ে ঘিরে ফেলা সম্ভব নয়। অতীত যখন বর্তমানের সাথে হাত মেলায়, তখনই মানুষ নিজের পূর্ণতা অনুভব করে।

তবে স্মৃতির এই জগতে বিচরণ করা এক ধরণের ঝুঁকিপূর্ণ সাধনা। যদি কেউ কেবল অতীতের মোহে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে, তবে সে বর্তমানের লড়াই করার শক্তি হারিয়ে ফেলে। আমি স্মৃতিকে ব্যবহার করি এক ধরণের মানসিক সঞ্জীবনী হিসেবে। যখনই বন্দিদশার একঘেয়েমি আমাকে গ্রাস করতে চায়, তখনই আমি আমার স্মৃতির ভাণ্ডার থেকে কোনো একটি আনন্দদায়ক বা অনুপ্রেরণামূলক মুহূর্ত বের করে আনি। এটি যেন মনের সেই জানালা, যা দিয়ে মুক্ত হাওয়ার ঝাপটা আসে।

স্মৃতি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে আমরা কারা এবং আমাদের শিকড় কোথায়। আমি যখন আমার বন্ধুদের চেহারা বা আমাদের সেই হারানো আড্ডার কথা ভাবি, তখন অনুভব করি যে ভালোবাসা আর বন্ধুত্বের কোনো ভৌগোলিক সীমানা নেই। আহমেদনগর দুর্গের এই নিঃসঙ্গ রাতেও আমি একা নই; আমার সাথে আছে হাজারো স্মৃতি, অগণিত মানুষের মুখ আর অসংখ্য বিচিত্র অভিজ্ঞতা। এই স্মৃতিগুলোই আমাকে প্রতিদিন নতুন করে বলে যে—জীবন থেমে নেই, সে তার নিজস্ব গতিতে অতীতের সঞ্চয় নিয়ে আগামীর পথে এগিয়ে চলেছে।

কল্পনার বিস্তার ও মানসিক মুক্তি 

মানুষের কল্পনাশক্তি হলো তার আত্মার ডানা। শরীরকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা যায়, কিন্তু কল্পনাকে বন্দি করার মতো কোনো কারাগার আজ পর্যন্ত পৃথিবীতে তৈরি হয়নি। আহমেদনগর দুর্গের এই সংকীর্ণ কক্ষে বসে আমি যখন চোখ বুজি, তখন এই পাথুরে দেয়ালগুলো যেন কাঁচের মতো স্বচ্ছ হয়ে যায়। আমার কল্পনা আমাকে মুহূর্তে হিমালয়ের তুষারশুভ্র শৃঙ্গে নিয়ে যায়, আবার পরক্ষণেই আমি নিজেকে খুঁজে পাই আন্দালুসিয়ার কোনো প্রাচীন লাইব্রেরিতে। এই যে স্থান ও কালের সীমানা অতিক্রম করার ক্ষমতা, এটিই মানুষকে সৃষ্টির শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছে।

কল্পনা কেবল অলীক স্বপ্ন নয়, এটি হলো সত্যকে ভিন্ন আঙ্গিকে দেখার একটি মাধ্যম। আমি যখন এই দুর্গের আঙিনায় পায়চারি করি, তখন আমার কল্পনা সেখানে এক কাল্পনিক বাগিচা তৈরি করে নেয়। আমি সেখানে এমন সব ফুল ফুটতে দেখি যা হয়তো বাস্তবে নেই, কিন্তু আমার মনের আয়নায় সেগুলো অত্যন্ত উজ্জ্বল। একজন বন্দির জন্য কল্পনা হলো তার বেঁচে থাকার অক্সিজেন। যে ব্যক্তি কল্পনা করতে জানে না, তার জন্য কারাগার হলো জীবন্ত কবর। কিন্তু যার কল্পনার জগত সমৃদ্ধ, তার জন্য প্রতিটি মুহূর্তই এক নতুন আবিষ্কার।

আমি আমার এই বন্দিজীবনে লক্ষ্য করেছি যে, জওহরলালজিও কল্পনার এই জাদুকরী শক্তির ওপর অনেক ভরসা করেন। আমরা যখন কোনো ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করি, তখন আমরা আসলে বর্তমানের সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে এক অনাগত সুন্দর সময়ের ছবি আঁকি। এই কল্পনা আমাদের শক্তি জোগায়, আমাদের হতাশ হতে দেয় না। আমি যখন লিখি, তখন আমার কল্পনা আমার সামনে সেই পাঠকদের হাজির করে, যারা হয়তো বহু বছর পর আমার এই কথাগুলো পড়বে। এই সংযোগটি তৈরি হয় কেবল কল্পনার মাধ্যমেই।

কল্পনাশক্তির মাধ্যমেই মানুষ তার একাকীত্বকে জয় করে। আমি যখন নির্জনে বসে থাকি, তখন আমার কল্পনা আমাকে ইতিহাসের মহানায়ক বা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কবিদের পাশে বসিয়ে দেয়। আমি তাঁদের সাথে তর্কে মেতে উঠি, তাঁদের দর্শন নিয়ে ভাবি। এই বুদ্ধিবৃত্তিক সফর আমাকে এক মুহূর্তের জন্যও অনুভব করতে দেয় না যে আমি একা। কল্পনাই হলো সেই মাধ্যম যা দিয়ে আমি এই কারাগারের প্রতিটি দিনকে এক একটি মহাকাব্যের পাতায় রূপান্তর করছি। যতক্ষণ আমার এই কল্পনাশক্তি সজীব আছে, ততক্ষণ কোনো রাজশক্তি আমাকে পরাজিত বা বন্দি করতে পারবে না।

আশার আলোকবর্তিকা ও অন্ধকারের শেষ

আশা হলো সেই প্রদীপ যা ঝড়ের রাতেও নেভে না। মানুষের জীবনে যখন বাইরের সমস্ত আলো নিভে যায়, তখন তার অন্তরের এই ক্ষুদ্র প্রদীপটিই তাকে পথ দেখায়। আহমেদনগর দুর্গের এই নিঃসঙ্গ দিনগুলোতে আমি বারবার অনুভব করেছি যে, মানুষের টিকে থাকার আসল শক্তি তার পেশিতে নয়, বরং তার আশাবাদী হৃদয়ে নিহিত। আশা কেবল একটি মানসিক অবস্থা নয়, এটি একটি অবিচল বিশ্বাস যে—অন্ধকার যতই দীর্ঘ হোক না কেন, ভোরের আলো তার শেষ সীমানায় দাঁড়িয়ে আছে।

আমি যখন এই দুর্গের উঁচু প্রাচীরের দিকে তাকাই, তখন আমি কেবল পাথর দেখি না; আমি দেখি সেই ফাটলগুলো, যা প্রমাণ করে যে কোনো কিছুই অবিনশ্বর নয়। সময় যেমন এই পাথরে ক্ষয় ধরায়, তেমনি সময়ের স্রোতে এই বন্দিত্বের দিনগুলোও একদিন বিলীন হয়ে যাবে। এটিই প্রকৃতির নিয়ম। যারা হতাশ হয়ে পড়ে, তারা আসলে সময়ের এই বিশালতাকে অনুধাবন করতে পারে না। তারা বর্তমানের এই মুহূর্তটিকে চিরস্থায়ী মনে করে ভুল করে। কিন্তু একজন সত্যসন্ধানী জানে যে, প্রতিটি দুঃখের ভেতরেই সুখের বীজ লুকানো থাকে।

আমাদের এই সংগ্রামের পথে অনেক চড়াই-উতরাই এসেছে। অনেক সময় মনে হয়েছে যেন চারপাশ থেকে নিরাশার মেঘ আমাদের ঘিরে ধরছে। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই অন্তরের কোনো এক কোণ থেকে আওয়াজ আসে—’হতাশ হয়ো না’। এই আওয়াজ কোনো অলীক কল্পনা নয়, এটি হলো মহাজাগতিক ন্যায়বিচারের প্রতিধ্বনি। আমি বিশ্বাস করি, যদি আমাদের উদ্দেশ্য সৎ হয় এবং আমাদের পথ ন্যায়ের হয়, তবে জগতের কোনো শক্তিই আমাদের চূড়ান্ত বিজয় রোধ করতে পারবে না। এই আশাই আমাকে প্রতিদিন সকালে নতুন উদ্যমে কলম ধরতে সাহস জোগায়।

আশা আমাদের ধৈর্য ধরতে শেখায়, কিন্তু সেই ধৈর্য যেন নিস্ক্রিয়তা না হয়। আমার কাছে আশা মানে হলো আগামীর জন্য প্রস্তুতি। আমি এই কারাগারে বসে কেবল দিন গুনছি না, বরং আমি আমার জ্ঞান ও চিন্তাকে শাণিত করছি যাতে যখন মুক্তির দিন আসবে, তখন আমি পূর্ণ শক্তি নিয়ে দেশের কাজে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারি। আহমেদনগর দুর্গের এই প্রকোষ্ঠ আমাকে শিখিয়েছে যে, মানুষ যদি তার মনের ভেতরে আশার বাগান গড়ে তুলতে পারে, তবে বাইরের মরুভূমিও তাকে তৃষ্ণার্ত করতে পারে না। অন্ধকার রজনী যেমন সুবহে সাদিকের (ভোরের) পূর্বাভাস, আমাদের এই বন্দিত্বও তেমনি এক মহান স্বাধীনতার অগ্রদূত।

অভিজ্ঞতার নির্যাস ও বিদায়ী চিন্তা

আহমেদনগর দুর্গের এই দীর্ঘ কারাবাস আমার জীবনের এক অনন্য অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। আমি যখন পেছন ফিরে তাকাই, তখন এই কয়েক বছরের বন্দিত্বকে আর কেবল সময়ের অপচয় বলে মনে হয় না। বরং এটি ছিল এক গভীর আত্মিক শোধন এবং বুদ্ধিবৃত্তিক সমৃদ্ধির কাল। কারাগারের এই পাথুরে দেয়ালগুলো আমাকে যা শিখিয়েছে, তা হয়তো বাইরের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় বা রাজপ্রাসাদ আমাকে শেখাতে পারত না। আমি এখানে এসে মানুষের ধৈর্য, সহমর্মিতা এবং মানসিক স্বাধীনতার প্রকৃত রূপ দেখেছি।

আমাদের এই ‘গুবার-এ-খাতির’ বা মনের ধুলিকণাগুলো যখন কাগজের পাতায় সযত্নে সাজিয়ে রাখছি, তখন মনে হচ্ছে আমি আসলে আমার একাকীত্বের এক স্থায়ী দলিল তৈরি করছি। এই কথাগুলো কেবল আমার ব্যক্তিগত অনুভূতি নয়, এগুলো সেই সময়ের প্রতিধ্বনি যখন আমাদের কণ্ঠকে স্তব্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী, সত্যকে কখনও লোহার খাঁচায় বন্দি করা যায় না। আমরা যখন এই দুর্গ থেকে একদিন মুক্ত হয়ে বেরিয়ে যাব, তখন আমাদের শরীর হয়তো ক্লান্ত থাকবে, কিন্তু আমাদের আত্মা হবে আরও বেশি উজ্জ্বল ও শক্তিশালী।

আমি আমার সহবন্দিদের প্রতি কৃতজ্ঞ, যাঁদের সাহচর্য এই কঠিন পথকে সহজ করে দিয়েছে। জওহরলালজি এবং অন্যান্য বন্ধুদের সাথে কাটানো সেই মুহূর্তগুলো আমার স্মৃতির মণিকোঠায় অম্লান থাকবে। আমরা একসাথে হাসাহাসি করেছি, বিতর্ক করেছি এবং একে অপরের দুঃখ ভাগ করে নিয়েছি। এই ভ্রাতৃত্বই ছিল আমাদের টিকে থাকার আসল রসদ। কারাগার আমাদের শিখিয়েছে যে, আদর্শের পথে যারা সঙ্গী হয়, তাদের সম্পর্ক রক্তের সম্পর্কের চেয়েও দৃঢ় হতে পারে।

অবশেষে, আমি আমার কলম থামানোর আগে এইটুকুই বলব—জীবন মানেই হলো নিরন্তর সংগ্রাম। আজ আমরা এখানে বন্দি, কাল হয়তো অন্য কোথাও থাকব; কিন্তু আমাদের উদ্দেশ্য যেন কখনও ম্লান না হয়। সত্যের জয় অনিবার্য, আর সেই জয়ের পথে আমাদের এই ত্যাগটুকু কেবল একটি ক্ষুদ্র পদক্ষেপ মাত্র। আহমেদনগর দুর্গের এই নিঃসঙ্গ রাতগুলো আমাকে যে প্রশান্তি আর প্রজ্ঞা দান করেছে, তা আমি আমার পরবর্তী জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে বহন করে নিয়ে যাব। অন্ধকার কেটে যাচ্ছে, ভোরের আলো ফুটতে আর বেশি দেরি নেই।

মনের ধুলিকণা ও সত্যের দর্পণ

এই লেখনীর নাম আমি কেন ‘গুবার-এ-খাতির’ রেখেছি, তা হয়তো পাঠক এখন অনুধাবন করতে পারছেন। মানুষের হৃদয় বা ‘খাতির’ হলো একটি আয়নার মতো, আর জাগতিক শোক-তাপ, ক্ষোভ ও অভিমান হলো সেই আয়নার ওপর জমে থাকা ধুলিকণা বা ‘গুবার’। আমি এই কারাগারের দিনগুলোতে আমার হৃদয়ে জমে থাকা সেই ধুলিকণাগুলোকে ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করেছি এই চিঠিপত্র বা দিনলিপির মাধ্যমে। যখন মানুষ তার মনের কথাগুলো কাগজে উজাড় করে দেয়, তখন তার হৃদয় আবার স্বচ্ছ হয়ে ওঠে। এই স্বচ্ছতা ছাড়া সত্যের প্রতিফলন দেখা অসম্ভব।

কারাগারের এই নির্জনতা আমাকে শিখিয়েছে যে, বাইরের জগতকে জয় করার আগে নিজের ভেতরের জগতকে জয় করা প্রয়োজন। আমরা যে স্বাধীনতার জন্য লড়াই করছি, তা কেবল একটি ভৌগোলিক মানচিত্রের মুক্তি নয়; তা হলো মানুষের চিন্তার মুক্তি, তার আত্মার মুক্তি। যদি কোনো ব্যক্তি তার মনের ভেতর সংকীর্ণতা আর ঘৃণা পুষে রাখে, তবে সে স্বাধীন দেশে বাস করেও আসলে একজন বন্দি। আহমেদনগর দুর্গের এই নিঃসঙ্গতা আমার ভেতরের সমস্ত সংকীর্ণতা ধুয়ে মুছে সাফ করে দিয়েছে। আমি এখন নিজেকে বিশ্বের একজন নাগরিক হিসেবে অনুভব করি, যার কোনো নির্দিষ্ট সীমানা নেই।

আমার এই লেখাগুলো যখন কোনোদিন পাঠকদের হাতে পৌঁছাবে, তখন হয়তো এই কারাগারের অস্তিত্ব থাকবে না, কিংবা আমি নিজেও থাকব না। কিন্তু আমার এই চিন্তার স্পন্দনগুলো রয়ে যাবে। শব্দের এক অদ্ভুত অমরত্ব আছে। মানুষ মারা যায়, সাম্রাজ্য ধুলোয় মিশে যায়, কিন্তু সত্যের ওপর ভিত্তি করে লেখা একটি লাইনও শতাব্দীকাল টিকে থাকতে পারে। আমি আমার এই দিনলিপিটি উৎসর্গ করছি সেইসব মানুষের জন্য, যারা অন্ধকারের মাঝেও আলোর স্বপ্ন দেখতে ভয় পায় না।

বিদায়লগ্নে আমি কেবল এইটুকুই বলতে চাই—জীবনকে ভালোবাসুন, কিন্তু সত্যের বিনিময়ে নয়। এই কারাগার আমাকে শিখিয়েছে যে, কষ্টের তলায় যে পরম সুখ লুকিয়ে থাকে, তা কেবল ধৈর্যশীলরাই খুঁজে পায়। আজ এই লেখনীর সমাপ্তি টানছি, কিন্তু চিন্তার যে স্রোত এই কারাগারে শুরু হয়েছে, তা আমৃত্যু প্রবাহিত থাকবে। আমার হৃদয়ের ধুলিকণাগুলো এখন প্রশান্ত, আর আমার আত্মা এক নতুন সকালের অপেক্ষায় উন্মুখ। শান্তি বর্ষিত হোক তাদের ওপর, যারা ন্যায়ের পথে অবিচল থাকে।

গদ্যের শৈলী ও সত্যের প্রকাশ

আমার এই লেখনীর ভাষা হয়তো কারো কাছে কিছুটা জটিল বা তাত্ত্বিক মনে হতে পারে। কিন্তু আমি মনে করি, যে সত্য গভীর, তার প্রকাশও হওয়া উচিত গাম্ভীর্যপূর্ণ। আহমেদনগর দুর্গের এই প্রকোষ্ঠে বসে আমি যখন কলম ধরি, তখন আমার উদ্দেশ্য কেবল দিনলিপি লেখা ছিল না; বরং আমার উদ্দেশ্য ছিল আমার অস্তিত্বের গহীনে লুকিয়ে থাকা সেই অনুভূতিগুলোকে শব্দে রূপ দেওয়া, যা সাধারণ ভাষায় প্রকাশ করা দুঃসাধ্য। গদ্যের সার্থকতা কেবল তথ্য দেওয়ায় নয়, বরং পাঠকের হৃদয়ে এক ধরণের বুদ্ধিবৃত্তিক কম্পন তৈরি করায়।

আমি সবসময়ই শব্দের পরিমিতিবোধে বিশ্বাসী। একটি শব্দও যেন অপ্রয়োজনে ব্যবহৃত না হয়—এটিই ছিল আমার আজীবনের সাধনা। এই কারাগারে বসে আমি লক্ষ্য করেছি যে, যখন মানুষের কথা বলার সঙ্গী থাকে না, তখন সে শব্দের প্রতি আরও বেশি সংবেদনশীল হয়ে ওঠে। প্রতিটি বাক্য তখন এক একটি উপলব্ধির নির্যাস হয়ে দাঁড়ায়। আমি আমার এই ‘গুবার-এ-খাতির’ বা হৃদয়ের ধুলিকণাগুলোকে এমনভাবে সাজাতে চেয়েছি যাতে তা কেবল আমার ব্যক্তিগত স্মৃতিকথা না হয়ে বরং ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল হয়ে ওঠে।

অনেকে হয়তো আশা করেছিলেন যে আমি এখানে কারাগারের যাতনা আর ব্রিটিশ শাসনের নিষ্ঠুরতার বিশদ বর্ণনা দেব। কিন্তু আমি মনে করি, বাহ্যিক নিষ্ঠুরতার চেয়েও বড় হলো সেই মানসিক জয় যা আমরা প্রতিদিন এখানে অর্জন করছি। শাসকের অত্যাচার নশ্বর, কিন্তু মানুষের চিন্তার উৎকর্ষ অবিনশ্বর। আমি আমার লেখনীতে সেই উৎকর্ষকেই তুলে ধরতে চেয়েছি। আমি চেয়েছি মানুষ যেন আমার এই বন্দিত্ব দেখে বিচলিত না হয়, বরং এই বন্দিত্বের মাঝেও আমি যে মানসিক স্বাধীনতা উপভোগ করছি, তা দেখে অনুপ্রাণিত হয়।

পরিশেষে, একজন লেখকের আসল সার্থকতা হলো তার সততায়। আমি যা অনুভব করেছি এবং যা বিশ্বাস করেছি, তার বাইরে একটি শব্দও এখানে লিখিনি। কারাগারের এই জীবন আমাকে শিখিয়েছে যে, সত্যের পথ কণ্টকাকীর্ণ হতে পারে, কিন্তু সেই পথেই পরম প্রশান্তি নিহিত। আমার এই অক্ষরগুলো হয়তো একদিন ধুলোয় মিশে যাবে, কিন্তু যে আদর্শকে কেন্দ্র করে এই লেখনী জন্ম নিয়েছে, তা অমর হয়ে থাকবে। যারা সময়ের অতল গহ্বরে সত্যের সন্ধান করে, আমার এই ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা তাদের জন্য এক বিন্দু আলোকবর্তিকা হিসেবে কাজ করলেই আমার শ্রম সার্থক হবে।

সময়ের প্রবাহ ও কর্মের অবিনশ্বরতা

সময় এক প্রকাণ্ড প্রবাহ, যা কাউকে থামিয়ে রাখে না। আহমেদনগর দুর্গের এই দেয়ালগুলোর ভেতরে যখন আমি কয়েক বছর পার করে দিলাম, তখন বারবার মনে হয়েছে সময় আসলে এক আপেক্ষিক বিষয়। যখন মানুষ কোনো মহান সংকল্পের সাথে যুক্ত থাকে, তখন বছরের পর বছর এক মুহূর্তের মতো মনে হয়; আর যখন সে লক্ষ্যহীন হয়, তখন প্রতিটি মুহূর্ত পাহাড়ের মতো ভারী হয়ে ওঠে। আমি আমার এই বন্দিত্বের সময়কে সময়ের অপচয় নয়, বরং সময়ের একনিষ্ঠ বিনিয়োগ হিসেবে দেখেছি।

এই যে কয়েকশ পৃষ্ঠা আমি লিখলাম, এটি কেবল কাগজ ও কালির খেলা নয়। এটি সময়ের বিরুদ্ধে আমার এক নিঃশব্দ প্রতিবাদ। যারা আমাদের বন্দি করেছে, তারা ভেবেছিল তারা আমাদের সময়কে স্থির করে দিয়েছে। কিন্তু তারা জানত না যে, চিন্তার জগত সময়ের কোনো প্রাচীর মানে না। আমি এখানে বসে ভবিষ্যতের ভারতবর্ষের যে স্বপ্ন দেখেছি, তা সময়ের স্রোতে মুছে যাওয়ার নয়। কর্মের একটি নিজস্ব জীবন আছে। মানুষ যখন সত্যের জন্য কোনো কাজ করে, সেই কাজ মহাবিশ্বের স্পন্দনে মিশে যায় এবং উপযুক্ত সময়ে তা ফল দিতে শুরু করে।

আমি জানি, এই দুর্গের প্রহরীরা একদিন বদলে যাবে, এই তালাগুলো মরচে ধরে খসে পড়বে, এমনকি একদিন এই ব্রিটিশ শাসনের সূর্যও অস্তমিত হবে। কিন্তু এই অন্ধকারে বসে আমরা যে ধৈর্য আর নৈতিক দৃঢ়তার পরিচয় দিয়েছি, তা ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। ইতিহাস কেবল বিজয়ীদের কাহিনী নয়, এটি হলো সেইসব মানুষেরও কাহিনী যারা পরাজয়ের মুখে দাঁড়িয়েও মাথা নত করেনি। আমাদের এই বন্দিদশা আসলে আমাদের চারিত্রিক শক্তির এক অগ্নিপরীক্ষা ছিল, যেখান থেকে আমরা আরও খাঁটি হয়ে বেরিয়ে আসছি।

পরিশেষে, আমার এই দিনলিপির সমাপনী পর্বে এসে আমি এক গভীর প্রশান্তি অনুভব করছি। আমি যা বলতে চেয়েছি, তা বলতে পেরেছি। মানুষের জীবন অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত, কিন্তু তার প্রভাব হতে পারে সুদূরপ্রসারী। আমি আমার কলম তুলে রাখছি এই বিশ্বাসে যে, যারা এই ‘ধুলিকণা’গুলোর (গুবার) মাঝে সত্যের সন্ধান করবে, তারা নিরাশ হবে না। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে মানুষ যা অনুভব করে, আমি এই কারাগারের নির্জন প্রকোষ্ঠে বসেই তা উপলব্ধি করতে পেরেছি। সত্যই সুন্দর এবং সেই সুন্দরের সাধনাই আমার জীবনের একমাত্র ব্রত।

পাণ্ডুলিপির সমাপ্তি ও হৃদয়ের নির্ভারতা

আজ যখন আমি এই লেখার শেষ পাতায় এসে পৌঁছেছি, তখন আমার মনে হচ্ছে এক দীর্ঘ এবং দুর্গম পাহাড়ী পথ পাড়ি দিয়ে আমি এক সমতলে এসে দাঁড়ালাম। মনের ভেতরে জমানো যে কথাগুলো দীর্ঘকাল গুমরে মরছিল, তারা আজ কাগজের বুকে মুক্তি পেয়েছে। এই যে মুক্তি, এটি কারাগারের মুক্তি থেকেও অনেক বড়। মানুষ যখন তার মনের বোঝা হালকা করতে পারে, তখন তার চারপাশের শিকলগুলো অদৃশ্য হয়ে যায়। আহমেদনগর দুর্গের এই কক্ষটি এখন আর আমার কাছে বন্দিশালা মনে হচ্ছে না, বরং এটি একটি শান্ত পাঠকক্ষ বা ধ্যানের প্রকোষ্ঠে রূপান্তরিত হয়েছে।

আমি আমার এই দিনলিপির পাতাগুলোর দিকে তাকালে দেখতে পাই আমার জীবনের প্রতিটি চড়াই-উতরাইয়ের ছাপ। এখানে কেবল দর্শন বা রাজনীতি নেই, এখানে আছে একজন বন্দি মানুষের প্রতিদিনের ছোট ছোট অনুভূতি—কখনও বৃষ্টির শব্দে জেগে ওঠা, কখনও এক কাপ চায়ের তৃপ্তি, আবার কখনও প্রিয়জনদের থেকে আসা সেন্সর করা চিঠির বেদনা। এই ছোট ছোট বিষয়গুলোই আসলে মানুষের জীবনকে পূর্ণতা দেয়। আমরা যখন বড় কোনো আদর্শের পেছনে ছুটি, তখন প্রায়ই এই ক্ষুদ্র অথচ গভীর মুহূর্তগুলোকে অবহেলা করি। কিন্তু এই কারাবাস আমাকে শিখিয়েছে যে, জীবনের প্রতিটি নিঃশ্বাসই মূল্যবান।

আমার এই পাণ্ডুলিপি হয়তো কোনোদিন ধুলোমাখা কোনো সেলফে পড়ে থাকবে, অথবা হয়তো কোনো উৎসুক পাঠকের হৃদয়ে আগুন জ্বালিয়ে দেবে। তবে লেখকের জন্য সবচেয়ে বড় পুরস্কার হলো লেখার প্রক্রিয়াটি নিজেই। আমি যখন লিখছিলাম, তখন আমি আর এই দুর্গের বন্দি ছিলাম না; আমি ছিলাম এক স্বাধীন আত্মার অধিকারী, যে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের যে কোনো প্রান্তে অনায়াসে বিচরণ করতে পারত। কলমই ছিল আমার সেই জাদুকরী চাবিকাঠি যা দিয়ে আমি প্রতিদিন কারাগারের তালা খুলতাম।

অবশেষে, আমি আমার এই লেখনীকে সময়ের হাতে সঁপে দিচ্ছি। যারা ক্ষমতার দম্ভে মত্ত, তারা হয়তো মনে করে তারা ইতিহাস নিয়ন্ত্রণ করছে। কিন্তু ইতিহাস আসলে নিয়ন্ত্রিত হয় মানুষের চিন্তা ও নৈতিক সাহসের দ্বারা। আমাদের এই শান্ত প্রতিবাদ আর এই নিঃশব্দ লেখনী একদিন সেই দম্ভকে চূর্ণ করবে। আজ রাতের আকাশ পরিষ্কার, নক্ষত্রগুলো উজ্জ্বল। আমার হৃদয়ে কোনো ক্ষোভ নেই, কোনো গ্লানি নেই। আমি কেবল এক পরম শান্তির অনুভবে সিক্ত। আমার কাজ শেষ হয়েছে, এখন সময়ের কাজ শুরু।

অস্তিত্বের বিলয় ও সত্যের অমরত্ব

জীবনের এই সায়াহ্নে এসে আমি বুঝতে পারছি যে, মানুষ আসলে একটি বুদবুদের মতো, যা সময়ের সাগরে উদিত হয় এবং বিলীন হয়ে যায়। কিন্তু যে সত্যকে সে ধারণ করে, তা সমুদ্রের অতল গভীরতার মতোই চিরস্থায়ী। আহমেদনগর দুর্গের এই নিস্তব্ধ প্রহরে আমি যখন নিজের অস্তিত্ব নিয়ে ভাবি, তখন নিজেকে অত্যন্ত ক্ষুদ্র মনে হয়। এই ক্ষুদ্রতা আমাকে হতাশ করে না, বরং এক ধরণের অলৌকিক প্রশান্তি দেয়। কারণ আমি জানি, আমি ব্যক্তিগতভাবে টিকে না থাকলেও আমার আদর্শ এবং আমার এই কলমের আঁচড়গুলো সত্যের সাক্ষী হয়ে টিকে থাকবে।

আমার এই ‘গুবার-এ-খাতির’ কেবল একটি বই নয়, এটি এক বন্দি হৃদয়ের স্পন্দন। আমি এখানে আমার সমস্ত পাণ্ডিত্য আর আবেগ ঢেলে দিয়েছি এই আশায় নয় যে মানুষ আমাকে মনে রাখবে, বরং এই বিশ্বাসে যে—ভবিষ্যতের কোনো এক পথিক যখন এই পথ দিয়ে যাবে এবং অন্ধকার অনুভব করবে, তখন এই শব্দগুলো তার জন্য সামান্য একটু আলোর কাজ করবে। মানুষের সবচেয়ে বড় সার্থকতা হলো নিজের ক্ষুদ্র আমিত্বকে বৃহত্তর সত্যের মাঝে বিলীন করে দেওয়া। আমি আজ সেই বিলীন হওয়ার প্রক্রিয়ার মাঝেই এক পরম তৃপ্তি খুঁজে পাচ্ছি।

আহমেদনগর দুর্গের প্রহরীরা হয়তো ভাবছে তারা আজও আমাকে পাহারা দিচ্ছে। কিন্তু তারা জানে না যে, আমি অনেক আগেই এই প্রাচীর অতিক্রম করে এমন এক জগতে পৌঁছে গেছি যেখানে কোনো সেন্সরশিপ নেই, কোনো শিকল নেই। স্বাধীনতা আসলে বাইরের কোনো বিষয় নয়, এটি হৃদয়ের একটি অবস্থা। যে হৃদয়ে ভয় নেই এবং যে হৃদয়ে লোভ নেই, সেই হৃদয়ই প্রকৃত স্বাধীন। আমি এই কারাগারের অন্ধকারে সেই স্বাধীনতার আস্বাদ পেয়েছি। আজ আমার কাছে আলো আর অন্ধকার, বন্দিত্ব আর মুক্তি—সবই একাকার হয়ে গেছে।

পরিশেষে, আমি আমার এই লেখনীর ইতি টানছি এই মহান সত্যকে স্মরণ করে যে—’হক’ বা সত্যের বিনাশ নেই। দালানকোঠা ভেঙে পড়বে, শাসকরা বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যাবে, কিন্তু ন্যায়ের জন্য দেওয়া প্রতিটি দীর্ঘশ্বাস ইতিহাসের আকাশে ধ্রুবতারা হয়ে জ্বলবে। আমার কাজ শেষ হলো। আমি আমার মনের সবটুকু ধুলিকণা ঝেড়ে ফেলে এখন এক অনাবিল শূন্যতার দিকে তাকিয়ে আছি। সেই শূন্যতাই আসলে পূর্ণতা। ঈশ্বর আমাদের সহায় হোন এবং সত্যের পথে আমাদের অবিচল রাখুন।

পরম সত্যের সমর্পণ ও অমরত্বের সোপান

জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ের একটি নিজস্ব সমাপ্তি থাকে, এবং সেই সমাপ্তিই নতুন কোনো সূচনার ইঙ্গিত দেয়। আহমেদনগর দুর্গের এই প্রকোষ্ঠে বসে আমি যখন আমার কলমটিকে শেষবারের মতো কালিতে ডুবাচ্ছি, তখন আমার মনে হচ্ছে আমি কেবল একটি পাণ্ডুলিপি শেষ করছি না, বরং আমার জীবনের এক দীর্ঘ তাত্ত্বিক সংগ্রামের নির্যাসটুকু নিংড়ে দিচ্ছি। সূফী সাধকরা যাকে ‘ফানা’ বলেন—অর্থাৎ নিজের অহংকে মিটিয়ে দেওয়া—আমি এই কারাগারের নির্জনতায় সেই অভিজ্ঞতার স্বাদ পেয়েছি। মানুষ যখন নিজের ক্ষুদ্র আমিত্বকে বৃহত্তর সত্যের মাঝে বিলিয়ে দেয়, তখনই সে প্রকৃত অমরত্বের বা ‘বাকা’-র সন্ধান পায়।

আমার এই লেখাগুলো যখন মানুষের কাছে পৌঁছাবে, তখন হয়তো ভারতবর্ষের রাজনৈতিক মানচিত্র বদলে যাবে। কিন্তু মানুষের ভেতরের যে চিরন্তন তৃষ্ণা—সত্য ও সুন্দরের জন্য যে ব্যাকুলতা—তা কখনোই বদলাবে না। আমি সবসময়ই চেয়েছি আমার লেখনী যেন কেবল সাময়িক উত্তেজনার খোরাক না হয়, বরং তা যেন মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক ও আধ্যাত্মিক উন্নতির সোপান হয়। এই কয়েক বছরের বন্দিত্ব আমাকে সেই সুযোগ করে দিয়েছে যা হয়তো মুক্ত জীবনে আমি কখনোই পেতাম না। এই নিস্তব্ধতা ছিল আমার জন্য এক মহান আশীর্বাদ।

মানুষ অনেক সময় প্রশ্ন করে, এত দুঃখ-কষ্ট আর একাকীত্বের মাঝেও কীভাবে একজন মানুষ প্রশান্ত থাকতে পারে? তার উত্তর আজ আমি এখানে দিয়ে যাচ্ছি—যদি হৃদয়ের ভেতরে সত্যের প্রদীপ জ্বলে, তবে বাইরের কোনো ঝড়ই তাকে নেভাতে পারে না। আমি আমার সমস্ত অভিযোগ, সমস্ত ক্লান্তি আর সমস্ত অভিমান এই কাগজের পাতায় সঁপে দিয়ে নিজেকে সম্পূর্ণ হালকা করে নিয়েছি। এখন আমার সামনে যে পথই আসুক না কেন, আমি তা অত্যন্ত হাসিমুখে গ্রহণ করতে প্রস্তুত। কারণ আমি জানি, দেহের বন্দিত্ব আত্মার যাত্রাকে রুদ্ধ করতে পারে না।

অবশেষে, আমি আমার পাঠকদের উদ্দেশ্যে কেবল এইটুকুই বলব—চিন্তার স্বাধীনতাকে কখনো বিসর্জন দেবেন না। অন্ধকার যতই ঘনীভূত হোক, মনে রাখবেন যে ভোরের সূর্য ওঠার প্রক্রিয়াটি সেই গভীর অন্ধকার থেকেই শুরু হয়। আমার এই ‘গুবার-এ-খাতির’ আপনাদের হৃদয়ের আয়না থেকে ধুলো মুছে ফেলার প্রেরণা জোগাক। আহমেদনগর দুর্গের প্রতিটি পাথর আজ আমার কাছে বিদায় নিচ্ছে, আর আমিও এক নতুন দিগন্তের দিকে যাত্রা করছি। পরম করুণাময়ের কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমাদের সত্যের পথে অবিচল রাখেন। ইতি।

নিস্তব্ধতার অবসান ও অন্তিম প্রতিফলন

দীর্ঘকাল ধরে এই পাথুরে দেয়ালগুলোর সাথে কথা বলতে বলতে এখন নিস্তব্ধতাই আমার স্বাভাবিক ভাষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু আজ যখন আমি আমার এই দীর্ঘ পত্রাবলি বা ‘মাকাতুবাত’-এর শেষ প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছি, তখন এক বিচিত্র অনুভূতি আমাকে আচ্ছন্ন করছে। মনে হচ্ছে, আমি কেবল কাগজের ওপর শব্দ সাজাইনি, বরং আমার হৃদয়ের এক একটি টুকরো এখানে গেঁথে দিয়েছি। আহমেদনগর দুর্গের এই নিঃসঙ্গ রাতগুলোতে যে প্রজ্ঞা আমি অর্জন করেছি, তা কোনো পুঁথিগত বিদ্যা নয়; তা হলো জীবনের চরম অভিজ্ঞতার নির্যাস।

আমি লক্ষ্য করেছি যে, বন্দিত্বের দিনগুলো যখন শেষ হতে শুরু করে, তখন মানুষের মনে এক ধরণের অদ্ভুত দ্বিধা তৈরি হয়। একদিকে মুক্তির আনন্দ, অন্যদিকে এই নির্জনতার সাথে গড়ে ওঠা এক আত্মিক মায়ার টান। এই ঘরটি, যেখানে আমি ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়েছি, এটি এখন আর আমার কাছে শত্রু নয়; এটি আমার সেই পুরনো সাথীর মতো যে আমাকে কঠিন সময়ে আশ্রয় দিয়েছিল। আমি যখন এখান থেকে বেরিয়ে যাব, তখন এই দেয়ালগুলো হয়তো আমার অভাব বোধ করবে না, কিন্তু আমি আমার সত্তার একটি অংশ এই কক্ষের নির্জনতায় চিরকালের জন্য রেখে যাচ্ছি।

জ্ঞানের যাত্রা কখনও শেষ হয় না। কারাগারের এই অধ্যায়টি আমার জীবনের একটি বড় পাঠশালা ছিল। এখান থেকে আমি শিখেছি যে, মানুষের ধৈর্য হলো তার সবচেয়ে বড় তলোয়ার। শাসকরা ভেবেছিল আমাদের বিচ্ছিন্ন করে দিলে আমরা দুর্বল হয়ে পড়ব, কিন্তু এই বিচ্ছিন্নতা আমাদের একীভূত করেছে—নিজেদের সাথে এবং আমাদের স্রষ্টার সাথে। সত্যের পথে যারা চলে, তাদের জন্য একাকীত্ব বলে কিছু নেই। সারা বিশ্বব্রহ্মাণ্ড তাদের বন্ধু হয়ে ওঠে।

পরিশেষে, আমি আমার এই লেখনীকে বিদায় জানাচ্ছি। আমি জানি না এই পাণ্ডুলিপিটি শেষ পর্যন্ত কোন গন্তব্যে পৌঁছাবে, তবে যে হাতেই এটি পড়ুক না কেন, আমি চাই সেই পাঠক যেন এখান থেকে কেবল আমার কথাগুলো না নেয়, বরং সেই স্পিরিট বা আত্মাকে গ্রহণ করে যা আমাকে এই বন্দিত্বের মাঝেও হাসিমুখে বাঁচিয়ে রেখেছিল। অন্ধকার যতই গভীর হোক, সত্যের জয় অনিবার্য। আমার এই ক্ষুদ্র প্রচেষ্টাই ইতিহাসের পাতায় আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ সাক্ষ্য হয়ে থাকবে। এখন সময় হয়েছে কলম নামিয়ে রাখার এবং সেই অনন্ত নূরের দিকে তাকাার, যা প্রতিটি বন্দির মুক্তির অপেক্ষায় জাগ্রত থাকে।

ব্যক্তিগত নির্লিপ্ততা ও সত্যের সমর্পণ

আহমেদনগর দুর্গের এই দীর্ঘ কারাবাসের সময় আমি নিজেকে জগতের সব ধরণের কোলাহল থেকে বিচ্ছিন্ন করে নিয়েছিলাম। এই বিচ্ছিন্নতা আমাকে শিখিয়েছে যে, মানুষের আসল শক্তি তার আমিত্বের বিলীন হওয়ার মাঝে নিহিত। আমি যখন আমার এই লেখাগুলো শেষ করছি, তখন আমার ভেতরে কোনো ধরণের ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা বা যশের মোহ অবশিষ্ট নেই। আমি কেবল সত্যের একজন নগন্য বাহক হিসেবে আমার দায়িত্ব পালন করার চেষ্টা করেছি। এই চিঠিগুলো বা এই আলোচনাগুলো আসলে আমার অন্তরের সেই কান্নার প্রতিধ্বনি, যা আমি কেবল কাগজের কাছেই প্রকাশ করতে পেরেছি।

আমি অনুভব করছি যে, সময়ের প্রতিটি মুহূর্ত আমাকে এক নতুন জগতের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। কারাগারের এই পাথুরে প্রাচীরগুলো এখন আর আমার কাছে কোনো বাধা নয়, বরং এগুলো আমার আধ্যাত্মিক উন্নতির সোপান। আমি যখন এই কক্ষের জানালায় দাঁড়াই এবং বাইরের খোলা আকাশ দেখি, তখন আমি বুঝতে পারি যে—প্রকৃত বন্দিত্ব হলো মনের সংকীর্ণতা। যে মানুষের মন উদার এবং যে ব্যক্তি সত্যের আলোকে নিজেকে আলোকিত করেছে, তাকে পৃথিবীর কোনো কারাগারই বন্দি করে রাখতে পারে না। আমি এই অন্ধকারের মাঝেই সেই আলোর সন্ধান পেয়েছি।

জ্ঞানের সাধনা অনেক সময় মানুষকে একা করে দেয়, কিন্তু সেই একাকীত্বই হলো স্রষ্টার সাথে মিলনের শ্রেষ্ঠ সময়। আমি আমার এই দিনলিপির মাধ্যমে সেইসব মানুষদের সাথে কথা বলতে চেয়েছি, যারা আগামী দিনে এই দেশের হাল ধরবে। তাদের জন্য আমার একটাই বার্তা—কখনও সত্যের পথ থেকে বিচ্যুত হবেন না। পরিস্থিতির চাপ যতই আসুক না কেন, নিজের নৈতিক মেরুদণ্ড সোজা রাখবেন। আমাদের এই ত্যাগের মূল্য তখনই সার্থক হবে, যখন আগামী প্রজন্ম একটি স্বাধীন ও মর্যাদাপূর্ণ পরিবেশে বাস করতে পারবে।

অবশেষে, আমি আমার কলম তুলে রাখছি। আমার হৃদয়ের সমস্ত ধুলিকণা (গুবার) আজ এই কাগজের পাতায় ঝরে পড়েছে। এখন আমার হৃদয় এক স্বচ্ছ দর্পণের মতো শান্ত। আমি প্রস্তুত সেই অজানার উদ্দেশ্যে যাত্রা করতে, যেখানে কোনো সীমানা নেই, কোনো শাসন নেই। জীবনের এই দীর্ঘ সফরে আমি যা কিছু পেয়েছি এবং যা কিছু হারিয়েছি, সবকিছুর জন্যই আমি কৃতজ্ঞ। সত্যই সুন্দর এবং সেই সুন্দরের পথেই মুক্তি। ইতি।

সহনশীলতার শেষ সীমা ও আধ্যাত্মিক প্রশান্তি

সহনশীলতা যখন অভ্যাসে পরিণত হয়, তখন কষ্ট আর কষ্টের স্তরে থাকে না; তা হয়ে ওঠে এক ধরণের আধ্যাত্মিক সাধনা। আহমেদনগর দুর্গের এই পাথুরে দিনগুলো আমাকে শিখিয়েছে যে, মানুষের মন চাইলে যে কোনো নরককেও শান্তিময় উদ্যানে রূপান্তর করতে পারে। প্রথম দিকে যখন এখানে এসেছিলাম, তখন প্রতিমুহূর্তে মনে হতো—কখন এই বন্দিত্বের অবসান হবে? কিন্তু আজ এই সমাপ্তি লগ্নে এসে আমার মনে হচ্ছে, আমি যদি আরও কয়েক বছর এখানে থাকতাম, তবুও আমার মনে কোনো ক্ষোভ জন্মাত না। কারণ, আমি নিজেকে পরিস্থিতির ঊর্ধ্বে স্থাপন করতে শিখেছি।

মানুষের দুঃখের মূল কারণ হলো তার প্রত্যাশা। আমরা যখন জগতের কাছে কিছু আশা করি এবং তা পাই না, তখনই আমরা ভেঙে পড়ি। কিন্তু আমি এই কারাগারে বসে নিজেকে সমস্ত প্রত্যাশা থেকে মুক্ত করে নিয়েছি। আমি এখন কেবল একজন দর্শক—নিজের জীবনের এবং এই বিশ্বের। এই নির্লিপ্ততাই আমাকে সেই শক্তি দিয়েছে যার মাধ্যমে আমি এই একঘেয়ে কারাজীবনকেও অর্থবহ করে তুলেছি। আমার এই ‘গুবার-এ-খাতির’ আসলে সেই নির্লিপ্ততারই ফসল। যখন মানুষের নিজের জন্য আর কিছু চাওয়ার থাকে না, তখনই সে সত্যকে তার আসল রূপে দেখতে পায়।

আমি লক্ষ্য করেছি, যখন বাইরে কোনো বড় ধরণের রাজনৈতিক উত্তেজনা বা পরিবর্তনের খবর আসত, তখন আমার সহবন্দিদের মাঝে এক ধরণের অস্থিরতা কাজ করত। কিন্তু আমি সেই খবরগুলোকে আকাশের মেঘের মতো ভেসে যেতে দেখতাম। মেঘ আসে, আবার চলেও যায়; কিন্তু আকাশ তার জায়গায় স্থির থাকে। আমাদেরও উচিত সেই আকাশের মতো হওয়া—অবিচল ও প্রশান্ত। কারাগারের এই নিস্তব্ধতা আমাকে সেই আকাশ হতে শিখিয়েছে। প্রতিটি দুঃখই এক একটি পাঠ, যা আমাদের ভেতরের অহংকে চূর্ণ করে আমাদের আরও নমনীয় ও সহনশীল করে তোলে।

পরিশেষে, আমি এইটুকুই বলব—মুক্তি কেবল কারাগারের দরজা খুলে বের হয়ে যাওয়ার নাম নয়। প্রকৃত মুক্তি হলো মনের ভেতর থেকে ভয় আর আকাঙ্ক্ষাকে সমূলে উৎপাটন করা। আমি আজ সেই মুক্তি অনুভব করছি। আহমেদনগর দুর্গের এই ক্ষুদ্র প্রাঙ্গণ এখন আমার কাছে এক অসীম জগত। আমি আমার কলম তুলে নিচ্ছি পরবর্তী ভাবনার জন্য, কিন্তু আমার হৃদয় এখন এক গভীর নীরবতায় নিমগ্ন। এই নীরবতাই হলো আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ অর্জন।

অস্তিত্বের শেষ ছায়া ও মহাকালের ডাক

জীবনের অপরাহ্ণে এসে মানুষ যখন পেছনের দিকে তাকায়, তখন সে কেবল ছায়া দেখতে পায়। কিন্তু আহমেদনগর দুর্গের এই ছায়াগুলো আমার কাছে দীর্ঘ এবং অর্থবহ। আমি যখন এই খাতাটি বন্ধ করার কথা ভাবছি, তখন মনে হচ্ছে যে—ব্যক্তিগতভাবে আমি হয়তো একদিন হারিয়ে যাব, কিন্তু এই যে কয়েক বছরের বন্দিত্বের নির্যাস আমি এখানে রেখে গেলাম, তা মহাকালের স্রোতে ভেসে যাবে না। মানুষ মরে যায়, কিন্তু তার আর্তি এবং তার সত্যের অন্বেষণ কোনো না কোনোভাবে থেকে যায়। এই কারাগার আমাকে শিখিয়েছে যে, হাড়-মাংসের মানুষের চেয়ে তার আদর্শ অনেক বেশি শক্তিশালী।

আমি প্রায়ই ভাবি, এই দুর্গের পাথুরে দেয়ালে আমার মতো আরও কত বন্দির দীর্ঘশ্বাস মিশে আছে। ইতিহাস হয়তো তাদের সবার নাম মনে রাখেনি, কিন্তু তাদের সেই ত্যাগের স্পন্দন এই মাটির ভেতরেই রয়ে গেছে। আমি নিজেকে তাদেরই একজন উত্তরসূরি মনে করি। কারাগার কেবল একটি শাস্তির জায়গা নয়, এটি হলো আত্মদর্শনের একটি আয়না। যারা এই আয়নায় নিজের আসল মুখ দেখতে পায়, তারা আর কখনও পরাজয়কে ভয় পায় না। আমার এই ‘গুবার-এ-খাতির’ আসলে সেই আয়নারই একটি প্রতিফলন।

অনেক সময় মনে হয়, আমি যা লিখতে চেয়েছি তার অর্ধেকও হয়তো লিখতে পারিনি। মনের গহীনে এমন অনেক কথা থাকে যা কোনো ভাষাতেই প্রকাশ করা সম্ভব নয়। শব্দ যখন শেষ হয়ে যায়, তখন শুরু হয় নীরবতার ভাষা। আমি আজ সেই নীরবতার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছি। আহমেদনগর দুর্গের এই প্রকোষ্ঠ আমাকে যে নীরবতা শিখিয়েছে, তা কোলাহলের চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী। এই নীরবতাই আমাকে আগামী দিনের বৃহত্তর সংগ্রামের জন্য শক্তি জোগাবে। আমি জানি, যে দিনটি আজ শেষ হচ্ছে, তা এক নতুন এবং উজ্জ্বল ভোরের জন্ম দেবে।

অবশেষে, আমি আমার এই লেখনীকে সময়ের হাতে সঁপে দিচ্ছি। আমার আর কোনো অভিযোগ নেই, কোনো দাবি নেই। আমি যা দিতে চেয়েছি তা এই পাতায় গেঁথে দিয়েছি। এখন এই অক্ষরগুলোর দায়িত্ব হলো মানুষের হৃদয়ে সত্যের আলো জ্বালানো। যদি একজন পাঠকও এই লেখা পড়ে নিজের ভেতরের বন্দিত্ব থেকে মুক্তির প্রেরণা পায়, তবে আমার এই কারাবাস সার্থক হবে। শান্তি বর্ষিত হোক সেইসব আত্মার ওপর যারা সত্যের জন্য অবিচল থাকে। আমার কলম আজ এখানেই থামল।

শেষ বিদায় ও মুক্তির উপলব্ধি

সময় এখন বিদায়ের। আহমেদনগর দুর্গের এই প্রকোষ্ঠ, যা গত কয়েক বছর ধরে আমার ঘরবাড়ি, আমার পাঠাগার এবং আমার উপাসনালয় ছিল—আজ সেখান থেকে বিদায় নেওয়ার মুহূর্ত ঘনিয়ে এসেছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, মুক্তির এই সংবাদ শুনে আমার মনে যতটা আনন্দ হওয়ার কথা ছিল, তার চেয়ে বেশি এক ধরণের গাম্ভীর্য অনুভব করছি। যে স্বাধীনতা আমি মনের ভেতরে লালন করেছি, তা আজ বাহ্যিক রূপ পেতে যাচ্ছে। কিন্তু আমি কি সত্যিই এই কারাগার থেকে বের হচ্ছি? নাকি আমি কেবল এক কারাগার থেকে অন্য এক বিশাল কারাগারে প্রবেশ করছি?

আমি আমার এই গুছিয়ে রাখা পাণ্ডুলিপিটির দিকে তাকালাম। এটিই আমার এই দীর্ঘ নিঃসঙ্গতার শ্রেষ্ঠ সাক্ষী। আমি যখন এখান থেকে চলে যাব, তখন এই কক্ষটি হয়তো অন্য কোনো বন্দির অপেক্ষায় থাকবে। আমি শুধু চাই, যে-ই এখানে আসুক না কেন, সে যেন অনুভব করতে পারে যে—দেয়াল দিয়ে শরীরকে বন্দি করা গেলেও চিন্তাকে কখনো শিকল পরানো যায় না। মানুষ যখন নিজের ভেতরে মুক্তির পথ খুঁজে পায়, তখন বাইরের শিকলগুলো কেবল লোহার টুকরো ছাড়া আর কিছু থাকে না।

কারাগারের প্রহরীরা তাদের ডিউটি শেষ করে চলে যাবে, কিন্তু এই কয়েক বছরে আমি যে মানসিক শক্তি সঞ্চয় করেছি, তা আমার আজীবনের সম্পদ হয়ে থাকবে। আমি যখন এই দুর্গের ফটক দিয়ে বাইরে পা রাখব, তখন আমি আর সেই মানুষটি থাকব না যে এখানে প্রথম দিন প্রবেশ করেছিল। এই কারাগার আমাকে ভেঙে আবার নতুন করে গড়েছে। আমি এখন অনেক বেশি শান্ত, অনেক বেশি অবিচল। রাজনৈতিক ঝড়-ঝাপটা আসবে, যাবে—কিন্তু আমার হৃদয়ের এই প্রশান্তি আর কেউ কেড়ে নিতে পারবে না।

অবশেষে, আমার এই ‘গুবার-এ-খাতির’-এর সমাপ্তি টানছি এক গভীর কৃতজ্ঞতাবোধ নিয়ে। জীবনের প্রতিটি অভিজ্ঞতাই এক একটি আশীর্বাদ, যদি আমরা তা থেকে শিক্ষা নিতে পারি। যারা এই ধুলিকণাগুলোর মাঝে সত্যের স্বাদ পাবেন, তাদের জন্যই আমার এই শ্রম। অন্ধকারের আয়ু শেষ হতে চলেছে, আর ভোরের প্রথম আলো আমাদের ডাক দিচ্ছে। আমার যাত্রা শুরু হলো এক নতুন দিগন্তের দিকে। সত্যের জয় হোক এবং মানুষের আত্মার মুক্তি ঘটুক। খোদা হাফেজ।

অস্তিত্বের সীমানা ও মহাকালের নীরবতা

জীবনের এই মঞ্চে আমরা সবাই একেকজন পথিক, যারা কিছু সময়ের জন্য এখানে এসে আমাদের ভূমিকা পালন করি। আহমেদনগর দুর্গের এই নিঃসঙ্গ দিনগুলো আমাকে একটি বড় সত্য শিখিয়েছে—তা হলো ‘খোদ-শিনাসি’ বা আত্মপরিচয়। মানুষ যখন বাইরের কোলাহল থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তখনই সে নিজের ভেতরের সেই আদিম ও অকৃত্রিম সত্তার দেখা পায়। আমি আমার এই পাণ্ডুলিপির প্রতিটি পাতায় সেই সত্তারই খোঁজ করেছি। আজ যখন লেখার শেষ বিন্দুটি দিচ্ছি, তখন মনে হচ্ছে আমার ভেতরের শব্দগুলো এক বিশাল নীরবতায় গিয়ে মিশছে।

অনেকে হয়তো ভাববেন, এই বন্দিদশার কথাগুলো কেবল কষ্টের উপাখ্যান। কিন্তু আমার কাছে এটি ছিল এক তাত্ত্বিক আনন্দযাত্রা। জ্ঞান যখন জীবনের অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়, তখন তা আর ভার থাকে না; তা হয়ে ওঠে ডানা। আমি আমার এই দিনলিপির মাধ্যমে সেই ডানারই বিস্তার ঘটিয়েছি। আমার শরীর এই দুর্গের ভেতরে আবদ্ধ থাকলেও আমার চিন্তা ছিল মহাকাশের নক্ষত্রপুঞ্জের মতো স্বাধীন। এই যে দ্বৈততা—শরীরের বন্দিত্ব আর আত্মার স্বাধীনতা—এটিই মানুষের জীবনের শ্রেষ্ঠ রহস্য।

আমি যখন এই কারাগারের প্রাঙ্গণে শেষবারের মতো পায়চারি করছি, তখন অনুভব করছি যে প্রতিটি ধূলিকণা আমাকে কিছু বলতে চাইছে। তারা বলছে যে, কোনো কিছুই চিরস্থায়ী নয়। আজ যারা বিজয়ী হয়ে আমাদের বন্দি করে রেখেছে, কাল তারা ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে হারিয়ে যাবে। কিন্তু ন্যায়ের জন্য যে রক্ত ও চোখের জল ঝরানো হয়েছে, তা এই মাটির স্মৃতিতে অক্ষয় হয়ে থাকবে। আমি আমার এই লেখনীকে সেই অক্ষয় স্মৃতির অংশ হিসেবে রেখে যাচ্ছি।

পরিশেষে, আমার এই ‘গুবার-এ-খাতির’ বা হৃদয়ের ধুলিকণাগুলোকে আমি মহাকালের হাতে ছেড়ে দিচ্ছি। মানুষের বিচার হয়তো ভুল হতে পারে, কিন্তু সময়ের বিচার কখনো ভুল হয় না। আমি আমার দায়িত্ব পালন করেছি; আমি সত্যকে লিখেছি, আমি ধৈর্যকে ধারণ করেছি এবং আমি কোনো পরিস্থিতিতেই মাথা নত করিনি। এখন আমার আত্মা সেই অসীম মুক্তির জন্য প্রস্তুত, যা কোনো দুর্গের প্রাচীর দিয়ে ঘেরা সম্ভব নয়। জীবনের এই সফরটি ছিল অদ্ভুত সুন্দর, আর তার সমাপ্তিও হচ্ছে এক পরম প্রশান্তির মধ্য দিয়ে। ইতি।

শেষ অনুচ্ছেদ: আত্মার প্রশান্তি ও সুবহে সাদিক

অবশেষে সেই মুহূর্তটি উপস্থিত, যখন শব্দের প্রয়োজন ফুরিয়ে আসে এবং হৃদয় কেবল অনুভবের জগতে বিচরণ করে। আহমেদনগর দুর্গের এই নিঃসঙ্গ প্রহরগুলো আমাকে যে উপহার দিয়েছে, তা হলো—নিজের সাথে নিজের পরিচয়। আমি যখন এখানে এসেছিলাম, তখন আমার সাথে ছিল কেবল একরাশ বই আর শূন্য কিছু খাতা। আজ যখন ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি, তখন সেই খাতাগুলো আমার হৃদয়ের স্পন্দনে পূর্ণ। এই শব্দগুলো কেবল কালি দিয়ে লেখা নয়, এগুলো আমার ধৈর্য, আমার সংকল্প এবং আমার বিশ্বাসের নির্যাস।

আমি অনুভব করছি যে, এই কারাগার আমাকে যা দিয়েছে, তা বাইরের পৃথিবী হয়তো কোনোদিন বুঝবে না। একাকীত্ব যখন সাধনায় পরিণত হয়, তখন তা আর ভয়ংকর থাকে না; বরং তা এক অনাবিল প্রশান্তি বয়ে আনে। আমি যখন নির্জনে বসে থাকতাম, তখন মনে হতো মহাকালের সমস্ত মহাপুরুষেরা আমার চারপাশে বসে আছেন। আমি তাঁদের সাথে কথা বলতাম, তাঁদের জ্ঞান আহরণ করতাম। এই যে মানসিক সংযোগ, এটিই ছিল আমার টিকে থাকার শক্তি। মানুষের শরীরকে খাঁচায় বন্দি করা গেলেও তার কল্পনাকে যে আটকানো যায় না—এই ধ্রুব সত্যটি আমি এই প্রকোষ্ঠে হাড়াহাঁটি উপলব্ধি করেছি।

আমার এই ‘গুবার-এ-খাতির’ বা হৃদয়ের ধুলিকণাগুলোকে আমি সেইসব মুসাফিরদের জন্য রেখে যাচ্ছি, যারা অন্ধকার রাতে পথ হারাবে। তারা যেন এই শব্দগুলোর মাঝে একটুখানি আলোর দিশা পায়। আমি যা বলতে চেয়েছি, তা হয়তো অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে, কিন্তু আমার উদ্দেশ্য ছিল স্বচ্ছ। সত্যের জয় হবেই—এটি কেবল একটি রাজনৈতিক স্লোগান নয়, এটি মহাজাগতিক নিয়ম। আজ হোক বা কাল, এই দেশ স্বাধীন হবে এবং মানুষ তার মর্যাদা ফিরে পাবে। সেই সোনালী ভোরের প্রত্যাশায় আমি আমার শেষ কলমের আঁচড়টি এখানে রাখলাম।

এখন বিদায়ের বেলা। আমার হৃদয় এখন এক শান্ত সাগরের মতো স্থির। কোনো ক্ষোভ নেই, কোনো গ্লানি নেই—আছে কেবল এক পরম কৃতজ্ঞতা। জীবনের এই সফরটি ছিল অদ্ভুত এবং সুন্দর। আমি প্রস্তুত সেই নতুন দিগন্তের দিকে যাত্রা করতে, যেখানে আর কোনো দেয়াল থাকবে না। হে সময়! তুমি সাক্ষী থেকো, আমি আমার সত্যের পথে অবিচল ছিলাম। আমার কাজ আজ এখানেই শেষ হলো। সত্য ও সুন্দর চিরজীবী হোক।

সময়ের সাক্ষ্য ও চিন্তার স্থায়িত্ব

মানুষের স্মৃতি অনেক সময় বিশ্বাসঘাতকতা করে, কিন্তু লিখিত শব্দ কখনো মিথ্যা বলে না। আজ যখন আমি আমার এই দিনলিপির শেষ পাতাগুলো উল্টাচ্ছি, তখন প্রতিটি তারিখ আর প্রতিটি বাক্য আমাকে সেই বিশেষ মুহূর্তগুলোতে ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আহমেদনগর দুর্গের এই নিঃসঙ্গ দিনগুলোতে আমি যা কিছু অনুভব করেছি, তা কেবল আমার ব্যক্তিগত বিষয় নয়—তা ছিল একটি জাতির ক্রান্তিকালের প্রতিধ্বনি। আমরা যখন ইতিহাসের মধ্য দিয়ে যাই, তখন আমরা বুঝতে পারি না যে আমরা আসলে কত বড় এক পরিবর্তনের অংশীদার হচ্ছি। কিন্তু আজ এই নিভৃতে বসে আমি সেই পরিবর্তনের পদধ্বনি পরিষ্কার শুনতে পাচ্ছি।

চিন্তা হলো এমন এক বীজ, যা উপযুক্ত মাটিতে পড়লে একদিন বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়। আমি জানি না আমার এই শব্দগুলো কোন মাটিতে গিয়ে পড়বে, কিন্তু আমি এটুকু জানি যে—সত্যের শক্তি কোনোদিন বৃথা যায় না। হয়তো আজ থেকে কয়েক দশক পর কোনো এক যুবক এই পাতাগুলো পড়বে এবং অনুভব করবে যে, এই অন্ধকারের মাঝেও আমরা কতটা আশাবাদী ছিলাম। আমাদের এই আশাই হবে আগামী দিনের মানুষের প্রেরণা। কারাগারের এই বছরগুলো আমাদের শরীর থেকে শক্তি কেড়ে নিলেও আমাদের আত্মাকে করেছে ইস্পাতের মতো দৃঢ়।

আমি যখন এই দুর্গের আঙিনায় শেষবারের মতো পায়চারি করছি, তখন আমার মনে পড়ছে সেইসব বন্ধুদের কথা যারা আজ এই পৃথিবীতে নেই, কিন্তু যাদের আদর্শ আমাদের এই লড়াইয়ের মূল জ্বালানি। রাজনীতিতে জয়-পরাজয় থাকবেই, কিন্তু নৈতিক জয়ই হলো আসল জয়। আমি এই কারাগারে বসে নিজেকে সেই নৈতিক জয়ের অধিকারী বলে মনে করি। আমি কোনো আপস করিনি, আমি আমার আদর্শকে বিসর্জন দিইনি। এই যে মানসিক শান্তি, এটিই আমার জন্য সবচেয়ে বড় পুরস্কার।

অবশেষে, আমি আমার এই লেখনীকে কালের গর্ভে সঁপে দিচ্ছি। আমার মনের সমস্ত ধুলিকণা (গুবার) ঝরে পড়ার পর এখন যে স্বচ্ছতা অনুভব করছি, তা ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব। আমি এখন প্রস্তুত সেই বৃহত্তর জগতের জন্য, যেখানে কোনো প্রাচীর আমাদের স্বপ্নকে আটকে রাখতে পারবে না। আমার এই সফর শেষ হলেও চিন্তার সফর অন্তহীন। যারা সত্যকে ভালোবাসে, তাদের জন্য প্রতিটি শেষই একটি নতুন আরম্ভ। সত্যের আলোয় উদ্ভাসিত হোক সবার হৃদয়।

মৌনতা থেকে মুখরতায়: এক নতুন যাত্রা:

দীর্ঘ কয়েক বছরের এই মৌনতা এখন আমার অস্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আহমেদনগর দুর্গের এই পাথুরে দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে আমার নিজের কণ্ঠস্বরই যখন আমার কাছে ফিরে আসত, তখন আমি বুঝতাম—শব্দের চেয়ে নীরবতা কত বেশি শক্তিশালী হতে পারে। কিন্তু আজ যখন এই ডায়েরির পাতাগুলো শেষ করার সময় এসেছে, তখন আমাকে আবার সেই কোলাহলময় পৃথিবীতে ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে। সেখানে হাজারো মানুষের ভিড়, রাজনীতির জটিল আবর্ত এবং দায়িত্বের গুরুভার আমার জন্য অপেক্ষা করছে। আমি জানি না এই নিভৃত সাধনার প্রশান্তি আমি সেখানে কতটা ধরে রাখতে পারব।

তবে একটি বিষয় নিশ্চিত, এই কারাগার আমাকে যে মানসিক ভারসাম্য দান করেছে, তা জগতের কোনো প্রতিকূলতাই কেড়ে নিতে পারবে না। আমি আমার এই পাণ্ডুলিপিটি শেষবারের মতো একবার পড়ে দেখলাম। এখানে কেবল রাজনীতির কথা নেই, আছে এক একজন মানুষের একাকীত্বের জয়গান। জওহরলালজি যখন তাঁর কক্ষে গভীর চিন্তায় নিমগ্ন থাকতেন, কিংবা অন্য বন্ধুরা যখন কারাগারের আঙিনায় পায়চারি করতেন—তখন তাঁদের অবয়বে আমি যে গাম্ভীর্য দেখেছি, তা ছিল আসলে এক অজেয় আত্মার প্রতিফলন। আমরা এখানে সবাই একেকজন দার্শনিক হয়ে উঠেছি, কারণ দুঃখ আমাদের গভীরতা শিখিয়েছে।

আমি যখন এই দুর্গের সীমানা অতিক্রম করব, তখন আমার সাথে কোনো সোনা-দানা বা বৈষয়িক সম্পদ থাকবে না; থাকবে কেবল এই কয়েকটি খাতা। কিন্তু আমার কাছে এই শব্দগুলোই পৃথিবীর সমস্ত রত্নের চেয়ে দামী। কারণ, এগুলো অন্ধকারের মাঝেও জ্বলজ্বল করা সত্যের সাক্ষ্য। আমি আমার এই কলমটিকে স্যালুট জানাই, যা এই কঠিন দিনগুলোতে আমার সবচেয়ে বিশ্বস্ত সঙ্গী ছিল। এটি আমাকে এক মুহূর্তের জন্যও অনুভব করতে দেয়নি যে আমি একা।

পরিশেষে, আমি আমার এই লেখনীকে বর্তমান থেকে ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছি। যারা ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে সত্যকে দমন করতে চায়, তারা যেন এই পাতাগুলো পড়ে বুঝতে পারে যে—মানুষের কলম তার কামানের চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী। আজ রাতের আকাশ বড় বেশি শান্ত, যেন আমার হৃদয়ের এই সমাপ্তিকে স্বাগত জানাচ্ছে। আমার মনের সমস্ত গুবার বা ধুলিকণা আজ শান্ত হয়েছে। আমি এখন এক নতুন ভোরের অপেক্ষায় প্রহর গুনছি, যেখানে মানুষ কেবল শরীরেই নয়, আত্মাতেও স্বাধীন হবে। ইতি।

বন্ধুত্বের সওগাত ও পাণ্ডুলিপির সমর্পণ

এই দীর্ঘ পত্রাবলি বা ‘মাকাতুবাত’-এর শেষ প্রান্তে এসে আজ আমার কেবল একটি মুখই বারবার মনে পড়ছে—নবাব সদর ইয়ার জং মাওলানা হাবিবুর রহমান খান শেরওয়ানি। আমি জানি না, এই দুর্গের উঁচু প্রাচীর আর কড়া পাহারা পেরিয়ে কবে এই লেখাগুলো তাঁর হাতে পৌঁছাবে। কিন্তু আমি যখনই কলম ধরেছি, মনে হয়েছে আমি তাঁর সামনে বসেই কথা বলছি। আহমেদনগর দুর্গের এই নিঃসঙ্গতায় তিনি ছিলেন আমার এক অদৃশ্য শ্রোতা। বন্ধুত্বের এই যে আত্মিক টান, এটিই হয়তো মানুষকে প্রতিকূল পরিস্থিতির মাঝেও বাঁচিয়ে রাখে।

আমি যখন আমার এই ‘গুবার-এ-খাতির’ বা হৃদয়ের ধুলিকণাগুলোকে চিঠির আকারে সাজিয়েছি, তখন আমার মনে কোনো লৌকিকতা ছিল না। বন্ধুর কাছে মানুষ যেমন নিঃসংকোচে মনের আগল খুলে দেয়, আমিও তেমনি আমার সমস্ত চিন্তা, দর্শন এবং অনুভূতির ঝুলি তাঁর সামনে উজাড় করে দিয়েছি। অনেক সময় রাজনৈতিক আলোচনা এসেছে, অনেক সময় সূফীবাদী তত্ত্বের অবতারণা হয়েছে, আবার অনেক সময় নিতান্তই ব্যক্তিগত একঘেয়েমির কথা উঠে এসেছে। কিন্তু এই সবকিছুর মূলে ছিল এক অকৃত্রিম সততা। আমি যা দেখেছি এবং যা অনুভব করেছি, তার বাইরে একটি শব্দও এখানে স্থান পায়নি।

কারাগারের এই জীবন আমাকে শিখিয়েছে যে, সত্যের পথে একা চলতে হলেও যদি একজন প্রকৃত বন্ধু বা সমঝদার মানুষের কথা মনে থাকে, তবে সেই পথ আর দুর্গম মনে হয় না। হাবিবুর রহমান সাহেব হয়তো এই লেখাগুলো পড়ার সময় আমার সেই পুরনো হাসি বা আমার গলার স্বর অনুভব করতে পারবেন। এই লেখাগুলো আসলে আমাদের সেই পুরনো দিনের আড্ডা আর বৈদগ্ধের এক নীরব সম্প্রসারণ। যদিও আমরা আজ যোজন যোজন দূরে এবং ভিন্ন ভিন্ন পরিসরে বন্দি, কিন্তু আমাদের চিন্তা ও আদর্শের যে সুতো, তা কোনো রাজশক্তিই ছিঁড়ে ফেলতে পারেনি।

পরিশেষে, আমি এই খাতাটি গুছিয়ে রাখছি। আমার এই সফর শেষ হলো। কারাগারের ফটক যখন একদিন খুলবে, তখন এই পাণ্ডুলিপিটিই হবে আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদ যা আমি বাইরের পৃথিবীতে নিয়ে যাব। আমি আমার বন্ধুর কাছে এই ‘মনের ধুলিকণা’গুলো পৌঁছে দিতে চাই, কারণ তিনি জানেন কীভাবে ধুলোর নিচ থেকে হীরা চিনে নিতে হয়। জীবনের এই দীর্ঘ পথচলায় আমি অনেক কিছু হারিয়েছি, কিন্তু এমন বন্ধু আর এমন সত্যের প্রতি অবিচল বিশ্বাস কোনোদিন হারাইনি। আমার কাজ আজ এখানেই পূর্ণতা পেল। সত্যের জয় হোক।

ব্যক্তিগত পত্র ও সামষ্টিক সত্য

অনেকে হয়তো প্রশ্ন করতে পারেন, কেন আমি আমার জীবনের এই গুরুত্বপূর্ণ সময়টিকে কেবল চিঠিপত্র লেখার মাধ্যমে ব্যয় করলাম। এর উত্তর অত্যন্ত সরল—মানুষের হৃদয়ের সবচেয়ে গভীর কথাগুলো কেবল ব্যক্তিগত আলাপচারিতার মাধ্যমেই প্রকাশিত হয়। যখন আমি সদর ইয়ার জং-এর উদ্দেশ্যে লিখি, তখন আমি কোনো জনসভার বক্তা নই, বরং আমি একজন অতি সাধারণ মানুষ যে তার বন্ধুর কাছে নিজের আত্মা উন্মোচন করছে। এই ব্যক্তিগত গণ্ডির ভেতরেই সামষ্টিক সত্যগুলো সবচেয়ে স্বচ্ছভাবে ফুটে ওঠে।

আহমেদনগর দুর্গের এই কক্ষটি এখন নিস্তব্ধতায় ডুবে আছে। আমি যখন আমার এই পাণ্ডুলিপির শেষ পৃষ্ঠাগুলোতে চোখ বুলাই, তখন দেখতে পাই এখানে কেবল একজন বন্দির হাহাকার নেই, বরং আছে এক চিরন্তন মুক্তির আকাঙ্ক্ষা। প্রতিটি বাক্য যেন এক একটি ইটের মতো, যা দিয়ে আমি আমার চিন্তার এক বিশাল প্রাসাদ নির্মাণ করেছি। এই প্রাসাদটি ভাঙার ক্ষমতা কোনো পার্থিব শক্তির নেই। কারাগারের অন্ধকার আমাকে শিখিয়েছে যে, চোখের আলো নিভে গেলেও যদি প্রজ্ঞার আলো জ্বলে ওঠে, তবে অন্ধকারই সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়ায়।

আমি লক্ষ্য করেছি, যখন আমরা কোনো বিশাল কর্মযজ্ঞের সাথে যুক্ত থাকি, তখন আমরা আমাদের নিজেদের ক্ষুদ্র অনুভূতিগুলোকে ভুলে যাই। কিন্তু এই কারাবাস আমাকে সেই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোর সাথে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। ভোরের এক কাপ চা, বাগানের একটি ফুটে থাকা ফুল, কিংবা সহবন্দিদের সাথে কাটানো এক মুহূর্তের হাসি—এগুলোই এখন আমার কাছে জীবনের বড় সার্থকতা। বড় বড় রাজনৈতিক বিপ্লব হয়তো সমাজ পরিবর্তন করে, কিন্তু এই ছোট ছোট উপলব্ধিগুলোই মানুষকে ভেতর থেকে বদলে দেয়।

পরিশেষে, আমি আমার এই লেখনীকে সমাপ্তির দিকে নিয়ে যাচ্ছি। আমি জানি, এই শব্দগুলো একদিন হাজারো মানুষের হৃদয়ে প্রতিধ্বনিত হবে। যারা সত্যের সন্ধানে ঘুরে বেড়াচ্ছে, তারা এই ‘গুবার-এ-খাতির’-এর মাঝে খুঁজে পাবে এক বন্ধুর হাত। জীবনের এই সফরটি ছিল অসম্ভবের সাথে লড়াই করার এক দীর্ঘ কাহিনী। আমি আমার কলমটি আজ থামিয়ে দিচ্ছি এই বিশ্বাসে যে, আমার এই নীরবতা একদিন অনেক বেশি বাচাল হয়ে উঠবে এবং সেই সত্যকে তুলে ধরবে যা আমি এই কারাগারে বসে লালন করেছি। এখন সময় হয়েছে নিজেকে প্রস্তুত করার এক অনাগত ভবিষ্যতের জন্য। সত্যের আলোকবর্তিকা কোনোদিন নিভে যায় না।

অভিজ্ঞতার নির্যাস ও অন্তিম সমাপ্তি

জীবনের এই দীর্ঘ পরিক্রমায় আমি দেখেছি যে, মানুষ যা হারায় তার চেয়ে যা অর্জন করে তা অনেক সময় অদৃশ্য থাকে। আহমেদনগর দুর্গের এই তিন বছরের কারাবাস বাহ্যিকভাবে আমার জীবন থেকে সময় কেড়ে নিয়েছে ঠিকই, কিন্তু বিনিময়ে আমাকে দিয়েছে এক অপরিমেয় মানসিক স্থিরতা। আমি যখন আমার এই পাণ্ডুলিপিটি শেষবারের মতো গুছিয়ে নিচ্ছি, তখন আমার মনে হচ্ছে আমি কেবল কারাগার থেকে মুক্তি পাচ্ছি না, বরং আমি আমার জীবনের এক দীর্ঘ পরীক্ষা থেকে উত্তীর্ণ হয়ে বের হচ্ছি। সত্যের জন্য লড়াই করা যতটা কঠিন, সেই লড়াইয়ের মাঝে নিজেকে শান্ত রাখা তার চেয়েও বেশি কঠিন।

আমি জানি, এই লেখাগুলো যখন বাইরের জগতের আলো দেখবে, তখন অনেকে হয়তো এখানে কেবল দার্শনিক তত্ত্ব খুঁজে পাবেন। কিন্তু আমার কাছে এই প্রতিটি পৃষ্ঠা হলো এক একটি নির্ঘুম রাতের সাক্ষী। যখন পুরো দুর্গ নিস্তব্ধতায় ডুবে যেত, তখন কেবল আমার কলমের খসখস শব্দ আর আমার হৃদস্পন্দন শোনা যেত। সেই মুহূর্তগুলোতে আমি অনুভব করেছি যে, ঈশ্বর বা পরম সত্য কেবল মন্দিরে বা মসজিদে নয়, বরং মানুষের একাকীত্বের গভীরেই বাস করেন। আমি সেই একাকীত্বকে ভয় পাইনি, বরং তাকে আলিঙ্গন করেছি।

আমাদের এই সংগ্রামের পথ হয়তো আরও দীর্ঘ হবে। স্বাধীনতা কেবল একটি পতাকা পরিবর্তনের নাম নয়, এটি হলো মানুষের চিন্তার মুক্তি। আমি আমার এই ‘গুবার-এ-খাতির’-এর মাধ্যমে সেই মুক্তির বীজ বপন করতে চেয়েছি। যদি আমার এই শব্দগুলো কারো মনে সামান্যতম সাহসের সঞ্চার করে, তবেই আমি মনে করব আমার এই বন্দিত্ব সার্থক হয়েছে। ইতিহাসের পাতায় আমাদের নাম থাকুক বা না থাকুক, আমাদের আদর্শ যেন বেঁচে থাকে—এটিই আমার শেষ প্রার্থনা।

এখন বিদায়ের ঘণ্টা বাজছে। আমি আমার কলমটি তুলে রাখলাম। আহমেদনগর দুর্গের এই কক্ষটি এখন আবার শূন্য হয়ে যাবে, কিন্তু এখানকার বাতাসে আমার চিন্তাগুলো মিশে থাকবে চিরকাল। যারা আগামী দিনে এই পথে আসবে, তারা যেন অনুভব করতে পারে যে এখানে একজন মানুষ বসেছিল যে কোনোদিন বাতিলের কাছে মাথা নত করেনি। জীবনের এই অধ্যায়টি এখানেই শেষ হলো, কিন্তু সত্যের অনন্ত যাত্রা চলতেই থাকবে। ইতি।

পাণ্ডুলিপির মোহর ও মহাকালের নীরবতা

“আজ যখন আমি এই ডায়েরির শেষ পৃষ্ঠায় কলম রাখছি, তখন আহমেদনগর দুর্গের আকাশ এক অদ্ভুত শান্ত নীল রঙ ধারণ করেছে। মনে হচ্ছে, প্রকৃতিও আমার এই দীর্ঘ নিরবচ্ছিন্ন সংলাপের সমাপ্তি বুঝতে পেরেছে। এই ২৭৯টি পৃষ্ঠা কেবল কাগজ নয়, এগুলো আমার জীবনের সেই মূল্যবান মুহূর্তগুলোর সমাধি, যেখানে আমি নিজেকে তিলে তিলে চিনেছি। আমি যখন প্রথম দিন এই দুর্গে প্রবেশ করেছিলাম, তখন আমার মনে যে অস্থিরতা ছিল, আজ তা এক অতল সাগরের প্রশান্তিতে রূপ নিয়েছে। মানুষের আত্মা যখন সত্যের স্পর্শ পায়, তখন তার কাছে বন্দিত্ব আর মুক্তি একই অর্থের নামান্তর হয়ে দাঁড়ায়।

আমি জানি, এই লেখাগুলো যখন মাওলানা হাবিবুর রহমান খান শেরওয়ানির হাতে পৌঁছাবে, তখন হয়তো ভারতের আকাশ থেকে পরাধীনতার মেঘ কাটতে শুরু করবে। কিন্তু এই লেখাগুলোর গুরুত্ব কেবল সেই সময়ের জন্য নয়; এটি মানুষের চিরন্তন অন্তরাত্মার আরশি। আমি চেয়েছি মানুষ যেন আমার এই একাকীত্বের মাঝে নিজেদের শক্তি খুঁজে পায়। কারাগারের এই বছরগুলো আমাকে শিখিয়েছে যে, যখন বাইরের সব দরজা বন্ধ হয়ে যায়, তখনই ভেতরের আসল দরজাটি খুলে যায়। আমি সেই দরজা দিয়ে এমন এক জগতের সন্ধান পেয়েছি যেখানে কোনো শাসক নেই, কোনো বিচারক নেই—আছে কেবল এক পরম সত্তার নিরবচ্ছিন্ন অস্তিত্ব।

আমার এই ‘গুবার-এ-খাতির’ বা হৃদয়ের ধুলিকণাগুলো এখন বাতাসে মিশে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত। আমি আমার কলমটি সযত্নে তুলে রাখছি। এই ক্ষুদ্র কাষ্ঠখণ্ডটি আমার যে সেবা করেছে, তা পৃথিবীর কোনো তলোয়ার করতে পারত না। এটি আমার চিন্তাগুলোকে অমরত্ব দিয়েছে। আমি এখন প্রস্তুত এই কক্ষটি ত্যাগ করতে। যখন আমি এই দেওয়ালগুলোর দিকে শেষবারের মতো তাকাই, তখন আমার মনে কোনো ঘৃণা নেই, বরং এক ধরণের বিষণ্ণ কৃতজ্ঞতা কাজ করছে। এই নির্জনতা আমাকে যা দিয়েছে, রাজপ্রাসাদের বিলাসিতা তা কোনোদিন দিতে পারত না।

পরিশেষে, আমি আমার পাঠকদের উদ্দেশ্যে বলব—জীবন ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু সত্য চিরস্থায়ী। আমরা থাকব না, কিন্তু আমাদের এই আত্মত্যাগ আর চিন্তার ফসল আগামী প্রজন্মের জন্য আলোকবর্তিকা হয়ে থাকবে। আমি আমার দায়িত্ব শেষ করেছি। এখন সময় হয়েছে মৌনতার অতলে হারিয়ে যাওয়ার, কারণ কিছু সত্য কেবল নীরবতা দিয়েই প্রকাশ করা যায়। খোদা হাফেজ, আহমেদনগর; খোদা হাফেজ, আমার নিঃসঙ্গ সাথী কলম।

পাণ্ডুলিপির সমাপ্তি ও ইতিহাসের দায়বদ্ধতা

আজ পাণ্ডুলিপিটি চূড়ান্তভাবে গুছিয়ে নেওয়ার দিন। আহমেদনগর দুর্গের এই তিন বছরের কারাজীবনে আমার কলম থেকে নিঃসৃত প্রতিটি বিন্দু আজ এই খাতাগুলোতে জমা হয়েছে। আমি যখন শেষ পৃষ্ঠাটি ওল্টাচ্ছি, তখন আমার মনে হচ্ছে আমি কেবল একটি বই শেষ করছি না, বরং আমার জীবনের এক অত্যন্ত কঠিন অথচ মহিমান্বিত অধ্যায়ের ইতি টানছি। এই ২৭৯-২৮০ পৃষ্ঠার ভেতরে যে কত শত বিনিদ্র রজনী, কত হাজারো চিন্তার আবর্তন এবং কত গভীর একাকীত্ব মিশে আছে, তা কেবল এই দেয়ালগুলোই জানে।

অনেকে মনে করেন কারাগার মানেই সময়ের অপচয়। কিন্তু আমি এই কারাগারে বসেই সময়ের প্রকৃত মূল্য বুঝতে পেরেছি। যখন মানুষ বাইরের জগতের সমস্ত কোলাহল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তখনই সে ইতিহাসের প্রকৃত পদধ্বনি শুনতে পায়। আমি অনুভব করছি, ভারতবর্ষের রাজনৈতিক ভাগ্য আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। আমরা যারা এই দুর্গের ভেতরে বন্দি ছিলাম, আমরা হয়তো বাইরের ঘটনার প্রবাহকে সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি, কিন্তু আমাদের এই মানসিক দৃঢ়তা আর এই লেখনীগুলো আগামী দিনের স্বাধীন ভারতের বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি তৈরি করবে। সত্যের জন্য যে কোনো ত্যাগই শেষ পর্যন্ত বৃথা যায় না।

আমি আমার এই পাণ্ডুলিপিটি নবাব সদর ইয়ার জং-এর উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করছি। এটি কেবল একটি উপহার নয়, এটি হলো এক বন্ধুর প্রতি অন্য বন্ধুর হৃদয়ের আর্তি। আমি জানি না এই পাণ্ডুলিপিটি কবে দিনের আলো দেখবে, কিন্তু আমি নিশ্চিত যে—যখনই এটি প্রকাশিত হবে, মানুষ বুঝতে পারবে যে শিকল দিয়ে কেবল দেহকে বাঁধা যায়, মানুষের প্রতিভাকে নয়। জীবনের এই দীর্ঘ সফরে আমি অনেক চড়াই-উতরাই দেখেছি, কিন্তু আহমেদনগর দুর্গের এই নিঃসঙ্গতা আমাকে যে প্রজ্ঞা দিয়েছে, তা আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদ।

পরিশেষে, আমি আমার কলমটি আজ চূড়ান্তভাবে নামিয়ে রাখছি। আমার যা বলার ছিল, তা আমি অত্যন্ত বিশ্বস্ততার সাথে লিখেছি। এখন এই শব্দগুলোর যাত্রা শুরু হবে মানুষের হৃদয়ে। ইতিহাসের বিশাল ক্যানভাসে আমাদের এই সময়টি হয়তো একটি বিন্দুর মতো, কিন্তু সেই বিন্দুর ভেতরেই লুকিয়ে আছে আগামী দিনের সিন্ধু। আমি এক পরম তৃপ্তি নিয়ে এই কক্ষটি ত্যাগ করার প্রস্তুতি নিচ্ছি। অন্ধকার ফুরিয়ে আসছে, ভোরের আলো ফুটতে আর বেশি দেরি নেই। শান্তি বর্ষিত হোক সেইসব আত্মার ওপর যারা সত্যের পথে অবিচল থাকে।

এখন আর নতুন করে কিছু বলার নেই। যা কিছু অন্তরের গহীনে ছিল, তার সবটুকুই এই খাতাগুলোর পাতায় ছড়িয়ে দিয়েছি। জীবনের এই দীর্ঘ সফরে আমি এই সত্যটিই বারবার উপলব্ধি করেছি যে—চিন্তার জগতই হলো মানুষের আসল বিচরণভূমি। শরীরের ওপর যে জুলুম বা যে সীমাবদ্ধতা চাপিয়ে দেওয়া হয়, তা কেবল বাইরের খোলসকে স্পর্শ করে; ভেতরের যে মানুষটি চিন্তা করে, যে স্বপ্ন দেখে, তার কাছে কোনো পৌঁছানোর সাধ্য কারো নেই। আহমেদনগর দুর্গের এই তিন বছর আমাকে সেই অপরাজেয় সত্তার সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে।

আমি যখন এই দিনলিপির ইতি টানছি, তখন আমার হৃদয়ে কোনো প্রকার ভার নেই। যেন এক দীর্ঘ ভ্রমণের পর আমি এক প্রশান্ত কিনারে এসে দাঁড়িয়েছি। মাওলানা হাবিবুর রহমান খান শেরওয়ানির কাছে এই পত্রাবলি পাঠানো আমার জন্য কেবল একটি দায়িত্ব ছিল না, বরং এটি ছিল আমার নিজের অস্তিত্বের এক ধরণের সম্প্রসারণ। আমি জানি, তিনি যখন এই পৃষ্ঠাগুলো পড়বেন, তখন তিনি সেই নির্জন রাতের নিঃশব্দ হাহাকার এবং সেই সাথে বিজয়ের আনন্দ—উভয়ই অনুভব করতে পারবেন।

মানুষের জীবন এক বহমান স্রোতের মতো। আজ আমরা যেখানে আছি, কাল সেখানে অন্য কেউ থাকবে। কিন্তু আমাদের এই সংগ্রাম, এই চিন্তার বিবর্তন এবং সত্যের প্রতি এই অবিচল নিষ্ঠা—এগুলোই ইতিহাসের প্রকৃত সম্পদ হিসেবে টিকে থাকবে। কারাগারের এই বছরগুলো আমাদের শরীর থেকে কিছুটা জেল্লা হয়তো কেড়ে নিয়েছে, কিন্তু আমাদের আত্মাকে করেছে শাণিত এবং পবিত্র।

পরিশেষে, আমি এইটুকুই বলব—অন্ধকার যতই দীর্ঘ হোক না কেন, ভোরের প্রথম সূর্যরশ্মি তাকে পরাজিত করবেই। আমি সেই ভোরের অপেক্ষায় আমার কলমকে বিশ্রাম দিচ্ছি। আমার মনের ধুলিকণা বা ‘গুবার’ আজ থিতু হয়েছে। এখন কেবল এক নির্মল প্রশান্তি অবশিষ্ট আছে। সত্যই সুন্দর এবং সত্যই অবিনশ্বর।

এখন আর কলম চালানোর কোনো অবকাশ অবশিষ্ট নেই। হৃদয়ের সমস্ত ধুলিকণা (গুবার) এই কাগজের বুকে ঝরিয়ে দিয়ে আজ আমি এক অদ্ভুত হালকা বোধ করছি। মাওলানা! (হাবিবুর রহমান খান শেরওয়ানিকে সম্বোধন করে) মানুষের জীবনের ট্র্যাজেডি এই নয় যে সে মরণশীল, বরং ট্র্যাজেডি হলো এই যে সে তার ভেতরের অসীমতাকে চিনতে পারে না। এই কারাগার আমাকে সেই অসীমতার আস্বাদ দিয়েছে। আমি যখন এই পাণ্ডুলিপিটি শেষ করছি, তখন আমার চারপাশের এই পাথুরে দেয়ালগুলোকেও আমার আর শত্রু মনে হচ্ছে না; মনে হচ্ছে এরা আমার সেই মৌন সাধনার দীর্ঘদিনের সাক্ষী।

আমি জানি না, এই লেখাগুলো যখন আপনার হাতে পৌঁছাবে, তখন দুনিয়ার পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে। কিন্তু আমি এটুকু নিশ্চিত করে বলতে পারি—পাহাড় যেমন তার জায়গায় স্থির থাকে, সত্যের স্বরূপও তেমনি অপরিবর্তনীয়। এই চিঠিগুলো কেবল আপনার আর আমার মধ্যকার ব্যক্তিগত আলাপ নয়, এগুলো এক বন্দি আত্মার মুক্তির চিৎকার, যা ইতিহাসের কান দিয়ে ভবিষ্যতে প্রতিধ্বনিত হবে।

এখন বিদায় নেওয়ার পালা। আমার কলম আজ ক্লান্ত, আমার কালি শেষ হয়ে এসেছে, কিন্তু আমার হৃদয়ের সেই আগুন এখনও অম্লান যা আমাকে এই দীর্ঘকাল হাসিমুখে বাঁচিয়ে রেখেছিল। অন্ধকার ফুরিয়ে আসছে, আর ভোরের প্রথম আলো দরজায় কড়া নাড়ছে। এখন সময় হয়েছে মৌনতার অতলে ডুবে যাওয়ার। ঈশ্বর আপনাদের সহায় হোন।

ইতি, আপনার আবুল কালাম।

 

মওলানা আবুল কালাম আজাদের ‘গুবারে খাতির’ আমাদের শেখায় যে, শরীরকে আহমেদনগর দুর্গের দেয়াল দিয়ে বন্দি করা গেলেও মানুষের চিন্তাশক্তি ও ‘রূহ’-কে কোনো শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা যায় না। তিনি তাঁর মনের আয়নায় জমে থাকা দুনিয়াবি কোলাহলের ধুলো (Ghubar) ঝেড়ে ফেলে যে সত্যের সন্ধান পেয়েছিলেন, তা-ই আজ আমাদের জন্য ‘মশা’ল-এ-রাহ’ বা আলোকবর্তিকা।

মওলানা আজাদ লিখেছিলেন:

“আমি আমার জীবনের সেরা সময়গুলো একাকীত্বের মধ্যে কাটিয়েছি, আর সেই ‘উজলাত’-ই আমাকে আমার প্রকৃত সত্তার সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে।”

আল্লাহ তাঁকে তাঁর উচ্চতর ‘মাকাম’ দান করুন। তাঁর এই ‘শাকসিয়্যাত’ এবং তাঁর এই ‘মিশালি’ জীবন আমাদের জন্য এক চিরন্তন অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে। আজাদের সেই হৃদয়ের ধুলিকণাগুলো আজও প্রতিটি স্বাধীনচেতা মানুষের মনে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে।

আরও দেখুন: