মুসলিম পারিবারিক আইন ১৯৬১ যে কারণে ইসলামিক শরিয়াহ বিরোধী | ইসলাম ও মুসলিম সিরিজ

এই লেখাটি আমি প্রধানত তাঁদের উদ্দেশ্যে লিখছি যাঁরা ‘তাকলিদ’ বা প্রথাগত অন্ধ অনুকরণের নীতিতে বিশ্বাসী। অর্থাৎ, যাঁরা মনে করেন পবিত্র কুরআন, হাদিস ও ইজমায় যা কিছু সুনির্দিষ্ট ও নির্ধারিত হয়েছে, তার প্রতিটি বিধানই হুবহু মানতে হবে—সেখানে কোনো ধরনের পরিবর্তন বা পরিমার্জন করা যাবে না। স্থান, কাল কিংবা পাত্র যাই হোক না কেন, শরিয়াহর চিরন্তন রূপটিই তাঁদের কাছে একমাত্র গ্রহণযোগ্য।

এই লেখাটি তথাকথিত “আহলে চয়েস” বা সুবিধাবাদী মুসলিমদের জন্য নয়; যাঁরা নিজেদের সুবিধা অনুযায়ী কুরআন-হাদিসের কিছু অংশ মানেন আর অসুবিধা হলে তা এড়িয়ে যান। এমনকি আমার মতো যাঁরা মনে করেন যুগের চাহিদার সাথে সাথে সামাজিক নিয়মের সংশোধন প্রয়োজন, এই লেখাটি তাঁদের জন্যও নয়।

যাঁরা যুগের পরিবর্তনের সাথে সাথে দ্বীনের আইনি পরিবর্তনকে সানন্দে মেনে নিয়েছেন, তাঁদের নিয়ে নতুন করে কিছু লেখার প্রয়োজন বোধ করছি না। তবে বিষ্ময়ের জায়গাটি অন্যখানে। যাঁরা শরিয়াহর আইনগত পরিবর্তনকে তাত্ত্বিকভাবে পুরোপুরি অস্বীকার করেন, তাঁদের পক্ষে কোনোভাবেই ১৯৬১ সালের এই পারিবারিক আইনটি মুখ বুজে মেনে নেওয়ার কথা ছিল না। অথচ বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, তাঁরা এটি মেনে নিয়েছেন এবং এ বিষয়টি নিয়ে এখন আর তেমন কোনো উচ্চবাচ্য করেন না। এর চেয়েও অনেক তুচ্ছ বা সাধারণ (ট্রিভিয়াল) ধর্মীয় ইস্যু নিয়ে মাঠ গরম করলেও, এত বড় একটি বিষয়ে তাঁদের কোনো জোরালো বক্তব্য নেই। মূলত তাঁদের এই নীরবতা ও মনস্তাত্ত্বিক ভণ্ডামিকে প্রশ্নবিদ্ধ করতেই আমার এই লেখা।

আমার সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন হচ্ছে—মুসলিম পারিবারিক আইন ১৯৬১ যদি প্রচলিত ইসলামিক শরিয়াহর এত বড় লঙ্ঘন ও শরিয়াহবিরোধী হয়ে থাকে, তবে ইসলামের এই প্রকাশ্য অবমাননার বিরুদ্ধে তাঁরা বুদ্ধিবৃত্তিক বা আইনি সংগ্রাম (জিহাদ) করে এটি পরিবর্তনের চেষ্টা করছেন না কেন? এত বড় একটি মৌলিক ইস্যু চোখের সামনে থাকতে, তাঁরা কেন কেবলই প্রান্তিক ও তুচ্ছ বিষয়গুলো নিয়ে আন্দোলন করে সময় পার করছেন?

Table of Contents

১/ ক্ষমতার সমীকরণ: বন্দুকের নলের সামনে আপস বনাম গণতন্ত্রের ঘাড়ে চেপে বসা

ইতিহাস ও বর্তমানের বাস্তবতাকে যদি অত্যন্ত নির্মোহভাবে বিশ্লেষণ করা হয়, তবে আমাদের সমাজের তথাকথিত ‘শরিয়াহর অতন্দ্র প্রহরী’ দাবিদারদের একটি চরম মনস্তাত্ত্বিক ভণ্ডামি ও সুবিধাবাদ উন্মোচিত হয়। ১৯৬১ সালের এই পারিবারিক আইনটি যখন পাস হয়েছিল, তখন পাকিস্তানের মসনদে কোনো নির্বাচিত বা গণতান্ত্রিক সরকার ছিল না। ক্ষমতায় ছিলেন কট্টর সামরিক আইন প্রশাসক ও একনায়ক ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান।

আইয়ুব খান কোনো আলোচনা, সংসদীয় বিতর্ক বা ওলামাদের সাথে আপসের ধার ধারেননি। তিনি সামরিক ডিক্রি বা বুটের তলা দিয়ে প্রথাগত আলেমদের সমস্ত ফতোয়া ও ধর্মীয় অনুভূতিকে পিষে ফেলে এই অধ্যাদেশ জারি করেছিলেন। সবচেয়ে লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো, যে আলেম সমাজ ও ধর্মীয় রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের ‘আল্লাহর আইনের একমাত্র রক্ষক’ বলে দাবি করেন, তাঁরা আইয়ুব খানের সেই বন্দুকের নলের সামনে টু শব্দটিও করার সাহস পাননি। সামরিক জান্তার কঠোর চাবুক, জেল-জুলুম আর শাস্তির ভয়ে তাঁরা অত্যন্ত সুবোধ বালকের মতো এই ‘লা-শরিয়তি’ আইনকে হজম করে নিয়েছিলেন। আজ দীর্ঘ ছয় দশক পার হয়ে গেলেও পাকিস্তান বা বাংলাদেশ—কোনো দেশের কট্টরপন্থী ওলামা বা ইসলামী দলগুলো এই আইন সম্পূর্ণ বাতিলের দাবিতে কোনো রাজপথ কাঁপানো গণআন্দোলন গড়ে তোলেননি।

অথচ, এই একই গোষ্ঠীর চরিত্র সম্পূর্ণ বদলে যায় যখন কোনো ‘সফট’, উদারপন্থী বা গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় থাকে। যেহেতু গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় নাগরিক অধিকার থাকে, বাক-স্বাধীনতা থাকে এবং সরকার দমনপীড়নের চেয়ে আলোচনার পথ বেছে নেয়, ঠিক তখনই এই মৌলভিরা সরকারের সেই ভদ্রতা, পরমতসহিষ্ণুতা ও আইনি নমনীয়তাকে পুঁজি করে তাদের ঘাড়ে চড়ে বসে। তখন সামান্য কোনো পাঠ্যপুস্তকের শব্দ, কোনো ভাস্কর্য, কোনো কবির কবিতা কিংবা কোনো তুচ্ছ (ট্রিভিয়াল) সামাজিক ইস্যুকে কেন্দ্র করে তাঁরা দেশজুড়ে হরতাল, ভাঙচুর, রাজপথ অবরোধ ও জ্বালাও-পোড়াওয়ের মতো উগ্র আন্দোলন গড়ে তোলেন।

ঘরের ভেতরে ১৯৬১ সালের আইনের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত কুরআন ও হাদিসের অকাট্য বিধানের যে তীব্র লঙ্ঘন (ভায়োলেশন) চলছে, তা নিয়ে তাঁদের কোনো মাথাব্যথা নেই। কারণ তাঁরা খুব ভালো করেই জানেন, ক্ষমতাশালী ও নিষ্ঠুর সামরিক শাসকের বন্দুকের নলের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর চেয়ে একটি সহনশীল ও দুর্বল গণতান্ত্রিক সরকারকে ব্লাকমেইল করা অনেক সহজ, নিরাপদ এবং রাজনৈতিকভাবে লাভজনক। এই সুবিধাবাদী দ্বিচারিতাই প্রমাণ করে যে, তাঁদের ধর্মরক্ষা আসলে কোনো ঈমানী বা আদর্শিক লড়াই নয়, বরং ক্ষমতার একটি নোংরা ও ভণ্ড সমীকরণ মাত্র।

২/ ঐতিহাসিক পটভূমি ও রাজনৈতিক মোটিফ (১৯৫৫-১৯৬১)

১৯৬১ সালের এই আইনের জন্ম কোনো আকস্মিক আইনি বা তাত্ত্বিক গবেষণার ফসল ছিল না। এর পেছনে ছিল পাকিস্তানের তৎকালীন উচ্চবিত্ত, সামরিক আমলাতন্ত্র ও শাসক শ্রেণীর এক গভীর ব্যক্তিগত, রাজনৈতিক ও পারিবারিক সংকট। এই ইতিহাসের সূচনা হয় ১৯৫৫ সালে, পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী বগুড়ার একটি ব্যক্তিগত ও বিতর্কিত পারিবারিক সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে।

প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী বগুড়ার দ্বিতীয় বিয়ে এবং সামাজিক তোলপাড়

১৯৫৫ সালে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী বগুড়া তাঁর প্রথম স্ত্রী হামিদা বগুড়া জীবিত থাকা সত্ত্বেও তাঁর চেয়ে বয়সে অনেক ছোট যুবতী সেক্রেটারি আলিয়া সাদ্দিকে দ্বিতীয় বিয়ে করেন। এই ঘটনাটি তৎকালীন পাকিস্তানের পশ্চিমাঘেঁষা উচ্চবিত্ত সমাজ, বিশেষ করে অভিজাত ও রাজনৈতিক অঙ্গনের নারীদের মধ্যে এক তীব্র ক্ষোভ ও আতঙ্কের জন্ম দেয়। তৎকালীন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ও প্রভাবশালী সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তাদের স্ত্রীদের দ্বারা পরিচালিত ‘অল পাকিস্তান উইমেনস অ্যাসোসিয়েশন’ (APWA – এপোয়া) এই বিয়ের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে এক অভূতপূর্ব ও আক্রমণাত্মক আন্দোলন শুরু করে।

এপোয়া (APWA)-এর এই আন্দোলনের মূল দাবি ছিল, মুসলিম পুরুষদের বহুবিবাহ করার যে অবাধ অধিকার শরিয়াহ দিয়েছে, আইন করে তা অবিলম্বে বন্ধ বা সীমিত করতে হবে। তাঁরা মোহাম্মদ আলী বগুড়ার এই বিয়েকে কেন্দ্র করে রাজপথে নেমে আসেন এবং তৎকালীন লবিস্ট গ্রুপগুলোর মাধ্যমে সরকারের ওপর তীব্র মানসিক ও রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করেন। এই তীব্র নারীবাদী ও আধুনিকতাবাদী আন্দোলনের মুখে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার বাধ্য হয়ে একটি আইনি কমিশন গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়।

জাস্টিস আব্দুর রশিদের ‘রশিদ কমিশন’ গঠন ও আলেমদের অন্তর্ভুক্তি

আন্দোলনের তীব্রতা প্রশমিত করতে ১৯৫৫ সালের আগস্ট মাসে পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্টের সাবেক প্রধান বিচারপতি স্যার আব্দুর রশিদের নেতৃত্বে ‘পারিবারিক আইন বিষয়ক সাত সদস্যের একটি তদন্ত কমিশন’ গঠন করা হয়, যা ইতিহাসে ‘রশিদ কমিশন’ নামে পরিচিত। এই Commissions-এর সাতজন সদস্যের মধ্যে ছয়জনই ছিলেন পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত এবং আধুনিকতাবাদী ভাবাদর্শের অনুসারী। এদের মধ্যে তিনজন ছিলেন নারী সদস্য, যাঁরা প্রথম থেকেই ঐতিহ্যবাহী ইসলামী পারিবারিক ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের পক্ষে সোচ্চার ছিলেন।

কমিশনের এই আধুনিকতাবাদী ভারসাম্য বজায় রাখতে এবং সাধারণ মুসলিম জনগণের ক্ষোভ এড়াতে ধর্মীয় প্রতিনিধি হিসেবে তৎকালীন সময়ের অন্যতম প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ ও হানাফি ফিকহ শাস্ত্রের পণ্ডিত মাওলানা এহতেশামুল হক থানভীকে (বিখ্যাত আলেম আশরাফ আলী থানভীর শাগরেদ ও ভাতিজা) অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

রশিদ কমিশন ১৯৫৬ সালে তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। এই প্রতিবেদনে কমিশনের ছয়জন আধুনিকতাবাদী সদস্য পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহর ঐতিহ্যবাহী ব্যাখ্যাকে তোয়াক্কা না করে বিয়ে, তালাক ও মিরাসের নিয়মে বড় ধরনের পরিবর্তনের সুপারিশ করেন। তাঁরা দাবি করেন যে, যুগের পরিবর্তনের সাথে সাথে শরিয়াহর নিয়মও বদলে ফেলা উচিত।

মাওলানা এহতেশামুল হক থানভীর ঐতিহাসিক ‘নোট অব ডিসেন্ট’

কমিশনের এই চরম আধুনিকতাবাদী এবং শরিয়াহর মূল ভিত্তি ওলটপালট করে দেওয়ার মতো সুপারিশ দেখে মাওলানা এহতেশামুল হক থানভী আপত্তি প্রকাশ করেন। তিনি কমিশনের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের তৈরি করা মূল প্রতিবেদনের সাথে একমত হতে অস্বীকার করেন এবং এর বিরুদ্ধে একটি দীর্ঘ ও ‘নোট অব ডিসেন্ট’ (Note of Dissent) বা ভিন্নমতের দলিল পেশ করেন।

মাওলানা থানভী তাঁর এই ভিন্নমতের দলিলে অত্যন্ত শক্তিশালি আইনি ও ধর্মীয় যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করেন যে, Commissions-এর প্রস্তাবিত সুপারিশগুলোর প্রতিটি ধারা সরাসরি পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহর স্পষ্ট লঙ্ঘনের শামিল। তিনি সতর্ক করে দেন যে, যদি এই সুপারিশগুলো আইনে রূপ দেওয়া হয়, তবে তা মুসলিম সমাজকে আল্লাহর দেওয়া শরিয়াহ থেকে বিচ্যুত করে এক চরম ফেতনার দিকে ঠেলে দেবে।

মাওলানা থানভীর অবস্থান এবং দেশজুড়ে আলেমদের প্রাথমিক প্রতিরোধের মুখে তৎকালীন বেসামরিক ও গণতান্ত্রিক সরকারগুলো এই বিতর্কিত প্রতিবেদনটি আইনে রূপ দেওয়ার সাহস পায়নি। ফলে ১৯৫৬ থেকে ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত এই প্রস্তাবিত আইনটি আমলাতন্ত্রের ফাইলের ভেতরেই চাপা পড়ে থাকে।

আইয়ুব খানের সামরিক অভ্যুত্থান এবং ডিক্রি জারি

১৯৫৮ সালের অক্টোবর মাসে জেনারেল আইয়ুব খান সামরিক আইন জারির মাধ্যমে পাকিস্তানের ক্ষমতা দখল করেন। আইয়ুব খান নিজেকে একজন কট্টর আধুনিকতাবাদী ও প্রগতিশীল শাসক হিসেবে বিশ্বমঞ্চে প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন। তাঁর মূল রাজনৈতিক এজেন্ডা ছিল পাকিস্তানের রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থা থেকে আলেম সমাজের প্রভাব চিরতরে মুছে ফেলা।

আইয়ুব খান দেখলেন যে, আলেমদের আপত্তির কারণে ঝুলে থাকা রশিদ কমিশনের এই প্রতিবেদনটিকে যদি তিনি ডিক্রি জারির মাধ্যমে আইনে রূপ দিতে পারেন, তবে তিনি একই সাথে পশ্চিমা দুনিয়ার বাহবা পাবেন এবং পাকিস্তানের প্রভাবশালী প্রগতিশীল ও নারীবাদী সংগঠনগুলোর পূর্ণ সমর্থন লাভ করবেন।

যেহেতু তখন দেশে কোনো সংসদ ছিল না, কোনো গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতা ছিল না, তাই আলেম সমাজের কোনো ভয় আইয়ুব খানের ছিল না। তিনি ওলামাদের সমস্ত ফতোয়া ও আপত্তিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে, ১৯৬১ সালের ২রা মার্চ এক সামরিক অধ্যাদেশ বা ডিক্রির মাধ্যমে ‘মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১’ জারি করেন। এই ডিক্রির মাধ্যমেই দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে প্রথমবারের মতো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার জোরে কুরআন-সুন্নাহর প্রতিষ্ঠিত শরিয়াহ আইনকে বাইপাস করে এই আইন পাশ করা হয়।

সবচেয় ইন্টারেস্টিং বিষয় হলো কুরান হাদিসের এত বড় অবমাননার পরেও কোন আলেম বা তাদের সাগরেদ রাজপথে রক্ত দেওয়া, পুলিশের গুলিতে নিহত হওয়া বা ফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার মতো কোনো উদ্যোগ নেননি।

৩/ উৎস ও দর্শনের সংঘাত (Jurisprudential Conflict)

১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ এবং প্রচলিত শরিয়াহর মধ্যকার সংঘাতটি কেবল ওপর ওপর কয়েকটি আইনি ধারার বৈসাদৃশ্য নয়; এটি মূলত দুটি সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী আইনি দর্শন, ধর্মতত্ত্ব ও উৎসের সংঘাত। প্রচলিত শরিয়াহ বা ইসলামী আইনশাস্ত্র (Islamic Jurisprudence) একটি সুনির্দিষ্ট, শৃঙ্খলিত এবং ঐশ্বরিক কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে, যার মূল উৎস হলো চারটি: পবিত্র কুরআন, সুন্নাহ (রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর বাণী, কর্ম ও মৌনসম্মতি), ইজমা (মুসলিম উম্মাহর ফকীহদের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত) এবং কিয়াস (যৌক্তিক সাদৃশ্যকরণ)।

ইসলামী আইনশাস্ত্রে একটি সুপ্রতিষ্ঠিত এবং অকাট্য নীতি হলো, যখন কোনো বিষয়ে পবিত্র কুরআন এবং সুন্নাহর স্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট নস বা টেক্সট বিদ্যমান থাকে, সেখানে মানুষের বুদ্ধি খাটানো, মনগড়া আইন তৈরি করা কিংবা সেই সুনির্দিষ্ট মাত্রাকে পরিবর্তন করার কোনো সুযোগ থাকে না। ফিকহের পরিভাষায় একে বলা হয়—

لا اجتهاد مع النص

(লা ইজতিহাদা মা’আন নাস — সুনির্দিষ্ট টেক্সটের উপস্থিতিতে কোনো নতুন গবেষণার অবকাশ নেই)।

প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান এবং রশিদ কমিশনের আধুনিকতাবাদী সদস্যরা এই চিরন্তন ইসলামী আইনি কাঠামোকে সম্পূর্ণ অবমাননা ও বাইপাস করেছিলেন। তারা দাবি করেছিলেন যে, যুগের পরিবর্তনের সাথে সাথে মুসলিম সমাজকে আধুনিক করতে হলে ‘ইজতিহাদ’ বা নতুন গবেষণার প্রয়োজন। কিন্তু তাদের এই তথাকথিত ইজতিহাদ কোনো যুগান্তকারী মুজতাহিদ বা গভীর ইসলামী আইনবিদের মাধ্যমে হয়নি; বরং এটি হয়েছিল একটি সামরিক ডিক্রি এবং পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত কিছু আমলা ও নারীবাদী নেত্রীদের রাজনৈতিক এজেন্ডার হাত ধরে।

শরিয়াহর দৃষ্টিতে রাষ্ট্র বা শাসকের আইন প্রণয়নের ক্ষমতা (সিয়াহ্ শারইয়্যাহ) অত্যন্ত সীমিত। শাসক কেবল এমন বিষয়ে প্রশাসনিক বা জনকল্যাণমূলক আইন করতে পারেন যা শরিয়াহর কোনো অকাট্য বিধানকে লঙ্ঘন করে না এবং যা জনসাধারণের সাধারণ কল্যাণে (মাসলাহাহ) ব্যবহৃত হয়। কিন্তু আইয়ুব খান তাঁর সামরিক ক্ষমতার জোরে এবং এই মৌলভিরা তাঁদের কাপুরুষোচিত নীরবতার মাধ্যমে এমন সব বিষয়ে হস্তক্ষেপের সুযোগ তৈরি করে দিলেন, যা সরাসরি আল্লাহর দেওয়া হালাল-হারামের সীমানাকে পুনর্নির্ধারণ করে। এই দর্শনের সংঘাতই শরিয়াহ আইনের সাথে ১৯৬১ সালের অধ্যাদেশের এক অলঙ্ঘনীয় ও চিরস্থায়ী প্রাচীর খাড়া করে দেয়, যা দেখেও আমাদের ‘তাকলিদপন্থী’ সমাজ আজ না দেখার ভান করে বসে থাকে। সচচেয়ে বড় কমেডি তখন হয়, যখন আমাদের বিভিন্ন রাজনৈতি দল বলে – আমরা কোন কুরান হাদিস বিরোধী আইন করবো না। তারা একবারও বলে না আমরা কুরান হাদিস বিরোধী “মুসলিম পারিবারিক আইন ১৯৬১” বাতিল করবো।

৪/ ধারা ৪-এর ব্যবচ্ছেদ: এতিম নাতির উত্তরাধিকার বনাম মিরাসের মূলনীতি

১৯৬১ সালের অধ্যাদেশের ৪ নম্বর ধারাটি দক্ষিণ এশিয়ার ইসলামী আইন এবং ফিকহ শাস্ত্রের ইতিহাসে সবচেয়ে বিতর্কিত এবং তীব্রভাবে সমালোচিত একটি অনুচ্ছেদ। এই ধারার মাধ্যমে ইসলামের ১৪০০ বছরের প্রতিষ্ঠিত ‘মিরাস’ বা উত্তরাধিকার আইনকে এক কলমের খোঁচায় ওলটপালট করে দেওয়া হয়েছিল, যা সম্পূর্ণ কুরআন ও সুন্নাহর নির্দেশনার অবমাননা।

ক) আইনের বিধান ও এর পেছনের যুক্তি

অধ্যাদেশের ৪ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে:

যদি কোনো ব্যক্তির জীবদ্দশায় তার কোনো পুত্র বা কন্যা মারা যায়, তবে ওই ব্যক্তির মৃত্যুর পর তার সম্পত্তি যখন বণ্টন করা হবে, তখন ওই মৃত পুত্র বা কন্যার সন্তানরা (অর্থাৎ এতিম নাতি-নাতনিরা) সমষ্টিগতভাবে ঠিক ততটুকুই সম্পত্তি পাবে, যতটুকু তাদের বাবা বা মা জীবিত থাকলে পেতেন।

এই আইনটি করার পেছনে আধুনিকতাবাদীদের মানবিক যুক্তি ছিল অত্যন্ত সরল ও আবেগী। তারা সমাজে একটি করুণ চিত্র তুলে ধরলেন: এক ব্যক্তির তিন ছেলে। এর মধ্যে মেজো ছেলেটি তার বাবার জীবদ্দশাতেই মারা গেল এবং তার পেছনে কিছু নাবালক সন্তান (এতিম নাতি-নাতনি) রেখে গেল। কিছুদিন পর যখন দাদা মারা গেলেন, তখন প্রচলিত শরিয়াহ আইন অনুযায়ী জীবিত দুই চাচা সমস্ত সম্পত্তি পেয়ে যাচ্ছেন, আর এই অবুঝ এতিম নাতিরা পুরোপুরি শূন্যহাতে পথে বসছে। এই মানবিক বিপর্যয় ঠেকাতেই আইয়ুব খান এই ধারাটি যুক্ত করেছিলেন। কিন্তু আবেগ দিয়ে তো আর ঐশ্বরিক আইন বদলানো যায় না।

খ) সনাতন শরিয়াহ ও ফিকহ শাস্ত্রের অনমনীয় অবস্থান

আপাতদৃষ্টিতে এই ধারাটিকে অত্যন্ত মানবিক মনে হলেও, সনাতন শরিয়াহ এবং ইসলামের চার মাজহাবের (হানাফি, শাফিয়ি, মালিকি ও হাম্বলি) ফকীহদের মতে, এটি ইসলামের মিরাস ব্যবস্থার মূল কাঠামোর ওপর একটি বড় আঘাত।

ইসলামে মিরাস বা উত্তরাধিকারের বণ্টন কোনো মানুষের করুণা, আবেগ বা মানবিক অনুভূতির ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়নি। এটি পবিত্র কুরআনের সূরা আন-নিসার ১১, ১২ এবং ১৭৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা স্বয়ং সুনির্দিষ্ট অঙ্কে (যেমন: অর্ধেক, এক-চতুর্থাংশ, এক-অষ্টমাংশ, দুই-তৃতীয়াংশ ইত্যাদি) ভাগ করে দিয়েছেন। এই আয়াতগুলোর শেষেই আল্লাহ কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন—”এগুলো আল্লাহর নির্ধারিত সীমানা” (তিলকা হুদুদুল্লাহ)।

ইসলামী উত্তরাধিকার আইনের একটি মূল ও অকাট্য নীতি হলো: “আল-আকরাবু ফাল-আকরাব” বা “নিকটবর্তী আত্মীয়ের উপস্থিতিতে দূরবর্তী আত্মীয় বঞ্চিত হয়” (The nearer in degree excludes the more remote)।

মৃত ব্যক্তির সাথে রক্তের সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতার ওপর ভিত্তি করে এই অধিকার নির্ধারিত হয়। একজন দাদার সাথে তার নিজের জীবিত পুত্রের (চাচার) সম্পর্কের দূরত্ব হলো এক ডিগ্রি (সরাসরি সন্তান)। আর দাদার সাথে মৃত পুত্রের সন্তানের (নাতির) সম্পর্কের দূরত্ব হলো দুই ডিগ্রি (পুত্রের মাধ্যমে)। সুতরাং, রক্তের সম্পর্কের এই গভীরতার নীতি অনুযায়ী, জীবিত পুত্রের উপস্থিতিতে নাতি কোনোভাবেই সরাসরি ‘মিরাস’ বা উত্তরাধিকারী হতে পারে না। সমস্ত সাহাবি, তাবেয়ি এবং চৌদ্দশত বছরের ফকীহদের এই বিষয়ে সুষ্পষ্ট ইজমা বা সর্বসম্মত ঐক্যমত রয়েছে।

গ) ১৯৬১ সালের ধারার আইনি ও যৌক্তিক ফাঁকফোকর

ইসলামী আইনবিদগণ ১৯৬১ সালের এই ৪ নম্বর ধারার ভেতরে কিছু অসঙ্গতি নিয়ে অভিযোগ করেন। তারা বলেন :

কাল্পনিক জীবনের তত্ত্ব (Theory of Representation):

এই আইনটি একটি সম্পূর্ণ অবাস্তব ও কাল্পনিক ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। আইনটি ধরে নেয় যে, মৃত পুত্র বা কন্যা যেন তাঁর বাবার মৃত্যুর সময়েও ‘কাল্পনিকভাবে জীবিত’ আছেন এবং সম্পত্তি তাঁর মাধ্যমে নাতি-নাতনিদের কাছে যাচ্ছে। ইসলামে মৃত ব্যক্তি কখনো সম্পত্তির মালিক বা মাধ্যম হতে পারে না। উত্তরাধিকারী হতে হলে মোরেস (মৃত ব্যক্তি) মারা যাওয়ার মুহূর্তে ওয়ারিশকে (উত্তরাধিকারী) সশরীরে জীবিত থাকতে হবে।

চাচার চেয়ে নাতির বেশি সম্পত্তি পাওয়ার অসংগতি:

এই কাল্পনিক তত্ত্বের কারণে সমাজে একটি অদ্ভুত বৈষম্য তৈরি হয়। ধরা যাক, এক ব্যক্তির এক ছেলে এবং এক মৃত ছেলের এক কন্যা (নাতনি) আছে। ১৯৬১ সালের আইন অনুযায়ী, মৃত ছেলেটি জীবিত থাকলে পুরো সম্পত্তির দুই-তৃতীয়াংশ পেত, সুতরাং তার এক মেয়েই বাবার পুরো হিস্যা অর্থাৎ দুই-তৃতীয়াংশ ($2/3$) সম্পত্তি পেয়ে যাবে। আর মৃত ব্যক্তির নিজের আপন জীবিত পুত্র পাবে মাত্র এক-তৃতীয়াংশ ($1/3$) সম্পত্তি। শরিয়াহর দৃষ্টিতে এটি একটি চরম বিকৃতি, যেখানে জীবিত আপন পুত্রের চেয়ে দূরবর্তী এক নাতনি দ্বিগুণ সম্পত্তি নিয়ে যাচ্ছে।

ঘ) শরিয়াহসম্মত সমাধান: ‘ওসিয়ত ওয়াজিবাহ’ (Mandatory Will)

১৯৬১ সালের এই আইনের বিকল্প হিসেবে আমাদের দেশের ঐতিহ্যবাদী আলেম ও মুফতিরা প্রায়ই মিশরের ‘আইন নং ৭১ (১৯৪৬)’-এর দোহাই দিয়ে ‘ওসিয়ত ওয়াজিবাহ’ (Mandatory Will) বা বাধ্যতামূলক ওসিয়তের তত্ত্ব হাজির করেন। তারা দাবি করেন, এটি নাকি একটি চমৎকার শরিয়াহসম্মত সমাধান। কিন্তু তাদের এই দাবিটি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে ওলামাদের নিজেদের তাত্ত্বিক দেউলিয়াত্ব ও আইনি গোঁজামিলই প্রকাশ পায়।

পবিত্র কুরআনের সূরা বাকারার ১৮০ নম্বর আয়াতে ওসিয়ত করার সাধারণ তাগিদ রয়েছে এবং হাদিসের নিয়ম অনুযায়ী একজন ব্যক্তি বেঁচে থাকতে তাঁর মোট সম্পত্তির সর্বোচ্চ এক-তৃতীয়াংশ (1/3) এমন কারো নামে ওসিয়ত করতে পারেন, যিনি সরাসরি মিরাসের অংশীদার নন। আলেমদের যুক্তি হলো—যেহেতু দাদা মারা যাওয়ার পর এতিম নাতিরা সরাসরি কোনো অংশ পায় না, তাই রাষ্ট্র আইন করতে পারে যে, দাদা অলসতাবশত ওসিয়ত না করে মারা গেলেও আদালত ধরে নেবে দাদা ওসিয়ত করে গেছেন এবং দাদার মোট সম্পত্তি থেকে এক-তৃতীয়াংশ কেটে নাতিদের দিয়ে দেওয়া হবে।

কিন্তু বাস্তবতা হলো, আলেমদের এই সমাধানও কোনোভাবেই সরাসরি কুরআন অনুযায়ী হয় না। এটিও এক ধরনের মনগড়া আইনি জোড়াতালি। এর কারণগুলো হলো:

কুরআনের অকাট্যতার লঙ্ঘন:

পবিত্র কুরআনের সূরা আন-নিসায় মিরাসের যে বণ্টন এবং অংশীদারদের তালিকা আল্লাহ নিজে সুনির্দিষ্ট করে দিয়েছেন, সেখানে এতিম নাতিদের কোনো অংশ রাখা হয়নি। এখন আলেমদের কথামতো রাষ্ট্র যদি ‘বাধ্যতামূলক’ বা জোরপূর্বক ওসিয়তের আইন বানিয়ে মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি থেকে এক-তৃতীয়াংশ কেটে নেয়, তবে তা-ও কুরআনের বণ্টন প্রক্রিয়ার ওপর মানুষের তৈরি আইনের এক প্রকার জোর জবরদস্তি।

ওসিয়তের মূল দর্শনের পরিপন্থী:

ইসলামে ‘ওসিয়ত’ বা উইল হলো একজন মানুষের সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত ও স্বেচ্ছাধীন ইবাদত। মানুষ নিজের ইচ্ছায়, সওয়াবের উদ্দেশ্যে তাঁর জীবদ্দশায় এটি লিখে যাবেন। কোনো ব্যক্তি যদি ওসিয়ত না করেই মারা যান, তবে রাষ্ট্র কাল্পনিকভাবে ধরে নিয়ে তাঁর সম্পদের ওপর ‘বাধ্যতামূলক’ ওসিয়ত চাপিয়ে দেওয়ার অধিকার শরিয়াহর মূল কাঠামোতে কোথায় পেল?

আইয়ুব খানের আইনের সাথে অমিল কোথায়?

আইয়ুব খান যেমন সামরিক ডিক্রি দিয়ে কুরআনের বাইরে গিয়ে নাতিদের মিরাসের অংশীদার বানিয়েছেন, ঠিক তেমনি আলেমদের বাতলে দেওয়া মিশরের মডেলে রাষ্ট্র আইন করে মৃত ব্যক্তির সম্পদ জবরদখল করছে। দুটি প্রক্রিয়াই তো আল্লাহর আইনের সমান্তরালে মানুষের তৈরি আইনি হস্তক্ষেপ।

সুতরাং, আধুনিকতাবাদীরা যেমন আবেগ দিয়ে কুরআন বদলাতে চেয়েছেন, তেমনি এই ওলামা সমাজও মিশরের আইনের অন্ধ অনুকরণ (তাকলিদ) করে কুরআনের বাইরে গিয়ে আরেকটি গোঁজামিলকে ‘ইসলামী সমাধান’ বলে চালিয়ে দিতে চাচ্ছেন।

সবচেয়ে বড় তামাশা হলো, আলেমদের নিজস্ব যুক্তি মতেই যদি আইয়ুব খানের আইনটি সরাসরি কুরআন বিকৃতির শামিল হয় এবং তাদের প্রিয় মিশরের ‘বাধ্যতামূলক ওসিয়ত’ আইনটিই একমাত্র বিকল্প হয়—তবে গত ৬০ বছর ধরে তারা এই বিকল্প আইনটি বাস্তবায়নের জন্যও বাংলাদেশে কোনো আন্দোলন করেননি কেন? রাজপথে রক্ত দেওয়া তো দূরের কথা, এই আইনি বৈপরীত্য দূর করার জন্য তারা কোনো জোরালো দাবিও তোলেননি। কিতাবের পাতায় কুরআন বিকৃতির ফতোয়া দিয়ে, আর বাস্তবে সেই বিকৃত আইনকেই আদালতের টেবিলে মুখ বুজে মেনে নিয়ে তারা যে দ্বিচারিতা দেখাচ্ছেন, তা তাদের চরম ভণ্ডামিরই বহিঃপ্রকাশ।

৫/ ধারা ৬-এর ব্যবচ্ছেদ: বহুবিবাহের ওপর আইনি শিকল ও ‘তাহরিমুল হালাল’-এর ফিকহী অপরাধ

১৯৬১ সালের অধ্যাদেশের ৬ নম্বর ধারাটি মুসলিম সমাজে পুরুষের বহুবিবাহের অধিকারকে রাষ্ট্রীয় আইনের বেড়াজালে আবদ্ধ করে। আইয়ুব খান এবং রশিদ Commissions-এর আধুনিকতাবাদী সদস্যরা দাবি করেছিলেন যে, এই ধারার উদ্দেশ্য হলো প্রথম স্ত্রীর মর্যাদা রক্ষা করা এবং পুরুষদের অনিয়ন্ত্রিত বহুবিবাহের প্রবণতা বন্ধ করে সমাজে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা। কিন্তু শরিয়াহর আইনি দর্শনের আলোক বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই ধারাটি আল্লাহর দেওয়া একটি বৈধ অধিকারকে সংকুচিত ও অপরাধ হিসেবে গণ্য করার মাধ্যমে শরিয়াহর সীমানায় সরাসরি হস্তক্ষেপ করেছে।

ক) আইনের বিধান ও এর কঠোর শর্তসমূহ

অধ্যাদেশের ৬ নম্বর ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যদি তাঁর বর্তমান স্ত্রীর (বা স্ত্রীদের) উপস্থিতিতে আরেকটি বিয়ে করতে চান, তবে তাঁকে কয়েকটি কঠিন আইনি ধাপ পার হতে হবে:

  • শালিসী পরিষদের অনুমতি: পুরুষটিকে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের কাছে নির্দিষ্ট ফিসহ একটি লিখিত আবেদন করতে হবে, যেখানে দ্বিতীয় বিয়ের সুনির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ থাকতে হবে।
  • বর্তমান স্ত্রীর সম্মতি: আবেদনের সাথে বর্তমান স্ত্রীর কাছ থেকে একটি লিখিত সম্মতিপত্র বা অনুমতিপত্র জমা দিতে হবে।
  • শালিসী পরিষদের গঠন ও সিদ্ধান্ত: চেয়ারম্যান এরপর বর্তমান স্ত্রী ও স্বামীর পক্ষ থেকে একজন করে प्रतिनिधि (প্রতিনিধি) নিয়ে একটি ‘শালিসী পরিষদ’ (Arbitration Council) গঠন করবেন। এই পরিষদ যদি মনে করে যে দ্বিতীয় বিয়েটি করা অত্যন্ত ‘প্রয়োজনীয় এবং জাস্ট্রিফাইড’, কেবল তখনই তারা বিয়ের অনুমতি দেবে।

শাস্তির বিধান:

যদি কোনো ব্যক্তি এই নিয়ম লঙ্ঘন করে অর্থাৎ শালিসী পরিষদের অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করেন, তবে আইনত তাঁর সেই বিয়েটি বাতিল বা অবৈধ হবে না ঠিকই, কিন্তু তাঁকে দুটি বড় শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে:

১. তিনি তাঁর বর্তমান স্ত্রীকে (বা স্ত্রীদের) তাৎক্ষণিকভাবে পুরো দেনমোহরের টাকা (তা মুআজ্জাল বা বিলম্বিত যাই হোক না কেন) পরিশোধ করতে বাধ্য থাকবেন।

২. অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করার অপরাধে তাঁকে এক বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড অথবা বিপুল অঙ্কের জরিমানা (কিংবা উভয় danda) ভোগ করতে হবে।

খ) শরিয়াহর অকাট্য অবস্থান ও হুকুম

পবিত্র কুরআনের সূরা আন-নিসার ৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা পুরুষদের জন্য বহুবিবাহের সাধারণ অনুমতি দিয়ে স্পষ্ট ঘোষণা করেছেন:

“তবে তোমরা নিজেদের পছন্দমত নারীদের বিয়ে করে নাও—দুটি, তিনটি কিংবা চারটি। আর যদি তোমরা আশঙ্কা করো যে সুবিচার (ইনসাফ) করতে পারবে না, তবে একটিই…”

ইসলামী আইনশাস্ত্রের (ফিকহ) চার মাজহাবের ইমাম ও ফকীহদের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত (ইজমা) হলো, ইসলামে বহুবিবাহের অনুমতি একটি সাধারণ এবং মৌলিক অধিকার। এই অধিকারটি পাওয়ার জন্য বা দ্বিতীয় বিয়েটি বৈধ হওয়ার জন্য প্রথম স্ত্রীর অনুমতি নেওয়া কিংবা কোনো রাষ্ট্রীয় বা প্রশাসনিক পরিষদের ছাড়পত্র পাওয়ার কোনো বাধ্যবাধকতা শরিয়াহর মূল কাঠামোতে নেই।

ইসলাম বহুবিবাহের জন্য কেবল একটিই মৌলিক শর্ত আরোপ করেছে, আর তা হলো—স্ত্রীদের মধ্যে নিখুঁত সমতা ও ইনসাফ বজায় রাখা (আর্থিক, মানসিক এবং সময় বণ্টনের ক্ষেত্রে)। যদি কোনো পুরুষ ইনসাফ করতে না পারেন, তবে তাঁর জন্য দ্বিতীয় বিয়ে করা শরিয়াহর দৃষ্টিতে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ বা গুনাহের কাজ। কিন্তু কোনো পুরুষ যদি ইনসাফ করতে সক্ষম হন, তবে তাঁর জন্য এই বিয়ে করা সম্পূর্ণ বৈধ বা ‘মুবা’। আর ইনসাফ করতে পারছে কি না, সেটা ওই পুরুষ নিজে নির্ধারণ করবে। তার জন্য কোন বহিরাগত কতৃপক্ষ নেই।

গ) শরিয়াহবিরোধী হওয়ার মূল ফিকহী কারণ এবং ওলামাদের ভণ্ডামির যোগসূত্র

ওলামা এবং ইসলামী আইনবিদগণ ১৯৬১ সালের এই ৬ নম্বর ধারাটিকে প্রধানত দুটি কারণে সম্পূর্ণ শরিয়াহবিরোধী ও অবৈধ বলে গণ্য করেন:

হালালকে হারাম বা সংকুচিত করার চেষ্টা:
ইসলামী আইনশাস্ত্রের একটি সুপ্রতিষ্ঠিত নীতি হলো, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ﷺ যে বিষয়টিকে মানুষের জন্য ‘হালাল’ বা ‘মুবা’ (বৈধ) ঘোষণা করেছেন, কোনো রাষ্ট্র বা শাসক আইনি ডিক্রি জারি করে সেই বৈধ বিষয়কে ‘অপরাধ’ বা ‘নিষিদ্ধ’ ঘোষণা করতে পারেন না। একে ফিকহের পরিভাষায় বলা হয়—“তাহরিমুল হালাল” (আল্লাহর হালালকে হারাম করা)। ১৯৬১ সালের আইনটি আল্লাহর দেওয়া একটি সাধারণ অনুমতিকে রাষ্ট্রীয় অনুমতির ওপর নির্ভরশীল করে দিয়ে প্রকারান্তরে শরিয়াহর সার্বভৌমত্বকে অস্বীকার করেছে।

বিবাহিত জীবনের বৈধতা বনাম আইনি অপরাধের বৈপরীত্য:

এই আইনটি নিজেই একটি বড় আইনি বৈপরীত্যের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। আইনটি বলছে, অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করলে বিয়েটি ভেঙে যাবে না, অর্থাৎ বিয়েটি ধর্মীয় ও আইনত ‘বৈধ’ থাকবে। অথচ একই সাথে আইনটি বলছে, এই বৈধ কাজটি করার জন্য পুরুষটিকে ‘অপরাধী’ হিসেবে জেলে যেতে হবে। শরিয়াহর দৃষ্টিতে এটি একটি চরম প্রহসন। যে কাজটি আল্লাহর দরবারে বৈধ এবং যার মাধ্যমে একটি নতুন পরিবার গঠিত হলো, সেই পবিত্র কাজের জন্য একজন মুসলিমকে রাষ্ট্র কীভাবে ‘অপরাধী’ গণ্য করে শাস্তি দিতে পারে?

এখানেই মৌলভিদের মুনাফেকির প্রমাণ স্পষ্ট:

তারা যখন কোনো গণতান্ত্রিক বা উদারপন্থী সরকারের আমলে কোনো সাধারণ বা ট্রিভিয়াল সামাজিক বিষয় দেখে, তখন “আল্লাহর দেওয়া হালালকে কেউ হারাম করতে পারবে না” বলে হুংকার ছাড়ে, আন্দোলন করে দেশ অচল করে দেয়। অথচ আইয়ুব খানের সামরিক বুটের তলায় যখন পবিত্র কুরআনের সূরা নিসার এই অকাট্য স্বাধীন বিধানটিকে শেকল পরানো হলো এবং আল্লাহর হালাল করা কাজকে ‘রাষ্ট্রীয় অপরাধ’ বানিয়ে এক বছরের জেলের বিধান রাখা হলো, তখন এই আলেম সমাজ নিজেদের পিঠ বাঁচাতে সম্পূর্ণ আপস করে নিলো। তাদের এই সিলেক্টিভ বা সুবিধাবাদী শরিয়াহ প্রীতিই প্রমাণ করে যে, তারা বন্দুকের নলকে আল্লাহর হুকুমের চেয়ে বেশি ভয় পায়!

৬/ ধারা ৭ ও ৮-এর ব্যবচ্ছেদ: তালাক ও ইউনিয়ন পরিষদের নোটিশের গোলকধাঁধা

১৯৬১ সালের অধ্যাদেশের ৭ ও ৮ নম্বর ধারাটি মুসলিম দাম্পত্য জীবনের সবচেয়ে সংবেদনশীল বিষয়—‘তালাক’ বা বিবাহবিচ্ছেদের পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করে। এই ধারা দুটির মাধ্যমে শরিয়াহর ক্লাসিক্যাল তালাক ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ ওলটপালট করে এক চরম প্রশাসনিক গোলকধাঁধা তৈরি করা হয়েছে, যা মুসলিম পরিবারগুলোতে এক ভয়াবহ ধর্মীয় ও সামাজিক সংকটের জন্ম দিয়েছে।

ক) আইনের বিধান ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া

অধ্যাদেশের ৭ নম্বর ধারা অনুযায়ী, একজন স্বামী যদি তাঁর স্ত্রীকে তালাক দিতে চান, তবে তাঁকে নিম্নলিখিত আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে:

১. চেয়ারম্যানকে নোটিশ: স্ত্রীকে যেকোনো পদ্ধতিতে (মুখে বা লিখিতভাবে) তালাক দেওয়ার পর, স্বামীকে যত দ্রুত সম্ভব স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানকে একটি লিখিত নোটিশ দিতে হবে এবং স্ত্রীর কাছে তার একটি অনুলিপি পাঠাতে হবে।

২. শালিসী পরিষদ গঠন: নোটিশ পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে চেয়ারম্যান উভয় পক্ষের মধ্যে আপোষ-মীমাংসা বা পুনঃস্থাপনের উদ্দেশ্যে একটি ‘শালিসী পরিষদ’ গঠন করবেন এবং দুই পক্ষকে আলোচনার জন্য ডাকবেন।

৩. ৯০ দিনের স্থগিতাদেশ: চেয়ারম্যানকে নোটিশ দেওয়ার দিন থেকে ঠিক ৯০ দিন অতিবাহিত না হওয়া পর্যন্ত ওই তালাকটি কোনোভাবেই কার্যকর হবে না। যদি এই ৯০ দিনের মধ্যে শালিসী পরিষদের মাধ্যমে তাদের মধ্যে মিটমাট হয়ে যায়, তবে তালাকটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রত্যাহার হয়ে যাবে।

খ) শরিয়াহর সুপ্রতিষ্ঠিত তালাক নীতি

ইসলামী শরিয়াহ অনুযায়ী, বিবাহ যেমন একটি পবিত্র ধর্মীয় ও সামাজিক চুক্তি, তালাকও তেমনি একটি বিশেষ ও চূড়ান্ত আইনি অধিকার। পবিত্র কুরআন এবং সুন্নাহর নির্দেশিকা অনুযায়ী, একজন স্বামী যখন তাঁর স্ত্রীকে সচেতনভাবে এবং সুস্থ মস্তিস্কে ‘তালাক’ শব্দ উচ্চারণ করে বা লিখে সুনির্দিষ্টভাবে জানিয়ে দেয়, তখন থেকেই তালাকের ধর্মীয় প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যায়।

শরিয়াহর ফতোয়া অনুযায়ী, স্বামী মুখে এক বা দুই তালাক (তালাকে রাজ’ঈ) কিংবা চূড়ান্ত তিন তালাক দেওয়ার সাথে সাথেই স্ত্রীর ওপর সেই তালাকটি পতিত হয়ে যায়। এর জন্য কোনো সরকারি চেয়ারম্যান, আদালত বা কোনো তৃতীয় পক্ষের কাগজের নোটিশের ওপর তালাক হওয়া বা না হওয়া ঝুলে থাকে না। তালাক দেওয়ার পর স্ত্রীর ‘ইদ্দতকাল’ (অপেক্ষা করার সময়) শুরু হয়, যা সাধারণত নারীর তিন ঋতুস্রাব কাল (কুরআনের ভাষায়: সালাসাতি কুরু)। এই ইদ্দতকালের মধ্যে স্বামী চাইলে স্ত্রীকে কোনো নতুন বিয়ে ছাড়াই ফিরিয়ে নিতে পারেন (রুজু করা)। কিন্তু ইদ্দত পার হয়ে গেলে বা তিন তালাক দিলে তালাকটি চূড়ান্ত হয়ে যায়।

গ) ১৯৬১ সালের আইনের মারাত্মক শরিয়াহবিরোধী দিকসমূহ এবং সামাজিক জিনা বা ব্যভিচারের রাষ্ট্রীয় বৈধতা

ওলামাগণ এই ৭ নম্বর ধারাটিকে শরিয়াহর সবচেয়ে বিপজ্জনক বিকৃতি হিসেবে দেখেন, কারণ এটি মুসলিম দম্পতিদের অজান্তেই এক চরম ধর্মীয় গুনাহের (জিনা) দিকে ঠেলে দেয়। এর মূল কারণগুলো নিচে দেওয়া হলো:

তালাক কার্যকরের সময় নিয়ে চরম বিভ্রান্তি:

১৯৬১ সালের আইন অনুযায়ী, স্বামী যদি স্ত্রীকে মুখে তিন তালাকও দেয় কিন্তু কোনো কারণে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানকে লিখিত নোটিশ না পাঠায়, তবে আইনের চোখে তাদের তালাক কার্যকর হয় না এবং তারা আইনত স্বামী-স্ত্রীই থেকে যায়। অথচ শরিয়াহর ফতোয়া অনুযায়ী, মুখে তালাক দেওয়ার সাথে সাথেই তাদের বিয়ে ভেঙে গেছে এবং ইদ্দত শেষে তারা একে অপরের জন্য সম্পূর্ণ হারাম হয়ে গেছে। এই অবস্থায় যদি কোনো দম্পতি সরকারি আইনের ওপর ভরসা করে নোটিশ না দিয়ে বা চেয়ারম্যানের সার্টিফিকেটের অপেক্ষায় বছরের পর বছর একসাথে বসবাস করতে থাকে, তবে শরিয়াহর দৃষ্টিতে তাদের প্রতিটি মুহূর্ত ‘ব্যভিচার’ বা জিনা হিসেবে গণ্য হবে, যা একটি মুসলিম সমাজের জন্য সবচেয়ে বড় বিপর্যয়।

গর্ভবতী নারীর ইদ্দতকাল নিয়ে কুরআনের স্পষ্ট লঙ্ঘন:

পবিত্র কুরআনের সূরা আত-তালাকের ৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা গর্ভবতী নারীর ইদ্দতকাল বা তালাক চূড়ান্ত হওয়ার সময়সীমা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করে দিয়েছেন—“আর গর্ভবতী নারীদের ইদ্দতকাল হলো সন্তান প্রসব হওয়া পর্যন্ত” (ওয়া উলাতুল আহমারি আজালুহুন্না আই ইয়াদ্বানা হাম্লাহুন্না)। অর্থাৎ, কোনো গর্ভবতী নারীকে তালাক দিলে, সে যদি নোটিশ দেওয়ার দুইদিন পরেও সন্তান প্রসব করে, তবে শরিয়াহর নিয়মে সেদিনই তার ইদ্দত শেষ এবং তালাক কার্যকর হয়ে যাবে। অথচ ১৯৬১ সালের এই ৭(৩) ধারাটি আল্লাহর এই স্পষ্ট আয়াতকে অমান্য করে ঢালাওভাবে আইন করেছে যে—গর্ভবতী নারী হোক বা সাধারণ নারী হোক, চেয়ারম্যানকে নোটিশ দেওয়ার পর ৯০ দিন পার না হলে কোনোভাবেই তালাক কার্যকর হবে না। এটি সরাসরি কুরআনের আক্ষরিক পাঠের বিকৃতি।

এই প্রশাসনিক গোলকধাঁধার কারণে হাজার হাজার মুসলিম নারী-পুরুষের জীবন ধর্মীয়ভাবে সংকটাপন্ন হয়ে পড়েছে। রাষ্ট্র যাকে স্ত্রী বলছে, ধর্ম তাকে পরনারী বলছে; রাষ্ট্র যাকে স্বাধীন বলছে, ধর্ম তাকে ইদ্দতের বন্ধনে আটকে রাখছে।

কিন্তু আফসোসের বিষয় হলো – হুজুরেরা গণতান্ত্রিক সরকারের আমলে নারীদের সাধারণ পোশাক বা সহশিক্ষার মতো বিষয় নিয়ে বড় বড় আন্দোলন করলেও, ১৯৬১ সালের আইনের এই বিশাল ভায়োলেশন নিয়ে পুরো নীরব। কারণ তারা জানে, এই আইনের শেকড় সামরিক বুটের তলায় প্রোথিত ছিল!

৭/ ধারা ৯-এর ব্যবচ্ছেদ: ভরণপোষণ ও বিচারিক ক্ষমতার বিচ্যুতি

১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ৯ নম্বর ধারাটি স্ত্রীর ভরণপোষণ (নফকা) আদায়ের পদ্ধতি এবং তা নির্ধারণের এখতিয়ার নিয়ে আলোচনা করে। এই ধারার মূল উদ্দেশ্য ছিল কোনো স্বামী যদি তাঁর স্ত্রীর প্রতি দায়িত্বহীন আচরণ করেন, তবে স্ত্রী যেন সহজে রাষ্ট্রীয় সহায়তায় তাঁর আর্থিক অধিকার আদায় করতে পারেন। কিন্তু এই সামাজিক ও মানবিক সুরক্ষার আড়ালে আইনি কাঠামোটি তৈরি করতে গিয়ে শরিয়াহর নিজস্ব বিচারিক ব্যবস্থা এবং যোগ্যতার (Jurisdiction and Competence) মূলনীতিকে সম্পূর্ণ ক্ষুণ্ণ করা হয়েছে।

ক) আইনের বিধান ও প্রশাসনিক এখতিয়ার

অধ্যাদেশের ৯ নম্বর ধারা অনুযায়ী:

কোনো স্বামী যদি তাঁর স্ত্রীকে পর্যাপ্ত ভরণপোষণ দিতে ব্যর্থ হন কিংবা একাধিক স্ত্রী থাকলে তাদের মধ্যে সমানভাবে ভরণপোষণ বণ্টন না করেন, তবে স্ত্রী (বা স্ত্রীরা) সরাসরি স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের কাছে লিখিত আবেদন করতে পারবেন।

আবেদন পাওয়ার পর চেয়ারম্যান উভয় পক্ষের প্রতিনিধি নিয়ে একটি ‘শালিসী পরিষদ’ (Arbitration Council) গঠন করবেন। এই পরিষদ বিষয়টি তদন্ত করে স্বামী কত টাকা ভরণপোষণ দেবেন, তার একটি সুনির্দিষ্ট অংক নির্ধারণ করে সার্টিফিকেট জারি করবে। যদি স্বামী নির্ধারিত সময়ে এই টাকা পরিশোধ না করেন, তবে তা ‘সরকারি বকেয়া’ (Public Demand) বা ল্যান্ড রেভিনিউ হিসেবে তাঁর সম্পত্তি ক্রোক বা অন্য কোনো আইনি উপায়ে অত্যন্ত কঠোরভাবে আদায় করা হবে।

খ) শরিয়াহর বিচারিক পদ্ধতি ও কাজীর যোগ্যতা

ইসলামী আইনশাস্ত্রের (ফিকহ) সুপ্রতিষ্ঠিত নিয়ম অনুযায়ী, ভরণপোষণ বা ‘নফকা’ কেবল একটি সাধারণ আর্থিক পাওনা নয়; এটি একটি অত্যন্ত জটিল ধর্মীয় ও দেওয়ানি বিষয়। শরিয়াহর মূলনীতি হলো—কোনো দম্পতির মধ্যে ভরণপোষণ নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে, তার সমাধান করার একক এখতিয়ার কেবল ‘কাজী’ বা শরিয়াহ আদালতের সুনির্দিষ্ট বিচারকের (Family Court Judge)।

ইসলামে একজন বিচারক বা কাজী হওয়ার জন্য বিশেষ কিছু ধর্মীয় ও একাডেমিক যোগ্যতা থাকা বাধ্যতামূলক। তাঁকে পবিত্র কুরআন, সুন্নাহ, ফিকহ শাস্ত্র এবং শরিয়াহর সূক্ষ্ম বিধি-বিধানে গভীর পণ্ডিত হতে হয়। কারণ, ভরণপোষণ নির্ধারণ করার সময় বিচারককে কেবল স্বামীর আয় দেখতে হয় না, বরং শরিয়াহর আরও বহু বিষয় বিবেচনা করতে হয়। যেমন—স্ত্রী স্বামীর অবাধ্য (নাশেজাহ) কি না, স্ত্রী কোনো শরয়ী বা যৌক্তিক কারণ ছাড়া স্বামীর ঘর ছেড়ে চলে গেছেন কি না, কিংবা স্বামীর আর্থিক সামর্থ্য অনুযায়ী ইসলামের পরিভাষায় ‘তাক্বদীরুল কিফায়াহ’ (পর্যাপ্ততার পরিমাপ) কতটুকু হওয়া উচিত—এসব ফিকহী সিদ্ধান্তের ওপর ভরণপোষণের বৈধতা নির্ভর করে।

গ) শরিয়াহবিরোধী হওয়ার মূল কারণসমূহ ও রাজনৈতিক ক্ষমতার দাসত্ব

১৯৬১ সালের এই ৯ নম্বর ধারাটিকে প্রধানত নিম্নলিখিত কারণে আমি শরিয়াহর পরিপন্থী বলে মনে করি:

অ-আলেম ও রাজনৈতিক প্রতিনিধির হাতে বিচারিক ক্ষমতা:

এই আইনের মাধ্যমে শরিয়াহর গভীর ফিকহী বিচারিক ক্ষমতা একজন যোগ্য কাজীর হাত থেকে কেড়ে নিয়ে সম্পূর্ণ রাজনৈতিকভাবে নির্বাচিত স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। একজন ইউপি চেয়ারম্যান বা শালিসী পরিষদের সদস্যরা সাধারণ মানুষ; তাঁরা শরিয়াহ শাস্ত্র, ফিকহী সূক্ষ্মতা (Nuances) বা ইসলামী বিচার ব্যবস্থার কোনো প্রথাগত জ্ঞান রাখেন না। শরিয়াহর মূলনীতি অনুযায়ী, দ্বীনি বা শরিয়াহ সংক্রান্ত বিষয়ে ফয়সালা দেওয়ার অধিকার কোনো অ-আলেম বা অ-বিশেষজ্ঞের নেই।

একপাক্ষিক সিদ্ধান্তের ঝুঁকি ও নাশেজাহর বিধান উপেক্ষা:

শরিয়াহ অনুযায়ী, স্ত্রী যদি কোনো শরয়ী কারণ ছাড়া স্বামীর অবাধ্য হন (নাশেজাহ), তবে স্বামী তাঁকে ভরণপোষণ দিতে বাধ্য নন। কিন্তু ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক প্রভাব, সামাজিক চাপ বা আইনি অজ্ঞতার কারণে শরিয়াহর এই সূক্ষ্ম শর্তগুলো খতিয়ে দেখতে পারেন না। ফলে অনেক সময় অবাধ্য স্ত্রীর পক্ষে একপাক্ষিক রায় চলে আসে, যা স্বামীর প্রতি শরিয়াহসম্মত বিচারকে ব্যাহত করে। শরিয়াহর বিচারিক ক্ষমতাকে এভাবে আমলাতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক রূপ দেওয়া ফিকহী দর্শনের সম্পূর্ণ পরিপন্থী।

এখানেই ওলামাদের সেই চেনা দ্বিচারিতা:

শরিয়াহর একটি বিচারিক স্তম্ভ হলো কাজী বা ইসলামী আদালতের সার্বভৌমত্ব। আইয়ুব খানের সামরিক ডিক্রি যখন কাজীর সেই পবিত্র বিচারিক আসনটিকে হরণ করে একজন অ-আলেম, ধর্মনিরপেক্ষ ও রাজনৈতিক চেয়ারম্যানের হাতে সঁপে দিল, তখন আমাদের ‘তাকলিদপন্থী’ আলেম সমাজ এই বিচারিক বিচ্যুতির বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর বুদ্ধিবৃত্তিক বা আইনি প্রতিরোধ গড়ে তোলেননি। কিন্তু কোনো অ-সামরিক, গণতান্ত্রিক সরকার যখনই বিচার বিভাগ বা শিক্ষাব্যবস্থায় সাধারণ কোনো সংস্কারের উদ্যোগ নেয়, তখনই এই আলেমরাই কাজীর অধিকার হরণের ধুয়া তুলে রাজপথ অচল করতে দ্বিধা করেন না।

৮/ উত্তর-ঔপনিবেশিক প্রভাব ও বর্তমান আদালতের দৃষ্টিভঙ্গি

১৯৬১ সালের এই সামরিক অধ্যাদেশটি জারির পর থেকে গত ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে দক্ষিণ এশিয়ার আইনি ও বিচারিক অঙ্গনে এক অবিরাম টানাপোড়েন চলছে। একদিকে দেশের ধর্মনিরপেক্ষ আইনি কাঠামো এই আইনটিকে ধরে রাখতে চায়, অন্যদিকে শরিয়াহ সচেতন নাগরিক ও আলেম সমাজ কিতাবের পাতায় এর বিরোধিতা করলেও মাঠপর্যায়ে একে একপ্রকার নীরবেই হজম করে নিয়েছেন। বাংলাদেশ এবং পাকিস্তানের উচ্চ আদালতগুলোতে এই দ্বন্দ্বের রূপটি ভিন্ন ভিন্নভাবে প্রকাশ পেয়েছে।

ক) পাকিস্তানের ফেডারেল শরিয়ত কোর্টের ঐতিহাসিক রায়সমূহ

পাকিস্তানের বিচার ব্যবস্থায় একটি বিশেষ আদালত রয়েছে, যার নাম ‘ফেডারেল শরিয়ত কোর্ট’ (Federal Shariat Court – FSC)। এই আদালতের মূল কাজই হলো দেশের যেকোনো প্রচলিত আইন কুরআন ও সুন্নাহর সাথে সাংঘর্ষিক কি না, তা পরীক্ষা করা এবং সাংঘর্ষিক হলে তা বাতিল ঘোষণা করা।

বিগত বছরগুলোতে পাকিস্তানের ফেডারেল শরিয়ত কোর্টে ১৯৬১ সালের এই পারিবারিক আইনের প্রায় প্রতিটি ধারাকে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে। বিশেষ করে ২০০০ সালের এক ঐতিহাসিক রায়ে ফেডারেল শরিয়ত কোর্ট ১৯৬১ সালের অধ্যাদেশের ৪ নম্বর ধারাটিকে (এতিম নাতির সরাসরি মিরাস) সম্পূর্ণ শরিয়াহবিরোধী এবং বাতিল ঘোষণা করেছিল। আদালত স্পষ্ট জানিয়ে দেয় যে, কুরআন-সুন্নাহর আলোকে নাতি সরাসরি মিরাস পেতে পারে না; এর একমাত্র বৈধ সমাধান হলো মিশরের মতো ‘ওসিয়ত ওয়াজিবাহ’ বা বাধ্যতামূলক ওসিয়তের আইন করা। যদিও পরবর্তীতে সুপ্রিম কোর্টের শরিয়ত অ্যাপিলিয়েট বেঞ্চে আপিলের কারণে এই রায়ের চূড়ান্ত বাস্তবায়ন আইনি মারপ্যাঁচে ঝুলে যায়, তবুও উচ্চ আদালতের এই রায় প্রমাণ করে যে এই আইনটি আসলেই শরিয়াহ পরিপন্থী।

খ) বাংলাদেশের আইনি ও বিচারিক বাস্তবতা এবং আলেমদের নীরব আপস

বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থায় পাকিস্তানের মতো কোনো পৃথক ‘শরিয়ত কোর্ট’ নেই। এখানে ১৯৮৫ সালের ‘পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ’ (Family Courts Ordinance, 1985) অনুযায়ী দেওয়ানি আদালতগুলোই ১৯৬১ সালের এই মুসলিম পারিবারিক আইনটি প্রয়োগ করে থাকে।

বাংলাদেশের উচ্চ আদালত (হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্ট) বিভিন্ন মামলায় ১৯৬১ সালের আইনের ধারাগুলোর সাংবিধানিক ও পদ্ধতিগত ব্যাখ্যা দিয়েছে। তবে বাংলাদেশের বিচার বিভাগ সাধারণত এই আইনের ধর্মীয় শুদ্ধাশুদ্ধি বা শরিয়াহর গভীর তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বে প্রবেশ করা থেকে বিরত থাকে। আদালত মূলত দেখে যে, আইন অনুযায়ী চেয়ারম্যানকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে কি না, কিংবা বহুবিবাহের ক্ষেত্রে শালিসী পরিষদের অনুমতি ছিল কি না।

এর ফলে বাংলাদেশের বাস্তবতায় এক অদ্ভুত ও বিপজ্জনক দ্বিমুখী সমাজ ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে। দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী যে তালাকটি নোটিশ না দেওয়ার কারণে ‘অবৈধ’ বা ‘কার্যকর নয়’, দেশের শীর্ষস্থানীয় কওমি ও আলিয়া মাদ্রাসার দারুল ইফতা বা ফতোয়া বিভাগগুলো শরিয়াহর আলোকে সেই তালাককে ‘চূড়ান্ত ও কার্যকর’ বলে ফতোয়া দিচ্ছে। এর ফলে সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষ এক চরম মানসিক ও ধর্মীয় দোদুল্যমানতার মধ্যে দিনাতিপাত করছেন—তারা রাষ্ট্রের আইন মানবেন নাকি আল্লাহর শরিয়াহ রক্ষা করবেন?

সবচেয়ে বড় ভণ্ডামি হলো, এই হাজার হাজার ফতোয়া দেওয়া মুফতি ও ওলামারা চার দেয়ালের ভেতরে সাধারণ মানুষের কাছে এই আইনকে ‘শরিয়াহবিরোধী’ ও ‘বাতিল’ বলে ফতোয়া বিক্রি করলেও, এই ডিক্রিটি রাষ্ট্র থেকে চিরতরে উচ্ছেদ করার জন্য কোনো প্রকাশ্য আইনি বা রাজনৈতিক জিহাদ ঘোষণা করেন না। তারা খুব ভালো করেই জানেন, চার দেয়ালের ভেতর ফতোয়া দেওয়া নিরাপদ, কিন্তু রাষ্ট্রশক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে আইনি কাঠামোর আমূল পরিবর্তন চাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ।

৯/ একটি স্থায়ী দ্বন্দ্বের তাত্ত্বিক মূল্যায়ন এবং শরিয়াহসম্মত উত্তরণের পথ

১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ওপর আমাদের এই দীর্ঘ ও ধারাবাহিক ব্যবচ্ছেদটি প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার জোরে জোরপূর্বক চাপিয়ে দেওয়া কোনো আইনি সংস্কার কখনো সমাজে পূর্ণাঙ্গ গ্রহণযোগ্যতা পায় না, যদি তা সেই সমাজের মানুষের বিশ্বাস এবং ধর্মীয় মূল্যবোধের সাথে সাংঘর্ষিক হয়। ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান এবং রশিদ কমিশনের আধুনিকতাবাদী সদস্যরা যে মহৎ উদ্দেশ্যের (নারী অধিকার রক্ষা ও সামাজিক শৃঙ্খলা) কথা বলে এই আইনটি জারি করেছিলেন, তার প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তিটিই ছিল ত্রুটিপূর্ণ। তাঁরা ইসলামী আইনশাস্ত্রের ভেতর থেকে সমাধান না খুঁজে, পশ্চিমা আইনি দর্শনের আদলে শরিয়াহর অকাট্য সীমানাগুলোকে পুনর্নির্ধারণ করার চেষ্টা করেছিলেন।

এর চূড়ান্ত ফল দাঁড়িয়েছে এই যে, এই আইনটি গত ছয় দশক ধরে মুসলিম সমাজকে আইনি এবং ধর্মীয়ভাবে খণ্ড-বিখণ্ড করে রেখেছে।

  • ৪ নম্বর ধারার মাধ্যমে মিরাস আইনের চিরন্তন রক্তের সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতার নীতিকে লঙ্ঘন করে সমাজে এক নতুন গাণিতিক বৈষম্য তৈরি করা হয়েছে।
  • ৬ নম্বর ধারার মাধ্যমে আল্লাহর দেওয়া একটি সাধারণ বৈধ বা ‘মুবা’ অধিকারের ওপর রাষ্ট্রীয় punishments বা শাস্তির খড়্গ ঝুলিয়ে এক অদ্ভুত আইনি বৈপরীত্যের জন্ম দেওয়া হয়েছে।
  • ৭ ও ৮ নম্বর ধারার প্রশাসনিক জটিলতা মুসলিম দম্পতিদের অজান্তেই ধর্মীয়ভাবে ‘ব্যভিচার’ বা জিনার মতো ভয়াবহ গুনাহের ঝুঁকিতে ফেলে দিয়েছে।
  • এবং ৯ নম্বর ধারার মাধ্যমে শরিয়াহর সূক্ষ্ম বিচারিক ক্ষমতাকে একজন যোগ্য ‘কাজী’র হাত থেকে কেড়ে নিয়ে সাধারণ রাজনৈতিক জনপ্রতিনিধির হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে।
শরিয়াহর ভেতর থেকেই কি আধুনিক সমাধান সম্ভব ছিল?

অনেক প্রথাগত আলেম ও ইসলামী আইনবিদ দাবি করেন যে, ১৯৬১ সালের আইনের এই সংকটগুলোর প্রতিটিই নাকি ইসলামের ঐতিহ্যবাহী ফিকহ ও শরিয়াহর কাঠামোর ভেতর থেকেই সম্পূর্ণ বৈধ উপায়ে সমাধান করা সম্ভব ছিল। তাদের মতে, এর জন্য কোনো শরিয়াহবিরোধী সামরিক আইন চাপানোর প্রয়োজন ছিল না। কিন্তু তারা যেসব বিকল্পের কথা বলেন, তা গভীরভাবে তলিয়ে দেখলে বোঝা যায়—আধুনিকতাবাদীরা যেমন রাষ্ট্রশক্তির জোরে কুরআন বিকৃত করেছে, এই ওলামা সমাজও তেমনি ফিকহী মারপ্যাঁচ দিয়ে কুরআনের মূল চেতনাকে পাশ কাটানোর চেষ্টা করেছে।

তাদের প্রস্তাবিত সেই তথাকথিত সমাধানগুলোর ভেতরের অসঙ্গতি নিচে ব্যবচ্ছেদ করা হলো:

১. এতিম নাতিদের ক্ষেত্রে এবং আলেমদের ‘ওসিয়ত ওয়াজিবাহ’র গোঁজামিল:

আলেমদের সবচেয়ে বড় প্রেসক্রিপশন হলো—মিরাসের মূল কাঠামোতে হাত না দিয়ে, মিশরের আইনি মডেল অনুসরণ করে ‘ওসিয়ত ওয়াজিবাহ’ বা বাধ্যতামূলক ওসিয়তের আইন করা। কিন্তু আগেই প্রমাণ করা হয়েছে, এই সমাধানটিও কোনোভাবেই সরাসরি কুরআন অনুযায়ী হয় না। কুরআন যেখানে নির্দিষ্ট আত্মীয়দের বাইরে কাউকে জোরপূর্বক সম্পদ দেওয়ার সুযোগ রাখেনি, সেখানে রাষ্ট্র কাল্পনিকভাবে মৃত ব্যক্তির ওপর ‘বাধ্যতামূলক ওসিয়ত’ চাপিয়ে দিয়ে সম্পদ কেটে নেবে—এটিও এক প্রকার মানুষের তৈরি আইনের জোর-জবরদস্তি। সুতরাং, আলেমদের এই সমাধানও কুরআনের অকাট্যতা রক্ষা করে না, বরং এটি তাদের আরেকটি আইনি জোড়াতালি মাত্র।

২. বহুবিবাহ ও প্রথম স্ত্রীর সুরক্ষায় ‘কাবিননামার শর্তের’ ফাঁকফোকর:

ওলামারা সাজেস্ট করেন যে, ইসলাম বিয়ে বা নিকাহনামার চুক্তিতে ‘শর্তারোপের অধিকার’ স্ত্রীকে দিয়েছে। বিয়ের সময় কাবিননামায় স্ত্রী যদি শর্ত যুক্ত করে দেন যে—“স্বামী তাঁর জীবদ্দশায় দ্বিতীয় বিয়ে করতে পারবেন না, করলে প্রথম স্ত্রী স্বয়ংক্রিয়ভাবে তালাক নেওয়ার অধিকার (তালাকে তাফবীজ) পাবেন”—তবে শরিয়াহ মতেই স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করার সাথে সাথে প্রথম স্ত্রী আইনি ও ধর্মীয় সুরক্ষা পেয়ে যেতেন। রাষ্ট্র পুরুষকে জেলে না পাঠিয়ে, কাবিননামার এই শর্তগুলোকে আইনি তদারকি করতে পারত।

কিন্তু এই সমাধানের ভেতরেও ওলামাদের চরম ভণ্ডামি লুকিয়ে আছে। প্রথমত, কাবিননামায় এই শর্ত জুড়ে দিলেও তা বহুবিবাহের মূল সমস্যার কোনো সমাধান করে না; এটি কেবল প্রথম স্ত্রীকে ঘর ভাঙার (তালাক নেওয়ার) লাইসেন্স দেয়। দ্বিতীয়ত, যে আলেম সমাজ এই শর্তকে “শরিয়াহসম্মত বিকল্প” হিসেবে প্রচার করে, বাস্তব সমাজে কোনো নারী যখন বিয়ের সময় কাবিননামায় এই ধরণের কঠোর শর্ত যুক্ত করতে চায়, তখন এই মৌলভিরাই “সংসার শুরুর আগেই ভাঙনের সুর” কিংবা “পুরুষের খোদা প্রদত্ত অধিকারে হস্তক্ষেপ” বলে ফতোয়া দিয়ে বসেন। মুখে প্রগতির কথা বললেও, বাস্তবে তারা পুরুষের সেই একচেটিয়া আধিপত্যকেই টিকিয়ে রাখতে চান।

৩. তালাক ও বিবাহবিচ্ছেদের ক্ষেত্রে কাজীর ক্ষমতার রাজনীতি:

আলেমদের আরেকটি প্রস্তাব হলো—রাষ্ট্র ইউনিয়ন পরিষদের অ-আলেম চেয়ারম্যানদের বিচারিক ক্ষমতা না দিয়ে, প্রতিটি জেলায় বিশেষায়িত ‘পারিবারিক শরিয়াহ আদালত’ গঠন করে সেখানে ঐতিহ্যবাহী ফিকহ ও আধুনিক আইনে দক্ষ ‘কাজী’ বা বিচারক নিয়োগ দিতে পারত। তাঁরা শরিয়াহর সীমানার ভেতরে থেকেই তালাক, ইদ্দত এবং ভরণপোষণের ফয়সালা দিতেন।

আপাতদৃষ্টিতে এটিকে যৌক্তিক মনে হলেও, আলেমদের আসল উদ্দেশ্য এখানে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তাদের এই দাবির মূল লক্ষ্য শরিয়াহর চেয়েও বেশি “নিজেদের ক্ষমতার পরিধি বিস্তার করা”। তারা চায় বিচারিক ক্ষমতা যেন ধর্মনিরপেক্ষ চেয়ারম্যানদের হাত থেকে ছুটে তাদের মতো মাদ্রাসায় পড়া ওলামা বা মুফতিদের পকেটে ঢোকে।

সবচেয়ে বড় তামাশা হলো, আলেমদের নিজস্ব যুক্তি মতেই যদি এই বিকল্পগুলোই সমাজকে জিনা ও কুরআন বিকৃতি থেকে বাঁচানোর একমাত্র উপায় হতো, তবে গত ছয় দশক ধরে তারা কেন এই বিকল্প আইনি মডেলগুলো বাস্তবায়নের জন্য রাষ্ট্র বা আদালতের দরজায় কোনো জোরালো দাবি তোলেনি? কেন তারা সাধারণ মানুষকে সাথে নিয়ে এই “শরিয়াহসম্মত বিকল্প” প্রতিষ্ঠার কোনো বুদ্ধিবৃত্তিক বা আইনি আন্দোলন গড়ে তোলেনি?

এর কারণ অত্যন্ত পরিষ্কার—তারা খুব ভালো করেই জানে, ১৯৬১ সালের এই বিকৃত আইনটি আসলে রাষ্ট্রশক্তির একটি শক্ত ঢাল। কিতাবের পাতায় একে ‘হারাম’ আর ‘কুফরি’ বলে সাধারণ মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিকে চাঙ্গা রাখা যায়, আর আদালতের টেবিলে এই কুফরি আইনকেই মুখ বুজে মেনে নিয়ে নিজেদের সুবিধাবাদী আখের গোছানো যায়। এই দ্বিমুখী ও সুবিধাবাদী চরিত্রই প্রমাণ করে যে, আধুনিকতাবাদী শাসক আর কট্টরপন্থী মৌলভি—উভয় পক্ষই আসলে নিজ নিজ স্বার্থে কুরআন ও শরিয়াহকে কেবল নিজেদের দাবার ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করেছে।

১০/ এই ভণ্ডামির শেখ কোথায়?

১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ওপর এই দীর্ঘ ও ধারাবাহিক বিশ্লেষণটি একটি নির্মম সত্যকে আমাদের সামনে স্পষ্ট করে তোলে। এই আইনটি তার প্রতিটি ছত্রে—তা মিরাস হোক, বহুবিবাহ হোক কিংবা তালাকের বিধান হোক—প্রচলতি শরিয়াহ এবং পবিত্র কুরআনের অকাট্য নস বা টেক্সটকে সরাসরি ভায়োলেট বা লঙ্ঘন করছে। এই সত্যটি আমাদের দেশের আলেম, মুফতি এবং ইসলামপন্থী দলগুলো খুব ভালো করেই জানে। তাদের কিতাব আর ফতোয়ার পাতায় এই আইনটি স্পষ্টতই একটি ‘লা-শরিয়তি’ আইন।

কিন্তু ট্র্যাজেডি হলো, এই কট্টরপন্থী সমাজ যখনই আইয়ুব খানের মতো কোনো স্বৈরাচারী সামরিক শক্তির মুখোমুখি হয়, তখন তাদের সমস্ত জিহাদি জোশ কর্পূরের মতো উড়ে যায়। বন্দুকের নলের ডগায় যখন তাদের শরিয়াহকে ক্ষতবহিত করা হয়, তখন তারা নিজেদের জান আর মাল রক্ষার্থে অত্যন্ত ভদ্র ও অনুগত নাগরিক সেজে সেই অনাচারকে মেনে নেয়। গত ষাট বছর ধরে তারা এই আইনটির বিরুদ্ধে একটি সফল আন্দোলন গড়ে তুলতে পারেনি, কারণ সামরিক বা শক্তিশালী একনায়কতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে রক্ত দেওয়ার মতো নৈতিক সাহস তাদের নেই।

বিপরীতপক্ষে, দেশের কোনো নরমপন্থী, উদার বা গণতান্ত্রিক সরকার যখন ক্ষমতায় আসে, তখন এই ওলামাদের রূপ সম্পূর্ণ বদলে যায়। সরকারের গণতান্ত্রিক সহনশীলতা ও নমনীয়তাকে তারা সরকারের ‘দুর্বলতা’ মনে করে। তখন তারা অত্যন্ত ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক সামাজিক বিষয়গুলোকে কেন্দ্র করে রাজপথে ব্লাসফেমি বা ধর্ম অবমাননার ধুয়া তুলে সাধারণ মানুষকে খেপিয়ে তোলে। তারা একটি নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকারের স্থিতিশীলতা নষ্ট করতে তাদের পূর্ণ শক্তি নিয়োগ করে, অথচ ঘরের ভেতরে চেপে বসা ১৯৬১ সালের আসল শরিয়াহ লঙ্ঘনের বিশাল পাহাড়টি নিয়ে তারা কোনো আন্দোলন করে না।

এই দ্বিমুখী নীতিই প্রমাণ করে যে, এই তথাকথিত শরিয়াহর রক্ষকদের প্রধান চালিকাশক্তি আল্লাহর দ্বীন রক্ষা নয়, বরং ক্ষমতা ও সুবিধাবাদের নোংরা রাজনীতি। তারা শক্তিশালী শাসকের সামনে দাস, আর সহনশীল শাসকের সামনে উন্মত্ত। যতক্ষণ না সাধারণ জনগণ তাদের এই ধর্মীয় ভণ্ডামি ও মুনাফেকির মুখোশ চিনতে পারবে, ততক্ষণ পর্যন্ত ইসলামের নামে এই ধরণের সিলেক্টিভ বা সুবিধাবাদী আন্দোলনের নাটক আমাদের সমাজে চলতেই থাকবে। তথ্যের ভিত্তিতে এবং ইতিহাসের নিরিখে এটিই বর্তমান সময়ের সবচেয়ে কঠোর ও অকাট্য সত্য।

আরও দেখুন: