সংগীতের আড্ডায় একটা কথা খুব প্রচলিত—আরোহণ-অবরোহণ যদি হয় একটা রাগের কঙ্কাল, আর পকড় যদি হয় তার চেনা মুখের অবয়ব বা পরিচয়চিহ্ন; তবে ‘চলন’ (Chalan) হলো সেই রাগের রক্ত-মাংসের আস্ত একটা জীবন্ত রূপ।
রাগের চলন: সুরের অবয়ব আর অলিগলির গল্প
সোজা বাংলায়, চলন হলো একটা রাগের হাঁটার ভঙ্গি বা তার চলাচলের নিজস্ব স্টাইল। একটা রাগের স্বরগুলো একে অপরের সাথে কীভাবে গল্প করবে, কোন স্বর থেকে লাফ দিয়ে কোন স্বরে যাওয়া হবে, সুরের যাত্রাপথে কোথায় একটু জিরিয়ে নেওয়া হবে, আর কোথায় মায়াবী মীড় বা স্বরের দোলন (আন্দোলন) দেওয়া হবে—এই সবকিছুর অলিখিত নিয়মকানুনই হলো চলন। এই চলনের হাত ধরেই একটা রাগ অলস ভঙ্গিতে ডানা মেলে এবং তার আসল রস ও মেজাজটা শ্রোতার মনের ভেতর চারিয়ে দেয়।
চলুন, খটমটে তাত্ত্বিক কথা বাদ দিয়ে আমাদের চেনা কিছু রাগের চালচলন একটু পরখ করে নেওয়া যাক:
১. রাগ ভৈরব (ধীর ও গম্ভীর পদচারণা)
ভোরের এই রাগের চলনটা কেমন জানেন? একদম শান্ত, গুরুগম্ভীর আর ধীরস্থির। এর চলনের রূপটা কিছুটা এরকম:
সা, গ ম প, ধ্ ধ্ প, ম গ ম ঋ ঋ সা
(Sa, Ga Ma Pa, Dha Dha Pa, Ma Ga Ma Re Re Sa)
ভৈরবের আসল জাদুটা প্রকাশ পায় যখন সুর কোমল ধৈবত (ধ্) থেকে আলতো করে পঞ্চমে (প) নেমে আসে, কিংবা কোমল ঋষভ (ঋ)-এ এসে থিতু হয়। এই স্বরগুলোর ওপর যখন শিল্পী একধরণের সূক্ষ্ম কম্পন বা আন্দোলন তৈরি করেন, তখনই ভৈরবের সেই আধ্যাত্মিক আর ধ্যানমগ্ন রূপটা জীবন্ত হয়ে ওঠে।
২. রাগ ইমন (উজ্জ্বল আলোর বিকাশ)
আমাদের অতি পরিচিত ইমনের চলনটা আবার অন্যরকম:
নি রে g, রে সা, প ম^ গ রে, নি রে সা
(Ni Re Ga, Re Sa, Pa Ma♯ Ga Re, Ni Re Sa)
ইমন সাধারণত একদম নিচু সুর (মন্দ্র সপ্তক) থেকে লাজুক পায়ে যাত্রা শুরু করে, তারপর বুক ফুলিয়ে মধ্য ও তার সপ্তকের দিকে এগিয়ে যায়। এর কড়ি মধ্যম (ম^) এমন এক মায়াবী উজ্জ্বলতা তৈরি করে যে পুরো সুরের পরিবেশটাই কেমন যেন রোমান্টিক আর তৃপ্তিময় মনে হয়।
৩. রাগ ভূপালী (গান্ধারের রাজত্ব)
ভূপালীর চলন অত্যন্ত সরল, নিটোল আর মন্থর গতির:
সা রে গ, রে সা ধ প, সা রে গ প গ, রে সা
(Ga Re Sa Dha Pa, Sa Re Ga Pa Ga, Re Sa)
যেহেতু মাত্র পাঁচটি স্বরের খেলা, তাই কোনো লুকোচুরি নেই। তবে এর বিশেষত্ব হলো, সুরটা বারবার ঘুরেফিরে ‘গা’ (গ) স্বরের ওপর এসে ভর করে। এই একটি স্বরের ওপর দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার কারণেই ভূপালীতে এক অনাবিল ভক্তি আর প্রশান্তি দানা বাঁধে।
স্বর এক, কিন্তু হাঁটার ভঙ্গি আলাদা!
চলন আসলে একটা রাগের নিজস্ব ব্যক্তিত্ব। কখনো কখনো দুটো রাগের ব্যবহৃত স্বর বা ঠাট একদম এক হতে পারে, কিন্তু শুধু তাদের হাঁটার ভঙ্গি বা চলন আলাদা হওয়ার কারণে তারা দুটো ভিন্ন রাগে রূপ নেয়। যেমন—রাগ মারোয়া এবং রাগ পুরিয়া। স্বরলিপির দিক থেকে এদের মধ্যে যমজ ভাইয়ের মতো মিল, কিন্তু একটার চলন ওপরের দিকে আর অন্যটার ঝোঁক নিচের দিকে। আর এই চলনের কারণেই এদের মেজাজ সম্পূর্ণ আলাদা।
চলুন, আরও কিছু রাগের বিশেষ চলনের জাদুকরী রূপ দেখে নেওয়া যাক:
- রাগ বৃন্দাবনী সারং (দুপুরের বাঁক): এর চলনটা (নি সা রে, ম প নি সা’, রে’ নি সা’, ন্ ধ প, ম রে, নি সা রে সা) কখনো সোজা পথে চলে না। অবরোহের সময় যখন কোমল নি (ন্) ব্যবহার করা হয়, সুরটা তখন এমন একটা মোচড় বা বাঁক নেয় যে নিমিষেই চেনা দুপুরের অলস মেজাজটা চোখের সামনে ভেসে ওঠে।
- রাগ কামোদ (রাজকীয় লাফ): কামোদ রাগটি তার বক্র আর আভিজাত্যময় চালের জন্য বিখ্যাত। এর চলনে (সা রে প, ম প ধ প, গ ম রে সা, রে প) ‘রে’ থেকে সরাসরি ‘প’-তে একটা লম্বা লাফ দেওয়া হয়, আর তারপর ‘ম-প-ধ-প’ করে সুরটা চর্কির মতো ঘোরে। এই রাজকীয় ভঙ্গিটাই কামোদের আসল সিগনেচার।
- রাগ গৌড় সারং (সুরের লুকোচুরি): এর চলনটা (সা গ রে ম, গ প, ম ধ প, নি ধ সা’, রে’ নি ধ প, ম গ, রে ম গ, রে সা) খাঁটি জিকজ্যাক বা আঁকাবাঁকা। সুর সরল পথে না গিয়ে কখনো একপা এগোয়, তো দুপা পিছিয়ে যায়। এই যে স্বরগুলোর একে অপরের সাথে মায়াবী লুকোচুরি, এটাই গৌড় সারং-এর আসল সৌন্দর্য।
- রাগ হামীর (বীরত্বের গর্জন): হামীরের চলনটা (সা রে গ ম, প ধ নি ধ সা’, সা’ নি ধ প, ম^ প ধ প ম প গ ম রে) বলিষ্ঠ আর তেজি। কড়ি মধ্যম (ম^) আর শুদ্ধ মধ্যম (ম)-এর মেলবন্ধনে সুরটা যখন দ্রুত নিচের সপ্তক থেকে তার সপ্তকে ধাবিত হয়, মনে হয় কোনো রাজা বীরদর্পে হেঁটে যাচ্ছেন।
পুরো ব্যপারটা যদি আমরা একটু সহজ করে ভাবি—
আরোহণ-অবরোহণ হলো কোনো একটা অচেনা শহরের প্রধান বড় রাস্তা, পকড় হলো সেই শহরের বুকে দাঁড়িয়ে থাকা মস্ত বড় কোনো চেনা ল্যান্ডমার্ক, আর চলন হলো সেই শহরের অলিগলি আর চিপা-চুপা দিয়ে হেঁটে বেড়ানোর এক বাস্তব রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা।
আমরা যখন কোনো বড় ওস্তাদ বা পণ্ডিতের মুখে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আলাপ, ধ্রুপদ বা খেয়ালের বন্দিশ শুনি, তখন আমরা মূলত ওই রাগের চেনা-অচেনা অলিগলিগুলোতেই ঘুরে বেড়াই। আর এই অলিগলি চেনার নামই হলো রাগের চলন আস্বাদন করা।
আরও দেখুন: