ধরা যাক, অনেকদিন পর রাস্তায় পুরোনো এক বন্ধুর সাথে আপনার দেখা। আপনি কিন্তু তার পুরো কোষ্ঠী বা বায়োডাটা মাথায় এনে তাকে চেনেন না; তার হাঁটার ধরণ, গলার আওয়াজ কিংবা হাসির ছোট্ট একটা টুকরো দেখেই এক সেকেন্ডে চিনে ফেলেন।
আমাদের শাস্ত্রীয় সংগীতের দুনিয়াতেও ঠিক এমন একটা জাদুকরী ব্যাপার আছে, যাকে বলা হয় ‘পকড়’। ‘পকড়’ শব্দটার আক্ষরিক অর্থ হলো ধরা বা আঁকড়ে ধরা। আর সংগীতের পরিভাষায় এর সোজা সাপটা মানে হলো—কোনো রাগের সবচেয়ে ছোট এবং সবচেয়ে চেনা সুরের সেই টুকরোটা, যা কান খাড়া করে শুনলেই একজন শ্রোতা বা শিল্পী হুট করে বলে দিতে পারেন, “আরে! এটা তো অমুক রাগ!” এই কারণেই সংগীতজ্ঞরা পকড়কে রাগের ডিএনএ, সিগনেচার বা পরিচয়পত্র বলে থাকেন। আরোহণ-অবরোহণ দিয়ে রাগের ব্যাকরণ বোঝা যায় সত্যি, কিন্তু পকড় হলো সেই রাগের আসল চেহারা।
রাগের পকড়: সুরের চাবিকাঠি ও রাগের ডিএনএ
চলুন, খুব বেশি তাত্ত্বিক কচকচালিতে না গিয়ে আমাদের চেনা কিছু রাগের পকড় দিয়ে ব্যাপারটা একটু সহজ করে বোঝা যাক:
১. রাগ ভৈরব (ভোরের ধ্যানমগ্ন সুর)
ভৈরবের নাম শুনলেই মনে হয় কোনো এক নিঝুম ভোরে কেউ ধ্যানে বসেছেন। এর পকড়টা হলো:
গ ম ধ্ ধ্ প, গ ম ঋ ঋ সা
(Ga Ma Dha Dha Pa, Ga Ma Re Re Sa)
ভৈরব রাগের মূল প্রাণ লুকিয়ে আছে এর কোমল ঋষভ (ঋ) আর কোমল ধৈবত (ধ্) স্বরের মধ্যে। এই স্বরগুলোর ওপর যখন শিল্পী আলতো করে একটু দোলন বা আন্দোলন দেন, তখনই ভৈরবের সেই গম্ভীর ও আধ্যাত্মিক মেজাজটা চট করে ধরা পড়ে।
২. রাগ ইমন (সন্ধ্যার আলো-আঁধারি)
আমাদের সবার প্রিয় এবং খুব চেনা একটা রাগ হলো ইমন। এর পকড়টা খেয়াল করুন:
নি রে গ রে সা, প ম^ গ রে সা
(Ni Re Ga Re Sa, Pa Ma♯ Ga Re Sa)
ইমন রাগটি বেশির ভাগ সময় একটু নিচু সুর (মন্দ্র সপ্তক) থেকে দানা বাঁধতে শুরু করে। আর এর প্রধান বিশেষত্ব হলো এর কড়ি মধ্যম (ম^)। এই তীব্র মধ্যম আর শুদ্ধ নিষাদের আলতো ছোঁয়ায় ইমনের পকড়টি শোনামাত্রই চারপাশের আবহ কেমন যেন শান্ত, উজ্জ্বল আর রোমান্টিক হয়ে ওঠে।
৩. রাগ ভূপালী (পাঁচ স্বরের সরলতা)
ভূপালী একটি ঔড়ব রাগ, অর্থাৎ এখানে মাত্র পাঁচটি স্বর (সা, রে, গ, প, ধ) খেলা করে। এর পকড়টি যেমন সরল, তেমনই মিষ্টি:
গ রে সা ধ্ সা, রে গ প গ, রে সা
(Ga Re Sa Dha Sa, Re Ga Pa Ga, Re Sa)
কোনো জটিলতা নেই, বক্রতা নেই। এই সীমিত স্বরের সহজ চালের কারণেই ভূপালীর পকড় শুনলেই মনের ভেতর এক অনাবিল শান্তি আর ভক্তিরস জেগে ওঠে।
৪. রাগ বৃন্দাবনী সারং (চপল ও লাবণ্যময়)
দুপুরবেলার এই রাগটির মেজাজ আবার একটু চঞ্চল। এর পকড়টা খুব ছোট:
নি সা রে, ম রে সা
(Ni Sa Re, Ma Re Sa)
এই রাগে দুই ধরণের ‘নি’ ব্যবহার করা হলেও, পকড়ের এই ‘রে-ম-রে’ অংশটুকুই সারং অঙ্গের আসল চাবিকাঠি। এটি শুনলেই দুপুরের তপ্ত রোদের মাঝে এক পশলা ঠাণ্ডা বাতাসের ছোঁয়া পাওয়া যায়।
৫. রাগ কামোদ (রাজকীয় বক্রতা)
কিছু রাগ আছে যারা সোজা পথে হাঁটতে একদম ভালোবাসে না। কামোদ তেমনি একটি বক্র ও রাজকীয় রাগ। এর পকড়টা দেখুন:
রে প, ম প ধ প, গ ম রে সা
এখানে ‘রে’ স্বর থেকে সরাসরি ‘প’-তে একটা লম্বা লাফ দেওয়া হয়, আর তারপর ‘ম-প-ধ-প’ করে সুরটা গোল হয়ে ঘুরে আসে। এই রাজকীয় মোচড়টা ছাড়া কামোদ রাগকে চেনাই অসম্ভব!
৬. রাগ গৌড় সারং ও হামীর (দুই বিপরীত মেজাজ)
গৌড় সারং-এর চলনটা হলো আঁকাবাঁকা বা জিকজ্যাক। এর পকড়টা (সা গ রে ম, গ প, রে সা) শুনলেই বোঝা যায় স্বরগুলো একে অপরের সাথে কেমন মায়াবী কুস্তিতে মেতেছে।
অন্যদিকে রাগ হামীরের পকড়টি (সা রে গ ম, ধ নি ধ সাঁ) শুনলে মনে হবে কোনো বীরযোদ্ধা বুক টান টান করে দাঁড়িয়ে আছেন। এর ‘ধ নি ধ সাঁ’ অংশটুকু মুহূর্তের মধ্যে এক তেজস্বী আভিজাত্য তৈরি করে।

আসলে, নতুন কোনো শ্রোতা বা শিক্ষার্থীর জন্য রাগের লম্বা আরোহণ-অবরোহণ মুখস্থ করার চেয়ে পকড়টা গুনগুন করে মনে রাখা অনেক বেশি সহজ। আপনি যদি প্রতিটি রাগের এই সিগনেচার সুরটুকু কানের ভেতর গেঁথে নিতে পারেন, তবে হাজারটা গানের ভিড়েও আসল রাগটিকে খুঁজে পেতে আপনার এক সেকেন্ডও সময় লাগবে না। পকড় হলো সুরের গোলকধাঁধায় পথ চেনার সবচেয়ে সহজ কম্পাস।
আরও দেখুন: