রাগের পকড় । অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীতে পকড় বলতে বোঝায় কোনো রাগের সবচেয়ে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ ও সংক্ষিপ্ত স্বরসমষ্টি বা ‘কি-ফ্রেজ’ (Key Phrase)। ‘পকড়’ শব্দের আক্ষরিক অর্থ হলো ধরা বা আঁকড়ে ধরা। সংগীতের পরিভাষায় এর অর্থ দাঁড়ায়—যে স্বরসমষ্টি বা স্বরচালন শুনে একজন শ্রোতা, শিক্ষার্থী কিংবা অভিজ্ঞ শিল্পী তৎক্ষণাৎ সেই রাগটিকে চিনে ফেলতে বা ‘ধরে’ ফেলতে পারেন, সেটিই পকড়। তাই অনেক সংগীতজ্ঞ পকড়কে রাগের ডিএনএ, স্বাক্ষর (Signature) বা পরিচয়চিহ্ন বলেও অভিহিত করেন। একটি রাগের বিস্তৃত রূপ বোঝার জন্য যেমন তার আরোহণ-অবরোহণ, বাদি-সম্বাদি বা চলন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি পকড় সেই রাগের সারসংক্ষেপকে খুব অল্প কয়েকটি স্বরের মধ্যেই প্রকাশ করে।

পকড় মূলত রাগের চরিত্র, আবহ এবং ভঙ্গিমাকে সংকেতের মতো তুলে ধরে। একটি পূর্ণাঙ্গ আলাপ বা বন্দিশ শোনার আগেই কখনো কখনো শুধুমাত্র পকড়ের কয়েকটি স্বর শুনেই শ্রোতা বুঝতে পারেন কোন রাগ পরিবেশিত হচ্ছে। এ কারণেই গুরু-শিষ্য পরম্পরায় রাগ শেখানোর সময় পকড় বিশেষ গুরুত্ব পায়।

উদাহরণ হিসেবে রাগ ভৈরব (Bhairav)-এর কথা বলা যায়। এই রাগের পকড় হলো—
গ ম ধ্ ধ্ প, গ ম ঋ ঋ সা
(Ga Ma Dha Dha Pa, Ga Ma Re Re Sa)।
ভৈরব রাগের মূল সৌন্দর্য নিহিত রয়েছে এর কোমল ঋষভ (Re) এবং কোমল ধৈবত (Dha) স্বরের বিশেষ ধরনের কম্পন বা আন্দোলন-এ। এই স্বরগুলোর উপর ধীর ও গম্ভীর দোলনের মাধ্যমে যে গভীর ও আধ্যাত্মিক আবহ সৃষ্টি হয়, তা ভৈরব রাগের প্রধান বৈশিষ্ট্য। পকড়টি শুনলেই সেই গুরুগম্ভীর ও ধ্যানমগ্ন মেজাজ অনুভূত হয়।

অন্যদিকে রাগ ইমন (Yaman)-এর পকড় হলো—
নি রে গ রে সা, প ম^ গ রে সা
(Ni Re Ga Re Sa, Pa Ma♯ Ga Re Sa)।
ইমন রাগের একটি লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হলো এটি অনেক সময় মন্দ্র সপ্তকের নি থেকে শুরু হয় এবং এতে ব্যবহৃত কড়ি মধ্যম (Teevra Ma) রাগটিকে বিশেষ স্বাতন্ত্র্য দেয়। শুদ্ধ নিখাদ ও তীব্র মধ্যমের সূক্ষ্ম প্রয়োগের ফলে ইমনের পকড় শুনলেই এর প্রশান্ত, উদার ও উজ্জ্বল আবহ স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

একইভাবে রাগ ভূপালী (Bhupali)-এর পকড় হলো—
গ রে সা ধ্ সা, রে গ প গ, রে সা
(Ga Re Sa Dha Sa, Re Ga Pa Ga, Re Sa)।
ভূপালী একটি ঔড়ব রাগ, অর্থাৎ এতে মাত্র পাঁচটি স্বর ব্যবহৃত হয়—সা, রে, গ, প এবং ধ। এই সীমিত স্বরের মধ্যেই রাগটির পকড় একটি মধুর ও শান্ত স্বরচালনের সৃষ্টি করে। ফলে ভূপালীতে এক ধরনের নির্মল, শান্ত ও ভক্তিময় রস অনুভূত হয়।

আসলে পকড় কেবল কয়েকটি স্বরের সমষ্টি নয়; এটি রাগের প্রকৃত ব্যক্তিত্ব বোঝার চাবিকাঠি। অনেক সময় দুটি রাগের স্বরলিপি বা ঠাট এক হলেও তাদের স্বরচালন ভিন্ন হয়, এবং সেই ভিন্নতাটি সবচেয়ে স্পষ্টভাবে প্রকাশ পায় পকড়ের মাধ্যমে। এই কারণে সংগীতজ্ঞরা পকড়কে রাগের পরিচয়মূলক সংকেত হিসেবেও বিবেচনা করেন।

উদাহরণস্বরূপ রাগ বৃন্দাবনী সারং (Brindabani Sarang)-এর পকড় হলো—
নি সা রে, ম রে সা
(Ni Sa Re, Ma Re Sa)।
এই রাগে আরোহণে শুদ্ধ ‘নি’ এবং অবরোহণে কোমল ‘নি’ ব্যবহৃত হলেও পকড়ের মধ্যেই এর চপল ও লাবণ্যময় চরিত্র ধরা পড়ে। বিশেষ করে ‘রে-ম-রে’ অংশটি সারং অঙ্গের রাগগুলোর অন্যতম পরিচায়ক।

একইভাবে রাগ কামোদ (Kamod)-এর পকড়—
রে প, ম প ধ প, গ ম রে সা
কামোদ রাগের স্বরচালন অত্যন্ত বক্র এবং কিছুটা রাজকীয় ভঙ্গিমার। এখানে ‘রে’ থেকে সরাসরি ‘প’-তে লাফ দেওয়া এবং তারপর ‘ম-প-ধ-প’-এর ঘূর্ণায়মান চলনই রাগটির বিশেষ পরিচয় বহন করে। এই চলনটি ছাড়া কামোদ রাগের স্বতন্ত্রতা স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে না।

আবার রাগ গৌড় সারং (Gaud Sarang)-এর পকড়—
সা গ রে ম, গ প, রে সা
এই পকড়ে স্বরগুলোর একটি জিকজ্যাক বা বক্র চলন লক্ষ্য করা যায়। সরল সোজা পথে না গিয়ে স্বরগুলোর পারস্পরিক জড়িয়ে থাকা ও ওঠানামার মধ্যেই রাগটির স্বতন্ত্রতা প্রকাশ পায়।

এছাড়া রাগ হামীর (Hamir)-এর পকড়—
সা রে গ ম, ধ নি ধ সাঁ
এই পকড়ে একটি বলিষ্ঠ ও বীরত্বপূর্ণ ভঙ্গি রয়েছে। বিশেষ করে ‘ধ নি ধ সাঁ’ অংশটি রাগটির তেজস্বী ও আভিজাত্যময় আবহকে মুহূর্তের মধ্যেই শ্রোতার সামনে তুলে ধরে।

সবশেষে বলা যায়, নতুন কোনো শ্রোতা বা শিক্ষার্থীর জন্য রাগ চেনার ক্ষেত্রে আরোহণ-অবরোহণ মুখস্থ করার চেয়ে পকড় মনে রাখা অনেক সহজ এবং কার্যকর। যদি কেউ প্রতিটি রাগের পকড়টি গুনগুন করে মনে রাখতে পারেন, তবে অসংখ্য গান বা পরিবেশনার ভিড়েও সেই রাগটিকে শনাক্ত করা তার জন্য অনেক সহজ হয়ে যায়। তাই রাগসংগীত শেখা বা বোঝার ক্ষেত্রে পকড়কে বলা যায় রাগের সংক্ষিপ্ত অথচ শক্তিশালী পরিচয়পত্র