রাগ খামাজ (Khajmaj) হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সংগীতের একটি অত্যন্ত জনপ্রিয়, চঞ্চল এবং মধুর রাগ। এটি তার ললিত গায়নশৈলী এবং শৃঙ্গার রসের প্রাচুর্যের কারণে শাস্ত্রীয় সংগীতের আসর থেকে শুরু করে আধুনিক উপ-শাস্ত্রীয় সংগীতের ক্ষেত্রেও এক অনন্য স্থান দখল করে আছে।
রাগ খামাজ
রাগ খামাজ হলো খামাজ ঠাট-এর আশ্রয় রাগ। এটি একটি অতি প্রাচীন রাগ এবং ভারতীয় সংগীতের ইতিহাসে এর গুরুত্ব অপরিসীম। খামাজ মূলত ‘শৃঙ্গার’ বা প্রেম রসের রাগ হিসেবে পরিচিত। মুঘল আমল থেকে শুরু করে আধুনিক কাল পর্যন্ত ঠুমরি, দাদরা এবং টপ্পা গায়কির জন্য খামাজ একটি অপরিহার্য রাগ। এই রাগের প্রকৃতি এতই নমনীয় যে, এতে রাধাকৃষ্ণের প্রেমের লীলা বা বিরহের আর্তি অত্যন্ত চমৎকারভাবে ফুটে ওঠে।
খামাজ রাগের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এতে দুটি নিষাদের (শুদ্ধ ও কোমল) ব্যবহার। এর আরোহে শুদ্ধ নিষাদ (নি) এবং অবরোহে কোমল নিষাদ (ণি) ব্যবহৃত হয়। আরোহে ঋষভ (রে) বর্জিত হওয়ায় এটি একটি বিশেষ মাধুর্য পায়। খামাজ রাগে শাস্ত্রীয় কঠোরতার চেয়ে ভাবের গভীরতা বেশি প্রাধান্য পায়। এই কারণে শাস্ত্রীয় খেয়ালের পাশাপাশি লঘু-শাস্ত্রীয় সংগীতে (যেমন—রবীন্দ্রসংগীত বা নজরুলগীতি) এই রাগের প্রভাব অত্যন্ত ব্যাপক।
রাগের শাস্ত্র
- ঠাট: খামাজ।
- জাতি: ষাড়ব-সম্পূর্ণ (আরোহে ৬ স্বর, অবরোহে ৭ স্বর)।
- আরোহ: সা গা মা পা ধা নি সা।
- অবরোহ: সা ণি ধা পা মা গা রে সা। (এখানে ‘ণি’ হলো কোমল নিষাদ)।
- বাদী স্বর: শুদ্ধ গান্ধার (গা)।
- সমবাদী স্বর: শুদ্ধ নিষাদ (নি)।
- বর্জিত স্বর: আরোহে ঋষভ (রে) বর্জিত।
- ব্যবহৃত স্বর: ষড়জ (সা), শুদ্ধ ঋষভ (রে), শুদ্ধ গান্ধার (গা), শুদ্ধ মধ্যম (মা), পঞ্চম (পা), শুদ্ধ ধৈবত (ধা), শুদ্ধ নিষাদ (নি) এবং কোমল নিষাদ (ণি)।
- সময়: রাত্রির দ্বিতীয় প্রহর (রাত ৯টা থেকে ১২টা)।
- প্রকৃতি: চঞ্চল, শৃঙ্গার রস প্রধান, মধুর এবং আবেদনময়ী।
সম্পর্কিত বা সদৃশ রাগ
- দেশ: খামাজের মতো দেশেও দুটি নিষাদ থাকে, তবে দেশে ঋষভ (রে) অত্যন্ত প্রবল এবং এর চলন ভিন্ন।
- তিলক কামোদ: আরোহে কিছু মিল থাকলেও তিলক কামোদের চলন খামাজের চেয়ে অনেক বেশি বক্র।
- ঝিনঝুটি: ঝিনঝুটি রাগে খামাজের স্বর থাকলেও এতে মন্দ্র ও মধ্য সপ্তকের কাজ বেশি থাকে এবং গাম্ভীর্য বেশি।
- জয়জয়ন্তী: এটি একটি জটিল রাগ যেখানে খামাজ ও কাফি অঙ্গের মিশ্রণ থাকে।
- গাড়া: গাড়া রাগে খামাজের ছায়া থাকলেও এতে ঋষভ ও ধৈবতের বিশেষ প্রয়োগ একে আলাদা করে।
খামাজ রাগের আসল সৌন্দর্য তার অবরোহের কোমল নিষাদ (ণি)-এর মধ্যে নিহিত। যখন শিল্পী আরোহে শুদ্ধ নিষাদ স্পর্শ করে তার সপ্তকের ষড়জে পৌঁছান এবং অবরোহে কোমল নিষাদের মধ্য দিয়ে ধৈবত ও পঞ্চমে নেমে আসেন, তখন এক অপূর্ব রোমান্টিক আবহ তৈরি হয়। এই রাগের বাদী স্বর ‘গা’ হওয়ায় সুরের বিস্তার মূলত মধ্য ও তার সপ্তককে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়।
ঠুমরি গায়কির ক্ষেত্রে খামাজকে বলা হয় ‘রাণীদের রাগ’। বেনারস ঘরানার শিল্পীদের কণ্ঠে খামাজের ঠুমরি এক অনন্য উচ্চতা পেয়েছে। খামাজে ‘গা মা পা ধা পা’ বা ‘নি ধা পা মা গা’—এই স্বর সংগতিগুলো বারবার ফিরে আসে। এই রাগে বিরহ এবং মিলন—উভয় ভাবই সমানভাবে ফুটিয়ে তোলা সম্ভব।
রাগ খামাজের সহজ সরল চলন এবং দুটি নিষাদের জাদুকরী সহাবস্থান একে সাধারণ শ্রোতা ও বোদ্ধা—উভয়ের কাছেই গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে। শাস্ত্রীয় সংগীতের কঠিন ব্যাকরণকে অক্ষুণ্ণ রেখেও কীভাবে সুরের মাধ্যমে মাধুর্য ও প্রেমকে শ্রেষ্ঠভাবে উপস্থাপন করা যায়, খামাজ রাগ তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
চলুন এবার কিছু গান বাজনা শোনা যাক ….
কণ্ঠে খাম্বাজ
আরোহ-আবরোহ এই লিঙ্ক গুলোতে গিয়ে শুনে নিতে পারেন । লিংক ১ ।
কাজী নজরুল ইসলামের গানে খাম্বাজ :
নজরুলের গানে খাম্বাজ রাগের প্রয়োগ অত্যন্ত ব্যাপক। তবে শুদ্ধ খাম্বাজ ছাড়াও তিনি অনেক সময় ‘মিশ্র খাম্বাজ’ ব্যবহার করেছেন।
১. “সৃজন-ছন্দে আনন্দে নাচো নটরাজ” — এটি খাম্বাজ রাগের একটি অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন। গানটির স্থায়ী ও অন্তরার চলন খাম্বাজ রাগের শাস্ত্রীয় কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে তৈরি। এটি মূলত একটি বন্দিশধর্মী গান।
২. “পরদেশী বঁধুয়া এলো রে” — এই গানটিতে খাম্বাজ রাগের চঞ্চল এবং লোকজ (Folk) মেজাজটি অত্যন্ত স্পষ্ট। এটি খাম্বাজ রাগের ‘খাম্বাজ ঠাট’ এবং আরোহে ‘রে’ বর্জিত হওয়ার বৈশিষ্ট্যটি নিখুঁতভাবে মেনে চলে।
৩. “গভীর রাতে জাগি খুঁজি তোমারে” — এটি খাম্বাজ রাগের একটি ধ্রুপদী অঙ্গের গান। এর সুরের ভাঁজে কোমল নিষাদ (ণি)-এর প্রয়োগ বিরহ ও আধ্যাত্মিক আকুলতাকে ফুটিয়ে তোলে।
৪. “কেন দিলে এ কন্টক পথ যদি কুসুম বন” — এই গানটিতে খাম্বাজ রাগের করুণ ও শৃঙ্গার রসের এক অনন্য সংমিশ্রণ দেখা যায়।
৫. “ভুলি কেমনে আজো যে মনে” — এটি একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় গান যা খাম্বাজ রাগের আধারে রচিত। (পূর্বের তালিকায় এটি উল্লিখিত ছিল এবং এটি তথ্যগতভাবে সঠিক)।
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের গানে খাম্বাজ:
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান বা রবীন্দ্রসংগীতের ক্ষেত্রে আপনার পর্যবেক্ষণটি অত্যন্ত গভীর এবং সংগীততাত্ত্বিক দিক থেকে বেশ সঠিক। রবীন্দ্রনাথ নিজে বিশ্বাস করতেন যে, গানের সুর রাগের দাস নয়, বরং রাগ সুরের অনুগামী। তিনি অনেক ক্ষেত্রে রাগের ব্যাকরণ ভেঙে নিজস্ব এক ‘রবীন্দ্র-সুর’ তৈরি করেছেন।
১. “বাজে করুণ সুরে” — এটি খাম্বাজ রাগের একটি বিশুদ্ধ উদাহরণ হিসেবে গণ্য করা হয়। এই গানে খাম্বাজের আরোহ-অবরোহ এবং কোমল নিষাদের (ণি) প্রয়োগ অত্যন্ত নিখুঁত।
২. “কাঁদালে তুমি মোরে ভালোবাসারই ঘায়ে” — এটিও খাম্বাজ রাগের আশ্রয়ে রচিত। তবে এখানে রবীন্দ্রনাথ রাগের গাম্ভীর্যের চেয়ে এর ‘আবেগ’ বা করুণ রসকে বেশি প্রাধান্য দিয়েছেন।
৩. “ফাগুন হাওয়ায় হাওয়ায় করেছি যে দান” — এই গানটিতে খাম্বাজ রাগের চঞ্চল প্রকৃতি ফুটে উঠেছে। যদিও এতে লোকজ সুরের কিছুটা স্পর্শ রয়েছে, তবুও এর মূল কাঠামো খাম্বাজ রাগের ওপর দাঁড়িয়ে।
৪. “সখী, আঁধারে একেলা ঘরে” — এই গানে খাম্বাজ রাগের নৈশ আমেজ ও বিরহী রূপটি স্পষ্টভাবে পাওয়া যায়।
৫. “ভালোবেসে সখী নিভৃত যতনে” — এটি মিশ্র খাম্বাজ বা পিলু-খাম্বাজের একটি চমৎকার উদাহরণ। এখানে রবীন্দ্রনাথ রাগের শুদ্ধতার চেয়ে সুরের মাধুর্যকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন।
আধুনিক বাংলা গানে খাম্বাজ :
আধুনিক বাংলা গানের ভাণ্ডারে খাম্বাজ (বা খামাজ) রাগের উপস্থিতি অত্যন্ত উজ্জ্বল। বিশেষ করে বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত সুরকাররা এই রাগের চঞ্চলতা, শৃঙ্গার রস এবং লোকজ সুরের সাথে এর সখ্যতাকে দারুণভাবে কাজে লাগিয়েছেন।
১. “ওগো নিরূপমা” (শিল্পী: কিশোর কুমার, সুরকার: আর. ডি. বর্মন) — এটি খাম্বাজ রাগের একটি অত্যন্ত আধুনিক এবং গতিশীল উদাহরণ। এর প্রমোদময় চলন এবং স্বরবিন্যাসে খাম্বাজের শুদ্ধ ও কোমল নিষাদের খেলা অত্যন্ত স্পষ্ট।
২. “এই কূলে আমি আর ওই কূলে তুমি” (শিল্পী: প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়, সুরকার: অনিল বাগচী) — খাম্বাজ রাগের করুণ ও বিরহী মেজাজ এই গানটিতে সার্থকভাবে ফুটে উঠেছে। এর সুরের গাঁথুনি শাস্ত্রীয় খাম্বাজের কাঠামোকে অনুসরণ করে।
৩. “আমি চন্দনা গো” (শিল্পী: আরতি মুখোপাধ্যায়) — এই গানটিতে খাম্বাজ রাগের চপলতা এবং মিষ্টত্ব দারুণভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। আরোহে ‘রে’ বর্জিত হওয়ার যে নিয়ম, তা এই গানে চমৎকারভাবে রক্ষিত।
৪. “যদি হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা আসত” (শিল্পী: সুবীর সেন) — এটি একটি জনপ্রিয় আধুনিক গান যা খাম্বাজ রাগের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। গানটির ছন্দে এবং সুরে খাম্বাজের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ স্বরসমষ্টি পাওয়া যায়।
৫. “বাঁশি শুনে কী ঘরে থাকা যায়” (শিল্পী: সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়) — এই গানটিতে খাম্বাজ রাগের সাথে বাংলার লোকজ সুরের (Folksy touch) এক অদ্ভুত মেলবন্ধন রয়েছে। এটি খাম্বাজ রাগের মায়াবী রূপটিকে তুলে ধরে।
গজলে খাম্বাজ :
গজল মূলত ‘শৃঙ্গার রস’ (প্রেম ও বিরহ) এবং ‘নমনীয়তা’র ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে, যা খাম্বাজ রাগের মূল চরিত্রের সাথে হুবহু মিলে যায়। গজলের আসরে খাম্বাজকে প্রায়ই ‘মিশ্র খাম্বাজ’ হিসেবে গাওয়া হয়, যা শিল্পীকে রাগের ব্যাকরণ কিছুটা শিথিল করে ভাব প্রকাশের স্বাধীনতা দেয়।
১. “আও পধোরো মারে দেশ” (শিল্পী: মেহদী হাসান) — এটি খাম্বাজ রাগের একটি লোকজ বা ‘মাড়’ অঙ্গের সংমিশ্রণে তৈরি গজল। মেহদী হাসানের কণ্ঠে খাম্বাজ রাগের গাম্ভীর্য এবং রাজস্থানি মাড় রাগের ছোঁয়া একে অনন্য করেছে।
২. “দিওয়ারোঁ সে মিলে কর রোনা আচ্ছা লাগতা হ্যায়” (শিল্পী: পঙ্কজ উদাস) — খাম্বাজ রাগের অত্যন্ত করুণ এবং বিরহী রূপ এই গজলে ফুটে উঠেছে। এতে খাম্বাজ রাগের কোমল নিষাদ (ণি)-এর প্রয়োগ বিরহের আর্তিকে আরও গভীর করে।
৩. “রঞ্জিশ হি সহি, দিল হি দুখানে কে লিয়ে আ” (শিল্পী: মেহদী হাসান) — যদিও এটি মূলত রাগ ইমন-এর ওপর ভিত্তি করে শুরু হয়, তবে অনেক শিল্পী (যেমন ফরিদ আয়োজ বা মেহদী হাসান নিজেই লাইভ কনসার্টে) এর অন্তরা এবং তানে খাম্বাজ ও পিলু রাগের মিশ্রণ ঘটান। এটি ‘মিশ্র খাম্বাজ’-এর একটি চমৎকার রেফারেন্স।
৪. “উও কভি মিল জায়েঁ তো কেয়া হো” (শিল্পী: গুলাম আলী) — পাতিয়ালা ঘরানার শিল্পী গুলাম আলী এই গজলে খাম্বাজ রাগের চপলতা এবং ঠুমরি মেজাজকে অত্যন্ত নিপুণভাবে ব্যবহার করেছেন।
৫. “বাত নিকলেগি তো ফির দূর তলক যায়েগি” (শিল্পী: জগজিৎ সিং) — জগজিৎ সিং এই কালজয়ী গজলে খাম্বাজ রাগের একটি অত্যন্ত সরল ও হৃদয়স্পর্শী রূপ ব্যবহার করেছেন। এতে খাম্বাজ রাগের স্বরবিন্যাস সাধারণ শ্রোতার কাছেও রাগের মাধুর্য পৌঁছে দেয়।
ভজনে খাম্বাজ :
ভজন মূলত ‘ভক্তি রস’ ও ‘শরনাগতি’র ওপর আধারিত, আর খাম্বাজ রাগের মিষ্টত্ব ও সরলতা এই ভাব প্রকাশের জন্য আদর্শ।
১. “বৈষ্ণব জন তো তেনে কহিযে” (গান্ধিজীর প্রিয় ভজন) — এটি খাম্বাজ রাগের ওপর ভিত্তি করে রচিত একটি বিশ্ববিখ্যাত ভজন। নরসিংহ মেহতার এই পদটিতে খাম্বাজ রাগের শান্ত ও ভক্তিপ্রধান রূপটি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।
২. “পায়ো জি ম্যায়নে রাম রতন ধন পায়ো” (শিল্পী: লতা মঙ্গেশকর/মীরাবাঈ-এর পদ) — মীরাবাঈয়ের এই পদটি বিভিন্ন রাগে গাওয়া হলেও, এর সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং প্রামাণ্য সুরটি ‘মিশ্র খাম্বাজ’-এর ওপর আধারিত। এতে খাম্বাজ রাগের প্রসন্নতা ও ভক্তির গভীরতা বিদ্যমান।
৩. “ঠুমকি চলত রামচন্দ্র” (শিল্পী: ডি. ভি. পলুস্কর/তুলসীদাসের পদ) — সন্ত তুলসীদাসের এই পদটি খাম্বাজ রাগের একটি অত্যন্ত উজ্জ্বল উদাহরণ। এতে শ্রীরামচন্দ্রের বাল্যরূপের চপলতা খাম্বাজ রাগের চঞ্চল প্রকৃতির সাথে হুবহু মিলে যায়।
৪. “শ্রীরামচন্দ্র কৃপালু ভজমন” (শিল্পী: লতা মঙ্গেশকর/অনুপ জালোটা) — এটি একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় স্তোত্র বা ভজন যা মূলত রাগ খাম্বাজ ও পিলু-এর সংমিশ্রণে (মিশ্র খাম্বাজ) গাওয়া হয়। এর ভক্তি ও শান্ত রসের আবেদন সর্বজনবিদিত।
৫. “ম্যায় তো সাভারে কে রঙ রাঁচি” (মীরা ভজন) — মীরাবাঈয়ের এই পদটি খাম্বাজ রাগের আশ্রয়ে গাওয়া হয়। কৃষ্ণপ্রেমের মাতোয়ারা ভাবটি খাম্বাজ রাগের স্বরবিন্যাসের মাধ্যমে অত্যন্ত নিপুণভাবে প্রকাশ পায়।
ঠুমরিতে খাম্বাজ :
ঠুমরিতে রাগ খাম্বাজ (বা খামাজ)-এর প্রয়োগ সবচেয়ে বেশি সার্থক এবং অনিবার্য। ঠুমরি গায়কির ইতিহাসে খাম্বাজকে বলা হয় “ঠুমরির রাণী”। এই রাগের চঞ্চলতা, শৃঙ্গার রস (প্রেম ও বিরহ) এবং স্বরের নমনীয়তা ঠুমরির ‘বোল-বনাও’ (শব্দের কারুকার্য) করার জন্য আদর্শ। ঠুমরিতে বিশুদ্ধ খাম্বাজের চেয়ে ‘মিশ্র খাম্বাজ’-এর ব্যবহার বেশি হয়, যেখানে শিল্পী ভাবের প্রয়োজনে অন্য রাগের স্বর স্পর্শ করার স্বাধীনতা পান।
১. “কা করুঁ সজনি আয়ে না বালম” (শিল্পী: উস্তাদ বড়ে গোলাম আলী খাঁ) — এটি খাম্বাজ রাগের ঠুমরির এক কালজয়ী দলিল। পাতিয়ালা ঘরানার এই প্রবাদপ্রতিম শিল্পী খাম্বাজ রাগের বিরহী রূপটিকে এই ঠুমরিতে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। এতে খাম্বাজ ও পিলুর এক অপূর্ব সংমিশ্রণ লক্ষ্য করা যায়।
২. “পিয়া তো মানত নাহি” (শিল্পী: আবদুল করিম খাঁ) — কিরানা ঘরানার প্রতিষ্ঠাতা উস্তাদ আবদুল করিম খাঁর কণ্ঠে এই ঠুমরিটি খাম্বাজ রাগের এক অত্যন্ত মিষ্ট ও শান্ত রূপ। এতে খাম্বাজ রাগের কোমল নিষাদ (ণি) এবং গান্ধার (গা)-এর প্রয়োগ শ্রোতার হৃদয়ে গভীর আবেদন তৈরি করে।
৩. “অব কে সাওয়ান ঘর আ যা” (শিল্পী: বেগম আখতার) — ‘গজল কুইন’ বেগম আখতারের কণ্ঠে এই ঠুমরিটি খাম্বাজ রাগের চঞ্চলতা এবং বর্ষার বিরহকে ধারণ করে আছে। খাম্বাজ রাগের ‘রে-পা’ এবং ‘মা-গা’ সংগতিগুলো এতে অত্যন্ত নিপুণভাবে ব্যবহৃত হয়েছে।
৪. “নাহক লায়ে গবনবা” (শিল্পী: গিরিজা দেবী) — বেনারস ঘরানার ‘ঠুমরি সম্রাজ্ঞী’ গিরিজা দেবীর এই ঠুমরিটি খাম্বাজ রাগের আভিজাত্য ও লোকজ মেজাজের এক সার্থক রূপ। বেনারসি ঠুমরির যে বিশেষ ঢঙ, তা খাম্বাজ রাগের ওপর ভিত্তি করেই এতে ফুটে উঠেছে।
৫. “বাত চলত নয়ি চুনরি রং ডারি” (শিল্পী: পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তী/শোভা গুরতু) — এটি একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং চপল মেজাজের ঠুমরি যা মূলত খাম্বাজ রাগের ওপর আধারিত। শ্রীকৃষ্ণের হোলি খেলার চপলতা খাম্বাজ রাগের চঞ্চল প্রকৃতির সাথে হুবহু মিশে গেছে।
যন্দ্রে খাম্বাজ :
সেতারে খাম্বাজ:
সেতারের ইতিহাসে রাগ খাম্বাজ (বা খামাজ) বাজানোর ক্ষেত্রে ইমদাদখানী (বিলায়েতখানী) এবং মৈহার—এই দুই ঘরানার শিল্পীরা এক অনন্য উচ্চতা তৈরি করেছেন।
১. উস্তাদ বিলায়েত খাঁ: ইমদাদখানী ঘরানার এই রেকর্ডিংয়ে সেতারে কণ্ঠসংগীতের অনুকরণে খাম্বাজ রাগের ঠুমরি অঙ্গ, বিশেষ মিঁড় এবং চপল গায়কি মেজাজ অত্যন্ত নিপুণভাবে ফুটে উঠেছে।
২. পণ্ডিত রবিশঙ্কর: মৈহার ঘরানার এই পরিবেশনায় খাম্বাজ রাগের শাস্ত্রীয় আভিজাত্যের সাথে লোকজ সুরের এক অপূর্ব মেলবন্ধন এবং তবলার সাথে জাদুকরী লয়কারী ও ঝালা লক্ষ্য করা যায়।
৩. পণ্ডিত নিখিল বন্দ্যোপাধ্যায়: এই রেকর্ডিংয়ে খাম্বাজ রাগের চপলতাকে ছাপিয়ে এক গভীর, শান্ত এবং আধ্যাত্মিক গাম্ভীর্য প্রতিফলিত হয়েছে যেখানে প্রতিটি স্বরের প্রয়োগ অত্যন্ত নিখুঁত ও শ্রুতিমধুর।
৪. উস্তাদ শহীদ পারভেজ খান: আধুনিক সেতার বাদনের এই প্রামাণ্য রূপটিতে খাম্বাজ রাগের দ্রুত গতির তান, জটিল স্বরবিন্যাস এবং ইমদাদখানী ঘরানার গায়কি ঢঙের এক চমৎকার সমন্বয় ঘটেছে।
৫. উস্তাদ সুজাত খাঁ: এই পরিবেশনায় খাম্বাজ রাগের একটি অত্যন্ত রোমান্টিক এবং লঘু-শাস্ত্রীয় রূপ পাওয়া যায় যেখানে সেতারের সুরের সাথে শিল্পীর কণ্ঠের গুঞ্জন রাগের মায়াবী আবহকে পূর্ণতা দেয়।
সারদে খাম্বাজ:
সরোদ বাদনে রাগ খাম্বাজ (বা খামাজ) একটি অত্যন্ত বিশেষ স্থান দখল করে আছে। সেতারের চপলতার চেয়ে সরোদে এই রাগের গাম্ভীর্য এবং ‘মীড়’-এর কাজগুলো অনেক বেশি জোরালোভাবে ফুটে ওঠে।
১. উস্তাদ আলী আকবর খাঁ (মৈহার ঘরানা): মৈহার ঘরানার এই প্রবাদপ্রতিম শিল্পীর সরোদে খাম্বাজ রাগের এক অত্যন্ত গভীর, প্রশান্ত এবং আধ্যাত্মিক রূপ ফুটে উঠেছে যা এই রাগের শাস্ত্রীয় আভিজাত্যকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়।
২. পণ্ডিত বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত (শাহজাহানপুর ঘরানা): তাঁর সরোদ বাদনে খাম্বাজ রাগের অত্যন্ত শুদ্ধ রূপ এবং বিশেষ করে এই রাগের তাত্ত্বিক ও ব্যাকরণগত সূক্ষ্মতা ও চমৎকার ‘তান’-এর কাজগুলো স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করা যায়।
৩. উস্তাদ আমজাদ আলী খাঁ (সেনিয়া বঙ্গশ ঘরানা): তাঁর পরিবেশনায় খাম্বাজ রাগের অত্যন্ত চঞ্চল, রোমান্টিক এবং লঘু-শাস্ত্রীয় ঠুমরি অঙ্গের এক অপূর্ব প্রকাশ পাওয়া যায় যা শ্রোতার হৃদয়ে সরাসরি আবেদন তৈরি করে।
৪. উস্তাদ হাফিজ আলী খাঁ (সেনিয়া বঙ্গশ ঘরানা): এই ঐতিহাসিক রেকর্ডিংটিতে খাম্বাজ রাগের অত্যন্ত প্রাচীন এবং বিশুদ্ধ রূপটি সংরক্ষিত হয়েছে যেখানে সরোদের প্রতিটি ঘষট ও মীড় রাগের মূল চরিত্রকে মূর্ত করে তোলে।
৫. উস্তাদ আশীষ খাঁ (মৈহার ঘরানা): আলী আকবর খাঁর পুত্র আশীষ খাঁর সরোদে খাম্বাজ রাগের মৈহার ঘরানার ঐতিহ্যবাহী গায়ককি ঢঙ এবং আধুনিক লয়কারীর এক চমৎকার সমন্বয় লক্ষ্য করা যায়।
খেয়ালে খাম্বাজ:
খেয়াল গায়কিতে রাগ খাম্বাজ (বা খামাজ) অত্যন্ত বিরল এবং কঠিন একটি বিষয়, কারণ এই রাগটি মূলত ঠুমরি বা লঘু-শাস্ত্রীয় সংগীতের জন্য বেশি পরিচিত।
১. উস্তাদ রশিদ খান: রামপুর-সহসওয়ান ঘরানার এই শিল্পীর কণ্ঠে খাম্বাজ রাগের বিলম্বিত ও দ্রুত খেয়াল অত্যন্ত মিড়-প্রধান এবং তাঁর বিশেষ দানাদার তানের কাজ রাগের প্রতিটি স্বরকে উজ্জ্বল করে তোলে।
২. উস্তাদ আমীর খান: ইন্দোর ঘরানার এই মহীরুহের কণ্ঠে খাম্বাজ রাগের অতি বিলম্বিত খেয়াল এক গভীর আধ্যাত্মিক প্রশান্তি ও গাম্ভীর্য বয়ে আনে, যেখানে ‘মেরুখণ্ড’ পদ্ধতির স্বর-বিস্তার লক্ষ্য করার মতো।
৩. পণ্ডিত কুমার গান্ধর্ব: তাঁর গাওয়া ‘কেদার-খাম্বাজ’ (মিশ্র রাগ) এক অনন্য সৃষ্টি, যেখানে তিনি প্রচলিত রাগের কাঠামো ভেঙে কেদারের আভিজাত্য ও খাম্বাজের মাধুর্যের এক নতুন রূপ ফুটিয়ে তুলেছেন।
৪. বিদুষী কিশোরী আমোনকর: জয়পুর-আত্রৌলি ঘরানার এই শিল্পীর কণ্ঠে খাম্বাজ রাগের এক অত্যন্ত পরিশীলিত এবং বুদ্ধিবৃত্তিক রূপ পাওয়া যায়, যেখানে তিনি রাগের প্রতিটি স্বরের সূক্ষ্ম ও ললিত প্রয়োগ দেখিয়েছেন।
৫. পণ্ডিত মুকুল শিবপুত্র: কুমার গান্ধর্বের সুযোগ্য পুত্র হিসেবে তাঁর কণ্ঠে খাম্বাজ রাগের এক সাবলীল ও স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ পাওয়া যায়, যা পিতার বিশেষ শৈলী ও বিশুদ্ধ ব্যাকরণের এক চমৎকার মিশ্রণ।
৬. বিদুষী শুভ্রা গুহ: শুভ্রা গুহ মূলত আগ্রা ঘরানার ঠুমরি ও খাম্বাজের জন্য বিখ্যাত; অন্যদিকে বিদুষী শোভা মুডগালের কণ্ঠে খাম্বাজ রাগের বন্দিশে অত্যন্ত বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর ও রাগের চমৎকার রঙ ফুটে ওঠে যা শাস্ত্রীয় আভিজাত্যের দাবিদার।
টিউটোরিয়াল:
যেকোনো রাগের স্বরের চলাফেরা বোঝার জন্য ২/৫ টি স্বর-মালিকা বা সারগম-গীত শোনা দরকার। স্বর মল্লিকার পাশাপাশি দু একটি লক্ষণ গীত (বা ছোট খেয়াল) শুনলে সহজ হতে পারে। লক্ষণ গীত মূলত শেখানো হয় রাগের লক্ষণগুলো সহজে ধরতে। লক্ষণ গীত ছোট খেয়াল প্রায় একই কাজ করে। অনলাইনে অনেক গুলো আছে। একটু খোঁজাখুঁজি করলে পেয়ে যাবেন। স্যাম্পল হিসেবে নিচের দুটো লিংক দেয়া হল।
১. রাগ খাম্বাজের স্বরমল্লিকা।
২. এনিসিআরটির টিউটোরিয়াল।
রিলেটেড রাগ:
খাম্বাজ সম্পর্কে আরও জানার জন্য:
১. উইকি আর্টিকেল
২. অটোমেটেড ট্রান্সক্রিপশন প্রজেক্ট এর- খাম্বাজ কেদার
শ্রোতা সহায়িকা নোট সিরিজে আজকের রাগ – রাগ আড়ানা বা আডানা। এই আর্টিকেলটির উন্নয়ন কাজ চলমান রয়েছে। আপডেট পেতে আবারো আসার আমন্ত্রণ রইলো।
আরও দেখুন:
