শ্রোতা সহায়িকা নোট সিরিজে আজকের রাগ – রাগ জৈনপুরী [ Raga Jaunpuri ] । এই আর্টিকেলটির উন্নয়ন কাজ চলমান রয়েছে। আপডেট পেতে আবারো আসার আমন্ত্রণ রইলো।
রাগ জৈনপুরী
ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের ভাণ্ডারে রাগ জৈনপুরী (Jaunpuri) একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং প্রভাবশালী রাগ। এই রাগের নামকরণ এবং সৃষ্টির ইতিহাস বেশ কৌতূহল উদ্দীপক। প্রচলিত ইতিহাস অনুযায়ী, ১৫শ শতাব্দীর জৌনপুরের সুলতান শরকি বা সুলতান হুসেন শরকি এই রাগের স্রষ্টা। তিনি তৎকালীন লোকজ সুর এবং শাস্ত্রীয় কাঠামোর সংমিশ্রণে এই রাগটি তৈরি করেছিলেন বলে একে ‘জৈনপুরী’ বলা হয়। এটি মূলত আশাবরী ঠাটের অন্তর্গত একটি রাগ।
জৈনপুরী রাগের বিশেষত্ব হলো এর ভক্তি ও করুণ রসের সংমিশ্রণ। এটি দিনের দ্বিতীয় প্রহরে গীত হয়, যখন সকালের স্নিগ্ধতা কাটিয়ে সূর্য মধ্যগগনের দিকে এগিয়ে চলে। এই সময়ে রাগ জৈনপুরীর বিস্তার শ্রোতার মনে এক ধরণের বৈরাগ্য এবং সমর্পণের ভাব জাগ্রত করে। অনেকে একে ‘আশাবরী’ রাগের সাথে গুলিয়ে ফেলেন, কিন্তু জৈনপুরীতে নিষাদ (ণি) স্বরটি আরোহ ও অবরোহ উভয় ক্ষেত্রেই ব্যবহৃত হয়, যা একে আশাবরী থেকে আলাদা ও আরও রঞ্জক করে তোলে। এর গায়নশৈলী গম্ভীর হলেও এতে দ্রুত তানের কাজ অত্যন্ত চমৎকার শোনায়।
রাগের শাস্ত্র
- ঠাট: আশাবরী।
- জাতি: ষাড়ব-সম্পূর্ণ (আরোহে ৬টি এবং অবরোহে ৭টি স্বর ব্যবহৃত হয়)।
- আরোহ: সা রে মা পা দা ণি র্সা
- নোটেশন: সা রে মা পা দা ণি র্সা (এখানে কোমল ধৈবত ও কোমল নিষাদ ব্যবহৃত)।
- অবরোহ: র্সা ণি দা পা মা গা রে সা
- নোটেশন: র্সা ণি দা পা মা জ্ঞা রে সা (এখানে কোমল গান্ধার, কোমল ধৈবত ও কোমল নিষাদ ব্যবহৃত)।
- বাদী স্বর: ধৈবত (দা)।
- সমবাদী স্বর: গান্ধার (জ্ঞা)।
- বর্জিত স্বর: আরোহে গান্ধার (গা) স্বরটি বর্জিত। অবরোহে কোনো স্বর বর্জিত নয়।
- ব্যবহৃত স্বর: ঋষভ (রে) ও পঞ্চম (পা) শুদ্ধ; গান্ধার (জ্ঞা), ধৈবত (দা) ও নিষাদ (ণি) কোমল।
- সময়: দিন দ্বিতীয় প্রহর (সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত)।
- প্রকৃতি: ভক্তি ও করুণ রস প্রধান; গম্ভীর প্রকৃতির রাগ।
কয়েকটি চলন:
১. সা রে মা পা, দা পা, মা পা, ণি দা পা।
২. মা পা ণি র্সা, র্সা ণি দা পা।
৩. মা পা দা ণি দা পা, মা গা রে সা।
আরোহ-আবরোহ এই লিঙ্ক গুলোতে গিয়ে শুনে নিতে পারেন । লিংক ১ ।
“দরবারী কানাড়া” ও “আড়ানা (Adana)” রাগের সাথে জৈনপুরী রাগের পার্থক্য:
জৈনপুরী দরবারী রাগের খুব একই নোট, আবার চলাফেরাতেও কিছু মিল থাকার কারণে শুরুর দিকে শ্রোতাদের কাছে মাঝে মধ্যে একটু মিশিয়ে যেতে পারে। তাই পার্থক্যটা লিখে রাখলাম।
দরবারী কানাড়া, আদানা এবং জৈনপুরী—এই তিনটি রাগের স্বর (সা রে জ্ঞা মা পা দা ণি) একই হলেও এদের গায়নশৈলী সম্পূর্ণ আলাদা। দরবারী হলো সমুদ্রের গভীরতা, যা নিচু স্বরে গুমরে মরে। আদানা হলো পাহাড়ের ঝর্না, যা উঁচু স্বরে দ্রুত বেগে ছুটে চলে। আর জৈনপুরী হলো ভোরের প্রার্থনা, যা মধ্য ও উঁচু সপ্তকে ভক্তিময় পরিবেশ তৈরি করে। সবচেয়ে বড় পার্থক্য হলো কোমল গান্ধার (জ্ঞা); দরবারীতে এটি আন্দোলিত ও বক্র, আদানায় এটি সংক্ষিপ্ত, আর জৈনপুরীতে এটি একদম সহজ ও স্পষ্ট।
মুল পার্থক্যগুলো হল:
- দরবারী কানাড়া বেশিরভাগ সময় মন্দ্র এবং মধ্য সপ্তকে বিকশিত হয়, আর জৌনপুরী মাঝারি এবং উপরের সপ্তকে বেশি বিকশিত হয়। আড়ানা মূলত তার সপ্তকে খোলে।
- দরবারী কানাড়ার আবেদন খুব গভীর এবং এক ধরনের মহিমান্বিত বিষয় আছে। অন্যদিকে জৌনপুরী অনেকটা হালকা মেজাজে তৈরি হয়। এদিকে আড়ানা একটু অস্থির মেজাজ তৈরি করে।
- জৈনপুরী রাগটি আশাবরী রাগ-অঙ্গের রাগ হবার কারণে এটার চলাফেরা আশাবরীর মূর্ততার কাছাকাছি অবয়বে আসে। অন্যদিকে দরবারী কানাড়া রাগটি “কানাড়া” রাগ অঙ্গের মূর্ততার কাছাকাছি অবয়বে আসে।
- এই দুটি রাগগুলির মধ্যে সবচেয়ে বড়, কিন্তু সূক্ষ্ম পার্থক্যটি হল, কোমল গান্ধারের ব্যবহার। দরবারি কানাড়ার আন্দোলিত অতি কোমল গান্ধার একেবারেই আলাদা (আরোহের সময় রিশব এই দিকে ঝোঁক আর অবরোহণের সময় মধ্যম এর দিকে ঝোঁক), দীর্ঘ, খুবই সাবধানতার সাথে করা হয়, যেটা অন্যান্য রাগ স্পষ্ট ভাবে আলাদা করে।
এই অঙ্গের কারণে দরবারি কানাড়া ও আডানার মধ্যে শুরুতে বেশি মিল বেশি মনে হবে। পরে মিল মনে হবে জৈনপুরীরর সাথে। তবে শুনতে শুনতে সব পরিস্কার হয়ে যাবে। এছাড়া আরও অনেক সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে যেগুলো বোঝার জন্য বিভিন্ন কম্পোজিশন শোনার কোন বিকল্প নেই।
এই ভিডিওটিতে ওস্তাদ মেহদি হাসান খান দরবারী রাগের “কুবাকু ফ্যায়ল গ্যায়ে” গজলটি গাইবার আগে জৈনপুরী ও দরবারীর পার্থক্য দেখিয়েছেন:
আধুনিক গানে জৈনপুরী:
১. ঐ উজ্জ্বল দিন ডাকে স্বপ্ন রঙিন — শিল্পী: হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। (এটি রাগ জৈনপুরীর ওপর ভিত্তি করে তৈরি বাংলা আধুনিক গানের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। এর সুরের চড়াই-উতরাই ও বিস্তার জৈনপুরীর আরোহ-অবরোহকে নিখুঁতভাবে অনুসরণ করে)।
২. খাঁচার পাখি ছিল সোনার খাঁচায় — শিল্পী: পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তী / আরতি মুখোপাধ্যায়। (রবীন্দ্রসংগীত হলেও এটি রাগ জৈনপুরীর প্রভাবে সুরারোপিত। এর প্রতিটি মিড় ও স্বরবিন্যাসে জৈনপুরীর আর্তি স্পষ্ট)।
৩. কেন দূরে থাকো শুধু আড়াল রাখো — শিল্পী: আশা ভোঁসলে। (এই বিখ্যাত আধুনিক গানটিতে জৈনপুরী রাগের ছোঁয়া অত্যন্ত স্পষ্ট, যা গানের বিষণ্ণ মেজাজকে ফুটিয়ে তোলে)।
গজলে জৈনপুরী:
গজল গায়কিতে রাগ জৈনপুরী তার আভিজাত্য এবং বিরহী মেজাজের কারণে অত্যন্ত জনপ্রিয়। বিশেষ করে মধ্যাহ্নের এই রাগের কোমল স্বরগুলো (জ্ঞা, দা, ণি) যখন গজলে ব্যবহৃত হয়, তখন তা এক অদ্ভুত একাকীত্ব এবং আধ্যাত্মিক আর্তি তৈরি করে।
১. দিল মেঁ এক ল্যাহের সি উঠি হ্যায় আভি — শিল্পী: গোলাম আলী।
এটি রাগ জৈনপুরী-র ওপর ভিত্তি করে তৈরি গজলের সবচেয়ে বিখ্যাত উদাহরণ। এর স্থায়ী এবং অন্তরায় জৈনপুরীর ‘সা রে মা পা দা ণি র্সা’ চলনটি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। গোলাম আলী সাহেব এই গজলে জৈনপুরীর শুদ্ধতা বজায় রেখে চমৎকার তান ও মুরকির কাজ করেছেন।
২. মুঝসে প্যাহলি সি মোহাব্বত মেরে মেহবুব না মাঙ্গ — শিল্পী: নূরজাহান / ফৈয়জ আহমেদ ফৈয়জ (কবিতা হিসেবে)।
ফৈয়জ আহমেদ ফৈয়জের এই অমর সৃষ্টিতে সুরারোপ করা হয়েছে রাগ জৈনপুরী-র আদলে। এর গাম্ভীর্য এবং বিরহী মেজাজ জৈনপুরী রাগের সাথে হুবহু মিলে যায়।
৩. কাহাঁ আকে রুকে থে রাস্তে — শিল্পী: মেহেদী হাসান।
শাহেনশাহ-এ-গজল মেহেদী হাসান এই গজলটি রাগ জৈনপুরী-র অত্যন্ত ধীর ও গম্ভীর চালে গেয়েছেন। এর স্বরবিন্যাস এবং মিড়গুলো জৈনপুরীর ব্যাকরণকে নিখুঁতভাবে অনুসরণ করে।
৪. খুলি জো আঁখ তো ও থা, না ও জামানা থা — শিল্পী: গুলাম আলী।
এই গজলটিতে জৈনপুরী রাগের একটি করুণ এবং স্মৃতিচারণমূলক রূপ পাওয়া যায়। এটি মূলত মিশ্র জৈনপুরী-র একটি চমৎকার নিদর্শন।
ভজনে জৈনপুরী:
ভজন গায়কিতে রাগ জৈনপুরী অত্যন্ত গম্ভীর, ভক্তিময় এবং সমর্পণমূলক এক পরিবেশ তৈরি করে। এই রাগের আশাবরী অঙ্গের চলন ঈশ্বরের প্রতি আকুলতা প্রকাশের জন্য অত্যন্ত উপযোগী।
১. ঘর মেঁ পধারো গজাননজি — শিল্পী: পণ্ডিত রাজন ও সাজন মিশ্র / বিভিন্ন শিল্পী। (এটি রাগ জৈনপুরীর ওপর ভিত্তি করে তৈরি একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় গণেশ ভজন। এর আরোহ-অবরোহ এবং স্থায়ী-অন্তরার কাজগুলো জৈনপুরী রাগের শুদ্ধ রূপকে চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তোলে)।
২. পায়োজি ম্যায়নে রাম রতন ধন পায়ো — শিল্পী: লতা মঙ্গেশকর / ডি. ভি. পালুস্কর। (মীরাবাঈয়ের এই বিখ্যাত পদটি সাধারণত রাগ জৈনপুরী-মিশ্র বা আশাবরী অঙ্গে গাওয়া হয়। এর মধ্যে জৈনপুরীর স্বরবিন্যাস এবং ভক্তি রস অত্যন্ত প্রবল)।
৩. প্রভু মেরে অবগুণ চিত না ধরো — শিল্পী: পণ্ডিত ভীমসেন জোশী / অনুপ জালোটা। (সুরদাসের এই পদটি অনেক ক্ষেত্রে জৈনপুরী রাগের কাঠামোতে গাওয়া হয়। এর গম্ভীর ও করুণ সুর ভক্তের আর্তিকে প্রকাশ করতে সাহায্য করে)।
৪. তেরে মন মেঁ রাম তন মেঁ রাম — শিল্পী: বিভিন্ন ভজন গায়ক। (এই ভজনটি জৈনপুরী রাগের সরল ও মধুর চলনের ওপর ভিত্তি করে তৈরি, যা সাধারণ শ্রোতাদের কাছেও অত্যন্ত জনপ্রিয়)।
ঠুমরিতে জৈনপুরী:
ঠুমরি গায়কির ক্ষেত্রে রাগ জৈনপুরী-র ব্যবহার তুলনামূলকভাবে কম, কারণ জৈনপুরী একটি অত্যন্ত গম্ভীর এবং শাস্ত্রীয় ব্যাকরণ-প্রধান রাগ। ঠুমরিতে সাধারণত যে চপলতা বা ‘খটকা-মুরকি’র কাজ থাকে, তা জৈনপুরীর গম্ভীর মেজাজের সাথে কিছুটা বিপরীত। তবুও, বেনারস ঘরানার শিল্পীরা এই রাগের করুণ রসকে কাজে লাগিয়ে কিছু চমৎকার ঠুমরি ও দাদরা সৃষ্টি করেছেন।
১. বাজে ঝুনঝুন প্যায়লিয়া — শিল্পী: বিদুষী গিরিজা দেবী। (বেনারস ঘরানার এই প্রবাদপ্রতিম শিল্পী জৈনপুরী রাগের ‘ঠুমরি-অঙ্গ’ বা চৈত্রি আঙ্গিকে এই পদটি অত্যন্ত নিপুণভাবে পরিবেশন করেছেন। এর মধ্যে জৈনপুরীর গম্ভীর মেজাজের সাথে ঠুমরির মাধুর্য মিশে আছে)।
২. সুঘর বানাও লাড়িলী — শিল্পী: পণ্ডিত ছন্নুলাল মিশ্র। (বেনারস গায়কির এই অনন্য শিল্পী জৈনপুরী রাগের ওপর ভিত্তি করে তৈরি এই ঠুমরি-সদৃশ পদটি গেয়েছেন। এতে জৈনপুরীর শুদ্ধ স্বরবিন্যাস এবং ঠুমরির ললিত ভাব—উভয়ই স্পষ্ট)।
৩. পিয়া বিন না হ্যায় চৈন — শিল্পী: বিভিন্ন বেনারস ঘরানার শিল্পী। (এটি মূলত একটি মিশ্র জৈনপুরী বা আশাবরী অঙ্গের ঠুমরি। বিরহী মনের আকুলতা প্রকাশে জৈনপুরীর কোমল স্বরগুলো এখানে অত্যন্ত কার্যকরভাবে ব্যবহৃত হয়েছে)।
৪. রাগ জৈনপুরীতে পতিয়ালার ওস্তাদ বড় ফাতেহ আলী খাঁ সাহেবের বিখ্যাত “লাগান লাগে মরি” :
যন্দ্রে জৈনপুরী:
সেতারে জৈনপুরী:
সেতারে রাগ জৈনপুরী বাজানো বেশ চ্যালেঞ্জিং, কারণ এর বিশেষ স্বরবিন্যাস এবং ‘দা-পা’ বা ‘মা-পা-দা-ণি-দা-পা’-এর মতো মিড়ের কাজগুলো সেতারে ফুটিয়ে তুলতে উচ্চমানের নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন। আপনার উল্লেখ করা ওস্তাদ শহীদ পারভেজ খাঁ এই রাগের আধুনিক ও তেজোদীপ্ত রূপায়ণে অনন্য।
নিচে ফ্যাক্ট চেক করে সেতারে রাগ জৈনপুরীর প্রামাণ্য তালিকা দেওয়া হলো:
১. উস্তাদ শহীদ পারভেজ খাঁ (ইমদাদখানী ঘরানা): তাঁর সেতারে রাগ জৈনপুরীর এক অসাধারণ গায়ন-অঙ্গ (Vocal style) ফুটে ওঠে। বিশেষ করে তার সপ্তকে তাঁর দ্রুত গতির তান এবং নিখুঁত ‘তন্ত্ৰকারী’ এই রাগের উজ্জ্বলতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। তাঁর বাজানো জৈনপুরীর ‘ঝালা’ এবং দ্রুত লয়ের গৎ সেতার প্রেমীদের কাছে অত্যন্ত প্রিয়। তাঁর বিভিন্ন কনসার্ট রেকর্ডিং এবং অ্যালবাম (যেমন: The Great Heritage সিরিজ)।
২. পণ্ডিত নিখিল বন্দ্যোপাধ্যায় (মাইহার ঘরানা): সেতারে জৈনপুরী রাগের সবচেয়ে গম্ভীর এবং আধ্যাত্মিক রূপটি তাঁর বাজনায় পাওয়া যায়। তাঁর ধীর গতির ‘আলাপ’ এবং মন্দ্র সপ্তকের কাজ এই রাগের ভক্তি রসকে পূর্ণতা দেয়। তিনি প্রায়ই জৈনপুরীর বিশুদ্ধ রূপটি বাজাতেন। তাঁর লাইভ কনসার্টের সংকলন (ইউটিউবে Nikhil Banerjee Raga Jaunpuri লিখে সার্চ করলে পাওয়া যাবে)।
৩. পণ্ডিত রবিশঙ্কর (মাইহার ঘরানা): তিনি জৈনপুরী রাগের একটি অত্যন্ত রঞ্জক ও ছন্দময় রূপ পরিবেশন করতেন। তাঁর সেতারে এই রাগের ‘জোড়’ এবং বিভিন্ন তালের (যেমন—রূপক বা ঝাপতাল) প্রয়োগ লক্ষ্যণীয়। তাঁর ঐতিহাসিক কনসার্ট রেকর্ডিং দেখুন।
৪. উস্তাদ বিলায়েত খাঁ (ইমদাদখানী ঘরানা): শহীদ পারভেজ খাঁ সাহেবের ঘরানার এই প্রধান পুরুষ সেতারে জৈনপুরী রাগের যে সূক্ষ্ম মিড় ও ‘খটকা’ ব্যবহার করতেন, তা অনেকটা কণ্ঠসংগীতের মতো শোনায়। তাঁর বাজনায় জৈনপুরীর করুণ রস অত্যন্ত তীব্র।
সরদে জৈনপুরী:
সরদে রাগ জৈনপুরী এক গম্ভীর ও রাজকীয় মাত্রা পায়। সরদের ধাতব ও প্রতিধ্বনিময় শব্দ এই রাগের আশাবরী অঙ্গের গাম্ভীর্যকে চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তোলে। আপনার উল্লিখিত দুজন দিকপাল শিল্পীর পরিবেশনা এই রাগের প্রামাণ্য দলিল হিসেবে স্বীকৃত।
১. উস্তাদ আলী আকবর খাঁ (মাইহার ঘরানা): তাঁর সরদে রাগ জৈনপুরীর এক অত্যন্ত আধ্যাত্মিক ও মরমী রূপ পাওয়া যায়। তিনি মূলত এই রাগের ‘আলাপ’ এবং ‘জোড়’ অংশে মন্দ্র ও মধ্য সপ্তকের কাজ দিয়ে এক ধীরস্থির আবহের সৃষ্টি করতেন। তাঁর বাজানো জৈনপুরী অনেক সময় অত্যন্ত করুণ ও শান্ত রসের উদ্রেক করে। তাঁর বিখ্যাত অ্যালবামসমূহ এবং কনসার্ট আর্কাইভ (ইউটিউবে Ali Akbar Khan - Raga Jaunpuri লিখে সার্চ করলে তাঁর পূর্ণাঙ্গ পরিবেশনা পাওয়া যাবে)।
২. পণ্ডিত বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত (শাহজাহানপুর ঘরানা): তাঁর সরদে জৈনপুরী রাগের গাণিতিক শুদ্ধতা এবং রাগের কাঠামোগত স্পষ্টতা অতুলনীয়। বিশেষ করে তাঁর ‘তন্ত্ৰকারী’ এবং দ্রুত লয়ের ‘গৎ’-এ জৈনপুরীর উজ্জ্বল ও তেজোদীপ্ত রূপটি প্রকাশ পায়। তিনি এই রাগের আরোহ-অবরোহের ব্যাকরণ অত্যন্ত কঠোরভাবে মেনে চলতেন। তাঁর বিভিন্ন শাস্ত্রীয় সংকলন এবং আকাশবাণীর (AIR) রেকর্ডিং।
৩. উস্তাদ আমজাদ আলী খাঁ (সেনিয়া সেহরাওয়াত ঘরানা): তাঁর সরদে জৈনপুরী রাগের একটি অত্যন্ত দ্রুত এবং ছন্দময় রূপ পাওয়া যায়। তাঁর ‘একহারা তান’ এবং আঙুলের ক্ষিপ্র কাজ এই রাগে এক নতুন গতিশীলতা যোগ করে। তাঁর বিভিন্ন লাইভ কনসার্টের ভিডিও এবং অডিও রেকর্ড।
খেয়ালে জৈনপুরী :
১. উস্তাদ রশিদ খাঁ (রামপুর সহসওয়ান ঘরানা) তাঁর কণ্ঠে রাগ জৈনপুরী এক অনন্য উচ্চতা লাভ করেছে। বিশেষ করে তাঁর বিখ্যাত বন্দিশ ‘বাজ রে ঝনঝন প্যায়লিয়া’ (দ্রুত একতাল) এবং ‘পিয়া ঘর আও’ অত্যন্ত জনপ্রিয়। তাঁর গায়কিতে এই রাগের মধ্য ও তার সপ্তকের উজ্জ্বলতা চমৎকারভাবে ফুটে ওঠে।
২. উস্তাদ আমীর খাঁ (ইন্দোর ঘরানা) আমীর খাঁ সাহেব জৈনপুরী রাগের অত্যন্ত গম্ভীর এবং আধ্যাত্মিক রূপটি পরিবেশন করতেন। তাঁর বিলম্বিত খেয়ালের শান্ত ও মন্থর চলন এই রাগের ভক্তি রসকে পূর্ণতা দেয়। তাঁর ‘খাম্বাজ’ বা ‘মারোয়া’-র মতো জৈনপুরীও একটি প্রামাণ্য রেকর্ড হিসেবে স্বীকৃত।
৩. পণ্ডিত কুমার গান্ধর্ব (জোড়-রাগ: কেদার-জৈনপুরী) কুমার গান্ধর্ব তাঁর নিজস্ব সৃজনশীলতায় দুটি ভিন্ন প্রকৃতির রাগকে মিলিয়ে ‘কেদার-জৈনপুরী’ নামক একটি অপূর্ব মিশ্র রাগ তৈরি করেছিলেন। কেদারের শুদ্ধ মধ্যম এবং জৈনপুরীর কোমল স্বরের এই সংমিশ্রণ তাঁর গায়কির এক অনন্য সম্পদ।
৪. বিদুষী কিশোরী আমোনকর (জয়পুর-আত্রৌলি ঘরানা) জয়পুর ঘরানার বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী তাঁর জৈনপুরী ছিল অত্যন্ত জটিল স্বরবিন্যাস ও ‘বক্র’ তানের কাজে ঠাসা। তাঁর গাওয়া জৈনপুরীর বন্দিশ ‘কাহে কো ললচায়ে’ একটি মাইলফলক হিসেবে গণ্য হয়।
৫. পণ্ডিত মুকুল শিবপুত্র : কুমার গান্ধর্বের পুত্র এবং শিষ্য হিসেবে তিনি তাঁর পিতার উত্তরাধিকার বহন করেন। তাঁর কণ্ঠে জৈনপুরী রাগের শুদ্ধতা এবং ভাবগাম্ভীর্য অত্যন্ত প্রামাণ্য। তাঁর লাইভ কনসার্টের জৈনপুরী রেকর্ডিংগুলো ইন্টারনেটে এবং আর্কাইভে সংরক্ষিত আছে।
৬. বিদুষী শোভা মুডগাল : তাঁর শক্তিশালী ও ভরাট গলায় জৈনপুরী রাগের বীর ও করুণ রসের এক অদ্ভুত মিশ্রণ পাওয়া যায়। তিনি শাস্ত্রীয় খেয়ালের পাশাপাশি জৈনপুরী অঙ্গের ভজন ও আধা-শাস্ত্রীয় গানেও সমান পারদর্শী।

আরও দেখুন:

![SufiFaruq.com Logo 252x68 2 রাগ জৈনপুরী । অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ 2 রাগ জৈনপুরী [ Raga Jaunpuri ] সহজে চেনার উপায় । শ্রোতা সহযোগী নোট !](https://sufifaruq.com/wp-content/uploads/2022/09/SufiFaruq.com-Logo-252x68-2.png)