রাগ ভৈরব মিশ্রিত যত রাগ । অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতে ভৈরব একটি ‘আদি’ এবং ‘জনক’ রাগ।  ভৈরবের গম্ভীর, আধ্যাত্মিক এবং শান্ত প্রকৃতি একে অন্যান্য রাগের তুলনায় এক অনন্য আভিজাত্য দান করেছে। এই রাগের কাঠামোগত দৃঢ়তা এতই বেশি যে, বিভিন্ন ঘরানার পণ্ডিত ও ওস্তাদগণ ভৈরবের সাথে অন্যান্য রাগের সংমিশ্রণ ঘটিয়ে সৃষ্টি করেছেন অসংখ্য বৈচিত্র্যময় ‘মিশ্র রাগ’ বা ‘জোড় রাগ’।

রাগ ভৈরব মিশ্রিত যত রাগ

সর্বাধিক জনপ্রিয় ও প্রচলিত ভৈরব অঙ্গসমূহ

এই রাগগুলো শাস্ত্রীয় সংগীতের আসরে নিয়মিত পরিবেশিত হয় এবং এদের নিজস্ব স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে উঠেছে:

  • অহির ভৈরব: এটি ভৈরব এবং কাফী রাগের এক অপূর্ব সমন্বয়। ভৈরবের কোমল ঋষভ ও কোমল ধৈবতের সাথে কাফী রাগের কোমল নিষাদ যুক্ত হয়ে এতে এক গভীর মরমী আবেদন তৈরি করে।
  • নট ভৈরব: ভৈরব এবং নট রাগের সংমিশ্রণ। এর পূর্বাঙ্গ নট রাগের মতো শুদ্ধ ঋষভ প্রধান এবং উত্তরাঙ্গ ভৈরবের মতো গম্ভীর। পণ্ডিত রবিশঙ্কর এই রাগকে বিশেষ জনপ্রিয় করেছেন।
  • আনন্দ ভৈরব: ভৈরব ও বিলাবল রাগের সংমিশ্রণ। এতে শুদ্ধ ও কোমল—উভয় ঋষভের সূক্ষ্ম কারুকার্য লক্ষ্য করা যায়।
  • রামকালী: ভৈরব ঠাটের এই রাগে শুদ্ধ মধ্যমের পাশাপাশি তীব্র মধ্যম এবং কোমল নিষাদের চতুর প্রয়োগ একে ভৈরব থেকে পৃথক এক উজ্জ্বলতা দান করে।

 

দুর্লভ ও আধ্যাত্মিক মিশ্র ভৈরবসমূহ

এই রাগগুলো মূলত দুটি ভিন্ন রসের মিলন ঘটিয়ে এক নতুন অনুভূতির সৃষ্টি করে:

  • প্রভাত ভৈরব: ভৈরব এবং ললিত রাগের মিলন। ললিতের ‘উভয় মধ্যম’ প্রয়োগের কারণে ভোরের নিস্তব্ধতায় এই রাগটি এক অপার্থিব আধ্যাত্মিকতা তৈরি করে।
  • শিবমত ভৈরব: ভৈরব এবং শিবরঞ্জনী রাগের জোড়। এতে কোমল গান্ধারের প্রয়োগ থাকায় এটি অত্যন্ত করুণ ও ভক্তি রসপ্রধান।
  • বিরাট ভৈরব: ভৈরব এবং আসাবরী রাগের সংমিশ্রণ। এর গাম্ভীর্য ‘বিরাট’ বা বিশালত্বের অনুভূতি জাগিয়ে তোলে।
  • কবিরী ভৈরব: সাধক কবিরের নামে নামাঙ্কিত এই রাগটি ভৈরব ও আসাবরী অঙ্গের মিশ্রণ, যা নির্গুণ ভক্তির পরিচয় দেয়।

 

অপ্রচলিত ও ঘরানা-ভিত্তিক বিশেষ ভৈরবসমূহ

বিশেষ বিশেষ ঘরানার ওস্তাদগণ এই রাগগুলোকে সংরক্ষণ করে রেখেছেন:

  • গৌরী ভৈরব: ভৈরব ও গৌরী রাগের মিলন, যা প্রাচীন ও তান্ত্রিক আরাধনার মেজাজ বহন করে।
  • মন্ড ভৈরব: রাজস্থানি লোকসংগীতের ‘মাণ্ড’ সুরের সাথে ভৈরবের সংমিশ্রণ। এতে ভোরের গাম্ভীর্যের সাথে এক ধরণের লোকজ মিষ্টতা থাকে।
  • জৌন ভৈরব: ভৈরব এবং জৌনপুরী রাগের শৈল্পিক মিলন।
  • আসা ভৈরব: ভৈরব এবং আসা রাগের মিশ্রণ, যা উত্তরাঙ্গে আসাবরীর ছায়া দেয়।
  • হুসাইনী ভৈরব: ভৈরব এবং হুসাইনী কানাডার সংমিশ্রণ। এটি সুফি বা মরমী মেজাজের একটি বিরল রাগ।
  • ভাটিয়ারী ভৈরব: ভৈরব ও ভাটিয়ার রাগের মিশ্রণ।

 

 অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রকারভেদ

ভৈরব ঠাটের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে আরও কিছু রাগ রয়েছে:

  • কলিঙ্গড়া: স্বরবিন্যাস ভৈরবের মতো হলেও এর প্রকৃতি অত্যন্ত চঞ্চল ও উজ্জ্বল।
  • দেবরঞ্জনী: দক্ষিণ ভারতীয় উৎসজাত এই রাগে পঞ্চম ও গান্ধার বর্জিত থাকে।
  • মেঘরঞ্জনী: এই রাগে পঞ্চম ও নিষাদ বর্জিত থাকে, যা এক ধরণের শূন্যতা ও বৈরাগ্য সৃষ্টি করে।
  • কৌশি ভৈরব: ভৈরব এবং মালকোষ রাগের মিলন, যেখানে কোমল গান্ধার, কোমল ধৈবত ও কোমল নিষাদের খেলা চলে।

 

সারসংক্ষেপ ও বৈশিষ্ট্য

ভৈরব মিশ্রিত এই বিশাল রাগভাণ্ডারের কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা প্রতিটি রাগকে একটি সুতোয় গেঁথে রাখে:

১. সময়: এই তালিকার প্রায় প্রতিটি রাগই প্রাতঃকালীন (ভোর ৪টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত)।

২. স্বর: প্রায় সব রাগে কোমল ঋষভ (রে) এবং কোমল ধৈবত (ধা)-এর উপস্থিতি অপরিহার্য।

৩. রস: ভক্তি, শান্ত এবং করুণ রসই এই রাগগুলোর প্রধান প্রাণ।

ভৈরব মিশ্রিত এই রাগগুলো প্রমাণ করে যে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীত কতটা নমনীয় এবং সৃজনশীল। একটি মূল রাগের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে কীভাবে রসের ভিন্নতায় শত শত নতুন সুরের সৃষ্টি হতে পারে, তার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ হলো এই ‘ভৈরব পরিবার’।

তথ্যসূত্র:

পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখণ্ডে রচিত ‘হিন্দুস্তানি সংগীত পদ্ধতি’, বসন্তের ‘সংগীত বিশারদ’ এবং বিমলকান্ত রায় চৌধুরীর ‘ভারতীয় সংগীতকোষ’।

আরও দেখুন: