বাঁশগ্রাম গ্রাম, ৭ নং বাগুলাট ইউনিয়ন, কুমারখালী, কুষ্টিয়া

কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালী উপজেলার অন্তর্গত ৭ নং বাগুলাট ইউনিয়নের ৪ নং ওয়ার্ডের একটি ঐতিহাসিক, রাজনীতি-সচেতন, শিক্ষানুরাগী এবং অর্থসামাজিকভাবে অত্যন্ত গতিশীল জনপদ হলো বাঁশগ্রাম। প্রাক-স্বাধীনতা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, জনপ্রতিনিধিত্ব, ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা এবং সুফি ফারুক ইবনে আবুবকরের সামাজিক ও ডিজিটাল রূপান্তরের নানামুখী উদ্যোগের কারণে গ্রামটি কুমারখালী তথা কুষ্টিয়া অঞ্চলে এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

ভৌগোলিক অবস্থান ও সীমানা

বাঁশগ্রাম বাগুলাট ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ড ও নির্দিষ্ট মৌজার অন্তর্ভুক্ত এবং ভৌগোলিকভাবে এটি ইউনিয়নের প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত। গ্রামটির চারপাশের সীমানা নিম্নরূপ:
  • উত্তর: বানিয়াখড়ি ও ভড়ুয়াপাড়া গ্রাম
  • পূর্ব: আদাবাড়িয়া গ্রাম
  • দক্ষিণ: কুশলিবাসা গ্রাম
  • পশ্চিম: দুর্বাচারা গ্রাম
আশেপাশের এই গ্রামগুলোর সংযোগস্থলে অবস্থানের কারণে বাঁশগ্রাম বাগুলাট ইউনিয়নের অন্যতম প্রধান যোগাযোগ, সামাজিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র বা হাব (Hub) হিসেবে কাজ করে।

রাজনৈতিক ইতিহাস

বাঁশগ্রামের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর সমৃদ্ধ ইতিহাস এবং রাজনীতি ও শিক্ষার অনন্য মেলবন্ধন। এই গ্রামের স্বনামধন্য সুফি পরিবার ও রাজনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে একাধিক প্রখ্যাত ব্যক্তিত্ব উঠে এসেছেন:
  • সুফি আইনুদ্দিন (রহ.): বাঁশগ্রামের বিশিষ্ট শিক্ষানুরাগী ও দানবীর ব্যক্তিত্ব। তিনি স্থানীয় শিক্ষার প্রসারে বাঁশগ্রাম বহুমুখী মাধ্যমিক বিদ্যালয়, আলাউদ্দিন আহমেদ ডিগ্রি কলেজ এবং বাঁশগ্রাম কামিল মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার জন্য স্বপ্রণোদিত হয়ে নিজ মালিকানাধীন জমি দান করেন। তাঁর এই অনন্য অবদানের ওপর ভিত্তি করেই গ্রামে শিক্ষার মজবুত ভিত্তি গড়ে ওঠে।
  • আব্দুল বারি: তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের জ্যেষ্ঠ (সিনিয়র) সহ-সভাপতি হিসেবে তিনি ১৯৬০-এর দশকে ছাত্র আন্দোলন ও স্বাধীনতাকামী সংগ্রামের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংগঠক ছিলেন।
  • আব্দুর রউফ: বাঁশগ্রামের এই প্রখ্যাত সন্তান পরবর্তীতে সংসদ সদস্য (এমপি) হিসেবে জাতীয় সংসদে এলাকার প্রতিনিধিত্ব করেন।
  • সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর: বিশিষ্ট তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ, শিক্ষানুরাগী, সমাজসেবক ও রাজনীতি-সচেতন ব্যক্তিত্ব। তিনি সুফি আইনুদ্দিন (রহ.)-এর পৌত্র (নাতী) এবং তৎকালীন ছাত্রলীগ নেতা আব্দুল বারি ও এমপি আব্দুর রউফ—এঁরা দুজনই সুফি ফারুকের আপন মামা।

সুফি ফারুক ইবনে আবুবকরের প্রধান আর্থিক সহযোগিতায় বাঁশগ্রাম বাজারের আধুনিক ও দৃষ্টিনন্দন জামে মসজিদটি নির্মিত হয়, যা বর্তমানে এলাকার প্রধান ধর্মীয় মিলনকেন্দ্র।

সুফি ফারুকের পারিবারিক নিবাস ‘অন্নপূর্ণা’ (Annapurna) বর্তমানে অত্র অঞ্চলের প্রযুক্তি শিক্ষা, কুটিরশিল্প উন্নয়ন, ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ ও মানবিক সামাজিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র।

বিখ্যাত বাঁশগ্রাম বাজার ও স্থানীয় অর্থনীতি

বাঁশগ্রাম বাজার কেবল গ্রামের ভেতরেই নয়, বরং সমগ্র বাগুলাট ইউনিয়ন ও আশপাশের অঞ্চলের অন্যতম বিখ্যাত ও প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র।
  • কৃষি হাট ও পাইকারি বাণিজ্য: এটি অত্র এলাকার ধান, পাট, পেঁয়াজ, রসুন ও নানাবিধ শাকসবজির প্রধান পাইকারি ও খুচরা কেনাবেচার হাট।
  • ব্যবসা-বাণিজ্য: বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় দোকানের পাশাপাশি ইলেকট্রনিক্স, হার্ডওয়্যার, ওষুধ, ফার্নিচার এবং চাল-পাটের পাইকারি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে।
  • অর্থনৈতিক গতিশীলতা: সপ্তাহের হাটের দিনগুলোতে আশেপাশের কয়েকটি গ্রামের হাজার হাজার মানুষ এই বাজারে সমবেত হয়, যা স্থানীয় গ্রামীণ অর্থনীতিকে সক্রিয় রেখেছে।

শিক্ষা ও গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহ

সুফি আইনুদ্দিন (রহ.)-এর জমিদান এবং স্থানীয় শিক্ষার প্রতি নিবেদিত ভূমিকার কারণে বাঁশগ্রাম বর্তমানে ইউনিয়নের প্রধান শিক্ষানগরী।

১. বাঁশগ্রাম বহুমুখী মাধ্যমিক বিদ্যালয় (প্রতিষ্ঠা: ১৯৪৭): ১৯৪৭ সালে সুফি আইনুদ্দিন (রহ.)-এর দানকৃত জমিতে প্রতিষ্ঠিত এই ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠটি কুমারখালী উপজেলার অন্যতম প্রাচীন ও বিখ্যাত উচ্চবিদ্যালয়।

২. বাঁশগ্রাম কামিল মাদ্রাসা (পূর্বনাম: বাঁশগ্রাম ফাজিল মাদ্রাসা): ১৯৪০ সালে প্রতিষ্ঠিত এই ঐতিহাসিক এমপিওভুক্ত সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত মাদ্রাসাটির জমি দান করেছিলেন সুফি আইনুদ্দিন (রহ.)। প্রতিষ্ঠার সাল: ১৯৪০। EIIN নম্বর: 117707 | MPO কোড: 6304022301। শিক্ষার স্তর: ইবতেদায়ী থেকে কামিল (এমএ সমমান) পর্যন্ত (সাধারণ, বিজ্ঞান ও ব্যবসায় শিক্ষা শাখা বিদ্যমান)।

৩. আলাউদ্দিন আহমেদ ডিগ্রি কলেজ (প্রতিষ্ঠা: ১৯৯৪-৯৫): বাগুলাট ইউনিয়নের প্রধান এই ডিগ্রি কলেজের ভিত্তিভূমিতেও সুফি আইনুদ্দিন (রহ.)-এর দান করা জমি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। কলেজটি বর্তমানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত।

৪. প্রাথমিক বিদ্যালয়: প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়নে ‘বাঁশগ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’ সুনামের সাথে পরিচালিত হয়ে আসছে।

 

জনসংখ্যা ও সমাজ ব্যবস্থা

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (BBS) তথ্য অনুযায়ী, বাঁশগ্রামের মোট জনসংখ্যা প্রায় ৪,৫০০ থেকে ৫,০০০ জন।
  • পরিবার ও জনমিতি: গ্রামে প্রায় ১,১০০টির বেশি পরিবার বসবাস করে। নারী-পুরুষের অনুপাত জাতীয় গড়ের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
  • সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি: গ্রামটিতে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতার পাশাপাশি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক হিন্দু পরিবার দীর্ঘকাল ধরে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও পারস্পরিক ভাইচারের সাথে বসবাস করে আসছে।

অবকাঠামো ও যোগাযোগ ব্যবস্থা (LGED)

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (LGED) ও ইউনিয়ন পরিষদের মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী বাঁশগ্রামের যোগাযোগ অবকাঠামো অত্যন্ত সুসংগঠিত:
  • সড়ক নেটওয়ার্ক (LGED): কুমারখালী উপজেলা সদরের সাথে সংযুক্ত প্রধান সড়কটি বিটুমিনাস কার্পেটিং দ্বারা পাকা করা। গ্রামের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ নিশ্চিত করতে আরসিসি ঢালাই ও ইট বিছানো (HBB) সংযোগ সড়ক রয়েছে।
  • ড্রেনেজ ও ব্রিজ-কালভার্ট: সেচ ও বর্ষার পানি নিষ্কাশনের জন্য একাধিক কালভার্ট ও ড্রেনেজ চ্যানেল নির্মিত হয়েছে।
  • বিদ্যুৎ ও সোলার আলো: গ্রামে শতভাগ বিদ্যুৎ সংযোগ রয়েছে এবং বাঁশগ্রাম বাজারসহ প্রধান সড়কগুলোতে সোলার স্ট্রিট লাইট বসানো হয়েছে।

সামাজায়ন ও উন্নয়নমূলক রূপান্তর

ঐতিহাসিক পরিবারের শিক্ষানুরাগ, রাজনৈতিক ঐতিহ্য এবং স্থানীয় বাজার ও এলজিইডি অবকাঠামোর সুবাদে বাঁশগ্রাম একটি গতিশীল মডেল গ্রামে পরিণত হয়েছে। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ ও সামাজিক নেতৃত্বের সহায়তায় বাল্যবিবাহ রোধ, মাদকবিরোধী সচেতনতা এবং পরিচ্ছন্নতা অভিযান নিয়মিত পরিচালিত হয়। ‘অন্নপূর্ণা’-কে কেন্দ্র করে নিখরচায় প্রযুক্তি প্রশিক্ষণ ও চিকিৎসাসেবা গ্রামটিকে কুষ্টিয়া জেলার মধ্যে এক সমৃদ্ধ ও সমাজসেবামুখী দৃষ্টান্ত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

আরও দেখুন: